প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৪৪

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৪৪
তানিশা সুলতানা

“কবুল” শব্দটার মধ্যে অদ্ভুত এক শক্তি রয়েছে। যা দুটো হৃদয়কে একই সূত্রে বেঁধে দেয়। মনাকে পছন্দ নয় ইফাদের। কিন্তু নিয়তির লিখনে তাদের বিয়ে হলো। আস্তেধীরে মনাকে মনে ধরলো। ভালোবেসে ফেললো। হৃদয়ে স্থান করে নিলো মায়াবিনী মেয়েটা। বারো পুরুষের সঙ্গে রাত কাটানো মেয়েটিকে ভালোবেসে বুকের মধ্যে আগলে রাখার প্রতিজ্ঞায় নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। কিন্তু শেষ মুহুর্তে এসে ঠকে গেলো।
ইফাদের মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে। ঘুম ভেঙে যাবে আর বুঝতে পারবে এসব কিছুই সঠিক নয়। দুঃস্বপ্ন ছিলো। মনা খ্যাঁক খ্যাঁক গলায় ইফাদকে ডাকবে। ঘুমের ঘোরে বুকে মাথা দিবে। ভালোবাসার জোয়ারে ভাসিয়ে নিবে।
কিন্তু ঘুম ভাঙছে না। স্বপ্ন মিথ্যে হচ্ছে না।

দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ইফাদ। গুটিগুটি পায়ে নিজ কক্ষ হতে বেরিয়ে আসে। গোটা জমিদার বাড়িতে চলছে আনন্দ উল্লাস। দশখানা গরু জবাই করে মিষ্টির খরচ করা হচ্ছে। মেহমান গিজগিজ করছে। গোটা শহর দাওয়াত করা হয়েছে নিশ্চয়।
ইফাদের কক্ষের দুই কক্ষ পড়েই অভি এবং পূর্ণতার কক্ষ। হাত কাটার পর থেকে আর কখনোই পূর্ণতার কক্ষে যাওয়ার সাহস করে নি ইফাদ। বরাবরই দূরে থেকেছে। তবে আজকে খুব করে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। দেখতে ইচ্ছে করছে মলিন মুখখানা। তেজি মেয়েটা শান্ত হয়ে গিয়েছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

সব সময় মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাওয়া পূর্ণতার মাথা নিচু হয়েছে। মুখ বন্ধ করে সয্য করে সকলের কথা। নিয়তি কি নিষ্ঠুর। এক মুহুর্ত সময় নেয় না পরিস্থিতি পাল্টাতে।
কক্ষের দরজা খোলা। ইফাদ উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে পূর্ণতা কি করছে। কিন্তু দেখতে পারে না। পা বাড়িয়ে চৌকাঠ পেরুতেই আবারও পা বাইরে নিয়ে যায়। দরজায় টোকা দিয়ে ডাকে পূর্ণতাকে

“পূর্ণতা ভেতরে আসতে পারি?
সাথে সাথেই জবাব আসে
” আসুন
ইফাদ ভেতরে ঢুকে পড়ে। বারান্দায় হাঁটু মুরে বসে আছে পূর্ণতা। উজ্জলতা এসেছে চোখেমুখে। চোখে দুটো ভেজা নয়। ভাড়ি অবাক হয় ইফাদ। কাঁদছে না কেনো?
সে তো এসেছিলো পূর্ণতার কান্না দেখতে।
ইফাদের দিকে তাকিয়ে হাসে পূর্ণতা। শুধায়

“কাঁদছি না বলে অবাক হচ্ছেন? আমার কান্না দেখতে ভালো লাগে?
ইফাদ পূর্ণতার সামনে বসে। নিজের উসকোখুসকো চুলে হাত বুলিয়ে বলে
” ভালো লাগে।
তোমার অহংকার ভেঙে গিয়েছে পূর্ণতা। পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে। তুমি হেরে গেছো।
ইফাদের চোখে চোখ রেখে পূর্ণতা জবাব দেয়

