ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ২১
মাহিরা ইসলাম মাহী
আদ্রিত ততক্ষণে মাহরিসার বাসার নিচে।
“ তুই আসবি নাকি আমি আসবো? কোনটা?”
মাহরিসা’র ভয়ে গলা শুঁকিয়ে কাঠ কাঠ।
কি হবে তার এখন? ক্ষ্যাপা সিংহকে সে আরো ক্ষেপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই বা কি করতো।
নিজের কানে শোনা কথাগুলো তো সে আর ফেলে দিতে পারে না।
ইয়া খোদা কি হবে তার এখন? কে বাঁচাবে তাকে..
মাহরিসা ঘরের মাঝে পায়চারি চালায় সমান তালে।কম্পন তার পুরো শরীরে।
কি করবে এখন সে।
এর মাঝে আদ্রিত জানালা দিয়ে ঢিল ছুড়ে।
রাস্তায় পরে থাকা টুকরো পাথরটার দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে চেয়ে রয় মাহরিসা।
ফোন বাজে তার।
“আসবি কি না? “
মাহরিসা আর কোনো উপায় দেখছে না। ইতোমধ্যে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশটার ঘর পেরিয়েছে।
টিপ টিপ পায়ে সে বাহিরে উঁকি দেয়।
নাহ কেউ নেই ড্রয়িংরুমে।
দুরুদুরু বুকে সে নিচে নেমে আসে গেট খুলে।
কাঁপতে কাঁপতে আদ্রিতের গাড়ির থেকে খানিকটা দূরে এসে দাঁড়ায়।মাহরিসার নিজের উপর নিজে বিরক্ত হচ্ছে।
আশ্চর্য তার এত কম্পন আসছে কই থেকে।
ইচ্ছে করছে নিজের গালে নিজেই একটা ঠাটিয়ে চর মেরে বসে।
গাড়িটা আজ খাটাশ মানব বাড়ির পিছনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
তাইতো আরো নির্জনতায় ছেয়ে আছে চারিপাশ। যানবাহন চলাচলের শব্দ নেই অথচ কেমন অদ্ভুত ভুতুরে আওয়াজ। সর্বনাশ এখান থেকে তার আদু ভাই যদি তাকে গুম ওও করে দেয় কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না, কেউ না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নিঃশব্দে চাপা আর্তনাদে ফেটে পরে তার মন।
মাহরিসার আগমনে আদ্রিত গাড়ি থেকে বের হয় ঝড়ের বেগে। মানব এত জোড়ে ঠাস করে গাড়ির পাল্লা লাগালো যে মাহরিসার মনে হলো কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো বুঝি। সেই ঝটকানিতে মাহরিসার দেহ কেঁপে উঠলো দিগুন তালে।
দোয়া ইউনূস পড়তে পড়তে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো।
“ ক..কেন ডেকেছো আদু ভাইয়া।”
“ তোর ব্যক্তিগত অধিকারের ষষ্ঠী করতে।”
মুহুর্তে নিজের পা দুটোকে শূন্যে আবিষ্কার করে মাহরিসা। অসভ্য মানব তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছে।
ঘটনা উপলব্ধি করতে রমনীর দু সেকেন্ড সময় লাগে।চিৎকার করতে নেয় সে।
আদ্রিত অপর হাতে মাহরিসার মুখ চেপে ধরে।
“ আমি বাসায় যাবো আদু ভাইয়া।আমায় ছেড়ে দাও।”
“ চুপপ।ইডিয়েট। “
“ আমি বাসায় যাবো। আদু…”
“ একটা কথা বলবি তো সোজা আছাড় মেরে নিচে ফেলবো তোকে। আই গেস বিনি টাকায় আছাড় খেতে তোর ভালোই লাগবে।”
আদ্রিত দাঁতে দাঁত চাপে।
চোখ বড় বড় করে।মাহরিসা নাক টানে। কত্তবড় অভদ্র লোক শুধু তাকে ধমকায়।তাকে হুমকি দেয়।
“ বাসায় যাবো আ…”
বাকি কথা বলার সাধ্য হয় না তার, আদ্রিত একপ্রকার ছুঁড়ে মারে তাকে গাড়ির ভেতর।
মানবের হঠাৎ কার্যে মাহরিসা তাল সামলাতে না পেরে ব্যাথা পেয়েছে কোমরে।
কত্তবড় পাষান্ড লোক। তার প্রতি একটু দয়া মায়া ও হয় না।
আদ্রিত কে গাড়ি স্টার্ট দিতে দেখে মাহরিসা হতভম্ব।
সে ভেবেছিলো হয় তো সর্বোচ্চ আদ্রিত তাকে দুই চারটা থাপ্পড় মারবে।
কিন্তু কাহিনি তো উল্টো ঘটছে ইয়া খোদা।
“ কোথায় যাচ্ছেন আপনি আদ্রিত ভাই?”
