প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৬
সাইয়্যারা খান
আগামীকাল রাতেই তৌসিফদের ফ্লাইট। গন্তব্য আস্ট্রেলিয়া। তায়েফা সেখানেই থাকে। সে প্রস্তাব করেছে যাতে তার বাসায়ই উঠা হয়। তৌসিফ না না করলেও রাজি হয়েছে শেষে তবে পুরোটা হানিমুন সেখানে কাটাবে না ও। বউ নিয়ে তার চরম মাত্রার প্রাইভেসি চাই। শপিং করেছে সে একা হাতে। বউ তার শপিং নিয়ে ততটা আগ্রহ দেখায় না৷ দেখা যায় দামদর করে দোকানদারকে মুখ ভেচকি উপহার দিয়ে আসে। তৌসিফ বিভ্রান্ত হয়ে থাকে তখন। বেছে বেছে সবচাইতে কমদামী কিছু কাপড় ধরে যা তৌসিফের মোটেও পছন্দ না। সে তার বউকে পারলে চোখের পলকে বসিয়ে রাখতো। শপিং করতে গিয়ে কিছু দুষ্টমিষ্টি জিনিস কিনেছে সে তার বউয়ের জন্য। পৌষের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা নিয়ে সন্দিহান অবশ্য তৌসিফ।
গতকাল থেকে একজন আবার ফুলেফেঁপে উঠছে। দমকে দমকে তার শ্বাস উঠানামা করছে যেন। তৌসিফের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না৷ তৌসিফ মারাত্মক ভাবে ফেঁসেছে। যেখানে তার ছোট্ট সোনামণি শালীরা বায়না করছে না সেখানে তার দামড়া ভাই সাথে যাওয়ার বায়না ধরেছে। তৌসিফ ওটা ওর দুষ্টামি ভাবলেও এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তুহিন মোটেও দুষ্টামি করছে না। এক নেশা কানাডার রিহ্যাবে পাঠিয়ে কাটিয়েছে এখন এই নতুন পা গলামো কিভাবে কাটাবে তৌসিফ বুঝতে পারছে না। কাল জোড়ালো ভাবে না করার পর থেকে রেগেমেগে হনহনিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। যাওয়ার আগে ইনি, মিনিকে টেনে হিঁচড়ে কাঁধে ফেলে নিয়ে গিয়েছে। দেখার মতো বিষয় ছিলো গতকাল। পৌষের মতো মানুষ হতবাক হয়ে এক মিনিট থ হয়ে ছিলো। দুই মিনিটের ব্যবধানে তুহিন খালি হাতে ফিরে এসে পিহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় আবার। পৌষ তখন হঠাৎ রণমুর্তি ধারন করে। বিরাট চেঁচামেচি করে। তার পছন্দ না তার বোনদের নিয়ে এভাবে তুহিন নিজের কাছে রাখুক। পিহাকে নিয়ে একদমই পছন্দ না৷ বিরাট গোলজোক লাগা মাত্রই শ্রেয়া সামলে নিয়েছিলো। শ্রেয়ানকে তৌসিফের কাছে রেখে নিজে সেঁধে গিয়েছিলো তুহিনের ফ্ল্যাটে। পলক অবশ্য খারাপ ব্যবহার করে নি। শ্রেয়াকে জোর করে বসিয়ে ড্রিংকস সার্ভ করেছে। এদিকে তুহিন দরজা বাইরে দিয়ে আটকে সোজা হুমকি দিয়েছে, সে যাবেই। তৌসিফের ধৈর্যর বাঁধ ভাঙতে আর সময় লাগে নি। বাধ্য হয়ে সে তুহিনকে গালাগাল করেছে। রাগ উঠে গিয়েছিলো তারও। ধমকে শালীদের নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে এসেছিলো। সেই থেকে এখন অব্দি তুহিন কথা বলে নি।
তুরাগ সব শুনে অফিস কাঁপিয়ে হাসছে। বাসার নিচ তলার অফিসে বসা তারা। তৌসিফ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। সোফায় গা এলিয়ে বললো,
“তুমি হাসছো?”
“তো?”
কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো তুরাগ। তৌসিফ দাঁড়ি চুলকালো স্বভাবমতো। উত্তরে বললো,
“ওকে এভাবে রেখে আমি যেয়ে শান্তি পাব বড় ভাই?”
