Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৫

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৫

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৫
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

সকাল দশটা বেজে ত্রিশ মিনিট।
শুভ্রর গাড়ি এসে থামলো ইসলাম বাড়িতে। লামিয়া গাড়ি থেকে নেমেই দেখলো খান আর ইসলাম বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে আছে তাদের জন্য। তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন লামিয়া কে দেখে খুশিতে লাফিয়ে লামিয়ার গলা জড়িয়ে ধরতেই লামিয়া সরিয়ে দিলো তাদের। তা দেখে সবাই বেশ অবাক হলো। বাড়ির বড় রা সবাই এগিয়ে আসতেই লামিয়া তাদের সরিয়ে দিয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেলো নিজের রুমে। তা দেখে সবাই বেশ চিন্তায় পড়লো। শুভ্র অসহায় চোখে লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকালো।

সবাই লামিয়ার এমন ব্যাবহারে বেশ অবাক হলো। লাতিফা বেগম বেশ চিন্তিত গলায় শুভ্র কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো ” বাপ কি হয়েছে লামিয়ার এমন করে চলে গেলো কেনো?”
শুভ্র মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। তা দেখে লতিফা বেগম আরো চিন্তিত গলায় বললো ” বাপ ওর সাথে কী কোনো খারাপ কী হয়েছে?”
শুভ্র চট করে মাথা তুলে লতিফার দিকে তাকিয়ে বললো ” তুমি কী আমাকে বিশ্বাস করো না মামনি?”
” করি তবে লামিয়া এমন করে চলে গেলো কেনো? ওও তো এমন করে না কোনোদিন। কি হয়েছে বাপ খুলে বল।”
শুভ্র মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললো ” তোমার মেয়ে অভিমান করেছে মামনি।”
” অভিমান কিসের অভিমান ?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

শুভ্র সব কিছু খুলে বলতেই সবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো। লামিয়া সহজে কারোর সাথে রাগ অভিমান করে না। আর যদি একবার করে তাহলে সেই রাগ নিজ থেকে না ভাঙলে, এই রাগ অভিমান ভাঙতে কেউ পারবে না । ভেবেই হামিদ সাহেব বেশ চিন্তিত হলো।
তায়েব,তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন এর মুখ টা ছোট্ট হয়ে আছে। তাঁদের বোন তাদের সাথে রেগে আছে তাহলে। না না কিছু একটা করে তার রাগ ভাঙাতে হবে না হলে লামিয়া এই জনমে কথাই বলবে না তাদের সাথে। ভেবেই একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে কিছু ইশারা করে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে।

হল রুমে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আনিসুল সাহেব কিছু না বলে গম্ভীর হয়ে চলে গেলেন নিজের ঘরে। তা দেখে রাশেদা বেগম ও চলে গেলেন স্বামীর পিছনে। আস্তে আস্তে সবাই স্থান ত্যাগ করলো। শুধু দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র। হঠাৎ আজমেরী বেগম খিটখিট করে হেঁসে উঠলো। তা দেখে শুভ্র মাথা তুলে তাকালো। আজমেরী বেগম শুভ্রর হাত ধরে সোফায় বসিয়ে বললেন ” খারাপ লাগছে দাদুভাই?”
শুভ্র মাথা নিচু করে মাথা নাড়িয়ে বেশ অসহায় গলায় বললো
” আমাকে ছেঁড়ে চলে যাবে না তো তোমার নাতনি?”
তা শুনে আজমেরী বেগম বললো ” ওই পাগলের অভিমান তোমার ই ভাঙতে হইবো বুঝলা। যেইহানে রাগ অভিমান বেশি, হেইহানে ভালোবাসা ও বেশি। তুমি পারবা তোমার বউয়ের রাগ ভাঙাতে। ”
শুভ্র মাথা তুলে তাকিয়ে বললো

” কীভাবে?”
আজমেরী বেগম সয়তানি হেঁসে শুভ্রর কানে কানে কিছু বলতেই শুভ্রর চোখ রসগোল্লার মতো হয়ে গেলো।
তা দেখে আজমেরী বেগম হেঁসে বললো ” আমরা সবাই তোমার সাথে আছি।” বলেই সামনের দিকে ইশারা করতেই দেখলো মাহির, তায়েব, তায়েবা,আবির, রাশেদ, সাফওয়ান, আরিফ, শারমিন, লামহা, হামিদা,আয়না, ফারিয়া, হাফসা, ছবি,লাবিব সবাই দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা সবাই শুভ্র কে চোখ দিয়ে ইশারা করে বোঝালো তারা সবাই তার সাথে আছে। হঠাৎ ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনে সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো জ্যাকি তার সামনের দু হাত উঁচু করে জিভ বের করে আছে। ব্ল্যাকি শুভ্রর পায়ের কাছে ঘেঁষে ম্যাউ ম্যাউ শব্দ করছে। তা দেখে রাশেদ হেসে বললো

” দেখেছিস তুই একা না আমরা সবাই তোর সাথে আছি। ”
তা দেখে শুভ্রর মুখে হাসি ফুটলো। আজমেরী বেগম তা দেখে বললো ” এখন যে যার রুমে গিয়া বিশ্রাম করো গা, বিকাল থেইক্কা প্ল্যান মাফিক কাজ কবরা। ”
আজমেরী বেগম এর কথা শুনে সবাই মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো নিজেদের রুমে।

সময়টা বিকেল পাঁচটা।‌
আজ সারাদিন লামিয়ার কোনো দেখা পাওয়া‌ যায় নি। সেই সকাল থেকেই নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। দুপুরের খাবার খেতে ও আসে নি সে। অনেকবার ডাকা ডাকি করে গিয়েছে লতিফা বেগম কিন্তু কোনো সারা শব্দ না পেয়ে হতাশ হয়ে চলে গিয়েছে।
শুভ্র লামিয়ার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। তাঁর পিছনে আড়ালে লুকিয়ে আছে সবাই। শুভ্র পিছনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে ঘুরে রুমের দরজা নক করলো তবুও সারা শব্দ পেলো না। পর পর দু তিনবার নক করতেই লামিয়া দরজা খুলে দিয়ে বিরক্ত গলায় বললো ” কি চাই?”