আদ্রিত জবাব দিলো না।
“ বলুন প্লিজ।”
মাহরিসার কলিজা শুঁকিয়ে। সে বাসায় নেই আর তা যদি বাসার কেউ টের পায় তাকে জ্যান্ত পুঁতে রাখবে।
“ আগে নিজে ঠিক কর এখনো ছোট থাকবি নাকি অল্পতেই বড় হবি।”
মাহরিসা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে নাক টানে।আদ্রিতের কথার মানে তার বোধগম্য হয় না।
ড্রাইভিং করতে করতে আদ্রিত কাকে কাকে যেন ফোন দেয়।
তাদের সঙ্গে বলা আদ্রিতের অস্পষ্ট কথাগুলোও মাহরিসা স্পষ্ট বুঝতে পারে না।
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনি আমায় আদ্রিত ভাই?”
আদ্রিত কথার জবাব দেয় না।
খানিকক্ষণ পরেই সে জোড়ছে ব্রেক কষে।
মাহরিসা কোনো রকমে নিজেকে সামলায়।
আদ্রিত গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুঁড়ে,
“ নাম।”
“ নামতে বলেছি তোকে।”
দীর্ঘ সময় লাগিয়ে আদ্রিতের ধমক খেয়ে মাহরিসা কাঁচুমাচু মুখ করে নেমে আসে।তার কান্না’র দমকের সঙ্গে নাক টানা কমেছে অনেকটা।
বাহিরে বের হয়ে সে অবাক হয়। কোথায় নিয়ে এসেছে লোকটা তাকে।
কোথাও পাচার করে দিবে না তো তাকে। সর্বনাশ।
“ আমার পিছু পিছু আয়।”
কিন্তু মাহরিসা আদ্রিতের পিছু যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
সামনের বিল্ডিংটায় বড় বড় অক্ষরে কাজী অফিস লেখা সাইনবোর্ডটায় চোখ আটকায় তার দৃঢ় ভাবে।অজানা আশঙ্কা তার বুক টেপে ধরে।
সঙ্গে অসম্ভব ও মনে হয় খানিক।
মাহরিসাকে নড়তে না দেখে আদ্রিত ধমকায়।
“ কি হলো কথা কানে যায় না তোর? তুলো গুঁজেছিস?”
আদ্রিত হাল ছাড়ে। মাহরিসার এক হাত শক্ত করে ধরে টানে।
হাতে ব্যাথা পেয়ে ডুঁকরে কেঁদে উঠে সে।
আদ্রিত বিরক্ত হয়।
“ শরীর তো নয় যেন আস্ত তুলোর ভান্ডার হাতে ধরেছি। সামান্য হাত ধরায় ব্যাথা পাচ্ছিস সামনে কি করবি তুই? আশ্চর্য মেয়ে মানুষ।”
সামনে মানে, ব্যাথা, কান্নার মাঝেও আদ্রিতের কথার অর্থ বোঝার স্বার্থে মস্তিষ্ক খাটায় মাহরিসা।তবে সফল হয় না অর্থ উদ্ধারে।আহাঃ এত বোকা হলো কবে থেকে তার চতুর মস্তিষ্ক।
সবই কি তার আদু ভাইয়ের কামাল।
“কাল থেকেই তুই জীমে যাবি নিয়ম করে।
তোর এই তুলোর মতো নরম শরীর দিয়ে আমার পোষাবে না বুঝেছিস কিছু মাথা মোটা?
