Home পারমিতা পারমিতা পর্ব ৪৫

পারমিতা পর্ব ৪৫

পারমিতা পর্ব ৪৫
Nabila Ahmed

২ মাস পর।
খাটের উপরে বসে আছেন মায়া চৌধুরী। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। তাকিয়ে আছে নিজের হাতে থাকা ছবির ফ্রেমটির দিকে। ছবিতে ছোটবেলার আফরিন আর মিতাকে দেখা যাচ্ছে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে। দু জনের মুখেই বিশাল হাসি।
–মা?
মায়া চৌধুরীর কাঁধে হাত রেখে পেছন থেকে ডাক দিয়ে উঠে আফরিন।
আফরিনের ডাক শুনে ফিরে তাকায় মায়া চৌধুরী। আফরিনের সাথে চোখাচোখি হতেই চোখের পানি যেন দ্রুত গতিতে পড়তে শুরু করেছে।

–নিজেকে একটু সামলাও মা, তা না হলে তুমি যে অসুস্থ হয়ে পড়বে।
মায়া চৌধুরীর পাশে বসতে বসতে বলে আফরিন।
–আমাকে কোন পাপের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে? প্রথমে তোকে নিয়ে এরপর মিতাকে নিয়ে।
কাঁদতে কাঁদতে বলেন মায়া চৌধুরী।
–এভাবে বলো না মা! উপরওয়ালার পরীক্ষা সব কিছুই।
নিজের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলে আফরিন।
–আর কত পরীক্ষার সম্মুখীন হবো আমি? আর কত ধৈর্য্য ধরলে আমার মিতা আমার কাছে ফিরে আসবে?
কাঁদতে কাঁদতে বলেন মায়া চৌধুরী। নিজের হাত দিয়ে ছবির ফ্রেমটি শক্ত করে ধরে রেখেছেন তিনি।
–জানিনা মা, কিছুই জানিনা।
মায়া চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বলে আফরিন।
মায়া চৌধুরী আর কিছু বললো না। আফরিনের কাঁধে মাথা রেখেই চুপ করে রইল। আফরিনও কিছু না বলে কিছুটা ভাবতে লাগলো। ক্ষণিকেই যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়লো আফরিন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাত ১১ টা ৩০ মিনিট।
ব্লাক কালারের গাড়ি থামে চৌধুরী মেনশনের সামনে। চাবি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসে অরিয়ন। কালো রঙের স্যুট প্যান্ট পরা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গজিয়েছে। চোখের নিচে কালো দাগ, মনে হচ্ছে কতরাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে তার ঠিক নেই। মুখে ক্লান্তির ছাপ পড়েছে। ডান হাতে মাঝারি সাইজের একটা বক্স ও শপিং ব্যাগ।
চৌধুরী মেনশনের সবাই ঘুমিয়ে আছে। পুরো বাড়ি অন্ধকার। অরিয়নের গাড়ির শব্দ পেতেই একজন কাজের লোক তড়িঘড়ি করে এসে বাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায়। শায়লা ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
–স্যার খাবার গরম করে দিবো?
অরিয়ন ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই বলে উঠে শায়লা।
–না।
হাটতে হাটতে জবাব দেয় অরিয়ন।
শায়লা আর কিছু না বলেই খাবার গুলো ঢেকে নিজের রুমে ঘুমাতে চলে যায়।

