বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৯
রানী আমিনা
দিনের আলো ম্লান হয়ে এসেছে, পশ্চিম আকাশে আবছা লালিমা। শিরো মিদোরির সেইফজোনের ডাইনিং এরিয়ার একটি রংচটা চেয়ারে বসে আছে থিয়োডর। পোশাকে ময়লা, কিছু কিছু স্থান ছেঁড়াখোঁড়া।
চেহারায় বিরাজমান শীতের রুক্ষতা, ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখগুলো কিছুটা সন্দিগ্ধ, উদাসীন। বুনোমি ফুটে আছে তার চেহারায়।
পাশেই মাটিতে বসে চেয়ারের গায়ে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ইলোরা। তাদের অদূরে একদল ছেলেমেয়ে বসা, শীতে জবুথবু। তাদের পাশে অবহেলায় পড়ে আছে কয়েকটি পুরোনো, মরিচা ধরা রাইফেল।
মাঝখানে নিভু নিভু হয়ে জ্বলছে একটা ছোটখাটো আগুন, অল্প অল্প তাপ ছড়াচ্ছে তা। ওমে ওমে একে অপরের গা ঘেঁষে বসে আছে সকলে।
আগুনের পাশে আধ-খাওয়া কিছু টিনের কৌটা, কয়েকটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, আর ফেলে রাখা বিয়ারের বোতল।
চোয়াল বসে গেছে প্রায় সকলের। কয়েক মাস ধরে কোনো রেশন আসেনি, জঙ্গল থেকে ছোট ছোট প্রাণী শিকার করে দিন কাটছে ওদের। জানতে পেরেছে অন্যান্য দ্বীপ গুলোতেও কোনো খাবার যায়নি। খাবারের কাঁচামাল উধাও। সেখানে ওদের মতো উদ্বাস্তুদের খবর কে রাখবে?
ইলোরা গর্ভবতী, কিন্তু অপুষ্টির কারণে তার চোখ মুখ বসে গেছে গর্তে৷ ভয়ানক দেখাচ্ছে তাকে। আউটসাইডার্স দের ভেতরে যারা বৃদ্ধ ছিলেন তাদের অনেকেই বিগত মাস গুলোতে মৃত্যুবরণ করেছেন, সেইফজোনের গ্রেভ ইয়ার্ডে নতুন কবর উঁকি দিচ্ছে অনেকগুলো।
জঙ্গলের এই অলস নিরবতা হঠাৎ ভেঙে গেল জোরালো ইঞ্জিনের শব্দে। অলস সময় কাটানো থিয়োডর আর তার সাথের ছেলেমেয়ে গুলো নড়েচড়ে বসল তৎক্ষনাৎ। তাদের চোখ থেকে অলসতা উবে গিয়ে ভর করলো সতর্কতা, কিছুটা আগ্রাসী ভাব। মুহূর্তেই মাটিতে ফেলে রাখা মরচেধরা অস্ত্রশস্ত্রের দিকে হাত বাড়াল, প্রস্তুত হলো মোকাবিলার জন্য।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রেড জোনের দিক থেকে ওয়ার্কিং জোনের ভেতর তখনি আচমকা প্রবেশ করল দুটি সামরিক জিপ। গর্জন তুলতে তুলতে বন্য কালো ষাড়ের মতোন জিপ দুটো এসে থামলো ডাইনিং এরিয়ার কাছাকাছি, সামনে আর জিপ নিয়ে যাওয়ার রাস্তা নেই।
থিয়োডর বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ইলোরাকে নিজের পেছনে আড়াল করে নিয়ে শক্ত করে ধরে রইলো রাইফেলটি৷ যে যেভাবে পারলো আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে উগ্র চোখে তাকিয়ে রইলো জিপ গুলোর দিকে৷
তখুনি জিপের দরজা ঠেলে নামলো ইযান। পরনে তার ঝা চকচকে পরিপাটি পোশাক, চেহারায় স্পষ্ট কর্তৃত্বের ছাপ। এই জঙ্গুলে পরিবেশে তার সুদর্শন হুলিয়া বেশ বেমানান দেখালো। সঙ্গে নামলো বেশ কয়েকজন ইউনিফর্ম পরিহিত সোলজার। তাদের হাতে ধরা আধুনিক অস্ত্র, চোখে পেশাদারীত্ব৷
থিয়োডর অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসতে নিলে ইযানের আশেপাশে থাকা সোলজার গুলো শক্ত মুখশ্রীতে এগিয়ে এলো কয়েক কদম। ওদের ভারী পদক্ষেপ দেখা মাত্রই থিয়োডরের সাথের ছেলেগুলো পিছিয়ে গেলো ভয়ে।
