Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩
নাজনীন নেছা নাবিলা

মুনভি?
পেছন থেকে এক পুরুষালি কন্ঠ ভেসে এলো মুভির কানে। মুনভির কন্ঠটি চিনতে সমস্যা হলো না।এ যে তার অতি প্রাণ প্রিয় বন্ধুর কন্ঠ।মুনভি চেয়ার সমেত পেছনে ফিরল।তার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে বাঁকা হাসলো। পরনের সাদা এপ্রোন খুলে চেয়ারের উপর রাখল।চেহারা ছেড়ে উঠে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। পেশায় সে একজন ডাক্তার।Hôpital Européen Georges-Pompidou(ইউরোপীয় হাসপাতাল জর্জেস পম্পিডো) তে সে একজন Cardiologist.(হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ) ব্যক্তিটির একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বলল ___

মিহাল খান মাই ডিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড।আই মিন এক্স বেস্ট ফ্রেন্ড।উই মিট আফটার আ লং টাইম।তো এখানে কি করে আসা?
মুনভির বলা কথাগুলো শুনে মিহালের ঠোঁটেও স্মিত হাসি ফুটে উঠল।এক জীবনে দুজন দুজনের জন্য জান দিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল।আর এখন দুজন দুজনের জান নিয়ে নিতে প্রস্তুত।কি অদ্ভুত এই বন্ধুত্ব।মিহাল নিজের মস্তিষ্ক হতে অন্যান্য চিন্তা ভাবনা দূর করে বলল___
“এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম ভাবলাম নিজের শত্রুর খোঁজ খবর নিয়ে যাই।যত যাই হোক এক জীবনে তো বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মিহালের কথা শুনে মুনভির ঠোঁট তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।সে বিদ্রুপ করে বলল ____
ছিলাম তো বেস্ট ফ্রেন্ড।(বেস্ট ফ্রেন্ড কথাটি সে জোড় লাগিয়ে বলল।)এক সময় অনেক ভালো বন্ধু ছিলাম।সেই বন্ধুত্বের হত্যা নিজ হাতে করেছিস তুই মিহাল।তাই এখন আমার তোকে মারতেও হাত কাঁপবে না। ঠিক যেমন তোর আমাদের বন্ধুত্বকে হত্যা করতে হাত কাঁপেনি।
মুনভির কথা শুনে মিহাল ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হলেও তা প্রকাশ করল না। বরং শব্দ করে হেসে উঠলো।তার এহেন কান্ডে অবশ্য মুনভি অবাক হলো না। ছোট বেলা থেকেই তাদের বন্ধুত্ব ছিল তো তাই সে মিহাল কে যতটা চেনে মিহাল নিজেও নিজেকে ততটা চেনে না।মিহাল নিজের হাসি আয়ত্তে এনে বলল___

যখন বন্ধুত্ব ছিল তখন যদি সেই বন্ধুর জন্য মরতে পারি, তাহলে এখন না হয় বন্ধুত্ব শেষ হয়ে জন্মে উঠা শত্রুতামিতে শত্রুর হাতে মরব।তফাত নেই তো কোনো।
মিহালের কথায় মনক্ষুণ্ণ হলো মুনভি।এত সহজেই কি বন্ধুত্ব শেষ করা যায় যত সহজে মিহাল বলল কথাটি। কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলল না।মুনভি কে চুপ থাকতে দেখে শায়ান শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল___
মিনু আন্টি কেমন আছেন?
মিহালের কথা শুনে মুনভি কিছুটা স্বাভাবিক হলো। তারপর সেও শান্ত কন্ঠে উত্তর দিল ___

আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আমার সাথে যাই হোক না কেন মা তোকে খুব ভালো বাসে।সময় করে বাড়ি আসিস।
মিহাল যেন এই কথাটি শোনার অপেক্ষায় ছিল।কেবল মাথা নাড়িয়ে মুনভির কেবিন থেকে বের হয়ে এলো।বের হয়ে বাইরে থেকে দরজা মিশিয়ে দিল এবং নিজে দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।চোখ বন্ধ করে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলো এবং যথাসম্ভব নিজের আবেগ কে নিজের আয়ত্তে আনার চেষ্টা চালালো।যখন বুঝতে পারলো সে স্বাভাবিক হয়ে গেছে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলো ___
মিহাল খান নিজের আয়ত্তে সব কিছু রাখতে পারে এমনকি নিজের আবেগও।
কিন্তু পরক্ষণেই আহত কন্ঠে বলল___

আমি না হয় সত্য জানি না, আমি না হয় সব কিছু শেষ করেছি। কিন্তু চাইলেই তো একবার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারতি, “মিহাল আমি কিছুই করিনি।তুই যা জানিস সব মিথ্যে।”ট্রাস্ট মি মুনভি সকল প্রমাণ কে প্রত্যাখ্যান করে কেবল তোর কথা বিশ্বাস করতাম। কিন্তু তুই কি করলি? আমাদের বন্ধুত্বের উপরে নিজের ইগো কে বেছে নিলি? এক্সপ্লেইন পর্যন্ত করলি না।
কথা গুলো বলে মিহাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর গলার টাই ঢিলা করতে করতে বলল__
সত্য কখনো লুকানো যায় না। খুব শীঘ্রই আমি সত্যি জেনে ছাড়বো। কিন্তু এই সবের মাঝে যে আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়েছে তা কখনোই ঠিক হবে না।
কথা গুলো বলেই মিহাল হসপিটাল থেকে হনহনিয়ে বের হয়ে গেল।
অন্যদিকে কেবিনের ভেতর বসে থাকা মুনভি আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। তারপর তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল____
ঠিকই তো আগের মতোন অধিকার দেখিয়ে পারমিশন না নিয়ে আমার কেবিনে ঢুকে পরলি।অথচ যাওয়ার আগে একবারও পিছনে ফেরার প্রয়োজন বোধ করলি না? এই ছিল তোর বন্ধুত্ব? সত্য একদিন ঠিকই প্রকাশ পাবে কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে মিহাল।

নীলা, আবির এবং ইবাদ মিলে ইরফান আর আরশির বাসর ঘর সাজাচ্ছে। বাড়ির সবাই অবাক না হয়ে পারছে না নীলা কে দেখে।নীলয় মির্জা দরজার ফাঁক দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখছেন।চোখ উনার অশ্রুসিক্ত।
হারিয়ে গেলেন পুরোনো স্মৃতির মাঝে___
অতীত ____
বড় আব্বু দেখো না ইরফান ভাইয়া তার এক বান্ধবীর সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ি আসছে।
৭ বছরের নীলা নিজের বড় চাচারা কাছে এসে উনার ছেলের নামে বিচার দিল।নীলার কথা শুনে উপস্থিত সকলে নীলার দিকে দৃষ্টিপাত করল। সেখান নীলয় মির্জা, ইমরান মির্জা, আকাশ মির্জা সকলের উপস্থিত ছিলেন।
ইমরান মির্জা নিজের ভাইজি কে কাছে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে আদুরে স্বরে বললেন___
কেন আমার নীলা মার বুঝি কষ্ট হচ্ছে?
নীলা মাথা নাড়িয়ে বলল___

“তুমিই তো বলেছিলে ইরফান ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ে দিবে তাই যাতে বড় হয়ে কখনো অন্য কোনো ছেলের সাথে কথা না বলি। তাহলে ইরফান ভাইয়া কেন অন্য মেয়ের সাথে কথা বলছে? কই আমি তো কোন ছেলের সাথে কথা বলি না। আমি আমার জিনিস অন্য কারোর সাথে ভাগ করতে পারবো না।আমার মানে সেইটা সম্পূর্ণ আমার।”
নীলার এমন অধিকারী কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল।

