Home নক্ষত্রের যাত্রাপথে নক্ষত্রের যাত্রাপথে পর্ব ২০

নক্ষত্রের যাত্রাপথে পর্ব ২০

নক্ষত্রের যাত্রাপথে পর্ব ২০
ঝিলিক মল্লিক

ভোরের আলো ফুটেছে সবে। তাজরীন সারারাত ঘুমায়নি। ছোট দিদার বিছানায় বসে গল্প করছিল। আজ রাতটা তারা এখানেই কাটিয়েছে। যেহেতু অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল, তারওপর জীমের শরীর ভালো নয়; তাই ছোট দিদা একপ্রকার জোরপূর্বক ওদেরকে এবাড়িতে রেখে দিয়েছেন। বড়ঘরের দরজা খুলে পুরুষদের ঘুমানোর ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন সেই মাঝরাতে। আর মেয়েদেরকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের ঘরে। শুধুমাত্র শাহবীর আর জীম রিমিলির ঘরে ছিল। তবে রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হলেও সারারাত-ই কেউ সেভাবে ঘুমায়নি।

ছোট দিদার সাথে গল্প করেই রাত পার করেছে। ভোরের দিকে তাজরীনের একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। ঘুম ভাঙতেই উঠে দেখে, ছোট দিদা আর রিমিলি তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আর কেউ নেই ঘরে। তাজরীন একটা শাল চাদর মাথা থেকে কোমর অবধি পেঁচিয়ে ঘরের ভিটা পেরিয়ে নেমে আসতেই দেখে বাড়ির কংক্রিটের দুই পাশ ঘেঁষা সিঁড়ির ওপর বসে মুখ চেপে কাঁদছে রিক্তি। তারপাশে বসে কাঁধে হাত রেখে স্বান্তনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে জেসি। তহুরা বিরস মুখে বসে বসে দেখছে রিক্তিকে। তাজরীন এগিয়ে গিয়ে সামনের সিঁড়িতে বসে কৌতূহলী হয়ে রিক্তিকে প্রশ্ন করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“কী হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন?”
রিক্তি তাজরীনের প্রশ্ন শুনে তৎক্ষণাৎ মুখ উঠালো না। আরো কিছুক্ষণ মুখ চেপে কাঁদতে লাগলো। তারপর একবার মুখ থেকে হাত সরিয়ে তাজরীনকে দেখে নিয়ে আবারও কান্নাকাটি শুরু করলো। তহুরার দিকে তাকাতেই তহুরা তাজরীনকে বললো,
“একটা বদমায়েশ আছে। বদমায়েশটার জন্য নিব্বিটা কাঁদছে!”
“কার জন্য?”
ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো তাজরীন। তহুরা জবাব দিলো,

“ওর এক্স বয়ফ্রেন্ড। হারামজাদাটার গতকাল বিয়ে ছিল। আকদ হয়েছে। রিক্তি জানতো না। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, একটা স্প্যাম নাম্বার থেকে ওকে হোয়াটসঅ্যাপে ওই হারামজাদাটা তার আর তার বউয়ের কিছু পিক পাঠিয়ে মেসেজে লিখেছে, “তুমি তো আমাকে বিয়ে করতে রাজি হইলা না, তাই আমি সেকেন্ড অপশন খুঁজে বিয়েটা করে নিলাম। আমার মতো সুদর্শন ছেলের আবার অপশনের অভাব হয় না।” টেক্সটের শেষে আবার কতগুলো গাঁজাখুরে হাহা ইমোজি। ওই মেসেজগুলো দেখার পর থেকেই নিব্বিটার কান্নাকাটি শুরু। কোথাকার কোন অসভ্য, অভদ্র তার জন্য আবার হুদাই কান্নাকাটি করে মরছে। ঢঙ দেখলে বাঁচি না!”
তহুরা কপট রাগ দেখালো। বোঝা গেল, ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। অকারণে শুধুশুধু চোখের পানি ঝরানোর কোনো মানে হয় না। এই চোখের পানির বহুত দাম। কেউ এসে শোধ করে দিয়ে যাবে না। তাজরীন এবার উঠে এগিয়ে আসলো রিক্তির সামনে। তারপর ওর কাঁধে হাত রাখতেই রিক্তি এবার মুখ উঠিয়ে তাকালো তাজরীনের দিকে। তাজরীন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সহজভাবে রিক্তিকে জিজ্ঞাসা করলো,
“ছেলেটা তোমাকে এখনো সিডিউস করছে কেন?”
রিক্তি ভাঙা গলায় জবাব দিলো,

