Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৪

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৪

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৪
insia isha chowdhury

রজনী পেরিয়ে ভোরের কোমল আলো ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজানের স্নিগ্ধ প্রতিধ্বনি। চারপাশজুড়ে এক অদ্ভুত শান্তি।
প্রণয় আর সূচনা একে অপরকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সূচনার মাথাটা আলতো করে রাখা প্রণয়ের বুকে। এলোমেলো খোলা চুলগুলো ছড়িয়ে আছে প্রণয়ের মুখজুড়ে। সেই চুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ঘুম ভাঙতেই প্রণয় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল।
কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে সূচনার মুখের দিকে চেয়ে রইল সে। ঘুমন্ত মুখটায় কী অপার্থিব শান্তি! ঠোঁটের কোণে মায়াভরা প্রশান্তি, যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে।

অদ্ভুত এক কোমল অনুভূতিতে ভরে উঠল প্রণয়ের মন। না চাইতেও সে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সূচনার কপালে।
স্পর্শটা পেতেই সূচনা আধো ঘুমের ঘোরে আরও বেশি করে প্রণয়কে জড়িয়ে ধরল। প্রণয়ও মৃদু হাসল। দু’হাতের বাঁধনে আগলে রাখল তাকে।
হঠাৎই দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই প্রণয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। নামাজের সময় প্রায় চলে যাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে সূচনাকে সরিয়ে উঠে বসল। তারপর আলতো করে সূচনার গালে হাত রেখে নরম গলায় ডাকল,
“সূচনা ওঠো। নামাজের সময় হয়ে গেছে।”

কিন্তু সূচনা তখনো গভীর ঘুমে বুঁদ। প্রণয় আবার ডাকতেই সে অভ্যাসবশত প্রণয়ের হাতটা সরিয়ে দিয়ে আধো ঘুমে বিড়বিড় করে বলল,
“আম্মু আর একটু ঘুমাই আর পাঁচ মিনিট।”
প্রণয় বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“আম্মু? আমি তোমার আম্মু?”
সূচনা চোখ না খুলেই বিরক্ত গলায় বলল,
“উফ আম্মু, প্লিজ আরেকটু ঘুমাতে দাও না।”

কথাটা শেষ করেই আচমকা চোখ খুলে সামনে হঠাৎ এতটা কাছে প্রণয়কে দেখতে পেয়ে সূচনা ভয় পেয়ে গেল। কিছু না বুঝেই তাড়াহুড়ো করে প্রণয়কে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে প্রণয় নিজেকে সামলানোর সুযোগই পেল না। ধপাস করে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেল সে।
মেঝেতে পড়ার শব্দ হতেই সূচনার ঘুম পুরোপুরি উড়ে গেল। হতভম্ব হয়ে সে তাকিয়ে রইল। আর এদিকে প্রণয় মেঝেতে বসে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ‎সূচনার চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। তাড়াহুড়ো করে মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠল,
“সরি স্যার! আসসালামু আলাইকুম স্যার।
গুড মর্নিং স্যার!”

সূচনার এই আজগুবি কথায় প্রণয়ের রাগ আরও বেড়ে গেল। ‎দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমাকে বিছানা থেকে ফেলে দিয়ে এসব কী আজেবাজে কথা বলছ তুমি?”
সূচনার তখন নিজেরই মাথা কাজ করছে না। হঠাৎই ওর মনে পড়ল— ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। আর প্রণয় স্যার এখন ওর স্বামী!
ইতোমধ্যে প্রণয় উঠে দাঁড়িয়েছে। সূচনা থতমত খেয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“আসলে স্যার… আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছিলাম। তাই ভুল করে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছি। বিশ্বাস করুন, ইচ্ছা করে করিনি।”

প্রণয় বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমার মাথা খেও না। যাও, ওজু করে আসো। নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
প্রণয়ের কথা শেষ হতেই সূচনা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তাড়াতাড়ি ওর লাগেজ খুলে একটা চুড়িদার নিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল।
আর প্রণয় বিছানায় বসে এক হাত দিয়ে নিজের চুল খামচে ধরে গভীর শ্বাস ছাড়ল।

কিছুক্ষণ পর বাথরুমের দরজা খুলে সূচনা বেরিয়ে এলো। মুখজুড়ে এখনো ঘুমঘুম একটা আবেশ লেগে আছে। কোনো কথা না বলেই চুপচাপ একপাশে সরে দাঁড়াল। ‎প্রণয়ও আর কিছু বলল না। সোজা বাথরুমে গিয়ে ওযু সেরে ফিরে এলো। ফিরে এসে দেখল সূচনা সুন্দর করে ওড়নাটা মাথার চারপাশে পেঁচিয়ে হিজাবের মতো করে নিয়েছে। ভোরের নরম আলোয় তাকে অদ্ভুত শান্ত আর পবিত্র লাগছে।
প্রণয় নিঃশব্দে দুটো জায়নামাজ বিছিয়ে দিল।
তারপর দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সালাতে মগ্ন হয়ে গেল। ‎চারপাশে তখন কেবল স্নিগ্ধ শান্ত আবেশ।
নামাজ শেষ হতেই সূচনা মাথা থেকে ওড়নাটা খুলে আলগোছে গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে আবার বিছানায় গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ তার এক হাত টেনে ধরল। ‎সূচনা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল প্রণয় তার হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ভ্রু কুঁচকে সূচনা বলল,

“কি হয়েছে? এখন আবার কী করতে হবে?”
প্রণয় কোনো উত্তর দিল না। শান্তভাবে টেবিলের ওপর কয়েকটা নোটবুক, খাতা আর একটা পেন রেখে বলল,
“আর কয়দিন পর তোমার ক্লাস টেস্ট। এখন তুমি পড়তে বসবে।”
প্রণয়ের কথাটা সূচনা এমনভাবে উপেক্ষা করল, যেন কথাগুলো তার কান পর্যন্ত পৌঁছায়ইনি। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ‎আর সেটাই যেন প্রণয়ের ধৈর্যের শেষ সীমা হয়ে দাঁড়াল। ‎চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার।
একটাও কথা না বলে সে সোজা গিয়ে সূচনাকে কোলে তুলে নিল। ‎হঠাৎ এমন কাণ্ডে সূচনা হতভম্ব হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ছটফট শুরু করল নিচে নামার জন্য। কিন্তু প্রণয়ের শক্ত বাহুর সঙ্গে পেরে ওঠার ক্ষমতা তার ছিল না।
সূচনা বিরক্তিতে চিৎকার করে উঠল,

’আশ্চর্য! আপনার সমস্যা কী? আমি এখন পড়ব না। আমি এখন ঘুমাবো!”
প্রণয় নির্বিকার। ‎সে সোজা সূচনাকে টেবিলের সামনে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
“এখনই এই অংকগুলো করবে। ভুলে যেও না, সোমবার তোমার ম্যাথ ক্লাস টেস্ট।”
সূচনা বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে উঠে দাঁড়াল।
“আশ্চর্য! আপনার কি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে? মনে নেই আমি সোমবারের জন্য ছুটি চেয়েছিলাম? আমি ওই পরীক্ষা দেব না।”
কথাটা বলেই আবার চলে যেতে নিল সে।
কিন্তু প্রণয় এবার আরও দৃঢ়ভাবে তার কাঁধ চেপে ধরে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিল।
প্রণয়ের কণ্ঠ এবার কঠিন।
“দেখো, এখন আমি যা বলব, তোমাকে সেটাই করতে হবে। তোমার পড়াশোনার অবস্থা ভীষণ খারাপ। তাই এখন তোমাকে পড়তেই হবে। আর আমি নিজেই তোমাকে পড়াবো।”
সূচনা ঠোঁট ফুলিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,

“আমি পড়াশোনা করব না বলেই তো বিয়ে করেছি!”
কথাটা শুনে প্রণয় কিছু মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল। সে বুঝতেই পারল না হাসবে, নাকি মাথায় হাত দেবে।
শেষমেশ নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল,
“বিয়ের সঙ্গে পড়াশোনার সম্পর্ক কী? বিয়ে হয়েছে বলে কি পড়া বন্ধ করে দিতে হবে? তুমি পড়াশোনা করবে না।”
সূচনা গোঁ ধরে বলল,
“হ্যাঁ, করব না।”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‎তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আমার কথা শোনো, পড়াশোনা প্রত্যেক মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তুমি জানো না ভবিষ্যতে তোমার জীবনে কী হবে। তাই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য হলেও পড়াশোনা দরকার। এমন কিছু দরকার, যেটা একদিন তোমাকে বাঁচাতে পারবে।”

সূচনা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ছোট করে তাকাল।
“ওহ তার মানে ভবিষ্যতে আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন? তাই এত পড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন?”
প্রণয় তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল।
“একদম না। আমি শুধু চাই তুমি পড়াশোনা করো। এর বাইরে আর কিছু না।”
সূচনার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়তেই ওর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে প্রণয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আপনি অফিস রুমে আমাকে কী বলেছিলেন মনে আছে?”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি বলেছিলাম?”
সূচনা বিজয়ীর হাসি হেসে বলল,

“আপনি বলেছিলেন, আমি টেস্ট এক্সাম দিলেও আপনি আমাকে মার্ক দেবেন না, আবার না দিলেও মার্ক দেবেন না। তাহলে এখন পড়ে কী হবে? আপনি তো আমাকে মার্কই দেবেন না! তাই আমি ঘুমোতে যাচ্ছি।”
কথাটা বলে সে আবার ঘুরে দাঁড়াতেই প্রণয় হঠাৎ তার এক বাহু শক্ত করে ধরে ফেলল। এবার প্রণয়ের চোখেমুখে স্পষ্ট কঠোরতা। দৃঢ় গলায় বলল,
“তখন পরিস্থিতি একরকম ছিল, এখন আরেকরকম। আর আমি কি বলেছি তোমার মার্ক কাটব? তুমি এখনই পড়তে বসবে। আর আমার কথা অমান্য করার চেষ্টা করবে না। কারণ আমি ভালোর জন্য খুব ভালো আর খারাপের জন্য ভীষণ খারাপ।”
কথাটা বলেই সে আবার সূচনাকে চেয়ারে বসিয়ে দিল।
খাতা খুলে একটা অংক দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা করতে থাকো। আমি আমাদের দু’জনের জন্য কফি নিয়ে আসছি।”

প্রণয় দরজা খুলে ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই সূচনা সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতে শুরু করল।‎ “উফফ! মানুষটা একটা আস্ত খাটাশ! সারাক্ষণ শুধু পড়ো, পড়ো, পড়ো! জীবনে আর কোনো কাজ নেই নাকি!”
রাগে গজগজ করতে করতে সে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর দ্রুত গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। দরজা বন্ধ করেই সূচনা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ‎তারপর তাড়াহুড়ো করে লাগেজের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। কিছুক্ষণ এলোমেলোভাবে খুঁজাখুঁজির পর নিজের ব্যাগটা বের করল। ব্যাগ খুলে সেখান থেকে ফোনটা হাতে নিতেই তার মুখে যুদ্ধ জয়ের ভাব ফুটে উঠল।

