Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৬৪

দাহশয্যা পর্ব ৬৪

দাহশয্যা পর্ব ৬৪
Raiha Zubair Ripti

ঢাকায় আসার পর ইমন খুব জোর লাগিয়ে দিয়েছে চাকরির জন্য। একটা সরকারি চাকরির সন্ধান পেয়েছে খবরের কাগজে। সেটারই প্রিপারেশন নিয়েছে ২ টা মাস। কদিন আগে সেই জবের জন্য ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল। সব কিছুতেই টিকেছিল ইমন। আশাবাদী ছিলো যে চাকরি টা তার এবার হয়েই যাবে। লিখিত ভাবে মৌখিক ভাবে সব কিছুতেই ইমন পাশ করেছে, কিন্তু সব কিছুতে পাশ করার পরও ইমনের চাকরি হয় নি। এই বাংলাদেশে চাকরি পেতে হলে মেধার আগে বাপ,মামুর লম্বা হাত লাগবে, না হয় বাপের টাকা থাকতে হবে আর তা না হলে মাস্ট কোটা থাকতেই হবে।

বাংলাদেশে শুধু মেধা দিয়ে চাকরি পাওয়া যায় না। ইমনের মেধা ছাড়া উল্লেখিত আর একটা জিনিসও নেই। তার মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৩০% নেই। আছে শুধু মেধা কোটা ৫৫%। সেই ৫৫% কোটা ৩০% কোটার গহ্বরে তলিয়ে গেছে।
ইমন হতাশ হয়ে গেলো বাংলাদেশের এই জব সিস্টেম দেখে। গরীব রা এমনিই চাকরির অভাবে মরে যায় প্রতিনিয়ত , এখন এই রকম জব সিস্টেম তাদের আরো মে’রে দিবে। এর জন্যই বাংলাদেশে বেকারত্বের হার কমে না।
তবে কোটা ব্যবস্থা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা মূলত পাকিস্তান আমল থেকেই চালু। ১৯৪৯ সালে লিয়াকত আলী খান প্রথম কোটা প্রথা শুরু করেন যেখানে মাত্র ২০% ছিল মেধা, আর বাঙালিদের জন্য রাখা হয় ৪০% বিশেষ কোটা, কারণ মেধা কোটায় বাঙালিদের সুযোগ ছিল খুব কম।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু,পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান , ১৯৮৫ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কোটাকে অন্তর্ভুক্ত করেন।

এর মধ্যে ১৯৯০-এর পর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরাসরি চাকরি পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা দাবি করতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের যেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকুরির ব্যবস্থা করা হয়। পরে ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটায় যুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশে কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন শুরু করে ছাত্রশিবির ১৯৯৬ সালে। শিবিরের দাবি ছিলো, যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী নেই, তাই ৩০% কোটা মেধায় যুক্ত করা দরকার । পরে ২০০২ সালে কিছু সংস্কার হলেও বৈষম্য বহাল থাকে।
সময়ের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরসূরি কমতে থাকায় ৩০% কোটা সমগ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে বড় বৈষম্য তৈরি করে।
২০০৮, ২০১১ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয় বিশেষ করে ৩য় প্রজন্মকে কোটায় যুক্ত করার পর প্রতিবাদ বাড়ে। ২০১৩ সালে দমন-পীড়নে আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যায়।