“ওর সাথে আমার রিলেশন ছিল বছর দুয়েকের মতো। আমি ক্যাম্পে থাকার কারণে আমাদের লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ ছিল। বাট একই এলাকার। ছুটিতে বাসায় ফিরলেও তেমন দেখাসাক্ষাৎ হতো না। তবে ও অনেকবার রিকোয়েস্ট করতো, এখানে-সেখানে দেখা করতে। আমি মানা করে দিতাম। তারপর একদিন ও আমার কাছে ধরা পরলো। অন্য মেয়েদের নিয়ে রুম ডেটে যেতো। এটা নিয়ে ঝামেলা হয় আমাদের মধ্যে। ও আমাকে অপমান করে অনেক কথা বলে। তারপর ব্রেকআপ। ব্রেকআপের মাসখানেক পরে ও আমাকে নক দিয়ে স্যরি বলে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। তখন আমি মুখের ওপর রিজেক্ট করে দিতেই বলে উঠলো, “তোর মতো মেয়ে আমি হাজারটা পাবো। হাজারও অপশন আছে আমার কাছে। অনেক মেয়েদের সাথে ডেট করলেও তোকেই বিয়ে করতাম। কারণ ভাবতাম, তুই হাবলা ছিলি। হাবলা মেয়েদের নিয়ে সংসার করা যায়। কিন্তু না। তুই তো বোকাচো*দা না। তুই হচ্ছিস বহুত শেয়ানা। তুই বিয়ে না করতে চাইলে আমার বালডাও ছেঁড়া যাবে না। আগামী দুই মাসের মধ্যে আমি বিয়ে করবো একটা সুন্দরী মেয়েকে। দেখে নিস। ” এই মেসেজের পর গতকাল মাঝরাতের দিকে আবার ওর মেসেজ এসেছে। এই-যে এটা।”

রিক্তি এবার ফোনের লক খুলে একে একে তাজরীনকে সব মেসেজ দেখাতে লাগলো। তাজরীন তখন শক্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
“তুমি কি ওকে ব্লক করেছো?”
“হ্যাঁ।”
রিক্তির জবাব পেয়ে তাজরীন আবারও বললো,
“ব্লক খোলো।”
“কিন্তু..”
“তুমি কী বুঝতে পারছো? ওই হাড়ে হারামজাদা তোমাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে চাইছে! তুমি একজন স্ট্রং গার্ল, যতদূর আমি জানি। তাহলে একটা বেয়াদব, অসভ্য ছেলের জন্য কেন দুঃখী হয়ে থাকবে? বলো? পারবে তো ওকে দু’টো কড়া কথা শুনিয়ে দিতে?”
তাজরীন জবাবের আশায় প্রশ্নটা করে আকাঙ্খা নিয়ে তাকিয়ে থাকলো রিক্তির দিকে। রিক্তি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর জোরে শ্বাস টেনে আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো,
“হ্যাঁ, আমি পারবো।”
রিক্তি ব্লক খুললো তার প্রাক্তনের কন্ট্যাক্ট নাম্বারের। এরপর তাজরীনের ইশারা অনুযায়ী সরাসরি কল দিয়ে বসলো সেই ভোরবেলা-ই। কল রিসিভ হলো দু’বার রিং বাজার পরে। ওপাশের ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে বেশ ঠাট্টার সুরে বলে উঠলো,
“কি রেহ? আমাকে বিয়ে না করতে পারার আফসোসে রাতে ঘুমাতে পারোনি নাকি? সাতসকালবেলা কল দিয়ে বসেছো যে!”

