না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৯
মাইশা জান্নাত নূরা
ফজরের আজান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই খান ভিলার প্রতিটা কোণে আবারও ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে।
আজকের এই দিনটার জন্য সবাই অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলো। কারণ আজ সারফারাজ আর পিহুর নিকাহ এর দিন। বাগানের মাঝখান থেকে গত রাতের হলুদের জন্য করা ডেকোরেশন পুরো বদলে ফেলা হচ্ছে। সব সরিয়ে সেখানে সাদা আর হালকা সবুজ ফুল দিয়ে তৈরি হচ্ছে ওদের নিকাহর মঞ্চ। চারপাশটা আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয় করার জন্য জুঁই আর রং-বেরঙের গোলাপও ব্যবহার করা হচ্ছে। মঞ্চের মাঝখানে রাখা হয়েছে ওদের দু’জনের বসার জন্য কাঠের কারুকাজ করা সাদার মধ্যে বড় দু’টি সোফা। এছাড়াও কাজী ও সাক্ষীদের বসারও ব্যবস্থা করা হয়েছে ২পার্শেই। দুই আসনের মাঝখান দিয়ে ফুলের তৈরি পর্দা লাগানো হয়েছে।
অন্যদিকে রান্নার জায়গায় বড় বড় ডেগে খাবার বসানো হয়েছে। বাকি অতিথিরাও ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছেন। পুরো খান বাড়িটা উৎসবের আমেজে মেতে উঠছে আস্তে আস্তে।
নিজরুমে পিহু ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুপচাপ বসে আছে। নীরা শেষবারের মতো ওর মাথায় চুলের সাথে আটকানো ওড়নার পাড়টা ঠিক করে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওকে ভালো করে দেখে নিয়ে বললো…..
—”নাহ্, একটা জিনিস আমি কিছুইতেই বুঝে উঠতে পারছি না।”
পিহু আয়নায় পড়া নীরার ওদের দু’জনের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়েই বললো….
—”কি বুঝছো না তুমি আবার?”
—”তোমাকে আমাদের এতো কষ্ট করে সাজানোর তো কোনো দরকারই ছিলো না, ভাবী।”
ওদের পিছনেই অনু বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে ছিলো। আর ইলমা বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে এলোমেলো হয়ে থাকা জুয়েলারি গুলো বাক্সবন্দী করছিলো গুছিয়ে। নীরা কথা কানে পড়তেই ওরা দু’জনে প্রশ্নসিক্ত নয়নে তাকালো নীরার দিকে। অনু অবাক হয়ে বললো…..
—”মানে?”
নীরা তৎক্ষণাৎ ওর ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললো….
—”কারণ, আমাদের ভাবী এমনিতেই মাশাআল্লাহ এতো সুন্দর যে এই সব সাজ তার সৌন্দর্যকে ঢেকে আলাদা কোনো রূপ দিতে পারছে না। বরং এই সাজগুলো ভাবীর নিজস্ব সৌন্দর্যের জন্যই পূর্ণতা পেয়েছে।”
পিহু তো শুরুতে নীরার কথায় কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এখন ওর প্রশংসামূলক বাক্য শুনে ও মাথা হালকা নুইয়ে নিলো লজ্জায়। ঠোঁটে সেই লজ্জার হাসিও ফুটে উঠলো। অনু বিছানা থেকে নেমে ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”একদম ঠিক বলেছো তুমি নীরা আপু। আসলেই আমাদের পিহু ভাবী বিনা সাজেও অনেক বেশি সুন্দর দেখতে।”
পিহু বললো….
—”তোমরা এখন একটু বাড়িয়েই বলছো কিন্তু। শ্যমবর্ণের সৌন্দর্য নিয়ে এতো প্রশংসা বাক্য খরচ করা মানা।”
ইলমাও এবার ওদের সঙ্গে দিয়ে বললো….