২০১৮ সালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে কোটা সংস্কার আবার গণদাবিতে পরিণত হয়।
কিন্তু কোনো লাভই হচ্ছে না। কোটার কোটা থেকেই যাচ্ছে। এই সোনার বাংলায় ইমনের মতন লক্ষ লক্ষ তরুন যুবক এই বেকারত্বের বোঝা বয়ে হেঁটে চলছে। অথচ তাদের উপরই রাখা হয়েছে আস্ত একটা সংসারের বোঝা। গোটা পরিবার তাদের দিকেই মুখ চেয়ে তাকিয়ে আছে। দুই বোঝার চাপ বয়ে হাঁটা কি সহজ? এত শিক্ষিত হয়েও ইমনের চাকরি করতে হচ্ছে এক মেয়রের ড্রাইভার হয়ে। পড়াশোনা করার মূল্য কি তাহলে এটাই? বাংলাদেশের প্রায় সব চাকরি সেক্টরে বসে আছে মুক্তিযুদ্ধের নাতিপুতিরা।
ইমনের আফসোস হচ্ছে কেনো তার একটা মুক্তিযোদ্ধা কোটা নেই? বাপ দাদারা তখন সংসার নিয়ে পড়েছিল।
ইমন নির্নিমেষ চোখে আকাশের দিকে তাকালো। মানুষ কেনো বড় হয়? বড় হলেই চেনা যায় জীবন কতটা নিষ্ঠুর। তার কান্না পায় খুব এই জীবন দেখে। পুরুষ মানুষ বলে কাঁদতে পারে না সব সময়। সমাজে একটা প্রচলিত বাক্য আছে পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। কিন্তু এই সমাজ কি করেছে ইমন দের মতো তরুনদের জন্য? কিচ্ছু করছে না। কোনো একদিন আসবে, এই বাংলাদেশের জব সিস্টেম বদলাবে। কোটার জায়গায় মেধার মূল্যায়ন হবে। ততদিন ইমন থাকবে তো বেঁচে? নিজ চোখে দেখতে পারবে তো এই সোনার বাংলার নতুন ভাবে জন্ম হওয়াটা? ইমন ছাঁদের রেলিঙ ঘেঁষে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লো। এত এত নিষ্ঠুর বাস্তবতা দেখতে দেখতে ইমন ক্লান্ত। আহাজারি করে ইমন আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলল-

“ ইয়া আল্লাহ এভাবে চলতে থাকলে আমার মতন হাজার হাজার ইমন অচীরেই হারিয়ে যাবে এই দেশ থেকে। একটু মুখ তুলে তাকাও আমাদের দিকে। একটু করুনা বর্ষণ করো। তুমি ছাড়া কেউ নেই আমাদের। সাহায্য করো। মন্ত্রণালয়ের গদিতে বসে থাকা লোকদের সুবুদ্ধি দাও। তারা এই দেশ টাকে নরকে পরিণত করে তুলছে। তারা ভাবছে এই দেশ তাদের বাপের নিজস্ব সম্পত্তি । তাদের বাপ স্বাধীন করেছে একা। তাই তাদের বাপের ভাই, ভাইয়ের ছেলেমেয়ের নাতিপুতিদেরই শুধু অধিকার আছে সরকারি চাকরি করার। আমারা সাধারণ মানুষ গুলোর অধিকার থাকার সত্বেও আমাদের বঞ্চিত। তুমি তাদের এই অহং টা এই ভুল ধারণা টা ভেঙে দাও। এমন ভাবে ভেঙে দাও যেন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে দেখে তাদের। পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত রাজনীতির ঘাঁটি এই বাংলাদেশ। ”
ঢাকা থেকে ঊর্মি নওগাঁ চলে যাওয়ার পর থেকেই খুব ভয়ে ভয়ে কাটাচ্ছে দিন। এই বুঝি তার মা ভাই জেনে গেলো বিয়ের কথাটা। আর তাকে ইচ্ছে মতো পিটালো। ইব্রাহিম রোজ ফোন দেয় রাতে। ইদানিং শরীর টা ভীষণ খারাপ ঊর্মির। কিছু খেতে পারে না। চোখ মুখ হলুদ হয়ে গেছে। ডক্টর দেখানোর পর জানালো জন্ডিস হয়েছে। ইমন খবর টা জানতে পেরেই বোন কে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। ইব্রাহিম জানে না ঊর্মির জন্ডিস হয়েছে। ঊর্মি জানায় নি। তবে বাড়ি ফিরে শুনলো ইমন ঊমি কে নিয়ে এসেছে,আর ডক্টরের কাছে নিয়ে গেছে।
ইব্রাহিম ছুটলো ঐ হসপিটালে। জন্ডিস টা মারাত্মক লেভেলে হয়েছে। ডক্টর প্রথমেই রক্ত পরীক্ষা করলেন। রক্তকণিকার ভাঙন, হিমোগ্লোবিন, বিলিরুবিন সব পরীক্ষা হল। রিপোর্ট দেখে বললেন,

