Home প্রেমের ধূলিঝড় প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৬৫

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৬৫

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৬৫
ফিজা সিদ্দিকী

“সবগুলো গার্ডকে এখান থেকে যেতে বলো, নইলে আমার হাতের একটা ট্রিগারের চাপ তোমার খুলির এপার ওপার হয়ে যাবে।”
ধূসরের হাতের দৃঢ়তা, নীলচে চোখের রক্তিম ধারা, কণ্ঠের গভীরতা জাওয়াদ শিকদারের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জীবনের প্রথম সে ভয় পেল। সত্যিকারের অর্থে ভয়। মানুষ বলে রক্তের স্বভাব পরিবর্তন হয়না। বাপের স্বভাব তার সন্তানের মধ্যে দ্বিগুণহারে ধরা দেয়। ধূসরকে এখন তার কাছে নতুন এক জাওয়াদ শিকদার লাগছে। নিজের স্বরুপই যেন আয়নায় দেখতে পাচ্ছেন। শরীর তার কাঁপছে। ধূসরের আগ্রাসী হিংস্র চাহনী তার ভেতরটা নাড়িয়ে দিচ্ছে ভীষনভাবে। নিজের রক্তের সাথে পেরে উঠবেন না আজ বোধহয় সে। আজ আপোষে এসে গেলে হয়তো পরে আরও সুযোগ পাবে সবাইকে শেষ করার।

ভাবনাগুলো মস্তিস্কে খেলতেই ইশারা করলো গার্ডদের। একে একে তারা ছেড়ে দিলো সবাইকে। এরপর যে পথে এসেছিলো সে পথেই ফিরে গেল একে একে।
জাওয়াদ শিকদারকে ছেড়ে ধূসর এগিয়ে গেল নন্দিতার কাছে। খাদের একদম কিনারে দাঁড়িয়ে তারা। দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের সাথে ঘটুক, কিন্তু নন্দিতা! তাকে বাঁচতে হবে। তার শরীরে একফোঁটা আঁচড় সহ্য করবে না সে।
ছাড়া পেতেই তুর্জয় উঠে দাঁড়ালো। নিজের কোমরে গুঁজে রাখা ছোটো ছুরিটা বের করে পিছন থেকে সরাসরি ধরলো তৈমুরের গলায়। আঁতকে উঠলো তৈমুর। ধূসর যখন জাওয়াদ শিকদারের হাত থেকে নন্দিতাকে ছাড়িয়ে তাকে নিরাপদ জায়গায় পাঠাতে ব্যস্ত তার উপর পাল্টা আক্রমণ করলো জাওয়াদ শিকদার। হাতের কনুই দিয়ে আঘাত করলো ধূসরের পিঠে। আচমকা আক্রমণে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ক্ষণিকের জন্য দূর্বল হয়ে পড়ল ধূসর। আর সেই সুযোগেই নন্দিতাকে আগের মত পাকড়াও করতে চায় জাওয়াদ শিকদার।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কিন্তু তড়িৎ গতিতে নন্দিতাকে সরিয়ে ফেলে ধূসর। এরপর জাওয়াদ শিকদারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশে পড়ে থাকা বন্দুকটার দিকে হাত বাড়ায়।
জাওয়াদ শিকদার কোনোভাবেই তাকে সেই বন্দুকের নাগাল পেতে দিচ্ছেনা। উপরন্তু হাতের পাশে একটা পাথর পেয়ে সেটা দিয়ে আঘাত করে ধূসরের মাথায়। ব্যথায় নীল হয়ে ওঠে ধূসরের মুখ। জাওয়াদ শিকদার তাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের উপর থেকে সরিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে খেয়াল করে একেবারে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে সে। আর এখানের মাটিটা কেমন যেন ঝুরঝুরে। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধ্বস নামে মাটি।
জাওয়াদ শিকদারের পায়ের কাছের মাটি ধ্বস নেমে সোজা গিয়ে পড়ে খাদে। তৈমুর চমকে উঠে “আব্বা” বলে এগিয়ে যেতে গেলে তার গলায় ধরে রাখা ছুরির ধারালো ফলা নিজের কারণেই গেঁথে যায় তার গলায়। ধীরে ধীরে রক্তের একটা টাকা স্রোত গলা বেয়ে নেমে আসে।

