Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী গল্পের লিংক || লামিয়া ইসলাম শাম্মী

প্রিয় রাগিনী গল্পের লিংক || লামিয়া ইসলাম শাম্মী

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

– বাবা আমি থাকতে চাই না এখানে ।
মেয়ের কথা শুনে হামিদ সাহেব বেশ অবাক হলেন তাঁর সাথে হল ভর্তি বাড়ির মানুষ।
নাকে মুখে রক্ত নিয়ে গটগট করে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে হঠাৎ লামিয়ার এই কথা শুনে সবাই ভরকে গেলেন।
হামিদ সাহেব মেয়ের চোখের দিকে চোখ রেখে বললেন

– কেনো??
লামিয়া হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক ঘষে বললো
– এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। আমি দূরে কোথাও যেতে চাই। যেখানে গেলে আমি ভালো থাকতে পারবো।
হামিদ সাহেব মেয়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো।
বাবা হয়েও মেয়ের দুঃখে সে মেয়ের পাশে দাঁড়াতে পারছে না।
হামিদ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

– কালকে সকালেই তোমাকে তোমার নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিবো। কিন্তু তোমার নাকে মুখে রক্ত কেনো? তুমি কী আজকেও মারামারি করেছো??
লামিয়া কোনো কথা বললো না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।
হামিদ সাহেব মেয়ের নিরবতা দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো
– আজকে কোন মেয়েকে মেরে এসেছো?? আর কেনো??
লামিয়া দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বললো
– হ্যাঁ মেরে এসেছি, আর তুমি তো জানোই বাবা আমি অকারণে কিছু করি না। মেয়েটার অবশ্যই কোনো ভুল ছিলো।
বলেই গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে গেলো
হামিদ সাহেব মলিন দৃষ্টিতে তাকালো মেয়ের যাওয়ার দিকে। মেয়েটা দিন দিন বেশ বদমেজাজি হয়ে গিয়েছে।
কোথায় আগে তো এমন ছিলো না।

আগে তো এই মেয়ে বেশ শান্ত শিষ্ট ছিলো কিন্তু যখন থেকে সব বুঝতে শিখেছে তখন থেকে এমন হয়ে গিয়েছে। এই মেয়ে বাড়ি ছেঁড়ে কোথাও চলে গেলে এই বাড়ি যে অন্ধকার হয়ে যাবে। ভেবেই হামিদ সাহেব তাঁর বড় ভাই আনিসুল সাহেবের দিকে তাকালেন। তাঁর ভাই ও অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।
তা দেখে হামিদ সাহেব মাথা নিচু করে চলে গেলেন।
মেয়ের কথা ভেবে লতিফা বেগম ডুকরে কেঁদে উঠলো।
তার তিন মেয়ের মধ্যে তাঁর ছোট্ট মেয়ে লামিয়া লতিফা বেগমের একটু বেশি আদরের। তার উপর মেয়েটার মানসিক অবস্থা ভালো না। লতিফা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে তারপর দ্রুত চলে গেলেন
মেয়ের রুমে।

– আহ, বড় আপা ছাড়ো তো এইসব আদিখ্যেতা ভালো লাগে না।
বলেই লামিয়া মুখ কুঁচকে ফেললো।
হামিদা চোখের পানি মুছে নাকে মুখর রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বললো,
– সবসময় এমন বদমেজাজি ই কি থাকবি? এই যে সবসময় মারামারি করে আসিস, নিজেও তো ব্যাথা পাস।
লামিয়া তাচ্ছিল্য হাঁসি দিয়ে বললো
– কিছু ব্যাথা সয়ে যেতে হয় বড় আপা। মানুষের আঘাত পেতে পেতে শরীরের সয়ে গেছে, তাই এখন আর ব্যাথা লাগে না।
লামহা, হামিদা বোনের দিকে তাকালো। তাদের ছোট্ট বোন এই অল্প বয়সেই কতটা কষ্ট পেয়েছে, সব কষ্ট ভিতরে পুষে রেখেছে, প্রকাশ করে না। উপর দিয়ে হাঁসি খুশি দেখালেও ভেতরে তিলে তিলে দুমড়ে মুচড়ে শেষ হচ্ছে দিন দিন।
দরজা ঠেলে প্রবেশ করলেন লতিফা বেগম। চোখের পানি মুছে লামিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো

– যা যা প্রয়োজনীয় জিনিস তা আজকে রাতে গুছিয়ে নে। কাল তুই তোর নানু বাসায় চলে যাচ্ছিস।
লতিফা বেগম আর কিছু না বলেই চলে গেলো।
লামিয়া হালকা হাসলো তার মায়ের দিকে। সে জানে তার মা রাগ করেছেন কেনো।
লামিয়া কিছু না বলে টেবিল থেকে গিটার নিয়ে বারান্দায় চলে গেল। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
– আমার জীবনটা এমন না হলেও পারতো।
হাতে গিটার নিয়ে টুং টাং সুর তুলে গান ধরলো—

নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই
নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই
তোলো বন্ধু আমার কেহ নাই
চিকন ধুতি খানি পরিতে না জানি
না জানি বান্ধিতে কেশ
চিকন ধুতি খানি পরিতে না জানি
না জানি বান্ধিতে কেশ
না জানি বান্ধিতে কেশ
না জানি বান্ধিতে কেশ
অল্প বয়সে পিরিতি করিয়া
হয়ে গেলো জীবনের শেষ
অল্প বয়সে পিরিতি করিয়া
হয়ে গেলো জীবনের শেষ
হয়ে গেলো জীবনের শেষ
হয়ে গেলো জীবনের শেষ
প্রেমের মুরালি বাজাতে না জানি
না পারি বান্ধিতে সুর
প্রেমের মুরালি বাজাতে না জানি
না জানি বান্ধিতে সুর
না জানি বান্ধিতে সুর
না জানি বান্ধিতে সুর

আর গাইতে পারলো না, লামিয়ার গলা কান্নায় ভেঙে এলো। পিছন থেকে হামিদা, লামহা, তায়েবা, তায়েব, রাশেদ, মাহির, আরিফ—সবাই একে একে লামিয়াকে জড়িয়ে ধরল।
লামিয়া হালকা হেসে উঠলো। এই প্রিয় মানুষগুলোকে পেয়ে, তার বিপদ, খারাপ পরিস্থিতির মাঝেও শান্তি পেল।

আসুন পরিচয় দেই : আমি লামিয়া ইসলাম। ইসলাম পরিবারের দ্বিতীয় ছেলে হামিদ ইসলামের ছোট্ট মেয়ে। তার বড় মেয়ে হামিদা ইসলাম এবং মেজো মেয়ে লামহা ইসলাম আর আমি তাদের ছোট্ট। উহু এইখানে শেষ নয় আরো আছে।
ইসলাম পরিবারের প্রথম ছেলে আনিসুল ইসলাম, তার দুই সন্তান—বড় ছেলে রাশেদ ইসলাম আর ছোট ছেলে আরিফ ইসলাম। ইসলাম পরিবারের সেজো ছেলে হাশিম তার এক ছেলে মাহির ইসলাম। ইসলাম পরিবারের ছোট ছেলে আজমির তার দুই সন্তান—বড় ছেলে তায়েব ইসলাম আর ছোট মেয়ে তায়েবা ইসলাম।
এই বাড়ির প্রধান কর্ত্রী দাদী আজমেরী বেগম। বাবা, চাচারা—সবাই দাদীর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।
এই হলো আমাদের ইসলাম পরিবার। হাসি, মজা, রাগ, অভিমান, দুষ্টু-মিষ্টি গল্পে আমাদের পরিবার পরিপূর্ণ। সবাই মিলেমিশে থাকে। আশেপাশের মানুষ আমাদের পরিবারের আরো একটা নাম দিয়েছেন পাগলা পরিবারে। কেনো দিয়েছে সেটা না হয় গল্প পড়েই বুঝতে পারবেন।
চলুন এইবার গল্পে যাওয়া যাক।

সকালের আলো হতেই লামিয়াকে নিয়ে চলে গেল তার মামার সাথে।
কারো সাথে দেখা না করেই সে মামার সাথে পারি জমালো নানার বাড়ি। দিন যায় দিন আসে। লামিয়া আস্তে আস্তে ঠিক হতে শুরু করে। মামাতো ভাই বোনদের নিয়ে লামিয়ার বেশ ভালোই কাটছে দিন। পিছনে কি হয়েছে না হয়েছে তা লামিয়া ভুলেই যেতে লাগলো। আবশ্য একবারে না। মনের ব্যাথা মনেই আছে। কষ্ট কি আর এতো সহজে ভুলে যাওয়া যায়?