“জন্ডিস মারাত্মক, মূলত হিমোলাইটিক কারণে লিভারের চাপ বেশি।”
এরপর ঊর্মিকে দিলেন লিভার সাপোর্ট ওষুধ, যা লিভারের কাজ সহজ করবে এবং বিলিরুবিন কমাবে। ইনফিউশন শুরু করলেন, যাতে শরীরের পানি ও লবণ ঠিক থাকে এবং দুর্বলতা কমে। রক্তের মান নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রক্ত প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা প্রস্তুত করা হলো। পাশাপাশি হালকা খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সংক্রমণ এড়ানোর পরামর্শ দিলেন।
ইব্রাহিম হন্নে হয়ে খুঁজে ইমন কে দেখতে পেয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ তোমার বোন ঠিক আছে? কি হয়েছি কি ওর? ”
ইমন চমকালো। ইব্রাহিম জানলো কি করে সে হসপিটালে আর ঊর্মি সাথে আছে? আর জেনেছে যখন তখন এমন হন্নে হয়ে আসলো কেনো?
“ জন্ডিস হয়েছে। ডক্টর ঔষধ দিয়েছে,বলেছে ঠিক হয়ে যাবে। ”
ইব্রাহিম আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে বলল-
“ কবে হলো জন্ডিস? ”
“ সপ্তাহ খানেক ধরেই শরীর অসুস্থ ছিলো। ”

ইব্রাহিমের শরীর বেয়ে রাগ সঞ্চারিত হলো। মেয়েটা তাকে বললো না কেনো?
ঊর্মি কে নিয়ে ইব্রাহিমের বাড়িতেই আনা হলো। একেবারে সুস্থ হলে তারপর রেখে আসবে। ইমন বাহিরে যেতেই ইব্রাহিম চেপে ধরলো ঊর্মি কে। ধমক দিয়ে বলল-
“ তোমাকে জাস্ট চ’ড়িয়ে দাঁত ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে। কেনো বলো নি আমায়? সমস্যা কি তোমার? তোমার স্বামী আমি। অধিকার আছে জানার। ”
ঊর্মি ক্লান্ত শরীর নিয়ে বলল-

“ বললেই চলে আসতেন। আর আপনি চলে আসলেই গন্ডগোল হয়ে যেত। তাই জানাই নি। ”
“ আমি কেয়ার করি না ওসবের। জানলে জানতো।”
“ না আপনি বলেছিলেন আপনি সুন্দর মতো জানাবেন বাসায়। এভাবে জেনে গেলে সমস্যা তৈরি হতো। ”
“ তোমরা গ্রামের মেয়েরা ভীতু কেনো? লোক সমাজকে এত ভয় পাও কেনো? ”
“ জানি না। আপনি এখন যান। ভাইয়া দেখলে ভালো দেখাবে না বিষয় টা। ”
ইব্রাহিম তপ্ত শ্বাস ফেলে চলে গেলো।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে তাদের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে চাচ্ছে তুর্কি যেতে। মেহরিনেরও ইচ্ছে তুর্কি শহরটাকে নিজ চোখে দেখে ছুঁইয়ে দেওয়ার। সোলেমান এবার সেটা পূরণ করবে। বিবাহ বার্ষিকীর ৩ দিন আগে মেহরিন কে নিয়ে তুর্কির ইস্তানবুল শহরে আসলো। সাথে এসেছে ডক্টর অয়ন, লুকা আর অ্যালিজাও। তারা Stunning Private House in Balat এ উঠলো।
ফাতিহ জেলার বালাত এলাকায়, সুলেমানিয়া মসজিদ থেকে প্রায় ২.১ কিলোমিটার দূরে।
এত সুন্দর এই শহরটা। গাড়ি দিয়ে শহরে প্রবেশ করার সময় মেহরিন মুগ্ধ হয়ে দেখছিল শহরের ইতিহাসে ভরা রাস্তাগুলো, রঙিন বালকনি আর সুলতানদের যুগের প্রাচীন স্থাপত্য। সন্ধ্যার দিকে তারা বালাত এলাকায় এসে থামলো। বাড়িতে পৌঁছেই দেখলো আগে থেকে খাবার-দাবার সাজানো ছিলো। মেহরিন সোলেমানরা ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে নেয়। খাওয়াদাওয়া শেষে মেহরিন অ্যালিজার সাথে গল্প করছিলো বাগানে। সেখানে
হুট করে সোলেমান এসে মেহরিন কে পাঁজা কোলে নিয়ে অ্যালিজার উদ্দেশ্যে বলল-

