প্রেমতৃষা পর্ব ৯
ইশরাত জাহান জেরিন
ফার্মিসীর সামনে বাইকটা থামাতেই আতঙ্কে তৃষার ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে তো এই হাইব্রিড করলাকে ইহো জিন্দেগীতে ভয় পায় না। তবে দেখো এই মশাই তো প্লে- স্টোর থেকে একদিনেই তৃষাকে ভয় দেখানোর একেবারে কোর্স করে মাঠে নেমেছে লাঙ্গল চালাতে।লাঙ্গল তো টানা হয় এদের মতো বলদ গরু দিয়েই। নইলে কোন শাস্ত্র আবার গাভী গরুকে দিয়ে ওইসব করায়? যাই হোক কথায় কথায় নিজেকে গাভী গরু বলে কতবড় পাপ করল তৃষা। এখন শাস্তি স্বরূপ প্রত্যুষের বউ হয়ে গেলেই হয়েছে।
ছেলে সরকারি চাকরি করে। বিয়ে হয়ে গেলে তৃষার ভালোই টাকা পায়সা হবে। তখন তো আর এত কষ্ট করে চাকরি খুঁজতে হবে না। তাছাড়া ওইসব চাকরি-ফাকরি তৃষার পোষায় না। সে তো কেবল শুয়ে-বসে থাকতে চায়। তার সামনে মানুষ খাবার সে দিয়ে যাবে। মুখে তুলে খাইয়ে দেবে আর সে বসে বসে খালি ফোন চালাবে। আর কী চাই এই জীবনে? তবে বিষয় এখন এসব নয়। কথা হচ্ছে প্রেম নেওয়াজ ফার্মেসীতে কেন গেছে? খুবই সন্দেহজনক। হায় খোদা মাইন্ড কয়লার মতো এমন ফকফকা হচ্ছে কেমনে করে? তৃষা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল। প্রেম ফিরে এলো একটা পানির বোতল নিয়ে। তৃষাকে ঔষধের পাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘খাবে নাকি? এটা খেলে অনেক বড় বিপদের থেকে বাঁচতে পারবে।’
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘মা…মানে?’
‘মানে এটা এলার্জির ঔষধ। এটা খেলে চুল্কানি কমে। মেয়ে তুমি আমায় সুযোগ পেয়ে এত টার্চ করেছো যে সঙ্গে সঙ্গে এলার্জি শুরু হয়ে গেছে। আমার স্কিন কত সেনসিটিভ ধারণা আছে? দিলে তো এখন খরচা বাড়িয়ে।’
‘কত কিপ্টে আপনি। আমাদের ওইখানে কদুমিয়া নামক এক লোক থাকত। সবাই তাকে ডাকত কিপ্টে কদু বলে। আপনি ভাই তার থেকেও বেশি কিপ্টে।’
‘ওহ আর তুমি তো মহীয়সী, তো দাও এতটা পথ সঙ্গে করে এনেছি পেট্রোলের বিলটা দাও।’
‘না মানে।’
‘তোমার চেটাং চেটাং কথাবার্তা ওই ইয়ে আর মানেতেই যে আঁটকে যায় তা প্রেমের জানা আছে।’
‘দেখুন প্রেম ভাই এমন ভাবে বললে কিন্তু জিদের বশে কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে ফেলতে পারি।’
‘তুমি সোনা নতুনতো, তাই জানো না প্রেম নেওয়াজ যে জিদের ভাত কুত্তাকে খাওয়ায়। বি কেয়ারফুল।’
তৃষা চুপসে যায়। প্রেম একসঙ্গে তিনটে এলার্জির ঔষধ মুখে দিয়ে পানি খেয়ে খায়। তৃষা একবার তার কণ্ঠমণির দিকে তাকায়। পানির প্রতিটি ঢোকে ওই উঁচু জায়গাটা কেমন উপর-নীচ হচ্ছে। কেমন করে যেন এক মুহূর্তে তার শরীরের লোমকূপ গুলো নড়ে উঠে। একটা অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে। এই অদ্ভুত শিহরণ কাজ করাটাও তো ভীষণ অদ্ভুত। এই খবিশ লোককে দেখে বরঞ্চ নেগেটিভ ফিলিংস ছাড়া ভেতর থেকে অন্য কিছু আসা ঠিক না। প্রেম পানি খাওয়া শেষ করে ভ্রু কুঁচকে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পানি খাওয়ার সময়ও এত নজর দেওয়া লাগে? ছেলে মানুষ দেখো নি। অবশ্য ছেলে অনেক দেখেছো তবে প্রেম নেওয়াজের মতো বারুদ তো একপিসই। দেখবে কেমন করে?’
