Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৭

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৭
রানী আমিনা

আনাবিয়া ইয়ট থেকে যখন নামলো তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বার্ডি এসেছে তার সাথে। আনাবিয়া ওকে সাথে আনতে চায়নি, কিন্তু বার্ডির বারংবার অনুরোধে ওকে সাথে আনতে হয়েছে।
ওরা যেখানে ইয়ট থামিয়েছে তার কিছু দূরেই ওয়াইল্ড শেড জঙ্গল। জঙ্গল পেরোলেই উত্তর দিকে এক বিরাট এরিয়া জুড়ে সেনাঘাটি। জঙ্গুলে রাস্তা ধরে হাটতে হাটতে ওরা এগোলো জঙ্গলের আরও গভীরে।
অন্ধকারের ভেতর বার্ডি আতঙ্কভরা চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে এগোতে লাগলো আনাবিয়ার পিছে পিছে। তার ভীত মুখ দেখে আনাবিয়া মৃদু হেসে বলল,

“ভয় পেয়োনা, ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই এদিকে। কয়েকটি নেকড়ের পাল আর শেয়াল ব্যাতিত এখানে অন্য কোনো শিকারি প্রাণী দেখা যায়না। আর তারা সবই সাধারণ নেকড়ে, লাইকান নয়।”
বার্ডি একটু আশ্বস্ত হলো, তবুও ভয় গেলোনা তার, আনাবিয়ার কাছাকাছি এসে গা ঘেঁষে হাটতে লাগলো। হাটতে হাটতে এক বিরাট গুহার সামনে এসে হাজির হলো ওরা। গুহাটির মুখ বিস্তৃত, ভেতরে গাঢ় অন্ধকার, কিচ্ছুটি দেখার মতো অবস্থা নেই৷ বার্ডি চাপা সুরে জিজ্ঞেস করলো,
“শেহজাদী, আমরা এখানে কেন এসেছি?”
আনাবিয়া একা একাই গুহার ভেতর এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“কাজে।
তুমি এখানেই থাকো, আমি ঘন্টা দুই পরেই ফিরে আসবো।”
“ঘ্‌-ঘন্টা দুই! আম-আমি এখানে একা একা থাকবো শেহজাদী?”
চারপাশের ধেয়ে আসা অন্ধকারের দিকে চেয়ে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল বার্ডি। আনাবিয়া তাকালোনা পেছনে, কোনো আলোর সাহায্য ছাড়াই অন্ধকারের ভেতর হারিয়ে যেতে যেতে বলল,
“হুম, ভয় নেই তোমার। বেশি ভয় লাগলে গাছের ডালে উঠে বসে থাকো।”
এরপর আনাবিয়ার আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলোনা। বার্ডি গুহার মুখে কিছুক্ষণ উঁকিঝুঁকি মেরে কারো কোনো অস্তিত্ব না পেয়ে দ্রুত নিজের বার্ড ফর্মে পরিণত হয়ে গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে উঠে পাতার আড়ালে লুকিয়ে নিলো নিজেকে৷

সেনাপ্রধান পদে অভিষেকের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নেমে গেছে। আলোকসজ্জায় সজ্জিত লাল গালিচায় দাঁড়ানো গাঢ় খাকি রঙা ফর্মাল পোশাকে আবৃত কোকোকে সংবর্ধনা জানিয়ে চলেছে সকলে। কোকোকে বেশ প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। ফর্মাল পোশাকে বেশ মানিয়েছে তাকে। এতকাল গোঁয়ার, মাস্তান কোকোকে দেখে যারা অভ্যস্ত তারা ওর এই সভ্য ভাবখানা নিতে পারছেনা, অস্বাভাবিক ঠেকছে।
মীর ভেতরে আছে, সারাদিন পর এসে এখন গোসল দিলো সে। ঘাড় বাবরি ভেজা চুল থেকে কিছু পর পরই টুপ টুপ করে পানি পড়ছে। গায়ে একটা পাতলা রোব জড়িয়ে, পানীয়ের গ্লাস হাতে ভবনের পেছন দিকের বারান্দায় চলে এসেছে সে, বাহিরের ওই আলোকসজ্জা, হাসিতামাশা তার আর ভালো লাগছে না।
অ্যাশটন এসে উপস্থিত হলো তখন, আনুগত্যের সাথে জিজ্ঞেস করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার কিছু প্রয়োজন?”
“না অ্যাশটন, তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও।”