রিক্তি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থ মে’রে রইলো। তাজরীন দূরে গিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলে বোঝালো ওকে। তৎক্ষনাৎ ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটির উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো সুরে রিক্তি বললো,
“হারামির বাচ্চা! নিজেকে কী মনে করিস তুই? লুচ্চা, লাফাঙ্গা কোথাকার! তোকে বিয়ে না করার জন্য আফসোস করবো আমি? আরেহ, তোকে আমি কেন, আমার জুতাও বিয়ে করবে না। সামনে পেলে জুতা পেটা করতাম তোকে। তা-ও নতুন জুতা না। ওটা তুই ডিজার্ভ করিস না। তোর জন্য পুরোনো জুতা-ই ঠিকঠাক৷”
একটানা কথাগুলো বলে ফোনটা একটু দূরে সরিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে রিক্তি। ফোন লাউড স্পিকারে ছিল। ওপাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠে “মাতারি” শব্দটা শোনামাত্র-ই দ্রুত এগিয়ে এসে রিক্তির হাত থেকে ফোনটা কেঁড়ে নিলো তাজরীন। তারপর চেঁচামেচি করে বলে উঠলো,

“কু’ত্তার তিন নাম্বার ছাউ, হারামির বাচ্চা! এই ছাগলের বাচ্চা, নিজেকে আয়নায় দেখছোস তুই? লম্পটের বাচ্চা! তোরে যে কেউ বিয়ে করসে, এ-ই তো তোর সাত জনমের কপাল। তোর মতো লম্পটকে তো কুত্তায়ও বিয়ে করতো না। ফোনকলে নাটক-ফাটক আর ফাঁপরবাজি না মারিয়ে সামনে আয় সাহস থাকলে। মেয়েমানুষকে সম্মান করতে জানিস না। কুত্তার পেট থেকে জন্ম নিছোস তুই? তোরে সামনে পেলে কেটে পিস পিস করে কুত্তা দিয়ে খাওয়াইতাম। হাত-পা ভেঙে দিতাম। তারপর পঙ্গু হয়ে গুলিস্তানের মোড়ে রাস্তার ওপরে গড়িয়ে গড়িয়ে দুই হাত পেতে ‘আম্মারা দুইডা ভিক্ষা দ্যান” গান গেয়ে ভিক্ষা করে খাইতিস!”

তাজরীন কথাগুলো একটানা বলে ক্ষ্যান্ত হয়। মাথা গরম থাকার কারণে এতোক্ষণ আশেপাশে খেয়াল ছিল না ওর। এবার ফোন কেটে নাম্বারটা ব্লকলিস্টে ফেলে সামনে তাকাতেই দেখলো রিক্তি, তহুরা আর জেসি আড়ষ্ট চোখে ইশারা-ইঙ্গিতে তাজরীনের পেছনে উঠোনের দিকে দেখাচ্ছে। তাজরীন প্রথমে বুঝলো না। তহুরার বারবার পেছনের দিকে তাকানো দেখে এবার পিছু ঘুরে তাকালো ও। দেখলো, গোলপাতার গেইটের সামনেই উঠোনের মাঝখানে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে আফিস, হাসান, রায়ান শোয়েব আর..আর সবশেষে রুবায়েতকে দেখা গেল। রুবায়েত বাদে বাকিরা বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাজরীনের দিকেই তাকিয়ে আছে। তারমানে সবাই এতোক্ষণ যাবত তাজরীনের সব কথা শুনেছে। রুবায়েতকে স্বাভাবিক দেখা গেল। তেমন হেলদোল নেই, কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। সবাইকে ফেলে রেখে লোকটা সিঁড়ি বেয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল। সবার পোশাক-আশাক দেখে বোঝা গেল, তারা জগিং করতে গিয়েছিল। তাজরীনের হঠাৎ গতকাল রাতের কথা মনে পরলো। গতরাতে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। যা সে জীবনেও ভুলবে না।

ঘর থেকে বেরিয়ে তাজরীন যখন রুবায়েতের হাত ধরে টানতে টানতে উঠোনের বাইরে পুকুরঘাটের সামনে এনে দাঁড় করালো, তখন ওর মাথা ঠিক নেই। মেজাজ খারাপ। এতোকিছু ঘটার পরে নিশ্চয়ই মেজাজ ঠিক থাকার কথা নয়। তবে রুবায়েতকেই কেন এখানে টেনে এনেছে কৈফিয়ত চাওয়ার জন্য, তা জানা নেই তাজরীনের। এই মুহূর্তে ভাবতেও চাইছে না সে। বরং রুবায়েতের শান্ত দৃষ্টি ওর শরীরে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিলো আরো বেশি। তোয়াক্কা করছে না এরা! কারো দুশ্চিন্তার কোনো পরোয়া নেই এদের কাছে! এরা কী মানুষ? তাজরীন এবার ক্ষ্যাপা স্বরে রুবায়েতকে জিজ্ঞাসা করে বসলো,