পুরোনো কথা মনে পড়তেই নীলয় মির্জার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল‌।সাত বছরের নীলা তার ইরফান ভাইয়ার সাথে অন্য কোনো মেয়েকে দেখতে পারতো না। অথচ আজ ২১ বছরের নীলা(অনেকেই বছর নিয়ে কনফিউজ কারণ আমি একবার চেন্জ করে ২৩ দিয়েছিলাম। কিন্তু ২১ই ঠিক আছে।) নিজের হাতে তার ইরফান ভাইয়ার বাসর ঘর সাজাতে ব্যস্ত।এই দৃশ্য নীলয় মির্জা আর বেশিক্ষণ দেখতে পারলেন না।তার মেয়ে যতোই শক্ত দেখাক না কেন নিজেকে কিন্তু ভেতর ভেতর যে শেষ হয়ে গেছে তা তিনি বাবা হয়ে বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পারছেন। চোখের পানি মুছে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।বরণ হবার পর যে তিনি সেই নিজের রুমে ঢুকে ছিলেন এরপর মাত্র বের হলেন মেয়ের খুঁজে।এখন মেয়েকে শক্ত হয়ে থাকতে দেখে তিনি আরো বেশি ভেঙে পরলেন।আর মেয়ের সামনে নিজের ভেঙে যাওয়ার রূপ প্রকাশ করতে চান না বলে আপনার নিজের রুমে চলে গেলেন।

পুরো রুম জবা ফুল দিয়ে সাজালো নীলা। টুকটুকে লাল রঙের জবা ফুল নীলার খুব পছন্দ। কিন্তু ইরফান জবা ফুল পছন্দ করতো না বলে সে নিজের পছন্দ কে বিসর্জন দিয়েছিল কোনো এক কালে।আজ সে নিজের হাতেই ইরফানের বাসর ঘর জবা ফুল দিয়ে সাজালো। সাথে নীল রঙের জালি কাপড় যাতে ইরফানের মনে হয় এইটা তার বাসর ঘর না বরং সাজা পাওয়ার ঘর।আবির আর ইবাদ নীলার সাথে দাঁড়িয়ে পুরো রুমে ভালো করে চোখ বুলায়। আবিরের বুক মোচড় দিয়ে উঠলো আজ এই খানে তার বোনের থাকার কথা ছিল অথচ নিয়তির পরিহাসের ফলে তার বোন এই রুম সাজালো।মুখ দিয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর নীলার উদ্দেশ্যে বলল___
সাব্বাস নীলু সাব্বাস। এই না হলে আমার বোন।
ইবাদ বলে উঠলো ____

“আয়না ঘরের দিন শেষ, বাসর ঘরকে সাজা ঘরে পরিণত করে হল বাংলাদেশ।”
আবির শব্দ করে হেসে উঠলো ইবাদের কথা শুনে।নীলা বাঁকা হাসলো তারপর বলল____
এখন সবাই যার যার রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে আসো। বাসর ঘরে ঢুকতে দেওয়ার আগে বরের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে তো।
আবির আরেক দফা অবাক হলো নীলার কথা শুনে।আজ যেন অবাক দিবস। কিন্তু কিছু না বলে আবির আর ইবাদ নিজেদের ঘরে চলে গেল।নীলা একবার চোখ বুলিয়ে নিল ঘরটাতে। চোখের কোণে তার জল জমেছে খানিকটা।নীলা রুমে থাকা ফুল গুলোতে আলতো করে হাত বুলিয়ে আহত কন্ঠে বলল___

আমায় কেন ধোঁকা দিলে ইরফান ভাই? আমি কি দোষ করেছিলাম? আমার সত্যিকারের ভালবাসার এত বড় পুরস্কার না দিলেও পারতে। কোনো কু নজর নেই তোমার নতুন সংসারের প্রতি আর না আছে কোনো অভিশাপ। কিন্তু তোমরা আমাকে এমন ভাবে ভেঙে দিয়েছো যে এখন আমি নতুন নীলা হয়ে জন্মেছি। কিন্তু আমার মনের ভালোবাসা বিশ্বাস অনুভূতি এগুলো আর কখনো কারোর জন্য জন্মাতে পারবে না। আমাকে এমন ভাবে না ভাঙলেও পারতে।
কথা গুলো বলতে বলতে নীলার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরার আগেই নীলা উপরের দিকে তাকালো। চোখের পানি চোখে রয়ে গেল। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক
করে বলল___

