বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫১
রানী আমিনা
ইলহানের রক্ষীরা আনাবিয়াকে প্রতিহত করতে শিরো মিদোরির বিভিন্ন স্থানে অপেক্ষায় ছিলো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নজর রেখেছিলো কিছু গোপন রাস্তায়। ইযানের ধারণা অনুযায়ী শেহজাদী সেসব গোপন রাস্তা গুলো দিয়েই শিরো মিদোরিতে প্রবেশ করবেন।
কিন্তু সকলের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো যখন আনাবিয়া কোনো লুকোচুরি ব্যাতিত নির্ভয়ে এগিয়ে আসতে রইলো সমুদ্র বেয়ে। পা জোড়া স্থীর সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর, পায়ের নিচে সাঁতরে চলেছে এক বিশাল জলজ প্রাণী— তার পিঠের ওপর ভর করেই এগিয়ে আসছে আনাবিয়া। ধীর গতিতে প্রাণীটি ভেসে চলেছে জলের বুকে, যেন শেহজাদী টাল সামলাতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে না যান৷
সমুদ্র পাড়ের ওদিকটা থিয়োডরদের দখলে। তাদের সাথে কয়েক প্লাটুন সৈন্য৷ ইযানের স্পষ্ট আদেশ, দেমিয়ান প্রাসাদের উদ্দ্যেশ্যে আক্রমণের জন্য কেউ এগোলে তাকে সাথে সাথেই নিশ্চিহ্ন করার। ইযানের সংকেত পাওয়া মাত্রই তারা পেছন থেকে ঝাপিয়ে পড়বে শত্রুপক্ষের আর্মিদের ওপর। পরিকল্পনা সাজানো, যেন বিজয় তাদেরই সুনিশ্চিত হয়। পেছনে থেকে আক্রমণ করা কাপুরুষোচিত, কিন্তু ক্ষমতার লড়াইয়ে সবই জায়েজ।
থিয়োডর অলসভাবে সমুদ্রের দিকে নজর রেখে একটি চিকন খড়ের পশ্চাৎভাগ চিবোচ্ছিলো। সেই মুহুর্তেই তার চোখ পড়লো সমুদ্র পৃষ্ঠ দিয়ে সফেদ চুল উড়িয়ে এগিয়ে আসা চোখ ধাধানো পরীতুল্য মেয়েটির ওপর।
ক্ষণিক মুগ্ধ, মনোযোগী দৃষ্টি দিয়ে দেখার পরেই চিনতে পারলো সে৷ ততক্ষণে আরও কাছাকাছি এগিয়ে এলো আনাবিয়া। থিয়োডর মুগ্ধতা কাটিয়ে দ্রুতই পেছন ফিরে ছুটে গিয়ে উত্তেজিত স্বরে সৈন্য দের মেজরকে বলল,
“সমুদ্র দিয়ে শেহজাদী আসছেন, এখন আমরা কি করবো?”
তার কথা শোনা মাত্রই সৈন্যরা দ্রুতই নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছুটে এলো সমুদ্র পাড়ে৷ কেউ একজন উত্তেজিত স্বরে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কাম সেরেছে! সমুদ্রে আমরা মরণফাঁদ বিছিয়েছিলাম শত্রুপক্ষের জন্য, যেন কোনো কারণে সমুদ্রে নামা মাত্রই তাদের সলিলসমাধি হয়। এখন স্বয়ং শেহজাদীই এদিকেই আসছেন, এখন কি হবে! তাঁর গায়ে আঁচড় পড়লে হিজ ম্যাজেস্টি আমাদের খুন করে ফেলবেন!”