“এই, কোথায় গিয়েছিলেন আপনারা? বলে যাননি কেন আমাদের? আমাদেরকে কি মানুষ মনে হয় না? নাকি আপনারা অমানুষ হ্যাঁ? তখন আপনার ওপর হামলা হলো। কেন হলো, কি কারণে হলো, কে বা কারা করলো; সব আপনি জানতেন, আমাকে বলেননি। ওকে ফাইন! আমি আপনার কাছের কেউ নই; সুতরাং আমাকে বলা না-ই যেতে পারে। আমি এতে মাইন্ড করিনি। একটা বিষয়ে ভাবলাম। আপনার হাতে আঘাত লেগেছিল সামান্য। রক্ত বোধহয় মাত্র কয়েক ফোঁটা গড়িয়েছে। এই সামান্য আঘাতে আপনি সেন্সলেস হলেন কীভাবে? আর অস্বাভাবিকভাবে মিনিট দুয়েকের মধ্যে হামলাকারী উধাও হতেই আবারও আপনার সেন্স ফিরে আসলো!

ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে না? যাক সেসব বাদ দিলাম৷ একটা কথা বলুন, ওই ঘটনার পরেও আপনি এতোটা স্বাভাবিক থাকলেন কীভাবে? তারওপর এখানে ফিরে আসা মাত্রই ভাইয়াকে নিয়ে আবার বেরিয়েও পরলেন! তারপর আফিম ভাইয়া আর হাসান ভাইয়া গেল। এরপরের কাহিনী আর না বলি! ও আল্লাহ! আপনাদের মতো ব্যাটামানুষ কারো কপালে না জুটুক! সারাটা রাত আমরা টেনশনে ঘুমাতে পারিনি। বৌমণি তো অসুস্থ হয়ে পরলো। আমরা পাশে বসে ছিলাম সারারাত। এবার বলুন, আপনারা আমাদের আরামের ঘুম হারাম করে কোথায় গিয়েছিলেন?”

তাজরীন শেষোক্ত প্রশ্নটা অত্যাধিক কঠোরতার সহিত করলো। যেন, এই প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে। না দিয়ে কোনো উপায় নেই। তাজরীন দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। আঁধারে ওর ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম রেখায় হাসি ফুটে উঠলো। এবার মনে হচ্ছে, উত্তরটা ও পেয়ে যাবে। কিন্তু ওকে চমকে দিয়ে রুবায়েত ওর হাত টেনে ধরলো। উঠোন হতে হালকা হলুদ আলো ঠিকরে আসছে এদিকে। সেই মিয়মান আলোতে তাজরীন দেখলো, রুবায়েত ওর কাছে নমনীয় হচ্ছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার! লোকটা নত স্বীকার করে কোমল কন্ঠে তাজরীনের হাত চেপে ধরে বললো,
“স্যরি। ভেরি স্যরি।”

তাজরীন সেই কথার পরে আর কোনো কথা বলতে পারিনি। পুরো থ মে’রে গিয়েছিল। যতোটা তেজ নিয়ে এসেছিল, তা ভেতরেই দমন করে রাখতে হলো। প্রকাশ করার উপায়ন্তর নেই। রুবায়েত ভেতর বাড়িতে যাওয়ার আগে কি মনে করে যেন আবার তাজরীনের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। কড়া পারফিউমের মিষ্টি স্মেল নাকে আসতেই তাজরীনের নিঃশ্বাস আঁটকে আসার উপক্রম। রুবায়েত নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে তাজরীনকে বললো,
“একটা অ্যাডভাইস দিই, কখনো অপরিচিত মানুষের জন্য কান্নাকাটি করবেন না। ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে এটা দুর্বলতার কারণ হতে পারে। আর দুর্বলতা মানে বোঝেন তো? ডুবে যাওয়া। সর্বনাশ যাকে বলে। আমি একদিক থেকে আপনার ভাইয়ের বন্ধু। চাইনা, আপনার সর্বনাশ হোক। অন্য মেয়ের ক্ষেত্রে হলে এতোটা ভাবতাম না। অ্যাডভাইসও দিতাম না। বরং, লাই দিতাম।”
রাতের সেই ঘটনার পর থেকে তাজরীনের বিস্ময় এখনো কাটেনি। সেই ঘোর নিয়েই উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলো ও।

