প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৩৪
ফিজা সিদ্দিকী
থমথমে পরিবেশ। তুর্জয় বাড়ী ফিরেছিল সবটুকু রাগ অভিমান দূরে ঠেলে দুপুরের খবর একসাথে খাবে বলে। কারন সকালে ওভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর যে নন্দিতা নিজেও কিছু মুখে তুলবে না, তা তার অজানা নয়। মেয়েটা তাকে ভালোবাসে, ভীষণ রকম ভালোবাসে। ভালোবাসি না বলেও যেভাবে ভালোবাসা যায়, তেমন করে ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষটার প্রতিটা কথায়, প্রতিটা কাজে, তার করে যত্নে ভালোবাসা ঠিকই টের পাওয়া যায়। সবসময় মুখে ভালোবাসি বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিছু কিছু সময় নীরবতা অনেক গল্প বলে যায় নিশ্চুপে।
অথচ বাড়ী ফেরার পর থেকে ঘটে যাওয়া একের পর ঘটনায় মাথা নষ্ট হয়ে পড়েছিল তুর্জয়ের। যে মানুষটার সামান্য আঘাতে তার বুকে ঝড় ওঠে, যাকে আগলে রাখতে গিয়ে সবকিছুর সাথে সমঝোতা করতে রাজি সে, আজ সেই মানুষটাকেই এ্যতা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করলো সে। রাগে, ঘৃণায় ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা সব জিনিস এক ঝটকায় এলোমেলো করে নীচে ফেলে দিলো সে। নন্দিতার মুখোমুখি হতে হবে বিধায় আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না। এটুকু সাহসও জোগাড় করতে পারছে না সে। পারবে না সেই দৃশ্য সহ্য করতে যেখানে যন্ত্রণায় ডুকরে কাঁদতে থাকবে নন্দিতা। অথচ এই আঘাত তারই দেওয়া।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ওয়াশরানের শাওয়ার চালু করে তার নিচে দাঁড়ায় নন্দিতা। শরীরের ভার সহ্য হচ্ছে না তার যেন। তাই ঝট করে বসে পড়ে মেঝেতে। শাওয়ারের পানির ফোয়ারা ঠোঁটে লাগতেই যন্ত্রণায় মৃদু চিৎকার করে পানির নীচে থেকে সরে যায় তৎক্ষণাৎ। ওড়নার আঁচল চেপে ধরে ঠোঁটে। এখনো রক্ত পড়ে যাচ্ছে অবিরত। তুর্জয়ের এমন রূপ এর আগে কখনো দেখেনি সে। তার বলা প্রতিটা কথা তীরের তীক্ষ্ম ফলার মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে তার হৃদয়। শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণায় হাঁপিয়ে উঠছে সে। অতঃপর কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়ে মেঝেতে।
কতক্ষন কেটে গেছে কে জানে? চেঞ্জ করে ওয়াশরুম থেকে বের হয় নন্দিতা। এতটা সময় বেঘোরে পড়ে ছিল সে। চিন্তা চেতনায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো জীবনের সব হিসেব নিকেষ। মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারলে বোধহয় আজ বেশ ভালো লাগতো। মনের ভেতরে চলতে থাকা তুফানি ঝড় একটু বোধহয় থাকতো। কিন্তু মা কী কাঁদতে দিতো তাকে? ফ্যাচ ফ্যচ করে কান্নার স্বভাবটা তার একদমই পছন্দ করতেন না নওরীন। স্কুলে কারোর সাথে মনোমালিন্য হলে বাড়িতে এসে যদি সে কাঁদতো, নওরীন সাথে সাথে ধমক দিতেন তাকে। কড়া কণ্ঠে বলতেন,
“মেয়েদের এই স্বভাবটা আমার বুঝে আসে না কিছুতেই। একটু কিছু হলেই এমন ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদতে হবে কেন? কান্না হলো মানুষের দুর্বলতা। আর মেয়েরা এই দুর্বলতা বড্ডো সহজে মানুষকে দেখিয়ে ফেলে বলেই মেয়েদের দুঃখ এতো বেশি। মানুষ তাদের ভাঙ্গেও বেশি। কতবার না বলেছি এসব সামান্য বিষয় নিয়ে কাঁদবে না? এমনকি আমাদের মৃত্যুতেও যেন তোমার কান্না না আসে, এতটা শক্ত হতে হবে।”
অথচ শত চেষ্টার পরও নন্দিতা পারতো না মায়ের মতো শক্তসামর্থ্য একজন নারী হতে। মায়ের বুদ্ধিমত্তা ছিল ধারালো। তার ক্ষমতা আর বিচক্ষণতা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতো তার মুখ থেকে। একজন স্ট্রং, আত্মনির্ভরশীল নারী বলতে নন্দিতা একমাত্র তার মাকেই দেখেছে।
তুর্জয়কে ঘরেই আশা করেছিল নন্দিতা। কিন্তু ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে তাকে না পেয়ে খুব একটা অখুশি হয়নি সে। বরং খানিকটা স্বস্তি নিয়ে বিছানায় বসতে গেল। আচমকা তার চোখ পড়লো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা জিনিসগুলোর উপর। আর তুর্জয়ের দেওয়া সেদিনের সেই আংটিটা ছিটকে গিয়ে পড়েছে আলমারির পায়ের কাছে। নন্দিতা উঠে গিয়ে আংটিটা তুললো। ফিরে আসতে গিয়ে আচমকা আংটি থেকে ছোটমত কিছু একটা পড়ে গেল নীচে। অবাক হয়ে নন্দিতা ঝুঁকলো নীচে। আংটিটা মতো ভেঙে গেছে ভেবে স্বর্ণের টুকরো খুজতে লাগলো এদিক সেদিক। এমন সময় তার পায়ের কাছে কালো রঙের একটা ছোটো মেমোরিকার্ড দেখতে পেয়ে ভীষণ রকম অবাক হলো। বাম হাতে ধরে থাকা আংটিটা মুঠো থেকে বের করে দেখলো সেটা পুরোপুরি ঠিক আছে। আংটিটা ওলোট পালোট করে দেখতে গিয়ে খেয়াল করলো বেশ বড়সড়ো এই আংটিটা নীচের দিকে রয়েছে অনেকটা ফাঁকা অংশ। মেমোরী কার্ডটা আলতো করে সেখানে ঢুকিয়ে দিলে একদম পারফেক্টলি সেট হয়ে গেল। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিস্মিত চোখে তাকালো সে আংটিটার দিকে।
শরীরে উত্তাপ টের পাচ্ছে স্পষ্ট। এই অবস্থায় আংটি বা মেমোরি কার্ড নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করা ঠিক হবে না ভেবে দুটো জিনিস সাবধানে সরিয়ে রাখলো নন্দিতা। এর মধ্যে কী আছে সে জানে না, তাই কোনোভাবে তুর্জয়ের হাতে পড়তে দিতে চায়না।
থরথরিয়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে নন্দিতার শরীর জুড়ে। ঠোঁট দুটো ফুলে দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে। জ্বালাপোড়াও করছে ভীষণ। শরীরের ওজন এতো বেশি লাগছে, নড়াচড়া করতেও কষ্ট হচ্ছে। ঠোঁট নাড়াতে গেলে টের পাচ্ছে কতটুকু ক্ষত স্থান পেয়েছে তার নরম ঠোঁটে। বেঁহুশের মতো বিছানায় পড়ে থাকতে থাকতে জ্ঞ্যান হারালো নন্দিতা। সকাল থেকে এমনিতেই খাওয়া নেই কিছু। তার উপর শরীরের সাথে সাথে মানসিক ধকলটাও তো কম গেল না। কখন যে নিস্তেজ শরীরটা জ্বরতপ্ত হয়ে জ্ঞ্যান হারালো টেরই পায়নি।
মনের মাঝে হাজারো কুণ্ঠাবোধ নিয়ে বাড়িতে ফিরল তুর্জয়। যেভাবে হোক নন্দিতার কাছে মাফ চাইবে আজ সে। প্রয়োজনে পায়ে পড়ার দরকার হলেও সে করবে। তবুও মুখ ফিরিয়ে আর থাকতে দেবে না তাকে। যেখানে ধূসর নিজেই স্বীকার করলো নন্দিতা তার প্রতি ইন্টারেস্টেড নয়, তাহলে কেন এই মিথ্যা নাটক সাজালো সে, সবটুকু জানবে। আর কিছুতেই দূরে সরে থাকতে দেবে না নন্দিতাকে। প্রয়োজনে শক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে ধরে থাকবে যতক্ষণ না মাফ করে তাকে।
নন্দিতার চোখ মুখের অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে কান্না নিবারণ করলো তুর্জয়। জীবনে এই প্রথমবার টের পেল সে ভালোবাসা মানুষকে কতটুকু পরিবর্তন করে। তার মতো গম্ভীর, রগচটা পুরুষকে পুরোদমে বদলে দিয়েছে এই ছটফটে মেয়েটা। যার হাসির কুঞ্জনে চাপা পড়ে গেছে তার গম্ভীরতা। নাক উঁচু স্বভাবের তাকে এই মেয়েটা দিন দিন কীভাবে যে নিজের করে নিলো, টেরই পেল না। এইযে ঠোঁট ফুলিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে আছে, এটা দেখে তুর্জয়ের নিজেকে দুটো চড় মারতে ইচ্ছে করছে। কী অবস্থা করেছে সে মেয়েটার। নিজেকে সামলে নিয়ে নন্দিতার পাশে বসলো তুর্জয়। মাথা ধরে আলতো করে বুকে টেনে নিতে গিয়ে টের পেল জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে তার। পরনের জামাটাও আধভেজা। তুর্জয় আর অপেক্ষা করল না। এমন অবস্থায় শাড়ী বা চুড়িদার পরাতে অসুবিধা হবে দেখে আলমারী থেকে তার একটা টি শার্ট বের করে সবার আগে চেঞ্জ করিয়ে দেয় নন্দিতাকে।ওষুধের প্যাকেট থেকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বের করে থুতনিতে আঙুল ঠেকিয়ে আলতো করে আলগা করে তার ঠোঁট। অতঃপর ওষুধটা ছুঁড়ে দিয়ে পানি ঢেলে দেয় মুখে। নন্দিতার জ্ঞ্যান ফিরেছে ততক্ষণে। কিন্তু চোখ খুলতে পারছে না। জ্বরের ঘোরেই কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু ঠোঁট নাড়াতে পারছে না।
তুর্জয়ের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো টপ করে। সে তাড়া দেখালো না সেটা মোছার জন্য। কিছু কিছু সময় অশ্রু বিসর্জন দিতে হয়। সবকিছু বুকের ভেতর জমিয়ে রাখার জন্য হয়না। কিছু কিছু জিনিস মুক্ত করতে পারলেই শান্তি লাগে। মানুষের চোখের জলও এমন ধরনের জিনিস। মুক্তিতেই শান্তি।
নন্দিতার মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ ধরে জলপট্টি দিচ্ছে তুর্জয়। শরীরে চাপিয়ে দেওয়া মোটা আকারের কম্বল। ঠোঁটের গায়ে রক্ত লেগে এখনও। দেখে মনে হচ্ছে আলতো করে ছুঁয়ে দিলেই রক্ত পড়বে আবারও। নন্দিতা নড়েচড়ে উঠলো। জ্বরটা কমেছে অনেকটা। চোখ খুলে তুর্জয়কে নিজের মাথার কাছে আবিষ্কার করে দুর্বল শরীর নিয়েই উঠে বসে সে। বিছানা থেকে বালিশ টেনে শুয়ে পড়ে একপাশে। তুর্জয় এগিয়ে যায় নন্দিতার কাছে। মুখের উপর ঝুঁকে কপালে চুমু খায় আলতো করে। অভিমানে বশ হয়ে থাকা মন নিয়ে নন্দিতা ঘুরে শোয় অন্যপাশে। তুর্জয়ে দুইহাতে নন্দিতাকে আগলে ধরে। ঠোঁটের আশেপাশে আলতো করে আঙুল চালিয়ে করুণ কণ্ঠে বলে,
“বড্ডো বেশি ব্যথা দিয়ে ফেলছি তাইনা?”
নন্দিতা উত্তর করলো। মুখ ঘুরিয়ে রইলো শুধু অন্যদিকে। তুর্জয় আলতো হেসে নন্দিতার মুখের উপর ঝুঁকে ধীর কণ্ঠে বলে,
“ব্যথা যখন আমি দিয়েছি, সেই ব্যথাটুকু শুষে নেয়ার দায়িত্বও তো তবে আমারই হলো।”
কথাটুকু বলে আর অপেক্ষা করল না সে। নন্দিতার নীচের ঠোঁটটা চেপে ধরলো তার দুই ঠোঁটের মাঝে। প্রথমে খানিকটা জ্বালাপোড়া করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ আরাম লাগতে শুরু করলো নন্দিতার। মানুষের লালারসে লাইসোজাইম নামক একটি এনজাইম থাকে, যা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। এছাড়া, লালারসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, শ্লেষ্মা, এবং অন্যান্য উপাদানও থাকে যা ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে, ক্ষতকে আর্দ্র রাখে এবং দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে।
প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৩৩
স্বামীর আহ্লাদী ভালোবাসাই স্ত্রীর সব রোগের ওষুধ। স্বামীর ভরসা, সাপোর্ট, ভালোবাসা পেলে একজন নারী সবকিছু থেকে লড়াই করতে পারে। স্বামী নরম মনে স্ত্রীর দিকে তাকালেই তারা রাগ গলে পানি হয়ে যায়। শত অপরাধের পরও স্ত্রীর কাছে আসলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার মতো বিশাল মন নিয়ে জন্ম হয় একজন স্ত্রীর। সেখানে তুর্জয়ের এমন আদুরে ভালোবাসা পেয়ে নন্দিতাই বা কতক্ষণ তার অভিমান ধরে রাখতে পারে? কিছুটা সময় পেরোতেই দুইহাতে তুর্জয়কে আঁকড়ে ধরে নন্দিতা। আর তুর্জয়ও একইভাবে তার দুই ব্যাথাতুর দুই ঠোঁটে উষ্ণ ওম দিতে থাকে।
রাত হয় গভীর। তুর্জয় আচমকা নন্দিতার কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেয়ে ধীর কণ্ঠে বলে ওঠে,
“তুমি আমার নিজের মধ্যে থাকা এক নিষিদ্ধ অধ্যায়। যেটা আমি বারবার ছুঁতে চাই, পড়তে চাই, মুখস্ত করতে চাই।”
