Home নোলকের নতুন শাড়ি নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১০

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১০

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১০
ইলোরা ফারদিন

সময় ও স্রোত কারো জন্য থেমে থাকে না। তেমনি দেখতে দেখতে তিনটা বছর পেরিয়ে গিয়েছে।
হাসান নোলক নতুন শহরে এসে নতুন করে নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। মনের কষ্টে হাসান নিজের আর নোলকের দুজনেরি ফোন নাম্বার চেঞ্জ করেছে। যাতে তার পরিবারের কেউ আর তাদের কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। হাসান ভালো মতোই জানে যখন প্রয়োজন পরবে, তখনি তারা হাসানের সাথে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করবে। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করবে। হাসানও দুর্বল হয়ে আবারও তাদের ফাদে পা দিবে। কিন্তু প্রয়োজন ফুরালে তারা আগের মতোই হাসানকে ছুড়ে ফেলবে। তাইতো এবার হাসান সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর দুর্বল হবে না।
অন্যদিকে নোলকের বাবা মাও মারা গিয়েছে। ভাই ভাবি খোজ নেয় না। ওই শহর ছাড়ার আগে নোলকও যেয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে নিজের ভাগের অংশ বুঝে নিয়ে বিক্রি করে এসেছে। রাগে ক্ষোভে নোলকের ভাইও নোলকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এজন্য নোলকও তার নাম্বার পরিবর্তন করতে দ্বিমত প্রকাশ করে নি। কারণ তার নিজের বলতে এই স্বামী সন্তান ছাড়া আর কেউ নেই।

হাসান বাসার বারান্দায় বসে এতোক্ষণ এসব ই ভাবছিল।
প্রতিদিন রাতের অভ্যেস মতো আজ রাতেও নোলক দু কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসেছে । তারপর হাসানের পাশে বসে, একটি কাপ হাসানের হাতে দিয়ে বলল,” হাসান আমি জানি তোমার মন পুড়ে তোমার মাকে দেখার জন্য। আমি জানি এতো কিছুর পরেও তুমি তাকে ভালোবাসো। এজন্য আমি কোনোদিন তোমাকে বাধা দিই নি যে তুমি তোমার মায়ের সাথে দেখা করবে না। অবশ্যই করবে। আর তোমার তার প্রতি কিছু দায়িত্ব রয়েছে সন্তান হিসেবে, যেগুলো পালন করতে আমি কখনোই বাধা দিই নি তোমাকে। আমি শুধু চেয়েছিলাম আমি আর আমার বাচ্চারা যাতে বঞ্চিত না হই, আমাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ যাতে অন্ধকার নাই হয়। এর বেশি কিছু না। তুমি চাইলে যখন তখন তোমার মায়ের সাথে দেখা করে আসতে পারো।”

হাসান ম্লান হেসে বলল,” মাকে ভালোবাসি সত্যি, কিন্তু মায়ের প্রতি আর ওই ভক্তিটা নেই নোলক। ওই সম্মানটা আর মন থেকে আসে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি মায়ের নিজের সন্তানই না। নাহলে সে কিভাবে মা আমার মৃত্যু কামনা করলো! সেদিন মরতে মরতে বেচেছিলাম, আল্লাহ বাচিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু আমি এই জিনিসটা ভুলতেই পারছি না যে মা আমার মরণ চেয়েছিল। কোনো মা কি এটা চাইতে পারে নোলক? তার অহংকর এতো বেশি ছিল যে সে আর আশেপাশের কাউকে মানুষ ভাবতো না।
কি করি নি ওই পরিবারের জন্য, ওই পরিবারের মানুষ গুলোর জন্য? কিন্তু দিন শেষে সবাই নিজের স্বার্থ দেখল। আমি বোকা হয়ে পরে রইলাম।

জানো নোলক, শাহিনাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসতাম। আমার জীবনের প্রথম প্রেম। কিন্তু মা নিজের স্বার্থে আমাকে শাহিনার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। আমি বোকা মাথা পেতে নিয়েছিলাম মায়ের সিদ্ধান্ত। যেদিন সম্পর্ক ভাঙলাম, শাহিনা আমার পা ধরে কেদেছিল। কিন্তু আমি সায় দিই নি৷ কারণ আমার কাছে আমার মায়ের আদেশ সবার আগে ছিল। আর সেই মা ই আমার মরা মুখ দেখেতে চেয়েছিল। ভাবতে পারছো?”
“আমি কি বলব বলো। আমার নিজেরি তো এখন আর কেউ নেই এই তুমি আর আমার দুটো বাচ্চা ছাড়া। নিজের অধিকার বুঝে নেয়ার অপরাধে আমার ভাই আমার সাথে সম্পর্ক ভেঙেছে। দুনিয়ায় সবাই সবার স্বার্থ বুঝে হাসান।”
এভাবে স্বামী স্ত্রী চা খেতে খেতে তাদের দীর্ঘ আলাপ চালিয়ে গেল।