ইযান হাত তুলে সোলজার দের থামতে নির্দেশ দিলো। সোলজার গুলো থেমে গেলো তৎক্ষনাৎ। কিন্তু তাদের শত্রুভাবাপন্ন চোখ পড়ে রইলো থিয়োডরদের দিকে।
ইযান সরু চোখে তাকিয়ে থিয়োডরকে পর্যবেক্ষণ করলো কিছুক্ষণ। ছেলেটিকে সে চিনতে পেরেছে, ছেলেটি রেপিস্ট অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ সিরিয়াল কিলার৷ মেয়েদেরকে রেপ করে মেরে দিতো৷
কিন্তু বয়স অল্প এবং মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি, পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই ওর৷ ইযান দুকদম এগিয়ে এসে শান্ত, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো,
“লে’মি ইন্ট্রোডিউস; আ’ম ইযান হাসেমি, চিফ সেক্রেটারি টু বাদশাহ জাজীব ইলহান দেমিয়ান।
সোজা কথাতে আসি, আমি এখানে এসেছি তোমাদেরকে একটি গোল্ডেন অপরচুনিটি দিতে। আ’ ওয়ান্ট ইয়্যু গাইজ টু জয়েন হিজ ম্যাজেস্টি’স আর্মি। তোমরা হিজ ম্যাজেস্টির আর্মি তে জয়েন দিলে তোমাদেরকে মুক্তি দেওয়া হবে, এবং পূর্বের সমস্ত ক্রিমিনাল রেকর্ড ডিলিট দেওয়া হবে৷ আর যদি জয়েন দিতে অপারগতা প্রকাশ করো তবে….. তবে টা আর না-ই বলি৷”
বলে ইযান মিষ্টি করে হাসলো। সাথের সোলজার গুলো অস্ত্র নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো ‘তবে’-র পরে কি হবে৷
ইযানের কথাতে থিয়োডর বিস্ময় বিয়ে তাকিয়ে রইলো, অপ্রস্তুত হয়ে আশেপাশে দেখলো ওর সাথের ছেলেমেয়ে গুলোর প্রতিক্রিয়া। তারা সকলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইযানের দিকে, তাদের কদর্য, রুক্ষ চেহারায় অবিশ্বাস আর সন্দেহের ছাপ ফুটে আছে যথারীতি।
থিয়োডর বিস্ময় কাটিয়ে এগিয়ে এসে ইযানের চোখে চোখ রেখে উগ্র গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
“কেন? আপনাদের এত এত আর্মি থাকতে আমাদেরকে কি প্রয়োজন? আমাদেরকে দিয়ে কি করাতে চান আপনি?”
থিয়োডরের এত সাহস দেখে ইযানের মনে চাইলো এক থাপ্পড়ে ওর চুপসানো গাল ভেঙে দিতে। কিন্তু এখন ধৈর্যহারা হলে চলবে না৷ চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলো সে, তারপর বলল,
“তোময়াদের ভেতর সম্ভাবনা আছে, তোমরা শক্তিশালী, পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতা রাখো, লড়াই করে টিকে থাকার প্রবণতা আছে।
তোমাদের এই ক্ষমতা গুলো আমাদের কাজে ব্যাবহার করো, যুদ্ধে আমাদের সাথ দাও। বিনিময়ে তোমরা পাবে পঞ্চদ্বীপের নাগরিক হিসেবে বৈধতা, সম্মান। তোমাদের জীবন আর এই ভয়ঙ্কর জঙ্গলে অনাহারে, অনিশ্চিতে নষ্ট হবে না৷”
শেষোক্ত কথাটি ইযান চারদিকের জঙ্গল আর থিয়োডরের ছেড়া মলিন পোশাকের দিকে নির্দেশ করে বলল। থিয়োডর সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“যুদ্ধ? কিসের যুদ্ধ? কাদের বিরুদ্ধে?”
“শেহজাদা নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান।”
নামটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই থমকালো থিয়োডর। তার কুঞ্চিত ভ্রুদ্বয় সোজা হয়ে এলো।
উনি তবে বেঁচে আছেন? কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ? কিভাবে করবে?
