Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৮ (২)

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৮ (২)

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৮ (২)
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

বৃষ্টিতে ভেজার কারণে তীব্র জ্বর, ঠান্ডা, কাশি বাধিয়েছে লামিয়া। একটু পরপরই নাক মুজচ্ছে টিস্যু দিয়ে যার ফলে নাক ফুলে গেছে। এবং লাল টুকটুকে হয়ে আছে। চোখ মুখ ফুলে বেহাল দশা। একটু পরপর আবার হাঁচি দিচ্ছে মনে হচ্ছে হাঁচির শব্দে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠছে।
টুলটুল পায়ে হেঁটে হেঁটে এসে সোফায় বসলো।
রাত সাতটা পঞ্চান্ন বাজে।

আজকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের খেলা হবে। কোনো ভাবে মিস করা যাবে না। এখনো অনেক দেরি তাই আগে এক কাপ গরম গরম চা করে খেয়ে নিলো। বাড়িতে এখনো কেউ অফিস থেকে আসে নি। শুধু রাশেদ আর আরিফ এসেছে তাড়াতাড়ি। লামিয়ার চা খাওয়ার মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো আরিফ।
লামিয়া কে চা খেতে দেখে লামিয়ার হাত থেকে মগটা নিয়ে নিজে খেতে খেতে সোফায় গিয়ে বসলো।
লামিয়া আরিফের দিকে এক নজর বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সব খাবারের জিনিস যা যা আছে সব নিয়ে সোফায় গিয়ে রেখে আসলো তারপর আবার ফ্রিজ খুলে মজো আইসক্রিম নিয়ে রাখলো।
আরিফ এতো কিছু সোফায় দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

– তুই রাক্ষস নাকি, সবার খাবার তুই একাই তো খেয়ে ফেলবি দেখছি। দে আমাকে একটা।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো
– তাহলে তোমার কী? আমার এখান থেকে একটা জিনিস ও ধরবে না তাহলে অনেক খারাপ হয়ে যাবে ছোট্ট ডাইয়া।
– চুপ বড় ভাইয়ের সাথে তর্ক করছিস কেনো? আর কি কি আছে সব নিয়ে আয়, পারলে পুরো কিচেন টাই উঠিয়ে নিয়ে আয় । বলেই টিভি অন করলো আরিফ।
লামিয়া কিছু না বলে কুড়কুড়ে চিপস চানাচুর নিয়ে গিয়ে সোফায় বসলো।
আরিফ এক নজর লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো

– কীরে তোর চেহারা এমন টম হয়ে ফুলে আছে কেনো? আবার ঠান্ডা লাগিয়েছিস?
লামিয়া নাক টেনে বললো
– হু, লেগেছে একটু।
আরিফ রাগি চোখে তাকিয়ে বললো
– তাহলে আবার ফ্রিজের জিনিস এনেছিস কেনো? তাড়াতাড়ি রেখে আয়।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো
– উফ ছোট ভাইয়া বিরক্ত করো না তো।
আরিফ রাগি চোখে লামিয়ার বেণী টেনে ধরে বললো
– রেখে আসবি কি না।
লামিয়া ও রেগে আরিফের চুল টেনে ধরলো।
উপর থেকে রাশেদ আর শুভ্র নিচে নামছিলো,
আরিফ লামিয়ার চুল টানাটানি দেখে রাশেদ তাড়াতাড়ি নিচে যেয়ে আরিফের হাত থেকে লামিয়ার চুল ছাড়িয়ে নিয়ে ধমকে বললো

– আরিফ তোকে কতোবার বলেছি বোনদের গায়ে হাত দিবি না।
আরিফ রাশেদের ধমকে চুপসে গেলো।
শুভ্র কঠোর চোখে দেখলো সব। আস্তে ধীরে এগিয়ে এসে লামিয়ার পাশের দূরত্ব বজায় রেখে বসলো।
রাশেদ শুভ্রের পাশে বসে ফোন দেখতে ব্যাস্ত হয়ে
গেলো।
আস্তে আস্তে একে একে হামিদা, লামহা, তায়েবা, তায়েব, মাহির এসে উপস্থিত হলো।
আজকে সবাই অনেক এক্সাইটেড খেলা দেখার জন্য। লামিয়ার সামনে এতো খাবার দেখে সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
লামিয়া আড়চোখে দেখলো। মাহির চিপসের প্যাকেটে হাত দিতেই লামিয়া চিৎকার করে উঠলো

