বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৪
রানী আমিনা
ভোর রাত। ওয়ারদিচা হতে কুরো আহমারে পৌছানোর পানি পথের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বিশাল বিশাল লরি। আগামী ছয় মাসের খাদ্যশস্য আর খাবারের নানা কাঁচামালে ভর্তি লরি গুলো। কুরো আহমার হতে প্রক্রিয়াকরণ শেষে সেগুলো সাপ্লাই হবে বাকি সব দ্বীপ গুলোতে।
লরির চালকেরা অলস ভঙ্গীতে অপেক্ষারত মালিকের ফোন কলের। একটা ফোন কল পাওয়া মাত্রই সকলে বেরিয়ে পড়বে কুরো আহমারের উদ্দ্যেশ্যে।
ঘুম ঘুম ভাব সকলেরই। কেউ কেউ ঘুম তাড়াতে রাস্তার ওপর বসে বসে দল বেধে তাস খেলায় ব্যাস্ত, কেউ কেউ সিগারেট টানছে রাস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে। দূরের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কেউ কেউ, সূর্য উঠবে এখুনি, পূব আকাশে লালিমা দেখা যায়।
লরির ওপর গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে ছিলো কজন। অন্যদের ডাকাডাকিতে চোখ কচলে ঘুম থেকে উঠলো তারা। ফোন হাতে নিলো কেউ কেউ৷
হঠাৎ তাদের ভেতরের কারো একজনের উত্তেজিত স্বর ভেসে এলো,
“এই তোরা এই ভিডিও দেখেছিস?”
“কিসের ভিডিও?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
জিজ্ঞেস করে কৌতুহলী হয়ে উঁকি ঝুঁকি মারলো আশেপাশের কজন। স্ক্রিণে তাকাতেই দেখলো সমুদ্রের ভেতর মালবাহী জাহাজে ক্রেনের সাহায্যে কন্টেইনার হতে পানিতে ফেলে দেয়া হচ্ছে পঁচাগলা লাশ।
মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে কেউ একজন চমকে উঠে আতঙ্কের সুরে বলল,
“আরে ওটা তো সেবাস্টিন এর মতোন দেখা গেলো! বছর তিন আগে আমাদের যে ছেলেটা গুম হয়েছিলো।”
বার বার করে একই জায়গা টেনে টেনে দেখলো তারা, নিজেদের ধারণাকৃত লোকটিই যে কন্টেইনার থেকে পানিতে পড়লো সেটা নিশ্চিত হলো ওরা। আতঙ্কিত চোখে একে অপরের দিকে তাকালো।
একটি অ্যানোনিমাস পেইজ থেকে ঘন্টা দুই আগেই আপলোড করা হয়েছে ভিডিওটি৷ ইতোমধ্যেই সেটা ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত পঞ্চদ্বীপ জুড়ে। মালবাহী জাহাজ গুলো বাদশাহ জাজীব ইলহান দেমিয়ানের মালিকানাধীন, রাজকীয় সাজসজ্জা দেখে সবাই একই মন্তব্য করে চলেছে সেখানে।
গভীর মনোযোগ দিয়ে ভিডিও গুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ ওরা শুনলো কারো আতঙ্কিত চিৎকার, মাথা তুলতেই দেখতে পেলো সমুদ্রের দিক থেকে উর্ধশ্বাসে ছুটে আসছে ওদেরই কজন, চিৎকার করে চলেছে আতঙ্কে! উচ্চস্বরে বলার চেষ্টা করে চলেছে কিছু, কিন্তু দূর থেকে তাদের কোনো বাক্যই সুস্পষ্ট হচ্ছে না।
গাড়ির ওপর থেকে তড়িঘড়ি নেমে গেলো তারা, তাসের আসরে বসা লোকগুলোও উঠে দাঁড়ালো তৎক্ষণাৎ। সেই মুহুর্তেই বোধগম্য হলো ছুটে আসতে থাকা লোকগুলোর চিৎকার, আতঙ্কে চিৎকার দিতে দিতে তারা বলে চলেছে,
“পালাও সবাই…! কুমিরে আক্রমণ করেছে….. কুমির….!”
রাস্তার ওপরে থাকা লোকগুলো অবুঝের মতোন তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে৷ সেই মুহুর্তেই পেছন থেকে ভেসে এলো সড়সড় শব্দ, লরির ফাঁকা দিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেলো ঝাঁকে ঝাঁকে বিশাল বিশাল কুমির সমুদ্র হতে উঠে ধেয়ে আসছে তাদের দিকেই!
ভয়ে, আতঙ্কে চিৎকার চেচামেচি শুরু করলো সকলে, হুড়মুড়িয়ে দড়ি বেয়ে উঠে গেলো লরির ওপর। যারা লরির ওপর উঠতে পারলোনা তারা ছুটে পালাতে নিলো জনপদের দিকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা তাদের৷ ঝড়ের গতিতে রাস্তায় উঠে এলো ভয়ানক দর্শন কুমিরের ঝাঁক। পালানোর পথ রইলোনা আর কারো, জীবননাশের শঙ্কায় আর্তনাদ জুড়ে দিলো সকলে।
সেই মুহুর্তেই রাস্তার ওপর উঠে এলো আরেকটি ভয়ানক আকৃতির কুমির, হিংস্রতা ছেয়ে আছে তার মুখমণ্ডল জুড়ে! অন্য কুমিরেরা ধীরে ধীরে জায়গা করে দিলো তাকে সামনে এগোনোর। তাকে দেখা মাত্রই শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো মানুষ গুলোর, এখুনি হয়তো অতিরিক্ত চাপে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়বে!