তার কথা শেষ হতে না হতেই এলোমেলো ভাবে নড়ে উঠলো আনাবিয়ার পায়ের নিচে থাকা বিরাট সাদা কালো মিশেলের ওরকা টি। পানির তল হতে একের পর এক সরু তীক্ষ্ণ বুলেট এসে বিধলো তার শরীরে, মুহুর্তেই রক্তলাল হয়ে উঠলো সমুদ্রের পানি৷ ওরকা টি ছটফট করতে শুরু করলে আনাবিয়া লাফিয়ে নামলো পানিতে, বুলেট লাগার ঠিক আগ মুহুর্তে আঘাত করলো নিজের বক্ষে। মুহুর্তেই তার সমস্ত শরীর মুড়িয়ে নিলো সাদা আর সোনালী রঙের মিশেলের ধাতব আর্মর৷ একের পর এক বুলেট এসে ধাতব আর্মরে বাড়ি খেয়ে ছিটকে পড়লো এদিক সেদিকে।
আনাবিয়া ডুব দিলো পানিতে, আহত ওরকাটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো দূর সমুদ্রের দিকে। তারপর পানির তল দিয়েই সাঁতরে এগোলো সামনে। একের পর এক বুলেট এসে তখনো আঘাত করতে রইলো তার শরীরে। আনাবিয়া নিজের খোলা পেটের ওপর দু হাত দিয়ে আড়াল করে নিলো। বুলেটের গতিপথ দেখে নিয়ে সবেগে এগোলো সেদিকে। তীরের কাছাকাছি এগোনো মাত্রই তার চোখে পড়লো সেন্সর্ড মেশিনগান, সারি সারি বসিয়ে রাখা সমস্ত তীর জুড়ে। হান্ড্রেড মিটারের ভেতর কোনো অবয়ব ঠাহর করতে পারলেই শ্যুট করার সিস্টেম এই স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান গুলোর৷
আনাবিয়া তীব্র গুলিবর্ষণের ভেতরেই বিদ্যুৎ গতিতে গিয়ে ভেঙে গুড়িয়ে ফেলতে রইলো সমুদ্রের এধার হতে ও ধার পর্যন্ত বিস্তৃত মেশিনগান গুলো। একটি গুলি সবেগে স্পর্শ করে গেলো ওর কোমল পেটের উপরিতল, ছড়ে গেলো খানিকটা, গাঢ় তরল বেরিয়ে এলো সামান্য।
আনাবিয়া গুরুত্ব দিলোনা তাতে, সবগুলো মেশিনগান ধংস করে সমুদ্রের পানির ভেতর দিয়ে এক পাক ঘুরে এসে ঝড়ো বেগে পানি হতে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো শূন্যে। চোখ রাখলো সমুদ্রে তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্য গুলোর দিকে, থিয়োডর কেও চোখে পড়লো তার। তাদের বিস্মিত হতভম্ব দৃষ্টি আঁটকে রইলো আনাবিয়ার হীরকখন্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখ আর সুগঠিত দেহের ওপর৷
পরক্ষণে হুশ ফিরতেই চোখ নামিয়ে নিলো সকলে, থিয়োডর তখনো লোলুপ, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আনাবিয়ার উন্মুক্ত পেটের দিকে৷ সৈন্য দের কেউ একজন ঘাড় ধরে দৃষ্টি নত করে দিলো তার, চিবিয়ে বলে উঠলো,
“মরার শখ জেগেছে নাকি?”
আনাবিয়া নেমে এলো সমুদ্র তীরে। নিজের সাধারণ অবস্থায় ফিরে এসে এগোলো রেড জোনের উদ্দ্যেশ্যে। সৈন্য রা সাথে সাথেই আটকালো পথ, অস্ত্র হাতে দ্রুত এগিয়ে এলো তারা। মেজর নত চোখে, ভারী গলায় বলে উঠলো,
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি আপনার শিরো মিদোরিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি শিরো মিদোরিতে প্রবেশ করতে পারবেন না।”
আনাবিয়া পাত্তা দিলোনা তাকে, এগোতে রইলো সামনের দিকে৷ পিছিয়ে গেলো সৈন্যরা, মেজর ইশারায় অস্ত্র তাক করতে বলল সবাইকে। সঙ্গে সঙ্গেই সকলে অস্ত্র তুলে নিশানা করলো আনাবিয়ার দিকে। মেজর বিনীত ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, আপনি আদেশ অমান্য করলে আমরা আপনার ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করতে বাধ্য হবো। প্লিজ কোওপারেট উইদ আস।”
আনাবিয়া দাঁড়ালো। মেজরের দিকে তাকিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলে উঠলো,
“তাই নাকি? করো দেখি!”
