প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২
সাইয়্যারা খান
তালুকদার বাড়ীটা একাত্তরের যুদ্ধের পর গোটা এলাকা জুড়ে একমাত্র প্রাণকেন্দ্র ছিলো। এই বংশ সম্পর্কে যতদূর জানা যায় ততোদূর পর্যন্তই জমিদার ঘরোনা হিসেবেই পরিচিত। তৌসিফের দাদা হাজী তৌকির তালুকদার ছিলেন চমৎকার একজন জমিদার। যেমন তার ঠাটবাট তেমনই ছিলো রসিকশ্রেষ্ঠত্বতা। জনসেবায় কাজ করে গিয়েছেন অনেক। নাম-ডাক সেই ছোট থেকেই দেখে আসছে তৌসিফ। তৌকির তালুকদারের তিন পুত্র ছিলেন প্রথম ঘরে। শাহজাহান তালুকদার, সমশের তালুকদার আর সুলাইমান তালুকদার। শাজাহান তালুকদারই তাহমিনা, সম্রাট আর শাহরিয়ারের বাবা। সমশের তালুকদারের ঘরে তুরাগ, তৌসিফ, তুহিন সহ তায়েফা, তাহিয়া আর তিশা।
জমিদার সাহেবের এই তিন পুত্রই বিয়ে করেছিলেন প্রথম ঘরের। তৌসিফ যতদূর জানে, চিনে তারমধ্যে তার দাদার এগারোজন বউ ছিলেন৷ বিভিন্ন সময়ে তিনি বিয়ে করেছিলেন। তার দাদী আর দুইজন বাদে বাকিরা জমিদার সাহেব জীবিত থাকাকালীনই মৃত্যু বরণ করেছিলেন। তৌসিফের নিজের দাদাকে বেশ ভালোই মনে আছে কিন্তু তার চাইতেও বেশি মনে আছে একজনকে। তার ছোট চাচা সুলাইমান তালুকদার তার খুব প্রিয় ছিলো। এই চাচার প্রতি টানই ছিলো অন্যরকম তার। সুলাইমান নিজেও তৌসিফকে অন্যান্য ভাতিজা, ভাতিজি বা নিজের সন্তানদের চাইতেও কেন জানি একটু বেশিই ভালোবাসত। কাঁধে নিয়ে পুরো এলাকা ঘুরতো। তাদের বয়সের পার্থক্যটা বেশি ছিলো কিন্তু ভালোবাসা বা বন্ধুত্বটা ছিলো বেশ গাঢ়। ছোট বেলা থেকেই ওরা সব ভাইবোন দেখতো আর বুঝতো বাকি সবার মতো তাদের জীবন না। তারা ভিন্ন। শাহজাহান তালুকদারের দুই ছেলের মধ্যে সম্রাটই ছিলো সবচাইতে বড়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বরং সকল ভাই-বোনদের মধ্যে সম্রাট ছিলো সবচাইতে বড়। তৌসিফ তো তখনও তেমন কিছু বুঝতো না। স্কুলে যেতো সবার সাথে। মাঝেমধ্যেই বাড়ীর আঙিনায় বিচার-শালিস বসতো। প্রায়সময় দেখতো তার প্রিয় চাচা রক্তে ভিজে বাড়ী ফিরেছে। কি করতো, কেন করতো তখনও বুঝার বয়সটা তাদের কারোরই হয় নি। শুধু মাত্র সম্রাট তাদের মধ্যে তখন কলেজে যেতো। বাপ-চাচাদের সাথে এদিক ওদিক দৌঁড়াত। প্রায়সময় বিচারে দাদার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। তৌসিফের তো প্রায়সময়ই মন চাইতো চাচার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বিচার দেখতে কিন্তু পারতো না। ওর আম্মু কখনোই রাজি ছিলেন না ছেলেকে ওসবে যেতে দিতে। নিজের তিন ছেলে, তিন মেয়েকে পাখের নিচে ভীষণ আরামে পেলেছেন তিনি। যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন যাতে ওরা তিন ভাই এসবের আশেপাশেও না থাকে। ধীরে ধীরে সময় গড়ালো। সুলাইমানের নতুন বউ সন্তানসম্ভবা হলেন।
