না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৩)
মাইশা জান্নাত নূরা
সম্পূর্ণ ঘরজুড়ে অদ্ভুত রকমের নীরবতা বিরাজ করছে। সারফারাজ, তেজ ও নির্ঝর তিন ভাইয়েরই দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নীরার দিকে। ওদের তিন জনেরই মনে নীরব ভাবে চাপা প্রশ্নরা ঝড় তুলেছে।
‘কোন সত্য তাঁদের তিনজনেরই অজানায় রয়ে গিয়েছে? এই সত্য জানার পর তারা কোন মোড়ে গিয়ে দাঁড়াবে?’
পিহুও নীরার কাঁধে হাত রেখে ওকে ভরসা দিচ্ছে। সত্য বলার জন্য পূর্ণ সাহস জুগাচ্ছে। নীরা ওর দাঁত দ্বারা নিচের ঠোঁট আলতো ভাবে চেপে ধরলো। চোখ দুটো বুঁজে রাখা অবস্থাতেই মৃদুভাবে কাঁপছে। নীরা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো…..
—“দুই বছর আগে আমার হুট করে দেশ ছাড়ার পেছনে আর তোমাদের সবার থেকে নিজেকে দূরে রাখার পেছনে একটা খুব বড় কারণ ছিলো ভাইয়া। এই কারণটা সেইসময় ল*জ্জা, ভ*য় ও অপ*মানের ভারে আমি কাউকেই বলতে পারি নি। কিন্তু আমি এই ২বছরে একটা বিষয় খুব ভালো ভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে, আমার সত্যের থেকে নিজেকে যতো আড়াল করে রাখার চেষ্টা করছিলাম বাস্তবতা ততো আমাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিচ্ছিলো। তাই পালাতে পালাতে এখন আমি বড্ড ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। আর পারছি না। আজ আর কিছুই লুকোতে চাই না তোমাদের থেকে। সবটা জানার পর তোমরা আমায় গ্রহন করবে নাকি এখনের থেকেও আরো দূরে, বহু দূরে চিরতরের জন্য সরিয়ে দিবে তোমরাই ঠিক করো।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
পুরো ঘরে এখন নীরার কথাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে বাকি ৪ জনের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সারফারাজ গলা খাঁ*কারি দিলো। নিজের শীতল ও ধাঁ*রালো কন্ঠস্বরে বললো….
—“সবটা বল তুই নীরা। আমরা শুনছি।”
নীরা চোখ মেলে ওদের ৪জনকেই একবার দেখে নিলো। পরক্ষণেই গভীর শ্বাস নিয়ে বললো…..
—“আমার একটা ছেলে আছে ভাইয়া। দেড় বছর বয়স ওর। নাম রেখেছি নির্বাণ। কিন্তু নির্বাণের বাবা কে তা আমি জানি না।”
নীরার এরূপ কথা শুনে সারফারাজ, তেজ ও নির্ঝর ৩ জনের মাঝেই অবাক ভাব ও স্তব্ধতার মাত্রা পাল্লা দিয়ে বাড়লো। নির্ঝর ঠোঁটজোড়া খুলে গেলেও সে কোনো কথা বলতে পারলো না। তেজ স্থির হয়ে চোখের আকৃতি বড় করে তাকিয়ে আছে নীরার দিকে। সারফারাজের ঘাড়ের শিরা টান টান হয়ে উঠলো। সারফারাজ নীরার দিকে দু’কদম এগিয়ে এসে কণ্ঠ ভারী ও রুদ্ধ করে বললো…..
—“মানে? তুই কি বলতে চাইছিস স্পষ্ট করে বল নীরা৷”
নীরা ঢোক গি*লে নিলো একবার। গলা শুকিয়ে আসছে ওর। সেই শুকনো গলাতেই সে বললো…..
—“দুই বছর আগে আমি হঠাৎ জানতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট। কিন্তু আমি জানি না কিভাবে, কখন এসবকিছু ঘটেছে আমার সাথে। আমার আজও এ নিয়ে কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না। ভাইয়া, তোমরা তো জানোই আমি কোনদিন নেশা করি নি। কোনো বা*জে জায়গায় যাই নি, কোনো ছেলে বন্ধুও ছিলো না আমার। আর না গার্ডিয়ান ছাড়া কখনো বাইরে কোথাও রাত কাটিয়েছিলাম আমি। তাই যখন রিপোর্টে এমন কিছু দেখতে পেয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিলো পুরো আকাশটাই আমার মাথার উপর ভে*ঙে পড়েছে।”
তেজ অবাক স্বরে বললো…..