” বাড়ির চাবি!”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া কপালে ভাঁজ ফেলে বললো ” কোন বাড়ির চাবি?”
” আমার বাড়ির চাবি।”
লামিয়া কিছুক্ষণ কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রইলো শুভ্রর দিকে। বেশ ভালো ভাবে খেয়াল করলো শুভ্র তাঁর দিকে একবারো তাকাচ্ছে না। মুখে কেমন বিরক্ত ছাপ।
তা দেখে লামিয়া চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে ফেললো।
লামিয়া কে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুভ্র অন্যদিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো ” কী হলো দিচ্ছেন না কেনো?”

” চাবি দিয়ে কী করবেন?”
” নিজের বাড়ির চাবি দিয়ে কী করে মানুষ?”
” জানি না! আপনি বলুন।”
” শুনেন আমি এখানে থাকবো না তাই চাবি দিন।নিজের বাড়িতে চলে যাবো। ”
” কেনো থাকবেন না?”
” কার জন্য থাকবো?”
” ওই বাড়িতে কার জন্য থাকবেন?”
” নিজের জন্য যাবো।”

লামিয়া নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে রুমের ভিতরে গিয়ে চাবি এনে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে চাবি বাড়িয়ে দিতেই শুভ্র থাবা দিয়ে চাবি নিয়ে লামিয়ার দিকে না তাকিয়ে চলে গেলো। লামিয়া অবাক হয়ে শুভ্রর যাওয়ার দিকে তাকালো। শুভ্র ভুল করেও তাকালো না লামিয়ার দিকে। তা দেখে লামিয়া মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে।
ওইদিকে দরজা খোলা পেয়ে ধরফর করে রুমে প্রবেশ করলো মাহির, তায়েব, তায়েবা। একটু আগে ইমন আর ইভান চলে গিয়েছে তাদের নিজেদের বাড়িতে।
তায়েবা, তায়েব, মাহির কে দেখে লামিয়া পিছন ঘুরে তাকিয়ে তাদের দিকে তাকালো। তায়েব, তায়েবা, মাহির চোরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া কোনো কথা না বলে বারান্দায় গিয়ে বসলো। তা দেখে মাহির, তায়েব, তায়েবা ও পা টিপে টিপে তার পিছনে দাঁড়ালো।

” আমার রুম থেকে বেরিয়ে যা। তোদের মতো বেইমান দের মুখ দেখতে চাই না।” তাঁদের তিনজনের দিকে না তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো লামিয়া।
” আমাদের মাফ করে দে বোন আমরা লুকাতে চাই নি কিন্তু শুভ্র ভাই নিষেধ করেছিলো আমাদের।” মন খারাপ করে বললো তায়েব।
” ওই বেডা গু খেতে বললে গু খাবি?” বলেই তাদের দিকে তাকালো।
লামিয়ার কথা শুনে তিনজনের মুখটা চুপসে গেলো। কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। তা দেখে লামিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আর কিছু না বলে চুপ করে বসে রইলো।
কিছুক্ষণ পর শুভ্র কাঁধে তাঁর ব্যাগ আর ব্ল্যাক কে কোলে তুলে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। তাঁর পিছন পিছন লতিফা, মনিরা, তাহমিনা,রাশেদা বেগম ও বেরিয়ে এলেন। লামিয়া চুপচাপ তাকিয়ে দেখতে লাগলো তাদের।
লতিফা বেগম চোখ মুছে শুভ্র কে কী কী যেনো বলছে শুভ্র ও হালকা হেসে তার জবাব দিচ্ছে। ব্ল্যাকি কে নিয়ে যেতে দেখে লামিয়ার মুখ টা কালো হয়ে এলো।‌ তখন ই ঘেউ ঘেউ করতে করতে জ্যাকি দৌড়ে শুভ্রর সামনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়াতে লাগলো।

শুভ্র রাশেদা বেগমকে কী যেনো বলে বিদায় নিতেই কোথা থেকে মিলি এসে দৌড়ে শুভ্রর হাত জড়িয়ে ধরলো। তা দেখে লামিয়ার চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো।
মাহির, তায়েব, তায়েবা মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একবার লামিয়ার দিকে তাকাচ্ছে আর একবার শুভ্র আর মিলির দিকে।
শুভ্র রেগে ঝাড়া দিয়ে মিলির থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। তারপর রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” ডোন্ট ক্রোস ইউর লিমেট মিলি। বলেছি না আমার থেকে দূরে থাকবে।”
শুভ্রর কথা শুনে মিলির মন খারাপ হয়ে এলো। শুভ্র বিরক্ত হয়ে চোখ ঘুরিয়ে উপরের দিকে তাকাতেই দেখলো এক জোড়া লাল বর্ণের চোখ। যা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। শুভ্র তা দেখে ও ইগনোর করে অন্যদিকে ফিরে সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে হাটা ধরলো। তাঁর পিছন পিছন মিলিও গেলো। তা দেখে লামিয়া চুপচাপ নিজের রুমে এসে বিছানায় বসলো। মাহির, তায়েব, তায়েবা চুপচাপ এসে বসলো লামিয়ার পাশে।
তাঁদের দেখে লামিয়া গম্ভীর গলায় বললো ” ছবি কোথায়?”