“আমি হারি নি। কখনো হারবো না৷ হারতে পারি না।
জমিদারদের পাপের রাজ্য ধ্বংস করবোই আমি।
পূর্ণতার মাথায় হাত রাখে ইফাদ। অধৈর্য স্বরে বলে
” হার মেনে নাও পূর্ণতা। পালিয়ে যাও দূরে কোথাও।
নাহলে তোমার ধ্বংস অনিবার্য।
পূর্ণতা জবাব দেয় না। বাগানে তাকায়। সেখানে গরু জবাই করা হচ্ছে। র ক্তে লাল হয়ে উঠেছে জায়গা৷ কসাইরা এক বিন্দুও সময় নিচ্ছে না। মুহুর্তে গ লা থেকে মা থা আলাদা করে ছোট ছোট টুকরো করে ফেলছে।

“ভয় পাচ্ছেন?
মৃদু হাসে ইফাদ৷ আসমান পানে তাকিয়ে বলে
” একটা হাত নেই আমার। বাবাও নেই। আমি জানি তাকে মে রে ফেলা হয়েছে। আমার বউ যাকে কালিমা পড়ে বিয়ে করেছি সেও আমাকে ফেলে চলে গিয়েছে। একমাত্র বোন যাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম তাকেও দু হাতে কবর দিয়েছি।

এরপরও ভয় পাবো?
আমার তো জীবনটাই বৃথা।
পূর্ণতা ইফাদকে দেখে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। আগে কখনো লোকটার দিকে ভালো করে তাকানো হয় নি। তবে আজকে দেখতে ইচ্ছে করছে। অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে লোকটাকে।
মানতেই হবে অভিরাজের ভাই। অভির মতোই চেহারার ধাচ। জমিদার জমিদার ভাব রয়েছে।
পূর্ণতাকে ঠিক করে দেখতে দেয় না মমতা বেগম। কোথা থেকে দৌড়ে আসেন তিনি। টেনে তুলে পূর্ণতাকে। উত্তেজিত গলায় বলে

“ওই মাইয়া তুই পালা। তোর শশুর পুলিশ নিয়া আইছে। তোরে ধরাই দিবো। তুই পালা। ওরা তোরে মা ই রা ফেলাইবো।
বলতে বলতে চোখে পানি চলে আসে তার। পূর্ণতার হাত পা কাঁপছে। কোথায় যাবে সে? বাইরে থেকে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ আসছে।
মমতা বেগম ঘোমটা টেনে দেয় পূর্ণতার মাথায়। দুই গালে হাত রেখে বলে
” বোইন রে তুই দূরে চইলা যা। যদি কোনোদিন আল্লাহ চায় আবার আমাদের দেখা হইবো। তখন তোরে সব বলবো। যা বোইন৷ খবরদার বাপের বাড়ি যাবি না। ওনারা তোরে ওইখান থেকেই ধরে আনবো।
মমতা পূর্ণতার অনুমতি না নিয়েই টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে বাড়ির পেছনের দিকে। ইফাদও পেছন পেছন যায়।

ইতোমধ্যেই জমিদারের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। পূর্ণতাকে বসার ঘরে নিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। কমলা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে পূর্ণতার কক্ষের পানে ছোঁটে। আগে থেকে একদম আন্দাজ করতে পারে নি তিনি৷ এখন কি করে বাঁচাবে পূর্ণতাকে? কি করেই বা খবর দিবে ইফতিয়ার চৌধুরীকে?
মমতা বেগম আঁচলে লুকিয়ে রাখা চাবি দ্বারা দরজা খুলে। পূর্ণতার গালে হাত রেখে ছলছল নয়নে তাকায়।
“আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক। ভালো থাকিস পূর্ণতা। আফসোস রাখিস না। জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেলি। শুকরিয়া আদায় করিস।
মমতা বেগমকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে পূর্ণতা। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে

” আমি পালাবো না দাদি। উনি আসবে। উনি এসে আমাকে না পেলে যে ভীষণ দুঃখ পাবে। পাগল হয়ে যাবে।
তাচ্ছিল্য স্বরে মমতা বেগম বলে
“তোর উনি আসবে না। ফিরবে না কোনোদিনও।
তার সিদ্ধান্তেই তোকে পুলিশ ধরতে এসেছে। তোর জা নো য়া র থানায় ডাইরি করে গিয়েছে যে তার বউ পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছেন ইফতিয়ার চৌধুরীর সাথে। তার বউ আর প্রেমিক মিলে খুনের হুমকি দিয়েছে বিধায় তিনি দূর দেশে পাড়ি জমিয়েছে।