তোকে কি ভেঙে মচকে শুধু শোকেজেই সাজিয়ে রাখবো?উহু তা তো হচ্ছে না মেরিগোল্ড। “
মাহরিসা চোখ বড় বড় করে চেয়ে আদ্রিতের পানে।
কাজী অফিসের সামনে গিয়ে দুজন দাঁড়াতেই।
চারজন পরিচিত -অপরিচিত মুখশ্রী বেরিয়ে আসে ভেতর হতে।
দু’জনের মুখ মাহরিসার কাছে পরিচিত।
একজন স্মৃতি ম্যাম অপরজন নিস্তব্ধতা। আর দুজন ছেলে জাওয়াদ আর বিদ্যুৎ আদ্রিতের ফ্রেন্ড যাদের দুজনই মাহরিসার অচেনা।
নিস্তব্ধতা কে দেখেই মাহরিসার দেহে যেন প্রাণ সঞ্চার হয়।
আদ্রিতের হাত কোনো রকমে ছাড়িয়ে সে দৌঁড়ে গিয়ে নিস্তব্ধতা কে জরিয়ে ধরে ডুঁকরে কেঁদে উঠে।
নিস্তব্ধতা নিজেরও ভাইয়ের কার্যকলাপ কিছু বোধগম্য হচ্ছে না।
আদ্রিত যে এখানে মেয়েটাকে নিজের করতে এসেছে সে তা বেশ বুঝতে পারছে।
কিন্তু আদ্রিত এমনটা করবে তা ছিল তার ভাবনাতীত। মাহরিসা কে তার ভাই যে পছন্দ করতে পারে তা ছিল তার কল্পনাতীত।ভাই তাকে আর্জেন্ট কল করে এখানে নিয়ে আসে। প্রফেসর জাওয়াদই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে ভাইয়ের তাগিদে।সে নিজেও চুপিচুপি বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে।
মাহরিসা নাক টেনে টেনে বলে,
“ আপু তোমার ভাই আমাকে এখানে জোড় করে নিয়ে এসেছে।কি হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না আপু।কি হচ্ছে আমায় একটু বলো প্লিজ।তোমরা কেন সবাহ এখানে।”
নিস্তব্ধতা মাহরিসার মাথায় হাত বুলায়।
আদ্রিত যেহেতু মাহরিসাকে নিজের জীবন সঙ্গিনী হিসাবে চুজ করেছে তার মানে নির্ঘাত এর পেছনে কোনো কারণ আছে।
আদ্রিত এমনি এমনি কিছু করার ছেলে নয় মোটেও।
নিস্তব্ধতা ফিসফিস করে বলে,
“ কাঁদেনা বুনু? তুই কি আমার ভাইকে পছন্দ করিস না বল?”
“ কিসের পছন্দ আপু? “
মূলত নিস্তব্ধতা জানেই না মাহরিসা বিয়ে সম্পর্কে একটুখানিও অবগত নয়।
“ কিসের পছন্দ মানে কি মারু? তুই বিয়েতে রাজি না?”
মাহরিসা হতভম্ব নেত্রে চেয়ে নিস্তব্ধতা’র পানে,
“ কিসের বিয়ে? কার বিয়ে?”