—”শরীরের রং কেবল চাপা আর উজ্জ্বল এর উপর নির্ভর করেই যে তার সৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসা ও ঘৃণামূলক বাক্য খরচ করতে হবে তার কোনো সঠিক যুক্তি নেই ভাবী। মানুষের আসল সৌন্দর্য থাকে তার মনে। আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের শরীরের রং ধবধবে সাদা হলেও মনটা হয় কুৎসিত। সে তো প্রশংসা শোনার যোগ্যতা রাখে না! আর তুমি যেমন শ্যমসুন্দরী তেমনই তোমার মনটাও অনেক পরিষ্কার ও স্বচ্ছ তাই তোমার সৌন্দর্য নিয়ে শত প্রশংসা করলেও তা কম হয়ে যাবে। বুঝেছো!”
পিহুর মনে অদ্ভুত শান্তি কাজ করছে ওদের কথাগুলো শুনে। শ্যম বর্ণের অধিকারিণী এক নারীকে নিয়েও ওরা ৩জন যথেষ্ট সৌন্দর্যের অধিকারিণীরা এতো প্রশংসা করতে পারছে কি করে! আসলেই মানুষের মন সুন্দর হওয়াটা সবথেকে জরুরি। যার মন যতো সুন্দর তার মুখের বুলিও হয় ততো শান্তি দায়ক। নীরা এবার পিহুর থুতনিটা আলতো করে ধরে ওর মুখটা উঁচু করিয়ে বললো….
—”একবার আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে ভালোভাবে দেখো তুমি ভাবী! তোমার নিজস্ব সৌন্দর্যের উপর আমরা খুব বেশি কোনো ছেরখানি করি নি। তাই তুমি ঠিক কতোটা সুন্দর দেখতে তা নিজেই উপলব্ধি করতে পারবে।”
পিহু এক ঝলক আয়নায় তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে বললো……
—”আমার লজ্জা করছে। তোমরা আর কিছু বলো না এখন।”
—”এই লজ্জা তোমার সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। এখন সত্যিই মনে হচ্ছে তুমি আমাদের বড় ভাইয়া ও খান বাড়ির যোগ্য বড় বউ হতে যাচ্ছো আবারও নতুন ভাবে।”
এরপর অনু, নীরা পিহুর সাথে আরো অনেক মজা করলো।
কিয়ৎক্ষণ পর ওদের রুমের বন্ধ দরজার বাইরে থেকে তেজের গলা শোনা ভেসে এলো….
— “এই নীরা! তোরা কি ভাবীকে আজই আমাদের ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিবি নাকি আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?”
নীরা চোখ উল্টিয়ে বললো…..
— “এই যে ফাঁ*টা টেপ রেকর্ডারটা বাজতে শুরু করলো, এখন আর থামার নাম নিবে না।”
নীরার কথায় অনু ফিঁক করে হেসে ফেললো। বাইরে থেকেই তেজ আবারও বললো….
— “চার ঘণ্টা ধরে একই রুমের ভিতরে আছিস তোরা সব। এদিকে বিয়ের মন্ঞ্চ থেকে শুরু করে অতিথিদের জন্য ৫০ রকমের খাবার রান্না শেষ হয়ে গেলো তবুও তোদের মেয়েদের সাজসজ্জা শেষ হলো না।”
নীরা দরজা খুলে সেখানে দাঁড়াতেই তেজ আর নির্ঝরকে সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো……
— “কী হয়েছে? কি সমস্যা তোমাদের? সময় নিয়ে সাজসজ্জা করা মেয়েদের জন্মগত অধিকার। সেই অধিকার উপর আঙুল তোলা দ*ন্ড*নীয় অ*প*রাধ যে তা তোমরা জানো না?”
তেজ গম্ভীর মুখ করে বললো…..
— “তোদের সাজসজ্জার পিছনে ব্যায়কৃত সময় নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য বিষয় নিয়ে আছে। আর বিষয়টা যথেষ্ট সিরিয়াস।”
— “কি বিষয় শুনি?”
