Home প্রেমতৃষা প্রেমতৃষা পর্ব ১০

প্রেমতৃষা পর্ব ১০

প্রেমতৃষা পর্ব ১০
ইশরাত জাহান জেরিন

রাতে একটা দুঃস্বপ্নে ঘুমটা ভেঙে গেল। এমন ভয়ানক স্বপ্ন কখনো এর আগে আসেনি। তনিমা আফরোজ দোয়া পড়তে পড়তে ডাইনিং রুমে গেল। গ্লাসে জল ঢেলে খেয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। মেয়েটা তার কই সে কিছুই জানে না। কেন যে এমন করল? তৃষার বাবা তারিকুল ইসলাম ভেতর দিয়ে একটু অন্যরকম। দুনিয়ার সব কিছু সে সহ্য করতে পারবে তবে অসম্মান নয়। কত আদর – যত্ন দিয়ে তৃষাকে মানুষ করিয়েছেন। পড়ালেখা করিয়েছেন। কখনো কোনো কিছুতে বাঁধা দেয়নি। ওর সাথের যখন সবার বিয়ে গেল তখনো পড়িয়েছেন মেয়েকে। সেই মেয়ে পরিবারের কোন সম্মান রাখল? সব শেষ। সব কিছুই শেষ।

বাড়ির মেয়ে যেদিন বাড়ির অসম্মান করে পালিয়ে গেল সেদিন রাতে তৃষার সব জিনিস, সব কিছুই বাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছিলেন তরিকুল। মনে ব্যথা পেয়েছেন তো! তৃষাকে সেদিনই মনে মনে কবরে শুইয়ে দিয়েছিলেন সে। ওই মেয়ে তার জন্য মৃত। বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া থেকে শুরু করে কত আবদার রেখেছেন তার ফল তো পেলেনই। সবাই যখন বলত, ‘মেয়ে মানুষের এত নাচন-কুদন ভালা না। একটা বিয়া করাইয়া দাও সময় থাকতে থাকতে।’ তখন তরিকুল মেয়ের হয়ে সাফাই গেয়েছিলেন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তার ঢাল হয়ে ছিলেন। তৃষার একটাই সমস্যা যুবরাজ রাজনীতি করে আর সেই রাজনীতি তৃষার বড্ড অপছন্দ। আরে বিয়ে করে স্বামীকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিলেই তো হতো। রাজনীতি করে তো কী হয়েছে? ওই ছেলের কত ক্ষমতা সেই সম্পর্কে ধারণা আছে? ওইদিন যুবরাজ যখন জিম্মি করেছিল তাদের তখন লজ্জায় চোখে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পেয়ে পাগলের মতো সব কর্মকাণ্ড করেছে। পাগল ভাবুক। ওই প্রশ্নের তো জবাব নেই। তাই পাগল হয়েই হা হয় তার চোখে থাকুক। তনিমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এ-ই রাতটা শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটবে কখন?

সাইন্ড বক্সে তখন লো ভলিউমে একটা গান বাজছে। ‘প্রেম আমার ওওওওওও প্রেম আমার।’ সেই গানের সঙ্গে কে যেন শিস বাজাচ্ছে আর গুন-গুন করছে সেই বদ্ধ ঘরটিতে। কালো হুডি পড়া লোকটার মুখে এতক্ষণ ভয়ানক দেখতে যেই মুখোশটা ছিল সেটা সে খুলে টেবিলের ওপর রেখেছে। হাতে তার একটা লাল গোলাপ। মুখোশটা মুখের ওপর থেকে সরাতেই তার অতি সুদর্শন মুখখানার দর্শন পাওয়া গেল। যেই মেয়েটা ঘরের কোণে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে তার এই মুখশ্রী দেখে কোনোভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে এই সুন্দর চেহারার পেছনে লুকিয়ে আছে একটা ভয়াল রূপ। লোকটা তাকে জীবিত রেখেছে অবশ্য তবে এটাকে বেঁচে থাকা বলে না। আজকে দু’দিন হলো তার পেটে কিছু পড়েনি। এখন সামনে যা পাবে তাই সে অনায়াসে খেতে ফেলতে পারবে।