বলে গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই মীরের বুকের হৃৎপিণ্ড হঠাৎ ভীষণ জোর পাম্প করলো। চমকে উঠে মুখ থেকে চাপা আর্তনাদ বের করে মীর চেপে ধরলো বুকের বা পাশ।
অ্যাশটন আতঙ্কিত হয়ে দ্রুতস্বরে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ঠিক আছেন আপনি?”
এগিয়ে আসতে নিতেই মীর হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো ওকে, অন্য হাতে তখনো চেপে ধরা বুকের বা পাশ!
অ্যাশটন শঙ্কিত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শরীর বেশি খারাপ বোধ হলে হেকিমকে ডাকবো?”
মীর বুক থেকে হাত নামিয়ে শ্বাস নিলো, বলল,
“প্রয়োজন নেই, ঠিক আছি আমি। তুমি যেতে পারো এখন।”
অ্যাশটন আনুগত্য জানিয়ে বেরিয়ে এলো বারান্দা থেকে, লিও কাঞ্জিকে জানিয়ে এলো মীরের এই হঠাৎ অসুবিধার কথা। লিও কাঞ্জি সতর্কতা অবলম্বনে মীরের কামরার বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরের দিকে কান খাড়া করে রইলো।
অতিথিরা বিদায় নেওয়ার পর সেনাঘাটি যখন নিরব হয়ে এলো তখন কোকোর ডাক পড়লো ভেতরে। অ্যাশটন এসে জানালো হিজ ম্যাজেস্টি ডেকে পাঠিয়েছেন ওকে।

কোকো ওর পোশাক ছাড়ছিলো, তড়িঘড়ি গায়ে একটা শার্ট চড়িয়ে ও ছুটলো মীরের কামরার উদ্দ্যেশ্যে। গিয়ে দেখলো দরজার বাইরে লিও কাঞ্জি দাঁড়ানো। সারাদিনে ফর্মালিটি রক্ষার্থে কারো সাথে কারো কথা হয়নি। দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে শুধু ইশারায়।
এখন কোকোকে দেখা মাত্রই দুজনে এক প্রকার ঝাপিয়ে পড়লো ওর ওপর, আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়ে বলে উঠলো,
“কংগ্রাচুলেশনস ব্রাদার, বহু উপ্রে উঠে গিয়েছো! এবার শুধু ভাতের হোটেলকে উপ্রে উঠিয়ে সেভেন স্টারে পরিণত করার পালা।”
কোকো হেসে দুটোকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,

“এবার ওটাকে ঘাড় ধরে টেনে এনে সেভেন স্টার বানাবো। আর তোরাতো আছিসই আমার পিছে!”
“অবশ্যই অবশ্যই, আমরা আছি তোমার সবরকম কুকর্মে সাথ দেওয়ার জন্য। জ্ঞান হলে ধরে সেটাই করে আসছি।”
কোকো ওদের মাথায় গাট্টা মেরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চাপা গলায় বলল,
“তোদের সাথে এসব বিষয়ে পরে কথা বলবো। আমাকে হিজ ম্যাজেস্টি ডেকেছেন, এখনি হাজির না হলে আর ভাতের হোটেলে কেন, চিড়ের হোটেলও কপালে জুটবে না। আর হ্যাঁ, এই যুদ্ধ শেষ হলে ভাতের হোটেলের জন্য রিং চুজ করতে যাবো আম্মাকে সাথে নিয়ে, তোদেরকে নিবোনা।”
“ঠিকাছে, আমিও তোমার বোনের হাতে রিং পরিয়ে দিবো, তুমি টেরও পাইবানা ব্রাদার। যখন দুটো কাচ্চাবাচ্চা ধরনীতে ল্যান্ড করে ট্যা ট্যা শুরু করবে তখন জানতে পারবা দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।”
চাপা সুরে বলল লিও, কোকো ওকে নিজের প্যান্টের পকেটে রাখা ম্যাশেটির ডান্টা দেখিয়ে নিঃশব্দ হুমকি দিয়ে চলে গেলো ভেতরে।

ভেতরে ঢুকতেই মীরকে পেলো সেই চিরচেনা রূপে। পরণে অফ ছাই রঙা ট্রাউজার, তার ওপর চড়ানো একটি অফ হোয়াইটের রাজকীয় রোব। টেবিলে বসা, কাগজ পত্রের ভিড়ে লাগিয়ে রাখা স্বর্ণাভ দৃষ্টি।
কোকোর উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকালো মীর। বলল,
“এসো কোকো, বসো।”
অ্যাশটনকে পেরিয়ে কোকো ধীর পায়ে এসে আনুগত্যের সাথে বসলো চেয়ার টেনে। মীর কাগজপত্র গুলো গুছিয়ে সরিয়ে রাখলো, তারপর সোজা হয়ে বসে চিরাচরিত গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“কোকো।
তুমি একজন লাইকান, দেমিয়ান রুলসে লাইকানদের সাম্রাজ্যের সকল বিষয় হতে দূরে রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু আমি তোমাকে আর্মি চিফের মতোন গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনক পদে রেখেছি। কারণ একটাই— আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। কেন করি, কিভাবে করি আ’ ডোন্ট নো। বাট ইয়্যু আর ওয়্যে মোর রিলায়েবল দ্যান আদার্স।
তুমি আর্মি চিফ, এর অর্থ তুমি পঞ্চদ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি, ওয়ান অব মা’ ক্লোজ ওয়ানস। এই পঞ্চদ্বীপের শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব সম্পুর্ন তোমার কাঁধে। তোমার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই প্রকাশ পাবে আমার ক্ষমতা, স্বচ্ছতা দৃঢ়তা।