সরাসরি নিজের রুমে গিয়ে ঢুকে অরিয়ন। দরজা লক করেই বেডের কাছে গিয়ে হাতের বক্স ও শপিং ব্যাগ বেডের উপরে রাখে। পরণের স্যুট আর টাই খুলে বিছানার উপর রাখে। আলমারি থেকে নিজের জন্য একসেট কাপড় বের করে ফ্রেশ হতে চলে যায় অরিয়ন।
তোয়ালে হাতে ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে আসে অরিয়ন। পরণে সাদা রঙের টি শার্ট ও ট্রাউজার। তোয়ালে দিয়ে নিজের ভিজা চুল মুছতে মুছতে এসে দাঁড়ায় বেডের সামনে। বেডের উপর থাকা ব্যাগের উপর চোখ যায় অরিয়নের। ক্ষণিকেই তোয়ালে থাকা হাতটা যেন স্থির হয়ে রইল। এক নজরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ব্যাগটার দিকে। ধীরে ধীরে নিজের হাতে থাকা তোয়ালে ছুড়ে কাউচের উপর রাখে অরিয়ন। গিয়ে বসে বেডে। বেড সাইডের টেবিলের উপর থাকা ছবির ফ্রেমটা হাতে তুলে নেয়। এক দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে অরিয়ন। ছবিটা কে তুলেছে অরিয়ন জানে না। শুধু জানে ছবিটা অরিয়ন আর মিতার বিয়ের দিনের ছবি। ছবিতে স্টেজে মিতা আর অরিয়ন বসে আছে, দুজনের মুখেই মিথ্যে অভিনয়ের হাসি। বউ রূপে থাকা মিতাকে সেদিন কতটা অপরূপ লেগেছিলো তা একবারের জন্যও খেয়াল করেনি অরিয়ন। কিন্তু এখন? এখন মনে হচ্ছে নিজের সব থেকে সুন্দর একটা মুহূর্ত নষ্ট করে ফেলেছে অরিয়ন।

–খুব ভালো আছিস আমাকে ছাড়া, তাই না?
ছবিতে থাকা মিতার দিকে তাকিয়ে অভিমানের সুরে প্রশ্ন করে অরিয়ন।
–কিন্তু তোর রিয়ন একটু ও ভালো নেই তোকে ছাড়া।
নিজেকে নিজে বলে অরিয়ন। কথাটা বলতেই যেন কণ্ঠ ভারী হয়ে আসলো অরিয়নের।
–তোকে ভালো না বেসেও তোর কাছে দেওয়া কথা আমি রেখেছিলাম, বলেছিলাম তোর প্রতি লয়াল থাকবো আর তাই ছিলাম। আফরিন ফিরে আসার পরও ওর দিকে আমি তাকাইনি। আর তুই?
কথাগুলো নিম্নস্বরে বলে অরিয়ন। ইচ্ছে করেই বললো নাকি গলা ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে এমন শোনা যাচ্ছে তা বুঝা মুশকিল।

–তুই বলেছিলি তুই আমাকে কখনো ছেড়ে যাবিনা। বলেছিলি তুই আমাকে সব সময় ভালোবাসবি। কী হলো তার?
কথাগুলো বলতে বলতেই অরিয়নের চোখ থেকে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে মিতার ছবিতে।
–আর যখন তোকে ভালোবেসে নিজের করতে চাইলাম, তুই মিথ্যে আশা দেখিয়ে চো*রের মতো পালিয়ে গেলি।
ছবির ফ্রেমটা শক্ত করে ধরে বলে অরিয়ন। যেন ছবিতে থাকা মিতাকেও পালিয়ে যেতে দিবে না অরিয়ন।
–যার সাথে পালিয়েছিস তার সাথে খুব ভালো আছিস তাই না?
দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে অরিয়ন। এতোক্ষণ অরিয়নের কন্ঠে ফুঁটে উঠা অভিমান বা দুর্বলতা যেন ক্ষণিকেই সরে গেল। ভেসে উঠেছে গাম্ভীর্যতা। কথাগুলো কর্কশ লাগছে শুনতে।
–ভালো থেকে নে। যতোদিন পারিস ভালো থেকে নে।
মৃদু হাসি দিয়ে বলে অরিয়ন।