— “সকাল থেকে আমরা দুই ভাই না খেয়ে ঘুরে ঘুরে এটা সেটা কাজ করছি আর দেখছি তোদের রুমে বারবার জুস, ফল ও বাহারি রকমের খাবার নিয়ে একটু পর পর সার্ভেন্টরা এসে সেগুলো দিয়ে যাচ্ছেন। আর এখানেই আমি একই বংশের সন্তানদের মধ্যে ঘোর বৈষম্য দেখতে পারছি। এ নিয়েই আমাদের সব সমস্যা।”
নীরা একটু ভাব নিয়ে বললো….
— “ওগুলো কনের জন্য এসেছে তাকে স্পেশাল ফিল করানোর উদ্দেশ্যে।”
— “তোর কি মনে হয় আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? বড় ভাবী জীবনেও একা এতো খাবার খেতে পারবেন না৷ সব নিজেরা ঠু*সে*ছিস যে সেটা বলতে লজ্জা করছে তাই না!”
নীরা ভে*ঙি*য়ে বললো…..
—”বেশ করেছি ঠুসেছি। আরো ঠু*সবো। পারলে ঠেকাও।”
ঠিক তখনই নির্ঝর কনুই দিয়ে তেজের পেটে হালকা গুঁ*তো মে*রে ফিসফিসিয়ে বললো….
— “ভাই! আধঘণ্টা আগেই তো তুমি ২ প্লেট কাবাব, চিকেন ফ্রাই খেলে, ভুলে গিয়েছো?”
তেজ স্বাভাবিক মুখ করেই বললো…..
— “ওটা তো যাস্ট টেস্ট করে দেখেছিলাম। অতিথিদের মুখে তোলার জন্য উপযুক্ত স্বাদের খাবার হয়েছে কি না সেটা দেখা তো আমাদের দায়িত্ব।”
নীরা দুই হাত ওর বুকের সাথে ভাঁজ করে বললো…..
—”নিজে তো ঠিকঠাকভাবেই ঠুসছো তবুও আমাদের খাওয়া নিয়ে জ্বা*লা করছে তোমার! ছি: মেজ ভাইয়া ছি:। তুমি এতোটা নে*ল*চ হয়ে গিয়েছো আমি ভাবতেও পারছি না।”
তেজ ওর নিচের ঠোঁট হালকাভাবে কাঁ*ম*ড়ে ধরে রাগী স্বরে বললো……
—”এতো বড় অ*প*মান করলি আমাকে তুই! আমি তোকে অভি*শা*…..!”
তেজ কথা শেষ করার আগেই নীরা ওর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। তেজ যেই না দরজা ধা*ক্কাতে যবে ওমনি পিছন থেকে নির্ঝর তেজের পেট জড়িয়ে ধরে ওকে পিছনের দিকে টেনে ধরলো। তেজ বললো….
—”আমাকে খাবার নিয়ে খোঁটা দিয়েছিস, ঐ তোর পে*টে গুড়া কৃমি হবে দেখিস। বিয়ে আর ইন্ঞ্জয় করতে পারবি না। টয়লেটেই আজ বাঁধতে হবে তোর সংসার৷”
নীরা ভেতর থেকে চিল্লিয়ে বললো…..
—”শ*কু*নের দোয়ায় গরু মরে না ভাই।”
তেজ নির্ঝরকে বললো….
—”এই ব্যটা ছাড় আমায়। আজ ওর নাক ফা*টিয়েই দম ফেলবো আমি। আমায় শ*কু*ন বললো।”
নির্ঝর আরো শক্ত করে তেজকে ধরে বললো….
—”তোমাকে শ*কুন বলার চক্করে ও তো নিজেকে গ*রুও বললো ভাই! ছাড়ো ওকে এখনের মতো। বিয়েটা মিটে যাক তারপর ওর জন্য গা*জ*নী বর পছন্দ করে এর শোধ তুলবো আমরা। ঠিক আছে!”
তেজ নির্ঝরকে থামাতে ব্যস্ত থাকাকালীন সময়েই নিচতলা থেকে ওদের উদ্দেশ্যে সারফারাজের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো….
—”তেজ, নির্ঝর! তোরা দু’জন এখুনি নিচে আয় তো।”
দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকালো। তেজ নিচু গলায় বললো…..