তুমি তোমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিবে, প্রাণ দিয়ে হলেও আমার সম্মান রক্ষা করবে। অ্যান্ড রিমেম্বার, তোমার দায়িত্বে সামান্যতম গাফিলতি দেখলে আমি নিজ হাতে তোমার প্রান নিবো, সো বি কেয়ারফুল।”
“ইয়েস ইয়োর ম্যাজেস্টি, আ’ উইল বি কেয়ারফুল অ্যান্ড উইল ডু মা’ বেস্ট।”
“এখন তুমি আসতে পারো।”
বলে উঠে দাঁড়ালো মীর। কোকো নিজেও উঠলো তৎক্ষণাৎ। মীর ভারী পা ফেলে আবার চলে গেলো কামরার পেছনের বারান্দায়। অ্যাশটন দাঁড়িয়ে ছিলো কোকোর পেছনে। কোকো জিজ্ঞেস করলো,
“হিজ ম্যাজেস্টি শিরো মিদোরিতে ফিরবেন কবে?”
“আগামীকাল ফিরে যাবেন। কেন?”
কোকো চাপা সুরে উত্তর দিলো,

“আম্মার সাথে একবার দেখা করবো। আমি এত উঁচু স্থানে পৌছেছি, আম্মার সাথে দেখা করে নিজের মুখে না বলা পর্যন্ত মন শান্ত হচ্ছে না।”
অ্যাশটন হাসলো মৃদু। কোকোর এই মাতৃভক্তির কথা জানতে রেড জোনের কারো বাকি আছে বলে মনে হয়না। অ্যাশটনের মনে লোভ জাগে, সেও যদি এদের সবার মতোন শেহজাদীর আদরের ভাগ পেতো!
কত মজাই না করতো সবার সাথে, ওর ও বোধ হয় তখন শেহজাদীকে সব কথা বলার জন্য মনের ভেতর আকুপাকু করতো! বলল,
“হিজ ম্যাজেস্টি বলেছেন আগামীকাল সকালেই বেরিয়ে যাবেন। তখন আপনি যত খুশি দেখা করবেন আপনার প্রাণপ্রিয় আম্মার সাথে।”

মীর দাঁড়িয়ে বেলকনিতে, দূরের জঙ্গলের দিকে দৃষ্টি। আঁধারে এটে আছে সমস্তটা। এক রহস্যময় স্থানে পরিণত হয়েছে সম্পুর্ন স্থান। মীর কখনো যায়নি সেখানে, মন টানেনি যেতে। দেমিয়ান হিস্ট্রিতে ওয়াইল্ড শেডের উল্লেখ ছিলো বোধ হয়। তবে সেটা শুধুমাত্র শেহজাদীদের জন্য। মীরের তাই আগ্রহ জন্মেনি এ জঙ্গলের প্রতি।
মীরের আজকাল স্মৃতিভ্রম হয়, বহু কিছুই সে ভুলে বসে আছে, কিছু কিছু স্মৃতি ঝাপসা। হাজার চাইলেও মনে পড়েনা তার। মনে করতে চায়ও না।
জীবনের অধিকাংশ স্মৃতিই তার তিক্ত, মনে পড়েনা শেষ কবে সে মন ভরে হেসেছে, কবে কারো সাথে মন খুলে কথা বলেছে, কবে কেউ তাকে পরম মায়ায় জড়িয়ে নিয়েছে।
চতুর্দিকে তার জনতার ঢল, অথচ এই হাজার লোকের ভিড়েও সে একা, সম্পুর্ন একা! সকলেই তার অপরিচিত, পর। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তার একান্ত আপনার বলতে নিজ অস্তিত্ব ব্যাতিত আর কেউ নেই।
বুক ভরে শীতল বাতাস টেনে নিয়ে ছেড়ে দিলো মীর। তখনি তার চোখে পড়লো দূর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মন্থর গতিতে এগিয়ে চলা একটি আলোকজ্জল সফেদ অবয়ব…