কান্না থেমে যায় পূর্ণতার৷ স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় মমতা বেগমের পানে। মোটেও বিশ্বাস করলো না তার কথা। এমনটা কখনোই করতে পারে অভিরাজ। কখনোই না। ভীষণ ভালোবাসে কি না।
ঘোর প্রতিবাদে সুরে কিছু বলতে যায় পূর্ণতা। শোনে না মমতা। ধাক্কা দিয়ে দরজার বাইরে বের করে দেয় এবং সাথে সাথে দরজা আটকে ফেলে। বুক ফেঁটে কান্না আসে পূর্ণতার। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ভাগ্য এ কোন খেলা তার সাথে? কোথায় এনে ফেললো তাকে?
কোথায় যাবে এখন?

হাঁটু মুরে বসে পড়ে সেখানেই। জমিদার বাড়ির ভেতর থেকে হম্বিতম্বির আওয়াজ আসছে। জমিদার চারিদিকে লোক ছড়িয়ে দিচ্ছে পূর্ণতাকে খুঁজতে। পুলিশ অফিসার থানায় কল করে আর কিছু কনস্টেবল ডেকে পাঠায়। যে করেই হোক খুঁজে বের করতে হবে পূর্ণতাকে।
এতোসব আওয়াজের মধ্যে পূর্ণতার কানে ভেসে আসে অভিরাজের গলার স্বর৷ সে করুন স্বরে বলছে
“আমাদের বিচ্ছেদ হয় নি। শুধুমাত্র পরিস্থিতি আমাদের আলাদা করেছে। তুমি অপেক্ষা করো পূর্ণতা। আমি ফিরে আসবো।
তাচ্ছিল্য হাসে পূর্ণতা। আসমান পানে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলে ওঠে
” আমি অপেক্ষা করছি। তবে আপনাকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয় নিজে ফুরিয়ে যাওয়ার।

ইতোমধ্যেই ইফতিয়ারের কানে পৌঁছে গিয়েছে সমস্ত ঘটনা। মাগরিবের আজান পড়েছে কিছুক্ষণ আগেই। চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছে। জমিদার বাড়ির চারপাশে পুলিশের ছড়াছড়ি। গোটা এলাকায় জমিদারের লোকজন ছোটাছুটি করে খুঁজে চলেছে পূর্ণতাকে।
গলা শুকিয়ে আসে ইফতিয়ারের। হারানোর ভয় বুকের ভেতর দানা বাঁধে। থরথর করে কেঁপে ওঠে হাত পা। কান্না পাচ্ছে ভীষণ।

অবাক হয় ইফতিয়ার।
মিষ্টির মরে যাওয়ার খবরও তাকে এতোটা কষ্ট দেয় নি। অথচ পূর্ণতাকে দেখতে পারবে না ভাবলেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
পূর্ণতা ম রে গেলে বোধহয় ইফতিয়ার চৌধুরীকে এক সেকেন্ডও বাঁচানো যাবে না।
ইফতিয়ার চোখ বন্ধ করে। মিষ্টিকে ডাকে মনে মনে
“মিষ্টি আমাকে পূর্ণতার খোঁজ জানিয়ে দাও। কোথায় আছে আমার পূর্ণতা?
কি অবস্থায় আছে?

মিষ্টি বোধহয় খিলখিল করে হেসে উঠলো। দুষ্টুমির স্বরে বললো
” খুঁজে নিন চৌধুরী সাহেব। ভালোবাসার পরিক্ষা দিন।
ইফতিয়ার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। হাঁটু মুরে বসে পড়ে রাস্তার মাঝখানে। চিৎকার করে বলে ওঠে
“ওকে খুঁজে না পেলে ইফতিয়ার বাঁচবে না। পৃথিবীর কোনো শক্তিই ইফতিয়ারকে বাঁচাতে পারবে না।

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৪৩

মিষ্টি বোধহয় আহত হলো। কান্না জমলো কি আঁখিতে? করুণ স্বরে বলে উঠলো বোধহয়
” আমায় ভালোবাসলেন না কেনো চৌধুরী সাহেব? আপনার থেকে একটু ভালোবাসা পাবো বলে, আপনার আঁখিতে মিষ্টি নামের অশ্রু দেখবো বলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলাম।
তবুও একটু ভালোবাসা পেলাম না। আমার থেকে অভাগী আর দুটো আছে কি?

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here