প্রিয় রাগিনী পর্ব ২০
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে সন্ধ্যার আলো। স্নিগ্ধ বাতাসে ছাদের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুভ্র। দূর আকাশে, তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবছে আর কিছুক্ষণ পর পর সুখটান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে হালকা ভঙ্গিতে।
— মন পাঁজরে শুধু তুমি আছো, কেউ তো আর থাকে না…
গুনগুন করতে করতে ছাদে পা রাখলো লামিয়া।
হঠাৎ নাকে সিগারেটের গন্ধ আসতেই কপালে ভাঁজ ফেলে চারপাশে তাকালো। পিছনে ঘুরতেই দেখলো ছাদের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুভ্র সুখটান দিচ্ছে।
তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ফ্রক এর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিলো। তারপর আস্তে ধীরে তার পিছনে গিয়ে হাত বুকে ভাঁজ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
নাকে ক্যান্ডির ঘ্রাণ আসতেই শুভ্র হালকা হাসলো। ঠোঁট কামড়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
— মিস, এই সন্ধ্যায় ছাদে কেনো?
বলেই পিছনে ঘুরলো।
লামিয়া কপাল কুঁচকে বললো
— আপনি বুঝলেন কীভাবে আমি এসেছি?
উত্তর না দিয়ে শুধু হাসলো শুভ্র।
অর্ধেক খাওয়া সিগারেট ফ্লোরে পিষে ফেললো, তারপর পকেট থেকে সেন্টার ফ্রুট মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে বললো
— সন্ধ্যা বেলা এখানে? ভয় করে না আপনার?
লামিয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো
— হাহ, ভয় আবার কী জিনিস? ভয় লামিয়ার ডিকশনারিতে নেই।
— বেশ সাহসী দেখছি আপনি।
— হ্যাঁ, অনেকটাই বলতে পারেন।
— ওহ তাই নাকি?
— কোনো সন্দেহ আছে?
— না না, কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু আমি শুনেছি জ্বীন আছে, আর তারা নাকি মেয়েদের উপর ভর করে বেশি।
— হ্যাঁ, জ্বীন আছে। তবে সব মেয়ের উপর ভর করে না। যারা বেশি সুন্দরী মেয়ে তাদের ঘাড়ে বসে। আর আমার ঘাড়ে বসার চান্স নেই।
— আপনি বলতে চাইছেন আপনি সুন্দরী নন?
— অবশ্যই আমি সুন্দর।
— তাহলে চান্স নেই কেনো?
— কারণ আমি নিজেই একটা জ্বীন তাই! এখন এসব বাদ। এবার বলুন তো ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলেন কেনো? এটা কিন্তু ঘোর অন্যায়।
শুভ্র শান্ত স্বরে বললো
— অনুমতি ছাড়া কারোর ছবি তোলাও কিন্তু ঘোর অন্যায়।
শুভ্রর কথায় লামিয়া কাঁচুমাচু মুখে তাকালো, তারপর বললো
— কে কার ছবি তুলেছে?
— জ্বী, আপনি আমার ছবি তুলেছেন।
— আন্দাজে কথা বললেন আর হয়ে গেলো তাই না?
— এখন অস্বীকার করতেই পারেন, মিস। আমার কোনো সমস্যা নেই। হ্যান্ডসাম ছেলের ছবি তুলতেই পারেন আমার কোনো আপত্তি নেই।
— ওয়েট! কী আপনি হ্যান্ডসাম? এটাও শুনতে হলো? ও খোদা! এই যে মিস্টার, নিজেকে কী মনে করেন? আর আপনি হ্যান্ডসাম কোন সালা বলে? আর আপনি
সিগারেট খান, সেটা আমি সবাইকে দেখাবো। তাই ছবি তুলেছি।
— ওইই তো তুলেছেন তো।
কিছু বলার আগেই ব্ল্যাকি এসে লামিয়ার পায়ে ঘেষে মিউ মিউ করতে লাগলো। লামিয়া ঝুঁকে ব্লাকিকে কোলে তুলে নিতেই ব্ল্যাকি তার গলা পেঁচিয়ে ধরলো।
লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে দোলনায় গিয়ে বসলো। শুভ্র ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। চুল মাঝে সিঁথি করে সাদা ফিতে দিয়ে দু পাশে দুটো বেণী করা, গায়ে হাঁটু পর্যন্ত কালো ফ্রক, সাদা পায়জামা আর সাদা ওড়না জড়ানো। বাতাসে উড়ছে সামনের লেয়ার-কাটা চুল। দেখতে পুরো বাচ্চাদের মতো লাগছে আজ।
শুভ্র ধীরে ধীরে দোলনার সামনের চেয়ারে বসলো। নাকে আবার ভেসে এলো ক্যান্ডির ঘ্রাণ। যা তাকে নেশাময় করে তুলছে। এই মেয়েটা গায়ে কী এমন ব্যবহার করে যে এত মিষ্টি ঘ্রাণ আসে?