গুহা থেকে বেরিয়ে আনাবিয়া বার্ডিকে নিয়ে চলেছে আবার ইয়টের দিকে। বার্ডি ওই দু’ঘন্টার ভেতর আহত হয়ে এসেছে, ওদিকে নাকি বেশ কাটাগাছ, বার্ডি রাতের আঁধারে খেয়াল করেনি, এখন তার বাহু আর উরু জুড়ে ছড়ে গেছে, অল্প স্বল্প রক্তও বেরিয়েছে।
আনাবিয়ার ছোট্ট ব্যাকপ্যাকে অ্যান্টিসেপটিক ছিলো, নিজের জন্য সবসময় ব্যাগে ফার্স্ট এইডের কিছু জিনিসপত্র রেখে দেয়, কখন কি লেগে বসে! তাই দিয়েই বার্ডির ছড়ে যাওয়া জায়গা গুলোর ট্রিটমেন্ট দিয়েছে।
বার্ডি কিছুক্ষণ পর পর নাক টানছে, কাটাবনে গিয়ে এভাবে বেধে যাবে সেটা ও ভাবেনি। বেশ লেগেছে তার! আনাবিয়ার থেকে বকাও খেয়েছে এভাবে না দেখে এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করার জন্য। কাটাগুলো বিষাক্ত হওয়ার কারণে যন্ত্রণা হচ্ছে বেশ। আনাবিয়ার পিছু পিছু খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটছে সে৷
এমন সময় আনাবিয়ার মনে হলো কেউ অনুসরণ করছে তাদের। পেছন ফিরে ভ্রুকুটি করে এদিক সেদিক দেখলো সে, কিন্তু কিছুই পেলোনা। বার্ডি কয়েকবার জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে, কিন্তু মেয়েটা ভয় পাবে ভেবে আনাবিয়া এড়িয়ে গেলো। কিন্তু সন্দেহ দূরীভূত হলোনা।
হাটতে হাটতে হঠাৎ বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো আনাবিয়ার, চমকে পেছনে তাকালো সে আবারও, পরক্ষণেই ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে পা বাড়াতেই হঠাৎ ধাক্কা খেলো কিছুর সাথে। আচমকা বাধা পেয়ে আঁতকে লাফিয়ে উঠে চিক্কুর পাড়লো সে।
বার্ডি সামনে তাকিয়ে ভীষণ লম্বা এক জ্বলজ্বলে চোখ বিশিষ্ট কালো ছায়া দেখা মাত্রই ভয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,

“ও মা গো জ্বীইইইইইন!”
পরক্ষণেই ছুটে পালাতে গিয়ে গাছের সাথে বেকায়দা এক বাড়ি খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে শব্দ করে পড়লো মাটিতে।
আনাবিয়া দ্রুত পাশের এক গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো। হঠাৎ সামনে কাউকে দেখে চমকে গেছিলো, ওর এক চিক্কুরে যে এতকিছু হয়ে যাবে ও ভাবেনি। কিন্তু এই কালাভুনা এত রাতে সেনাঘাটি থেকে বেরিয়ে এই জঙ্গলে কি করছে বুঝলোনা সে।
“এই মেয়ে, আড়াল থেকে বেরিয়ে এসো!”
মীরের কড়া গলা শুনে আনাবিয়া দুহাতে গাছটাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো, কোনদিকে গিয়ে কোথায় পালাবে বুঝতে পারলোনা, বুকের ভেতর ঢিবঢিব করতে শুরু করলো তার।
“এসো বলছি!”

আনাবিয়া দুদিকে মাথা নাড়লো। মীরের দৃষ্টিগোচর হলো তা। ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,
“পিচ্চি একটা মেয়ে এত রাতে জঙ্গলে কি করছো? এখানে তো কোনো বসতি নেই। তুমি কোথা থেকে এসেছো?”
“জ্‌-জাহাজ থেকে পড়ে গেছি, তাত্‌-তাই সাঁতরে এ-এখানে চলে এসেছি।”
রিনরিনে কাঁপা গলায় উত্তর করলো আনাবিয়া, করেই জিভে কামড় দিলে। জীবনে প্রথমবারের মতো মীরের সাথে মিথ্যা বলছে সে, গলা কাঁপছে তার।
“জাহাজ থেকে পড়ে গেছো এর অর্থ কি? কোন জাহাজ? কোথায় যাচ্ছিলে তুমি?”
“আম…. মানে…. আমি মালবাহী জাহাজে কাজ করি। জাহাজ কিমালেব থেকে কুরো আহমার যাওয়ার পথে ভুল করে পড়ে গেছি…… আমরা দুজন!”
মীর কপালে ভাজ ফেলে দেখলো আনাবিয়াকে, যতটুকু দেখা যায়।
মেয়েটির পরণে বেশ সুন্দর একটি ম্যাক্সি ড্রেস, তার ওপর বেশ দামি একটা ওভার কোট। জাহাজে কাজ করা কোনো মেয়ের এমন দামী পোশাক পরার সামর্থ্য থাকা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়, এ ধরণের কোট গুলো কাস্টমাইজড ক্যাটাগরির, রেয়ার পিসেস।