“তাহলে অশান্তিটাকে সাথে নিয়ে যা।”
চরম মাত্রায় বিরক্ত হলো তৌসিফ। তাকালো আড় চোখে। কতটা ফালতু পরামর্শ দিলো তার আপন বড় ভাই। বাঁকা চোখে তাকিয়ে হেয়ালি করে বললো,
“অথচ নিজের বউ নিয়ে কয়েকদিন পরপর ট্যুর দাও৷ হানিমুনে প্যারিসে ছিলে। বাচ্চাদের রেখে রেখে একা একা যাও এই বয়সেও। কোথায়, তখন তো আমি বায়না ধরি না। আমি কেন, তুহিনও ধরে না৷ ও নিজে ইতালি গিয়ে হানিমুন করলো তাও কিনা টানা তিনমাস। তিনমাস কে হানিমুন করে?”
“ওর মন চেয়েছিলো। করেছে।”
“হ্যাঁ। আমি তো আর বাঁধা দেই নি।”
“ও তো তোকে বাঁধা দেয় নি।”
“তুমি বুঝতে পারছো না বড় ভাইয়া।”
“কি বুঝব আমি?”
“আশ্চর্য! তুমি অবুঝ সাজছো কেন?”
“তো, কি করব? তোদের এসব অহেতুক কাহিনি নিয়ে ভেবে নিজের চুল সাদা করব?”
“সেটা করার বিশেষ প্রয়োজন দেখছি না। অলরেডি ইটস হ্যাপেন্ড।”
“অ্যাঁই! খবরদার বাড়াবাড়ি করবি না।”
বিরক্তিতে মুখ তেঁতো হয়ে এলো তৌসিফের। নিজের সাদা চুল নিয়ে কথা শুনবে না অথচ তৌসিফের হানিমুনে যে আগুন লেগেছে সেটার খবরও রাখছে না। তৌসিফের হঠাৎ কান্না পাচ্ছে। না না কান্না না অবশ্য, তার রাগ উঠে যাচ্ছে। তুহিন সাথে যাওয়া মানেই চব্বিশ ঘণ্টা তার সাথে আঠার মতো লেগে থাকা। দেখা যাবে তৌসিফকে রেখে পৌষকে নিয়ে তুহিনই বেরিয়ে যাবে এদিক ওদিক। যেই ভাব জমাচ্ছে দু’জন। তৌসিফের বিরক্ত লাগছে এখন। তার সাথেই কেন? উফ! উফ!
অফিস থেকে বেরিয়ে এলো তৌসিফ। তুরাগ শুধু মজাই নিবে, সমাধান দিবে না। চলার পথে হাতের সামনে পড়া গাছটা থেকে চলতি পায়েই একটা ফুল টেনে নিলো। দেখলোও না কি ফুল সেটা।
নিজের ফ্ল্যাটে এসে মূল দরজা লক পায় নি তৌসিফ। খোলাই ছিলো। নব ঘুরাতেই খুলেছে। এত রাতে মূল দরজা খোলা থাকার কারণ খুঁজতে তার সময় লাগলো না। ড্রয়িং রুমে নজর পড়তেই তার পা আটকে গেলো নিজ স্থানে। সোফায় বসা পৌষ। তার পায়ের কাছে বসা তুহিন। যথেষ্ট দূরত্ব তাদের মাঝে৷ বুঝাই যাচ্ছে তুহিন মাফ চাইছে তবে পৌষ মানছে না। মিনু দাঁড়িয়ে একটু দূরে। তুহিন কান ধরে একইভাবে বসা। পৌষ কোলে কুশন নিয়ে বসে আছে৷ মুখে অসহায় ভাব। তার বউ যে এত বড় দেবড় নিয়ে ফেঁসে গিয়েছে তা যথাযথ টের পাচ্ছে তৌসিফ। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ও৷ দেখার পালা কি করে এই নমুনাটা।
তুহিন মুখটা একদম বাচ্চাবাচ্চা করে আছে। বেশ অসহায় মুখ করে ডাকে,
“অ্যাঁই, ফুপাতো বোন?”
পৌষ উত্তর করে না। তুহিন আবার ডাকে,
“পৌষ?”
ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো পৌষ। হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো করে বললো,
“উঠুন। উঠে কথা বলুন।”
“স্যরিই না মানলে ওদের তুলে আমার ডায়িং এ আটকে রাখব।”
“ঐ হাতটা মুচড়ে দিব আমি।”
“পারবে না তুমি। রেকর্ড আছে আমার।”
“মাথা ফাটানোর রেকর্ড আছে আমার।”
“হুমকি দিচ্ছো?”
“না, বলছি।”
“আচ্ছা, শুনো আমার কথা।”
“একটা ঘন্টা ধরে এখানেই বসা আমি৷”
“আচ্ছা, এই যে কান ধরেছি। দেখো তুমি।”
“মুখে বলুন, ওদের এভাবে তুলে নিবেন না৷ আমার একদম অপছন্দ এটা।”
“আচ্ছা, আদর করে নিব।”
“সেটারও প্রয়োজন নেই।”
“আমার হলে তখন আর নিব না।”
“সেটা আপনার বিষয়।”
“না না সত্যি বলছি। আমার একটা, দুটো হোক তাহলে আর ওদের নিব না।”
হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো পৌষ পুণরায় শুধালো,
“শুনুন, আমার পছন্দ না বিষয়টা৷ ওরা আপনার মেয়ের বয়সী। তালই ডাক কেন শেখালেন আপনি? এসবের মানে হয়? নেশা না ছেড়েছেন?”
খোঁটাটা পৌষই দিবেই দিবে। তুহিন হাঁটু ভাঙা অবস্থায় একটু আগালো৷ মুখটা নিচু করে বললো,
“ওদের নিয়ে একটু পলককে দেখাই। যদি ওর মন নরম হয়। ও তো আমার বাবু ক্যারী করতে রাজি না।”
তৌসিফের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। সেদিন তুহিনকে জিজ্ঞেস করলেও তুহিন উত্তর করে নি। তৌসিফও আর ঘাটে নি। ছোট ভাইয়ের ব্যাক্তিগত বিষয় সেটা। পৌষের মধ্যে তেমন কিছু কাজ করলো না৷ ওকে অনেক্ষণ ধরে বসিয়ে রেখেছে তুহিন। বিরক্ত ও রীতিমতো। পৌষ ওকে বুঝানোর মতো করে বললো,
“দেখুন, ওরা বড় হচ্ছে। এভাবে নেয়াটা পছন্দ না।”
“আমি বুঝতে পেরেছি।”
“বুঝলে ভালো।”
“তুমি রেগে নেই?”
“ততটা না।”
“তাহলে আমি সাথে চলি পৌষ?”
বলতে বলতে পৌষের হাঁটুতে থাকা বালিশে মাথা দিলো তুহিন। পৌষ চমকে উঠলো৷ তুহিন তার থেকে বয়সে বড়। সম্পর্কে মামাতো ভাই হয় আবার দেবড়ও হয়। ওর কাছে বিষয়টা স্বাভাবিক হলেও পৌষের কাছে না৷ একদমই না৷ পৌষের হেমু ভাই তো একটু মাথায়ই হাত রাখতো, জ্বর আসলে রাতে মাথায় পানি ঢালতো তাতেই তো কত নোংরা শব্দ শুনেছে পৌষ। গালাগালি থেকে পৌষকে বাঁচাতে হেমন্তই দূরে সরে গেলো৷ তুহিনের এহেন আচরণও পৌষ মানতে পারলো না৷ বালিশ সহ ঠেলে দিতে দিতে বললো,
“এখন নিজের বাসায় যান।”
” অ্যাঁই পৌষ?”
“কি?”
“আমিও তাহলে সাথে চলি?”
“কই? জাহান্নামে?”
“না, তোদের সাথে ঘুরতে।”
তৌসিফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে। তার মন দোটানায় আটকে গেলো হঠাৎ। এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো এটা ঠিক হচ্ছে না। চোখে তুষারকে দেখলো ও। সাথে পিয়াসী। তাদেরও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো অতঃপর তারা দু’জন মিলে তৌসিফকে ঠকিয়ে গিয়েছে। এমনই তো ছিলো, নাকি? না, এমন ছিলো না। তারা ঢলাঢলি করতো। হাসতে হাসতে গায়ে লুটিয়ে পড়তো। গায়ে গা লাগিয়ে বসতো। পিয়াসীর ছোটখাটো পোশাকে খোলামেলা আচরণ ছিলো যা দৃষ্টিতে বিঁধতো কিন্তু
হাই সোসাইটিতে ওসব বিষয় ছিলো না।
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৫
এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। তুহিন মা চায়। ও পৌষের মাঝে মায়ের ভালোবাসা পেয়েছে। এখন ও ছাড়তে চাইছে না। আঠার মতো লেগে থাকতে চাইছে৷ তৌসিফ জানে সবটা কিন্তু ঐ যে মনবমন৷ মানবমস্তি্স্কের মধ্যে দুটোই চলে। খারাপ, ভালো দুটোই। তৌসিফ ভুগে এসেছে। ঠকে এসেছে। দেখে এসেছে। এখনও দেখছে। ও জানে, মস্তিষ্ক ওকে ভুল ভাবাচ্ছে তবুও ও ভাবছে কারণ ও মানুষ, পুরুষমানুষ।