ধূসরের ধাক্কায় নন্দিতা খানিকটা সরে গেলেও বেশিদূর যেতে পারেনি। জাওয়াদ শিকদারকে খাদে পড়ে যেতে দেখে সে এগিয়ে আসে ধূসরের কাছে। মাথার পিছনে দুইহাত দিয়ে মাটিতে শুয়ে ধূসর। তার রক্তে রাঙা আশেপাশের জমিন। নন্দিতা এগিয়ে যায় তার কাছে। ধূসরকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। নন্দিতার বাহু আঁকড়ে ধরে ধূসরও উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু তৎক্ষনাৎই কিছু একটা অনুভব হয় তার। পায়ের নীচের মাটি বেসামাল। তাড়াহুড়ো করে নন্দিতাকে ধাক্কা দেয় সে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে। আর ঠিক তখনই মাটি ভেঙে পড়ে যায় খাদে। নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে বড় একটা পাথর আঁকড়ে ধরে খাদের উপর ঝুলে পড়ে সে।

ধূসরের ধাক্কায় পেটের দিকে ভর করে পড়ে যায় নন্দিতা। সাথে সাথেই তার গগনবিদারি চিৎকারে কেঁপে ওঠে ধরণী। ফাঁকা জায়গায় থরে থরে প্রতিধ্বনিত হয় সেই শব্দ। ধূসর নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে সেদিকে। চোখের কোল ঘেঁষে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে আপনাআপনি। তৈমুরকে ফেলে তুর্জয় সবেমাত্র এগিয়ে আসছিল তার দিকে। আর মুহূর্তের মধ্যেই এতকিছু ঘটে গেল যে কোনো কূল কিনারা খুঁজে পেল না কেউ। নন্দিতার কাছে এসে তাকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরলো তুর্জয়। ব্যাথাতুর কন্ঠে বললো,

“কিছু হবে না তোমার। আমরা এখনই হসপিটালে যাব। কিছু হতে দেব না তোমার।”
নন্দিতা ডুকরে কেঁদে ওঠে। তনুজা এগিয়ে এসে নন্দিতাকে একপাশ থেকে ধরে দাঁড় করায়। সাথে সাথেই পাথর আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচিয়ে তাকায় ধূসর। কান্নাভেজা কন্ঠে বলে,

“আমাকে মাফ দিও। আমাকে মাফ করে দিও, ধরণী। আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে আঘাত করেছি। আমি তাকে যন্ত্রনা দিয়েছি, যাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার এতো লড়াই। আমার জন্ম তো বৃথা হয়েছে সেই কবেই। আজ আমার জীবনও বৃথা। আমি পারলাম না তার গল্পের আধ পাতার সুখ হতে, বরং শেষপাতার উপসংহারের লাল কালির দাগ হয়ে রয়ে গেলাম। যার সামান্য ব্যথা আমার বুকে আঁচড় কাটে, যার নির্মল হাসি আমাকে বেঁচে থাকার অনুপ্ররনা জোগায় তার তীব্র আর্তনাদ আমার শরীরের সব কয়টা হাড় ভেঙে ফেলার মতো যন্ত্রণার মুখে দাঁড় করালো। আমি পারলাম না। আমি তাকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমি পারলাম না তার জীবনে সুখের বাতাস ফিরিয়ে দিতে। আমি পাপ, আমি পাপের বংশ, পাপের অংশ। তুমি স্নিগ্ধ, তুমি পবিত্রতার স্পর্শ। আমার পাপী হাত তোমার পবিত্রতায় স্পর্শ হতেই দেখো, কেমন করে সর্বনাশ করে ফেললো। তছনছ করে ফেললো সব। আমি আমার চোখের সামনে যন্ত্রণাকে কাতরাতে দেখছি। অথচ কী অদ্ভুতভাবে নিঃশ্বাস চলছে আমার। আমার তো মরে যাওয়া উচিৎ। আমার চোখের সামনে আমারই হাতে পাওয়া যন্ত্রণা তোমার। আমার শাস্তি মৃত্যু। মৃত্যু ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মুক্তি নেই আমার। নেই কোনো ক্ষমা, নেই কোনো পথ যা আমাকে তোমার দুঃখ থেকে দূরে রাখবে। আমার ভালবাসা, আমার অপরাধ, তোমার বেদনায় লীন মুখশ্রী আমার বুকে ছুরিকাঘাত করছে সহস্রবার। এই আগ্রাসী বেদনার চেয়ে আমি মুক্তি চাই। আমার মৃত্যু চাই।”