এই সদর্শন পুরুষটা কত যত্ন নিয়ে সিগারেট দিয়ে তার শরীরের গোপনীয় স্থানগুলো ঝলসে দিতে একবার পরোয়া করেনি। মেয়েটি প্রশ্ন করেছিল বিধায় তার নিচের ঠোঁটটা কেটে ওই ঘরে বন্দী করে রাখা একটা হিংস্র কুকুরকে খাইয়েছে। লোকটা মুচকি হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এক পা দুই পা করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসে চোখের সামনে থেকে চুলগুলো আলতো করে পরম যত্নে সরিয়ে দিয়ে হাতটা ছুঁয়ে বলে, ‘কী করে পারলে যার সঙ্গে সংসার করবে বলে কথা দিয়েছিলে তাকে চিরদিনের মতো ছেড়ে অন্য কারো বাসরে গা ভাসাতে?’ লোকটি মেয়েটির হাতের মেহেদীর দিকে ভালো করে চাইল।

এই রঙ যে তার মস্তিষ্কের নিউরনে কারফিউ জারি করছে। ওই রঙ সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। অসহ্যকর ঠেকছে। মেয়েটির আতঙ্ক তখন যেন আকাশচুম্বী। ভয় আর আতঙ্কের মিশ্র অনুভূতিতে সে স্তব্ধ। কেবল কাঁপছে তার শরীর। মেয়েটি কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। ঠোঁটটা কাটার পর মুখ থেকে শুরু করে চোখ সব কিছুই ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তবুও সে গুঙিয়ে গুঙিয়ে কেবল বোঝাতে চাইল, ‘আমায় মেরো না। আমার সংসার জীবনের ফুলটা এভাবে ছিঁড়ে ফেলো না। আমায় আমার স্বামীর কাছে ফিরতে দাও।’

লোকটি এবার আবার বলে উঠল, ‘অন্য কারো জন্য মেহেদী পড়তে পারবে না। কিছুতেই না।’ সে তৎক্ষনাৎ পকেট থেকে চাকুটা বের করে মেয়েটি কিছু ভেবে উঠার আগেই একের পর এক আঘাত বসিয়ে দিলো তার হাতের তালুতে। ওপর দিকে। যেখানে যেখানে মেহেদীর রঙ ছিল সব ঢেকে দিলো। কখন যে গতি বেড়ে গেল, শক্তি বেড়ে গেল। হাতের চামড়া বেধ করে মাংশের আবরণ হা করে বেড়িয়ে এলো লোকটির সেদিকে খেয়াল নেই। খেয়াল সেই রগ কেটে যাওয়ার পর মেয়েটি সেই কখনই কাতরাতে কাতরাতে দম ছাড়ল। তাতেও যেন খুনির খুনের স্বাদ মিটল না। সে মৃত মেয়েটিকে শুইয়ে দিয়ে গলায় বড় ছুড়িটা ধরে কোপের পর কোপ বসিয়েই চলল। যতক্ষণ না আলাদা হয় ঠিক ততক্ষণে। গলার থেকে বেড়িয়ে আসা রক্তে সে রঞ্জিত। তার তো এই গন্ধটারই দরকার ছিল। সে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়া রক্তগুলো হাতে মেখে আনন্দ লাভ করল। গালে-মুখে ছিটকে আসার পরও সেই রক্ত ইচ্ছে করে সে মুখে মাখল। নাকের কাছে নিয়ে চোখ বুজল। তবে একটা কাজ করা বাকি। খুনি উঠে টেবিলের কাছে গিয়ে কেচিটা হাতে তুলে নিয়ে সেই গানের তাল মিলিয়ে গলার জোর বাড়িয়ে গাইল,

~তুমি ছাড়া আজ একা এমন, স্বপ্নের লাশঘর।
ভেঙে যাওয়া এই বুকের পাঁজর ধূ ধূ মরুপ্রান্তর।
তবুও প্রেম এসে, ভালোবেসে আজও দেখা দিয়ে যায়। যেই ছুঁতে যাই, আমি হাত বাড়াই, কেন দূরে সরে যায়? প্রেম আমার ওওওওও প্রেম আমার।’~
গান গাইতে গাইতে গোড়া থেকে চুলগুলো কেটে নিয়ে বলল, ‘এই চুলগুলো কোন পুতুলটার চুলে লাগাই বলোতো নবোঢ়া?’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রানীবিদ্যা বিভাগের ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তৃষা। আজ একটা প্রোগ্রাম আছে। কত মানুষ কত রং ঢং করে সেজে এসেছে। তৃষা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে শিমলার সঙ্গে তাদের সমালোচনা করছে। একটা মেয়ে একটু আগে সামনের গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল। তাকে দেখে তৃষা শিমলাকে বলল, ‘দেখ দেখ মেয়েটা নিজেকে ডিপিকা ভাবছে। লাগছে তো হিরো আলমের বউ। খালি সাজলেই হয় না। সে ভাবছে তাকে কত সুন্দরই না লাগছে।’ বলেই দুজনের যে কী হাসি। পাশেই দু’টো ছেলে যাচ্ছিল তাকে দেখে শিমলা তৃষাকে বলল, ‘এই তৃষা! ওইটা তোর আর এইটা আমার।’
তৃষা মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘না না সব তুই রেখে দে। আমি ভালো হয়ে গেছি।’
‘সে কী রে? কেমন করে হলি?’

