Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮
রানী আমিনা

ইযান খুবই ব্যাস্ত সময় পার করছে। গত দু সপ্তাহ ধরে সে সমস্ত দ্বীপ গুলো থেকে সেনাসদস্য সংগ্রহ করছে। নিজের হাতেই সামাল দিচ্ছে যেন একটি সৈন্যও ওদের হাতছাড়া না হয়, নইলে বিরাট সমস্যায় পড়তে হবে৷
এই মুহুর্তে সে আছে ওয়ারদিচাতে। বাকি সবগুলো দ্বীপ থেকে সেনা সংগ্রহ শেষ, একটাকেও পালাতে দেওয়া হয়নি, কেউ পালাতে চাইলেই তাকে আবার ধরে বেঁধে টেনে নিয়ে আসা হয়েছে। হিসেবে সেনা তাদের নিকট শত্রুপক্ষের থেকে প্রায় দ্বিগুন, অস্ত্রের মজুদও তাদের বেশি। সুতরাং তাদেরকে হারানো শত্রুপক্ষের জন্য বেশ কষ্টকর— বলা যায় অসম্ভব।

ইযান পায়চারি করে চলেছে, পাশেই ওর সেক্রেটারি বসে অন্যান্য দের থেকে সেনাসদস্যদের লিস্ট করছে৷ সেনাদের অধিকাংশকেই শিরো মিদোরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। একাংশকে মোতায়েন করা হয়েছে প্রাসাদের নিরাপত্তা রক্ষায়, বাকি দেরকে শিরো মিদোরির বর্ডারে চালান করা হয়েছে, একটা পিপড়াও যেন ফাঁক গলিয়ে ঢুকে যেতে না পারে।
কামরা ভর্তি নিরবতার ভেতর হঠাৎ কে একজন বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশের জন্য চিৎকার চেচামেচি শুরু করলো। রক্ষীরা বাধা দিলে ঝামেলার পরিমাণ বেড়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। ইযান কাউকে ইশারায় বাইরে গিয়ে দেখতে বলল বিষয়টা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ছেলেটি উঠে বাইরে গিয়ে মিনিট দুই বাদে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলো কামরায়, হড়বড় করে বলে উঠলো,
“মিস্টার হাসেমি, জায়ান সাদী আর নওয়াস জাবিন দুজনেই কয়েক মিনিট আগে লাইভে এসেছেন। বিগত বছর গুলোতে কি কি হয়েছে তাদের সাথে, এবং হিজ ম্যাজেস্টি কি কি করেছেন তাদের সাথে সে সমস্ত কথা বলছেন!”
ইযান চমকে উঠলো, এই দুটো বের হয়েই গা ঢাকা দিয়েছিলো। ইযান এমন সন্দেহ আগেই করেছিলো, তাই তাদের যাবতীয় সোস্যাল সাইট থেকে পার্মানেন্টলি ব্লাকলিস্টেড করে রেখেছিলো। এখন আবার দুটো গর্ত থেকে বেরিয়ে এই সমস্ত শুরু করেছে।
একটা মরা মানুষ ফিরে এসে সবার যে পরিমাণ সাহস বেড়েছে তা দেখে ইযান অবাক।
লোকটি ইযানের দিকে ট্যাব এগিয়ে দিলে ইযান ছো মেরে নিলো, কপালে ভাজ ফেলে মনোযোগী চোখে দেখতে লাগলো সে দুটো কি বলছে। জায়ান আর নওয়াসের সাজগোজ দেখে মনে মনে কয়েকটা গালি দিয়ে বলল,