হাসান আর জেসির কি একটা বিষয় নিয়ে তর্ক বেঁধেছে। দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। তাজরীন এখন খুবই ব্যস্ত। এখনো বেলা হয়নি। তারা সকালের নাস্তা করে তবেই ওই বাড়িতে যাবে। ছোট দিদা উঠেছেন সেই কখন। উঠেই উঠান ঝাঁট দিয়ে রান্নাঘরে গিয়েছেন। ভাই আর বৌমণির এখনো দেখা নেই। তাদের ঘুম ভাঙেনি এখনো অব্ধি। তাতে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। নিরিবিলিতে তাদেরকে ঘুমাতে দিয়ে সবাই উঠোনে শতরঞ্জির ওপরে বিছানো তোশকের ওপর এসে বসেছে আরামসে। তাজরীন রিমিলিকে নিয়ে পরিকল্পনা করছে। পুকুরের পাড় ঘেঁষে একটা মাঝারি আকারের বরই গাছ আছে। সেই গাছে টক বরই ধরে। মিষ্টি বরই হলে তাজরীনের এতোটা আগ্রহ জন্মাতো না। কিন্তু টক জিনিসের প্রতি ওর আবার ঝোঁক বেশি। এজন্যই বরই গাছে উঠবে বলে ঠিক করেছে। তবে সেটা সকালের নাস্তা করার পর।

রিমিলিকে নিয়ে গেইট থেকে বের হয়ে তাজরীন দাঁড়িয়েছিল ধানক্ষেতের আইলের সামনাসামনি সরু রাস্তায়। তখনই দেখা গেল দূর থেকে একটা বাচ্চা নাচতে নাচতে দৌড়ে এদিকে আসছে। তাজরীনের দৃষ্টি কিছু মুহূর্তের জন্য সেদিকে আঁটকে রইলো। হা করে তাকিয়ে থাকলো ও। ছোট বাচ্চাটা বেশ গুলুমুলু দেখতে। একটা ব্লু কালার ব্লেজার পরা। চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস। হাতে হাতঘড়ি। আর ডেনিম প্যান্ট পরা। পায়ে আবার ব্ল্যাক সু। বাচ্চাটার বয়স কত হবে? বছর তিন-চার? হ্যাঁ, এমন-ই হবে বোধহয়। বাবুটা তাক লাগানো সুন্দর। গায়ের রঙ দুধের মতো ফরসা। চুলগুলো সোনালি রঙের। দেখতে কিছুটা বিদেশিদের মতো। রিমিলিকে দেখে বুবু বলে দৌড়ে আসতে লাগলো। তার পেছনে দৌড়াচ্ছে মাহমুদ ভাই। ছেলেটা কাছাকাছি আসতেই রিমিলি উচ্ছ্বসিত হয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো। পরপর কতগুলো চুমু খেল। বাবুটাও পাল্টা কতগুলো চুমু বসালো রিমিলির গালে। তাজরীন শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো ওকে। রিমিলিকে জিজ্ঞাসা করলো,