বহুবছর পূর্বে অ্যানা কে খুঁজে নিয়ে যেতে তিনি এসেছিলেন এই সেইফজোনে। থিয়োডর দেখেছিলো সেদিন তাঁকে। থিয়োডর সজ্ঞানে কখনো ওই দীর্ঘদেহী, কঠোর ব্যাক্তিত্বের ভয়ঙ্কর লোকটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে না।
থিয়োডর নিজের অজান্তেই পিছিয়ে গেলো দুকদম। ইযান জানতো এরকমই প্রতিক্রিয়া পাবে সে৷ তাই বলে উঠলো,
“যুদ্ধে জিততে পারলে তোমরা স্বাধীন জীবন পাবে, এই জঙ্গল থেকে বের হতে পারবে। মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে, নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবে, পেট ভরে খেতে পারবে। পঞ্চদ্বীপের নাগরিকত্ব ফিরে পাবে, জঙলীদের মতোন জীবনযাপন করার আর প্রয়োজন পড়বে না৷
এখনো সময় আছে ভেবে দেখো, আমার জীপ এই স্থান ত্যাগ করলে আর কখনো ফিরবে না। পেছনে পুশুদের খাদ্য হিসেবে ফেলে রেখে যাবে তোমাদের মৃতদেহ।”
কথাটি বলে ইযান তাকালো ইলোরার ফোলা পেটের দিকে। থিয়োডর নিজেও ইযানের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো ইলোরার পেটে। সন্তানের কথা মনে আসতেই নিজেকে শক্ত করলো সে। কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আমরা রাজি। তবে তার জন্য আপনাদেরকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে যুদ্ধে জেতার পর আপনি আমাদেরকে মুক্তি দিবেন। শুধু যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তাদের নয়, সবাইকে।”
ইযান ভ্রু তুললো, ক্ষণিক ভেবে বলল,
“ঠিক আছে, সবাইকেই মুক্তি দেওয়া হবে৷”
অল্প সময়ের ভেতরেই চুক্তিপত্র সাক্ষরিত হলো। সোলজার রা তাদের অস্ত্র নামিয়ে নিলো। ওয়ার্কার্স এবং আউটসাইডার্স দের ভেতর থেকে সবল, সক্ষম গুলোকে বেছে বেছে নিয়ে আসা হলো। তারা তাদের মরিচা ধরা পুরনো অস্ত্রশস্ত্রগুলো ছুড়ে ফেললো মাটিতে, বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো উন্নতমানের সামরিক সরঞ্জাম। সকলকে দেওয়া হলো সামরিক ইউনিফর্ম। তাদের উগ্র ভাবটা রইল বটে, কিন্তু তার সাথে যুক্ত হলো সামরিক পেশাদারিত্বের ছাপ।
নতুন করে জীপ নিয়ে আসা হলো আরও কতকগুলো। সবাইকে তোলা হলো জীপে। জিপগুলো ইঞ্জিন চালু করল, তারপর আবারও গর্জন তুলতে তুলতে অদৃশ্য হয়ে গেলো রেড জোনের ভেতরে৷
রেড জোনের হাজার বছরের পুরোনো গাছপালাগুলোর শাখা প্রশাখা উঠে গেছে আকাশের দিকে। ডালের ফাঁক গলিয়ে মাটিতে নেমে এসেছে পূর্ণিমার নরম, দুধ-সাদা আলো।
নরম ঘাসের ওপর শিশিরের কণাগুলো চাঁদের আলোতে ঝিকিমিকি করছে মুক্তোর মতো। জঙ্গল জুড়ে মোড়ানো এক শান্ত, শক্তিশালী নীরবতা। ক্ষণে ক্ষণে শুধু পাতা নড়ার সরসর শব্দ আর দূর থেকে মন্ত্রের মতো ভেসে আসছে কোনো নিশাচর পাখির ডাক৷
লাইফট্রির গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে মাটিতে বসে আছে আনাবিয়া৷ মাটিজুড়ে অজগরের মতো এঁকে-বেঁকে ছড়িয়ে থাকা শেকড়গুলো ওকে সুন্দর আসন তৈরি করে দিয়েছে যেন। আজ ওর রোজকার দায়িত্ব পালনের দিন, আজ ওর সুরে মুখরিত হবে এই রেড জোন।