“এরা হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলো? কথা গুলো কেমন খাপছাড়া লাগছে। মনে হচ্ছে এর পূর্বে আরও কিছু আছে যা আমরা মিস করে গেছি। এনারা কেউ এমন হঠাৎ এসে উদ্ভট কথা বার্তা বলবেন না। অন্য কিছু আছে কিনা খোঁজ নাও৷”
“আমি এখনি দেখছি মিস্টার হাসেমি৷”
বলে লোকটি বেরিয়ে গেলো আবার। মিনিট দুই পরে আগের চাইতেও দ্রুত পায়ে ফিরে এসে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো,
“মিস্টার হাসেমি, গত কাল রাতে সেই অ্যানোনিমাস পেইজ সহ আরও কয়েকটি ফেমাস পেইজ থেকে একটি সিসিটিভি ফুটেজের সিক্স সেকেন্ডের ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। তাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শেহজাদা নামীর আসওয়াদকে। তার দীর্ঘ দেহ আর চোখ জোড়াতেই বলে দিচ্ছে তিনি কে। জাস্ট একটি নির্জন রাস্তা ধরে হেটে যাচ্ছেন। আর এতেই সবগুলো দ্বীপে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।

ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, পেইজগুলো থেকে কিছু প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে হিজ ম্যাজেস্টি শেহজাদা নামীর আসওয়াদ কে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে শেহজাদাকে হত্যাচেষ্টা সহ কি কি করেছেন, এরপর সিংহাসনে আরোহনের উদ্দ্যেশ্যে কাকে কাকে হত্যা করেছেন, সত্য গোপনের জন্য কোথায় কাকে কত টাকা বা সম্পত্তি দিয়েছেন, কাকে বন্দি করেছেন সমস্ত কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে, প্রমাণ সহ!”
একটানা গড়গড় করে কথাগুলো বলা শেষ করে লোকটা হাঁফাতে শুরু করলো। ইযান থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। এই কদিন ধরে এতসব ব্যাস্ততার মাঝে সেদিকটা খেয়াল করা হয়নি তার, তাই বলে কেউই খেয়াল করলোনা?
সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে যখন তারা আরামের ঘুম ঘুমোচ্ছিলো তখন শত্রুপক্ষ তাদের সবচেয়ে বড় চালটাই চেলে দিলো! এখন সেই চালকে আরও শক্তপোক্ত করতে জায়ান আর নওয়াস লাইভে এসে হাজির হলো।
ইযান কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

“ভিডিওটিকে এআই বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না?”
“দুঃখিত, মিস্টার হাসেমি। আসলে পঞ্চদ্বীপের এআই প্রযুক্তির টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনেই গোল্ডেন অ্যান্ড ডায়ামন্ড আইজ দিয়ে কোনো কিছু রিক্রিয়েট করা ফরবিড করা হয়েছিলো অনেক আগেই। সুতরাং কোনো এআই-ই গোল্ডেন আইজ রিক্রিয়েট করবেনা।”
“লাইভ কোনো ভাবে বন্ধ করার ব্যাবস্থা করো এমরান, সবে দুচার মিনিট হয়েছে, এখনি বন্ধের ব্যাবস্থা করো।”
উত্তেজিত স্বরে বলল ইযান, এমরান ছেলেটি নতমুখে বলল,
“আমাদের ছেলেরা চেষ্টা চালাচ্ছে মিস্টার হাসেমি, কিন্তু কোনো ভাবেই ভেতরে ঢুকতে পারছেনা। ক্ষমা করবেন।”
ইযান আশাহতের ন্যায় মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর আবার নতুন উদ্যমে সেনা সংগ্রহের কাজ শুরু করতে বলে বেরিয়ে পড়লো তৎক্ষনাৎ।