—”এখনের জন্য তোকে ছেড়ে দিলাম নীরা। বিয়েটা একবার মিটে যাক তোর নামে মান হানির মামলা ঠু*ক*বো আমি।”
নির্ঝর হেসে তেজের হাত ধরে নিচে নিয়ে যওয়ার উদ্দেশ্যে টানতে টানতে বললো….
—”মামলা পরে করো মেজ ভাইয়া। এখন বড় ভাইয়ার ডাক পড়েছেন সেখানে যাওয়াটা জরুরী।”
অতঃপর ওরা দু’জনে নিচে নামতেই ড্রয়িংরুমে পিহুর বাবার পাশাপাশি একেবারে একই রকম দেখতে অপরিচিত আরো ২জন ছেলেদের দেখে ওদের দু’জনেরই ভ্রু কুন্ঞ্চিত হয়ে এলো। পিহুর বাবা জবরুল মিয়ার মুখে আগের মতো সেই কঠোরতা, নির্দয়তার ছাপ ফুটে নেই। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। মেয়ের বিয়ের আনন্দ ও বি*চ্ছে*দ উভয়ের এর সুখ – দুঃখ অনুভূতি একসাথে অনুভব করছেন জন্যই হয়তো ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখাটা এখনও ফুটিয়ে রেখেছেন। পিহুর মায়ের অবর্তমানে যেখানে ওর মা-বাবা উভয়ের ভূমিকা জবরুল মিয়ার পালন করার কথা ছিলো সেখানে নিজের ২য় স্ত্রী ও সে পক্ষের মেয়ের প্ররোচনায় পরে দীর্ঘসময় পিহুকে অ*যত্নে, অবহেলায় ফেলে রেখেছিলেন তিনি। তা নিয়ে বর্তমানে তার অনুশোচনার শেষ নেই। যদিও পিহু এখন তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছে তবুও নিজের অতীত কর্মকে মনে করে এখনও জবরুল লজ্জাবোধ করেন। হয়তো ভাবেন যখন তিনি তার ভু*ল গুলো দেখতে পেলেন তখন বড্ড দেড়ি করে ফেলেছেন। পিহু এখন তার শ্বশুরবাড়িতে চলে এসেছে। বাবার বাড়িটা এখন ওর জন্য সাময়িক ঠিকানা। বাবার সাথে বসে দু’দন্ড একান্তে কথা বলার জন্য পিহুকে যেমন অপেক্ষা করতে হবে তেমনই অপেক্ষা করতে হবে জবরুলকেও।
তেজ আর নির্ঝর জবরুল মিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। তেজ সালাম দিলে তিনি উত্তর করলেন। এরপর কুশল বিনিময় হলো। তেজ কৌতুহলী চোখে জবরুল পাশে বসা সেই সমবয়সী একই চেহারার ২জন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”ওরা কারা?”
সারফারাজ বললো….
—”আমার ছোট দুই শা*লা। পিহু জমজ ছোট ভাই।”
—”নাম কি তোমাদের?”
জবরুল পাশে বসা ছেলেটা বললো…..
—”আমি রিফাত।”
রিফাতের পাশের ছেলেটা বললো…..
—”আর রিয়াদ।”
তেজ কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে ওদের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে বললো…..
—”রিফাত গোল্ডেন কালার ঘড়ি পড়ে আছো আর রিয়াদ ব্লাক কালার ঘড়ি পড়ে আছো। এই ঘড়ি ব্যতিত কোনো একটা দিক দিয়ে তোমাদের পার্থক্য করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। পায়ের জুতো থেকে শুরু করে, মাথার চুল, গায়ের রং, শরীরে থাকা পোশাক সব একেবারে একে-অপরের জেরজ কপি ঠিক চেহারাটার মতোই। তোমরা কিন্তু ঘড়িটা এক্সচেঞ্জ করে বসো না হুট করে। তাহলে রিয়াদকে রিফাত আর রিফাতকে রিয়াদ বলে সম্বোধন করে বসবো আমি।”
তেজের কথাটা শুনে ওরা সবাই একসাথে হেসে ফেললো। রিয়াদ বললো…..
