Home প্রিয় পূর্ণতা প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫০

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫০

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫০
তানিশা সুলতানা

দীর্ঘ দিন বাদে নিজের স্বামীকে দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে পূর্ণতা। ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলে। দুরত্ব খুব বেশি নয়। কয়েক কদম এগোলেই ছোঁয়া যাবে পুরুষটিকে। বক্ষদেশে মাথা রেখে আরামসে অনুভব করা যাবে তার স্পর্শ। কিন্তু পা অবশ হয়ে আসছে। একটুও এগোতে পারছে না। মাথা ঝিমঝিম করছে। হাঁটুও বোধহয় একটু কাঁপছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। চোখের পলক ফেলতেও ভয় করছে। যদি হারিয়ে যায়। যদি এটা স্বপ্ন হয়।

ইফতিয়ার নির্বাক দৃষ্টিতে পূর্ণতাকে দেখছে। গোটা একটা বছর যাবত জেনে এসেছে “পূর্ণতা অভিরাজের স্ত্রী। তাদের বিয়ে হয়েছে” বহুবার এক সাথে দেখেছেও দুজনকে। তবুও এতো কষ্ট হয় নি। আজকে যেনো কষ্টের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে। গোলগাল মুখশ্রীতে বিরহের অশ্রুকণা একদমই মেনে নিতে পারছে না। ইচ্ছে করছে বলতে “কেঁদো না পূর্ণতা। তোমার কান্না আমার সয্য হয় না”
কিন্তু বলতে পারে না। অধিকার নেই যে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কালো রংয়ের শার্টখানা ঘামে ভিজে জবুথবু হয়ে গিয়েছে। শ্যাম বর্ণের মুখশ্রীতেও রয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘামের অবয়ন। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গিয়েছে। যেনো বহুদিন যত্ন নেওয়া হয় না। চুল দাঁড়ি বড় হয়েছে বেশ। অযত্নে অবহেলায় জটলা পাকিয়ে গিয়েছে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে পূর্ণতার।
তাকে ছাড়া তার চৌধুরী সাহেব ভালো ছিলো না।
ইফতিয়ার আসমান পানে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে “অভিরাজ” বলে।

অভি তাকায়। সর্বপ্রথম চোখ পড়ে পূর্ণতার পানে। অশান্ত বুকটা শান্ত হয়ে যায়। চটজলদি সাথে থাকা দুটো লোককে বিদায় জানায়। অন্য কোনো দিন আলাপ জমাবে বলে কথা দেয়। এবং সময় ব্যয় না করে দৌড়ে আসে পূর্ণতার নিকট। লোক লজ্জার ভয় না করেই জাপ্টে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট দেহখানা।
অভিরাজের বুকে মাথা রেখে আঁখিপল্লব বন্ধ করে নেয় পূর্ণতা। কান্না গুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। আবারও কাঁদতে ইচ্ছে করছে। তবে দুঃখে নয় সুখে। ইফতিয়ার বুঝতে পারে না এখনো কেনো কাঁদছে? হয়ত বুঝতে পারছে কিন্তু চাইছে না।

কথায় বলে না
“মানুষ চেনা বড্ড কঠিন। মানুষ দুঃখ পেয়ে হাসে আবার সুখে কাঁদে। মানুষ ভালোবাসার জন্য লড়াই করে আবার ভালোবাসার জন্য চুপচাপ সরে আসে। পুরুষ তার শখের নারীর জন্য জীবন দেয়। আবার শখের নারীকে পেয়েও পরনারীতে আসক্ত হয়। মানুষ আঘাত পেয়ে শক্ত হয় আবার মানুষ আঘাত পেয়ে ভেঙে গুড়িয়ে যায়। মানুষ ভালোবেসে বাঁচতে শেখে আবার সেই মানুষই ভালোবেসে মরে যায়।
মানুষ চেনা বড্ড কঠিন।

একই সাথে পথ চলেও কার মনে কি চলছে বোঝা বড্ড দায়।
মানুষ সিনেমা দেখে কাঁদে আবার বাস্তব জীবনের ঘটনা শুনে মজা পায়।
মানুষকে চেনা বড্ড দায়।
একই মানুষ দেহে বিভিন্ন রূপ।
অভি পরপর কয়েকবার চুমু খায় পূর্ণতার চুলের ভাজ। অশান্ত স্বরে বলে ওঠে
” আমার জান
আমার পূর্ণতা।

এতো দেরি কেনো করলে আসতে? আমি অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য।
জবাব দেয় না পূর্ণতা। সে তো তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত। যে মানুষটা ছাড়া এক মুহুর্ত চলতো না সেই মানুষকে ছাড়া অনেক গুলো দিন কাটিয়ে দিয়েছে।
ইফতিয়ার নজর ফেরায়। মাথা নুয়িয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। ধরে আসা গলায় বলে
“আমি আসছি তাহলে।
ভালো থেকো পূর্ণতা
পূর্ণতা অভির বুক থেকে মুখ তোলে। তাকায় ইফতিয়ারের পানে। অভি ইফতিয়ারকে জড়িয়ে ধরে। কৃতজ্ঞতার স্বরে বলে