বিণুর সংসারে আর শান্তি নেই। বিনুর শ্বাশুড়ি আর ডিভোর্সি বোন তার বাচ্চাদের নিয়ে উঠছে তার এই শহরের বাসায়। এক বছর হলো।
তার ননদের বাচ্চারা যেয়ে দখল করেছে বিনুর বাচ্চাদের রূম। এখন অবস্থা এমন হয়েছে এক ঘরে চারটি বাচ্চা ঠেলাঠেলি করে ঘুমায়। বিমুর মেয়ের রূম দখল করেছে ওর ননদ। আর গেস্ট রূম ওর শ্বাশুড়ি। সারা বাসায় গাদাগাদি অবস্থা। বিনুর শ্বাশুড়ি গ্রাম থেকে আসায়, দেয়ালে দেয়ালে পানের পিক ফেলে। এসব দেখে বিনুর গা গুলিয়ে আসে। কিন্তু সব সময় কি আর চুপ করে থাকা যায়? আজ বিনু বাধ্য হয়ে তার ননদ ও ননদের বাচ্চাদের সব কাপড় চোপড় ফিকে বাসার বাহিরে ফেলে দিয়েছে। বিনু জানে আজ এটা নিয়ে বাসায় কেলেংকারী হবে। কিন্তু সে কোনোভাবেই নিজের সংসারে আর এদের সহ্য করবে না।
বিনুর ভাবনার মাঝেই বাহির থেকে চিল্লাচিল্লির আওয়াজ পেল। আর শাহেদ তার নাম ধরে ডাকছে। সাহস নিয়ে বিনু বের হল।

“কোন সাহসে আমার বোনের আর তার বাচ্চাদের কাপড় তুমি বাহিরে ফেলেছো” রাগান্বিত স্বরে বলল শাহেদ
‘যেই সাহসে তারা আমার বাচ্চাদের ঘর দখল করেছে, সেই সাহসেই। আর ভুলে যেও না এই বাসা বানাতে আমিও টাকা দিয়েছি। তোমার যেই ব্যবসা নিয়ে এতো বড়াই করো, ওটাও শুরু করেছো আমার বাপের বাড়ির টাকায়। বাড়িটাও কিন্তু অর্ধেক আমারি নামে। ভুলে যেও না।” তাচ্ছিল্য হেসে বলল বিনু
“না ভুলি নি। তোর এই বাড়ি আর ব্যবসায় থু মারি। যেই বাসায় আমার মা আর বোনের জায়গা হবে না, থাকব না সেখানে। টাকার লোভে পরে অনেক বছর ধরে তোর অত্যাচার সহ্য করেছি আমি। আর না। আমিও মানুষ।” বলল শাহেদ

“এই একদম তুই তুকারি করবে না। আমি তোমার স্ত্রী ভুলে যেও না। আর কোথায় যাবে তুমি? এই রকম দূঃসাহস দেখালে কিন্তু আমি নিজেও মরব আর সাথে তোমার বাচ্চা দুটোকেও শেষ করব। আর চিঠিতে তোমাকে আর তোমার মা-বোনকে দায়ী করব।
কাল সকালের মধ্যে যদি তোমার মা-বোন বাসা না ছাড়ে, তবে কালই আমি তোমাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলা দিব।
এখন ক্যাচাল না করে খেয়ে ঘরে এসো।” বলেই ঘরে চলে গেল বিনু।
অন্যদিকে বিনুর স্বামী কাউকে কিছু না বলেই বাসার বাহিরে চলে গেল।
ড্র‍ইং রূমে পরে রইলো বিনুর শ্বাশুড়ি আর ননদ। তারাও অবশ্য প্রথাগত শ্বাশুড়ি ননদের বিপরীত নয়। এতোদিন এ বাসায় ঘাটি বসাতে পারে নি কারণ বিনুর টাকায় এই বাড়ি আর ব্যাবসা। তাই বিনুর স্বামী নিজের মা বোনকে এখানে নিয়ে আসতো না। কিন্তু এবার কিছু গোপন কারণে সে তার মা বোনকে নিয়ে এসেছে। এই রহস্য বিণু জানে না। তারপরই লাগলো এই ঝামেলা।