—”এটা আমাদের কাছে নতুন কিছু না ভাইয়া। আমরা যেখানেই যাই না কেনো প্রায় ৭০% মানুষই আমাদেরকে একে-অপরের সাথে গুলিয়ে ফেলেন।”
নির্ঝর বললো….
—”গুলিয়ে ফেলার মতো বিষয়ই এটা। তোমরা তো একটা কাজ করলেই পারো! পরনে থাকা টি-শার্টে নিজের নামের একটা করে স্ট্যম্প লাগিয়ে রাখবা। তাহলে আর কেউ চিনতে ভুল করবে না তোমাদের।”
নির্ঝরের কথা শুনে ওরা কেবল মাথা নেড়ে হাসলো। সারফারাজ শান্ত স্বরে জবরুলকে বললেন…..
—”আপনাদের এখানে আসার পথে কোনো কষ্ট হয় নি তো?”
জবরুল মাথা নেড়ে বললেন….
—”না বাবা, তুমি তো গাড়িই পাঠিয়েছিলে তাই অসুবিধা হওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর জবরুল আবারও বললেন…..
—”সেদিন আমি তোমাদের কাছে ভু*ল স্বীকার করে এখান থেকে চলে যাওয়ার পর আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া চেয়ে এসেছিলাম, আমার অ*ভাগী মেয়েটার বিয়ের দিন যেনো অন্তত ওর মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে পারি। তোমার বদৌলতে আল্লাহ আমার সেই চাওয়া হয়তো পূরণ করবেন।”
কথা শেষ করতে গিয়ে জবরুলের গলা মৃদু ভাবে কেঁপে উঠলো। সারফারাজ মুখে কোনো উত্তর দিলো না। কেবল
সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করলো। অতঃপর সারফারাজ পিহুর সৎ জমজ দুই ভাই রিফাত ও রিয়াদের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছো হঠাৎ করে তোদের এখানেই নিয়ে এলাম কেনো!”
রিফাত একটু সংকোচ নিয়েই বললো….
—”গাড়িতে আসার সময় বাবা আমাদের সবটা সম্পর্কে অবগত করেছিলেন ভাইয়া। নয়তো এ বিষয়ে আমরা পুরোপুরিভাবে অনাগতই ছিলাম।”
রিয়াদও মাথা নিচু করে বললো…..
—”হোস্টেলে থাকার কারণে বাড়ির খবর ঠিকমতো পেতাম না আমরা। এখন যখন সব জানতে পারলাম! বিশ্বাস করুন ভাইয়া! আপার সঙ্গে যা হয়েছে, মা আর আপু মিলে যা করেছে আমরা তা আগে জানলে কখনোই চুপ করে থাকতাম না।”
সারফারাজ শান্ত গলায় বললো…..
—”হুম, আমি জানি তোমরা জানতে না। তাই তোমাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সরাসরি এখানেই নিয়ে আসলাম তোমাদের। যদি নির্দোষ না হতে তাহলে কখনই এখানে আনতাম না তোমাদের।”
রিফাত ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো….
—”আপনি আমাদের বিশ্বাস করেছেন এটাই অনেক।”
সারফারাজ রিফাত ও রিয়াদ উভয়ের কাঁধে দু’হাত রেখে বললো….
—”যার অপরাধ সেটা একান্ত তার নিজের। একজনের করা অ*প*রাধের জন্য পুরো পরিবার সাফার করবে এটা তো ঠিক না, তাই না! তেমনি তোমাদের মা-বোনের অপরাধের শা*স্তিও অবশ্যই তোমরা পাবে না।”
সারফারাজের চিন্তা-ধারা, অমায়িক ব্যবহার এর আগেও জবরুল দেখেছিলেন এবং মুগ্ধ হয়েছিলেন। আজ রিফাত ও রিয়াদ দেখলো। রিয়াদ বললো…..