— গায়ে কি পুরো পারফিউমের বোতল ঢেলে দিয়েছেন নাকি? প্রশ্ন করলো শুভ্র।
এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো লামিয়া, শুভ্রর কথার মানে সে বুঝতে পারে নি।
শুভ্র গলা খাঁকারি দিয়ে আবার বললো
— মানে মনে হচ্ছে, ছাদে আসার আগে পুরো পারফিউমের বোতল খালি করে দিয়েছেন।
— আমি তো পারফিউম ব্যবহারই করি না। আর আপনি পারফিউমের গন্ধ কোথায় পেলেন?
— আপনার গায়ে থেকে।
— এটা পারফিউমের স্মেল না, এটা আর্থ বিউটি অ্যান্ড ইউ বডি লোশনের স্মেল।
— কী এমন লোশন যে ক্যান্ডির স্মেলে পুরো ছাদ ভরে গেছে মনে হচ্ছে খেয়ে ফেলি।
— কী?
— আপনাকে।
নেশাময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আস্তে বললো শুভ্র।
— কী বললেন?
— কিছু না।
লামিয়া আর কিছু না বলে ব্ল্যাকির মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। তারপর আড়চোখে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে, হেঁটে দোলনায় যেয়ে বসলো।
শুভ্র ধীর পায়ে দোলনার সামনে রাখা চেয়ারে চুপচাপ বসে লামিয়া আর ব্ল্যাকি কে দেখতে লাগলো।
বিড়াল টা তাঁর কি সুন্দর কয়েকদিনে লামিয়ার শিকারি হয়ে গিয়েছে।
লামিয়ার জামার রঙের সাথে বিড়ালের শরীরের রঙটা মিলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে না লামিয়ার কোলো কোনো বিড়াল বসে আছে।
ছাদে দুজন মানুষ বসে আছে তবু ও কারোর মুখে কোনো কথা নেই। তারা যেনো নীরবতা পালন করছে।
মৃদু বাতাসে লামিয়ার অবাধ্য চুল গুলো উড়ছে। তা শুভ্র মুগ্ধ নয়নে দেখছে। ইচ্ছে করছে প্রেয়সীর এই অবাধ্য চুল গুলো যত্ন করে কানের পিছনে গুজে দিতে।
কিন্তু ইচ্ছেকে দমিয়ে রেখেছে সে।
চাঁদের আলোয় তাঁর দিলের দিলওয়ালি কে কী দারুণ লাগছে দেখতে। কতো বছর পর এই মেয়েকে মন দিয়ে দেখছে শুভ্র।
প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত এই মেয়েকে দেখার জন্য কতই না ছটফট করছে সে। কতো রাত যে সে না ঘুমিয়ে এই মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতে রাত কাটিয়ে দিয়েছে সে কি তা জানে? কতোই না চোখের পানি ফেলছে তার কথা ভেবে কেমন পাগল পাগল লাগতো তার এই মেয়ের জন্য, মন চাইতো সব কিছু ফেলে তার কাছে ছুটে আসি কিন্তু পারেনি সে। কিন্তু আজ তার সামনে থাকা সত্ত্বেও পারছে না তাঁর প্রেয়সীকে তাঁর বুকে জড়িয়ে ধরে তাঁর বুকের যন্ত্রনা কমাতে। কোনো এক অদৃশ্য দেয়াল যে তাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ যে তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তা লামিয়া নিজেও জানে না। সে ব্ল্যাকির গাঁয়ে হাত বুলিয়ে দিতে ব্যস্ত।
হঠাৎ কারোর কথার শব্দে লামিয়া মাথা তুলে তাকালো। সামনে তাকাতেই দেখলো খান বাড়ির ছাদে লাবিব আর মনিকা দাঁড়িয়ে আছে।
ব্ল্যাকি কে কোলে তুলে দোলনা থেকে আস্তে করে নেমে সামনে এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকালো সামনের ছাদে।