” ওর ঘরেই আছে , কোনো? ”
” ডেকে নিয়ে আয়।”
তায়েবা আর কোনো প্রশ্ন না করে বেরিয়ে গেলো ছবি কে ডাকতে।
” লামিয়া…!”
” বল….।”
” হঠাৎ ছবি কে দিয়ে কী করবি?”
” অনেক প্রশ্নের উত্তর আছে ওর কাছে। যা আমি এখন ই জানতে চাই। ”
মাহির আর কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইলো।
কিছুক্ষণ পর তায়েবা ছবি কে ডেকে নিয়ে আসলো। ছবি আসতেই লামিয়া গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
তা দেখে ছবি প্রশ্ন করলো ” দরজা আটকাচ্ছিস কেনো?”
লামিয়া এগিয়ে এসে আলমারির নিচ থেকে একটা মোটা লাঠি বের করলো। তা দেখে মাহির, তায়েব, তায়েবা,ছবির চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।

” এটা দিয়ে কী করবি?” ভয়ে ভয়ে বললো ছবি।
” পেটাবো।”
” কা…কাকে?”
” তোকে…!”
” কী বলছিস আমাকে অকারণে কেনো মারবি?”
” উহু অকারণে নয় কারণেই মারবো।”
” কী কারণ?”
” অনেক কারণ ই আছে। যেমন ধর আমার কাছ থেকে আমার ভালোবাসার মানুষ কে ছিনিয়ে নেওয়া। আরো অনেক কারণ। তবে আমার কার্বন কপি আমি তোকে মারবো না একটা শর্ত যদি মানিস তাহলে।”

” কী শর্ত…?”
” আমার সব কিছুর উত্তর চাই। সব কিছুর তোদের বিদেশ যাওয়ার পর থেকে যা যা ওইখানে হয়েছে সব কিছুর এ টু জেড খবর চাই আমার।”
ছবি লামিয়ার কথায় হালকা হেসে বললো ” আগে বললেই আমি তোকে বলে দিতাম এতো কাহিনী করার মানে হয় নাকি। কী জানতে চাস বল আমি সব বলবো আজকে তোকে।”
বলেই লামিয়ার বিছানায় বসলো। লামিয়া অবাক হলো ছবির কথায়। তবে বুঝতে না দিয়ে ঝটপট বললো ” সেদিন তোরা বেরিয়ে কোথায় ছিলি? কীভাবে কতোখানি এসেছিস? আর শুভ্রর সাথে তুই এতো দিন এক সাথে ছিলি? তোদের সাথে কিছু…..”
ছবি হেঁসে উঠলো

” আরে ভাই আস্তে আস্তে প্রশ্ন কর। একবারে এতো প্রশ্ন করিস না। আমি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না।”
বলেই থামলো তাঁর পর বলতে শুরু করলো ” সেদিন রাতে সবাইকে হারিয়ে আমরা দুজন যে কীভাবে দিন রাত কাটিয়েছি সেটা কেবল আমরাই জানি। সাত দিন আমরা খাবার না খেয়ে, শুধু পানি খেয়ে বেঁচে ছিলাম। না খেতে পেয়ে আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি সাথে শুভ্র ভাই ও। তবে আমার চেয়ে শুভ্র ভাই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। তারপর আমরা খিদে আর সহ্য না করতে পেরে অসুস্থ শরীর নিয়েই মানুষের কাছে হাত পাততে শুরু করলাম। যে ছেলে মেয়েরা কোনো দিন কোনো অভাব দেখে নি, খালি পেটে থাকে নি, সবসময় মায়ের আঁচলের তলায় ছিলো তাঁরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করেছিলো সেদিন। কেনো জানিস দু মুঠো খাবারের জন্য।

সেদিন আমরা কিছু টাকা পেয়েছিলাম সেই টাকা দিয়েই রুটি কিনে খেয়ে দুজন রাত টা পার করেছি। তবে ভাতের খিদে কী আর রুটিতে মিটে বল? এইভাবেই পার হয়ে গিয়েছিলো দু দিন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে লাগলাম একটু খাবারের জন্য। না খেতে পেয়ে খিদে আর সহ্য হচ্ছিলো না দূর্বল হয়ে হঠাৎ রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম সেদিন। শুভ্র ভাই আমাকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো। তখন শুভ্র ভায়ের ই বা বয়স কতো ছিলো বল। সবে তো সে তেরো বছরের ছিলো। আমাকে নিয়ে কোথায় যাবে কী করবে ভেভে না পেয়ে সেখানে দাঁড়িয়েই কাঁদতে লাগলো শুভ্র ভাই। ছোট্ট মাথায় যখন খেয়াল আসলো তখন আমাকে কোলে তুলে নিয়ে হসপিটালে কোথায় আছে তা খুঁজতে খুঁজতে দৌড়াতে লাগলো রাস্তা দিয়ে। আশে পাশে না তাকিয়ে সেদিন দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তা পার হতেই আচমকা একটা গাড়ি এসে বারি মেরে ফেলে দিয়ে গেলো শুভ্র ভাই কে। শুভ্র ভাই ছিটকে দূরে গিয়ে পড়লো তাঁর সাথে আমিও। আমার তেমন ক্ষতি না হলেও শুভ্র ভাই মাথায় আঘাত পেয়েছিলো সেদিন। রক্তাক্ত অবস্থায় পরে ছিলো শুভ্র ভাই। আশেপাশে কেউ ধরতে আসে নি আমাদের।

যখন চোখ খুলে তাকালাম তখন দেখলাম আমি হসপিটালে। আশেপাশে তাকিয়ে শুভ্র ভাইকে দেখতে না পেয়ে কাঁদতে লাগলাম। তখনই কেউ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম মধ্যে বয়সী একজন ভদ্রমহিলা । দেখতে ভীষণ সুন্দরী। দুধে আলতা গায়ের রং। আমাকে দেখে মহিলাটি হেঁসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো ” এখন তোমার কেমন লাগছে?”
আমি বেশ ভয়ে ভয়ে বলে উঠলাম

” শু… শুভ্র ভাই কোথায়?
” ওই ছেলেটা তোমার ভাই হয়?”
” হ্যাঁ! কোথায় শুভ্র ভাই?”
আমার কথা শুনে মহিলাটি বেশ নরম গলায় বললো ” তোমার ভাইয়া আছে পাশের কেবিনে। এখন বলো তোমার মা – বাবা, বা তোমার ফ্যামিলি কোথায়?”
পরিবারের কথা শুনেই ছবি ডুকরে কেঁদে উঠলো। তারপর একে একে সব কিছু জানাতেই মহিলাটি অবাক হলো। তবে ছবি আর শুভ্রর জন্য তার মায়াও হচ্ছে।
ছবি কাঁদতে কাঁদতে বললো ” প্লিজ আমাকে আমার শুভ্র ভাইয়ের কাছে নিয়ে চলুন।”
মহিলাটি ছবি কে কেলে বসিয়ে মিষ্টি হেঁসে বললো ” নিয়ে যাবো তো আম্মু তবে তোমার ভাইয়ের মাথায় ব্যাথা পেয়েছে তাই এখন রেস্ট করছে পরে দেখতে পাবে। ”
” কী হয়েছে শুভ্র ভাইয়ের?” কাঁদতে কাঁদতে বললো ছবি।