মেজর দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। শেহজাদীর গায়ে আঁচড় পড়লে হিজ ম্যাজেস্টি আস্ত রাখবেন না কাউকে, তবে তাঁকে কিভাবে ঠেকানো যায়? তাঁকে কি বল প্রয়োগ করে আটকানো যায়? নাকি তিনি কারো কথা শুনবেন?
মেজরকে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনাবিয়া শক্ত মুখে এগিয়ে এলো তার দিকে। মেজর ঢোক গিলে পিছিয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গে৷ থিয়োডর সবার পেছন থেকে লুকিয়ে দেখতে রইলো আনাবিয়াকে। বহুবছর পর তার ভেতরের লোলুপ সত্তা আজ যেন জেগে উঠেছে, মন চাইছে সেই ছোট ছোট মেয়েগুলোর মতোন করে এই অত্যন্ত সুন্দরী মেয়েটাকে দিয়ে নিজের নৃশংস জৈবিক তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতে।
আনাবিয়ার শাণিত দৃষ্টি মেজরের ওপর থেকে সরে গিয়ে তৎক্ষনাৎ পড়লো থিয়োডরের ওপর। থিয়োডর চমকে উঠলো। অতদূর থেকে আনাবিয়া কিভাবে ঠিক তার ওপরেই চোখ রাখলো বুঝতে পারলোনা সে, কিন্তু চোখ জোড়া যেন ভেতর পড়ে ফেলার মতো। আনাবিয়া কি কোনো ভাবে তার ভেতরের পশু সত্তার নিকৃষ্ট আকাঙ্খা টের পেয়ে গেলো?
আনাবিয়া মেজরের দিকে আরেকবার দৃষ্টি দিয়ে পরক্ষণেই এগিয়ে চলল রেড জোনের দিকে৷ সৈন্যরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো তার যাওয়ার পানে চেয়ে।
আলফাদের ভয়ানক, বিশাল শরীর পেঁচিয়ে রেখেছে কয়েকজন সৈন্যকে, তাদের হাড় ভাঙার মট মট শব্দ বাইরে থেকেই স্পষ্ট কর্ণগোচর হচ্ছে। মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে জেনেই তাদের ছেড়ে দিয়ে হিংস্র ভঙ্গিমায় সবেগে সামনে এগিয়ে চলল সে। পেছনে তার গোত্রের সমস্ত পাইথন ছুটে চলেছে তাকে অনুসরণ করে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বুলেট এসে বিধেছে আলফাদের শরীরে, কিন্তু জুৎ করতে পারেনি। তার ঝড়ো গতির দেহের ওপর বুলেটের নিশানা টানা দূরুহ।
ওকামির নেতৃত্বে বিশাল শরীরের নেকড়ে গুলো নিজেদের ধারালো দাঁতের দৃঢ় কামড়ে ছিন্ন ভিন্ন করে চলেছে সৈন্যদের শরীর, রক্তের বন্যা বইয়ে চলেছে তারা। লিও, কাঞ্জি আর জোভির গোত্রের পশু গুলো সৈন্যদের গলার নলি লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে, একে একে সকলের শ্বাস নালি কামড়ে ছিড়ে নিয়ে রক্ত মাখা মুখে এগিয়ে চলেছে ফটকের দিকে।
হায়েনা গুলোর নৃশংস হাসির শব্দে রণক্ষেত্র এক অদ্ভুত জগতে গিয়ে পৌছেছে, ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, নাড়িভুঁড়ি মুখে নিয়ে এদিক ওদিক ছুটে চলেছে তারা।
আকাশে ডানা মেলে বজ্র গতিতে উড়ে চলেছে রেড জোনের বাজ পাখি গুলো, একে অপরের সাথে তথ্য আদান প্রদান করে সকলকে জানিয়ে দিচ্ছে যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি। যুদ্ধ ক্ষেত্রের এক পাশে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘাপটি মেরে বসে আছে সল্ট ওয়াটার ক্রোকোডাইল, কোকোর আদেশ পাওয়া মাত্রই যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়বে তারা৷ কেউ কেউ এগিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে শত্রুপক্ষের কাউকে হঠাৎ হ্যাচকা টেনে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পরছে সন্তর্পণে। সৈন্যদের আর্তনাদ পৌছচ্ছে না অন্যদের কান পর্যন্ত, তার পুর্বেই হারাচ্ছে প্রাণ।
কিন্তু শত্রুপক্ষের মেশিনগানের তীব্র গুলিবর্ষণের সামনে টিকে থাকা কষ্টকর! অনেকেই ইতোমধ্যে লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে, কেউ কেউ হারিয়েছে অঙ্গ, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে কারো দেহ। পশুরা যুদ্ধের সাথে সাথে প্রোটেক্ট করে চলেছে তাদের কমান্ডার দের৷
অস্ত্রহীন, বর্মহীন পশুগুলো ক্ষণে ক্ষণেই কামানের গোলার তীব্র বর্ষণের কারণে বাধ্য হচ্ছে পিছিয়ে যেতে। শুধুই শরীরের জোর আর হিংস্রতা দিয়ে যে বুলেটের সামনে টিকে থাকা যায় না! অস্ত্রাগার পর্যন্ত পৌছানোর সুযোগটুকু পর্যন্ত পাচ্ছে না তারা৷
আনাবিয়া পৌছুলো লাইফট্রির নিকট। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে নিবিড় চোখে পর্যবেক্ষণ করলো লাইফট্রিকে। তার উপস্থিতিতে ধীরে ধীরে নড়ে উঠলো লাইফট্রি, আকাশের দিকে মেলে ধরলো নিজের ডালপালা। আজ যেন আনাবিয়াকে কোনো কমান্ড করার প্রয়োজন হলোনা, লাইফ ট্রি কোনো বাক্য ছাড়াই বুঝে গেলো আনাবিয়ার চাওয়া।
আনাবিয়া এগিয়ে গেলো, সাপের মতোন একে বেঁকে যাওয়া প্রশস্ত, বিস্তৃত শেকড়ের আসনে গিয়ে বসলো, পিঠ ঠেকিয়ে দিলো লাইফট্রির গায়ে। তৎক্ষনাৎ লাইফট্রি নিজের নরম ডালপালা দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো তাকে।
মুহুর্তেই আনাবিয়ার চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো, তীব্র স্বর্ণাভ আলো ছড়াতে শুরু করলো তারা। সফেদ চুল গুলো লাইফট্রির শরীরের বাকল বেঁয়ে সেঁটে রইলো টান টান হয়ে। সম্মুখে একটি বিরাট স্বচ্ছ স্ক্রিন ভেসে উঠলো মুহুর্তেই, সেখানে সম্পুর্ন যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র দৃষ্টিগোচর হলো আনাবিয়ার।
আনাবিয়া চোখ বন্ধ করলো, বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করলো কোনো কমান্ড। মুহুর্তেই লাইফট্রির শরীরের বাকল চিরে বেরিয়ে আসতে রইলো তীব্র স্বর্ণালি আলো।
আনাবিয়া ঝট করে চোখ মেললো তখনি, মৃদু স্বরে বলে উঠলো,
“কোড, জিরো ফো’ জিরো টু….”
যুদ্ধেক্ষেত্রে প্রাণপণে লড়াই করতে থাকা বাচ্চা গুলো চমকে উঠলো হঠাৎ, রেড জোনের সকল প্রাণী শুনতে পেলো তাদের শেহজাদীর কন্ঠস্বর৷ একে অপরের দিকে দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কি হচ্ছে এই মুহুর্তে! আনাবিয়া আবারও বলে উঠলো,
“কোড, জিরো ফো’ জিরো টু…. ”
বারংবার একই সংখ্যা রিপিট করতে শুরু করলো সে। বাচ্চারা কি করবে, কি বলবে বুঝে উঠতে পারলোনা৷ সেই মুহুর্তেই ফ্যালকন লিসনিং ডিভাইসের মাধ্যমে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো,
“শেহজাদী আমাদের লিসনিং ডিভাইসে লাইফট্রির একটি অংশ সেট করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন সেটা স্পর্শ করলেই উইন্ড স্ক্রিণে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্পুর্ন চিত্র ভেসে উঠবে। সবাই দ্রুত সেটা টাচ করো। স্ক্রিণ ভেসে উঠলে দেখবে নিচের দিকে ক্যি প্যাডের অপশন আছে, সেখানে শেহজাদীর বলা কোড টাইপ করে সেন্ড করো। ফাস্ট ফাস্ট!”