এতক্ষণে সকলের দৃষ্টি পড়লো ধূসরের উপর। নন্দিতাকে ছেড়ে তনুজা এগিয়ে এলো ধূসরের কাছে। ধূসরের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
“আপনি উঠে আসুন প্লীজ। আমার হাত ধরুন।”
ধূসর ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। হাসতে হাসতে দু চোখ ভরে নন্দিতার দিকে তাকালো। ততক্ষণে নন্দিতাকে কোলে উঠিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তুর্জয়। সেদিকে তাকিয়ে ধূসর চিৎকার দিয়ে বলল,
“আমার হৃদয়ের সবটুকু পাপ, শুধু তুমি পবিত্র। সব অন্ধকার ছাপিয়ে আলো।”
এরপর দুইহাত ছেড়ে দিলো ধূসর। মুখে হাসি টেনে চোখ বন্ধ করলো। এরপর ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল অন্ধকারের গহীনে। তনুজা চিৎকার দিল সাথে সাথে। পিছু ফিরে তাকালো তুর্জয়। তাকাল নন্দিতাও। বাতাস ভারী হয়ে উঠলো ক্রমশ। নন্দিতার চোখের কোল ঘেঁষে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো ধূসরের নামে। এটুকুই বোধহয় ধূসরের প্রাপ্তি। তার বিয়োগে একফোঁটা অশ্রু বিনিয়োগ করলো তার সখের নারী।

জঙ্গল পেরিয়ে নাঈম যখন এসে পৌঁছালো সেই ঘরের কাছে, সবকিছু শূন্য। কোথাও কারোর শব্দ নেই। নেই কোনো মানুষের অস্তিত্ব। ফোন বের করে বারবার লোকেশন দেখলো সে। হ্যাঁ, এখানেই তো। এখানেই তো থাকার কথা তনুজার। কিন্তু গেল কই? পাগলের মতো এদিক সেদিক খুঁজলো সে তনুজাকে। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে হাতড়ে বেড়াতে বেড়াতে আচমকাই তার চোখে পড়লো বিধ্বস্ত, বিমর্ষ রূপে এগিয়ে আসা তনুজাকে। এতক্ষনে যেন প্রাণ ফিরে পেল সে। কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই ছুটে গেল। দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরলো তনুজাকে বুকের সাথে।
কয়েকজন পুলিশ এসে পৌঁছালো তখনই। নাঈমই খবর দিয়েছে তাদের। সকলে মিলে ঘেরাও করে ফেললো চারপাশ। এরপর নাঈমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৬৪

“থ্যাংক ইউ স্যার। আমরা দেখছি ব্যাপারটা। কোনো অপরাধীই আর আমাদের হাত থেকে পালাতে পারবে না। আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে আসলে শেষ করা যাবে না। আপনার মত মানুষ আজও আছে বলেই আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা একটু হলেও রক্ষা পাচ্ছে। নিজের পরিবারের মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর কাজটা এতো সহজ নয়। স্পেশালি মানুষগুলো যখন আপনারই ফ্যামিলি মেম্বার। থ্যাংক ইউ সো মাচ মিস্টার নাঈম শিকদার।”
আলতো হেসে পুলিশের থেকে বিদায় নিয়ে নাঈম পিছু ফিরতেই চোখে পড়ল তনুজাকে। যার অবিশ্বাস্য চাহনী বুকে তীরের মতো বিঁধলো তার।

প্রেমের ধূলিঝড় শেষ পর্ব