কুমিরটি এসে শরীর ঝাড়া দিতেই পরিণত হয়ে গেলো একটি পূর্ণবয়স্ক দানবীয় পুরুষে, তার দেখাদেখি অনেকেই একই ভঙ্গিতে মানুষে পরিণত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো পেছনে।
দানবীয় পুরুষটি ভারী পা ফেলে এগিয়ে গেলো চালকদের ভেতর লিডার গোছের একজনের দিকে, তারপর গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“লরি ঘোরাও।”
লোকটি ভয়ে আতঙ্কে পাংশুবর্ণ ধারণ করলো মুহুর্তেই, শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
“এ্-এগুলা না পৌছাইলে অ্-অন্যেরা না খেতে পেয়ে ম্-মরবো!”
“লরি ঘোরাও! একটা লরিও কোথাও যাবে না।”
“কন্ট্রোলার জানলে খ্-খুব খারাপ হইবো। ত্-তিনি আপ-আপনাদেরকে ছাইড়া দিবেন না, হি-হিজ ম্যাজেস্টিকে উনি সব বলে দিবেন।”
“তোমার কন্ট্রোলারকে গিয়ে বোলো কোকো এসেছিলো, সব লুটেপুটে নিয়ে গেছে। যদি জিজ্ঞেস করে কার আদেশে, বলে দিও, বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান।”
হিসহিসিয়ে বলে উঠলো কোকো। পরমুহূর্তেই হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
“কেউ এখান থেকে এক পাও নড়লে বা কারো সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে জ্যান্ত ছিড়ে খেয়ে ফেলবো!”
পেছনে ফিরে একজনকে বলল সবার থেকে যোগাযোগের সমস্ত যান্ত্রিক বস্তু গুলো ছিনিয়ে নিতে, তারপর লিডার গোছের লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কোকোর বিশাল শরীরের সামনে ছোট খাটো লোকটি যেন নাই হয়ে গেলো, চুপসে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কাচুমাচু হয়ে।
“যাও, গিয়ে খবর দাও তোমার কন্ট্রলারকে। যদি বুকের পাটা থাকে তো আসতে বলে দিও। আমার কয়টা বা**ল ছিড়তে পারে আমিও দেখি।”
বলে রাস্তা দেখিয়ে দিলো ওয়ারদিচার প্রধান শহরের। লোকটি প্রাণভয়ে উর্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে গেলো শহরের দিকে।
কুরো আহমার জুড়ে হঠাৎ নেমে এসেছে অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা। ভোরের কাঁচাবাজার আর মুদিখানার দোকান, যেখানে প্রতিদিন কোলাহল, ঠেলাঠেলি আর দর কষাকষির শব্দ গমগম করতো, সেখানে আজ এক সপ্তাহ ধরে ভীষণ রকম ফ্যাসাদ। আজ যেন একটু বেশিই।
সুপার শপের দোকানের তাকগুলো ফাঁকা হয়ে উঠছে, মাছ মাংসের দোকান গুলোতে দিশেহারা হয়ে বসে আছে বিক্রেতারা, সাপ্লাই আসছে না যে!
অতচ ক্রেতাদের ভীড় ঠেলা দুষ্কর!
মুদি দোকানের সামনেও দীর্ঘ লাইন, অথচ ভেতরে কিছুই নেই। মানুষ চিৎকার চেচামেচি করে চলেছে, কেউ মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে চিৎকার করে চলেছে৷ বৃদ্ধেরা বলে চলেছে জীবদ্দশায় এমন কান্ড হতে দেখেনি। ওয়ারদিচা, কিমালেব দু’জায়গা থেকেই সব রকমের সাপ্লাই বন্ধ। কোনো লরি এসে পৌঁছেনি।
পোশাকের কাঁচামালও নাকি এবার আসেনি। কারখানার মালিকেরা শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে, কাঁচামাল ফুরিয়ে এসেছে বড়জোর আর কয়েকদিন চলবে৷
কাঁচাবাজার গুলোতে ভীষণ কোলাহল, সবাই নিজেদের ভেতর কথা বলাবলি করে চলেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে একটি লরিও আসেনি কুরো আহমারে, কাঁচা বাজার খালি। এখন তো চাল ডাল আটা ময়দারও তীব্র সংকট পড়ে গেলো। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে চলেছে হু হু করে, অল্প যা কিছু বেঁচে আছে সেগুলো বিক্রি করতে চাইছে না কেউ। গত রাতে নাকি কোন সুপার শপে লুটপাটও হয়েছে, যত ধরণের খাদ্য শস্য ছিলো সব লুট করে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। গত সপ্তাহে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটা নিয়ে এখনো জল্পনা কল্পনা, আলোচনা সমালোচনা হয়ে চলেছে। যেখানে সেখানে লোকজন এগুলো সম্পর্কে চাপা গলায় আলোচনা করছে।
মালবাহী জাহাজটি বাদশাহ ইলহানের সেটা সম্পর্কে সকলেই নিশ্চিত, কিন্তু কেউ টু শব্দটি করছে না। গতকাল শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কয়েকটি যুবসংঘের ছেলেমেয়েরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমেছিলো। ভিডিতে দেখা যাওয়া লাশুগুলোর বেশ অনেকেই নিরপরাধ, এবং সময়ে সময়ে গুম হয়েছে। তাদের পরিবারের লোকজন ও শামিল হয়েছিলো আন্দোলনে৷