–তোর আশিকের র*ক্তে তোকে গোসল করিয়ে, পবিত্র করেই বাড়িতে নিয়ে আসবো।
কথাটা বলতেই হাসি সরে যায় অরিয়নের মুখ থেকে।
–বাই দা ওয়ে, শুভ জন্মদিন মাই লাভ।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি এক হাসি দিয়ে বলে অরিয়ন।
–তোর জন্য কী এনেছি দেখ!
খাটের উপর থাকা বক্স হাতে নিতে নিতে বলে অরিয়ন।
মিতার ছবিটা বালিশের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করায় অরিয়ন। অতি আগ্রহ নিয়ে বক্স খুলতেই বেরিয়ে আসে ছোট একটা কেক। যেখানে সুন্দর করে লিখা ” HAPPY BIRTHDAY, MY LOVELY WIFE”।
–তুই নেই বলে কি তোর জন্মদিন ভুলতে পারি আমি? কোনদিন কী ভুলেছি? এবারও ভুলিনি।
কেকটা মিতার ছবির দিকে এগিয়ে রেখে বলে অরিয়ন।

নিজে নিজে কেক কাটে অরিয়ন। ছবিতে থাকা মিতার দিকে এক পিস কেক এগিয়ে দেয় অরিয়ন।
–মনে আছে তোর? গত বছর আমার কাছে বায়না ধরেছিলি একটা ডায়মন্ডের নেকলেসের জন্য?
কথাটা বলে একটু থামে অরিয়ন। কেকের পিসটা আবারও নিজের যায়গায় রেখে দেয়।
–আর তোর প্রিয় অনিয়ন তোকে সেটা দিয়েছিলো, তোর ১৮তম জন্মদিনে। মনে আছে তোর?
–এবার ও স্পেশাল গিফট চাই তাই না?
অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলে অরিয়ন।
–নিয়ে এসেছি তো, তোর রিয়ন তোর জন্য স্পেশাল গিফট নিয়ে এসেছে।
কথাটা বলেই শপিং ব্যাগটা খুলে অরিয়ন।

–টাডা…
কথাটা বলেই শপিং ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করে ছবিটার সামনে ধরে অরিয়ন।
–এটা কী এনেছি সেটা ভাবছিস তাই তো?
ভ্রু কুঁচকে বলে অরিয়ন।
–এটা হচ্ছে দড়ি।
বিশাল এক হাস দিয়ে বলে অরিয়ন।
–আমি ও কী বোকা! এটা কি সেটা তো তুই জানিস ই। কেন এনেছি সেটাই ভাবছিস তাই তো?
নিজের মাথায় নিজের হাত দিয়ে থাপ্পড় মে*রে বলে অরিয়ন।
–এটা তোর নতুন নেকলেস।এটা দিয়ে তোকে বেঁধে রাখবো, যেন কখনো চাইলেও আমাকে ছেড়ে যেতে না পারিস… তোর ধোঁকায় একবার পা দিয়েছি সেই ভুল আর দ্বিতীয় বার করছি না আমি।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে অরিয়ন। মুখ থেকে হাসি বা অভিমান সব সরে গিয়ে শুধুই গাম্ভীর্যতা প্রকাশ পাচ্ছে।
–এবার আমার থেকে তোকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, কেউ না৷ তুই নিজেও না।

কথাটা বলে মিতার ছবির পাশে থাকা বালিশে মাথা রাখতে রাখতে বলে অরিয়ন।
–শুধুমাত্র একটা সুযোগের অপেক্ষায়। শুধুমাত্র একবার জানতে পারলেই হচ্ছে কোথায় আছিস তুই।
বিরবির করে বলতে বলতে মিতার ছবিটা নিজের বুকে চেপে ধরে অরিয়ন।
–তোকে ফিরিয়ে আনবোই, ফিরিয়ে আনবোই। YOU WILL BE MINE. YOU WILL BE MINE ONLY.
বিরবির করে বলতে বলতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসে অরিয়নের।