মহিলাটি ধীরে ধীরে ছবি কে সব বলতেই ছবি ডুকরে কেঁদে উঠলো। এই অচেনা জায়গায় শুভ্র ছাড়া তার আর কোনো আপন মানুষ নেই। এখন যদি শুভ্রর কিছু হয়ে যায় তাহলে তাঁর কী হবে। ভেবেই কেঁদে উঠলো।
মহিলাটি ছবি কে শান্তনা দিলো তারপর ছবি কে কোলে তুলে আই সিউর সামনে এসে দাঁড়ালো। ছবি দরজা থেকে শুভ্র কে দেখলো নিথর হয়ে শুয়ে আছে বেডে। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে।শুভ্র কে এমন দেখতে পেয়ে ছবির বেশ কান্না পেলো। মহিলাটি ছবি কে নিয়ে আবার কেবিনে এনে বসিয়ে খাবার খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে চলে গেলো শুভ্রর কাছে। প্রায় এক সপ্তাহ পর শুভ্রর জ্ঞান ফিরে ছিলো। এর মধ্যেই ছবির সাথে ভদ্রমহিলার ভীষণ ভাব জমে উঠেছে। শুভ্রর জ্ঞান ফেরার পর ভদ্রমহিলা ছবি আর শুভ্র কে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। বিশাল বড় বাড়ি দেখে শুভ্র আর ছবি অবাক হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো সব কিছু।

শুভ্র ভদ্রমহিলা কে জিগ্যেস করতেই তিনি সব খুলে বললো।
ভদ্রমহিলাটির নাম রাবেয়া। একজন নামকরা বিজনেস ওমেন। তাঁর স্বামী তাঁকে রেখে অন্য মহিলার হাত ধরে চলে গিয়েছে, কোনো সন্তান কেউ নেই তার। বিশাল বড় বাড়িতে তিনি একা থাকেন। আর সে চায় আজ থেকে শুভ্র আর ছবি তাঁর সাথে থাকুক, তাঁর ছেলে মেয়ে হয়ে।

তাঁকে মা বলে ডাকুক তাঁরা দুজন। কথাটা শুনে শুভ্র ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো রাবেয়া বেগমের দিকে। তারপর ছবির দিকে তাকিয়ে কিছু ভেবে রাজি হয়ে গেলো। এইভাবেই কাটছিলো দিন আমাদের। আমরা তাঁকে মা না বললেও মণি মা বলে ডাকতাম। মণি মা আমাদের স্কুল ভর্তি করিয়ে দিলো। নতুন নামে গড়ে তুলেন আমাদের। আমি ছবি থেকে হয়ে উঠি আবিরা আর শুভ্র ভাই শুভ্র থেকে হয়ে উঠে আবরার।
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। শুভ্র ভাইয়ের পিছনে অনেক শত্রু লেগে যায়। মণি মায়ের বিজনেসের কারণে। সবার সামনে শুভ্র ভাই একজন নামকরা বিজনেস ম্যান হলেও আড়ালে তিনি ডিটেকটিভ অফিসার ফ্যালকন। মণি মায়ের বিজনেস দেখাশোনার পাশাপাশি নিজের পেশা কে ও ধরে রেখেছিলো। শুভ্র ভাইয়ের সবসময় একটাই কথা ছিলো যারা আমাদের পরিবার কে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তাদের কাউকে এই দুনিয়ায় রাখবে না।

এর মাঝে শুভ্র ভাই মণি মায়ের সাথে কথা বলে বাংলাদেশে তোদের সবার খোঁজ খবর ও নিয়েছে। তোর পিছন সর্বদা একজন মানুষ থাকতো আড়ালে। তুই কী করছিস না করছিস সব খোঁজ খবর রাখতো শুভ্র ভাই। তবে তোদের কাছে আসতাম না কারণ যদি আমাদের কারণে তোদের কারোর ক্ষতি করে দেয় তখন? এই ভয়ে বাংলাদেশে পা রাখি নি আমরা কেউ। তবে মণি মায়ের বিজনেস এর কাজে শুভ্র ভাই বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে আসতো। বাংলাদেশে এসে কাজের ফাঁকে দূর থেকে তোদের সবাইকে দেখে যেতো। তোর বদলে যাওয়া দেখে শুভ্র ভাই পাগলের মতো ছটফট করতো। মণি মায়ের কোলে মুখ গুঁজে কতো কান্না করেছে তোর জন্য হিসেব নেই কোনো।
লন্ডনে মণি মায়ের বাড়িতে যদি তুই যেতে পারতি লামিয়া, তুই যদি একবার শুভ্র ভাইয়ের বুক ফাটা চিৎকার শুনতে পেতি একবার তাহলে শুভ্র ভাইয়ের প্রতি ঘৃণা করার সাহস পেতি না।

শুভ্র ভাই রোজ পুরছে তোকে সেদিনের বলার ওই কথার জন্য। শুভ্র ভাইয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই আর না অন্য কারোর মেয়ের সাথে ছিলো। সেদিনের যে ছবি দেখেছিলি আমি তোকে পাঠিয়েছিলাম সেই মেয়ে আমার স্কুলের এক ফ্রেন্ড তিশা ছিলো। প্রায় সময় আমাদের বাড়ি আসতো। শুভ্র ভাই কে এক দেখায় বেশ ভালো লেগেছিলো। আমি যখন জানলাম তখনই বললাম প্রপোজ করে দিতে। আমার কথা অনুযায়ী তিশা সেদিন শুভ্র ভাই কে প্রপোজ করে শুভ্র ভাই রিজেক্ট করে দেওয়ায় শুভ্র ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেছিলো তখনই আমি কয়েকটা ছবি তুলে রেখেছিলাম তোকে দেবার জন্য। কারণ তুই এসব দেখলে ভীষণ কষ্ট পাবি তাই । আর তোকে কষ্ট দেবার জন্যেই আমি পাঠিয়েছিলাম সেদিন ওই ছবি গুলো। আর তুইও আমার ফেলানো টোপে পা দিয়েছিলি। শুভ্র ভাই কে তুই সেদিন এসব বলাতে শুভ্র ভাই অনেকবার তোকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো কিন্তু তুই সেদিন বুঝিস নি। তাই রাগ করে বাধ্য হয়ে বলে দিয়েছিলো যে হ্যাঁ ওই মেয়েকে ভালোবাসি আর বিয়ে করবো। বলেই মামনির ফোন রেগে আছাড় মেরে ভেঙে দিয়েছিলো। তাঁর জন্য তুই কল করার পর আর শুভ্র ভাইকে লাইনে পাস নি।