বাচ্চারা সকলে তড়িঘড়ি ফ্যালকনের কথা মতো কাজ শুরু করলো, আনাবিয়া তখনো একই সংখ্যা রিপিট করে চলেছে বারংবার, ক্রমে ক্রমে উগ্র হয়ে উঠছে তার কন্ঠস্বর৷ ফ্যালকন তাড়া দিয়ে দ্রুত কোড বসাতে বলল সবাইকে৷ বাচ্চারা ক্যি প্যাড চেপে দ্রুত হাতে কোড বসিয়ে সেন্ড করতেই থেমে গেলো আনাবিয়ার উগ্র স্বর।
কিন্তু তার পরমুহূর্তেই এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ কানে বাজলো সকলের। ভোতা, অথচ প্রচন্ড জ্বালাময়ী! কোকো দুহাতে কান চেপে বসে পড়লো তৎক্ষনাৎ। চাপা আর্তনাদ ভেসে এলো সকলের মুখ থেকে! কপালের দুপাশে যেন পেরেক ঠুকরালো কেউ ওদের!
ক্ষণিক তীব্র যন্ত্রণার পর হঠাৎ স্থীর হয়ে গেলো বাচ্চা গুলো, অসাড় হয়ে এলো তাদের শরীর। বাকি প্রানীরা সমানে যুদ্ধ করতে রইলো, সেই সাথে সুরক্ষা দিয়ে চলল তাদের কমান্ডার দের। প্রাণপণে শত্রুপক্ষের সাথে লড়তে লড়তে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইলো যুদ্ধক্ষেত্রে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা গুলোকে!
কিছু মুহুর্ত বাদেই যুদ্ধক্ষেত্রের এক এক কোণে স্থীর দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাগুলোর হুশ ফিরলো, মেললো বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ। ওরা নড়ে উঠতেই আশেপাশে থাকা প্রাণীগুলো ফিরে তাকালো তাদের দিকে, তাকিয়েই ভড়কালো!
জান্তব শরীরের শিরা-উপশিরা গুলো যেন ফেটে পড়তে চাইছে, চোখ গুলো তাদের ভয়ানক লাল, উজ্জ্বল! তীক্ষ্ণ দাঁত গুলো প্রচন্ড ধারালো, মুখভঙ্গিমায় ভয়াবহ হিংস্রতা! ক্ষুধার্ত শিকারির ন্যায় উগ্র, ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তারা এগোলো সম্মুখে। তাদের চাপা, রক্তপিপাসু, ক্রুর গর্জনে হাড় হিম হওয়ার উপক্রম হলো আশেপাশের প্রাণীগুলোর, অবাক চোখে তারা দেখতে রইলো তাদেরই এত বছরের পরিচিত কমান্ডারদের!
ওদেরকে হঠাৎ এমন ভয়ানক মূর্তিতে দেখে ঘাবড়ে গেলো শত্রুপক্ষের সৈন্যরা, আতঙ্কে দ্রুতই ওদের লক্ষ্য করে শুরু করলো গুলি ছোড়া। কিন্তু বুলেট ওদের শরীরের চামড়া ভেদ করার পূর্বেই এক অদৃশ্য বলয়ে গিয়ে বাড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো মাটিতে।
ঝুরঝুর ধাতব শব্দে একের পর এক বুলেট মাটিতে পড়তে দেখে বন্দুকধারী সৈন্যগুলো আতঙ্কিত হয়ে ভয়াল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। কিন্তু বাচ্চাদের কোনো হেলদোল বলো না তাতে, ধীর হিংস্র পায়ে এগিয়ে চলল তারা। তাদের লক্ষ্য স্থীর, কোনো কিছুই তাদেরকে আজ শিকার হতে বিমুখ করতে সক্ষম হবে না!