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, একটা সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে!”
হাঁফাতে হাঁফাতে রয়্যাল ফ্লোরে ছুটে এসে বলল ইযান।ইলহান ডুবে যেতে থাকা সূর্যের দিকে তাকিয়ে কফির মাগে চুমুক দিচ্ছিলো। ইযানকে এভাবে দেখে ভ্রুতে ভাজ ফেলে সে জিজ্ঞেস করলো,
“আবার কি সর্বনাশ হয়েছে ইযান? দয়া করে আমাকে আর কোনো খারাপ সংবাদ দিও না৷”
“ক্ষমা করবেন ইয়োর ম্যাজেস্টি, ছোটখাটো কোনো ইস্যু হলে আমি আপনাকে বিরক্ত করতাম না!”
“বলো, কি হয়েছে?”
“সোস্যাল মিডিয়াতে একটি ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে, শেহজাদা নামীর আসওয়াদের!”
ইলহান ভ্রু কুচকে তাকালে নিজের সংগ্রহে থাকা সমস্ত তথ্য সরবরাহ করলো ইযান। প্রতিবেদনের কথা শুনে ইলহান ইযানের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, একটা ঢোক গিলে বলে উঠলো,
“আমরা তো কোনো প্রমাণই রাখিনি ইযান, তবে কেন….. কিভাবে পেলো ওরা সেসব?”
“আমি জানিনা ইয়োর ম্যাজেস্টি, ক্ষমা করবেন! কিন্তু প্রমাণ গুলোর অধিকাংশ সত্যি না হলেও ভ্যালিড, খণ্ডানোর কোনো পথ নেই। রাত থেকে এসবই নিয়ে বিস্তর আলোচনা সমালোচনা চলছে সবখানে। তাছাড়া এতদিন ধরে মৃত ভেবে আসা জায়ান সাদি এবং নওয়াস জাবিন এই প্রতিবেদনের পর লাইভে এসেছিলেন। এসে তারা সমস্তই একে একে বর্ণনা করেছেন।

এসব দেখার পর থেকে প্রজারা সব ফুসে উঠেছে, এমনিতেই তারা কয়েক মাস যাবৎ আপনাকে নিয়ে যথেচ্ছা কথাবার্তা বলেছে, আর এখন তো তারা রীতিমতো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে! তারা চায় শেহজাদা নামীর আসওয়াদ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসুন, পঞ্চদ্বীপকে আগের মতো সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করুন।
এখন আমাদের বিরুদ্ধে যতগুলো অভিযোগ নেওয়া হয়েছে তার বেশিরভাগ সত্য না হলেও আমাদেরকেই দোষী করা হবে, আমরা অস্বীকার করলে কেউই আমাদের বিশ্বাস করবেনা ইয়োর ম্যাজেস্টি! আমরা এখন কি করবো?”
বলতে বলতে চোখ ভিজে এলো ইযানের, গলা কেঁপে এলো সামান্য। ইলহান ধপ করে বসে পড়লো সোফায়, চিন্তায় বিস্ফোরিত হতে থাকা দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রইলো মেঝের দিকে৷ মৃদু স্বরে বলল,
“আমি আমার ভাইকে হত্যা চেষ্টা করেছি জেনে প্রজারা ফুসে উঠেছে, আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আসওয়াদ আমাকে হত্যা করবে। এতে ওর কোনো দোষ হবে না ইযান, কেউ ওর দিকে আঙুল তুলবেনা, কেন সে দেমিয়ান রুলস অমান্য করলো সেটাও কেউ জিজ্ঞেস করবেনা৷

এতদিন ধরে অপেক্ষা করার তবে এটাই কারণ? যেন ওর দিকে কেউ আঙুল না তুলে, আবার আমাকেও শেষ করা যায়? সাপ মরলো, কিন্তু লাঠি ভাঙলো না!
জনগনের থেকে বৈধতা নিয়ে নিলো সে! এখন ওর সামনে আর কোনো বাধা রইলোনা আমাকে হত্যার!
এখানে আমার মেয়েও নেই!
থাকলেও বা কি? সে আমাকে একবার আসওয়াদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, দ্বিতীয়বার আমাকে সে বাঁচানোর ব্যাপারে ভাববে না। আর আমি যা করেছি তারপর তো আর…. কোনোভাবেই না! সে আমাকে…. বলা যায় ঘৃণা করে!”
ইযান মাথা নত করে রইলো, ক্ষনিক পর মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
“আমরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছি ইয়োর ম্যাজেস্টি, যুদ্ধ ব্যাতিত আমাদের কাছে এখন আর কোনো উপায়ই নেই। আমাদেরকে দ্রুতই প্রস্তুতি নিতে হবে৷