কথা বার্তাতেও মেয়ের উঁচু শ্রেণীর টান। তাছাড়া মেয়েটি অত্যাধিক সুন্দরী, এমন সুন্দরী মেয়ে সে তার জীবদ্দশায় দেখেছে কিনা মনে পড়েনা৷ এমন আশ্চর্য চোখ, চোখের চাহনি যে কাউকে বিমোহিত করার মতোন।
পরিপাটি, মার্জিত বেশভূষা, আবার ভালো করে গুছিয়ে মিথ্যাটুকুও বলতে পারেনা!
মিথ্যারও একটা সুন্দর শ্রেণীবিভাগ থাকে, এই মেয়ের মিথ্যা সে শ্রেণীবিভাগের একদম তলানিতে। সে যে কোনো জাহাজের কর্মী নয়, বরং কোনো অভিজাত পরিবারের মেয়ে সেটা বুঝতে বেগ পেতে হলোনা মীরের।
“কিমালেবের কোথায় বাসা তোমার? কে কে আছে বাসায়?”
জিজ্ঞেস করলো মীর। আনাবিয়া বিপদে পড়লো, কি দিয়ে কি বলবে বুঝতে পারলোনা। আমতা-আমতা করে বলল,
“ও-ওইতো, পাহাড়ের নিচের দিকে আমার বাসা। বাড়িতে…. বাড়িতে কেউ নেই! একটা… একটা বেড়াল আছে।”
মীরের হাসি পেলো। দুই ঠোঁট দিয়ে হাসি চাপলো সে। গলা খাকারি দিয়ে গমগমে স্বরে বলল,
“মিথ্যা বলছো কেন? জানো আমি কে?”

আনাবিয়া দুদিকে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো সে জানেনা। মনে মনে বলল— খুব জানি, আস্ত একটা খাটাশ।
“আমি নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান, পঞ্চদ্বীপের বাদশাহ। আমার সাথে মিথ্যা বলার কারণে আমি তোমার গর্দান নিতে পারি।”
আনাবিয়ার ভেতর কোনো হেলদোল দেখা গেলোনা, সে আগের মতো করেই গাছটা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
মীর ভ্রু কুচকালো, জিজ্ঞেস করলো,
“ভয় পাচ্ছোনা?”
আনাবিয়া দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উহুম, প্রমাণ না দিলে বিশ্বাস করিনা।”
মীর হোচট খেলো। বলে কি এ মেয়ে? ওর সিগনেচার আইজ দেখলেই তো বুঝে যাওয়ার কথা সে কে! অথচ এই মেয়ে ওকে চিনেনা, আবার বলে প্রমাণ দিতে!
মীরের পৌরুষে যেন একটু গুতো লাগলো। ভাবতে লাগলো কি প্রমাণ দিবে সে এখন নিজেকে বাদশাহ প্রমাণ করতে? এখন কি প্রমাণ আছে তার কাছে?
পরক্ষণেই হুশে এলো মীর, সে কেন এই মেয়েকে প্রমাণ দিতে যাবে? এই মেয়ের কাছে নিজেকে বাদশাহ প্রমাণ করে ওর লাভ কি? গলা খাকারি দিলো সে, বলল,
“জায়াগাটা বিপদজনক, এখানে থাকা তোমাদের জন্য সেইফ নয়। আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি, তোমাদেরকে গন্তব্যে পৌছে দিবে।”

মীর এবার পকেট থেকে ফোন বের করে কল লাগালো কারো কাছে। হাত উঠাতেই আনাবিয়ার দৃষ্টিগোচর হলো মীরের পাতলা রোবের স্লিভের ছিড়ে যাওয়া স্থানে। কব্জির উপরিভাগে বার্ডির ছড়ে যাওয়া স্থানের মতোই দেখালো, ধারালো কাঁটা বিধে রোব টা পর্যন্ত ছিড়ে গেছে, তাহলে কি আঘাতটাই না লেগেছে!
শিউরে উঠলো আনাবিয়া, একবার ভাবলো গিয়ে অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে দিবে, পরক্ষণেই ভাবলো থাকুক। তার কাছে এখন তার সেবা যত্নের জন্য হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত, এখন আর আনাবিয়াকে তার প্রয়োজন হবে না।
কিন্তু বুকের ভেতর অশান্তি শুরু হলো, কিছুতেই নিজেকে মানাতে পারলোনা যে মীরের সাথে সাথে মীরের ক্ষতের সহিতও এখন তার বিচ্ছেদ হয়েছে।
তখনি মীরের গলা শোনা গেলো, ফোনে বলল,
“অ্যাশটন, গাড়ি নিয়ে জঙ্গলের ধারে এসো।”
ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে মীর বার্ডিকে দেখিয়ে বলল,
“ওকে জাগাও, জাগিয়ে আমার সাথে এসো।”