সারাদিনে রেড জোনে ট্রেইনিং চলে প্রাণীগুলোর, রেড জোনের সকল প্রাণীকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে মীর। কোকো যেখানে স্বয়ং আর্মি চিফ সেখানে তাদের না করার কোনো প্রশ্নই আসেনা৷ রেড জোন জুড়ে তাই পুরোদমে চলছে তাদের ট্রেইনিং।
অন্যদিকে ইলহানের সৈন্যরা ট্রেইনিং এর জন্য সেইফজোন আর সমুদ্র পাড়ের বিরাট জায়গাটি বেছে নিয়েছে। যত ঝোপঝাড় জঙ্গল ছিলো সবই পরিষ্কার করে একটি বিরাট সেনাঘাটি গড়ে তুলেছে।
কোকোর থেকে জেনেছে সেইফজোনের অনেক ছেলেমেয়ে ইলহানের সৈন্যদের সাথে যোগ দিয়েছে। আধুনিক অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের হাতে।
রেড জোনের ট্রেইনিংয়েও কোনো কমতি নেই, প্রাণীগুলো সাধারণের চেয়ে প্রায় তিনগুণ শক্তিশালী। সম্মুখযুদ্ধে এলে তাদের সামনে কোনো সাধারণই টিকবে না। তাদের ট্রেইনিং এর দায়িত্বে আছে হাইনা, জোভী আর ওকামি।
মাঝে মাঝে কোকো নিজেও তদারকি করতে চলে আসে রেড জোনে। বাকিটা সময় সে রামাদিসামাতে থাকে, সেখানের সৈন্যদেরকে ট্রেইনিং প্রদান করে৷
অস্ত্রের ঘাটতি থাকায় যে যেভাবে পারছে নিজেদের অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে। অ্যানিম্যাল টাউনে তৈরি হচ্ছে বর্ম, এই মুহুর্তে কুরো আহমারে কাঁচামাল না পৌছানোয় সকল পোশাকের কাজ বন্ধ আছে।
অ্যানিম্যাল টাউনই তাই শেষ ভরসা। কয়েকটি স্থানে গোলাবারুদ তৈরির কাজও চলছে রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা, কেউ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগটুকু পাচ্ছে না৷ ইলহানের সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিপরীতে লড়ার জন্য যতরকমের প্রস্তুতি প্রয়োজন নেওয়া হচ্ছে৷
আনাবিয়ার খুব মন চায় এই রেড জোনে ফিরে আসতে, সবার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে। সে থাকলে বাচ্চা গুলো আরও বল পেতো, কাজ করার শক্তি পেতো। কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। মাসের এই একটি দিন ব্যাতিত রেড জোনে আসা হয়না তার, সেটাও অনেক গোপনে, চুপিচুপি।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আনাবিয়া। শান্ত, দুঃখী চোখ জোড়া ওর ঘুরে ফিরেলো থালার মতোন উজ্জ্বল চাঁদটির ওপর। গায়ে তার শীতের পোশাক, উলের, নীলচে।
জঙ্গলের প্রায় সকলেই এখন ঘুমে। কিন্তু মসভেইলে মীর আছে, গতবার সে ছিলোনা। আনাবিয়া এসে নিজের দায়িত্ব পালন করে আবার ভালোভাবেই ফিরে যেতে পেরেছিলো। কিন্তু এবার কি করবে বুঝতে পারলোনা৷ সে এখন গলা ছাড়লে সকলে ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুমোবেনা মীর, সে নিশ্চয় মসভেইল থেকে বেরিয়ে দেখতে আসবে কার এত শখ জেগেছে মধ্যরাতে তার ঘুমের বারোটা বাজানোর!
ইলহান শুনতে পেলে সেও বুঝে যাবে আনাবিয়া এখানেই আছে। চারদিকে যন্ত্রণা!
মীর টের পেলেও সমস্যা ছিলোনা, কিন্তু ওর সামনে পড়ে গেলে সমস্যা। একবার সে আনাবিয়াকে রামাদিসামাতে দেখেছে, জেনেছে আনাবিয়া কিমালেবের বাসিন্দা। এখন ওকে শিরো মিদোরিতে দেখলে নিশ্চিত দেশদ্রোহী ষড়যন্ত্রকারিনী ভেবে গর্দান নিবে!
