নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১
ইলোরা ফারদিন
“আমার শাড়ি আমি দিব না”
হাসান অস্বস্তি নিয়ে বললো,” জেদ করো না নোলক, তোমার শাড়িটা বিনুকে দেও। আমি তোমাকে নতুন এনে দিব।”
“আপনি বরং আপনার বোনকে নতুন শাড়ি এনে দিন। আমি জানি এই শাড়িটা যদি আমি আজ দিয়ে দিই, পরে আর আমি নতুন শাড়ি পাব না। আপনার ওসব মিষ্টি কথায় অনেক ভুলিয়েছেন। বিনিময়ে আমি আজ পর্যন্ত কিছু পাই নি।” অশ্রু ভরা চোখে বললো নোলক
বিণু একটু ঢং দেখিয়ে বলল,” থাক ভাইয়া, দরকার নেই। আমি তো এখন পর এ বাড়ির। থাক ভাবি তোমার শাড়ি তুমি রাখো।”
এবার নোলকের শ্বাশুড়ি বলল,” এই হাসান, তোর বউকে বল আমার মেয়েকে এখনি ওই শাড়িটা দিতে। একটা শাড়ি নিয়ে এতো ছোটলোকি। ”
হাসান এবার রাগী কন্ঠে নোলককে বলল,” নোলক বেয়াদবি না করে শাড়িটা বিনুকে দেও। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে আরেকটি শাড়ি এনে দিব।”
” আরে রাখেন আপনার কথা। আমার বিয়ের গহনা গুলোই তো এখনো আপনার বোনের থেকে উদ্ধার করে দিতে পারেন নি। হ্যা শুনেন বিনু আপা, কালকের মধ্যে আমার সব গহনা ফেরত দিবেন। পুরো তিন ভরি ছিল। আমি যদি আমার গহনা কালজের মধ্যে না পাই তাহলে আমি নিজ দায়িত্বে কাল ছেলে পক্ষের সামনে বিচার দিব যে আপনি আমার গহনা চুরি করেছেন।” বলেই সবার মুখে ঝামা ঘষে নোলক নিজের শাড়িটা নিয়ে চলে গেল।
নোলকের কথায় সবাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। কারণ যেই মেয়ে সাতটা বছর কারো সামনে মাথাটা উচু করেও তাকায় নি, সেই মেয়ে নাকি আজ তাদের সাথে তর্ক করলো!
ফরিদা বানু তো চিন্তায় রীতিমতো ঘামতে শুরু করলো। তবে কি এখন বাড়ির কর্তী বদলের সময় চলে এসেছে। একা একা বিরবির করতে করতে সে নিজের ঘরে চলে গেল।
এদিকে বিনু হাত কচলাতে লাগলো। গহনা তো সব বিক্রি করে বাসার ছাদ দিয়েছে সে। আর বললেই হলো নাকি। সে কিচ্ছু দিবে না। হুশ হুশ করতে করতে সে নিজের ঘরে চলে গেল।
এদিকে বিনুর ছোট বোন মিনু তো চিন্তায় কেদে দিল। অনেক কষ্টে অয়নের মা বিয়েতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু বড় ভাবি যদি সত্যি সত্যি কাল অশান্তি করে তাহলে এবার নির্ঘাত বিয়ে ভাঙবে৷ টেনশনে সে কেদে দিল। হাসান বোনকে শান্তনা দেয়ার ভাষা পেল না। সেও ঘরে চলে গেল।
নোলক মিয়া বাড়ির বড় ছেলে হাসান মিয়ার স্ত্রী। বিয়ের সাত বছর চলছে। পাচ বছরের একটি মেয়ে ও দুই বছরের একটি ছেলে আছে। ওই যে সাত বছর আগে সে এ বাসায় বউ হয়ে এসেছে, তারপর থেকে সে মাথা নত করে চলছে। ছোট থেকেই শিখে এসেছে শ্বশুরবাড়ির কারো অসম্মান করা যাবে না, সবার কথা মেনে চলতে হবে, মানিয়ে চলবে হবে। তাই তো এই আটটা বছর গাধার মতো খেটেছে, সবার ফাই ফরমাশ মেনে চলেছে, ট্যু শব্দটাও করে নি। কিন্তু এর বিনিময়ে আজ পর্যন্ত কারো কোনো প্রশংসা পায় নি। উলটো ভুল ধরতে সবাই সর্বদা মরিয়া হয়ে থাকতো।