নিরাপরাধদেরকে কেন এভাবে প্রাণ হারাতে হলো তার জবাব চেয়েছে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরোদমে শহর নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, তবুও মাঝে মাঝেই পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ওপর খাদ্যসঙ্কটের কারণে শহরের অবস্থা ভয়াবহ।
সকলের এই গোপন আলোচনার ভেতর মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছে কারো কারো উঁচু গলা। অধিকাংশই যুবক। আলোচনার ভেতর তাদেরই একজন বেশ জোর গলাতেই বলে উঠলো,
“বাদশাহ জাজীব ইলহান দেমিয়ানের সময়ে গত বছরে দুবার কিমালেবে আগুন লেগেছে। ওয়ারদিচার ফসলের গুদামেও আগুন লেগেছে। হিজ ম্যাজেস্টি যদি এসব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন তবে আমাদেরকে আমাদের মতো করে ছেড়ে দিন।”
পাশেই তার মা দাঁড়িয়ে ছিলো, ছেলেকে চাপা ধমকে চুপ করিয়ে দিয়ে ভিড়ের ভেতর থেকে এক প্রকার টেনে বের করে নিয়ে ছুটে গেলো বাড়ির দিকে।
সুসজ্জিত কামরার ভেতর কোমরে হাত ঠেকিয়ে, ঢাউস পেট নিয়ে হাটাহাটি করে চলেছে অরোরা। পাশেই তার খাস বাদি বসে আছে খাবারের বাটি নিয়ে, বেশ অনেক ক্ষণ ধরেই অরোরাকে একটু কিছু খেয়ে নেবার জন্য অনুরোধ করে চলেছে মেয়েটি৷ কিন্তু নাক কুচকে আছে অরোরার, খাবারের আঁশটে গন্ধে গা গুলিয়ে আসছে তার৷ কিছুই মুখে দিতে পারছে না।
এত বেছে বেছে, ভালোভাবে রান্না করার পরও মুখে দিতে পারছে না সে। তারওপর গর্ভে যে বেড়ে উঠছে সে তাকে দিনরাত যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে, কখনো কখনো মনে হয় যেন পেট চিরে বেরিয়ে আসবে৷
হাটতে হাটতে হঠাৎ যন্ত্রণা পূর্ণ চেহারায় খাসবাদীর দিকে তাকালো সে, শুধোলো,
“উনি এখনো ফেরেননি?”
“না অরোরা, মুহসিন বললেন সাম্রাজ্যের নানা রকম ঝামেলার কারণে বেশ ব্যাস্ত আছেন তিনি। চিন্তা কোরোনা, সময় পেলেই তোমাকে দেখতে আসবেন তিনি।”
অরোরার কান্না পেলো, আগে যা একটু কাছে পেতো এখন তাও পায়না। তাঁর সন্তান বয়ে চলেছে সে নিজ গর্ভে, অথচ আজ পাঁচ দিন হলো একবারের জন্যও দেখতে আসেননি ওকে, কাউকে দিয়ে খোঁজ নিতেও পাঠাননি।
আসলেও বা কি? শুধুতো বাচ্চার খাবরই নিবেন তিনি, সে মরে গেলেও কি তাঁর কিছু আসে যায়?
অরোরা হেলে দুলে হেটে গিয়ে বসলো সোফাতে, পিঠ ঠেকিয়ে দিলো সন্তর্পণে। পেটের বাচ্চাটা একটু বেশিই যন্ত্রণা দেয়, সহ্য করতে পারে না ও। মনে হয় এখনি বুঝি মারা যাবে যন্ত্রণায়!
মেয়েটি আরেকবার সাধলো কিছু খাওয়ার জন্য, কিন্তু অরোরা অল্প কিছু মুখে দিয়েই আর খেলোনা।
এমন সময়ে বাইরে শোনা গেলো পদশব্দ, পরিচিত শব্দ শুনে অরোরা চমকে তাকালো দরজার দিকে। বুকের ভেতরটা খুশি খুশি হয়ে গেলো প্রচন্ড। খাসবাদীটি দ্রুতই খাবার ট্রে নিয়ে গা ঢাকা দিলো।
অতি কষ্টে উঠে দাঁড়ালো অরোরা৷ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো ইলহান। ওকে দেখা মাত্রই অরোরা মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালো, পরক্ষণেই মিষ্টি হেসে তাকালো ইলহানের পানে।
ইলহানের উদ্ভ্রান্ত চেহারা দেখে থমকালো কিছুটা, রিনরিনে গলায় শুধলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ঠিক আছেন আপনি? আপনার কি শরীর খারাপ করেছে?”
ইলহান এগিয়ে এলো, ধরে বসিয়ে দিলো আবার অরোরাকে, নিজেও বসলো পাশে। অরোরার পেটের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে হাত রাখলো, বলল,
“কিছু হয়নি, ঠিক আছি।
আমার সিংহ কেমন আছে?”
“খুব দুষ্টু হচ্ছে, আমাকে এক ফোটা যদি শান্তিতে থাকতে দেয়! পেটের ভেতর থেকেই সে যুদ্ধ করতে শিখছে যেন! বাইরে এলে যে কি করবে আমি এই চিন্তায় শেষ হয়ে যাই।”
ইলহান শুকনো হাসলো। অরোরার পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললো,
“খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করছো তো? অনিয়ম কোরোনা একদমই, আমার সিংহের কিছু হলে কিন্তু তোমাকে দেখে নিবো।”
অরোরা হাসলো, সেই মুহুর্তেই মুচড়ে উঠলো বাচ্চাটি। চাপা চিৎকার দিয়ে উঠলো অরোরা। ইলহান চমকে তাকালো অরোরার দিকে, নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করতে পেরে খুশিতে যেন আত্মহারা হয়ে গেলো সে। অরোরা অসহায় গলায় বলল,
“দেখেছেন কেমন করে? এমন জোরে ছোটাছুটি করতে চাইলে আমি বাঁচি বলুন?”