“ বিবাহিত মহিলা দের এত রাত করে কিসের গল্প বাগানে? রুম নেই,স্বামী নেই তোমাদের ? তোমার স্বামী অপেক্ষা করছে রুমে অ্যালিজা রুমে যাও। নিজেও স্বামী হারা হয়ে থাকো,আমার বউটাকেও স্বামী হারা করে রাখছো। গজব পড়বে তোমার উপ্রে। ”
মেহরিন হতবিহ্বল। এটা কিভাবে কথা বলছে উনি? মেহরিনের লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। ডক্টর অয়ন ও এসে দাঁড়িয়েছে। মেহরিন মুখ গুজলো সোলেমানের বুকে। সোলেমান রুমে চলে আসলো মেহরিন কে নিয়ে।
পরের দিন সকালেই তারা শহর ঘুরতে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলো। মেহরিন গোল্ডেন রঙের একটা গ্রাউন পড়েছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিকাব বাধছে। মেহরিনের পেছনেই সোফায় বসে স্যু’র ফিতা বাঁধছে সোলেমান। বাঁধা শেষ হতেই মেহরিন কে দেখতে লাগলো। মেহরিন আয়নায় তাকাতেই সোলেমান কে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“ ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? ”
সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ কোন ভাবে তাকিয়ে আছি? ”
“ রাত হলে যেভাবে তাকান। ”
“ রাত হলে কিভাবে তাকাই? ”
“ বাজে চোখে তাকান। ”
সোলেমান হেঁসে উঠলো। গালে দু হাত দিয়ে চোখের নজর টা আরো গাঢ় করে বলল-
“ উফস বউজান, আমি নষ্ট মনে নষ্ট চোখে দেখি তোমাকে, মন আমার কি চায় বোঝাই কেমনে? ”
“ অসভ্য আপনি একটা। আমি ভালো ভেবেছিলাম আপনাকে। ”