আরও ৪ মাস পর।
–কী বা*লের ডিটেকটিভিটি করেন আপনারা? ১৯ বছরের একটা মেয়ের সন্ধান বের করতে পারছেন না!
রাগান্বিত অরিয়ন টেবিলের উপর রাখা ফাইল ছুড়ে ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে।
–আমরা আমাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি কিন্তু ম্যামকে খুজে বের করার কোনো রাস্তাই খোলা নেই।
জবাব দেয় ৪৮ বছরের এক মধ্য বয়স্ক লোক।
–এই কথা আরও ৬ মাস আগে থেকে শুনে আসছি আমি। আমাকে নতুন কিছু শুনান।
বিরক্তি প্রকাশ করে বলে অরিয়ন।
–নতুন কিছু শুনানোর মতো কোনো খবর নেই স্যার। আমরা কোনো ভাবেই সফল হতে পা..
–চুপ থাকুন।

চেঁচিয়ে উঠে অরিয়ন। দু কদমে এগিয়ে যায় লোকটির সামনে। ভয়ে কাচুমাচু করতে থাকে বয়স্ক লোকটি।
–আপনি বয়সে আমার থেকে বড়, তা ভুলে যাওয়ার আগেই আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যান। না হয়…না হয় আমি কি করে বসবো ইউ হেভ নো আইডিয়া
দাঁত কিরমির করে বলে অরিয়ন। অরিয়নের কথা শেষ হতেই তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বেরিয়ে যায় লোকটি।
নিজের অফিস রুমে দাঁড়িয়ে আছে অরিয়ন। মিতার খবর নেই ৬ মাস হয়ে গেছে। এই ৬ মাস অরিয়ন কীভাবে প্রতিটা দিন পার করেছে তা একমাত্র অরিয়ন নিজেই জানে। যতো দিন যাচ্ছে ততোই ইচ্ছে করছে মিতাকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার। ডিটেকটিভ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। ১৯ বছরের একটা মেয়ে কীভাবে সব কিছু এভাবে সাজিয়েছে তা মাথায় ঢুকছে না অরিয়নের।
–তোকে আমি খুজে বের করবোই, খুজে বের করবোই।
রুমের মধ্যে পায়তারা করতে করতে বলে অরিয়ন।
–আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না তুই, শুনতে পারছিস? আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না। ছেড়ে যেতে দেবো না আমি।
অরিয়নের কন্ঠে শুধু বেকুলতা প্রকাশ পাচ্ছে। ক্ষণি চেচামেচি করছে তো ক্ষণি চুপ করে থাকছে।

কিছুক্ষণ পর।
চেয়ারে বসে টেবিলের উপর মাথা রেখে বসে আছে অরিয়ন। ডিটেকটিভ যাওয়ার পর থেকে এভাবেই বসে আছে। নিজেকে আজ বড়ই অসহায় মনে হচ্ছে। এতো টাকা পয়সা কোনো কিছুই যেন মিতাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারছে না। রুমের মধ্যে সব কিছু এলোমেলো ভাবে পরে আছে। পরিষ্কার করতে আসলেও অরিয়নের ভয়ে রুমে থাকার সাহস করেনি কাজের লোক।
দরজা খোলার শব্দ শুনতেই চোখ মেলে তাকায় অরিয়ন। সাথে সাথেই বিগরে যায় মেজাজ।
— Get out.
মাথা তুলে তাকানোর আগেই চেচিয়ে উঠে অরিয়ন।

সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আফরিন। পড়নে সাদা রঙের থ্রি পিস। ওড়না গলায় ঝুলছে। চুলগুলো ছাড়া। আফরিনও যে মিতাকে ছাড়া খুব ভালো নেই তা আফরিনের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। অরিয়ন মাথা তুলতেই দেখতে পায় দাঁড়িয়ে থাকা আফরিনকে। আফরিনকে দেখে কিছু বললো না। নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। আফরিন রুমটা একবার ভালোভাবে দেখে নিলো। ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়।
অরিয়নের অপজিটে থাকা চেয়ার টেনে বসে আফরিন। এবার আফরিনের দৃষ্টি শুধুমাত্র অরিয়নের দিকে। খুব ভালো করে লক্ষ্য করছে অরিয়নকে। এভাবে অরিয়নকে দেখেই বুকের মধ্যে যেন চিনচিন করতে শুরু করলো আফরিনের।
আফরিন চেয়ারে বসতেই আবারও আফরিনের দিকে তাকায় অরিয়ন।