– একটা জিনিস ও ধরবি না। তোদের খেতে মন চাইলে তোরা কিচেন থেকে এনে খা।
– এতো গুলো জিনিস খেতে পারবি না। আমাকে দে একটা কিছু।
মাহির ঠোঁট উল্টে বললো।
– সব খেতে পারবো, পুরো দুনিয়া খেয়ে ফেলবো তারপর ও খাবারের ভাগ কাউকে দিবো না। সর সামনে থেকে।
নাক টেনে বললো লামিয়া।
মাহির রেগে কিচেনে যা খাবার ছিলো সব নিয়ে এসে বসেছে।
কেউ কোনো কথা বলছে না। কারণ খেলায় বাংলাদেশ যখন মাঠে নামে তখন লামিয়া বোম হয়ে থাকে।
সবাই বাংলাদেশ সাপোর্ট করলেও মাহির বাংলাদেশকে কোনো কালেই সাপোর্ট করে না।
খেলা শুরু হতেই মাহির মুখ ফসকে বলে উঠলো

– আজকেও সালারা হারবে।
বলতেই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো । যা বাবা ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলছে।
সবাই রেগে মাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে।
মাহির ক্যাবলা হাঁসি দিয়ে বললো
– ওই আর কি সত্যি কথা পেটে রাখতে পারি না বলে ফেলছি।
লামিয়া নাক টেনে চেঁচিয়ে বললো
– রাজাকারের বাচ্চা, গাদ্দারি করোস বাংলাদেশে থেকে বাংলাদেশের সাথে। খোদার কসম আজকে বাংলাদেশে হারলে তোর পশ্চাৎদেশে এমন মার মারবো, মা গো বাবা গো বলে চিৎকার করলেও কুল পাবি না।
মাহির লামিয়ার কথা শুনে চুপসে গেলো।
সবাই আবার খেলা দেখায় মনযোগ দিলো।
কিছুক্ষণ পর পর লামিয়া নাক টানছে, রুম কাঁপিয়ে হাঁচি দিচ্ছে।
চোখ মুখের অবস্থা বেশ ভয়াবহ। শুভ্র আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো। মুখ ফুলে বেলুন হয়ে আছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

কেউ দেখলে বলবে – কী লো লামিয়া কার আবেগে চোখ মুখ ভাসিয়ে কান্না করছিস।
শুভ্র লামিয়ার থেকে চোখ সরিয়ে টিভির দিকে চোখ রাখলো।
হুট করে শুভ্র হাঁচি দিয়ে উঠলো। এতোক্ষণ লামিয়ার পাশে শুভ্র বসে ছিলো লামিয়া খেয়াল করে নি তা। পাশে তাকাতেই শুভ্র কে দেখে টাস্কি খেলো মনে হলো।
এই বেডার ও ঠান্ডা লেগেছে। নাক মুখ লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে টমেটো, ধরলেই টুপ করে ফেটে যাবে।
নাক টানছে আর হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করছে। লামিয়া পাশ থাকা টিস্যুর বক্স টা বাড়িয়ে দিলো শুভ্রের দিকে। শুভ্র বক্সের দিকে তাকিয়ে লামিয়ার দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই লামিয়ার সকালের চুমুর কথা মনে পড়তেই চোখ সরিয়ে নিলো। শুভ্র টিস্যু নিয়ে মুচকি হেসে টিভি দেখতে লাগলো।

খেলা দেখতে দেখতে যা খাবার লামিয়া এনেছিলো সব খেয়ে শেষ করে ফেলছে। একা খেয়েছে তা কিন্তু নয়, অবশ্য সবাইকেই দিয়েছে। যতোই বলুক না কেনো দিবে না কিন্তু সবাইকে দিয়ে খায়।
আইসক্রিমের বাটিতে হাত দিতে যেতেই হামিদা চোখ রাঙিয়ে বললো
— এই রাখ রাখ, আইসক্রিম খাওয়া লাগবে না। এমনিতেই ঠান্ডায় চোখ মুখের অবস্থা খারাপ, তার উপর আবার আইসক্রিম?
হামিদার কথায় কোনো পাত্তা না দিয়ে লামিয়া আইসক্রিম খাওয়া শুরু করলো।

রাত বারোটা বাজতেই খেলা শেষ হলো। বাংলাদেশের হার। সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, কারও মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না।
এমন সময় মাহির হেসে হেসে বললো
— যা সালা, বাংলাদেশের খেলা আর গার্লফ্রেন্ড কোনোদিন এক হয় না। যেমন গার্লফ্রেন্ড কোনোদিন বউ হয় না, আর বাংলাদেশ কোনোদিন জিতে না।
বলেই হো হো করে হাসতে শুরু করলো।
মুহূর্তেই সবাই রেগে মাহিরের দিকে তাকালো।
লামিয়া হাতে টিস্যু ছুঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে উঠলো, দাঁত কটমট করে বললো
— রাজাকারের বাচ্চা! তোকে আজকে আমি মেরে ফেলবো। তোর দোষেই বাংলাদেশ হেরেছে। তোকে আমি ছাড়বো না।
মাহির ঠোঁট ভেটকি মাছের মতো করে ভাঁজ করে বললো