এরপর থেকে বাড়ীতে প্রায় অশান্তি লাগা শুরু হলো। চাচি কিছুতেই সুলাইমানকে এসবে যেতে দিবেন না৷ এসব রাজনীতি কারবার থেকে দূরে থাকতে বলতেন কিন্তু সুলাইমান শুনে নি। বউকে ভীষণ ভালোবাসা সত্ত্বেও সুলাইমান তালুকদার কোনদিনই রাজনীতি ছেড়ে দিতে পারে নি। ছোট্ট গাছটার গোড়ায়ই ঢালা হয়েছিলো রাজনীতি এখন কি আর বৃক্ষ থেকে তা তুলা যায়? ধীরে ধীরে তৌসিফ ছুটে গেলো সুলাইমানের হাত থেকে। তৌসিফের আম্মু তাকে শক্ত করে নিজের কাছে রাখতেন। তুরাগ কথা শুনলেও তৌসিফটা যথেষ্ট জেদী ছিলো৷ মায়ের কথা অমান্য করবে না কিন্তু রাগে, জেদে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিতো। সুলাইমান সহ নিজের বাবার সাথে এদিক ওদিক যেতে মন চাইতো। একমাত্র সমশেরই ছিলেন যিনি রাজনীতিতে মনোযোগ একটু কম দিতেন। শাহজাহান আর সুলাইমান ছিলো ওদের বংশের রাজনীতির হাল ধরা মূল দুই হাতিয়ার৷
নিজেদের স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সুখের এক বিশাল সংসার ছিলো তালুকদার বাড়ীতে। সেই কাক ডাকা ভোর থেকে ডাহুক ডাকা রাত, তালুকদার বাড়ী থাকতো ছমছমে, লোকালয়ে ভরপুর।
এমন এক রাজনীতির শিকড়ে বড় হওয়া ভাই-বোনগুলোর মেধা ছিলো দারুণ। সম্রাট আর তাহমিনা দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলো। শাহরিয়ারটা আবার ছিলো ভীতু প্রকৃতির। সবসময় মারামারি-হানাহানি থেকে গুটিয়ে থাকতেই পছন্দ করতো। কোন কিছুর আগে-পরে কোথাওই কেউ শাহরিয়ার নামক যুবকটাকে পেতো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে সে জাহাঙ্গীর নগরে পড়াশোনা করেছিলো। বছরখানিক সময়ের মধ্যেই নাম-ডাক শোনা যেতো তার। ডিপার্টমেন্টে টপ করা ছাত্র ছিলো বলে কথা। তাহমিনা ছোট হওয়াতে তার আবদারের ঝুলি যেতো দুই ভাইয়ের কাছে। শাহরিয়ার যেহেতু সবসময় থাকতো না তাই সময় হলেই ছুটে আসতো বাসায়, তার হাত ভর্তি থাকতো কাঁচের চুড়ি। তাহমিনা খুবই পছন্দ করতো বলে কথা। তবে পকেটে লুকিয়ে আরেকটা জিনিস আনতে হতো তার। লাল ফিতা। এই লাল ফিতা তামিমার খুবই পছন্দের ছিলো। তামিমা আর শাহরিয়ার ছিলো জমজ। শাহরিয়ারের সাথে সবচাইতে বেশি ভালোবাসা যেমন ছিলো তার, তেমনই ছিলো এক রেষারেষি সম্পর্ক অথচ তারা খুশি ছিলো। এই বিশাল বাড়ীটায় তারা একসাথে বেশ ভালোই ছিলো।