“ অসভ্য না হলে মা ডাক শুনবে কি করে শুনি? আর এই অসভ্য টাকে আমার জন্য হালাল করে দেওয়া হয়েছে । ”
“ হুসসস চুপ করুন আপনি। কথায় কথায় শুধু ওসব টানেন। দিনদুপুর ও বাদ রাখেন না। গতকাল কি করলেন ওটা? অ্যালিজা আপুর সামনে থেকে ওভাবে কোলে করে নিয়ে আসলেন কেনো? আর কথাবার্তা ওমন বেলেহাজের মতন ছিলো কেনো? বুদ্ধি কি কমে গিয়েছিল রাত ছিল বলে? বাহিরে লোকজনের সামনে ঐ টোনে একদম কথা বলবেন না আর বুঝেছেন? মনে থাকবে? ”
“ জ্বি ম্যাডাম যেহেতু, আপনি গুরু আমি শীর্ষ, বুদ্ধি আমার কম। আপনি বুঝাইয়া দিলেন বলে আমি বুঝিতে সক্ষম। ”
অ্যালিজা পিংক গ্রাউন পড়েছে। শর্ট চুল গুলো ছেড়ে দিয়েছে। লুকা ফুল হাতার কালো গেঞ্জি পড়েছে। মাথায় ফেক চুল লাগিয়েছে। বউ আবার তার টাকলা মাথা নিয়ে ছবি তুলতে লজ্জা পায়।
মেহরিন রা হাউস থেকে বের হয়ে প্রথমে তারা গেলো বালাত এলাকা ঘুরতে। বালাত তার রঙিন ভবন, প্রাচীন পাথরের রাস্তা এবং ছোট ছোট ক্যাফে দিয়ে পরিচিত। হাঁটার মাঝে কি যে শান্তি অনুভব করলো মেহরিন যা বলার বাহিরে। টাকা জমিয়ে সবার উচিত একবার হলেও এই ইস্তানবুলে আসা। এদের জীবনযাপন, এদের ন্যাচার,এতোটা সুন্দর এতোটা আকর্ষণীয় নিজ চোখে না দেখলে শুধু ছবিতে দেখেই আফসোস করতে হবে।

সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে NAFTALIN নামের ক্যাফেতে ঢুকলো। যেহেতু সকালে তারা খায় নি কিছু। ক্ষুধাও লেগেছে। এই ক্যাফে টা ক্যাট-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ এবং বিংশ শতাব্দীর নস্টালজিক সাজসজ্জার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ক্যাফেতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পুরনো বই, টাইপরাইটার, রেট্রো ফ্রিজ আর টেলিফোন দিয়ে সাজানো ইন্টেরিয়র, যেটা একটা আলাদা সময়ের ভ্রমণে নিয়ে যায়। মেহরিন বই গুলো ছুঁয়ে দেখলো। এখানে অনেক বিড়াল আছে, এখানে ওখানে টেবিলের উপর নিচে সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেড়াল। এরা অতিথিদের সাথে ভীষণ আদুরে হয়ে মিশে থাকে। মেহরিন একটা ধবধবে গুলুমুলু সাদা একটা বিড়াল কে কোলে নিলো। কি আদুরে বিড়াল গুলো। সোলেমান বিড়ালের সাথে ক্যাফের সাথে বিভিন্ন পোসে ছবি তুলে দিলো মেহরিনের।
মেহরিনরা হস্তনির্মিত কেক, কুকিজ, তুর্কি কফি, চা আর মেনেমেন অর্ডার দিলো। মেনমেন মানে অমলেট।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে তারা গেলো গ্র্যান্ড বাজারে। সোলেমান নিজে পছন্দ করে মেহরিন কে চুড়ি,ব্যাগ, জুতা, শাল,স্কাফ,ড্রেস,অটোমান স্টাইলের গয়না, নীল তাবিজ,জায়নামাজ কিনে দিলো। মেহরিনের খুশি দেখে কে? এত সুন্দর শহর! মেহরিনের এই শহরেই কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করতেছে। চোখ ধাঁধানো সুন্দর এই ইস্তানবুল শহর টা।

গ্র্যান্ড বাজার থেকে তারা গেলো স্পাইস বাজারে। হাজারো দোকানের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে মেহরিন এবং অ্যালিজা স্থানীয় মশলা, চা, রঙিন ল্যাম্পস ও কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হলো। মেহরিনে মশলা,তুর্কিশ ডিলাইট, চা কিনে নিলো।
স্পাইস বাজার থেকে বেরিয়ে তারা গেলো আমব্রেলা ক্যাফে তে। সেখানে তারা বিকেলের নাস্তা করলো।
সারা টা সময় সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে রেখেছিল। প্রতিটি জায়গার সম্পর্কে মেহরিন কে বলেছে। অয়ন আর লুকা পেছন থেকে দু’জন কে শুধু দেখে গেছে। ডক্টর অয়ন লুকা কে বলছে-
“ বাব্বাহ্ পৃথিবীতে মনে হয় আর কেউ বিয়ে করে নি। স্যার যেভাবে বউয়ের হাত ধরে হাঁটছে মনে হচ্ছে ছেড়ে দিলেই বউ হারিয়ে যাবে। ”
লুকাও সাই জানিয়ে বলল-