এমন সময়ে দরজায় নক পড়লো, বাইরে থেকে ভেসে এলো ইযানের গলা,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, আপনার সাথে জরুরি আলাপ ছিলো।”
ইলহান অরোরার উন্মুক্ত পেটে ঠোঁট ছোয়ালো।
মুখ ভার হলো অরোরার, তা খেয়াল করে অরোরার কপালে ঠোঁট স্পর্শ করে বলল,
“সময় পেলেই তোমার সাথে দেখা করতে আসবো, মন খারাপ কোরোনা। আর খাওয়া দাওয়ার কোনো অনিয়ম যেন না হয়।”
অরোরার গালে ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো সে কামরা ছেড়ে।
রয়্যাল ফ্লোরের বিরাট সুসজ্জিত বারান্দায় পায়চারি করছিলো ইযান৷ এখানে এখনো ফুটে আছে শেহজাদীর হাতে লাগানো ফুল। হরেক রঙা গোলাপ আর বুনো ফুলে ঢাকা একাংশ। বৃদ্ধা ইয়াসমিন রোজ একবার করে এসে গাছে পানি দিয়ে যায়।
প্রাসাদের দায়িত্ব আর সে পালন করেনা, সেই শক্তি সামর্থ নেই। তবুও এত বছর ধরে একনিষ্ঠ ভাবে এই দেমিয়ান পরিবারের সেবা করায় প্রাসাদেই তার স্থান হয়েছে।
বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে সকলেই তাকে সম্মানের চোখে দেখে, তাছাড়া স্বয়ং শেহজাদীর খাসবাদী হওয়ার কারণে বেশ কদর তার। এখনো মেয়েরা তাকে পেলে জেঁকে ধরে, শুনতে চায় সেই অপরূপা রমণীটির সৌন্দর্যের কথা।
ইয়াসমিন বেশ আনন্দ নিয়েই বলে, বলার সময়ে গর্বে ফুলে ওঠে তার বুক।
আর দাসীরাও শোনে, অবাক হয়। কে এমন ছিলেন তিনি, যাকে পেয়ে এমন নৃশংস, নির্দয় কেউ এতটা বদলে গিয়েছিলেন! কোন ক্ষমতা, জাদুবলে এটা সম্ভব হয়েছিলো!
ইযান নিজেও শোনে। ডার্ক প্যালেসে শেহজাদীকে প্রথমবার দেখার পর থমকে গেছিলো সে। হিজ ম্যাজেস্টি ধমকে ওকে হুশে না ফেরালে ও তাকিয়েই থাকতো বোধ হয়।
ভাতিজি যা-ই করুক, তিনি নিজে বকাবাজি করবেন তবুও মেয়ের বিরুদ্ধে কোনো কথা সহ্য করবেন না, তার দিকে কেউ তাকালেও সহ্য করবেন না৷ আজব পরিবার, আজব রক্ত!
হাসলো ইযান।
এমন সময়ে ধীর পদশব্দে এসে হাজির হলো ইলহান। বসলো সোফাতে। ইযানকে ইশারায় বসতে বলল। ইযান বসলে জিজ্ঞেস করলো,
“বলো ইযান, ভিডিওটা কোথা থেকে আপলোড করা হয়েছে খোঁজ পেয়েছো।”
“ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি সত্ত্বেও কিছু পাইনি।”
“তাহলে আমাকে কি জানাতে এসেছো?”
কড়া গলায় বলল ইলহান। ইযান মাথা নিচু করে ফেললো, আমতা আমতা করে বলল,
“ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি। আপনাকে কিছু সংবাদ দেওয়ার ছিলো।”
“দ্রুত বলো।”
“গত সপ্তাহ থেকে ওয়ারদিচা আর কিমালেব থেকে কোনো লরি কুরো আহমারে পৌঁছেনি। কেন পৌঁছেনি, লরি গুলো কোথায় গেছে কেউ জানে না।”
“গত সপ্তাহে ঘটেছে, আর তুমি আমাকে এখন এসে জানাচ্ছো? ইযান, কি হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে তোমার দায়িত্বে গাফিলতি করছো কেন?”
ঝাঝিয়ে বলে উঠলো ইলহান। ইযানের মাথা নুয়ে গেলো আরও, ইতস্তত করে সে বলল,
“আপনি ভিডিওর ব্যাপারটা নিয়ে আপসেট ছিলেন তাই…. আপনাকে কিছু জানাইনি। ভেবেছিলাম নিজে নিজেই সমাধান করে ফেলবো, কিন্তু…..”
“তোমাকে সাবধান করছি ইযান, দ্বিতীয় বার আমার থেকে কোনো কথা লুকোবে না। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা ইস্যু তুমি কিভাবে আমার থেকে চেপে গেলে? ডিটেইলস বলো দ্রুত!”