–কেন?
হুট করেই বলে উঠে আফরিন।
আফরিনের কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না অরিয়ন। ভ্রু কুঁচকে তাকায় আফরিনের দিকে। কী বলতে চাচ্ছে বোঝায় চেষ্টা করে।
আফরিনও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে অরিয়নের দিকে।
–কেন আমাকে ভুলতে পারলে আর মিতাকে পারছো না?
প্রশ্ন করে আফরিন। ক্ষণিকের জন্যও চোখ সরছে না আফরিনের।
অরিয়ন অবাক হয়ে আফরিনের দিকে তাকিয়ে রইল। “তাই তো!” মনে মনে ভাবে অরিয়ন। কী জবাব দিবে জানেনা। শুধু জানে এমনটা আর কখনো অনুভব করেনি অরিয়ন।
–কেন আমার পালিয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারলেও মিতার পালিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছো না?
আবারও প্রশ্ন করে আফরিন।

অরিয়ন এক দৃষ্টিতে বড় বড় চোখ করে আফরিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মিতার পালিয়ে যাওয়ার কথাটা শুনতেই চোখমুখ কঠোর হয়ে যায়। যেন এই বাস্তবতাটা মানতেই পারছে না অরিয়ন।
–কেন এভাবে আমাকে ভালোবাসতে পারলে না?
করুণ সুরে বলে আফরিন। আফরিনের চোখ ভিজে এসেছে। আজ কথাগুলো না বলে আর থাকতে পারলো না আফরিন। মন যে কোনো ভাবেই মানতে চায় না। মানতে চায় না,অরিয়ন মুভ অন করে নিয়েছে। এতো সহজে আফরিনকে কেনই ভুলে গেল? কেন একই অরিয়ন দুটি মানুষকে দুভাবে ভালোবাসলো তা জানতে খুব ইচ্ছে করছে আফরিনের।

না, আফরিন অরিয়নের কাছে ফিরে যেতে চায় না। শুধু চায় কিছু প্রশ্নের জবাব। যেন নিজের মনকে বোঝাতে পারে সে কারও থেকে কম নয়। সেও ভালোবাসার যোগ্য। সেও এরকম ভালোবাসার যোগ্য।
অরিয়ন অসহায়ের মতো আফরিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আফরিনের চোখের কোণের পানি ঠিকি দেখতে পারছে অরিয়ন। হঠাৎ করেই রাগ হচ্ছে অরিয়নের। নিজের উপর। কেন হচ্ছে জানেনা। কিছুই জানেনা। শুধু জানে মিতাকে ওর চাই। মিতার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেলেও মিতাকে ওর চাই। মিতার বিয়ে হয়ে যদি বাচ্চাও হয়ে যায় তাও মিতাকে অরিয়নের চাই। কোনো কিছুই যেন মিতাকে ভুলে যাওয়ার খেয়াল মাথায় ঢোকাতে পারছে না অরিয়নের।
–আমি জানিনা, আমি জানিনা।

অধৈর্য্য অরিয়ন নিজের চুল টেনে ধরে চেঁচিয়ে উঠে।
–আমি কিছুই জানিনা। আমি শুধু জানি, আমি এমনটা আর কখনো অনুভব করিনি। আমি ওকে ভুলতে পারছি না।
চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলে অরিয়ন।
–আমাকে ক্ষমা করো। যদি তোমার সাথে আমি অন্যায় করে থাকি তবে আমাকে ক্ষমা করো, আফরিন।
আফরিনের দিকে মাথা নিচু করে বলে অরিয়ন।
ভালোবাসায় তো জোর খাটে না। তাই বলে আফরিনকে অযোগ্য বলেও প্রমাণ করতে চায় নি অরিয়ন। কেন সব এমন উলোটপালোট হয়ে গেল বুঝতে পারছে না।
–হয়তো তুমি….