—”পিহু আপু ভিষণ ভাগ্যবতী। তাই তো আপনার মতো জীবনসঙ্গিনী পেয়েছে। আপনি অনেক ভালো দুলাভাই।”
—”পিহু ওর অতিবাহিত জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে তাই এতোটুকু সুখ ও ডিজার্ভ করেই। আর আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করে যাবো আজীবন পিহুকে সুখী রাখার, ওকে কখনও কোনো বিষয় নিয়ে অভিমান-অভিযোগ করার সুযোগ না দেওয়ার।”
উপস্থিত ওদের সবার ঠোঁটে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি সারফারাজের কথাগুলো শুনে। অতঃপর সারফারাজ আবারও বললো….
—”চলো, এবার পিহুর সঙ্গে দেখা করিয়ে আনি তোমাদের। বাবা! আপনিও চলুন।”
পিহুর বাবা জবরুল মিয়া সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। সারফারাজের মুখে বাবা ডাকটা শুনে তা অন্য রকম শান্তি অনুভব হচ্ছে। অতঃপর ওরা সবাই সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে শুরু করলো।
মিনিট খানেক পর ওরা সবাই এসে দাঁড়ালো পিহুর রুমের সামনে। সারফারাজ ইচ্ছে করেই একটু পেছনে সরে দাঁড়ালো। কারণ সে পিহুকে নিজের পরিবারের সাথে সময় কাটাতে দিতে চায় দ্বিধাহীন ভাবে। পিহু ওর বাবা ও দুই ভাইকে আজকের এই বিশেষ দিনে একসাথে দেখার পর অবশ্যই ইমোশনাল হয়ে যাবে। কিন্তু পিহুর হাস্যোজ্বল মুখটাই যে সবথেকে প্রিয় সারফারাজের। তাই পিহু এইটুকু কান্নাও সারফারাজের সহ্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তেজ দরজায় টোকা দিতে দিতে বললো…..
—”ভাবী! শুনছেন?”
ভেতর থেকে পিহুর কন্ঠস্বর ভেসে আসার আগেই নীরার গলা ভেসে এলো…..
—”আবার কী হলো তোমাদের, মেজ ভাইয়া? এই তো পাঁচ মিনিট আগেই ঝ*গড়া করে গেলে। এখন কি মাফ চাইতে এসেছো?”
তেজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো…..
—”বেশি বকবক না করে দরজাটা খোল। ভাবীর জন্য ছোট্ট সারপ্রাইজ আছে বড় ভাইয়ার তরফ থেকে।”
—”না, দরজা আর খুলবো না এখন। তোমরা সারপ্রাইজ এর নাম করে বদ*মা*য়ে*শী করার ও*স্তাদ। তাই তোমাদের উপর ভরসা করতে পারছি না কোনোভাবেই।”
—”দরজা খুলবি নাকি ভা*ঙ*তে বলছিস? যদি ভা*ঙি তাহলে ভিতরে ঢোকার পর তোর হাড়-গোড় ও ভা*ঙ*বো বলে রাখলাম লাগামহীন ব*করি।”
নীরাকে ব*ক*রি বলেছে তেজ তা শোনামাত্র ভিতর ও বাহির উভয় সাইডে হাসির রোল পড়লো যেনো। নীরা তো রাগে ফোঁস ফোঁস করছে কেবল। পিহু বললো…..
—”রাগ করো না নীরা। দরজাটা খুলে দাও। মনে হচ্ছে বেচারা সিরিয়াস মুড নিয়েই কথাটা বলেছে।”
অনুও তাতে সায় দিয়ে বললো….