লম্বা লম্বা পা ফেলে, চাপা গরগরে আওয়াজ করতে করতে এগিয়ে গেলো তারা, পরমুহূর্তেই ঝাপিয়ে পড়লো শত্রুপক্ষের সৈন্যদের ওপর। নিমেষেই ভয়াবহ নিষ্ঠুর মৃত্যু নেমে এলো যুদ্ধক্ষেত্রে! শক্ত থাবার ধারালো নখর, ক্ষুরধার দাঁতের খাবলে দ্বিখণ্ডিত হলো তাদের শরীর!
কারো চোখ উপড়ালো, কারো বেরিয়ে এলো হৃৎপিণ্ড, কারো বুকের খাচা আলাদা হয়ে এলো শরীর থেকে, কারো ক্ষতবিক্ষত পেট হতে পাকস্থলী, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়ে রইলো মাটির ওপর। তাদের ছিন্নভিন্ন দেহের ওপর পাড়া দিয়ে এগিয়ে চলল যুদ্ধ!
কোকো নিজের হিউম্যান ফর্মেই ছিলো, উলম্ব লেন্স বিশিষ্ট ধুসর চোখজোড়া তার ধারণ করেছে গাঢ় সবুজাভ কালো রঙ। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ন্যায় পরিধানের ফর্মাল কোট খুলে ফেললো সে, শার্ট খুলে ছুড়ে দিলো কোথাও। দু হাতে তুলে নিলো দুটি মেশিনগান, তারপর অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলল রণাঙ্গনের দিকে। তার ভয়ানক মূর্তি দেখে অধস্তন দের কেউ সাহস করলো না যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে মানা করার…!
ফটক থেকে সৈন্যরা সরে গেছে, সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য সংকট। রেড জোনের প্রাণীরা হঠাৎ হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর, হিংস্র। সৈন্যরা আহত হওয়ার সুযোগটুকু পাচ্ছে না, সরাসরি মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, নৃশংস মৃত্যু!
ফটক পাহারায় কয়েক প্লাটুন সৈন্য, হাতে শক্ত করে ধরে আছে অস্ত্র। আতঙ্কিত, সতর্ক চোখে তাকিয়ে চতুর্দিকে। কখন না জানি শত্রুপক্ষের আক্রমণ নেমে আসে তাদের ওপর!
ঠিক সেই মুহুর্তেই দুটি ভয়াবহ মূর্তির দেখা মিললো তাদের। কাঞ্জির হাতে মেশিনগান, লিওর হাতে সোর্ড। দুজন এগিয়ে আসছে সমান্তরালে। সৈন্যরা তাদের দেখা মাত্রই হতচকিত হয়ে বন্দুক তাক করলো, কিন্তু ট্রিগার চাপার আগেই বজ্র নিনাদের তুমুল গর্জনের মতো গর্জালো কাঞ্জির হাতের মেশিনগান।
বিদ্যুৎ গতিতে বুলেটের ফোয়ারা বয়ে গেলো সেখানে। একের পর এক ঝরে পড়লো শত্রুপক্ষের সৈন্যরা, কয়েক দল পিছিয়ে বাঁচলো, নিজেদের আড়াল করে নিলো শিল্ডের পেছনে।
কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। বুলেটের ঝড় শেষ হতে না হতেই যমের মতোন এসে হাজির হলো লিও। বিদ্যুৎ বেগে ছুটে গিয়ে হাতের ধারালো সোর্ড দিয়ে পিছিয়ে পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া সৈন্যদের একাংশকে মুহুর্তেই খন্ড খন্ড করে ফেললো, তাদের দেহের রক্তাক্ত খন্ডাংশ আছড়ে পড়লো মাটিতে।
সবাইকে খতম করে দুজন দৃষ্টি বিনিময় করে এগোলো ফটকের দিকে, ফটকের ওপাশে শোনা যাচ্ছে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের আসন্ন আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতির শব্দ। একে অপরের সাথে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কথা বলতে ব্যাস্ত তারা৷
লিও কাঞ্জি এসে দাঁড়ালো ফটকের সম্মুখে, দুজন দুজনের দিকে তাকালো একবার, পরমুহূর্তেই চলে এলো নিজেদের জান্তব আকৃতিতে। বিশাল ধাতব ফটকের গায়ে একের পর এক প্রবল আঘাত হানতে হানতে দুর্বল করে ফেললো শক্ত গাথুনি। ওদের পর্বতপ্রমাণ শরীরের দানবীয় শক্তির সামনে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে উঠলো ফটকটির। অন্যপাশে সৈন্যরা প্রাণপণে ঠেসে ধরে রইলো ফটক, যেন শত্রুপক্ষ কোনো ভাবেই ফটক ভেঙে প্রাসাদে প্রবেশ করতে সক্ষম না হয়!