যখন শুভ্র ভাইয়ের রাগ কমলো তখনই সেই কালো রাত আমাদের উপর আসলো। আর এখানে এসেছিলো কাজের সূত্রে । ওই নাসির কায়সার এর জন্য। রাশেদ,লাবিব আর জাহিদ ভাই ও এই মিশনে ছিলো। তবে তাঁরা প্রথমে কেউ চিনে নি শুভ্র ভাইকে। যখন শুভ্র ভাই নিজের পরিচয় জানালো তখন তাঁরা চিনতে পেরেছে। তারপর মেজো মামা কে খবর পাঠালে মেজো মামা সেখানে উপস্থিত হতেই শুভ্র ভাইকে দেখে বুকে জড়িয়ে কেঁদে উঠলো। শুভ্র ভাই সেদিন কাছের মানুষদের কাছে পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে নি মামা কে জড়িয়ে সে ও কান্না করেছিলো । তারপর পুরো ঘটনা খুলে বলতেই এই যে সবাই এক হলো। তারপর আবার শুভ্র ভাই লন্ডন ব্যাক করতে চেয়েছিলো কিন্তু চলে যাবার আগে তাদের টিমের একটা মিশন ছিলো তবে ভুল বসতো সেদিন তাদের সিকিউরিটি বেবি ডগ হারিয়ে গিয়েছিলো। আর সেই কুকুর টি আর কারোর কাছে না তোর কাছেই এসে পড়লো।” বলে থামলো ছবি।
লামিয়া অবাক হয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে বললো ” মানে?”
ছবি তা শুনে মুচকি হেসে আবার বলতে শুরু করলো

” মানে তুই যাকে জ্যাকি বলে এতো মাস নিজের সন্তানের মতো বড় করেছিস সে রাস্তার কুকুর নয়। সেটা পুলিশের কুকুর তাঁর নাম চ্যাম্প। এই চ্যাম্প এর মা ও আছে । তোর থেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু শুভ্র ভাই নিতে দেয় নি ওকে তোর থেকে। চ্যাম্প কে যেদিন পেয়েছিলি সেদিন ই তোর সাথে নাসির কায়সার এর দেখা হয়েছিলো। আর নাসির কায়সার তোকে প্রথম দেখেই তোকে পছন্দ করে বসে।
তোর জন্যই মামাদের কম্পানি কে অফার করে তাদের কম্পানির সাথে যেনো কাজ করে। রাশেদ, লাবিব, জাহিদ ভাই আর মেজ মামা সব কিছু জেনেও কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চুপচাপ রাজি হয়ে যায়।

তারপর তোর মনে আছে মাঝ রাস্তায় তোর সামনে শুভ্র ভাই একজন কে গুলি করেছিলো? তুই তখন চিনতি না শুভ্র ভাই কে, হয়তো ভুল ভেবেছিলি কেনো মেরেছে? সেদিন অফিসে রাশেদ ভাইয়ের কাছে টাকা আনার জন্য অফিসে গিয়েছিলি সেদিন কায়সার ও ওইখানেই ছিলো। কায়সার তোকে তুলে নিয়ে যাবার জন্য তোর পিছনে লোক পাঠিয়ে ছিলো। আর শুভ্র ভাই তাঁর জন্য লোক গুলো কে গুলি করেছিলো। কায়সার অনেকবার তোকে তুলে নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু শুভ্র ভাইয়ের জন্য পারে নি। এমন কি সেদিন হলুদের রাতে তোকে তুলে নেওয়ার জন্য ওই কায়সার ই লোক পাঠিয়ে ছিলো। সেদিন ও তোকে শুভ্র ভাই বাঁচিয়ে ছিলো।

আর বাড়ির সবাই জেনেছিলো তোরা যেদিন আয়না ভাবী কে তুলে আনতে গিয়েছিলি সেদিন। তুই মাতাল অবস্থায় ছিলি তাই কিছু জানতে পারিস নি আর কেউ কিছু জানায় ও নি, আর শুভ্র ভাইও বারণ করেছিলো সবাইকে। তোর রাগ শুভ্র ভাই নিজে ভাঙতে চেয়েছিলো কিন্তু তাঁর আগেই তুই জেনে গিয়েছিস। তবে শুভ্র ভাই তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে। সবসময় তোর ছায়া হয়ে তোর পাশে থাকে কিন্তু তুই তো অন্ধকারে হাটিস তাই দেখতে পাস না। তুই কী কষ্ট পেয়ছিস তার থেকে দ্বিগুণ কষ্ট শুভ্র ভাই পেয়েছে। শুভ্র ভাই অনেক কষ্ট পেয়েছে রে আমি জানি তুই ও পেয়েছিস তবে দুজনের মধ্যে সব ভেজাল ঠিক করে নে। শুভ্র ভাইকে আর কষ্ট দিস না। তুই ছাড়া শুভ্র ভাইয়ের কেউ নেই রে লামু।”

লামিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে মাথা নিচু করে। গলা দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। তায়েব, তায়েবা, মাহির ও চুপ করে বসে আছে। ছবি লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে হয়তো কিছু শোনার জন্য। কিন্তু লামিয়া কিছু না বলে গম্ভীর গলায় বললো ” আমি একটু একা থাকতে চাই বেরিয়ে যা এখন রুম থেকে।”
লামিয়ার কথা শুনে সবাই আস্তে করে বেরিয়ে গেলো। সবাই বেরিয়ে যেতেই লামিয়া বসা থেকে উঠে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।
তাঁর কিছু ভালো লাগছে না। সব কিছুই তো ভালো ছিলো তাহলে এমন এলোমেলো কেনো লাগছে। না আর মাথায় কিছু নেওয়া যাবে না। ভেবেই বারান্দা থেকে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো।

গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেয়ারা খাচ্ছে তায়েবা। পরনে তার কার্গো পেন্ট গাঁয়ে কালো গেঞ্জি, বা হাতে সবসময় একটা কলো একটা ব্রেসলেট থাকে, মাথায় উঁচু করে ঝুঁটি করা, লামিয়ার মতো পুরো চুল লেয়ার কার্ট দেওয়া, তবে লামিয়ার চুল কোমড় ছেঁড়ে চলে গিয়েছে কিন্তু তায়েবার চুলগুলো সবসময় কেঁটে মাঝারি সমান করে রাখে, না বড় হতে দেয় আর না ছোট্ট। তা দেখে বিরক্ত হলো জাহিদ। তায়েবা কে এর জন্য তার ভীষণ বিরক্ত লাগে। এক নাম্বারের ঘাউরা স্বভাবের মেয়ে। লামিয়া সবসময় কামিজ পড়ে থাকে আর এই মেয়েকে শুধু বিয়েতেই দেখলো মেয়েদের জামা পড়তে। তা ছাড়া এই মেয়েকে টপস, গেঞ্জি, পেন্ট, শার্ট পড়তেই দেখে। ভেবেই বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকালো জাহিদ। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেলো তায়েবার সামনে। তায়েবা পেয়ারায় কামড় দিয়ে মাথা তুলে জাহিদ কে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বললো ” কী?”

” কী..?” জাহিদ ও তায়েবার মতো করে ভ্রু নাচিয়ে বললো।
” কী সমস্যা আমার নকল করছেন কেনো?”
” তুই কোন দেশের প্রেসিডেন্ট যে তোর নকল করতে যাবো?”
” প্রেসিডেন্ট না তবে তাঁর চেয়ে ও বেশি কিছু।”
” এই তুই নিজেকে কী মনে করিস..?”
” আমার ভবিষ্যৎ জামাইয়ের বউ, আর ভবিষ্যত প্রজন্মের মা।”
জাহিদ বেশ বিরক্ত হয়ে বললো
” ত্যারা ত্যারা কথা না বলে এখন বল এই সন্ধ্যা সময় এখানে কী তোর?”
” নাচতে এসেছি , দেখতে পাচ্ছেন না?”
” এমন ত্যারা ত্যারা কথা বলবি না। ”
” একশোবার বলবো। কী করবেন?”

জাহিদ তায়েবার কথা শুনে বেশ শীতল দৃষ্টিতে তাকালো তাঁর দিকে। তায়েবা পেয়ারা চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে আছে জাহিদের দিকে। তায়েবার এমন চাহনি দেখে জাহিদ নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। তায়েবা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আচমকা জাহিদ তায়েবার কোমড় চেপে নিজের কাছে টেনে একদম কাছে নিয়ে আসলো। তায়েবা বড় বড় চোখ করে ফেললো । কিছু বোঝার আগেই জাহিদ তায়েবার ওষ্ঠ চেপে ধরলো। তায়েবা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে নিলো। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের স্পর্শে তায়েবা বরফের ন্যায়ে পরিণত হলো।
হাত থেকে পেয়ারা পড়ে গেলো। তায়েবার হুস আসতেই জাহিদের বুকে কিল ঘুষি মারলো কিন্তু জাহিদ ছাড়লো না বরং আরো চেপে ধরলো।

” তোদের চুম্মা চাটি শেষ হলে কী আমরা নিচে নামতে পারবো নাকি গাছেই চরে থাকবো কোনটা? সন্ধ্যার আজান দিচ্ছে তো।”
হঠাৎ কারোর কথায় জাহিদের ধ্যান ভাংতেই তায়েবার থেকে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। ছাড়া পেতেই তায়েবা বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছে। জাহিদ মাথা তুলে গাছের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো। গাছে তায়েব আর মাহির দাঁত কেলিয়ে বসে আছে তাও হাতে মোবাইল নিয়ে। তা দেখে জাহিদ তায়েবার দিকে তাকালো তায়েবা পারছে না চোখ দিয়ে তাঁকে জ্বালিয়ে দিতে। জাহিদ ভাবতে পারে নি এই দলের তিনটা এক সাথে ছিলো। এখন কী হবে। ভেবেই তায়েবার দিকে তাকালো। তায়েবা রেগে ফুস ফুস করতে করতে বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো বাড়িতে। জাহিদ অসহায় চোখে মাহির আর তায়েব এর দিকে তাকিয়ে দেখলো তাঁরা এখনো দাঁত কেলিয়ে আছে। জাহিদের মুখ দেখে, গাছে থেকে তায়েব দাঁত কেলিয়ে বলে উঠলো ” আরে জাহিদ ভাই প্যারা নিবেন না আমরা কেউ কিছু দেখিনি টপ সিক্রেট।”

জাহিদ তায়েব এর কথায় আস্তে করে বললো ” সত্যি তো?”
উপর থেকে মাহির বলে উঠলো ” হুম হুম ভাই টপ সিক্রেট।”
মাহির আর তায়েব এর কথা শুনে জাহিদ একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে তাদের দুজনকে বিশ্বাস করে চলে গেলো।
জাহিদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাহির আর তায়েব গাছ থেকে নেমে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধা আংগুল দেখিয়ে এক সাথে বলে উঠলো ” টপ সিক্রেট।”
বলেই চোখ মারলো। তারপর সয়তানি হেঁসে চলে গেলো বাড়িতে।