“গত সপ্তাহে যেদিন ভিডিও এক্সপোজ হয়েছিলো সেদিন সকালেই ওয়ারদিচা থেকে পরবর্তী ছ’মাসের খাদ্যের চালান নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো প্রায় পঞ্চাশ ষাটটা লরির। কিন্তু সেগুলোর একটিও কুরো আহমারে পৌঁছেনি। কিমালেবের ব্যাপারেও আমরা একই সংবাদ পেয়েছি, পোশাকের কোনো কাঁচামাল সেখান থেকে কুরো আহমারে পৌছেনি।
এমনকি রোজকার কাঁচা বাজারের সাপ্লাই ও গত এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ পড়ে আছে৷ কোনো লরিই ওয়ারদিচা থেকে বের হতে দেখা যায়নি।”
“ইব্রাহিম কি করছে? তার হাতে আমি ওয়ারদিচা ছেড়ে দিয়েছি, আর সে এভাবে ওয়ারদিচা সামলাচ্ছে? ওর সাথে যোগাযোগ করেছো?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমি ইব্রাহিম খালিলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাকে ফোনে পাইনি। লোক পর্যন্ত পাঠিয়েছি, কিন্তু খবর এসেছে সে সেদিন থেকেই লাপাত্তা। এমনকি ওয়ারদিচার কোনো বিজনেসম্যান, কোনো লরির মালিককে পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। সকলেই লাপাত্তা।
কিমালবের কন্ট্রোলার ফাইসাল আমিরের সাথেও আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, সেখানেও একই সিচুয়েশন। ফাইসাল আমিরকেও পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানের বড় বড় পোশাক কাঁচামালের মালিকরাও নিখোঁজ।”
ক্ষনকাল নিরবতা চলল। ইলহান মাথা চেপে ধরে তাকিয়ে রইলো মেঝের দিকে। ইযান চাপা গলায় বলে চলল,
“শহর গুলোতে প্রচন্ড খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে ইয়োর ম্যাজেস্টি, কুরো আহমারের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় খাদ্যসঙ্কট খুব দ্রুতই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সকলেই রাস্তাতে, লুটপাট শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। লোকজন সুপার শপ গুলোতে ভাঙচুর করে চলেছে, বাসা বাড়িতে কেউ ঘুমোচ্ছে না চোর ডাকাতের ভয়ে। আপনার কি আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি?”
“আসওয়াদ কোথায়?”
দৃঢ় গলায় প্রশ্ন করলো ইলহান। ইযান প্রথমটায় চমকালো কিঞ্চিৎ, উত্তর দিলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, তাকে এখনো পর্যন্ত রেড জোন থেকে বাইরে বেরোতে দেখা যায়নি। আমাদের কোনো গার্ডের চোখে তাকে পড়েনি, কোনো সার্ভিলেন্স ক্যামেরাতেও তাকে কখনো দেখা যায়নি।”
“তোমার কি মনে হচ্ছে ও ক্যামেরার সামনে এসে তোমাকে হাই হ্যালো করে যাবে ড্যাম ইট!”
গর্জে উঠে বলল ইলহান। ইযান কেঁপে উঠলো, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। ইলহান রেগেমেগে আবার বলল,
“তোমাকে গতবারই বলেছিলাম মোশন সেনসর্স সেট করো রেড জোনের সমস্ত বর্ডার জুড়ে, শিরো মিদোরি থেকে বের হওয়ার পানি পথ গুলোতে। এখনো সেট করোনি কেন, জবাব দাও!”
ইযান চুপ করে রইলো, যাকে কেউ কখনো বের হতে দেখেনি তার জন্য নতুন করে মোশন সেনসর্স লাগানো ওর কাছে অহেতুক লেগেছিলো, তাই গড়িমসি করেছে। এর ভেতরে যে এতকিছু হয়ে যাবে তা তার কল্পনাতেও আসেনি।
ইলহান বড় বড় দম ফেলে শান্ত করলো নিজেকে। কিয়ৎক্ষণ বাদে বলল,
“আজকেই মোশন সেনসর্স সেট করবে, ওর প্রতিটা মুভস আমার জানা প্রয়োজন।
ও-ই আমাকে শেষ করবে, ও-ই আমাকে ধ্বংস করবে! ওকে সেদিন আমি মেরে কেন ফেললাম না? কেন সেদিন মায়া করলাম আমি!”
ইলহান কপাল চেপে দুহাতে চুল আকড়ে বসে রইলো, এমন সময়ে শব্দ করে বেজে উঠলো ইলহানের ব্যাক্তিগত মোবাইল ফোন। ইলহান প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে তাকালো এবোনির টেবিলের ওপর রাখা ফোনের স্ক্রিনের দিকে৷
মুস্তাফা আজমের নামটা লেখা দেখা মাত্রই তাকালো ইযানের দিকে, ইযান নিজেও নামটা দেখে ইতস্ততভাবে বলল,
“কুরো আহমার উনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে হয়তো, তাই আপনাকে জানাতে চাইছেন।”
ইলহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, তারপর ফোন রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো মুস্তাফা আজমেরের আতঙ্কিত, ভয়ার্ত কন্ঠস্বর,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে! আমাকে বাঁচান, দয়া করে বাঁচান আমাকে! ওরা আমার কামরার দরজার সামনে, আমাকে বাঁচান!”
“কারা এসেছে মুস্তাফা? কারা ওরা?”
কিন্তু মুস্তাফা আজমের কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো বিকট শব্দ, ইলহান হ্যালো হ্যালো করলো কয়েকবার, ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলোনা। কিছু অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতে আসতে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হলো সংযোগ। ইলহান ফোনটা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে খিচিয়ে বলে উঠলো,
“এক্ষুনি কুরো আহমারে খবর নাও, সেখানে কি হচ্ছে তার সমস্ত খবর আমার জানা চাই!”
ইযান মাথা নুইয়ে আনুগত্য জানিয়ে তখুনি ছুটলো বাইরে।
আকাশে চকচকে বাকা চাঁদ। ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে মাটিতে। ছুরির ফলার মতোন তীক্ষ্ণ বাতাসে কাটা দিয়ে যাচ্ছে গায়ে।
রেড জোনের ভেতর মসভেইলের সম্মুখে বিশাল জনসমাগম। তাদের মৃদু ফিসফিসে আলোচনার শব্দ ভেসে আসছে থেকে থেকে। দূরে কোনো পাখির বিষণ্ণ ডাক কানে আসছে ক্ষণিক পর পর। চত্ত্বরে জমায়েত মানুষ গুলোর কেউ কেউ গুটিয়ে দাঁড়িয়ে, থিতু চোখে চেয়ে আছে চারদিকে। মুখগুলোতে ভীতি আর উত্তেজনার মিশ্রিত ছাপ।
রেড জোনের ভারী হাওয়াতে শ্বাস নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাদের, বড় বড় দম নিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে তারা। জীবনে প্রথমবারের মতোন এই রেড জোন নাম ভয়াল জগতে প্রবেশ করে বুক ধুকপুক করছে সকলের। কানের কাছে সর্বক্ষণ ভেসে চলেছে এক অদ্ভুত গ্রুম গ্রুম আওয়াজ, যেন দেহ এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছেনা তাদের।
কিছু দূরে শক্ত দড়িতে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা রয়েছে জনা পনেরো লোক। দড়ির দৃঢ় বাঁধনের চাপে নড়াচড়া অসম্ভব হয়ে পড়েভহ্ব। রক্তপ্রবাহে বাধা পড়ায় ধীরে ধীরে রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে তাদের দেহ। মাথা নিচু করে পড়ে আছে তারা, কোনো এক অমোঘ অপরাধবোধের তাড়নায়।
তাদেরকে পাহারা দিতে সামনেই যন্ত্রের মতোন স্থীর দাঁড়িয়ে কোকো, ওর পেছনে দাঁড়িয়ে বাকি বাচ্চারা। সকলের হাতেই ধারালো অস্ত্র।
আঁধারের চাদরে ঢেকে থাকা বন বাদাড়ের ভেতর, দৃষ্টির আড়ালে চক্কর দিচ্ছে চলেছে চারপায়ী শিকারী জন্তুর দল, হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসছে হায়েনার নৃশংস হাসি, যেন শুনিয়ে যাচ্ছে মরিচীকার মতোন ভয়াল ভবিষ্যতের অশুভ বার্তা!
হঠাৎই নিস্তব্ধ হয়ে এলো চারদিক, এক অজানা আতঙ্ক এসে ভর করলো সকলের মাঝে। মুহুর্তেই থেমে গেলো সকল ফিসফিসানি, সকলের দৃষ্টি ছুটলো চতুর্দিকে। ঠিক তখনই দূর হতে ভেসে এলো ভারী বুটের শব্দ; ধীর, লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসছে কেউ এদিকেই!
প্রতি পদক্ষেপের সাথে দ্রুততর হতে শুরু করলো তাদের হৃৎস্পন্দন। গাছের ডালে বসে থাকা রাতের পাখিরাও ডানা গুটিয়ে নীরব হয়ে গেলো যেন। মাটিতে বেঁধে ফেলে রাখা সেই বিশ্বাসঘাতকেরা কেঁপে উঠলো ভয়ে; চোখ তুলে দেখার চেষ্টা করলো ভারী পদশব্দের অধিকারীকে। আর তখনই জমাট বাধা আঁধার ছিন্ন করে আবির্ভাব ঘটলো মীরের!
তার রাজকীয়, প্রতাপশালী পদচারণা ত্রাসের সৃষ্টি করলো উপস্থিত প্রতিটি প্রাণীর মননে। আনুগত্যে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো তারা মুহুর্তেই, অবচেতন শ্রদ্ধার ভারে নত হয়ে এলো মস্তক।
এই প্রচন্ড শীতেও গায়ে স্রেফ একটি পাতলা সাদা শার্ট, শরীর জুড়ে ঘামের তরল। শ্যামরঙা পেটানো দেহ ঘামের প্রভাবে চকচক করে চলেছে। হাতে ধরা একটি কোল্ড ড্রিংকের ক্যান, তাতে চুমুক দিতে দিতে অগ্নিশিখার ন্যায় চোখ জোড়া দিয়ে অন্ধকার চিরে এগিয়ে এলো সে। ধীর পদক্ষেপে হেটে এসে বসলো মসভেইলের সামনে স্থাপিত বিরাট সিংহাসনে। তার ছায়াকে অনুসরণ করে সিংহাসনের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে পড়লো লিও, কাঞ্জি; মীরের বহু পূর্বে নিযুক্ত দুই দানবীয় দেহরক্ষী।
সে চত্বরে উপস্থিত হতেই ভারী হয়ে এলো বাতাস, এক গুমোট নিস্তব্ধ আবহাওয়া মুহুর্তেই এসে ভর করলো চতুর্দিকে। উপস্থিত মানুষগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো সম্পুর্ন, নড়াচড়া পর্যন্ত করার সাহস করলো না।
মীরের ঠোঁটে ফুটে রইলো ক্ষীণ এক বাঁক, সেটাকে ঠিক হাসি বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; বলা যায় তার প্রবল, দুর্ধর্ষ ক্ষমতার নিঃশব্দ স্মারক।
মীর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো অ্যাশটনের দিকে। অ্যাশটন এই নিঃশব্দ আদেশ পাওয়া মাত্রই মাথা নেড়ে সিংহাসনের পেছন ঘুরে এগিয়ে গেলো দড়ি বাধা লোকগুলোর দিকে, একে একে খুলে দিলো তাদের বাঁধন। মুক্ত হতেই সকলে তড়িঘড়ি ছুটে এসে লুটিয়ে পড়লো মীরের সামনে, কেউ একজন সাহস করে মীরের পা স্পর্শ করতে এগিয়ে আসতেই লিও ঝটিতি গিয়ে লাথি মেরে সরিয়ে দিলো ওকে অন্য দিকে।
মীর ডান ভ্রু উঁচিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ তাদের ভয়ার্ত, ক্ষমা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খায় ভরা চেহারা। বেশ মজা পেলো যেন! খোশ মেজাজে বলল,
“এক্সপ্লেইন ইয়োরসেলভস, এক্সপ্লানেশন ভালো লাগলে ক্ষমা করে দিবো।”
মুস্তাফা আজমের লাথি খেয়ে পড়েছিলেন একপাশে, তিনি দ্রুত হাটুগেড়ে এগিয়ে এসে কান্নাজড়ানো, শঙ্কিত গলায় অনুরোধের সুরে বলে উঠলেন,
“ক্ষমা করে দিন ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমি কন্ট্রোলার হতে চাইনি! হিজ.. শেহজাদা ইলহান বলেছিলেন আমি যদি তার হয়ে কাজ করি তবে তিনি আমাকে মারবেন না। ক্ষমা করুন ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমি বিশ্বাসঘাতক নই! প্রাণ বাঁচাতে আমি এ কাজ করেছি! বিশ্বাস করুন আমাকে, আমার ছোট মেয়েটার আমি ছাড়া কেউ নেই, ক্ষমা করুন আমাকে!”