“ ঠিক,একদম ঠিক বলেছো। আমাদের কি বউ নেই নাকি? ”
ডক্টর অয়ন বলল-
“ আমার নেই ভাই। ”
“ সো স্যাড ডক্টর অয়ন। তোমার দুঃখে আমি দুঃখিত। ”
ফেরার পথে ফোন আসে ইব্রাহিমের। সোলেমান কানে নিয়ে বলল-
“ বল। ”
ইব্রাহিম বলল-
“ কোথায় তুই? ”
“ তোর বাপ দাদার দেশ ইস্তানবুলে আমি। ”
ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকালো।
“ তুর্কী গেছিস? ”
“ হুমম। ”
“ কেনো? ”
“ নিশ্চয়ই হানিমুনে নয়। কাজেই এসেছি। তুই কেনো ফোন করেছিস সেটা বল। ”
“ তোর চাচা তো বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেছে। ”
সোলেমান বিস্ময়ের সহিত বলল-

“ হোয়াট! চাচা বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেছে মানে! কোন দুক্কে চলে গেল? ”
“ জানি না। এজওয়ান আনতে গেছে। বুইড়া বয়সে এ কেমন নাটক করে তোর চাচা বল তো? ”
সোলেমান ফোন কাটার আগে বলল-
“ মেয়ে দেখ। আমি ফিরে বিয়ের ব্যবস্থা করছি। ”
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ কিসের জন্য মেয়ে দেখবেন? কার বিয়ে? ”
সোলেমান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“ ধরো আমি বিয়ে করে নিলাম তোমায় রেখে। কি করবে তুমি? ”
মেহরিন মুখ জানালা বাহির দিকে করে বলল-
“ আপনাকে ছেড়ে দিব। ”
সোলেমান চেপে আনলো মেহরিন কে।

“ ছেড়ে দিবে মানে! তোমার স্বামী কে তুমি ছেড়ে দিবে? ”
“ স্বামী যদি আমাকে রেখে পর নারীর দিকে ঝুঁকে তাহলে ছেড়ে দিব না তো কি করবো শুনি? আমার বাপ আপনার সাথে রাখবে আমায়? জীবনেও না। আর না আমি আপনার সাথে থাকবো। আমি কি অবলা ? স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করবে আর আমি আড়ালে বসে কাঁদবো? হ্যাঁ কাঁদবো তবে অসহায় হয়ে আপনার সংসার করা অবশ্যই দেখবো না। আপনাকে দান করে দিব ঐ নারী কে। আর এমন ভাবে ছেড়ে দিব আপনায় যে সারাজীবন আফসোস করতে করতে ভাববেন আপনি আসলে কি করেছেন। ”
সোলেমান হাসলো। মেহরিন কে বুকের সাথে চেপে ধরে বলল-
“ দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ বিয়ে যদি করতেই হয় আমি নওয়াজ সোলেমান সুলতান শুধু আর শুধুমাত্র তার বিবিজান মেহরিন সুলতান কেই করবো। এই জীবন আমৃত্যু তার বিবিজানের দাসত্ব করতে রাজি তারপরও অন্য কারো গল্পে রাজা হয়ে রাজত্ব করতে রাজি নয়। জীবন মরন সুখ দুঃখ সব তুমিতেই আবদ্ধ আমার। ”
“ তাহলে পর নারীর কথা আমার সামনে বলবেন না। রাগ হয় আমার। ”
“ জো হুকুম সুলতানা। ”