মাহরিসার মাথায় যেন এবারে সত্যি উপরে থাকা মস্ত আকাশ খানা ভেঙে পরার উপক্রম।
নিস্তব্ধতা আর একটা কথা বাড়ায় না মাহরিসার সঙ্গে।
জাওয়াদ আর বিদ্যুৎ এগিয়ে যায় আদ্রিতের কাছে।
আদ্রিত থমথমে কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ কাজী সাহেব আসেনি এখনো? ঘুম হয় নি তার?”
জাওয়াদ স্পষ্ট স্বরে বলে,
“ রাত এগারোটার বেশি বাজে আদ্রিত কাজী সাহেব ঘুমাচ্ছে? “
“ তো তোমাকে বলিনি ভাই, কাজী কে আর্জেন্ট আসতে বলতে?”
জাওয়াদ বলে,
“ রিলাক্স। এত হাইপার হচ্ছিস কেন।এবারে বল ঘটনা কি? সকাল হওয়ার অপেক্ষা করা যেত না? এখনি কেন?”
“ তুমি বুঝতে পারছো না ভাই।ব্যাপারটা ক্রিটিক্যাল না হলে আমি…।”
আদ্রিতের কন্ঠে উৎকন্ঠা।
“ আচ্ছা, আচ্ছা ঠিকআছে আমি দেখছি
এই বিদ্যুৎ দেখতো কাজী ব্যাটা কদ্দুর। নয়তো সালাকে গিয়ে তুলে নিয়ে আয়।আমার ভাইয়ের বিয়ে আজই হবে।”
আদ্রিত হাসে।
বিদ্যুৎ কাজীকে ফোন দেয়।
জানায় সে চলেই এসেছে প্রায়।
কাজী বেচারা ঘন্টাখানিক আগেই ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছিলো।অথচ মোটা অঙ্কের টাকার লোভ সামলাতে না পেরে তার সেই সাধের ঘুৃম ছেড়ে এসেছে। কিন্তু এখানে এসে যখন সে দেখবে পাত্রী বিয়েতে রাজী না তখন তার কি হবে।কি হবে তার এতগুলো টাকার।
জাওয়াদ এবারে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে,
“ কিন্তু সব নাহয় বুঝলাম মাহরিসা রাজী তো বিয়েতে? আর মাহীন আঙ্কেল জানতে পারলে কিন্তু ব্যাপারটা… তার উপর নিস্তব্ধ আঙ্কেল, আন্টি কিন্তু ভীষণ হতাশ হবেন।”
আদ্রিত শক্ত চোয়ালে চায়,
“ কে কি ভাবলো করলো সেটা আমার দেখার বিষয় নয় ভাই। আমার কথা কেউ ভাবেনি। আমি কেন নিজের স্বার্থ দেখবো না তবে বলতে পারো? আর রইলল মারু? ওকে রাজি আমি করিয়ে নেব।”
জাওয়াদ হাসে।এই না হলে পুরুষ মানুষ।
জাওয়াদ দুষ্টু হেসে ফিসফিস করে বলে,
“ সবই বুঝলাম আদু বাট বাসরটা করবি কোথায়? গাড়িতে?”
আদ্রিত বাঁকা হাসে।ফিসফিস করে জাওয়াদের কানে কানে সুধায়,
“ দরকার পরলে তো তাই করতে হবে ভাই।সেটআপ দিও কিন্তু। যাস্ট…প্রাইভেসি প্রবলেম বুঝলে।”
জাওয়াদ শব্দ করে হাসে।
হাসতে হাসতে বলে,
“ মাহরিসার আদু ভাই যে এত দুষ্টু সে কি জানে?”