—“তাহলে, তুই বলতে চাইছিস আমাদের বাড়িতেই তোর অবচেতন অবস্থায় কোনো এক সময় কেউ এসব করেছে তোর সাথে?”
নীরা ভাঙা গলায় ‘হ্যাঁ’ জানালো। সারফারাজ চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই চোখ খুলতেই ওর ক্ষু*র-ধার দৃষ্টি স্পষ্ট দেখা গেলো। সারফারাজ ওর দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে বললো…..
—“এ বিষয়ে শেষে কথা হবে। এখন বাকিটা বল তুই নীরা।”
নীরা কাঁপা গলায় বলতে লাগলো…..
—“আমি বুঝতে পারছিলাম না কার কাছে যাবো। তোমরা জানতে পারলে কি ভাববে, বাবা-মা সহ্য করতে পারবে কিনা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি। পরিশেষে আমি তোমাদের সবার থেকে দূরে চলে যাওয়ারই সিদ্ধান্তই নিলাম। তোমরা জানতে আমি কানাডা যাচ্ছি পড়াশোনার জন্য কিন্তু আমার মূল উদ্দেশ্য ছিলো কানাডায় গিয়ে আমার ডেলিভারি প্রসেসটা গোপনে সেরে সেই বাচ্চাকে কোনো উপযুক্ত বাবা-মায়ের কাছে দত্তক দিয়ে আবারও দেশে ফিরে আসার।”
নীরা থামলো। আবারও গিললো শুকনো একটা ঢোক। তারপর বললো…..
—“কিন্তু দীর্ঘ ১২ ঘন্টার প্রসব য*ন্ত্র*ণা সহ্য করার পর নরমালি ভাবে ডেলিভারী শেষে যখন ডাক্তার নবজাতক ঐ শিশুটিকে আমার বুকের উপর রাখলেন বিশ্বাস করো ভাইয়া ওই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিলো আমি পুরো পৃথিবীর সুখ খুঁজে পেয়েছি। নির্বাণের ছোট্ট নরম গাল ওর নিঃশ্বাসের গন্ধ, কুঁকড়ে থাকা আঙুলগুলো যখন স্পর্শ করছিলাম তখন আমি ভুলে গিয়েছিলাম ওর জন্মের পর আমি ওকে অন্য কাউকে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার মতোও পরিকল্পনা করেছিলাম কোনো একসময়।”
নীরার দু’চোখ ভিজে উঠলো। তবুও সে দৃঢ় কন্ঠে বললো….
—“আজ নির্বাণ হাঁটুতে ভর দিয়ে পুরো বাসা ঘুরে বেড়ায়। দুইজন আয়া আছেন সর্বক্ষণ ওর দেখাশোনা করার জন্য। ওরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই দেশে আসার আগে ওদেরই হাতে নির্বাণের পুরো দায়িত্ব দিয়ে এসেছি আমি৷”
নীরা এবার থেমে গেলো। ওর ভিতরে জমে রাখা সব কথা আজ একেবারে নিঙরে বের করতে সক্ষম হয়েছে ও। তাই কিছুটা হলেও রিলিফ ফিল করতে পারছে নীরা।
ইলমার শ্বাস আটকে আসার মতো অনুভূতি কাজ করছে ভিতরে ভিতরে। অনু নিজেকে আবারও কিছুটা সামলে নিয়ে ভা*ঙা কন্ঠে বললো….