” ধন্যবাদ ভাই। তোমার কাছে সারাজীবন ঋণী হয়ে থাকবো।
ইফতিয়ার অভিকে সরিয়ে দেয়। দু পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। মৃদু হেসে বলে
“যাকে আমি মোনাজাতে চেয়েও পাই নি। আপনি তাকে বীণা সাধনায় পেয়ে গিয়েছেন। যত্নে রাখবেন।
এক মুহুর্তও দাঁড়ায় না ইফতিয়ার। হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে যায় উল্টো দিকে। পূর্ণতা সেইদিকে তাকিয়ে থাকে।
অভি পূর্ণতার কাঁধ জড়িয়ে বলে

” আফসোস হয় না পূর্ণতা? যে তোমাকে আকাশ সমান ভালোবাসে সে তোমাকে পেলো না।
মৃদু হাসে পূর্ণতা। অভির মুখপানে তাকিয়ে জবাব দেয়
“উনি আমাকে ঠিক যতটা ভালোবাসে। আমিও আপনাকে ঠিক ততোটাই ভালোবাসি।
মাথা নিচু করে ফেলে অভি। রিনরিনিয়ে বলে
” তোমাকে আমার অনেক কিছু বলার আছে।
পূর্ণতা পূণরায় ইফতিয়ারের যাওয়ার পানে তাকায়। কিন্তু এখন আর ইফতিয়ারকে দেখা যাচ্ছে না। দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছে সে।
” আমিও শুনতে চাই। এতো লুকোচুরি আর ভালো লাগছে না। এবার একটু শান্তি চাই।

হাঁটতে হাঁটতে নির্জন ট্রেন লাইনে এসে থামে ইফতিয়ার। চারিপাশ শুনশান নিরব। গাছপালা দিয়ে জায়গাটা ঘেরাও করা। গাছপালার পেছনে একটা পুকুর তার পোছনেই মেইন রোড। সেখান হতে মাঝেমধ্যে দুই একটা গাড়ির হর্ণের শব্দ ভেসে আসছে। এই যাহ এই জায়গাটা বড্ড চেনা ইফতিয়ারের। ছোট বেলায় মন খারাপ হলে এখানে এসেই বসতো। ট্রেনলাইন হওয়ার সুবিধার্থে এখানে যানবাহন চলাচল করতে পারে না। তবে প্রতিদিন দু বার ট্রেন যায় বেশ শব্দ করে।

ট্রেন আসার সময়টাও ইফতিয়ারের জানা। সকাল সাড়ে নয়টা। এবং বিকেল চারটা।
ট্রেন লাইনের ওপরে বসে পড়ে ইফতিয়ার। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না। আসমান পানে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। বারংবার হাত দ্বারা আঘাত করতে থাকে নিজের কপালে। উচ্চস্বরে বলে ওঠে
“ইয়া আল্লাহ আমার ম র ণ দিন। নয়ত সহ্য করার ক্ষমতা দিন। এতো কষ্ট আমি সইতে পারছি না। আমার কলিজা পুরে যাচ্ছে। পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।

মিষ্টি মিষ্টি রে
আমায় নিয়ে যাও। আমার মিষ্টি তোমাকে প্রয়োজন আমার।
কতক্ষণ একই সুরে কেঁদেছে জানা নেই ইফতিয়ারের। তবে দূর হতে ট্রেনের শব্দ ভেসে আসছে। কান খাঁড়া করে ইফতিয়ার। মনকে শুধায়
” সমাপ্ত করে দিবো কি জীবনের গল্প? এখানেই থেমে যাক অস্তিত্ব। মুছে যাক স্মৃতি। ভালোই হবে?
হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে নেয় ইফতিয়ার। তাচ্ছিল্য হেসে শক্ত হয়ে বসে পড়ে। চোখ বন্ধ করে পূর্ণতার মুখ খানা স্মরণ করে।

“তোমাকে কখনো বলা হলো না
তোমার মুখখানা দেখলেই আমার কলিজা ঠান্ডা হয়ে যেতো।
“আল্লাহ
বহু আশা নিয়ে তোমার দরবারে হাত পেতে ছিলাম। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলে চেয়েছিলাম একটা মেয়েকে। কিন্তু তাকে পেলাম না।

মেনে নিয়েছিলাম ভাগ্য। বুঝেছিলাম মানুষটি আমার জন্য তৈরি হয় নি। তাই তো পাগলামি করি নি।
কিন্তু আল্লাহ আপনি আমার হৃদয় থেকে নামটা মুছে দিলেন না। বরং সময়ের সাথে সাথে খোদাই করে লিখে দিলেন।
এখন আমি সহ্য করতে পারছি না। কি করবো আমি? ম রে যেতে ইচ্ছে করছে যে আমার।
মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে অনুভব করে ট্রেনখানা বড্ড কাছে চলে এসেছে।

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৪৯

” বাঁচতে চাইলাম তোমার সাথে বাঁধতে চাইলাম ঘর
স্বপ্ন দেখলাম পাহাড় সমান কিন্তু হায়য় নিয়তি করে দিলো পর”

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫১