Home প্রেমের ধূলিঝড় প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৭

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৭

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৭
ফিজা সিদ্দিকী

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তনুজা আর নন্দিতা। জাওয়াদ শিকদারের দিকে তাকিয়ে সামনে পা বাড়াতে গিয়ে সরাসরি ধাক্কা খায় সে তনুজার সাথে। ব্যথা না পেলেও ভয়ে কঁকিয়ে ওঠে ব্যাথাতুর ভঙ্গিতে। তুর্জয় তৎক্ষণাৎ পাশে ফিরে নন্দিতার বাহু আঁকড়ে ধরে। চিন্তিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “ঠিক আছো?”
নন্দিতা হ্যাঁসূচক মাথা নাড়িয়ে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি মেলে তনুজার দিকে। আবেগী কণ্ঠে বলে,
“থ্যাংক ইউ এডভোকেট তনুজা। আপনার সাহায্য ছাড়া আসল কালপ্রিটকে শনাক্ত করা এত সহজ হতো না। প্রিয়জন সেজে আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের শনাক্ত করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।”

তনুজা ফিকে হাসে। চোখ তুলে তাকায় নন্দিতার বাহু ভীষণ যত্নে আগলে রাখা তুর্জয়ের দিকে। একটা শব্দ না ব্যয় করেও ভালোবাসা বুঝিয়ে দেওয়া যায়, ঠোঁট না নাড়িয়েও যত্নে বুকে টেনে নেওয়া যায়, এটা তুর্জয়কে দেখে সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছে সে। ছোটো থেকেই শুনেছে রাগী, গম্ভীর পুরুষমানুষ হয় ভীষণ যত্নশীল, নির্দিষ্ট এক নারীর কাছে তারা পানির মতো সহজলভ্য, চন্দ্রাণী রাতে চাঁদ গণনা করার মতো সহজ।
“চাঁদ যার হাতের মুঠোয়, সে কিভাবে বোঝে চাঁদের মর্ম! যারা এক পলক চাঁদের দিকে তাকাতে গিয়েও ঝলসে যায় তার জৌলুসতায়, তারাই বোঝে চাঁদ দেখার সে কি সৌভাগ্য!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নন্দিতা ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে রইলো তনুজার দিকে। সাথে সাথেই হাতে টান অনুভব করলো। তুর্জয় পা বাড়িয়েছে সামনের দিকে। অগত্যা তাকেও এগিয়ে যেতে হলো। তবে তার চোখ পড়ে রইলো পিছনে ফেলে যাওয়া তনুজার দিকে। তনুজার কথার ভাবার্থ এখনো বুঝে উঠতে পারেনি সে। তবে তার চেহারায় স্পষ্ট মলিনতার ছাপ। চোখের দৃষ্টি ঘোলা।
তুর্জয় আলতো করে কোমর জড়িয়ে ধরে নন্দিতাকে ফেরালো। দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিদ্বেষী মনটাকে শান্ত করতে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
“বাড়ি ফিরে আপনাকে এলোমেলো করার কথা ছিল, সেটার এখন কী হবে ম্যাডাম? আপনি তো ভরা মজলিসে আমাকে এলোমেলো করে দিলেন।”

নন্দিতা দুর্বোধ্য হাসে। ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সংবরণের চেষ্টা করতে করতে বলে,
“মাঝরাস্তায় অসভ্য অসভ্য কথা বলবেন না একদম।”
“সারাজীবন বলবো, মাঝে মাঝে অসভ্যতামিও করবো। আই প্রমিজ।”
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে দুজন। কলকাতা শহরের উঁচু উঁচু ইমারত আর মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টগুলো একে একে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে পিচঢালা ওয়ান ওয়ের রাস্তাগুলোতে চলতে থাকা যানবাহনগুলোকে। শব্দ করে হর্ন বাজিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বড়ো বড়ো বাস, হলুদ রঙের ঐতিহ্যবাহী ট্যাক্সিগুলো শাঁ শাঁ গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে তাদের সামনে থেকে। লোকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে বাসস্ট্যান্ডের ছাউনির কাছে। কেউ কেউ আবার ছাউনি ছেড়ে নেমে গেছে রাস্তায়, খানিকটা ঝুঁকে তাকিয়ে রয়েছে অদূরের রাস্তায়, নির্দিষ্ট বাসটা আসছে কিনা সেই অপেক্ষায়।

একটা করে বাস আসে, বাসের সামনে লাগানো নম্বরপ্লেটের দিকে তাকিয়ে পিছিয়ে যায় কিছুজন। কনটাক্টর বাসের গায়ে জোরে বাড়ি মেরে মেরে জানায় তার নির্দিষ্ট গন্তব্য। ধাক্কাধাক্কি করে মানুষ উঠে পড়ে ভেতরে মানুষের ঘামে ঠাসাঠাসি ভীড় বাসে। ব্যস্ত জীবনে প্রত্যেকেরই ভীষণ তাড়া, তাই পরবর্তী বাস আসার অপেক্ষা আর কেউ করে না। এই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত শহুরে জীবনে প্রতিটা মানুষ। লাক্সারি কারে করে যাতায়াত করা মানুষের চোখের এই দৃশ্য পড়ে রোজ। তারা দেখে, কেউ কেউ হয়তো নাক সিঁটকায়, কেউ হয়তো বেদনার্ত চোখে তাকিয়ে আহাজারি জানায়। আবার কেউ কেউ বড্ডো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ভেবে চোখ ফিরিয়ে এগিয়ে যায়।

বাস এসে থামলো তুর্জয়ের সামনে। লোকজন ধাক্কাধাক্কি করে আগে চড়তে পারলেই বাঁচে। নন্দিতাকে আগলে ধরে সাইডে আনলো সে। সবাই উঠে যাওয়া শেষে তাড়াহুড়োবিহীন বড্ডো শান্তভাবে তাকে উঠিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে দাঁড়ালো। বাস ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। বাসের ঝাঁকুনিতে খানিকটা হেলে পড়তে গেলে নন্দিতাকে একহাতে বুকের সাথে জাপটে ধরে তুর্জয়। ব্যস্ত চোখ এদিক সেদিক ঘুরিয়ে খোঁজার চেষ্টা করে বসার জায়গা। এতো ভীড় বাস, যেখানে ভেতরে পা ফেলার পর্যন্ত জায়গা নেই, এখানে ফাঁকা সিট খুঁজতে যাওয়া যে কতটা বোকামি তা কী তুর্জয় জানে? যদি জানে তবে এমন একাগ্রচিত্তে বোকামি কী শুধু প্রিয়জনের জন্য!

কর্ণারের একটা ফাঁকা জায়গায় পিঠ গলিয়ে এগিয়ে গেল তুর্জয়। নন্দিতাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে তার দিকে মুখোমুখি হয়ে ভিড়ের মুখোমুখী প্রতিরোধক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। অনেকটা ক্যাঙ্গারুর তার সন্তানকে গর্ভে লুকিয়ে রাখার মত করে লুকিয়ে রাখলো নন্দিতাকে। নন্দিতা হাসলো। স্নিগ্ধ, চঞ্চল সেই হাসিতে কতখানি মুগ্ধতা লুকিয়ে আছে তা কী তুর্জয় জানে? নন্দিতাকে হাসতে দেখে ভ্রু উঁচিয়ে উঠলো তুর্জয়। যার অর্থ, কী হয়েছে? নন্দিতা প্রথমে না সুলভ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো, যার অর্থ কিছু হয়নি। কিন্তু পরক্ষণেই একটা দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসলো তার মাথায়। তুর্জয়ের কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে বড্ডো ধীর কণ্ঠে বললো,
“আপনাকে এখন একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।”
তুর্জয় ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। নন্দিতার মতো একই ভঙ্গিতে তার কানে ফিসফিস করে বলে,

“তুমি আজকাল পাবলিক জায়গায় আমার মান সম্মান নিয়ে টানাটানি করছো, আমি করলে কোথায় লুকাবে?”
“আপনি কেন করবেন?”
“আমার ইচ্ছে হচ্ছে তাই।”
“কী ইচ্ছে হচ্ছে?”
“এভাবে দাঁড়িয়ে ঝট করে তোমার ঠোঁট আঁকড়ে ধরে লম্বা একটা চুমু খেতে।”
“এতো ডেসপারেট হওয়া ভালো না মিস্টার।”
“আপনি করে দিচ্ছেন।”
“আরও করে দেব? আলতো করে ঠোঁটে ছুঁইয়ে?”

“আমি কিন্তু শুধু ঠোঁট ছুঁয়েই শান্ত থাকি না ম্যাডাম, সামলাতে পারবেন তো এভাবে?”
নন্দিতা ঝট করে সরে গেল। এলোমেলো দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকিয়ে নিজের মনোযোগ ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলো। কারন এই লোক লাগামছাড়া হলে সত্যিই করে বসতে পারে কিছু। তুর্জয় ঠোঁট আলগা করে শব্দহীন হাসে। নন্দিতা সেদিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ আগের মতো।
এতগুলো মাস পর পানির ছোঁয়া পেয়ে শরীর, মন ফুরফুরে হয়ে উঠল নওরীনের। শরীর লাগোয়া ব্যথায় জ্বালাপোড়া হলেও মানসিক শান্তি মিলছে ঢের। তাই জ্বালাপোড়ার ব্যথা সয়ে নেওয়া যায়। চামড়ার উপর পুরু আস্তরণে লেপ্টে থাকা ময়লার স্টর ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে সে। যেন এগুলো ময়লা নয়, শিকদারদের গ্লানি। যা একবিন্দু পরিমাণের রাখতে চায়না তার শরীরে। শরীর ছিলে গেলে যাক, রক্ত বের হলে হোক, তবুও এই চামড়া থেকে তাদের সরতেই হবে।

নতুন একটা আনকোরা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে নওরীন। দেখতে তাকে এখন বেশ স্নিগ্ধ লাগছে। কিছুক্ষণ আগের বয়সের চাপে ঝুলে পড়া শরীরটা এখন অনেকরই টানটান লাগছে। চেহারায় ঔজ্জ্বল্য ফিরে পেয়েছে। শরীর ফুরফুরে, মন শান্ত। নিজেকে ভীষণ হালকা হালকা অনুভব হচ্ছে তার। ধূসর তাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়। প্যাকেট থেকে খাবার বার করতে করতে বলে ওঠে,
“আম্মা, তুমি কী পছন্দ করো আমার তো জানা নেই। তাই মাছ, মাংস, সবজি রেস্টুডেন্টে যা যা ছিল মোটামুটি সবই এনেছি। কোনটা খাবে বলো।”
খাবারের ঘ্রাণে পেট ফুঁসে উঠলো তার। এতক্ষণের ক্ষিদেটা মাথা চাগাড় দিয়ে হুলস্থূল করতে লাগলো পেটের মধ্যে। নওরীন পেট চেপে ধরে ধূসরকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“কিছু একটা দাও, প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে।”
ধূসরের চোখ ছলছল করে উঠলো। প্লেটে ভাত, সবজি, মাংস সহ আরও কয়েক পদ ঢেলে নিয়ে এগিয়ে গেল সে বিছানার দিকে।

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৬

নওরীন নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে আছে ধূসরের দিকে। এই ছেলেটাকে তার ভীষণ মনে ধরেছে। একটা মানুষ এতটা নির্ভেজাল, এতটা ভালো হয় বুঝি! শিকদার বংশে এই কোমল পদ্ম জন্মালো কীভাবে? এই স্নিগ্ধ, নির্মল পদ্ম তার গর্ভে জন্ম কেন নিলো না? সাথে সাথেই তার মনে পড়লো নন্দিতার বিয়ে হয়েছে, ওই বাড়ির মালিকের বড়ো ছেলের সাথে। ছেলেটাকে সে কখনও দেখেনি। নন্দিতা কেমন আছে কে জানে? আচ্ছা, এইযে তার সামনে বসে থাকা ছেলেটা যদি নন্দিতার স্বামী হতো, খুব কী ভুল হতো?

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৮