পূর্ণতা পর্ব ২৫

পূর্ণতা পর্ব ২৫
নন্দিনী নীলা

আশালতা বেগম সোফায় বসে আছে। তার সামনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে দিদান। আশালতা বেগম দিদান কে বসার ঘরে ডেকে চুপ করে বসে আছে। আর দিদান মাথা নিচু করে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মুখে কথা নেই কারোর ই। দিদান আড়চোখে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। আশালতা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“ শ্বশুর বাড়ি তো ভালোই আরাম আয়েশ করে থাকতে ছিলে হঠাৎ ফেরত আসলে কেন?”

দিদান চকিতে তাকাল মায়ের দিকে। মা জানল কি করে আমি শ্বশুর বাড়ি থেকেছি। দিদান শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করতে লাগল।
“ তুমি জানলে কি করে আমি শশী দের বাড়িতে থেকেছি?”
“ আমার খোঁজ নিয়ে জানার সময় নেই। পাড়া প্রতিবেশীর আলোচনার প্রধান ব্যক্তি তুমি তাই জানতে পেরেছি।”
“ আমাকে ক্ষমা করে দাও আম্মু।” নিচু স্বরে বলল দিদান।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ কোন ভুলের ক্ষমা চাচ্ছ তুমি? একটা মেয়ের জীবন কষ্ট করা, নাকি ঠকানোর ক্ষমা? নাকি একটা মায়ের বিশ্বাস ভাঙার ক্ষমা? নাকি ঘরে ব‌উ থাকতে আরেক মেয়ের সাথে দীর্ঘদিন সম্পর্ক রেখে তাকে লুকিয়ে বিয়ে করা ক্ষমা? আমি তোমাকে কোন ভুলে ক্ষমা করব বলো তো?”
দিদান নিচু হয়ে আবার মায়ের পা ধরতে চাইল। আশালতা বেগম পা সরিয়ে বলল,“ আমার পা ধরতে আসবে না মুখে বলো যা বলার।”

“ আমি অনেক অপরাধ করেছি। কিন্তু তুমি তো মা তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে আমি কোথায় যাব বলো?”
“ কেন তোমার কি যাবার জায়গার অভাব? কোটিপতি শ্বশুর বাড়ি পেয়েছ সেখানে যাও।”
অসহায় মুখ করে তাকাল দিদান মায়ের দিকে।
তারপর বলল,“শশী এবং ওর পরিবারের অত্যাচারে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি মা ওখানে আমি আর ফিরে যেতে চাই না।”

“ মা হয়ে তো ফেঁসে গেছি মন নরম হয়ে ওঠে ক্ষমা করতে ইচ্ছে করে। তোমাকে বাসায় আমি জায়গা দেব ঠিকি কিন্তু তোমার অপরাধে কোন ক্ষমা তুমি পাবে না। যাও ভেতরে যাও।”
দিদান মায়ের দিকে অসহায়ত্বের চোখে তাকিয়ে থাকে। তারপর একটা ব্যথিত নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমে যায়। রুমে ঢুকে খুব অবাক হয় ওর জিনিস দিয়েই ভর্তি। নিজের চিরচেনা বিছানায় গা এলিয়ে দেয় এরপর।
ঘুম ভাঙতেই দিদান পেটে খিদের জ্বালা অনুভব করে। খাবার খাওয়ার কথা বললেন আশালতা বেগম কিছুই বললেন না।

দিদান মাথা নিচু করে অন্যদিকে চলে যায়। দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে দিদান সকালে খেয়েছিল আর কোন দানা পেটে পরেনি তাই এখন প্রচুর খিদে পেয়েছে ওর। ও নিজে বেড়ে খাবার খেয়ে বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে যায়।
মহল্লায় সবাই ওর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে ছিল যেন ও মানুষ না কোন জীব জন্তু। দিদান সবার উল্টোপাল্টা প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হয়ে বাসায় ফিরে আসে।
এদিকে রাতে দিদান ড্রয়িংরুমে টিভি দেখছিল বসে,মায়ের ডাকে তার রুমে যায়। আশালতা বেগম ছেলেকে কাছে ডেকে বলে,“ বস।”