—”হুম, আমারও তেমনই মনে হচ্ছে নীরা আপু। তোমার দরজাটা খুলে দেখা উচিত বিষয়টা। যদি তারা কোনো মশকরা করে তাহলে এর বিচার সরাসরি সারফারাজ ভাইয়ের কাছে দিয়ে দিবা। সাক্ষী আমরা হবো।”
নীরা অগ্যতা আর কিছু বলার বা করার ভাষা খুঁজে না পেয়ে দরজা খুলতে চলে গেলো। ইলমা পিহুর সাজ পরিপূর্ণ করার শেষ ধাপটা সম্পন্ন করালো। নীরা দরজা খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে কিছুটা অবাক হলো। কেবল পিহুর বাবাকেই সে চিনতে পারলো। রিফাত, রিয়াদকে একপলক দেখতেই ওর স্মরণ হলো পিহু গল্পে গল্পে একবার বলেছিলো ওর আরো ২জন জমজ ভাই আছেন। নীরা ওদেরই আন্দাজ করে ‘ভাবীপু’ বলে ডেকে উঠতেই পিহু সেদিকে ঘুরে তাকালো। নীরা দরজার সামনে থেকে সরে যেতেই নিজের বাবা ও দুইভাইকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর দু’চোখ ছলছল করে উঠলো। নিজের বাবার প্রতি মনে এখনও কিছুটা রাগ, অভিমান জমে থাকলেও রিফাত-রিয়াদ ছোট থেকেই পিহুর বড্ড আদুরে ছিলো। কেবল ওরা দুইজনই পিহুর আশেপাশে ঘুরঘুর করতো সবসময়।
যখন পিহু আড়ালে বসে কান্না করতো ওর সৎ মা, বোন ও নিজের বাবার আচারণের কথা চিন্তা করে তখন রিফাত-রিয়াদই এসে পিহুর মন ভালো করতো। নিজের ছেলেদের যখন অত্যাধিক ভাবে পিহুর সাথে সাথে থাকতে দেখলেন পিহুর সৎ মা তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন রিফাত-রিয়াদকে স্কুল হোস্টেলে রেখে পড়াশোনা করাবেন। জবরুলও তা মেনে নিলেন। এরপর রিফাত-রিয়াদ হোস্টেলে চলে গেলে পিহু একেবারে একলা হয়ে গেলো। নিজের মন খারাপের সাথে নিজেই লড়াই করে আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠতো সে। রিফাত-রিয়াদ হোস্টেল থেকে খুব কম ছুটি পেতো। বাড়ি এসে বড়জোর ৩-৪ দিন থাকতে পারতো। তখন পিহুর সৎ মা ও বোন রিফাত-রিয়াদকে নিজেদের সঙ্গ ছাড়া করতেন না কারণ তাদের মনে ভ*য় ছিলো পিহু ওদের একলা পেলে তাঁদের সম্পর্কে সব বলে দিবে তখন রিফাত-রিয়াদ তাঁদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।
পিহু কাঁপান্বিত কন্ঠে ওদের দু’জনের নাম উচ্চারণ করলো…
—”রিফাত! রিয়াদ!”
ডাক শোনা মাত্র রিফাত আর রিয়াদ দৌড়ে পিহুর কাছে গিয়ে ওর পায়ের কাছে বসে পড়লো। দু’জন পিহুর দু’হাত জড়িয়ে ধরে ‘আপু’ বলে কেঁদে ফেললো। পিহুও নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। ওর দু’চোখ বেয়েও অশ্রুরা ঝরে পড়তে শুরু হলো। রিফাত বললো….
—”আপু, তুমি আমাদের মাফ করে দাও।”
রিয়াদ বললো….
—”আমরা বুঝতেও পারি নি আমাদের মা-বোন তোমাকে এতোটা অ*ত্যা*চার করতো। কষ্ট দিতো!”
রিফাত বললো….
—”যদি আমরা হোস্টেলে না যাওয়ার জন্য জেদ করতাম তাহলে আমরা সব জানতে ও নিজের চোখে দেখতে পারতাম। তখন আমরা তোমার সাথে এতো অ*ন্যায় হতে দিতাম না কিছুতেই।”
রিয়াদ বললো….
—”অনেক দেড়িতে সবটা জানতে পেরে বড্ড আফসোস কাজ করছে আপু। তুমি আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের উপর কোনো রাগ-অভিমান নিজের মনে জমে রেখো না দয়াকরে।”
পিহু ওর দুই ভাইয়ের হাত নিজের মুখে কাছে টেনে নিয়ে তাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো…..