মীর দু ভ্রুই উঁচু করলো এবার, ঠোঁট উল্টিয়ে খুব চিন্তা ভাবনা করার ভাব ধরলো, পরমুহূর্তেই বলল,
“ভালো লাগেনি, নেক্সট?”
মুস্তাফা আজমের কে ঠেলে সরিয়ে দিলো অন্যরা, যে যার নিজের এক্সপ্লানেশন বলায় ব্যাস্ত হয়ে গেলো মুহুর্তেই। কেউ কেউ ভেঙে পড়লো কান্নায়, মীরের কাছাকাছি যেতে নিলেই লিও বা কাঞ্জি সরিয়ে দিলো তাদের!
মীর পূর্বের মতো করেই দেখলো তাদের ভীতসন্ত্রস্ত, বিপর্যস্ত চেহারা, বাঁচার তীব্র আকুতি। ভীষণ রকম হাসি পেলো তার, পরমুহূর্তেই গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“তোমরা যেতে পারো, আমি তোমাদেরকে আর কখনো দেখতে চাইনা।”
বলে দুহাত ভাজ করে মাথার পেছনে ঠেকালো সে, চোখ বুজে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েসে মাথা ঠেকালো সিংহাসনের শীর্ষভাগে। ভর দিয়ে বসতেই ফুলে উঠলো তার বাহুর দৃঢ় পেশি।
মুক্তির কথা শুনে চোখ চকচক করে উঠলো সকলের, অবিশ্বাসে ভরা দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকালো একবার। কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠলো তাদের চেহারায়, তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে আনুগত্য করলো সকলে। মুস্তাফা আজমের প্রচন্ড খুশিতে কেঁদে ফেললেন, কৃতজ্ঞতার সুরে বললেন,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার এই মহানুভবতা কখনো ভুলবোনা, চিরজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। আজ থেকে আমি আবার আপনার হয়েই কাজ করবো, এবার আমার বিশ্বস্ততায় আর কোনো ছেদ আপনি পাবেন না, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর চুপচাপ চোখ বুজে রইলো সেভাবেই। ওকে এত শান্ত দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সকলে, পরমুহূর্তেই দ্রুত পায়ে এগোলো রেড জোন ছেড়ে বেরিয়ে যাবার জন্য।
খুশিমনে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চারদিক থেকে ভেসে এলো ক্ষুধার্ত হায়েনার হিংস্র হাসির শব্দ, পাশেই কোথাও আকাশের দিকে চেয়ে করুণ স্বরে ডাক পাড়লো কোনো নেকড়ে, যেন আহ্বান করলো তার সঙ্গী সাথীদের!
ভড়কালো তারা, তবুও একে অপরের দিকে তাকিয়ে সাহস যোগালো। এগোতে শুরু করলো আবারও, বাড়িতে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো মন! কিন্তু আরও কয়েক কদম বাড়াতেই ঘন জঙ্গল চিরে একে একে বেরিয়ে এলো বিশালাকৃতির হায়েনা আর নেকড়ের ঝাঁক, ঠিক যেন একেকটি ঘোড়ার সমান উচ্চতা!
তাদের এভাবে এগিয়ে আসাতে দেখে গলা শুকিয়ে এলো সকলের, ভয়ে কেঁদে উঠলো কেউ কেউ, পেছাতে শুরু করলো দ্রুতবেগে।
পরমুহূর্তেই কে যেন দল থেকে বেরিয়ে চিৎকার দিয়ে ছুটে পালাতে গেলো কোনো একদিকে, মুহুর্তেই সকলের ওপর ঝাপিয়ে পড়লো হিংস্র জন্তুর ঝাঁক!
এর পরের কিছু ক্ষণ শুধুই শিকারী জন্তুর হিংস্র আওয়াজ, লোক গুলোর তীব্র চিৎকার, ধ্বস্তাধস্তি, রক্তের কলকল ধ্বনি আর মাংস খুবলে খাওয়ার আওয়াজ ছাড়া কিছুই কানে এলোনা!
মীর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে চোখ বুজে রইলো পুরোটা সময়, সমস্ত শব্দ শেষ হয়ে আবার যখন নিরবতা নেমে এলো তখন বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
“ফ্যানটাস্টিক..!”
রেড জোন নিঃস্তব্ধতা নেমে এলো আবারও, চত্বরে জমায়েত হওয়া লোকগুলো এতক্ষণ স্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে দেখে চলেছিলো ওই নারকীয় দৃশ্য! দম আঁটকে এলো তাদের, প্রচন্ড ভয়ে চোখ ভরে পানি এসে চোয়াল বেয়ে পড়লো কারো কারো, অথচ কান্নার আর্তনাদের শব্দ এলোনা সামান্য! কাপড় নষ্ট হলো কারো কারো, অথচ কেউ নিজের জায়গা থেকে ইঞ্চি পরিমাণ নড়ার সাহস করলো না!