ডাইনীও ভেবে বসতে পারে, বলা যায়না৷ এও ভাবতে পারে ইলহান এই সাদা চুলের পেত্নী টাকে মীরের ওপর নজরদারিতে রেখেছে! যে কোনো দিকেই হোক আনাবিয়াই ফেসে যাবে, সাথে মাথাটাও হারাবে। কিন্তু উপায় নেই, দায়িত্বে গাফিলতি করলে ঝামেলা বাড়বে বৈ কমবে না।
কুয়াশা পড়ছে বেশ, আনাবিয়ার শীত শীত লাগছে৷ এখানে এইভাবে খোলা আকাশের তলে বসে থাকলে নিশ্চিত ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলবে। এখন এই ক্রান্তিলগ্নে ঠান্ডা লেগে গেলেও বিপদ।
বার্ডি বসে আছে লাইফট্রির ডালের ওপর৷ খুব শখ জেগেছে তার কিভাবে শেহজাদী এই দিনে শিরো মিদোরি কে নতুন করে তোলেম সেটা দেখবে। আনাবিয়া বার বার বলে দিয়েছে নিচে নেমে দাঁড়াতে, ওপর থেকে পড়ে গেলে আঘাত লাগবে। কিন্তু সে উপর থেকে দেখবে বলে বায়না ধরে বসে আছে।
এখনো আনাবিয়া গলা ছাড়ছেনা দেখে এবার কয়েকডাল নিচে নেমে এলো সে। আনাবিয়া ওকে দেখে বলল,
“মসভেইলে হিজ ম্যাজেস্টির কামরায় বাতি জ্বলছে কিনা দেখে আসোতো বার্ডি৷”
বার্ডি তৎক্ষনাৎ ডানা ঝাপটে উড়ে চলল মসভেইলে। খানিক বাদে ফিরে এসে বলল,
“শেহজাদী, সব অন্ধকার। হিজ ম্যাজেস্টি এখন ঘুমিয়ে পড়েছেন নিশ্চিত। আপনি দয়া করে শুরু করুন, আমারও ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।”
শেষোক্ত কথাটা অসহায় ভঙ্গিতে বলল বার্ডি। আনাবিয়া ফোনে সময় দেখলো, একটা বেজে পয়ত্রিশ। এতক্ষণে সবার ঘুমিয়ে যাবার কথা৷
আনাবিয়া গা এলিয়ে দিলো লাইফট্রির ওপর, লাইফট্রি নিজের লতাপাতা দিয়ে আঁকড়ে ধরে রইলো ওকে। সফেদ চুলগুলো একে একে অদ্ভুত নকশায় সেঁটে গেলো লাইফট্রির গায়ে। অদ্ভুত রুপোলী আর সোনালী আলোর মিশ্রণ বিচ্ছুরিত হতে শুরু করলো সফেদ কেশগুচ্ছ হতে।
হীরকখন্ডের ন্যায় চোখ দুটি হয়ে উঠলো আরও উজ্জ্বল!
হাতের আঙুলগুলো গাছের কাণ্ডের উপর আলতো করে ছুঁয়ে দিলো একবার। এক স্পর্শেই লাইফট্রির সমস্ত শরীর স্বর্ণালি আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো, আলো যেন ফুড়ে বেরোতে শুরু করলো তার শক্ত বাকল!
আনাবিয়ার ঠোঁট আলগা হলো, ধীরে ধীরে দূর নদী থেকে ভেসে আসা কলতানের মতোন মৃদু সুর ভেসে এলো তার কন্ঠ হতে! ক্রমে ক্রমে জোরালো হলো তার কন্ঠস্বর, মুহুর্তেই তার জাদুকরী, মনোমুগ্ধকর সুরের মিষ্টি মূর্ছনায় গাঢ় ঘুম নেমে এলো শিরো মিদোরির সকল প্রাণের চোখে!
লাইফট্রির ডালপালা থেকে বের হওয়া স্বর্ণাভ আলো ছড়িয়ে পড়লো আকাশে, তা ধীরে ধীরে ছুয়ে দিলো রেড জোনের সকল বৃক্ষ, গুল্মলতা। এক গাছ হতে আরেক গাছে পানির প্রবাহের মতোন প্রবাহিত হয়ে চলল স্বর্ণাভ আলোক কণিকা৷ আকাশে ঢেউয়ের মতোন ভেসে চলল গ্লিটারের মতোন নরম স্বর্ণাভ আলো, যেন কোনো অদৃশ্য সুতো দিয়ে আকাশ থেকে সোনালী রঙের ঝর্ণা বইয়ে দিচ্ছে কেউ!
আনাবিয়ার কণ্ঠনিঃসৃত সুর যতই জোরালো হলো ততই নিস্তব্ধ হয়ে চলল রেড জোন। অদূরে গাছের নিচে শুয়ে থাকা হরিণটি হঠাৎ মাথা নিচু করে তলিয়ে গেলো গভীর ঘুমে। রেডউড গাছের মগডালে বসে থাকা রাতজাগা পেঁচাটির চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো নিমিষে, জোনাকিরাও তাদের খেলা থামিয়ে স্থির হয়ে রইলো পাতায় পাতায়!