তৌসিফ যখন এসএসসি পরীক্ষা দিবে তখনই এক রাতে সবাইকে চমকে দিয়ে দাদা মারা যান৷ পাথর বনে গিয়েছিলো সেদিন সকলে। সেই রাতেই তিনি সমশের তালুকদারকে ডেকে বেশখানিকটা সময় কথা বলেছিলেন। তার স্ত্রীদের হক আগেই বুঝিয়ে দেওয়া ছিলো কিন্তু তবুও তিনি তার এক মেয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সমশেরের উপর। সৎ বোনের দায়িত্ব নিতে ততটাও রাজি ছিলো না সমশের কিন্তু বাবার কথা ফেলতেও পারে নি সে। খোঁজখবর রেখেছিলেন সেই সৎ বোনের কিন্তু সেই বোনটা পালিয়ে গিয়েছিলো। এক বেকার ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিলো সে। না চাইতেও বোনটাকে সমশের মন থেকে ভালোবাসত। এক সুপাত্রের হাতেও তুলে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু সেই সুযোগটাই রাখে নি সে।
হাজী সাহেবের মৃত্যুর পর অদৃশ্য ভাবেই ছয়মাস পাড় হলো। ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হচ্ছিলো। রাজনীতির মাঠ তখন বেশ উত্তাল কিন্তু তালুকদার বাড়ী বেশ শীতলই ছিলো। সকাল থেকে রাত হৈচৈ হতো, বৈঠক হতো। সন্ধ্যা হতে টিফি দেখতে ভীর হতো আঙিনায়। বাইরেও একটা টিভি দেওয়া হয়েছিলো যাতে এলাকার মানুষজনও টিভি দেখতে পারে। বাচ্চাদের খেলাধুলা, পড়াশোনা সব চলতো বেশ সুন্দর ভাবে। বিকেল হতেই মায়েদের হাঁকডাক শুরু হয়ে যেতো। সুলাইমান তালুকদার ততদিনে দুই পুত্রের জনক। তেমনই এক ব্যাস্ত সকালে সাহারা আর তৌসিফের মা উঠেছিলো চুলা জ্বালাতে। সুলাইমানের বউ বাচ্চাদের কান্না থামাতে ব্যস্ত। সদর গেট খুলতেই চোখে পড়ে সুলাইমানের দেহ৷ সাদা শার্টের পুরোরাই লাল। কুপিয়ে হত্যা করা একটা দেহ যার মুখ বাদে চেনার উপায় নেই। বাড়ীর দুই বউ চিৎকার করে ওঠে। স্কুলে যেতে বাচ্চারাও তখন উঠেছিলো। তুরাগ, তৌসিফ সবার আগে দেখেছিলো তাদের চাচার দেহখান। চাচি বেরিয়ে এসে প্রথমে কিছু না বুঝলেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তৌসিফের মা দৌড়ে ভেতরে আসেন। গলগলিয়ে বমি করতে থাকেন। তখন তিনি আট মাসের গর্ভবতী। তুহিনের পর না চাইতেই যেন সন্তানটা চলে এসেছিলো।
পুরো বাড়ী জুড়ে তখন শোকের ছায়া। সুলাইমানকে স্পষ্ট খুন করা হয়েছিলো। বিষয়টা দলীয় সবাই জানতো। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত খবর পৌঁছালো। খবরের কাগজে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখা হলো কিন্তু বিচার, সেটা হলো না। সবাই যখন জানে খুনি কে, খুনি নিজেই যখন লাশের খাট বহন করে তখন তো আর বিচার চাইতে আইন লাগে না৷ সম্রাট সেদিন খাটিয়া বহন করা খুনিকে দেখেছিলো খুব কাছ থেকে। আতরের ঘ্রাণে তার বুক জ্বলে যাচ্ছিলো অথচ সম্রাট দেখছিলো। রাতে খুন করে বেচারা ঘুমাতে পর্যন্ত পারে নি, তার আগেই জানাজা পড়তে আসতে হলো। এ-র চাইতে শোকের আর কিইবা হতে পারে?