এক সেকেন্ডও দেরি না করে প্রীতিকে ফোন দিল।
এদিকে প্রীতি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ফোনের অবিরাম শব্দে বিরক্ত হয়ে আধো ঘুমের চোখে ফোনটা হাতে নিল সে। কিন্তু স্ক্রিনে সূচনার নামটা দেখতেই তার ঘুম এক মুহূর্তে উড়ে গেল।
এত সকালে সূচনা ফোন দিচ্ছে? ‎তাও আবার বিয়ের পরের দিন! ‎প্রীতির বুক ধক করে উঠল। মনে হলো নিশ্চয়ই শ্বশুরবাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে। কাউকে বলতে না পেরে তাই হয়তো নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকেই ফোন করেছে সূচনা।
দ্রুত ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সূচনার ক্ষুব্ধ কণ্ঠ,
“ওই প্রণয়ের বাচ্চা নিজেকে কী মনে করে বল তো? সারাদিন আমার ওপর অত্যাচার করে! এখন আবার আমাকে ঘুমাতেও দিচ্ছে না!”
প্রীতি পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেল। ‎কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারল না সে। তারপর অবাক গলায় বলল,
“সূচনা! তোর কী হয়েছে? আর তুই কোন স্যারকে এভাবে গালমন্দ করছিস?”
সূচনা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“তো কী করব? আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে ফেলছে! এই সকালবেলা কেউ পড়তে বসে? জোর করে আমাকে অংক করতে বসিয়ে গেছে!”
প্রীতি ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আশ্চর্য! তুই তো এখন শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে আবার প্রণয় স্যার কোথা থেকে আসল?”
কথাটা শুনে সূচনার হঠাৎ মনে পড়ল— প্রীতি তো তার বিয়েতেই আসতে পারেনি। ‎মুহূর্তেই তার রাগটা এবার প্রীতির ওপর গিয়ে পড়ল।
ঠোঁট ফুলিয়ে সে বলল,
“জানবি কীভাবে? তুই তো আবার আমার বিয়েতেই আসিসনি!”
প্রীতি কিছুটা থমকে গেল। তারপর নরম গলায় বলল,
“তুই তো জানিস হঠাৎ করেই বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে আসতে হয়েছে। এখন বল, আমি কীভাবে তোর বিয়েতে আসতাম? কিন্তু তার আগে তুই এটা বল প্রণয় স্যার তোর শ্বশুরবাড়িতে কী করছে?”
সূচনা একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,

“কারণ প্রণয় স্যার আমার শাশুড়ির ছেলে।”
প্রীতি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর প্রায় চিৎকার করে বলল,
“হোয়াট! তোর শাশুড়ির ছেলে মানে?!”
সূচনা বিরক্ত গলায় বলল,
“মানে ওই প্রণয়ের বাচ্চার সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে!”
প্রীতির যেন মাথাই ঘুরে গেল।
“কি সব বলছিস তুই! প্রণয় স্যারের সাথে তোর বিয়ে হয়ে গেছে?!”
সূচনা এবার বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ! আমি নিজেও জানতাম না ওই খাটাশটার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে! বিয়ের পর জানতে পেরেছি। এখন সেই খাটাশ সকাল সকাল আমাকে ঘুমোতে না দিয়ে অংক করতে বসিয়ে গেছে!”
প্রীতি পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কী বলবে, কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে— কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। ‎ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে প্রণয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“সূচনা, দরজা কেন বন্ধ করেছো?”

কণ্ঠটা শুনেই সূচনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
সে তাড়াহুড়ো করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“শোন আমার জল্লাদ মার্কা স্বামী চলে এসেছে! তোর সাথে পরে কথা বলব!”
কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ড দেরি না করে ফোনটা কেটে দিল। সূচনা গিয়ে দরজাটা খুলে দিতেই প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো ওর দিকে। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
“দরজা আটকে কি করছিলে?”
সূচনা চোখ ছোট ছোট করে নিরীহ মুখ বানিয়ে বলল,
“কিছুই করছিলাম না। এমনি।”
প্রণয় ধীর পায়ে রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো। হাতে থাকা ট্রেটা টেবিলের উপর রেখে সামনে চোখ পড়তেই দেখল কলম, খাতা আর নোটবুক ঠিক যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই পড়ে আছে। একটুও নড়েনি।
প্রণয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। আর বললো,
“একটা কলমের আঁচড়ও তো দাওনি।”
সূচনা ঠোঁট উল্টে বলল,