আদ্রিত মাথা নাড়ায়।
“ জানবে কেমন করে। জানাই নি তো।জানালেই জানবে।”
জাওয়াদ আদ্রিতের পিট চাপড়ায়।
“ বেস্ট অফ লাক আদু। দুঃখিত মারুর মতো ভাইয়া বলতে পারছিনা।”
জাওয়াদ আবারো হাসে।
মাহরিসা ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে জাওয়াদে হাসির পানে।
কিসে এত হাসি আসছে তাদের কই তার তো আসছে না।
তার তো কান্না পাচ্ছে। ভীষণ কান্না।
নিস্তব্ধতা জাওয়াদের হাসির পানে অবাক হয়ে চেয়ে প্রফেসর এভাবেও হাসতে পারে নাকি কই ভার্সিটিতে তো মুখটা বাংলার পাঁচ করে রাখে।
মাহরিসা পুনরায় ঢেকছি তুলে কান্না জুড়ে।
নিস্তব্ধতার মায়া হয় মেয়েটার কান্না দেখে আহারে।
বিদ্যুৎ ফিসফিস করে আদ্রিত কে বলে,
“ দোস্ত তোর বউ তো কেঁদে বন্যা বৈয়ে দেওয়ার জোগাড়। যা সামাল দে।”
আদ্রিত এগিয়ে যায় মাহরিসার পানে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ কি সমস্যা? কাঁদছিস কেন? মেরেছি তোকে? কিছু লুট করেছি তোর? “
মাহরিসা নাক টেনে মাথা নাড়ায়।
“ তবে কাঁদছিস কেন লোক হাসানোর পাঁয়তারা তোর? আমার বেজ্জতি করছিস বেয়াদব। “
মাহরিসা’র কান্না থামে না। সে কি করে বোঝাবে পাষান্ড মানব কে। তার কান্না যে থামে না।
নিস্তব্ধতা ভাইয়ের কথার টোনে হতভম্ব। ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে এই রুপ ব্যবহার তার ভাইয়ের?
অবাকের উপর অবাক হচ্ছে সে।
মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দেয় সে মাহরিসাকে।
মেয়েটার বহুত ধৈর্য্য বলতেই হচ্ছে।
এই যে সে যেমন, তার সঙ্গে যদি কেউ এমন করে নির্ঘাত সে তার গালে ঠাসঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিতো ততক্ষণাৎ।
নিস্তব্ধতা মাহরিসার পানে চেয়ে মুচকি হাসে।
সকলে তো এক নয়।কারো মাঝে ধৈর্যের পরিমাণ ওপরওয়ালা একটুখানি বেশিই বারিয়ে দেয়।
তারওপর সে লক্ষ করে মাহরিসার আদ্রিতকে ভয় ও পায়,যাকে বলে প্রচন্ড রকমের ।
এই যে দেখ এতকিছুর পরেও সে চু শব্দটি করছে না।নিস্তব্ধতা সত্যিই মুগ্ধ হয় মাহরিসার ধৈর্যের লেভেল দেখে।
আদ্রিত নিস্তব্ধতাকে বলে।
“ওকে বোঝাও নিরু। বিয়েতে যেন ঝামেলা না করে।”
বিয়ের কথা শুনে মাহরিসা আরো ডুঁকরে কেঁদে উঠে। কি করে সে বাবা-মা বিহীন একা একা নিজে বিয়ে করে ফেলবে।অসম্ভব।
সাইকো লোকটা কেন বুঝতে চাইছেনা মাহরিসার হৃদয়ের ব্যাথা।কেন একটু দয়া করছেনা তার প্রতি।
তারওপর লোকটার নিকট তার হাজরো প্রশ্ন জমা।তার উত্তর কে দেবে।কি গেম খেলছে অভদ্র মানব তার সঙ্গে। কে জানাবে তা তাকে?