এজওয়ান বৃদ্ধাশ্রমে এসে বাপের পাশে বসে বাপ কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাশার সুলতান যাবে না। এজওয়ানের বউয়ের জন্য সোলেমান তাকে কথা শুনিয়েছে। ছেলের বউয়ের জন্য কেনো সে কথা শুনবে? সে যাবেই না বাড়ি।
এজওয়ান বিরক্ত হয়ে হাতের ফোন টা বাশার সুলতানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ দেখো তাহলে কোন মেয়েটাকে তোমার পছন্দ হয়।
বাশার সুলতান ফোনের দিকে তাকালো। কয়েকটা মেয়ের ছবি৷ ধরতে গেলে বাশার সুলতানের মেয়ের বয়সী। ছেলের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-
“ মেয়ে কেনো দেখাচ্ছিস আমায়? ”
“ তোমার পছন্দ করা মেয়ের সাথেই বিয়ে ঠিক করবো। ”
বাশার সুলতান চমকালো।
“ দ্বিতীয় বিয়ে করার চিন্তা ভাবনা করছিস! দেখ এজওয়ান মানছি মাহি কে আমার পছন্দ না। তোকে মাহি মানে না। বৈবাহিক জীবনে এমন ঝগড়াঝাঁটি হয়ই। তাই বলে দ্বিতীয় বিয়ের দিকে ঝোঁকা টা মোটেও ভালো কাজ না। ঐ মেয়েকে বুঝাবি ভালো করে। আমরা বোঝালে খারাপ দেখায়।
এজওয়ান বাপের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকানোর সাথে মুখটাকেও কুঁচকালো। ফোনটা বাশার সুলতানের কোলে দিয়ে বলল-

“ পাগল নাকি আমি কেনো দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাব। একটাকেই সামলাতে হিমশিম খাই। আরেকটা বিয়ে করলে আমাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ”
“ তাহলে মেয়ের ছবি দেখাচ্ছিস কেনো আমায়?”
“ তুমি দেখবে না তো কে দেখবে? বিয়ে তো দিব তোমাকে। মেয়ে তো তোমারই পছন্দ করা লাগবে। আমায় আর ভাইজান কে তুমি মোটেও শান্তি দিচ্ছ না। তোমার এই একাকিত্বের জন্য আমাদের সমস্যা হচ্ছে । যখন খুশি তখন আমাদের জ্বালাতে চলে আসো। বউকে ছুঁতে গেলেই তোমার ডাক আসে। ওয়াশরুমে গেলে ডাক আসে। পুরাই যন্ত্রণাময় বানিয়ে দিছো আমাদের জীবনটা। তাই আমি আর ভাইজান মিলে ঠিক করেছি তোমার বিয়ে দিব। ভেবো না কচি মেয়েই দিব। এরা রাজি হয়েছে তোমায় বিয়ে করতে। তোমার ছবি দিয়ছিলাম। তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে তোমাকে৷ তুমি রাজি হলেই বিয়েটা ফাইনাল। তখন যেখানে খুশি সেখানে চলে যাও আমরা নিতে আসবো না।
বাশার সুলতান হতবিহ্বল হয়ে গেলো ছেলের কথা শুনে। এই বুড়ো বয়সে এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে তার ছেলেরা! বৃদ্ধাশ্রমে এসেও রেহাই দিচ্ছে না। এই অপমান মোটেও মেনে নেওয়া যায় না। বাশার সুলতান উঠে চলে যেতে যেতে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৬৩

“ দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে। আর আসবি না এখানে। আমি যাব না সুলতান নিবাসে। দোয়া করি তোরা বুড়ো হ আর তোদের ছেলেপেলে তোদের সাথে এমন ব্যবহার করুক। ”
এজওয়ান দু হাত তুলে বলল-
“ আমিন। সেই উছিলায় হলেও একটা বাচ্চা যেন হয় তোমার পুতের ঘরে। ”
বাশার সুলতান হাঁটার গতি বাড়িয়ে চলে গেল।

দাহশয্যা পর্ব ৬৫