‘হয়েছে নিজের প্রশংসা আর করতে হবে না।’
‘প্রশংসা করলাম কই? ওইসব যেন-তেন মানুষের সামনে করলেও সম্মান খোয়া যাবে।’
তৃষা মুখটা ভেংচি দিতেই প্রেম ফের বলে উঠল, ‘শক্ত করে ধরতে বলেছি বলে এমন ভাবেই সুযোগ নিয়ে ধরেছো যে এখন শরীরে ভীষণ এলার্জি হচ্ছে। তিনটে ঔষধ খাওয়ার পরেও মনে হচ্ছে আরো দুটো খেয়ে পাঁচটা করি। ভাইরাস কোথাকার!’
‘প্রেম ভাই?’
‘কী?’
‘আমি আপনার বাইকটা চালাই?’
প্রেম এক মুহূর্তে বিচলিত হয়ে বলে, ‘আরে না লেগে যায় যদি? তখন আমার কী হবে ভেবে দেখেছো?’
তৃষা থমকে যায়। ওমা এই লোকের দেখি মন বলেও কিছু আছে। তৃষার কিছু হয়ে যাবে বলে দুশ্চিন্তাও করছে। তা দেখে তৃষা প্রেমকে বলল,’ আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম প্রেম ভাই। খারাপ ব্যবহারও করেছি। থাক আপনিই বরং বাইকটা চালালেন। আমি পিছনে বসব।’
তৃষা ইমোশনাল হতেই প্রেম তৃষাকে ধাক্কা মেরে বাইকের সঙ্গে থেকে সরিয়ে বলল, ‘আরে শালী সর। তুই হেলান দিয়ে আমার বাইকের সঙ্গে বসে তার গায়ে নোংরা লাগিয়ে দিচ্ছিস। আর তোর লাগলে আমার কী? আমি তো আমার বাইকের কথা বলেছি। তুই চালাতে গিয়ে যদি আমার বাইকের গায়ে লাগিয়ে দেস? তখন তো আমার বাইকটার কত লাগবে? ওর গায়ে আচর পড়লে তখন আমার কী হবে? সর, ঘেঁষবি না। ‘
তৃষার ভেতরটা চুরমার হয়ে গেল। মনে হলো কেউ হাতুড়ি দিয়ে ইমোশনকে একেবারে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। প্রেম বুকটা বাঁকিয়ে কেবল চোখে কালো সানগ্লাসটা পড়ে বলে।
‘আস্তে বসবা ভোটকি। তোমার ওজনে যেন আমার জানেমানের নিঃশ্বাস বন্ধ না হয়ে যায়।’
তৃষা কোনোমতে বাইকে উঠে সে বলে, ‘তোর জানেমানের হাওয়া একবার লিক করেছি না প্রেমের বাচ্চা? আবার করব। এবার সঙ্গে তোরটাও করব।’
পোস্তগোলা ব্রিজের সামনে বাইকটা পার্কিং করেছে প্রেম। সিগারেট ধরিয়ে ভ্রু কুচকে বলল, ‘দেবে নাকি একটা টান? আমি আবার দয়াশীল তো। কাউকে না দিয়ে কিছু খাই না। খোদার নামে দিয়েই ফেলো টান।
‘ওই যে দেখেন একটা কুত্তা বসে আছে ওর সঙ্গে শেয়ার করে খান।’
‘তুমিও তো একই গত্রের। ওর আর তোমার খাওয়া একই কথা।’
নদীর বক্ষে অস্তমান সূর্যের কমলা রশ্মি গলে গিয়ে ঝরে পড়ছে তখন। বিস্তীর্ণ জলে বিস্তার করছে অগ্নিদীপ্ত সোনালি আভা। স্রোতের বুক জুড়ে সেই আলো ঝিলমিল করছে একেবারে অগণন রত্নখচিত আয়নার মতে। বাতাসে ভেসে আসছে কাঁচা নদীর গন্ধ, কোথাও হ শৈবালের মৃদু সোঁদা সুবাস, আবার কোথাও দূরবর্তী মাঝিদের গর্জন। দূরে কোথাও আবার লঞ্চ, স্টিমারের হুইসেল বাজছে।
প্রেম সিগারেটে শেষবারের মতো একটা টান বসিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা বাতাসে ছেড়ে দিয়ে বলল,’ ফিজিওলজির কোনখান থেকে শুরু করি বলো তো?’
‘আমি বলেছি আপনাকে শুরু করতে?’