—”মায়েরে সেদিন এতো মা*রছিলো বাবা যে মায়ের জ্ঞান ফিরতে অনেক লম্বা সময় লেগে গিয়েছিলো। মায়ের সর্বশরীর বাবার দেওয়া মা*রের আ*ঘা*তে আ*ঘা*তে কা*ল-সিটে দাগ পড়ে গিয়েছিলো। মায়ের জ্ঞান ফিরে আসলে পর আমি মায়েরে জড়ায় ধরে মেলা কাঁদছিলাম। বুকের ভিতরটা পুরো নিঙরে মায়ের সামনে ফেলতে চাইছিলাম যেনো সেদিন। মা আমার ঐ ব্য*থায় জর্জরির হওয়া শরীর নিয়েও নিজেকে সামলে রেখে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমায় শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন।”
অনু থামলো। পরক্ষণেই সে শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে ইলমার দিকে কয়েকটা প্রশ্ন ছুঁ*ড়*লো……
—”মায়েরা এমন হয় কেন আপা? তারা নিজেদের ব্য*থা, য*ন্ত্র*ণা গুলো কেন চোখে দেখে না? নাকি দেখেও না দেখার ভান করে চলে? তাঁদের কি ভাই*ঙ্গা পড়া মানা?”
ইলমার কাছে এই প্রশ্নগুলো বড্ড শক্ত লাগছে। উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সে অনুকে দেওয়ার মতো। অনু ইলমার অবস্থা বুঝতে পেরে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো….
—”আমার কান্না থামার পর মা আমায় বলেছিলেন, আমি যেনো গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে আমার নাগাল আমার বাবা বা ঐ চেয়ারম্যান পাবে না কখনও। আমি তো কোনোভাবেই মায়ের কথা মানতে রাজি ছিলাম না। কারণ আমি জানতাম আমি যদি একা পালিয়ে যাই তাহলে আমার অবর্তমানে বাবা মা’কে জানেই মে*রে ফেলবে। বাঁচতে দিবে না ১টা রাতও। কিন্তু আমার মা, হতভাগিনী-জনমদুঃখিনী মা নিজের জীবন নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা করলেন না। আমার হাতটা নিয়ে নিজের মাথার উপর রেখে আমায় কসমের মতো অদৃশ্য দড়ি দ্বারা বেঁধে ফেললেন। বললেন, আমি যদি না পালাই তাহলে উনি গলায় কলসী বেঁধে ভরা নদীতে ঝা*প দিয়ে নিজের প্রাণ ত্যাগ করবেন।”
অনুর বুক চিঁড়ে বেড়িয়ে এলো আরো একবার বড় দীর্ঘশ্বাস। অনু বললো….
—”২দিন পর রাত ১ টা নাগাদ মা আমায় নিয়ে লুকিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটলেন। আগেই ট্রেন মাস্টারমশাইয়ের থেকে আমার ঢাকায় আসার টিকিট সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন মা। আমার জন্য কিছু কাপড়, শুকনো খাবার আর নিজের কাছে জমা থাকা সবটাকাগুলো একটা ব্যগে ভরে নিয়েছিলেন। স্টেশনে বসে অপেক্ষার প্রহর গোণা হচ্ছিলো ট্রেন আসার। কিন্তু ভাগ্য আমাদের সহায় হলো না এতো সহজে। যেই ভয়টা মনের মধ্যে জমে রেখেছিলাম আমি সেটাই সত্য হলো না। সেই রাতে রেললাইনেরই এক ধারে বাবা তার জু*য়া খেলার সঙ্গীদের নিয়ে জু*য়া খেলতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁদের আমরা দেখতে না পেলেও তারা আমাদের ঠিকই দেখে নিয়েছিলো। তৎক্ষনাৎ বাবা সহ তার সব সঙ্গীরা আমাদের দিকে তেড়ে আসে। বাবার কিছু সঙ্গী এতোবেশি মাতাল ছিলো যে তারা আসতে আসতে রাস্তাতেই উল্টে পড়ে বেহুশ হয়ে যায়। বাবার রেষ ততোটা গাঢ় ছিলো না। তারা যখন অনেকটা কাছে চলে আসে তখনই আমাদের নজর তাঁদের উপর পরে। মা তৎক্ষনাৎ আমায় নিয়ে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করে। আমার ও মা দু’জনের চেহারা জুড়েই আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ফুটে ছিলো। পিছন থেকে স্পষ্ট শুনতে পারছিলাম কিছু বাক্য…..
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (২)
‘ধর ধর, ওগো ধর।
ওরা মা-মাইয়া পালাইতাছে।
জোড়ে দৌড়া, ধরতেই হবো ওদের।
ধর, ধর, ধর…!”
অনু থামলো। ওর চোখে-মুখে এখনও সেই আ*তঙ্কের কিছুটা ছাপ ফুটে থাকতে দেখতে পারছে ইলমা।