“ও কে?”
রিমিলি জবাব দিলো,
“আমার এক ভাগ্নীর মেয়ে। বড় মা আছে না? তার সেজো মেয়ের একমাত্র ছেলে। কাল রাতেই দাদাবাড়ি থেকে এখানে এসে পৌঁছেছে ওরা। ওর নাম ইশান মির্জা। সবাই আদর করে ডাকে কুট্টুস বলে। কুট্টুস বাবুসোনা, এই হচ্ছে তাজরীন আন্টি। যাও, আন্টির কোলে যাও।”
তাজরীন হাসিমুখে হাত বাড়াতেই রিমিলি কথাটা বললো। পাল্টা জবাবে কুট্টুস মুখ গোমড়া করে ঠোঁট উল্টে বললো,
“নো রিমিলি বাবু। কুট্টুস ছুন্দর মেয়েমানুষের কুলে যায় না। আমি তুমাল কুলেই থাকবো।”
তাজরীন মিষ্টি হাসলো কুট্টুসের কথা শুনে। ওর মনে পরলো, ওর পার্স ব্যাগে দুটো চকলেট আছে সম্ভবত। ওদেরকে ওখানে দাঁড় করিয়ে রেখেই৷ দ্রুত ভেতরে দৌড়ালো তাজরীন। উঠোন পেরিয়ে ভেতরে যেতেই ওর কান্ডকারখানা দেখলো উঠোনের সবাই। এই মেয়েটা ভারী অদ্ভুত। চলন-বলন কথাবার্তা সবদিক থেকে অদ্ভুত ছটফটে।। সবাইকে মাতিয়ে রাখতে এটুকুই যথেষ্ট।
.
.
জীম বালিশে হেলান দিয়ে বসে ফোন টিপছে। ওর সামনে বসে একদৃষ্টিতে ওকে দেখছে শাহবীর। জীমের তাতে কোনো হেলদোল নেই। দেখেওনি যেন লোকটাকে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই কথাবার্তা সম্পূর্ণ বন্ধ। একটা কথাও বলছে না শাহবীরের সাথে। এদিকে শাহবীর আবার অত্যাধিক আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে আছে। তার অনেক ধৈর্য। সিলভি তা কোনোভাবেই ভাঙতে পারবে না। কথা বন্ধ রেখেও নয়। কিন্তু শেষমেশ শাহবীরের আত্মবিশ্বাস ভাঙলো। ওই মলিন মুখ, ছটফটে ভাবের অভাব— সবকিছু ভেতরে ভেতরে দংশনের সৃষ্টি করছে। শাহবীর এবার অধৈর্য হয়ে জীমের পায়ে আলতোভাবে হাত রেখে বললো,
”পায়ে ব্যাথা করছে তোমার? কোথায় ব্যাথা করছে? বলো আমাকে। ম্যাসাজ করে দিচ্ছি।”
জীম ছিটকে দূরে সরে গিয়ে বিস্ফোরিত কন্ঠে বললো,
“একি করছেন আপনি! পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?”
শাহবীর তবু ক্ষ্যান্ত হলো না। জীমের কাছে এগিয়ে যেতেই জীম এবার বাঁধা দিয়ে বললো,

“কাছে আসারও কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই, আর না তো কোনোরকম এক্সপ্লেশন দেওয়ার। আজ রুবায়েত ভাইয়ার ওপর হামলা হয়েছে। কাল শাশুড়ি আম্মার ওপর হবে। পরশু তাজরীনের ওপরও। আমার ওপর হওয়া নিয়ে অবশ্য আমার কোনো চিন্তা নেই। মাঝেও একটা হামলার শিকার হয়েছি। এজন্য এসব নিতান্ত ছেলেখেলা লাগে। কিন্তু আমার পরিবারের ওপর কোনোপ্রকার হামলা হলে তখনও কিন্তু আপনারা এক্সপ্লেশন কোনো কাজে লাগবে না মেজর শাহবীর রুস্তম। ওরা আমারও পরিবার হ্যাঁ? আপনার মনে না হলেও, আমি জানি নিজের মনের কথা। ওদের কিছু হলে আমি নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারবো না।

এতোদিন যাবত আমি এই সহজ কথাটা-ই আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। এখন সিচুয়েশন হয়েছে এমন, আমি বিষ খেয়েছি বললেও আপনার কাছে আমার কথার কোনো গুরুত্ব নেই। আপনি মনে করেন, আমি এমনিই চেঁচামেচি করি। চেঁচামেচিটা যে এমনি এমনি করি না, তা কাল রুবায়েত ভাইয়ের ওপর হওয়া হামলার পরে বুঝলেন তো? আজ তার ওপর হামলা হয়েছে, যারা টার্গেট করেছে; তারা কিন্তু আপনাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য, লোকেশন সবকিছু জেনে গেছে। এখন এই বিয়েবাড়িতে একটা হামলা-হাঙ্গামা হলে তার দায়িত্ব কে নেবে মেজর? আপনি নেবেন? নাকি তখনও এক্সপ্লেশন করবেন? বলুন না। আমিও একটু শুনি।”
জীম ঠাট্টার সুরে কথাগুলো বললো। শাহবীর প্রথমে আশ্চর্য হলো! জীম কিভাবে জানলো! ওর তো জানার কথা নয়! তারপর আপাতত ব্যাপারটাকে পাষ কাটিয়ে শাহবীর ওর হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
“এসব ছেলেখেলা নয়, বিলিভ মি সিলভি…”