কিন্তু আজ। আজ থেকে নোলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে আর নিজের চাওয়া পাওয়া ছাড় দিবে না।
হাসানরা তিন ভাই, দুই বোন। হাসান আর ওর মেঝো ভাই রতনের বিয়ে হয়েছে। আর ছোট ভাই এখন বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। অন্যদিকে হাসানের ছোট বোন বিনুর বিয়ে হয়েছে পাচ বছর। আর কাল ছোট বোন মিনুর বিয়ে। সেই বিয়ে উপলক্ষেই হাসান সবার জন্য শাড়ি এনেছিল। যদিও নোলকের শাড়ির দাম বিনুর শাড়ির চেয়ে কম, তবুও বিনুর নজর পরে নোলকের শাড়ির উপর। আর সে থেকেই কথা কাটাকাটি
হাসান ঘরে ঢুকেই দেখে নোলক বাচ্চাদের ঘুম পারাচ্ছে। সে বিরক্তি নিয়ে বললো, ” সামান্য শাড়ির জন্য এতো কাহিনী না করলেও পারতে। যাও চুপচাপ বিনুকে শাড়িটা দিয়ে দেও।”
” বললাম তো দিব না। আর তোমার বোনকে বলেছো তো আমার গহনা ফিরিয়ে দিতে?”
” গহনার আলাপ কোথা থেকে আসছে নোলক? বিনু কি বাহিরের কেউ? ও কাছে থাকা আর তোমার কাছে থাকা তো একি ব্যাপার। ”
“একি ব্যাপার না। আমার গহনা আমি ফেরত চাই।” বলেই নোলক শুয়ে পরলো।
এদিকে নোলকের এরূপ পরিবর্তনে অবাক হলো হাসান।
সকাল ছয়টা বাজে। এ সময় প্রতিদিন নোলক ফরিদা বানুকে চা দিয়ে যায়। কিন্তু আজ নোলক এখনো চা আনছে না দেখে অবাক হলেন ফরিদা। হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে দেখলেন হাসানের ঘরের দরজা লাগানো। লাজ লজ্জা সব ভুলে রাগের মাথায় যেয়ে হাসানের ঘরের দরজা চাপড়াতে লাগলেন, চেচিয়ে বলতে লাগলেন
” কি রে নবাবজাদি, এখনো ঘুম শেষ হয় না তোর। আজকে কি না খাইয়ে রাখবি আমাদের। বের হ এখনি ঘর থেকে। বিয়ের সাত বছর পরেও তোর জ্বালা কমে না। এতক্ষণ ঘরে শুয়ে থাকা লাগবে তোর। খিদায় আমি মরতেছি।”
মায়ের চেচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল হাসানের। মায়ের সব কথা শুনলো সে। অবাক হচ্ছে মা কি করে বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে এতো বিশ্রী কথা বলছেন। তাই তাড়াতাড়ি নোকলকে ডাকতে গেলে
নোকল পাশ ফিরেই বলে উঠলো, ” খবরদার আমাকে এখন বিরক্ত করবেন না। বাড়িতে আরেকজন বউ আছে এখন। তাই সব দায়িত্ব আমি একা নিব কেন? যান আপনার ভাইয়ের বউকে বলেন সকালের নাস্তা বানাতে।”
বলে আবারও শুয়ে পরলো নোলক
অন্যদিকে হাসান বুঝলো নোলক ভুল বলে নি। বিয়ের পর থেকেই রতনের বউ পায়ের উপর পা দিয়ে বসে খায়। আর সারাদিন বাসায় খাটে মরে নোলক। কিন্তু এ কথা মাকে কি করে বলবে সে কিংবা ভাইয়ের বউকেই বা কি বলবে….