দিদান খাটের কোনায় বসে আশালতা বেগম আলমারি খুলে পূর্ণতা কে দেওয়া টাকা বের করে। যেটা পূর্ণতা চলে যাবার দিন আশালতার হাতে দিয়ে গিয়েছিল।
দিদান পূর্ণতার জিনিস মায়ের হাতে দেখে চমকে উঠে।
বিস্মিত কন্ঠে বলে,“ এসব তোমার কাছে কেন?”

“ পূর্ণতা কিছুই নেয়নি সব আমাকে দিয়ে গেছে।
”নেয়নি কেন? এসবের জন্য কম ঝামেলা তো করেনি।”
“ এসব নেওয়ার বুদ্ধি আমিই ওকে দিয়েছিলাম তোকে শায়েস্তা করতে।”
“এসব তোমার প্লান ছিল?”
“ হুম। এসব ফেরত নিয়ে ব‌উ নিয়ে সংসার করে খা। অভাব এসে ধরা দিলে মানুষ চেনা যায় তুই নিশ্চয়ই মানুষ চিনতে পেরেছিস? এখন এটা তোর প্রয়োজন তাই ফিরিয়ে দিলাম।”

“ আমার এসব আর লাগবে না। আমি আবার বিদেশে চলে যেতে চাই তুমি আমাকে সেটাতে সাহায্য করো।”
আশালতা বেগম দিদানের হাতে টাকা দিয়ে বলল,“ যা ইচ্ছা কর আমার সামনে থেকে যা এসব নিয়ে।”
দিদান মায়ের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখে টাকা বিছানার উপর রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল‌। আশালতা বেগম টাকার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

দুইদিন পর আয়রার বিয়ের অনুষ্ঠান। আয়রা কে ওর বাবা মা নিজের বাড়ি নিয়ে গেছে। মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠান নিজের বাড়িতেই করতে চায়। নাতনিকে নিজে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে ইচ্ছে ছিল নিজের বাড়ি থেকে বিদায় করতে। কিন্তু বাবা মায়ের ও তো শখ আহ্লাদ আছে। তাই তিনি আর মানা করেননি। পূর্ণতা কে ছাড়া খালি হাতে ফিরে তিনি ফাঁকা বাড়িতে একাই আছেন। এখন দিদান আর তিনি‌।

দিদান মায়ের ঘৃণা দৃষ্টি আর সহ্য করতে পারছে না। এদিকে গতকাল থেকে শশীর অসংখ্য কল আসছে। শশীর যন্ত্রণায় দিদান ফোন অফ করে রাখছে। দিদান সোফায় মাথা হেলিয়ে বসে আছে তখনি কলিং বেল বেজে উঠল। দিদান ওভাবেই বসে আছে। আশালতা বারবার কলিং বেল বাজার শব্দে বেরিয়ে দেখেই দিদান চোখ বন্ধ করে বসে আছে। তিনি দরজা খুলতেই শশী এবং সাথে পুলিশ দেখতে পায়।
আশালতা বেগম চমকে উঠে তাদের জিজ্ঞেস করতে লাগে,“ কেন এসেছে?”