রাত প্রায় দশটা।
পিটপিট করে চোখ খুলে দেখলো চারদিকে অন্ধকার। লামিয়া চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠে বসলো। হাত বাড়িয়ে বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করতেই দেখলো দশটা বাজে। তা দেখে ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো। বিছানা থেকে উঠে লাইট অন করে আলমারি থেকে জামা বের করে চলে গেলো গোসল করতে। গোসল না করলে ভালো লাগবে না তাঁর। তাই চলে গেলো গোসলে। বেশ কিছুক্ষণ পর শীতে ঠক ঠক করতে করতে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো ।

চুল থেকে গামছা খুলে চুল ঝাড়তেই দরজায় কেউ কড়া নাড়লো। লামিয়া এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো হামিদ সাহেব দাঁড়িয়ে আছে হাতে চেক বই আর কিছু ফাইল হাতে নিয়ে।
” বাবা তুমি কী হয়েছে কিছু বলবে?”
হামিদ সাহেব কথার উত্তর না দিয়ে ঝটপট রুমের ভিতরে গিয়ে বিছানায় বসে কপালে ভাঁজ ফেলে বললো ” তুমি এতো রাতে গোসল করেছো কেনো?”
” সারা দিন গোসল করা হয়নি তাই এখন ঘুম থেকে উঠে গোসল করে নিলাম এই আর কি। ”
” সারাদিন তো কিছু খাবার ও খাও নি তাই না?”
” খিদে নেই বাবা।”

” হ হ খাবি ক্যান তোরা? তুই একটা সারাদিন না খাইয়া আছোছ, ওই বাইত্তে শুভ্র একটা না খাইয়া আছে। তাঁর উপর দেখ গা হাত অর্ধেক কাইট্টা আনছে কোথা থেইক্কা জানি। কতো কইরা কইলাম আয় দাদুভাই আমাগো বাইত্তে আয়। কিন্তু না তার একটা কথাই যে বাড়িতে তার কোনো মূল্য কেউ দেয় না সে বাড়িতে কেনো খাবে। কতো কইরা বুঝাইলাম কিন্তু না আইলোই না।”

বলতে বলতে লামিয়ার রুমে প্রবেশ করলো আজমেরী বেগম। লামিয়া কিছু না বলে আজমেরী বেগম এর দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো । আজমেরী বেগম এর কথা শুনে হামিদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললো ” ঠিকই তো বলেছে। যাই হোক বাদ দিন আম্মা আমাদের কী যার যার টা সে সে দেখুক।” বলেই লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” লামিয়া দ্রুত এই চেক বইয়ে একটা সই করে দাও।”
লামিয়া এগিয়ে গিয়ে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সই করে দিলো। লামিয়ার সই করা শেষে হামিদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললো ” খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যেও। বাড়ির সবার খাবার খাওয়া শেষ।” বলেই চলে গেলো।
আজমেরী বেগম দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো ” আহহ জীবন। এই আছি এই নাই, পোলাডা কিছু খায় নাই সারাদিন তাঁর উপর কতোখানি হাত কাইট্টা আইছে দেখলাম। আহারের মা মরা পোলাডার লেইগ্গা বড্ড আফসোস হোইতাছে রে। ” বলেই চলে গেলো।

লামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ তারপর বারান্দায় গিয়ে শুভ্রর বাড়ির দিকে তাকালো। বাড়িতে কোনো লাইট জ্বলছে না। এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলো নাকি, বাড়িতে নেই? ভেবেই লামিয়ার মুখে চিন্তার ছাপ পড়লো। আর কিছু না ভেবে গায়ে উড়না পেঁচিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। বাগানে গিয়ে জ্যাকি কে খুঁজলো কিন্তু পেলো না। তাঁর মানে সেই সকালে শুভ্রর সাথে গিয়েছে এখনো আসে নি। ভেবেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হাঁটা ধরলো শাহরিয়ার শুভ্রা নিবাসের দিকে।

বাড়ির কাঠের দরজা হালকা ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো তা দেখে লামিয়া বিরক্ত হলো বেশ। এইভাবে কেউ দরজা খুলে রাখে যদি চো*র ডা*কাত আসে তখন কী হবে। ভাবতে ভাবতে পা টিপে টিপে বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখলো জ্যাকি আর ব্ল্যাকি শুয়ে আছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো শুভ্র নেই। কারোর পায়ের শব্দ পেতেই জ্যাকি আর ব্ল্যাকি মাথা তুলে তাকালো। লামিয়া কে দেখে দৌড়ে লামিয়ার কাছে এগিয়ে গেলো।
লামিয়া তাদের দেখে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো।

” আমার বাড়িতে কী চাই মেডাম?”
শুভ্রর কন্ঠ শুনে লামিয়া চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলো শুভ্র কিচেনে পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।
লামিয়া ছোট্ট ছোট্ট ফেললো এই লোক তাকে না দেখে বললো কীভাবে সে এখানে আছে। আসার সময় তো একটু শব্দ ও হয়নি তাহলে। ভাবনার মাঝেই শুভ্র সামনে ঘুরে বলে উঠলো ” আপনার শরীরের ঘ্রাণ এতো মারাত্মক যে আমি চোখ বুজেই বলে দিতে পারবো আপনি কোথায় আছেন। তাই এতো চিন্তা করে নিজের মাথায় পেশার দিবেন না। ভাবার জন্য আমি আছি তো আপনি শুধু আমাকে নিয়ে ভাবুন তাহলেই হবে। ”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া চমকে উঠলো। এই লোক কী তার মনের কথা ও শুনতে পাই নাকি?
লামিয়ার মুখ দেখে শুভ্র হালকা হেঁসে বললো ” তা এখানে কীসের জন্য এসেছেন?”

” জ্যাকি কে নিতে এসেছি। আর আপনি এসেছেন ভালো কথা ব্ল্যাকি কে কেনো নিয়ে এসেছেন?”
” আমার মেয়েকে আমি নিয়ে আসবো না তো রেখে আসবো না কি?”
” হ্যাঁ রেখেই আসবেন। আমি ওদেরকে আমার সাথে নিয়ে যাবো।”
” আপনি আপনার ছেলে কে নিয়ে যেতে পারেন তবে আমার মেয়ে কে আমি দিবো না।”
” কেনো দিবেন না?”
” কেনো দিবো আপনাকে? আপনি আমার মেয়ের কে হন যে আমার মেয়েকে আপনার কাছে বা আপনার বাড়িতে দিবো?”