তৌসিফ সেদিন সুলাইমানের লাশ দেখেছিলো। বাড়ীর সবাই যখন ব্যাস্ত তখন তৌসিফ চাচির মুখে ভাত তুলে দিয়েছিলো। তার কান্নারত মুখটা বলেছিলো,
“তোমার চোখের পানি আমি একদিন মুছে দিব চাচিম্মু।”
সেই কিশোর তৌসিফের বুকে চাচি কেঁদেছিলো। তার দুই সন্তান নিয়ে সে রয়ে গিয়েছিলো এই নিষ্ঠুরতম পৃথিবীতে।
রাত প্রায় বারোটা বেজে বিশ মিনিট।
তৌসিফ পড়ার টেবিলে বসে ঝুমছিলো। পাশেই ছোট্ট তুহিন ঘুমিয়ে। এক কাপ চা নিয়ে ওর রুমে ঢুকে ওর মা। তৌসিফ দেখে তার মাকে। লম্বা কোমড় সমান চুলগুলো বেণী গাঁথা। সুন্দর মুখটা দেখলেই মনটা হালকা লাগে। তৌসিফ চায়ের কাপ নিয়ে মায়ের হাত ধরে। আস্তে করে বসায় বিছানায়। নিজে হাঁটু গেড়ে তার সম্মুখে বসে প্রশ্ন করে,
“এত কষ্ট করতে গেলে কেন আম্মু?”
“আমার কলিজা যে পড়ছিলো তাই।”
“এক কলিজার কথা ভাবলে হবে? আমার কলিজা যে কষ্ট পাচ্ছে?”
“পৃথিবীতে আসার আগেই এত টান?”
“আমার মনে হয় এবারে বোন হবে আম্মু।”
“তুমি বোন চাও আব্বু?”
“চাই তো। তিশার মতো পাঁজি না তবে। একদম ঠান্ডা একটা বোন চাই, তামিমা আপার মতো।”
মায়ের সুন্দর হাসিতে তৌসিফও হালকা হেসেছিলো। আধ রাত পর্যন্ত পড়ে মায়ের পায়ে তেল ডলে উঠেছিলো জানালা বন্ধ করতে। তখনই চোখ পড়ে ঘাটলার দিলে। লুঙ্গি পরিহিত সম্রাট একেরপর এক ডুব দিচ্ছে। হারিকেন হাতে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে তাহমিনা।
তৌসিফ কেন জানি দৌড়ে বাইরে আসে। ঘাট পাড়ে আসতেই দেখে সম্রাট উঠছে। তৌসিফ ডেকে উঠে,
“ভাইজান?”
তাহমিনা চমকায় তবে সম্রাট হাত বাড়িয়ে ডাকে। ভেজা উন্মুক্ত শরীরে তৌসিফ দেখে তার ভাইকে। সুদর্শন এক যুবক তার ভাই। সম্রাটের বরফ শীতল হাত তৌসিফকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠে,
“তোর প্রিয় সুলাইমান চাচার লা শ দাফন সম্পূর্ণ হয়েছে তৌসিফ।”
তৌসিফ চমকায়। আস্তে করে বলে,
“আজ চারদিন ভাই।”
সম্রাট ওকে ছাড়ে। তৌসিফ অবুঝ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সম্রাট শুকনো লুঙ্গি জড়াতে জড়াতে বলে,
“মাটি চাপা ছিলো ওটা বোকা, দাফন আজ হয়েছে।”
“তুমি কি করেছো ভাই? তোমার গলায় কিসের দাগ?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪১
হারিকেনের আলোয় সম্রাটের গলায় জখম দেখে তৌসিফ। সম্রাট হাসে। ধীরে ধীরে শব্দ গাঢ় হয়। চিৎকার করে বলে,
“র ক্তের বদলে র ক্ত নিয়েছি আমি। গুনে গুনে কুপিয়েছি। খু নের বদলে খু ন করেছি আমি।”
তৌসিফ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকে। তার ভাইজান, তার সম্রাট ভাইজান খু ন করেছে কিন্তু তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তার ভাইজানের হাত তো কলম ধরে। কি সুন্দর মতির দানার মতো লিখে। এই কলম ধরা হাত খু ন কিভাবে করে?