—”তোরা দু’জন তো আমার কলিজার টুকরো ভাই। তোদের উপর আমি রাগ-অভিমান করতে যাবো কেনো হুম? এসবে তো তোদের কোনো দো*ষ নেই ভাই। তাই তোরা আফসোস করবি না একদম এসব ভেবে। যারা অ*প*রাধ করেছে তারা নিজ নিজ অ*প*রাধ অনুযায়ী শা*স্তিও ভোগ করছে।”
রিফাত মাথা নিচু করে বললো…..
—”তবুও আমরা তোমার পাশে থাকতে পারি নি যখন ওরা তোমায় দিন-রাত কষ্ট দিয়ে যাচ্ছিলো সেই দিক থেকে ভাই হিসেবে এতোটুকু অনুশোচনা হওয়া আমাদের প্রাপ্য, আপু।
পিহু ওদের দু’জনের হাত ছেরে দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে দু’জনের মাথায় দু’হাত রেখে হালকা হেসে বললো….
—”আমার ভাইরা যদি ইচ্ছা করে আমাকে ছেড়ে চলে যেতো তাহলে আমি খুব কষ্ট পেতাম। কিন্তু তোরা তো বাধ্য হয়ে হোস্টেলে গিয়েছিলি। তোদের হোস্টেলে রেখে পড়াশোনা করানোটা ছিলো সৎ মা ও আপার করা ষ*ড়*যন্ত্রেরই একটা অংশ। তাহলে এখানেও তোদের দোষটা কোথায় হচ্ছে? তাই কোনোরূপ অনুশোচনাও করবি না একদম তোরা। বুঝলি?”
দুই ভাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। এই দৃশ্য দেখে রুমের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা নীরা, অনুর চোখও ভিজে উঠলো। ইলমা নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিহু এবার বসা থেকে উঠে নিজের বাবা জবরুল মিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। দু’জনেই কিছুক্ষণ একে-অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। কেউ কোনো কথা বলতে পারছিলো না। শেষ পর্যন্ত পিহুর বাবাই নীরবতা ভেঙে কাঁপান্বিত কণ্ঠে বললেন….
—”মা…!”
শুধু এই একটা শব্দেই যেনো পিহুর ভিতরে জমে থাকা বাকি রাগ-অভিমানগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। জবরুল মিয়া পিহুর মাথায় হাত রেখে কান্না ভেজা কন্ঠে বললেন…..
—”আজকের এই দিনটা প্রতিটি নারীর জন্যই বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। এই দিন নিয়ে সবারই আলাদা আলাদা স্বপ্ন থাকে। নিজের বাবার বাড়িতে থেকে বাবার হাত থেকে নিজের স্বামীর হাতে হাত রেখে শ্বশুড়বাড়িতে আসার যে সুন্দর বেদনাদায়ক নিয়ম রয়েছে তা তোর ক্ষেত্রে পালন করা হলো না ২য় বারেও। আমি তোর চোখে চোখ রাখতে পারছি না। ভিষণ লজ্জা কাজ করছে।”
পিহু বললো….
—”এমন ভাবে বলবেন না, বাবা। হতে পারে আমি নিজের বাবার বাড়িতে থেকে বিবাহের বিদায় নিতে পারছি না কিন্তু এখানে যে আপনি ও আমার দুই ভাই উপস্থিত হয়েছেন এতেই আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমার মনে আর কোনো আফসোস নেই। বিয়ে পড়ানোর পর নিজের মেয়ের হাত তার স্বামীর হাতে তুলে দেওয়ার গুরু দায়িত্বটা না হয় এখানে থেকেই পালন করিয়েন।”
জবরুল বললেন….
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৮
—”বেঁচে থাক মা। আল্লাহ তোদের দু’জনকেই দীর্ঘায়ু দান করুক। জামাইয়ের সাথে এতো সুখী জীবন পার করতে পারিস যেনো অতীতের সব দুঃখ – কষ্ট তোর জীবন থেকে মুছে যায় দু:স্বপ্নের মতো হয়ে।”
উপস্থিত সবার মুখেই এবার হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো এহেনু আবেগঘন পরিবেশ এর মাঝে থাকার কারণে। সারফারাজও মনে মনে অনেক শান্তি অনুভব করছে এবার।