শুভ্রর কথায় লামিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কোনো কথা বললো না। তা দেখে শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এক হাত দিয়ে চুলা থেকে গরম পানি নামাতেই অসাবধানতায় পায়ে পড়ে যায়। লামিয়া আঁতকে উঠে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে শুভ্র কে ধরে। শুভ্র চোখ মুখ বন্ধ করে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আছে। লামিয়া দ্রুত শুভ্র কে টেনে চেয়ারে বসিয়ে জগ থেকে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলো শুভ্রর পায়ে। ফর্সা পা লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। লামিয়া তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে মলম আনতে চলে গেলো। শুভ্র লামিয়ার অস্থিরতা দেখে পায়ের জ্বালা ভুলে মুচকি হাসলো।
লামিয়া মলম এনে শুভ্রর পায়ে লাগিয়ে দিতে দিতে বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো ” দেখে কাজ করতে পারেন না?”

” না পারি না।”
” তা পারবেন কেনো? শুধু তো পারেন মানুষকে কষ্ট দিতে। তা ছাড়া আর কিছু পারেন নাকি?”
” আমি যে খারাপ তাই সবাইকে কষ্ট দেই। চলে যান এই খারাপ মানুষের থেকে দূরে।”
” সবসময় উল্টা পাল্টা কথা বলাটা কী আপনার পেশা?”
” যা ইচ্ছে ভাবতে পারেন”
” আগে তো এমন ছিলেন না।”
” আগে তো আপনিও এমন ছিলেন না।”
” হাত কাটলো কীভাবে?”
” জানাতে বাধ্য নই।”
” তা আমাকে জানাবেন কেনো? মিলি আছে তো তাকে জানান গিয়ে। এসে সকালের মতো জড়িয়ে ধরবে তখন খুব মজা লাগবে।”

” আইডিয়াটা খারাপ দেন নি কিন্তু।”
লামিয়া কোনো কথা বললো না। তা দেখে শুভ্র বললো
” হয়েছে এখন পা ছাড়ুন। জ্বালা করছে না আর।”
লামিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললো ” খাবার খান নি?”
” না!”
” কেনো?”
” খিদে নেই তাই।”
” এই গরম পানি করেছিলেন কেনো?”
” কফি খেতে চেয়েছিলাম তাই।”
” দাদী যে আপনাকে ডেকেছিলো খাবার খেতে যান নি কেনো?”
” যে বাড়িতে আমার জন্য ভালোবাসা নেই সেই বাড়িতে গিয়ে কি করবো?”
” সবাই আপনাকে ভালোবাসে মিথ্যে কেনো বলছেন?”
” সবার ভালোবাসা পেলেও একজনের ভালোবাসা তো পাই নি।”

” ওই একজনের ভালোবাসা পাওয়া কী খুব প্রয়োজন? কতো মানুষ আছে ভালোবাসার জন্য ওই একজনের ভালোবাসা না পেলে কিছু যায় আসবে না।”
” অনেক কিছু যায় আসে। ওই একজনের ভালোবাসার জন্য আমি ছটফট করি কীভাবে বোঝাবো ঝি মানুষটিকে?”
” বোঝানোর কোনো দরকার নেই। ” বলেই উড়না কাঁধে ঘুরিয়ে কোমড়ে পেঁচিয়ে চলে গেলো রান্নাঘরের। ভেজা চুল গুলো থেকে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে।
শুভ্র তা দেখে পিছন থেকে বলে উঠলো ” কোথায় যাচ্ছেন?”

” জাহান্নামে।”
” এতো রাতে গোসল করেছেন কেনো?”
” ইচ্ছে করেছে তাই।” বলেই ফ্রিজ খুলে মাংস বের করে নিলো।
” বিয়ের আগেই এতো রাতে গোসল বাহ্। আপনার জামাই কিন্তু অনেক লাকি হবে।”
” চুপ করুন ফালতু লোক। বেশি কথা বলবেন না। মুখ খুললেই ফালতু কথা বেরোতেই থাকে। ”
” হ্যাঁ তবে আপনি সামনে আসলে আমার চোখ বড্ড খারাপ হয়ে যায়, আর মুখের কথা আর কী বলবো , আপনাকে দেখলে মুখ থেকে ফালতু কথা বেরিয়ে যায় কী করবো বলেন?”
লামিয়া বিরক্ত নিয়ে কপাল কুঁচকে মুখ থেকে “চ” শব্দ করে কাজ করতে লাগলো। শুভ্র তা দেখে মুচকি হেসে বললো ” আপনি রান্না করছেন কেনো?”
” খিদে পেয়েছে তাই।”
” তো নিজের বাড়িতে গিয়ে খান আমার বাড়িতে কেনো রান্না করে খেতে হবে?”
” আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করলাম না। ”
শুভ্র কিছু বলবে তার আগেই শুভ্রর ফোন বেজে উঠলো। শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে ফোন নিয়ে উঠে চলে গেলো।
লামিয়া নিজের মতো কাজ করতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ পর লামিয়া পেঁয়াজ কাটতে কাটতে গুন গুন করে গেয়ে উঠলো

~ যদি তুমি দূরে কভু
যাও চলে…..
শুধু মরণ হবে
আর কিছু নয়।।।।
শুভ্র সবেই ফোন রেখে কিচেনে পা দিয়ে কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হতেই লামিয়ার গান শুনে থেমে গেলো। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকালো লামিয়ার দিকে। চুলের পানিতে পিঠ ভিজে গিয়েছে, টুপ টুপ করে পানি পড়ছে এখনো চুল থেকে। শুভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে লামিয়ার কোমড় জড়িয়ে ধরতেই লামিয়া চমকে উঠলো। শুভ্র তা দেখে লামিয়ার কোমড় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখে ধীর গলায় গেয়ে উঠলো

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৪

~ তোমায় ছেঁড়ে
বহু দূরে যাবো কোথায়…?
এক জীবনে এতো প্রেম
পাবো কোথায়….?

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৫ (২)