অ্যানিম্যাল টাউনে বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে অপারগ হয়ে বসে থাকা মা টি বাচ্চাকে বুকে নিয়ে ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়লো আলগোছে। সেইফজোনের আউটসাইডার্স দের রেসিডেন্সিয়াল এরিয়াতে অসুস্থতার কারণে ব্যাথায় ঘুমোতে না পারা বৃদ্ধাটিও ঘুমিয়ে গেলো পরম আবেশে। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর যন্ত্রণায় কাতরানো সৈন্যগুলো ব্যাথা ভুলে ঘুমিয়ে পড়লো ঘোর লাগা মাদকতাপূর্ণ মায়াবী সুরের প্রভাবে।
বার্ডি অনেক আগেই ঘুমের কাছে পরাজিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, ঘন হয়ে যাওয়া শ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে ক্ষণে ক্ষণে। আর অল্প পরেই শেষ হবে আনাবিয়ার দায়িত্ব, সমস্ত শিরো মিদোরিকে যখন ছুয়ে দিবে স্বর্ণাভ আলোক কণিকা।
কিন্তু হঠাৎই আনাবিয়া থামিয়ে দিলো সুর, সতর্ক হয়ে গেলো মুহুর্তেই। শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে এলো ওর। সন্ধানী চোখে তাকিয়ে দেখলো চারদিকে, কান খাড়া করলো মসভেইলের দিকে। পরক্ষণেই আতঙ্কে বড় বড় হয়ে এলো ওর চোখ। মুহুর্তেই উঠে দাঁড়িয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলল কোনো এক দিকে।
ওর পায়ের শব্দ ক্ষীন হয়ে আসা মাত্রই লাইফট্রির নিচে জোর কদমে এসে উপস্থিত হলো মীর। কুঞ্চিত ভ্রু জোড়ার নিচের স্বর্ণাভ দৃষ্টি দিয়ে দেখলো মাটিতে পড়ে থাকা বার্ডিকে।
আকাশে তখনো দৃশ্যমান হয়ে আছে স্বর্ণালি আলোক কণা, লাইফট্রি জেগে আছে, তার ডালপালা গুলোতে সাড়া দেওয়ার ছাপ স্পষ্ট। মীর শকুনি চোখে তাকিয়ে রইলো সামনের দিকে, কাউকে স্পষ্ট পালিয়ে যেতে দেখেছে সে, সাদা চুলের।
চোখের সামনে মুহুর্তেই ভেসে এলো রামাদিসামাতে দেখা মেয়েটির চেহারা। তারও সাদা রঙা চুল ছিলো, চোখ জোড়া ছিলো অস্বাভাবিক। একমাত্র দেমিয়ান পরিবার বা তার সাথে সম্পর্কিত ব্যাক্তি ব্যাতিত অন্য কারো দৃষ্টি অমন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে ওই মেয়েটি কে? আর আজকের এই মেয়েটিই বা কে?
অ্যানিম্যাল টাউনের কেউ লাইফট্রির আশেপাশে ঘেঁষবে না, সেইফজোন থেকে তো কেউ রেড জোনে প্রবেশের কথা চিন্তাও করবে না। তবে…..?
মীর তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার যাওয়ার পথের দিকে। মাটিতে পড়ে থাকা বার্ডিকে আরেকবার দেখে নিয়ে ফিরে চলল মহলের দিকে।
মসভেইলে নিজের কামরার বুকশেলফে তন্নতন্ন করে মীর খুঁজে চলেছে একটি বই। সেটা কি প্রাসাদে থেকে গেলো? দেমিয়ান শেহজাদীদের সম্পর্কে এখনো পর্যন্ত হাজার হাজার তথ্য পড়েছে সে, কোথাও যেন একটা মিল এসে জড়ো হচ্ছে, কোথাও কিছু এসে জট পাকিয়ে চলেছে।
লাইফট্রির সাথে দেমিয়ান শেহজাদীদের এক অদ্ভুত সংযোগ থাকে, কেমন সংযোগ থাকে এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না তার। অথচ এই সব বিষয়ে সে বিস্তর পড়াশোনা করেছে, কেন করেছে জানেনা, কিন্তু পড়েছে। কত শত বই সে শেষ করেছে এই বিষয়ের ওপর।
দেমিয়ান হিসেব অনুযায়ী একটা শেহজাদীর জন্ম হওয়ার কথা গত পঞ্চাশ থেকে একশো বছরের ভেতর। কিন্তু এমন কোনো শেহজাদীর অস্তিত্ব তো নেই! কারোরই তো মেয়ে হয়নি। সালিম মারা গেছিলো বিষক্রিয়ায়, সালিমের স্ত্রী মারা গেছিলো……. কেন মারা গেছিলো….. কিভাবে?
মনে পড়েনা মীরের, মস্তিষ্কে কিসের একটা সুক্ষ্ম জ্বালা বয়ে যাচ্ছে যেন! চোখ কুচকে গেলো মীরের৷ কিছুতেই মনে করতে পারলোনা, স্মরণেই আসলো না! পরিবর্তে মুখ থেকে অস্ফুট ধ্বনি বেরিয়ে এলো।
বইটা খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে বিছানায় এলো সে। উপুড় হয়ে বালিশ আকড়ে ধরে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। রাস্তায় যত প্রাণী দেখেছে সবাই ঘুমে, যে যার স্থানে। এটা সম্পর্কে সে বইয়ে পড়েছে, এই অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন করে ফেলা সুর সম্পর্কে। আরও কত কিছুই তো পড়েছিলো, কিন্তু কেন পড়েছিলো? কি প্রয়োজন পড়েছিলো তার?