ঘরের মধ্যে একা একাই বকবক করছে ফরিদা বানু। আজকাল তার মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। নিজেকে সে রানী হিসেবে কল্পনা করে আর এই বাসাটা হচ্ছে তার রাজ্য। তারজন্য একটি কাজের বুয়া রাখা হয়েছে। যার দায়িত্ব তিন বেলা তাকে খাবার দাবার দেয়া। গোসল অবশ্য ছুটির দিনে মিতু করিয়ে দেয়।
মাত্র টিউশন থেকে ফিরেছে মিতু। মাস্টার্স শেষের পর নিজের এলাকাতেই একটি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে ঢুকেছে। নিজেকে সে বদলেছে, নিজের ভুল গুলো বুঝেছে। পড়াশুনায় মন দিয়েছে। আর আজ সে ভালো চাকরি করছে। স্কুল, টিউশনির টাকা মিলিয়ে বেশ ভালোই একটি এমাউন্ট ইনকাম করে।
বাসায় আসতেই মিতুর কানে যায় মায়ের বকবকানি। কাধের ব্যাগটা রেখে একটি বাটিতে সামান্য পায়েশ নিয়ে ওতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে নেয়। তারপর মায়ের রুমে যায়। ফরিদা বানু মেয়েকে দেখেই হাসিমুখে বলে,” এসেছিস মা। দেখ না নতুন দাসীটা আমার ঠিক ভাবে সেবা করতে পারে না। ওই যে নোলক নামের একটা দাসী ছিল না। ওটা ভালো ছিল। তুই বরং ওকে নিয়ে আয়।’

মায়ের কথায় ম্লান হাসলো মিতু। মা আজকাল এসব আবল তাবল বকে। নোলক ভাবিকে নিজের চাকর ভাবে। অবশ্য মিতুরও নোলকের কথা খুব মনে পরে। সাতটা বছর ভাবি তাদের জন্য খেটেছে, বিনিময়ে তারা ভাবিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, ভাই-ভাবির সংসার ভাঙতে চেয়েছে। নিজের উপর ধিক্কার জাগে মিতুর।
মাকে পায়েশটা খাইয়ে দিল মিতু। কিছুক্ষণের মাঝেই ফরিদা বানু গভীর ঘুমে তালিয়ে গেলেন।
বিছানায় শুয়ে আছে মিতু। চোখের সামনে ভাসছে বিগত তিন বছরের প্রতিটি দিন। মায়ের অসুস্থতার শুরুর দিকে বড় ভাইকে অনেক খুজেছিল। কিন্তু পায় নি। অভিমান করে সে হারিয়ে গিয়েছে। এরপর দারস্থ হয় মেঝ ভাই আর ছোট ভাইয়ের। কিন্তু তারাও দায়িত্ব নিতে চায় নি। এমনকি কোনোদিন খোজও নেয় নি মা কেমন আছে। অন্যদিকে বিনু আপা,যার জন্য মা এতো করলো সেও মুখ ফিরিয়ে নিল। সব দিক থেকে প্রত্যাক্ষান পেয়ে একাই মাকে নিয়ে যুদ্ধে নেমে পরলো সে। বাড়ির ছোট আদুরে মেয়েটা হুট করে শক্ত নারীরে পরিণত হলো। তারপর থেকে একা হাতেই মাকে দেখছে সে।
আর বিয়ে? সেটা তার কপালে নেই। এরকম ভাঙা পরিবারে কে বিয়ে করবে। তাছাড়াও মিনুরও বিয়ের শখ নেই। ভালোবেসেছিল ওই একজনকেই। দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসার আর শক্তি নেই। জীবন যেভাবে চলছে চলুক না!

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৯

সকাল সকাল কারো চিৎকারের আওয়াজে ঘুম ভাঙে বিনুর। ধরফরিয়ে বিছায় উঠে বসে সে। পাশে তাকিয়ে দেখে শাহেদ নেই। কাল যে সে রুমে আসে নি তা বুঝেছে বিনু।
এদিকে ড্রয়িং রূমে চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ বেড়েই চলছে। বাধ্য হয়ে বিনু যায় বাহিরে। কিন্তু সামনে যা দেখে তা দেখে তার পায়ের তলের মাটি সরে যায়। ড্রয়িং রুমের ফ্যানটাতে ঝু*লছে শাহেদের মৃ*ত দেহ। সাথে সাথেই জ্ঞান হারালো বিনু।

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১১