আপনি চিন্তা করবেন না, আমাদের প্রচুর লোকবল আছে, তাছাড়া অস্ত্রও সব আমাদের দখলে। কুরো আহমার থেকে সবগুলো কারখানার মালিক, কর্মীদের গুম করে দিয়েছি, সেখানে একটি অস্ত্রও রাখিনি। আমাদের যে লোকবল হয়েছে তাতে আমরা নিরস্ত্র জংলী গুলোকে সহজেই হারিয়ে দিতে পারবো৷”
ইলহান সেভাবেই বসে রইলো, মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল,
“অরোরা কোথায়? ওকে আন্ডারগ্রাউন্ডে পাঠিয়ে দাও। আন্ডারগ্রাউন্ডে কোনো রক্ষী রাখার প্রয়োজন নেই, সবাইকে যুদ্ধে অংশ নিতে আহ্বান করো। প্রাসাদের যত গুরুত্বপূর্ণ দাস দাসী আছে তাদেরকে অরোরার সাথে আন্ডারগ্রাউন্ডে পাঠিয়ে দিবে, সাথে শুধুই দুজন রক্ষী দিবে। প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী আর জিনিসপত্র সহ পাঠাবে যেন যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওদের বের হওয়ার প্রয়োজন না পড়ে।”

“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে ইযান আবার বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শিরো মিদোরিতে সেইফ জোন নামে একটি স্থান ছিলো যেখানে শেহজাদা আসওয়াদ আসামীদের রাখতেন। আমরা কি ওদেরকেও আমাদের দলে টেনে নিবো?”
“প্রয়োজন পড়লে নিও ইযান। যেভাবেই হোক আমাদের লোকবলের যেন কমতি না হয়। রেড জোনের প্রাণী সম্পর্কে তোমার যথেষ্ট ধারণা আছে, সুতরাং তুমি নিজেও জানবে ওদেরকে হারাতে হলে আমাদের কি কি করা প্রয়োজন। লোকবল প্রয়োজন হলে যেখান যাকে পাবে টেনে নিবে।”

“ইয়েস ইয়োর ম্যাজেস্টি।
বলে থামলো ইযান, পরক্ষণেই ইতস্তত করে বলল,
“ক্ষমা করবেন…. শুধু একটা… আর একটা প্রশ্ন ছিলো। যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শেহজাদা আসওয়াদের মেইন টার্গেট থাকবেন আপনি। উনি যুদ্ধে অংশ নিলে সর্বপ্রথম আপনার উদ্দ্যেশ্যেই আসবেন। উনি যদি আপনার ওপর অ্যাটাক করেন তবে…. তবে আমরা কি ওপেন ফায়ার করবো?
“হ্যাঁ।”

মুনহল্যো তে লেকের পাশে বার্বিকিউ এর আয়োজন করা হয়েছে। বার্ডি তাতে বাতাস করছে কিছুক্ষণ পর পর। লায়রা আর ফক্সি খেলে বেড়াচ্ছে বেড়ালগুলোর সাথে, স্ত্রেলকা ঘাস খেয়ে পেটটা ঢোল বানিয়ে এখন আরামসে জাবর কাটছে।
আনাবিয়া কাছে পিঠে কোথাও আছে, থেকে থেকে তার গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, বার্ডিকে ক্ষণিক পর পর সে নির্দেশনা দিয়ে চলেছে কাজের।
আজ তার সব বাচ্চাগুলো এখানে আসবে, তাই তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। গত সপ্তাহে কোকো এসেছিলো, আর্মি চিফ হওয়ার খুশিতে তার আম্মার জন্য হাত ভর্তি উপহার নিয়ে৷
এযাবৎকাল কোকো তার আম্মাকে ফুল ব্যাতিত কিছু দেয়নি। তার আম্মার জন্য উপযুক্ত, মানানসই হবে এমন উপহার সে কখনো খুঁজে পায়নি। তিনি যে পঞ্চদ্বীপের বাদশাহর স্ত্রী! স্বয়ং বাদশাহ যাকে সর্বদা আভিজাত্যে, প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ করে রাখতেন তার উপযুক্ত কিছু নগন্য কোকো জোগাড় করতে পারতোনা।
কিন্তু এখন কোকোর হীনমন্যতা কেটে গেছে, সে তাই এবার ফেরার সময়ে খালি হাতে আসেনি, কুরো আহমারে গিয়ে সবচেয়ে বিলাসবহুল শপিংমলে ঢুকে যেটা ভালো লেগেছে সেটাই তুলে নিয়েছে। হাত ভর্তি উপহার সংগ্রহ করে তবেই সে ফিরেছে৷

আনাবিয়ার গায়ে আজ শোভা পাচ্ছে তার বড় ছেলের দেওয়া পোশাক, সাদা রঙা মোলায়েম ম্যাক্সি ড্রেসের ওপর ছোট্ট ছোট্ট ম্যাজেন্ডা আর কাঁচা হলুদ মিশেলের ফুল। কানে দুটো ছোট্ট ছোট্ট হীরের দুল ঝুলছে, কোকোর দেওয়া৷ রোদ লেগে ঝিকিমিকি করছে তা ক্ষণে ক্ষণে।
চুল গুলো এলোমেলো খোপায় বন্দি, তাতে আবার দুটো গাঢ় লাল গোলাপ গুজে দিয়েছে বার্ডি, গোলাপ দুটো লায়রা সকাল বেলা কামড়ে ছিড়ে রেখে গেছিলো আনাবিয়ার কোলের ভেতর।
লেকের পাশে রাখা বিরাট, দীর্ঘ ডাইনিং টেবিলের ওপর একে একে ধোঁয়া ওঠা খাবার সাজাচ্ছে আনাবিয়া। বাচ্চারা তার এলো বলে!

বলতে না বলতেই পাহাড়ের তলদেশের সরু গলি দিয়ে হইহট্টগোল করতে করতে ভেতরে ঢুকে পড়লো হাইনা, জোভি আর ওকামি। আনাবিয়া মাথা তুলে ওদের দেখে মিষ্টি করে হাসলো। কতদিন পর ছেলেগুলোকে দেখছে!
হাইনা ছুটে এলো আগে, ডাইনিং টেবিলের নিকট এসে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো কি কি আইটেম হয়েছে আজ, লোভাতুর চোখে চেয়ে একবার শব্দ করে ঢোক গিললো। আনাবিয়ার দিকে চেয়ে খুশি খুশি গলায় বলল,
“শেহজাদী, অনেকদিন পর আজ পেট ভরে খাবো।”
ওর বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেললো আনাবিয়া, তারপর ম্যানরের ভেতর চলে গেলো কিছু নিয়ে আসতে।
এরপর একে একে লিন্ডা আর আলফাদ, ফ্যালকন, কোকো সকলেই এসে হাজির হলো। রেক্সা নতুন সদস্য হওয়ায় এই গোপন সাক্ষাতে তাকে সামিল করা হয়নি। বাকিদেরও জোভির বাসাতেই রেখে আসা হয়েছে।
লিও কাঞ্জির আসার কোনো সুযোগ নেই, যদিও এরা আসবে শুনে বার বার করে বলে দিয়েছে দুজনের জন্য দুটো বক্স ভর্তি খাবার যেন পার্সেল হয়ে চলে আসে রেড জোনে৷

আনাবিয়া বড় দুই বোতল ভর্তি কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে এসে রাখলো টেবিলের ওপর৷ বাচ্চারা তখন গিজগিজে গল্প করতে ব্যাস্ত। আনাবিয়াকে দেখা মাত্রই কোকোর চোখ উজ্জ্বল হয়ে এলো, তার আম্মা তার দেওয়া উপহারেই আজ নিজেকে সাজিয়েছে দেখে আনন্দের সীমা রইলোনা ওর। ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে সুমিষ্ট স্বরে সে বলল,
“আম্মা, আপনাকে আজ হুরপরীর মতোন সুন্দর লাগছে!”
কোকোর কথাতে সবাই গল্প থামিয়ে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। হঠাৎ এতগুলো মুগ্ধ চোখ ওর দিকে এভাবে পড়ায় লজ্জায় পড়লো আনাবিয়া, শুভ্র গালে তৎক্ষনাৎ ছড়িয়ে পড়লো লালিমা৷ অপ্রস্তুত হয়ে গলা খাকারি দিলো সে।
বাচ্চারা আনাবিয়ার এমন অবস্থায় চাপা হেসে আবার গল্পে লেগে পড়লো, লিন্ডা কোকোর পাশে বসেছিলো, চাপা গলায় বলল,

“দেখতে হবেনা বউটা কার! দ্যা মোস্ট ডেঞ্জার ম্যান এর। ডেঞ্জার ম্যান দের বউরা সবসময় সুন্দরী হয়। আমাদের রেক্সাও সুন্দরী, কারণ ওয় একটা ডেঞ্জারের বউ হবে৷ আমিও সুন্দরী কারণ আমার সোয়ামী হলো দ্যা লায়ন কিং।”
“বক্তৃতা বন্ধ করে গিল চুপচাপ। লায়ন কিং মারাস, ম্যাও কুনহানের!”
একটা আস্ত নানরুটি গলাধঃকরণ করতে করতে বলে উঠলো কোকো। লিন্ডা ওর দিকে ধ্বংসাত্মক চোখে তাকিয়ে বলল,
“মোটেও আমার সোয়ামীকে উল্টাপাল্টা কথা বলবেনা ভাইজান, আমার সোয়ামী আমার কাছে শুধু লায়ং কিং না, ড্রাগন কিং৷ রেক্সা যেমন তোমার কাছে ভাতের হোটেল, অমন।”
আলফাদ কোকোর অন্যপাশে বসে ছিলো, লিন্ডার কথা শুনে বলল,
“ম্যাও ম্যাও করিসনা। ওই হলো সোয়ামী তাই নিয়ে বিল্লির অংহকারের শেষ নেই।”
“আজ আমার সোয়ামী উপস্থিত নেই বলে সোয়ামীর বউকে এভাবে অপমান করতেছো তোমরা? আমারও সময় আসবে তখন সুযোগ পেলেই আমি পঁচা ননদে পরিণত হয়ে কোনো এক নাগিনী কে কেঁচো বলে অপমান করবো, আর রেক্সা কে বলব মাছি বসা পান্তা ভাত। হুহ্‌!”

বলে লিন্ডা ওদের দিকে পিঠ দিয়ে হাইনার দিকে মুখ করে একের পর এক খাবার মুখের ভেতর চালান দিতে লাগলো। হাইনা খেতে খেতে লিন্ডার গোগ্রাসে গেলা দেখে ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
“আস্তে খা হতচ্ছাড়ি, মনে হচ্ছে দুই যুগ ধরে কিছু গিলিসনা৷”
“হ্যাঁ গিলিনা, তুমি মুখ বন্ধ করে খাও নইলে খাবারের সাথে সাথে তোমাকেও গিলে ফেলবো৷”
ঝাঝিয়ে বলে উঠলো লিন্ডা। ফ্যালকন অন্য পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল,
“মুখ বন্ধ করে কেমনে খায় রে বিলাই?”
“পাসা দিয়ে, চেষ্টা করে দেখো৷”
ফ্যালকন ভোতা মুখ করে বসে রইলো। তা দেখে সবগুলো হাসতে শুরু করলো খিকখিক করে। হাসতে হাসতে ওকামি গলায় খাবার বাধিয়ে ফেললো, কাশতে কাশতে অবস্থা ওর নাজেহাল হলে আনাবিয়া দ্রুত পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে সবগুলোকে ধমকে বলল,
“কি শুরু করলি তোরা? খেতে বসে দুনিয়ার আজেবাজে বকা! চুপচাপ খেয়ে রেডি হ, আমাদের মিটিং করতে হবে৷”
ধমক খেয়ে শান্ত হলেও ত্রিশ সেকেন্ডের মাথায় আবার খিকখিক করে হাসতে গিয়ে এবার গলায় পানি বাধালো জোভি।