মীর চোখ মেলে তাকালো এবার, বসলো সোজা হয়ে। ক্যানে আর এক চুমুক দিয়ে খালি ক্যানটা ছুড়ে দিলো কোথাও। জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে সরাসরি তাকালো তার সম্মুখে জড় হওয়া জনতার দিকে৷ ওর স্বর্ণাভ, শকুনী দৃষ্টির সম্মুখে আরও এক ধাপ স্তব্ধ হয়ে গেলো সমস্তই!
“আমার সাম্রাজ্যে দাঁড়িয়ে, আমারই সাথে বিশ্বাসঘাতকতা যে করবে- যে অবস্থাতেই হোক, আমি এই পৃথিবী থেকে চিরতরে তার অস্তিত্ব মুছে ফেলবো!
এই পঞ্চদ্বীপ আমার; নামীর আসওয়াদ দেমিয়ানের। যারা আমার শাসনকে বিঘ্নিত করতে চাইবে, তাদের আমি খন্ড খন্ড করে ফেলবো! এই সাম্রাজ্যের দিকে যে একটা আঙুল তুলবে আমি তার পুরো শরীর গুড়িয়ে দেবো!
আমার আদেশ অমান্য করা হলে, সে যে স্থানেই থাকবে সেটাই হবে তার অন্তিম ঠিকানা!”
গমগমে বজ্রকন্ঠে একের পর এক বাক্যবাণ ছুড়ে দিলো মীর। উপস্থিত জমায়েত তটস্থ হয়ে রইলো দুঃসহ শঙ্কায়! ক্ষনিক পূর্বের দৃশ্য এখনো প্রক্রিয়া করে উঠতে পারেনি তাদের মস্তিষ্ক, হতবিহ্বলতা এখনো গ্রাস করে আছে তাদের।
“ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”
দৃঢ়, শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো মীর৷ টু শব্দটি হলোনা কোথাও। সবার দিকে শিকারী চক্ষুতে এক নজর তাকিয়ে পরমুহূর্তেই ছাড়লো হুঙ্কার,
“ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”
সকলেই এবার সমস্বরে জোর গলায় বলে উঠলো,
“পজিটিভ, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মসভেইল এরিয়া যখন ফাঁকা হলো তখন রাত শেষ প্রহরের দিকে এগিয়েছে। সবাইকে সবার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চারা যে যার কাজে চলে গেছে, লিও কাঞ্জি আর শেফ মুরসালিন ছাড়া অন্য কেউ আর মসভেইলে নেই৷
মীর শীতল বাতাসে দাঁড়িয়ে আছে খোলা চত্ত্বরে। বাতাসে উড়ছে ওর বাটনলেস শার্টের নিচের অংশ। মীর তাকিয়ে আকাশের দিকে। সাদা মেঘ উড়ে চলেছে দক্ষীনে, তারা গুলো উঁকি মারছে তাদের ভেতর দিয়ে।
আনমনে ট্রাউজারের পকেটে হাত দিতেই হাতে বাধলো একটি টুকরো কাগজ, কৌতুহলী হয়ে সেটা পকেট থেকে বের করে সামনে মেলে ধরলো মীর,
“স্যিক দ্যা স্যোল বিনিথ ইয়্যোর নেইম”- লেখাটি দেখে ভ্রু কুচকালো, লেখাগুলোর এমন গোলাকৃতি দেখে মীরের মনে হলো কোনো মেয়ের হাতের লেখা৷ কিন্তু এটা ওর পকেটে কিভাবে আসলো বুঝতে পারলো না৷
এমন সময় কোকো এলো সেখানে। মীর ওকে দেখে কাগজটা আবার পকেটেই ভরে রাখলো। কোকো এসে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার আদেশ অনুযায়ী জোভীকেও অ্যানিম্যাল টাউনের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওকামি এবং আলফাদ রেড জোনের প্রাণীদের ট্রেইনিং দেওয়া শুরু করবে খুব দ্রুতই। আগামী কাল থেকেও শুরু করতে পারে। এদিকে সব ঠিক ঠাক থাকলেও আমি এবং ফ্যালকন আগামী পরশু বর্ডারের উদ্দ্যেশ্যে বেরিয়ে পড়বো।”
মীর আকাশের দিকে চেয়ে মাথা নাড়ালো ওপর নিচে। তারা গুলো মিটমিট করে জ্বলছে, বেশ লাগছে দেখতে। মনে হচ্ছে যেন কতকাল সে আকাশ দেখেনি। কিছু একটা যেন ফাঁকা ফাঁকা বোধ হচ্ছে, সামথিং ইজ মিসিং ফ্রম হিজ লাইফ।
কোকো তাকে নিশ্চুপ দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আর কোনো আদেশ?”
“না, তুমি যেতে পারো এখন।”
কোকো আনুগত্য জানিয়ে চলে যেতে নিচ্ছিলো, তখনি আবার ডাক পড়লো তার। থামলো কোকো, মীর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৩
“তুমি ঠিক কবে থেকে আমার এখানে কাজ করছো, কোকো?”
কোকো ঢোক গিললো, সেটা ঠিক মিথ্যা বলার ভীতির নাকি যন্ত্রণার সেটা বুঝলো না সে। ইতস্তত গলায় বলল,
“বেশ…. অনেক বছরই হচ্ছে, ইয়োর ম্যাজেস্টি। সঠিক….. মনে নেই!”
“ঠিক আছে, তুমি যেতে পারো এখন।”
বলে আবার মনোযোগ দিলো আকাশ দেখায়। কোকো আনুগত্য জানিয়ে বিদায় নিলো আবার, মসভেইল পার হতেই তার পাথর চোখে হঠাৎ দেখা দিলো লোনা জলের উপস্থিতি…..