মনিকা বারবার লাবিবকে জড়িয়ে ধরছে, আর লাবিব প্রতিবারই বিরক্ত হয়ে তাকে সরিয়ে দিচ্ছে আর বেশ শাসিয়ে কিছু বলছে। কিন্তু মনিকা ছাড়ছে না, আবার আঁকড়ে ধরছে।
শুভ্র আস্তে আস্তে লামিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালো, তাকিয়েই রইলো ওদিকটায়।
হঠাৎই মনিকা লাবিবকে দেয়ালে ঠেসে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দিলো। আচমকা ব্যাপারটা হওয়াতে লাবিব ভড়কে গেলো।
লামিয়া হকচকিয়ে আরো সামনে এগিয়ে রেলিংয়ের সাথে লেপ্টে দেখতে লাগলো। কেন জানি ভীষণ হাঁসি পাচ্ছে তার।
শুভ্র এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেনো কিছুই দেখছে না।
ওদিকে লাবিব প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়ানোর। তবুও মনিকা ছাড়ছে না দেখে সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে ধাক্কা দিলো, তারপর ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিলো গালে।
মনিকা গালে হাত চেপে ছলছল চোখে তাকিয়ে ছুটে চলে গেলো।
লাবিব রাগে ফেটে পড়ে সামনে তাকাতেই চোখ কুঁচকে গেলো।
সামনেই ইসলাম বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া, আর তার পাশেই শুভ্র।
শুভ্র কে দেখে লাবিব ভ্রু কুঁচকালো।
তা দেখে লামিয়া হো হো করে হেসে উঠলো। ব্ল্যাকি কে শুভ্রর কোলে দিয়ে দু’হাত দিয়ে চোখ ঢেকে চিৎকার করে বললো
— লাবিব ভাই, আমি কিছুই দেখিনি ভাই! ওই মনিকা আপনাকে যে কিস করছে আমি কিছুই দেখিনি ভাই!
বাই দ্যা ওয়ে, ওই মনিকার কিস কিন্তু ইমরান হাশমী কেও হার মানাবে!
বলেই হাঁসি তে ফেটে পড়লো লামিয়া।
ওপাশ থেকে লাবিব বিরক্ত গলায় চেঁচিয়ে বললো
— একটা মাইক এনে দিবো তোকে?
লামিয়া ও চেঁচিয়ে বললো
— তা প্রয়োজন পড়বে না।
লাবিব আবার চেঁচিয়ে উঠলো
— তা ঠিক বলেছিস, গলা তো নয় যেনো সাউন্ড বক্স। আর তুই এখন ছাদে কী করছিস?
— এইতো, লাবিব হাশমী আর মনিকা ফিমেল হাশমীরের লাইভ কিস দেখছিলাম! — চেঁচিয়ে উত্তর দিলো লামিয়া।
এই মেয়ের সাথে কথা বাড়ানো যাবে না এখন ভেবে লাবিব বিরক্ত মুখে চলে গেলো।
তা দেখে লামিয়া আবার হো হো করে হেসে উঠলো।
কিন্তু পিছন ঘুরতেই দেখলো শুভ্র তার দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে আছে।
সেই চাহনি দেখে লামিয়ার হাঁসি মুহূর্তেই থেমে গেলো।
সেদিনের সকালের সেই ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো। শুভ্র ঘুমের ঘোরে তার ঠোঁটে চুমু দিয়েছিলো।
সেটা মনে করতেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৯
লামিয়া কিছু না বলে শুভ্রর পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই হঠাৎ আবার ফিরে এলো।
শুভ্রর কোল থেকে ব্ল্যাকি কে কোলে তুলে নিলো, তারপর দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো।
শুভ্র তা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠলো।