নিস্তব্ধতা ফিসফিস করে মাহরিসা কে বলে,
“ ঝামেলা করিস না বুনু ভাই রেগে গেলে কিন্তু কেলেংকারী বেঁধে যাবে।সাবধান।”
মাহরিসার সে কথা বোধগম্য হয় না। তার পীড়ায় সে জর্জরিত।
অপরের মনের দুঃখ কেই বা অনুভব করতে পারে। যার দুঃখে সে সেই দুঃখের কাঙ্গাল।
অপরে বুঝে কতখানি।
কাজী এসে উপস্থিত হয়।
নিস্তব্ধতা জোড় করে মাহরিসাকে কোনো রকমে ভেতরে নেয়।
মাহরিসা মূর্তি বনে।সেই সঙ্গে তার কান্নার বেগ বাড়ে।
আদ্রিত নিজের আর মাহরিসার আইডি কার্ড আর ছবি কাজীর হাতে ধরিয়ে দেয়।
আশ্চর্য লোকটা তার সব জোগাড় করে নিয়ে এসেছে। খচ্চর লোক একটা।অভদ্র,পাজি।
দোয়া দরুদ শেষে বিয়ে পড়ানোর শেষ পর্যায়ে এসে বাঁধে বিপত্তি।
মাহরিসাকে দিয়ে এবারে কবুল বলানো দুষ্কর।
তার মুখ হতে শব্দ বেরোনোর নাম গন্ধ নেই।
স্মৃতি দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রয়। আদ্রিতকে প্রচন্ড রকমের পছন্দ করা সত্ত্বেও টু শব্দটি করতে পারে না সে।
ইচ্ছে করছে কাবিনের খাতাটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলুক সে।
রাগে হাতের মুঠি শক্ত করে আদ্রিত- মাহরিসা দুজনের নাটক দেখতে দেখতে সাক্ষী’র স্থানে সাইন করে দেয়।
হায়।পছন্দের মানুষটাকে নিজের করার যে স্বপ্ন নিয়ে সে বাংলাদেশে পা রেখেছিলো
তা আজ টুকরো টুকরো করে ভাঙতে বসেছে।
ইশশ এই মুহুর্তে যদি একটা মিরাক্কেল ঘটতো আর ডাঃ আদ্রিত শেখ তার হতো।
কিন্তু হায় আফসোস তা যে অসম্ভব।
নিজের রাগটুকু আর কন্ট্রোল করতে না পেরে এবারে দাঁতে দাঁত চেপে বলেই বসে সে,
“ তোমার এত ভান ধরে ন্যাকা কান্না করার কারণ তো আমি দেখছিনা মাহরিসা।চুপচাপ কবুল টা বলে দিলেই তো পারো।
ওয়েট এত ঢং না হজম হচ্ছে না ঠিক।
আদ্রিত তো তোমাদের পাড়ার মোড়ের বখাটে কিংবা বেকার ছেলে ও নয় যে তোমার আপত্তি থাকবে।এবং এস্টাবলিশ একজন সম্মানীয় ডাক্তার সে।”
“ তোর হজম না হলে হজমের ওষুধ খা।নিষেধ করেছে তোকে কেউ?”
“ হজমের ঔষুধ খেতে হবে না আদ্রিত
তুমি তোমার হবু বউকে আগে হজম করে দেখাও।”
স্মৃতি হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে যায়।
এসব নাটক দেখে তার মেজাজ টা যাস্ট গরম হচ্ছে।
আদ্রিত এবারে আটষাট হয়ে বসে।
“কবুল বল।”
মাহরিসা মাথা নাড়ায় সমান তালে।
চোখের জলে তার কাজল লেপ্টে।
নাক টানে, হাতের কব্জিতে ভেজা নাক মোছার বৃথা চেষ্টা চালায়।
আদ্রিত দাঁতে দাঁত চেপে পুনরায় সুধায়,
“ কবুল বল।”
মাহরিসা ঠোঁট উল্টে প্রত্যুত্তর করে,
“ পারিনা, আদু ভাইয়া।”
ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ২০
“ কবুল বলতে পারিস না ফাজলামো করিস তুই আমার সঙ্গে? থাপড়ে গাল ফাটিয়ে দেব বেয়াদব। “
“ কবুল বলতে পারিনা আদু ভাইয়া।”
“ তোর কবুল বলতে হবে না।কথাটা আবার রিপিট কর।”
মাহরিসা থতমত ভঙ্গিতে আদ্রিতের বাড়িয়ে রাখা হাতে নাক মুছে।
“ বল..”