“আম্মা, আমরা সর্বমোট তিনটি দলে ভাগ হবো। আমি লিড করবো সৈন্যদের একাংশ, সোজা প্রাসাদের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার দিকে। জায়ান সাদি একাংশ লিড করবেন, সেটা যাবে প্রাসাদের ভেতরে৷ আমরা প্রতিরক্ষা দুর্বল করে দেওয়া মাত্রই তারা ঢুকে পড়বেন। তাদের প্রধান কাজ হবে শেহজাদা ইলহানের আন্ডারে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গকে খুঁজে বের করা৷

তৃতীয় দলটি সংখ্যায় বেশি। এই দলে বেশিরভাগ রেড জোনের প্রাণী অর্থাৎ আমরা থাকবো এবং বাকি অল্পসংখ্যক সৈন্য৷ এই দলের প্রধান কাজ হবে শিরো মিদোরির সীমান্ত এলাকা গুলো থেকে শেহজাদা ইলহানের সৈন্যদের সরিয়ে দেওয়া। এই দলের নেতৃত্ব দিবে হাইনা, দলের ভেতর ওই জঙ্গলকে সবচেয়ে ভালোভাবে চিনে।
আমাদের আর দুটি গোপন দল থাকবে, এর একটি থাকবে রেড জোনের ভেতরে, ওরা ভেতরে কোনো আক্রমণ হলে প্রতিহত করবে, এবং আমাদের ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে। আর দ্বিতীয় দলটি থাকবে সমুদ্রে। কারণ, যতদুর জানতে পেরেছি শেহজাদা ইলহান সমুদ্রেও আমাদের জন্য ফাঁদ পেতে রাখবেন যেন আমরা শিরো মিদোরিতে ঢোকা মাত্রই বিপদে পড়ে যাই৷ সিক্রেট গ্রুপের একটির নেতৃত্বে থাকবে আলফাদ আর ওকামি, অন্যটিতে নওয়াস জাবিন।
আমাদের অস্ত্রের জোগান যেহেতু কম তাই আমরা কিছু হ্যান্ড গ্রেনেড নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছি, যতদূর পেরেছি আরকি৷ ওদের কাছে অস্ত্রের মজুদ অনেক, সেটাও আধুনিক অস্ত্র। এজন্য আমাদের বিপদের মাত্রা বেশি। কিন্তু আমাদের সেনারা সাহসী, তারা অস্ত্রের ব্যাপারটি নিয়ে একদমই চিন্তিত নয়, অস্ত্র ছাড়াই তারা যুদ্ধে অংশ নিবে, এবং আমার বিশ্বাস আমরা পারবো।”

কোমরে হাত গুজে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর মেলানো চামড়ার তৈরি ম্যাপে শিরো মিদোরির মানচিত্রের নির্দিষ্ট স্থান গুলো দেখিয়ে দিতে দিতে পরিকল্পনা বলল কোকো৷ বাকিরা সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে টেবিল। আনাবিয়া বসে আছে চেয়ারে৷
মানচিত্রের দিকে ক্ষণিক দৃষ্টি রেখে সে জিজ্ঞেস করলো,
“মীরের প্লান কি? সে কি করবে?”
“ক্ষমা করবেন আম্মা, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। উনি শুধু আমাদের জন্যই এই পরিকল্পনা করেছেন, উনি নিজে কোথায় থাকবেন, কি করবেন সেটা ক্লিয়ার করেননি, আর…. আমিও…. জিজ্ঞেস করার স্পর্ধা করিনি৷
তবে আমার ধারণা তিনি শুধু মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা করবেন শেহজাদা ইলহানের ওপর আক্রমণ করার৷”
আনাবিয়া একটা শ্বাস ছেড়ে ফ্যালকনের দিকে চেয়ে বলল,
“তোকে যে বন্দবস্ত করতে বলেছিলাম, করেছিস?”
“ফ্যালকন মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে একটা বড়সড় প্যাকেট বের করলো, প্যাকেট খুলতেই এক বিশেষ ধরণের লিসনিং ডিভাইস চোখে পড়লো সকলের। ফ্যালকন সেগুলো আনাবিয়ার কাছে হস্তান্তর করলে আনাবিয়া বার্ডিকে ইশারায় কিছু বলল। বার্ডি ম্যানরের দিকে এগোলো তৎক্ষনাৎ।
আনাবিয়া বলল,