আনাবিয়া বার্ডির কাছে গেলোনা, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে মীরের সামনে দাঁড়ালো। মীর এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখলো তাকে। এতক্ষণ যা ভেবেছিলো মেয়েটি তার থেকেও বহুগুণে সুন্দরী! মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মতোন। অত্যাধিক শুভ্র সে, তার শুভ্রতা এই আঁধারের মাঝেও অত্যন্ত প্রকট, ঠিক ভোরের আকাশের শুকতারাটির মতোন উজ্জ্বল। দূর থেকে হয়তো এই মেয়েটির রূপের চ্ছটাই সে দেখেছিলো।
ছোটবেলায় মায়ের বুকের ওপর থুতনি রেখে গল্প শুনতো সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বাস করতো এক রূপবতী রাজকন্যা, রাজকন্যার রূপের আলোয় আঁধারে আলো ফুটতো। এই বুঝি সেই রাজকন্যা?
সমস্ত দেহ উদ্বেলিত হলো মীরের, হাত জোড়া যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে যেতে চাইলো মেয়েটিকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করার প্রয়াসে। হাত সজোরে মুষ্টিবদ্ধ করে বহু কষ্টে নিজেকে আঁটকালো সে।
হঠাৎ দেহের ওপর থেকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে যারপরনাই অবাক হলো! এমন উদ্ভট আকর্ষণ তার কখনো অনুভূত হয়নি, তবে আজ কেন? হঠাৎ এই মেয়েকে নিজের বাহুডোরে অনুভব করতে এত উতলা হলো কেন?
কিন্তু মীর ঘূর্ণাক্ষরেও টের পেলোনা, মস্তিষ্ক না চিনলেও তার দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মেয়েটিকে পরতে পরতে চিনে!
আনাবিয়া দুকদম এগিয়ে এসে ইতস্তত সুরে বলল,

“আপ্‌-আপনার হাত ছড়ে গেছে!”
মীরের এবার খেয়াল হলো হাতের দিকে, ডান হাতটা উঁচিয়ে সে দেখলো ছড়ে যাওয়া অংশটা। এতক্ষণ কিছু অনুভূত না হলেও এখন একটা সুক্ষ্ম জ্বালা অনুভব করলো সে। কিন্তু তার কিছু বলার আগেই আনাবিয়া টেনে নিলো মীরের হাত।
সাথে সাথেই কেঁপে উঠলো মীর, অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলো আনবাইয়ার মুখের দিকে। এমন মোলায়েম, আরামদায়ক স্পর্শ সে জীবদ্দশায় কখনো পেয়েছে কিনা মনে করতে পারলোনা।
এ যাবৎকাল বহু নারীর সহিত একান্ত হয়েছে সে, কখনো জৈবিক কারণে, কখনো শুধুই নিজের পশুত্বকে তৃপ্তি দিতে। কিন্তু এমন স্পর্শ তার পাওয়া হয়নি কখনো!
আনাবিয়া নিজের ছোট্ট ব্যাকপ্যাক থেকে অ্যান্টিসেপটিক বের করে তুলা দিয়ে অল্প অল্প করে লাগিয়ে একটা পেপার টেপ আঁটকে দিলো। মীর নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে গ্রহণ করলো সেবাটুকু। বেশ খুশিও হলো, সেটা তার কালচে ঠোঁটের কোণের সুক্ষ্ম বাকেই ধরা পড়ে গেলো।
আনাবিয়া সেবাযত্নের পাট চুকিয়ে বার্ডিকে জাগিয়ে তুলে ওকে ইশারায় সাবধান করে, এরপর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগোলো মীরের পিছু পিছু।

গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে একবার এদিক আরেকবার ওদিক পায়চারী করে চলেছে অ্যাশটন। হিজ ম্যাজেস্টি হঠাৎ এই ভরা জঙ্গলের ধারে গাড়ি কেন ডাকলো ঠাহর করতে পারছে না সে। বার বার জঙ্গলের ভেতর উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে ভেতরে কিছু হচ্ছে কিনা।
ক্ষণিক পরেই ঘন গাছপালার আড়াল থেকে একে একে মীর সহ ওদের তিনজনকে বেরিয়ে আসতে দেখে অ্যাশটন বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলো। হিজ ম্যাজেস্টির সাথে এই মুহুর্তে স্বয়ং শেহজাদীকে দেখবে এটা সে একদমই আশা করেনি।
আনাবিয়া পেছন থেকে ইশারায় তাকে হা হওয়া মুখভঙ্গি বদলাতে বললে হুশে এলো অ্যাশটন, দ্রুত মাথা নুইয়ে আনুগত্য জানিয়ে বলল,