বেশি ভাবতে পারলোনা মীর, ঘুম যেন তাকেও ঠেসে ধরতে চাইছে বিছানায়। চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়ে অচিরেই তাকে ঘুমের দেশে ঠেলে নিয়ে গেলো আনাবিয়ার ফেলে রেখে যাওয়া জাদুকরী সুর।
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি কিছু খুঁজছেন?”
অ্যাশটনের গলা শুনে মীর ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকালো অ্যাশটনের দিকে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে বিনীত ভঙ্গিতে৷ মীর আবার খোঁজায় মনোযোগ দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমার একটা ডায়েরি ছিলো, কালো মলাটের। সেটা খুঁজে পাচ্ছিনা।”
“অনুমতি দিলে আমি খুঁজে দেখবো?”
মীর ওকে ভেতরে আসতে ইশারা করলো। অ্যাশটন বুকশেলফের কাছে এগিয়ে গেলে মীর আবার টেবিলের কাছে এলো, এতগুলো ডায়েরির ভেতর কালো মলাটের ডায়েরিটা নেই৷ নিজেও খুঁজতে লেগে পড়লো ডায়েরিটা। বাবা দিয়েছিলো তাকে, তার সিংহাসনে আরোহন উপলক্ষে।
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ডায়েরিতে কোনো বিশেষ চিহ্ন বা নাম লেখা ছিলো?”
“হ্যাঁ, লেখা ছিলো……”
মীর থেমে গেলো। তার স্পষ্ট মনে আছে সে ডায়েরিতে প্রতিনিয়ত লিখতো, কিন্তু কি লিখতো? তাতে কারো নামও ছিলো, সেটা মীরের নিজের নয়। অন্য কারো। কিন্তু কার নাম? অন্য কারো নাম সে কেন লিখেছিলো? মায়ের নাম লিখেছিলো? কিন্তু মায়ের নাম সে কেন লিখবে?
মনে করতে পারলোনা মীর, হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
“স্মরণে আসছে না, মলাট কালো ছিলো এতটুকু ইনফোই ইনাফ। কালো মলাটের আমার একটাই ডায়েরি, দ্রুত খুঁজে বের করো।”
মীরের কন্ঠে বিরক্তির ছাপ পেয়ে অ্যাশটন দ্রুত হাত চালালো, কিন্তু হাজার খোঁজাখুজি করেও ডায়েরির টিকি পাত্তা পেলোনা।
মুনহল্যো ম্যানরের বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে আছে আনাবিয়া, কোলে তার একটা কালো মলাটের ডায়েরি। সকালের মিষ্টি রোদ এসে লাগছে তার গায়ে, পড়ছে কোলের ওপর। রোদের স্পর্শে উজ্জ্বল হয়ে আছে ডায়েরির ওপর মীরের হস্তাক্ষরে লেখা একটি নাম,— “SHINZO”
আনাবিয়া ডায়েরিটা মেলে ধরলো, ঠিক পৃষ্টা নম্বর সেভেন্টি সেভেন এ। বিগত বছর গুলোতে হয়তো হাজার বার পড়ে শেষ করেছে সে ডায়েরিটা। তাকে উদ্দ্যেশ্যে করে লেখা মীরের প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি কথা হৃদয়ে, মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে আনাবিয়ার। তবুও পড়ে শেষ হয়না তার, তৃপ্তি মেলেনা!
আনাবিয়া চোখ বুলালো ডায়েরির সাতাত্তর নম্বর পৃষ্ঠাতে, যেখানে মীরের লম্বাটে হস্তাক্ষরে কাটাকাটা করে লেখা, —
“আমার প্রাণ, আমার শিনজো,
আমি যখন এই কথাগুলো লিখছি তখন তুমি কি করছো জানো? তুমি ঘুমোচ্ছো। তোমার এক পা বিছানা থেকে নেমে মেঝে ছুয়েছে। পোশাক গুলোও মেঝেতে, এলোমেলো রেশমী চাদরের একাংশ ঢেকে আছে তোমার বুক হতে উরু পর্যন্ত। চুলে আজ বেনী করোনি…. আমি সময় দেইনি।
তোমাকে এখন ঘুমন্ত অপ্সরার ন্যায় দেখাচ্ছে শিনজো, মন চাইছে সব কাজ ফেলে তোমাকে জড়িয়ে রাখি, আদরে আদরে তোমাকে বেসামাল করে দিই! কিন্তু আজ তুমি অনেক ক্লান্ত, তোমার ঘুম প্রয়োজন।
আজ তোমার বার্থডে ছিলো, অথচ আজ সারাদিন ধরে তোমাকে দিয়ে আমি সোর্ড ফাইট প্রাকটিস করিয়েছি। মন খারাপ করেছো নিশ্চই?