“ও তো কলমের আঁচড় দিলেই আমাকে ঘুমোতে দিবেন।”
ব্যস! কথাটা শুনেই প্রণয়ের ভেতরের রাগী মানুষটা জেগে উঠলো। সে হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে বেশ জোরেই বলে উঠল,
“Shut up!”
সূচনা হালকা কেঁপে উঠলো। আর তুতলে বলে ফেলল,
“আ… আমি!”
“একদম চুপ। এই মেয়ে তুমি পড়াশোনা করতে চাও না কেন? আমি তোমাকে কি বলে গেলাম? বললাম না আমি তোমাকে পড়াবো?”
সূচনা এবার সত্যিই রেগে গেল। মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে এভাবে কেন বলছেন? কি করেছি আমি? কালকে বিয়ে হয়েছে আর বিয়ের পরের দিন কোন মানুষ পড়তে বসে?”
প্রণয় ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা? তো বিয়ের পরের দিন মানুষ কি করে?”
সূচনা না বুঝেই বলতে শুরু করলো,

বিয়ের পরে মানুষ একে অপরকে সময় দেয়। একসাথে থাকে। তারপর একে অপরকে চেনে। আর তারপর রো–
হঠাৎই নিজের কথার মানে বুঝতে পেরে সূচনা তাড়াতাড়ি দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরলো। চোখদুটো লজ্জায় বড় বড় হয়ে গেল।
প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো। সে বুঝে গেছে এই মেয়েকে শিক্ষা না দিলে আজ আর পড়াশোনা হবে না। এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রণয় হঠাৎ সূচনাকে কোলে তুলে নিল।
আআআ—! সূচনা মৃদু চিৎকার করলো।
সূচনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রণয় ওকে বিছানায় ফেলে ওর উপর ঝুঁকে পড়লো। সূচনা আতঙ্কে প্রণয়কে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“আশ্চর্য! আপনি এসব কি করছেন?”
প্রণয় নিচু হয়ে ওর মুখের কাছে এসে কুটিল হেসে বলল,
“কেন? তুমি তো বললে বিয়ের পর মানুষ রোমান্স করে। তাই ভাবলাম তোমার সাথে একটু রোমান্স করি।”
“আমি এই কথা কখন বললাম?”
“বলোনি। অর্ধেক বলেছ, বাকিটা আমি বুঝে গেছি।”
“না, ঘোড়ার আন্ডা বুঝেছেন আপনি! আমার সামনে থেকে সরে যান।”
প্রণয় এবার আরো মজা পেয়ে বলল,
“যদি তুমি অংক করো তাহলে তোমার কথা শুনবো।”
সূচনা দ্রুত বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে!”
প্রণয় উঠে যেতেই সূচনা বেঁচে যাওয়ার মত নিঃশ্বাস ফেললো। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে চেয়ারে গিয়ে বসলো। তারপর খাতা টেনে নিয়ে সত্যি সত্যিই অংক করতে শুরু করলো।
প্রণয় ওর কান্ড দেখে মুচকি হাসলো। তারপর টেবিল থেকে কফির মগটা তুলে সূচনার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩

“কফিটা খাও। তাহলে আর ঘুম পাবে না।”
সূচনা খাতার দিকে তাকিয়েই বলল,
“দরকার নেই। এমনি আমার ঘুম উড়ে গেছে।”
কথাটা বলতে বলতেই সে আবার অংকে মন দিল।
আর প্রণয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূচনার বিরক্ত মুখটা দেখছিল। ঠোঁটের কোণে তখনও মুচকি হাসি লেগে ছিল।

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৫