‘কারো দর্শন পেয়ে ভালো হয়ে গেছি রে। এখন ওই বান্দাকে পেলেই হয়েছে।’
তৃষা তার ওরনাটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ অনুভব করল কেউ তার ওরনায় পেছন থেকে হাত দিয়েছে। ওই শালা প্রেম নিশ্চয়ই? আজকে সে প্রেমকে এমন একটা ঘুষি দেবে না একেবারে বংশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে মাইরি। তৃষা গালি দেওয়ার জন্য পেছনে তাকাতেই দেখল একটা কালোমতো ছেলে তার ওরনাটা টেনে ধরেছে। তার সঙ্গে আরেকটা ছেলে আছে। তৃষা রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই পাশের ছেলেটা বলল, ‘বেশি তেজ এখানে চলে না। আমাদের ভাই রাজনীতি করে। ছাত্রলীগ চেনো মেয়ে?’
‘ছাত্রলীগ নাকি ঘাতকলীগ তাতে আমার কী? রাজনীতির কোনো চ্যাপ্টারে বুঝি লেখা আছে মেয়ে দেখলেই ওরনা টেনে ধরতে হবে?’

‘না তবে তুমি চাইলে চ্যাপ্টার আমি নিজেই তৈরি করতে পারি।’
‘ওরনা ছাড়েন নইলে দুনিয়া ছাড়িয়ে দেব।’
ছেলে দু’টো হেসে উঠল। ততক্ষণে সেখানে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। সবাই কেবল দেখছে কোনোরকম সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে না। তৃষা একবার চারদিকে তাকালো। এটা কী সুটিং চলছে নাকি? মেজাজটা তার গরম হয়ে যায়। শিমলা কি করবে বুঝতে পারছে না। তৃষা ওরনাটা ছিনিয়ে নিতে যাবে তার আগেই ছেলেটা ওরনা ছেড়ে দিয়ে পাশের জনকে বলল, ‘আজকে রাতে আমার রুমে একেই পাঠাবি। তেজ কতখানি একটু মেপে দেখতে হবে না?’
তৃষা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ছেলেটার কাঁধে কেউ একজন হাত রাখল।

ছেলেটি পাশ ফিরে তাকাতেই আবিষ্কার করল প্রেম নেওয়াজকে। প্রেম সকলের সামনে তৃষার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ আরে হ্যাঁ নেতা সাহেব নাকি? এটাকে রুমে নিয়ে যাবেন? রুচি দেখছি আপনার মাটির নিচে চলে গেছে। ওর থেকে তো ওর সাথের টাই ভালো।’ শিমলা ভয়ে আরো চুপসে গেল। তৃষার তখন রাগ আর ঘৃণায় চোখ দিয়ে জল পড়ছে।

প্রেমতৃষা পর্ব ৯

দূর্বলতা আর ভয় সেই জলের উৎস নয় বরং রাগ সেই জলের উৎস। প্রেম সেই জল দেখে আরো হাসল। ছেলেটির কাঁধে চাপড় মেরে বলল, ‘এমন তেজ মেপে দেখবা ভাই, যেন চিৎকার করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। মেয়ে মানুষের এত দেমাক কিসের? দিস ইজ অ্যাবসোলিউটলি ফাকিং রং।’
দু’জনের চোখ তখন একে ওপরের দৃষ্টি মিলেছে। একজনের চোখে উপহাস অন্য জনের চোখের জলে তীব্র ঘৃণা।

প্রেমতৃষা পর্ব ১১