তোমরা যদি ভেবে থাকো আমি পাঁচ দশটা ন্যাকা মানুষের মতো বলবো “অথচ আজও লাশ তার খুনি কে ভালোবেসে” তাহলে তোমরা ভুল ভাবছো। খুনের বদলে খুন করবো না বরং তোমাদের করা খুনের প্রতিশোধ নেব।
কথাটি বলে বাঁকা হেসে রুম ত্যাগ করল নীলা।
পুরো মির্জা বাড়ি আজ থমথমে। ইরফান আর আরশি ইমরান মির্জার রুম দাঁড়িয়ে আছে। ইরফানের মা তো ছেলের দিকে তাকিয়েও দেখছে না। ইমরান খান নিজের ছেলের উদ্দেশে আবার বলে উঠলেন ____
লজ্জা করল না এমন নিচু কাজ করতে? বিয়েতে মত ছিল না তাহলে কেন মেয়েটির মন নিয়ে খেললে? গায়ে হলুদের দিন কেন হাসতে হাসতে আনন্দ করলে? আর বিয়ের দিনই কেন এমন কাজ করলে? একটা মেয়ের জন্য তার বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া কতটা অপমানজনক তাকে তুমি জানো? অবশ্য তুমি কি করে জানবে তোমার তো নিজেরই কোন মান নেই।

“বাবা”
ইরফান ডাকটি বলতেই ইমরান খান ছেলেকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল___
আমাকে বারবার বাবা ডেকে মনে করিয়ে দিও না যে আমি তোমার মত কুলাঙ্গার কে জন্ম দিয়েছি।যখন বেকার ছিলে তখন নীলা তোমার পাশে ছিল। আজ তুমি যতটুকু তার পেছনে কেবল রয়েছে নীলা আর তুমি সেই নীলা কেই এখন প্রত্যাখ্যান করলে? নীলাকে প্রত্যাখ্যান করার যোগ্যতা কি আদৌ আছে তোমার মাঝে?
ইরফান প্রতি উত্তরে বলার কিছু খুঁজে পেল না। ইমরান মির্জার এইবার নিজের পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন ____

যেখানে নিজের ছেলে দোষী সেখানে তুমি পরের মেয়ে তোমাকে আমি দোষারোপ করব না। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখবে যেই যায়গায় নীলা আমার ছেলেকে সাফল্যতা পেতে সাহায্য করেছে, সেই জায়গায় আমার ছেলে নীলাকে ছেড়ে দিয়েছে। তুমি তো তুচ্ছ্য নীলার সামনে।
ইমরান মির্জার কথা বেশ বিধলো আরশির গায়ে।সে যেই না মুখ খুলে কিছু বলতে নিবে তার আগেই ইরফান তার হাত চেপে ধরলো।
ইমরান মির্জা তাদের উভয়ের উদ্দেশ্যে বলল___

যাও এখন নিজেদের ঘরে যাও।
ইরফান আর আরশি নির্লজ্জের মত ইমরান মির্জার রুম থেকে বের হয়ে গেল। আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগলো ইরফানের ঘরের দিকে। ইরফান নিজের ঘরের সামনে যেতেই গান শুনতে পেল কোনো এক মেয়েলি কন্ঠের।
নীলা ইরফানের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে‌।তার এক পাশে আবির এবং অন্য পাশে ইবাদ দাঁড়িয়ে আছে। নীলার পরনে তার নীল শাড়ি এবং সাথে মেচিং করা চুড়ি এবং জুয়েলারি।নীলার হাতে রক্ত জবা ফুল। সে রক্ত জবা ফুলে হাত বুলাতে বুলাতে গান গাইলো ____

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২

হাতে চুড়ি ছাম ছাম বাজে
বসে না মন কোনো কাজে,
প্রেম আসে যায় মনে
তোকে না পাওয়ার কারণে।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩ (২)