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার কি আদেশ?”
মীর অ্যাশটনকে ইশারায় ডাকলো অন্য পাশে। চুপিসারে তাদের কি কথা হলো আনাবিয়া শুনতে পেলোনা। শুধু দেখলো অ্যাশটন অনর্গল মাথা নাড়িয়ে সায় মেনে চলেছে।
কথা শেষ করে মীর আরেকবার দেখলো আনাবিয়াকে, আনাবিয়া ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলো, চোখে চোখ পড়তেই নামিয়ে নিলো।
মীর বিদায় জানিয়ে এগোলো সেনাঘাটির পথে। অ্যাশটন অনুগত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বলল,
“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি আদেশ করেছেন আপনাদেরকে কিমালেবে পৌছে দিতে। দয়া করে গাড়িতে উঠুন।”
গাড়ির ব্যাকসিটের ডোর মেলে ধরলো অ্যাশটন। আনাবিয়া বার্ডিকে নিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল,
“কিমালেবে নামতে হবে না অ্যাশটন, তুমি আমাদেরকে পশ্চিম দিকের সী পোর্টে নামিয়ে দাও, সেখানে আমার ইয়ট রাখা আছে।”
“আপনার যেমন আদেশ শেহজাদী।”
গাড়ি চলতে শুরু করলো। টুকটাক কথা বার্তা বলতে বলতে ওরা এগোলো। আনাবিয়া উইন্ডো দিয়ে তাকিয়ে রইলো বাইরে৷ তুষারপাত হচ্ছে অল্পস্বল্প, কিছুদিন পর থেকে পঞ্চদ্বীপ কয়েক ফুট তুষারে ঢেকে যাবে। শিরো মিদোরিতে তুষারপাত হয়না, ও জায়গা বেশিরভাগ সময় নাতিশীতোষ্ণ থাকে বলা যায়। শীতের সময় অল্প অল্প শীত, গরমের সময় অল্প অল্প গরম!
কথার এক পর্যায়ে অ্যাশটন বলল,

“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি আমাকে বলেছেন আপনার বাসা কোথায় এবং আপনি কোন বংশের জেনে আসতে। উনি সন্দেহ করছেন আপনি হয়তো বিগত শেহজাদীদের কারো বংশধর।”
আনাবিয়া হাসলো, বলল,
“বলে দিও আমি মানুষই ছিলাম না, গাড়ি অর্ধেক পথে পেরোতেই আমি ভয়ানক এক পেত্নীতে পরিণত হয়ে নাঁকিসুরে হিঁহিঁ করতে শুরু করেছিলাম, তোমার ঘাড় মটকাতে চেয়েছিলাম কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হাত ফসকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছো।”
অ্যাশটন নিঃশব্দে হাসলো। অধস্তন দের রয়্যাল মেম্বারদের সামনে উচ্চস্বরে হাসি কান্না করা নিষেধ, তাই বেশ মজা পাওয়া সত্ত্বেও চেপে গেলো। ভাবলো আজ কোকো ভাইজান দের মতো কেউ হলে তাদের মতোই মন খুলে হাসা যেতো শেহজাদীর সামনে, অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হতোনা।

সী পোর্টে এসে গাড়ি থামিয়ে অ্যাশটন দরজা খুলে দিলো আনাবিয়ার জন্য। আনাবিয়ার ঘুম পেয়ে গেছিলো, গাড়ি থামতেই উঠে বসলো সে৷ আড়মোড়া ভেঙে নামতে নামতে বলল,
“অ্যাশটন, হিজ ম্যাজেস্টিকে জানিয়ে দিও আমি একজন সাধারণ মেয়ে মাত্র, তার বংশের সাথে আমার কোনো ধরণের কোনো সম্পর্ক নেই।”
“আপনার যেমন আদেশ শেহজাদী।”
বার্ডিকে নিয়ে ইয়টে উঠে আনাবিয়া হাত নেড়ে বিদায় জানালো অ্যাশটনকে। অ্যাশটন মাথা নুইয়ে আনুগত্য প্রদর্শন করে তাকিয়ে রইলো ঝড়ের বেগে কিমালেবের উদ্দ্যেশ্যে ধাবিত হওয়া ইয়টের দিকে।

প্রাসাদে নিজের কামরায় বসে আছে ইলহান। কপালে ভাজ ফেলে অমনোযোগী চোখে কোনো কিছু নিয়ে ভীষণ চিন্তিত সে৷ তার বিপরীতের চেয়ারে বসে ইযান, চোখেমুখে অপরাধবোধ, যেন যা হচ্ছে সব কিছুর জন্য সেই দ্বায়ী, তার অযোগ্যতা দ্বায়ী!
নিরবতা ভেঙে ইলহান জিজ্ঞেস করলো,
“সেনাঘাটির বাইরে এখন কত সংখ্যক সৈন্য আছে?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, সেনাবাহিনীর পাঁচটি কোরের দুটি এখন সেনাঘাটিতে অবস্থান করছে। বাকি তিনটির একটি কুরো আহমারে, অন্যদুটি কিমালেবে আর রামাদিসামাতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছিলোনা তাই রাসিন জুবের তিনটি কোরই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।”