কিন্তু লিও কাঞ্জি হার মানতে নারাজ, একবার ব্যর্থ হলে দ্বিতীয়বার দ্বিগুণ শক্তিতে আঘাত করতে ছুটে চলেছে দুজনে। শেষ বার দুজনেই পিছিয়ে গিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে এলো ফটকের দিকে, দুর্বার বেগে ফটকে আঘাত করতেই ভেঙে গেলো ফটকের ওপাশের তালা, সিংহদ্বারের একাংশ ভেঙে সৈন্যদেরকে নিয়ে ছিটকে পড়লো দূরে!
লিও কাঞ্জি তৎক্ষনাৎ ফিরে এলো নিজেদের হিউম্যান ফর্মে, হাতে আবারও তুলে নিলো অস্ত্র। তারপর ফটকের ভেতর থেকে ছুটে আসতে থাকা শত শত সৈন্যের ভেতর দিয়ে বুলেটের তীব্র শব্দ আর তলোয়ারের ধাতব খচ খচ শব্দ তুলে এগিয়ে চলল রাস্তা তৈরি করতে করতে।
সেই মুহুর্তেই দৃষ্টি গোচর হলো মীরের দীর্ঘাবয়ব! পরণে তারা বরাবরের মতোই একটি পাতলা সাদা শার্ট, বোতাম গুলো খোলা, শীতল বাতাসে শার্টের নিম্নাংশ উড়ে চলেছে দুদিকে। দৃশ্য মান হয়ে আছে তার শক্তপোক্ত, পেশীবহুল শ্যামবরণ উদর, বক্ষ।
ঠোঁটের ফাঁকে ধরা একটি ধূসর রঙা স্বাস্থ্যবান সিগারেট, সেটিকে হাতের সাহায্যে করে বাতাস থেকে আড়াল করে ঈগল-মস্তক আকৃতির লাইটার দ্বারা আগুন ধরানোর চেষ্টা করতে করতে লিও কাঞ্জির পরিষ্কার করে দেওয়া রক্তাক্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে নির্বিকার চিত্তে।
সিগারেটেটি সফল ভাবে জ্বালানো শেষ হতেই লাইটারের ধোঁয়া সরাতে দুইবার বাতাসে নাড়িয়ে ভরে রাখলো ট্রাউজারের পকেটে৷ ঘাড়ের ওপর দিয়ে বা হাত বাড়িয়ে পিঠের পেছন থেকে বের করলো নিজের অদৃশ্য আর্মরে থাকা একটি তলোয়ার, অপর হাতে বের করলো একটি কুড়াল সদৃশ অস্ত্র। প্রচন্ড তীক্ষ্ণ, অর্ধচন্দ্রাকৃতির ন্যায় মাথা বিশিষ্ট ধারালো চকচকে কুড়ালটি ডান হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলল সে সম্মুখে।
মাথা উঁচু করে ঘাড় বাকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে দেখলো লিও কাঞ্জির কাজ। দুজনে মিলে উন্মাদের মতো ছিন্ন ভিন্ন করে চলেছে প্রাসাদের সৈন্যদের। মীর ঠোঁটের কোণ বাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো। তারপর প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠে ডান দিকে ঘুরে এগোলো বেজমেন্টের উদ্দ্যেশ্যে।
বেজমেন্টে প্রবেশের দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে থাকা সৈন্যরা হঠাৎ তাকে দেখে ভড়কে গেলো। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গেলো মীরের সামনে। চোখে তাদের আতঙ্ক, দ্বিধা! একজন দেমিয়ান সদস্যের ওপর কিভাবে তারা হামলা করবে? তার ওপর তিনি যদি হন স্বয়ং বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান— সে চিন্তাই তাড়া করে চলেছে তাদের।
কিন্তু শপথ নিয়েছিলো যে! বাদশাহর জন্য প্রাণ দিয়ে দিবে, লড়বে যে কারো বিপক্ষে!