“এগুলো আমি বিশেষ ভাবে তোদের জন্য বানিয়েছি, অনলি ফর দ্যা রেসিডেন্সেস অব রেড জোন। এই ডিভাইসের মাধ্যমে আমি তোদের সাথে যোগাযোগ রাখবো, যুদ্ধের সময়ে। তখন আমি এখানে নয়, শিরো মিদোরিতে থাকবো।”
এমন সময় বার্ডি একটি বক্স নিয়ে ফিরলো। আনাবিয়া সেগুলো থেকে একটি বিশেষ ধরনের শলাকা সদৃশ বের করে লিসনিং ডিভাইসে সেট করে দিতেই একটি হল্যো স্ক্রিন ভেসে উঠলো সামনে। আনাবিয়া বলল,
“এটিতে আমি লাইফট্রির কিছু বিশেষ অংশ সেট করে দিচ্ছি। এর সাহায্যে সম্পুর্ন শিরো মিদোরির সমস্ত স্থান তোরা নখদর্পনে রাখতে পারবি, কখনো কোনো নির্দিষ্ট স্থানের অবস্থা দেখতে হলে হল্যো স্ক্রিন স্পর্শ করে সে স্থানটা সামনে আনলেই দেখা যাবে৷ এটার মাধ্যমে সবাই সবার সাথে যোগাযোগ ও রাখা যাবে।
আমি সেদিন লাইফট্রির কাছে থাকবো। তোদের যেহেতু অস্ত্র সংকট, সম্মুখ যুদ্ধে ফেঁসে গেলে তোরা মারা পড়বি। তাই আমার দায়িত্ব তোদের রক্ষা করা। তবে কাজটা আমি সর্বক্ষণ করতে পারবোনা, আমাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে যেতে হবে৷”

“কিন্তু আপনি আমাদের…. মানে আপনি কিভাবে আমাদেরকে রক্ষা করবেন শেহজাদী?”
শুধোলো ওকামি। আনাবিয়া ওর দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলল,
“সেটা সময় এলেই দেখতে পারবি৷”
এরপর আরও কিছুক্ষণ আলোচনার পর মিটিংয়ে ভঙ্গ দিয়ে আনাবিয়া বলে উঠলো,
“আলোচনা যা হয়েছে দ্যাটস ইনাফ৷ বাকিটা ওয়ারজোনে দেখবো। তোরা এখন যে যার স্থানে ফিরে যাবি। আর বার্ডি….”
বার্ডি নিজের নাম শুনে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, আনাবিয়া বলল,
“আমার চাচাজিকে একটা বার্তা পাঠাতে হবে, তুমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে। আজই, খুব জরুরি।”
বার্ডি সহ সকলেই বেশ বিস্মিত হলো আনাবিয়ার কথায়, কিন্তু প্রকাশ করলোনা কেউ। বার্ডি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আপনার যেমন আদেশ, শেহজাদী।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৭

ইযান দাঁড়িয়ে ইলহানের সামনে, ইলহানের হাতে একটা চিরকুট। কপাল কুচকে চিরকুটটা পড়ছে সে। পড়া শেষ করে ইযানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“সুপার কার? আমার মেয়ের নাকি একটা সুপার কার চাই! এখন এই সংকটের মুহুর্তে আমি কিভাবে ওকে সুপার কার দিবো, তাছাড়া সুপার কার দিয়ে সে করবেটা কি?”
ইযান কিছু বললনা, এঁদের চাচা ভাতিজির ভেতর না ঢোকায় ভালো। ওকে নিশ্চুপ দেখে ইলহান ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আচ্ছা, যাই হোক। জীবনে প্রথমবার মেয়ে কিছু চেয়েছে। কুরো আহমার গিয়ে সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ অ্যান্ড ফাস্টেস্ট সুপার কারটা আমার মেয়ের জন্য পারচেজ করো ইযান।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৯