— হ, যতো দোষ মাহির ঘোষ! তাই না? আমি কি বলেছিলাম ওদের হেরে যেতে। নাকি আমি বাম পা দিয়েছিলাম জানি ওরা, হেরে যায়।
লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
— হ্যাঁ, তুই আগেই বলেছিলি বাংলাদেশ জিতবে না। তাই হয়েছে! সব তোর মুখ তো কু*ত্তা মুখ যা কিছু বলিস সব সত্যি হয়ে যায়। আজ তোর মুখ আমি ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলবো।
বলেই দরজার আড়াল থেকে ঘরের ঝাড়ু টেনে বের করলো।
মাহির ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে উঠে শুভ্রর পিছনে লুকিয়ে বললো
— আবরার ভাই, প্লিজ বাঁচান!
লামিয়া ঝাড়ু হাতে এগিয়ে আসতেই তায়েব রেগে উঠে বললো

— এই রাজাকারের কোনো অধিকার নাই বাঁচার। মাইরা ফেল, বোইন! তোর সাথে আমি আছি।
মাহির দৌড় দিয়ে শুভ্র কে ছেড়ে পালাতে লাগলো। দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচিয়ে উঠলো
— ইয়া আল্লাহ! আমারে বাঁচাও। না হলে এই নরপিশাচরা আমাকে শেষ করে ফেলবে।
তার পিছনে লামিয়া আর তায়েব ঝাড়ু হাতে দৌড়াচ্ছে।
ওদের আটকাতে হামিদা, লামহা, তায়েবা, রাশেদ, আরিফ, শুভ্র সবাই দৌড়াতে লাগলো।
লামিয়া চেঁচিয়ে বললো

— রাজাকারের বংশ, তোকে আজ মেরে আমি আবার বাংলাদেশ স্বাধীন করবো! দাঁড়া তুই!
মাহির দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালো। পিছনে তাকিয়ে দেখে, লামিয়া আর তায়েব এখনো তার পিছু ছাড়ছে না। আবার দৌড় শুরু করলো।
দৌড়াতে দৌড়াতে ব্রিজের সামনে এসে দাঁড়াতেই ওদের হাতে ধরা পড়ে গেল মাহির। তায়েব আর লামিয়া মিলে মাহিরকে ধরে উল্টো করে ব্রিজের উপর ঝুলিয়ে রাখলো। নিচে কাদায় হাঁটু পর্যন্ত পানি।
মাহির ভয়ার্ত কণ্ঠে কাকুতি মিনতি করে বললো

— ভাই, আমারে বাঁচা ভাই, প্লিজ বাঁচা।
তায়েব দাঁত চেপে বললো
— তোকে বাঁচিয়ে আবার রাজাকারদের জন্ম দিবো নাকি? মরে যা তুই!
মাহির কান্না জড়ানো গলায় বললো
— এইবারের মতো মাফ করে দে ভাই। উপরে তুই, হাত ধর আমার।
লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
— রাজাকারের বাচ্চা, এখন আল্লাহর নাম নে, সোজা তার কাছেই চলে যাবি।
মাহির কেঁদেকেটে বললো
— বোইন, এভাবে বলিস না। আমার চোখে তাকা, দেখ তোদের জন্য ভালোবাসা আছে।
তায়েব মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো
— তোর চোখে ভালোবাসা না, শুধু গাদ্দারি ভরা।
লামিয়া রাগে এক পা ছেড়ে দিয়ে বললো
— অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাতে যাবো। কেচ্ছা খতম কর। ছেড়ে দে ওরে।
মাহির ভয়ে চিৎকার করে উঠলো –

— না না, এমন করিস না বোইন!
ঠিক তখনই হামিদারা সবাই দৌড়ে এসে হাজির হলো। রাশেদ ছুটে গিয়ে আটকাতে যাবে, এর আগেই তায়েব আরেক পা ছেড়ে দিলো। ঠাস করে মাহির কাদার পানিতে পড়ে গেলো।
লামিয়া গলা ফাটিয়ে বললো
— রাজাকারের বাচ্চা, আজকে বেঁচে গেলি। দ্বিতীয়বার গাদ্দারি করলে তোর মুণ্ডু কেটে ডুগডুগি বাজাবো পুরো মহল্লায়!

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৮

রাশেদ আর আরিফ কাদামাটি থেকে মাহিরকে টেনে তুললো। পুরো ভিজে কাদা-ভূত হয়ে বের হলো সে। সবাই তা দেখে পেটে হাত দিয়ে হাসতে লাগলো। কেউ মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো।
মাহির রেগে ধুপধাপ পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।
পেছনে তায়েব লামিয়ার কাঁধে হাত রেখে হেলেদুলে হাঁটছে।
আর বাকি সবাই হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৯