কিন্তু জানো, তোমার দিকে তাকিয়ে আজ আমার বুক ভরে গেছে এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে। তুমি হয়তো ভাবছো, আমি হঠাৎ কেন তোমাকে এত কিছু শেখাতে উঠে পড়ে লেগেছি, কেন এত পরিশ্রম করাচ্ছি? কেন রান্নার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কৌশল থেকে শুরু করে আত্মরক্ষার সকল ধাপ খুটিয়ে খুটিয়ে শেখাচ্ছি?
কারণ আমি আমার প্রাণকে শক্তিশালী দেখতে চাই, স্বনির্ভর দেখতে চাই। আমি চাই, আমার অনুপস্থিতিতে আমার প্রাণের মুখে যেন একফোঁটাও দুশ্চিন্তার ছায়া না পড়ে। সে যেন কখনো অসহায়, একা অনুভব না করে। আমি চাই না আমার শিনজোকে কখনো কারো সাহায্যের অপেক্ষায় থাকতে হোক!
প্রথম যেদিন তোমার হাতে ধরে রুটি বেলা শিখিয়েছিলাম তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল না তোমাকে ভালো রান্না শেখানোর। আমি চেয়েছি তুমি জানো যে, তোমার ক্ষুধা নিবারণের ক্ষমতা তোমার নিজের হাতেই আছে, অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই।
মনে আছে, প্রথম দিকে তুমি চুলার আগুন দেখলেই ভয় পেতে? আগুনের উত্তাপে চমকে গিয়ে আমার পেছনে এসে লুকিয়ে পড়তে? আজ সেই তুমি কত সহজে, কত দক্ষতায় দারুণ দারুণ রান্না করো। রেসিপি গুলো হয়তো আমার শেখানো, কিন্তু তোমার হাতের ছোয়াতেই সেগুলো প্রাণ পায়, শতগুন সুস্বাদু হয়ে ধরা দেয়। তোমার হাতের খাবারে যে তৃপ্তি মেলে তা আমি কখনো কোথাও পাইনি শিনজো!
আর কেন এত আত্মরক্ষার আয়োজন, প্রশ্ন তোমার নিশ্চই?
এই পৃথিবীটা সবসময় আমাদের প্রতি সদয় হয় না প্রাণ আমার! আমি জানি তুমি সাহসী, ক্ষমতাবান, অদম্য শক্তিধর। আমি যতদিন জীবিত থাকবো, তোমার শরীর স্পর্শ করবে এমন সাহস কারো নেই।
তবুও আমি চাই না তুমি কখনো ভয় পাও। আমি চাই, তুমি জানো তোমার নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব তুমি নিজেই নিতে পারো। আমার হাত না ধরেও তুমি দৃঢ় পায়ে দাঁড়াতে পারো।
জানোতো, লোকে বলে স্ত্রী অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু তুমি আমার অর্ধেক নও শিনজো, তুমি আমার সম্পুর্ণতা। তুমি শুধু আমার স্ত্রী বা প্রেমিকা নও, তুমি আমার সহচরী, আমার একমাত্র আত্মার আত্মীয়, আমার একান্ত আপন।
জীবনের পথ সর্বদা সরল থাকে না প্রাণ আমার! হয়তো কখনও এমন সময় আসবে যখন আমি তোমার পাশে থাকতে পারবো না। বা হতে পারে, তোমার পাশে থাকার জন্য আমি এ পৃথিবীতেই রবোনা। জগতের নিষ্ঠুর নিয়মে আমাকে অসীমের দিকে পাড়ি জমাতে হবে।
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮
এই চিন্তাই যে আমাকে সবসময় পীড়া দেয় প্রাণ আমার! তাই চেয়েছি আমার শিনজো যেন প্রতিটা পরিস্থিতি সামাল দিতে শিখে, দৃঢ়, নির্ভীক থাকে। আমার অনুপস্থিতিতেও সে জানুক আমি তার সাথে আছি, তার সাহসে মিশে আছি। সে নিরাপদ নয়, একা চলতে সক্ষম নয় এই ভাবনা যেন কখনোই তার হৃদয়ে জন্ম না নেয়!
আমার প্রাণের প্রতি এ আমার প্রতিশ্রুতি, এই নামীর আসওয়াদ দেমিয়ানের অনুপস্থিতিতেও যেন তার প্রাণ সূর্যের মতোন তার নিজস্ব আলোয় উজ্জ্বল থাকে।
নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান
২৩/০৪/১৯৮৮ ”