শশী বলে উঠে,“ আপনার ছেলের নামে আমি নারী নির্যাতনের মামলা করেছি। ওই কাপুরুষ কে আমি জেলে হাজতে পাঠিয়ে ছাড়ব কত বড় সাহস ওর ও আমার গায়ে হাত তুলে এখানে এসে আয়েশ করেছ।”
রাগে শশী কাঁপছে। আশালতা বেগম কি বলবেন বুঝতে উঠতে পারছে না স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে শশীর দিকে। এদিকে দিদান শশীর আওয়াজ পেয়েই চোখ তাকিয়েছে। শশীর কথা শুনে রেগে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
দুই পা এগিয়ে আসতেই শশী নিজের কাঁধের হাতের নীল হয়ে যাওয়া আঘাত আশালতা বেগম কে দেখিয়ে বলে সমস্ত ঘটনা। সব শুনে আশালতা বেগম রাগে ক্ষোভে এগিয়ে এসে দিদানের গাল বরাবর ঠাস করে চর মেরে বসে।

আর চিৎকার করে বলে,“ নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেও তাকে তুই নির্যাতন করছিস? ব‌উ পিটাচ্ছ তুই এই কুলাঙ্গার আমার পেট থেকে বের হয়েছে ভাবতেই আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। জন্ম নিতে কেন তোকে আমি গলা টিপে হত্যা করিনি। এই দিন দেখার জন্য কি আমি বেঁচে আছি। আল্লাহ আমার মরন হয়না কেন?”
দিদান কে এলোপাথাড়ি থাপ্পর দিতে লাগল আশালতা বেগম। এই ছেলের জন্য আর কত তাকে সাফার করতে হবে। আর এসব নিতে পারছেন না তিনি। দুহাতে মুখ চেপে ধরে তিনি বসে কাঁদতে লাগলেন। পুলিশ দিদান কে ধরে নিয়ে গেলেন। শশী পৈশাচিক আনন্দের সাথে চলে গেল।

পূর্ণতা আর স্মরণ পাশাপাশি বসে আছে। পূর্ণতা অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে এখন বসে আছে। কান্না থামাতে পারলেও এখনো থেকে থেকে ঠুকরে উঠছে। স্মরণ পূর্ণতাকে নিজের পকেটে থেকে রুমাল বের করে দিল। পূর্ণতা নিজের ওরনা দিয়েই চোখমুখ মুছে বসে আছে।
স্মরণ নিজের রুমাল বের পকেটে ঢুকিয়ে বলল,“ তোমার আশিক কোথায় বলো তো। কার বিরহে তোমার চোখে এতো অশ্রু?”

“ কারো বিরহে না।”
“ দেখো তোমার ব্রেকাপ হয়েছে আমি বুঝে গেছি। নাহলে এতো কাঁদতে না। খুব বেশিই ভালোবাসতে তাই না? মেয়েদের এই এক ভুল এরা ভুল জায়গার ভালোবাসা দেখায় আর যারা এদের ভালোবাসে তাদের অবহেলা করে। শোনো ভালো তাকেই বাসা উচিত যে তোমাকে ভালোবাসে। তুমি ভালোবেসে কি পেয়েছ? এক বুক যন্ত্রণা, পেয়েছ তার থেকে অবহেলা। আমাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখো আমি ইমতিয়াজ স্মরণ কথা দিচ্ছি তাকে তুমি ভুলে যাবে। এই কষ্ট এই চোখের জল আর কখনোই ফেলতে হবে না। আমি তোমার এতো ভালোবাসা দেবো তুমি ঠকবাজ আশিকের জন্য আর কখনোই কাঁদবে না‌। তার নামটা অব্দি ভুলে যাবে।”

পূর্ণতা পর্ব ২৪

স্মরণ কথা শেষ করে উঠতে পারল না। পূর্ণতা বাঘিনীর মতো করে ওর দিকে তাকাল আর ঠাস করে ওর গালে থাপ্পড় দিয়ে বলল,“ আমার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে আর একটা বাজে কথা বললে আমি আপনার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। তাকে আপনি আমায় ভুলিয়ে দেবেন কে আপনি? আমি আমি কখনোই ভুলতে চাই না। সে আমার হৃদয়ে অন্তত কাল থাকবে। তাকে আমৃত্যু হৃদয়ে বন্দি করে রাখব। তার স্মৃতি আমার ভালো থাকার কারণ।”

পূর্ণতা পর্ব ২৬