কথাটা বলতে গিয়েও চুপ হয়ে রইল আফরিন।
নিজের এক হাত দিয়ে অন্য হাতের নখগুলো খুটিয়েই যাচ্ছে।
দাঁড়িয়ে থাকা অরিয়ন সবটাই লক্ষ্য করছে। আফরিনের এটা ছোটবেলার অভ্যাশ। নার্ভাস হলেই হাত দিয়ে নখের উপর অত্যাচার চালায়।
–হয়তো তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোই বাসোনি।
মাথা নিচু করা আফরিন আস্তে করে বলে উঠে। অরিয়ন সবটাই শুনেছে।
–আফরিন…
অবাক হয়ে বলে অরিয়ন।
“কী বলছে আফরিন এসব? ভালোবাসিনি?”
–হয়তো আমি তোমার সেই বন্ধু ছিলাম, যার প্রতি লয়াল থেকে বাকিটা জীবন তো পার করা যায় কিন্তু তার দূরত্ব তোমাকে ততোটা ব্যাকুল করতে পারেনা, যতোটা ব্যাকুল জীবনসঙ্গিনী হারালে হয়।
মাথা নিচু থাকা অবস্থায় বলে আফরিন।
–হয়তো মিতাই তোমার সেই জীবনসঙ্গিনী।
মাথা তুলে অরিয়নের দিকে তাকিয়ে বলে আফরিন।
আফরিনের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

অরিয়ন কিছু বললো না। আফরিন যে, একেবারে ভুলও বলেনি তা বুঝতে পারছে অরিয়ন।
–I am so sorry, I am so sorry.
চেয়ারে গিয়ে বসতে বসতে বলে অরিয়ন।
অরিয়নের চোখেমুখে অপরাধবোধ ফুঁটে উঠেছে। কী জন্য জানেনা।
–এমনটা কখনো ভেবেনো যে, তুমি আমার সাথে অন্যায় করেছো। তোমার সাথে কাটানো ৬ টা বছর তুমি আমাকে সেভাবেই সম্মান দিয়েছো যেভাবে আমি তার প্রাপ্য ছিলাম। তোমাকে দেখেই এতোকিছুর পরও আমি ছেলেদের বিশ্বাস করতে পারছি, আফনান।
চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে আফরিন।
–তোমার মতো ছেলেদের দেখেই মেয়েরা ভালোবাসতে শিখে।
মৃদু হেসে বলে আফরিন।
–আমি চাই তুমি আর মিতা খুব ভালো থাকো। কখনো আমাকে দেখে যেন তোমার মন খারাপ না হয় অথবা তোমাকে দেখে আমার মন খারায় না হয়,সেই জন্যই সব কিছু ক্লিয়ার করতে এসেছি আমি।
–বন্ধু হিসেবে সব সময় আমাকে তোমাদের পাশে পাবে।

পারমিতা পর্ব ৪৪

কথাটা বলতে বলতেই উঠে দাঁড়ায় আফরিন।
অরিয়ন আফরিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অবাক হয়ে। বন্ধু হিসেবে অথবা এক সময়ের প্রেমিকা হিসেবে ভুল মানুষকে বাছাই করেনি ভেবেই। আফরিনের প্রতি সম্মান যেন হাজারগুন বেড়ে গেল অরিয়নের।
–আজ যাই।
বলে আফরিন।
–ধন্যবাদ তোমাকে। আমাকে এতোটা বুঝার জন্য।
বলে অরিয়ন।
আফরিন কিছু বললো না। আলতো করে এক হাসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

পারমিতা পর্ব ৪৬