“আচ্ছা, মানলাম এসব ছেলেখেলা নয়। সবকিছু আপনার প্ল্যানের অংশ। আমি তো আপনার কোনো প্ল্যান জানতে চাইছি না। ওটা আপনার প্রফেশনাল ম্যাটার। ওসব ব্যাপার জানার আমার কোনো ইচ্ছা-ও নেই। কিন্তু আপনি তো সবার নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারছেন না এসবের মধ্যে। আপনাদের এসব চোর-পুলিশের খেলাখেলির মধ্যে সিভিলের মানুষেরা কেন জড়িয়ে যাচ্ছে? কেন? আপনি না বললেও সবকিছু আপনার কাছে ছেলেখেলা-ই হয়ে যায়। আপনার প্রফেশনাল সাইড তো আপনার ক্যাপ্টেন্সিতে অলওয়েজ ঠিকঠাক-ই থাকে। মাঝখান থেকে বাকি সবকিছু ছেলেখেলা হয়ে যায়। এখন আমি এটাও বিশ্বাস করি, আপনার কাছে আমাদের বিয়েটাও ছেলেখেলা। নয়তো আপনার মতো মানুষ এমনি এমনি বিনা কারণে তো আর অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের জন্য ফ্যামিলির কথা মাত্র রাজি হয়ে যাবে না! বলুন না, একবার বলুন প্লিজ, ঠিক কোন ছেলেখেলার জন্য আমাকে বিয়ে করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে আমি আর যতোদিন আছি, একটা প্রশ্নও করবো না আপনাকে। আপোষহীনভাবে ছেড়ে দেবো।”
“যতোদিন আছি মানে? আর ছেড়ে দেওয়ার কথা উঠছে কেন সিলভি? মাথা গেছে তোমার?”
শাহবীর এবার কিছুটা চড়াও গলায় দাঁতে দাঁত পিষে প্রশ্ন করলে জীমকে। জীম কোনো জবাব না দিয়ে সরু চোখে তাকিয়ে রইলো শাহবীরের দিকে।

তাজরীন ছোটাছুটি করে সবাইকে চা দিচ্ছে। এতোক্ষণ কুট্টুস ওর কোলে ছিল। কুট্টুসের সাথে তাজরীনের কিছু সময়ের মধ্যে চকলেটের বিনিময়ে বেশ ভাব হয়েছে। এমন ভাব হয়েছে যে, এখন তাজরীনের কোলে ছাড়া আর কারো কোলে যেতেই চাইছে না কুট্টুস। তবে ছোট দিদাকে কাজে সাহায্য করার জন্য কুট্টুসকে মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে রুবায়েতের কোলের ওপর বসিয়ে দিয়ে চা-নাস্তা আনতে ছুটেছিল তাজরীন। এখন একে একে সবাইকে চা দিচ্ছে ও। জেসিদের দিয়ে ছেলেদের এপাশে এসে ট্রে থেকে একে একে চায়ের কাপ নামিয়ে দিতে দিতে বললো,
“আফিম ভাইয়া, আপনার চা। এই-যে হাসান ভাইয়া, আপনার কাপ। রুবায়েত, এই নিন আপনার চা..”
তাজরীন কথা শেষ করতে পারেনি তারমধ্যে রুবায়েতের কোলের মধ্যে গোলগাল কুট্টুস নড়েচড়ে বসে গুলুমুলু হাতদু’টো নাড়িয়ে বললো,

নক্ষত্রের যাত্রাপথে পর্ব ১৯

“তাজ বাবু, তুমি রুবাই আঙ্কেলকে ভাইয়া বলচো না কিনু? তবাইকে তো ভাইয়া বুলে ডাকচো। তাহলে রুবাই আঙ্কেলকে কিনু নাম ধলে ডাকচো?”
তাজরীন থমকালো। লজ্জায় আশেপাশে তাকাতেও পারছে না। রুবায়েত একদৃষ্টিতে ঠোঁট চেপে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে অদ্ভুতভাবে। এজন্য কুট্টুসকে চোখ রাঙানি দিয়ে চুপ করাতেও পারছে না। পরেছে মহা জ্বালায়। কুট্টুস বাবুসোনা কখন না জানি হাঁটে হাড়ি ভেঙে দেয়!

নক্ষত্রের যাত্রাপথে পর্ব ২১