তৎক্ষনাৎ বুলেট ছুটলো মীরের দিকে একের পর এক। তুখোড় দক্ষতায় বা হাতের তলোয়ার বিদ্যুৎ গতিতে ঘুরিয়ে প্রতিটি বুলেট ঠেকিয়ে দিলো মীর, ধাতব শব্দে সেগুলো আছড়ে পড়লো মেঝেতে।
থমকালো সৈন্যরা, অবিশ্বাস্য চোখে একবার দেখলো মীরকে, ঠোঁট আলগা হয়ে এলো তাদের অবাকতায়।
ভীষণ মজা পেলো মীর, ঠোঁটে তার ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি। পরক্ষণেই কথা বলল তার ধারালো কুড়াল!
চোখের পলকে খচ খচ শব্দে খণ্ডবিখণ্ড করে দিলো সে সৈন্যগুলোর একাংশকে।
অন্যরা ছুটে পিছিয়ে গিয়ে ছুড়তে শুরু করলো বুলেট, মীরের শরীর পর্যন্ত পৌছালো না সেগুলো, তার পূর্বেই পতিত হলো নিচে৷ হাতের কুড়ালটা অদ্ভুত কৌশলে ঘুরিয়ে নিয়ে চলল আঙুলের ওপর, কেউ একজন সামনে পড়তেই সবেগে কোপ বসিয়ে দিলো তার মাথার মধ্যিখান বরাবর। মুহূর্তেই কুড়ালটি তার শিরোস্ত্রাণে আবৃত মাথা ভেদ করে ফাড়তে ফাড়তে পৌঁছলো বুকের মধ্যিখান পর্যন্ত। রক্তের সাথে সাথে ছিটকে পড়লো মগজের টুকরো টুকরো থকথকে অংশ। শক্ত খুলির কুচো অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো মেঝেতে।
পরক্ষণেই কুড়ালটি হ্যাচকা টানে বের করে শূন্যে ছুড়ে ঘুরিয়ে ধরলো আবার, মুহুর্তেই সেটা দিয়ে সবেগে কোপ দিলো কারো গলা বরাবর। সৈন্যটির মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে ছিটকে চলে গেলো কোনো একদিকে, মস্তকহীন স্তব্ধ দেহ তখনো দাঁড়িয়ে সটান!
একহাতে তলোয়ার দিয়ে বুলেট ঠেকাতে ঠেকাতে অন্য হাতে কুড়াল চালাতে চালাতে এগোলো সে বেজমেন্টের দিকে। বেজমেন্টে পর্যন্ত পৌছানোর আগেই তার হাতে মরণ হলো সকলের। সাদা শার্ট রক্তের ছিটেয় ধারণ করলো গাঢ় লাল বর্ণ!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫০
রক্তমাখা হাত রাখলো সে বেজমেন্টের দরজার ওপর। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ হতেই যান্ত্রিক শব্দে খুলে গেলো দরজা।
সিগারেটটি শেষ হয়ে গেছে। সেটা ফেলে দিয়ে আরেকটা ধরাতে গেলো সে, পরক্ষণেই সিগারেটটি ঠোঁট থেকে নামিয়ে পকেটে ভরে রাখতে রাখতে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“উহুম, বড় ভাইয়ের সন্তানসম্ভবা খাস বাদীর সহিত প্রথম এবং শেষ সাক্ষাতে ভদ্রতা বজায় রাখা উচিত।”
শব্দ করে কৌতুকপূর্ণ হাসলো সে। তারপর কুড়ালটি ডান হাতে তুলে ঘোরাতে ঘোরাতে নামলো বেজমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে৷