‘বলবে কেন? সব কথা বলতে হয় না। কিছু জিনিস নিজ থেকেই করতে হয়।’
‘ঢং। দেখুন আমি এখন বাসায় যাব। আর আমাকে আপনার ফিজিওলজি শেখাতে হবে না। ওইটার জন্য আমি একটা ভালো স্যার দেখে টিউশন নেব।’
‘পুরুষ মানুষের কাছ থেকে?’
‘তো কোনো সমস্যা?’
‘না আমার কেন সমস্যা হবে? জাহান্নামে যাও তুমি।’
‘সব সময় আপনি এমন করেন। সরি না বললে কিন্তু আমি রাগ করে ব্রিজের ওপর থেকে ঝাপ দেব বলে দিচ্ছি।’
‘সেটা তো আমি সরি বললেও তুমি ঝাপ দেবে না সোনা।’
রাত তখন এগারোটা বাজে। বিছানায় তখন শিমলা মরার মতো পড়ে নাক ডাকছে। তৃষা এপাশ-ওপাশ কিছুক্ষণ ফিরে ফোনটা হাতে নিল। প্রত্যুষকে একটা ম্যাসেজ দিলে সমস্যা কী? সে তো খুব বেশি সময় নষ্ট করবে না কিংবা জ্বালাতনও করবে না। আজ এমনিতেই মনটা কেমন জানি খারাপ। বাড়ির কথা মনে পড়ছে অনেক। তবে তৃষা তার বাবাকে ভালো করেই চেনে। সে কখনোই তৃষাকে খুঁজবে না। কখনোই না। তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কী একটা ভেবে প্রত্যুষকে ম্যাসেজ দিয়েই দেয়। কিছুক্ষণের মাথায় প্রত্যুষের রিপ্লাই পেয়ে তৃষার মন নেচে উঠে। প্রত্যুষ লেখে,
‘রাতজাগা পাখির দলে নাম লিখার ইচ্ছে জেগেছে? ঘুমানি যে?’
‘ঘুমটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আমার চোখের পাতার সব ঘুম কে যে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।’
‘কল দেই?’
তৃষা মানা করল না। ‘আজ জানেন সবটা কেমন অন্ধকার লাগছে। আমি না আপনাকে কিছু বলতে চাই।’
”চাওয়ার মতো কথা কখনো বলা যায় না। বললে তা অন্য কারও কানে পৌঁছে যাবে।’
তৃষা কিছু একটা বলেও থমকে গেল। প্রত্যুষ ফের বলল, ‘কী যেন একটা বলে চাইছিলে?’
‘ থাক। কিছু কথা বললেও বোঝা যায় না।’
‘কিন্তু যদি আমি অনুভব করতে চাই?’
তৃষা সেই কথা শুনে মুচকি হাসল। কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই প্রত্যুষ বলল, ‘এই তোমার সঙ্গে একটু পড়ে কথা বলি? একটা ইমারজেন্সি কেইস এসেছে।’
তৃষা কলটা রেখে দিলো। মনে মনে চোখটা বন্ধ করে একটা শান্তি নিয়ে প্রত্যুষের মুখশ্রী কল্পনা করার চেষ্টা করতেই ভাসল প্রেমের মুখটা। চোখ সরু করে লোকটা সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছে। ধ্যাৎ আজ রাতের ঘুমটা এবার গেল।
প্রেম এই রাতের বেলা তৈরি হচ্ছে। পরনে কালো রঙের একটা হুডি। মুখে কালো রঙের একটা মাস্ক পড়েছে। কেবল চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। তাতে কত মায়া জড়িয়ে। প্রেম একটু আগেই কাল একটা গোলাপ ছিঁড়েছিল গাছ থেকে। সেটা পকেটে রাখলে নষ্ট হবে। তাই রাখল তার BMW S1000RR এর ওপরে। এটাও প্রেমের পছন্দের একটা বাইক। কালো রঙ ছাড়া অন্য কিছু ভালো লাগেনা। তাই সবগুলো বাইকের রঙ কালো।
প্রেমতৃষা পর্ব ৮
মানুষের যেমন একটা শখ থাকে? তেমনই প্রেমের শখ বাইক কালেকশনের। যতগুলো বাইক তার আছে তাতে একটা শো-রুম তো অনায়াসেই দেওয়া যাবে। প্রেম হ্যালমেট পড়ে আর দেরি না করে এই রাতের বেলা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। বাইকের শব্দেই সিদ্দিক নেওয়াজের ঘুৃমটা ভাঙল। সে উঠে বারান্দায় আসার আগেই প্রেম চলে গেছে। মুখটা কেমন যেন শুঁকিয়ে আসে সিদ্দিকের। সে কেবল বিরবির করে একবার বলে, ‘আজকে আবারও?’