“তাহলে আমাদের কাছে এখনো আশা আছে ইযান। যেসমস্ত সেনারা এখনো বাইরে আছে তাদের খোঁজ নাও, ওদেরকে আমার হয়ে যুদ্ধে নামতে বলো। তাহলে মীর কোনোভাবেই পেরে উঠবে না৷ কারণ সেনাঘাটিতে কোনো অস্ত্র মজুদ নেই, সেনাঘাটির সমস্ত অস্ত্র আমি আগেই প্রাসাদের অস্ত্রাগারে এনে রেখেছি, সাথে অ্যামোও। সুতরাং ওরা ওদের অস্ত্রসস্ত্রও বেশিক্ষণ চালিয়ে নিতে পারবেনা, অ্যামো শেষ হয়ে যাবে৷”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, যদি সৈন্যরা তাদের চিফকে বিট্রে করতে না চায়?”
“আমি এখনো পঞ্চদ্বীপের বাদশাহ, পুরোপুরি ক্ষমতাহীন হয়ে যাইনি। মীর শুধুমাত্র সেনাঘাটি দখল করে নিয়েছে, এতে সে পুরো সত্ত্বা পেয়ে যাবে না৷ তুমি সৈন্যদের আহবান করবে, যারা স্বেচ্ছায় আসবে না তাদের পরিবারকে জিম্মি করে রাজি করাবে। তাতেও কাজ না হলে পরিবার সহ শেষ করে দিবে৷”
“আপনার যেমন আদেশ ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“আরেকটি কাজ করবে, কুরো আহমারে যতগুলো ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যামুনিশান প্লান্ট আছে সেখানের মালিক এবং কর্মী সবাইকে উধাও করে দিবে। হত্যার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাদের কাউকে যেন খুঁজে পাওয়া না যায়।”

“অ্যাজ ইয়্যু কমান্ড ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
কামরায় নিরবতা নেমে এলো আবারও। কিছুক্ষণ আনমনে চেয়ে থেকে ইলহান বলল,
“কোকোকে আর্মি চিফ করে মীর একটা বিরাট চাল চেলেছে। কোনো শ্রম ছাড়াই এখন রেড জোনের সমস্ত প্রাণী গুলো তার হয়ে লড়বে, এইখানে তার আর কোনো হাতই দেওয়ার প্রয়োজন পড়বেনা, কোকো একাই সামলে নিবে৷ সুতরাং জানোয়ার গুলোকে হারানোর জন্য আমাদের আলাদা প্রস্তুতি নিতে হবে৷”
“আমি ব্যাপারটা দেখছি ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“আনাবিয়া কোথায় আছে এখন?”
“শেহজাদীকে সেদিন রাতের পর থেকে আর শিরো মিদোরিতে দেখা যায়নি৷ উনি কোথায় আছেন সেটাও জানা যায়নি।”

“শিরো মিদোরিতে রক্ষী বাড়িয়ে দাও ইযান, যা-ই হয়ে যাক আনাবিয়া যেন এই দ্বীপে প্রবেশ করতে না পারে। ও এই যুদ্ধের মাঝে ঢুকলে আমরা হারবো সেন্ট পার্সেন্ট।”
ইযান বিস্মিত হলো কিঞ্চিৎ, জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু…. কেন ইয়োর ম্যাজেস্টি, উনি আসলে আমরা হারবো কেন?”
“আমি জানিনা, আমার কোনো ধারণা নেই এসব সম্পর্কে। তবে এটা নিশ্চিত, সে যাকে প্রেফার করবে যুদ্ধে সে-ই জয়ী হবে৷ শী হ্যাজ সাম হিডেন ওয়েপন উইদ হার। তাছাড়া লাইফ ট্রি সর্বদা ওদের সাপোর্টেই থাকবে, সুতরাং আনাবিয়া যদি একবার যুদ্ধের মাঝে ঢুকে যায় তবে আমাদের জয়ী হওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠবে৷ অস্ত্রাগারে যে অস্ত্র আমি মজুদ করে রেখেছি তা সম্পুর্ন সেনাঘাটির জন্য যথেষ্ট। এরপরও আমাদের লোকবল কম মনে হলে অন্য উপায় খুঁজতে হবে, তবুও ওদেরকে হারাতে হবে ইযান।”
কাটাবনে মোড়া সিংহাসনের দিকে একবার তাকিয়ে ইলহান আবারও বলল,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৬

“এই সিংহাসনের জন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ওই ডার্ক প্যালেসের সিল গালা প্রবেশ পথ থেকে আমি জীবনবাজি রেখে বের হয়েছি। সমস্ত কোণে গুপ্তচর রেখেছি, অপেক্ষা করেছি মোক্ষম সময়ের, আর পেয়েছিও। যদিও আমার মেয়ের জন্য আমি তাতে শান্তিতে দুদন্ড বসতে পারিনি, কিন্তু এই সিংহাসন আমি দ্বিতীয় বার হাতছাড়া করতে চাইনা। কোনো মূল্যেই না।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