এইভাবেই কেটে গেল পাঁচটা মাস।
হামিদ সাহেব ছোট্ট মেয়েকে না দেখে বেশ কষ্টে দিন পার করছেন।
নাস্তার টেবিলে ইসলাম বাড়ির সবাই বসেছে।
বাড়ির বউরা একের পর এক খাবার দিচ্ছে টেবিলে।
সবাই খাওয়া শুরু করলেও হামিদ সাহেব চুপচাপ বসে আছেন। মুখে খাবার তোলেননি একবারও।
আনিসুল সাহেব ভাইয়ের মনের অবস্থা বুঝে লতিফা বেগমকে বললেন,
– মেজো বৌমা, এতো মাস হয়ে গেল, মেয়েটাকে নিয়ে আসো। এইভাবে দূরে রাখা যায় নাকি?
লতিফা বেগম ঠান্ডা গলায় বললেন,
– বড় ভাই থাকুক ও ওর মতো। যখন ইচ্ছা হবে চলে আসবে।
হামিদ সাহেব কোনো কথা না বলে চেয়ার ঠেলে উঠে চলে গেলেন।
টেবিলে থাকা আর কারোরই খাওয়া হলো না।
হামিদা আর লামহা চুপচাপ বসে আছে, মন খারাপ নিয়ে।
সেই যে বোনটা চলে গেল, তারপর আর একবারও খবর পেল না ওরা। ভেবেই মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।
অন্যদিকে,,

ক্রিকেট ব্যাট কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া। চোখ দুটো রীতিমতো শিকারের টার্গেটে আটকে আছে। শিকার আর কেউ না, সামনের বাড়ির চান্দু মিঞার ঝকমকে টাক। কিছু দিন আগে তার মাথায় ইট পরে গর্ত হয়ে গিয়েছিলো তার টাক মাথায়।
রোদে সেই টাকটা এমন ঝলমল করছে যে মনে হচ্ছে হেডলাইট জ্বলছে।
লামিয়া পাশের ছেলেটাকে ইশারা করলো।
— এই, বল দে দেখি, একটা ছক্কা মারি।
ছেলেটা বোলিং করতেই, ধাম করে ব্যাট ঘুরিয়ে লামিয়া এমন একটা শট মারলো যে বলটা সোজা গিয়ে চান্দু মিঞার টাকে গিয়ে “ঠাস” করে লাগলো।
চান্দু মিঞা ব্যথায় দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো।

— হায় আল্লা, কে রে আমার চান্দী ফাটাইছে!
তিনি ধপাস করে বসে পড়লেন। আশেপাশে কিছু বাচ্চারা ভয়ে পালাতে শুরু করলো আর কিছু
বাচ্চারা হো হো করে হাসতে লাগলো। পাশ থেকে এক ছেলে বললো,
— চান্দু কাকার টাকে আবার নতুন গর্ত হলো!
চান্দু মিঞা দাঁতে দাঁত চেপে চারপাশে তাকাতেই দেখলো লামিয়া দুই হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে বিজয়ীর হাঁসি।
চান্দু মিঞা গলা চড়িয়ে বললো,
— ওই ছেমড়ি, তুই আমার মাথায় বল মারলি কেন রে?
লামিয়া চোখ কুঁচকে হেসে উত্তর দিলো,

— চান্দু কাক্কু তুমি তো টাকের জন্যই বিখ্যাত, তাই আমি ভাবলাম তোমার টাক মাথাটায় টার্গেটটা একটু কাজে লাগাই!
এবার বাচ্চারা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। পাশ থেকে বাচ্চারা হাসতে হাসতে বললো,
— কাকার টাকই তো লামিয়াপুর প্র্যাকটিস বোর্ড!
চান্দু মিঞা রাগে তেতিয়ে উঠে বললেন,
— শোন ছেমড়ি, আমার চান্দী কিন্তু এলাকার সৌন্দর্যের প্রতীক! এই চান্দীতে বল মারা মানে জাতির অপমান!
লামিয়া মুখ গম্ভীর করে মাথা নাড়লো, তারপর দাঁত বের করে বললো,
— তাই নাকি? তাহলে আজকে আমি ইতিহাস গড়লাম!
বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বললো – কি বলিস তোরা এতো ভালো ইতিহাস গড়ার জন্য আমাকে যাদুঘরে রাখার দরকার নাহ?

বাচ্চারা হাত উঠিয়ে বললো – হ্যাঁ হ্যাঁ একদম। বলেই
আবারও হাসির ঝড় উঠলো চারপাশে। চান্দু মিঞা গরম ভাপে ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ির মতো ফুসফুস করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। লামিয়া ব্যাটটা ঘুরিয়ে বললো,
— ওরে কে আছিস, আরেকটা বল দে, এবার ছক্কা মারবো চান্দু কাক্কুর নাক বরাবর!
লামিয়ার কথা শুনে সবাই আবার হেঁসে উঠলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ২