বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯
রানী আমিনা
সেই সফেদ চুলের মেয়েটি…..!
হাতে ধরা একটি ব্লাক মাম্বা স্নেইক, অপ্সরার ন্যায় অপরূপ মুখশ্রীতে তার বিশ্বজয়ীর হাসি।
ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে মীর, শুধুই একটি ট্রাউজার পরণে তার। মুখখানা বড্ড বেজার, হিংসাত্মক দৃষ্টি তার শুভ্র মেয়েটির হাতে ধরা কৃষ্ণবর্ণের সর্পের দিকে, যেন পারলে কাঁচা চিবিয়ে খায়!
ছবিটি এই ডাস্কমায়ারেই তোলা। অন্য কেউ ও যে ছিলো তাদের সাথে! কিন্তু কে ছিলো? তার চেয়ে বড় কথা সে এই মেয়েটার সাথে কি করছে? এই মেয়েটা তার এত কাছাকাছি কেন? আরেকটু এগোলেই যে মেয়েটির মস্তক তার উন্মুক্ত বক্ষ স্পর্শ করতো!
কিন্তু তার এসব কিছুই স্মরণে নেই কেন? এই মেয়েটার সাথে সে ডাস্কমায়ারে কবে এসেছিলো? কেন এসেছিলো? ওই মেয়েটিকে তো সে রামাদি সামার জঙ্গলেই প্রথম বারের মতোন দেখেছিলো! শুকতারার মতন জ্বলজ্বল করছিলো সে জঙ্গলের ভেতর। মেয়েটির কাছাকাছি গিয়ে বুকের ভেতর তার কোনো এক অজানা কারণে ঝড় বয়ে যাচ্ছিলো, হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেছিলো হঠাৎ।
কেন? কি কারণ ছিলো তার?
ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্নরা হানা দিলো মীরের মস্তিষ্কে, এই বদ্ধ ঘরে দম নেওয়া কষ্টকর হয়ে উঠলো তার জন্য। পরক্ষণেই ঝড়ের গতিতে সে বেরিয়ে গেলো বাইরে, উচ্চস্বরে দুবার ডেকে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“লিও, লিও!”
লিও আর কাঞ্জি পাশের কামরাতেই ছিলো। সবেমাত্র চোখ লেগে এসেছিলো লিওর৷ মীরের কর্কশ কন্ঠে নিজের নাম শোনা মাত্রই তড়াক করে উঠে পড়লো সে, কাঞ্জি কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে ছিলো, মীরের গলা শুনে কম্বল টা চোখের ওপর থেকে সরিয়ে নাক পর্যন্ত নিয়ে এসে সে লিওকে জিজ্ঞেস করলো,
“কি পাপ করেছিস?”
“জানিনা ভাই, আমি শুনে আসি কি হয়েছে। তুই দুয়া করতে থাক।”
“পারবোনা, মরলে মরগা। লিন্ডাকে আর একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিবো।”
বলে ফের কম্বল মুড়ি দিয়ে আয়েশ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো কাঞ্জি। লিও মনে মনে একটা ভয়ানক গালি দিয়ে বিছানা ছেড়ে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে গেলো বাইরে। মীরের কামরার সামনে আসতেই ভেতর থেকে মীর বলে উঠলো,
“গাড়ি বের করো, আমরা বেরোবো।”
রাতের বারো বাজতে বেশি বাকি নেই। বাইরে বেশ ঠান্ডা। কিমালেবের পাহাড় সারির ওপর পুরু কুয়াশা জমেছে। ভরা পূর্ণিমার আলোয় সমুদ্রের ওপর জমা হওয়া কুয়াশা এক অদ্ভুত ভৌতিক আবহাওয়া তৈরি করেছে৷ যেন ক্ষণিক পরেই ওই কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে কোনো বিশালাকৃতির ক্রাকেন; নিজের আঠালো, থকথকে, শক্তিশালী হাত-পা গুলো দিয়ে আক্রমণ করে বসবে সমুদ্রে ভেসে চলা জাহাজ গুলোতে।
সেদিকে দেখতে দেখতে রাস্তা বয়ে হেটে চলেছে আনাবিয়া, পাশে গুটিগুটি পায়ে হেটে চলেছে ফক্সি। মধ্যরাতে বাইরে বেরোতে পেরে সে প্রচন্ড খুশি, নেচে নেচে সামনে এগোচ্ছে, আবার আনাবিয়ার কাছে ফিরছে। কোথাও কোনো ব্যাঙ লাফাতে দেখলে ছুটে গিয়ে সামনের দুপায়ে চেপে ধরে দাঁত দিয়ে টানাটানি করে তার জীবননাশ করছে। মাঝে মাঝে হুয়া হুয়া করে ডেকে উঠছে আনন্দে৷
আনাবিয়া ওর এমন নাচুনি দেখে মিটমিটিয়ে হাসছে। লায়রা আর ফ্যালকনকে রেখেই চলে এসেছে সে। ঘুমিয়েছে ওরা দুজনেই। আনাবিয়ার ঘুম ধরছেনা, অস্বস্তি হচ্ছে৷ বিছানায় ঘন্টা খানেক এপাশ ওপাশ করেও ঘুমোতে না পেরে উঠে এসেছে৷ কিন্তু ওকে বাইরে যেতে দেখে ফক্সিও ঘুম ভেঙে উঠে লাফাতে লাফাতে চলে এসেছে।
কিছুক্ষণ বাদেই নববর্ষ৷ দূর শহর থেকে ভেসে আসছে নারী পুরুষের হল্লা৷ সকলে নতুন বর্ষকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে৷ আনাবিয়া হাটতে হাটতে অনেক দূর চলে এসেছে প্রায়। সমুদ্রের ধার ঘেঁষে আন্ডারওয়াটার রোড গুলো চলে গেছে দুদিকে— একটি কুরো আহমার, অন্যটি শিরো মিদোরি।
আনাবিয়া দূর থেকে দেখলো টানেলের পাশাপাশি থাকা প্রবেশপথ দুটোকে, একবার মন চাইলো হাটতে হাটতে শিরো মিদোরিতে পৌছে যায়! বছর দুই হলো সে শিরো মিদোরিতে পা রাখেনি, লাইফট্রির কাছেও যায়নি৷ দুবছর ধরে লাইফট্রি তার ভেতরে জমা থাকা এনার্জির সাহায্যে ব্যাকআপ দিয়ে চলেছে সমস্ত পঞ্চদ্বীপকে, যা সে করে থাকে শেহজাদীদের অনুপস্থিতির সময়ে।
আনাবিয়া চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো সেদিকে, হাটতে হাটতে দুটি টানেলের একটির ভেতর দিয়ে এগোলো সামনে। কিছু দূর যাওয়ার পর দাঁড়িয়ে গেলো আবার। ফক্সি বেশ খানিক এগিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু পিছে আনাবিয়ার পায়ের শব্দ না পেয়ে ফিরে তাকিয়ে আনাবিয়াকে দূরে দেখে ছুটে আবার ফিরে এলো সে৷
আনাবিয়া তাকিয়ে রইলো সম্মুখে।
না, সে যাবেনা শিরো মিদোরিতে। আর কখনোই না! যা সে ফেলে এসেছে সেখানে আর কখনো যাবেনা, তাতে তার বুকে যত ক্ষত, যত জখমই হোক না কেন!
মীরের স্মৃতি তাকে যতই পীড়া দিক, বেহায়া চোখ জোড়া তাকে যতই দেখতে বায়না ধরুক, সে আর কখনোই তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেনা, কোনোদিনই না!
আবছা আলোয় ম্রিয়মাণ টানেলটি কিছুক্ষণ তৃষ্ণার্ত চোখে দেখে নিয়ে সে ফিরে আসতে রইলো আবার৷ হাটতে হাটতে টানেলের বাহিরে বেরোনোর ঠিক আগ মুহুর্তে কুরো আহমারে প্রবেশের টানেল হতে গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো তার কানে।
এই নিষিদ্ধ সময়ে কুরো আহমার থেকে কিসের লরি আসছে দেখতে টানেলের বাহিরে এসে পাশের টানেলের সামনে পা রাখতেই সজোরে এসে একটি কালো রঙা গাড়ি ধাক্কা দিলো আনাবিয়াকে, মুহুর্তেই রাস্তার ওপর ছিটকে আছড়ে পড়লো আনাবিয়া!
ফক্সি আতঙ্কিত হয়ে আনাবিয়ার কাছে দৌড়ে গিয়ে এদিক ওদিক ছুটে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি আরম্ভ করলো তৎক্ষনাৎ!
গাড়ি থামিয়ে ভেতর থেকে হকচকিয়ে বেরিয়ে এলো লিও। আনাবিয়াকে চিনতে দেরি হলো না ওর৷ ছুটে আনাবিয়ার কাছে গিয়ে সে দেখতে রইলো আনাবিয়া ঠিক আছে কিনা, চাপা স্বরে কয়েকবার ডাকলো,
“শেহজাদী, শেহজাদী!”
আনাবিয়ার কোনো সাড়াশব্দ এলোনা। চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে, মুখের কি অবস্থা দেখার উপায় নেই। লিও আনাবিয়াকে স্পর্শ করতে ইতস্তত বোধ করলো, বার বার আনাবিয়াকে ধরে উঠাতে গিয়েই হাত সরিয়ে নিয়ে এলো আবার।
তখুনি ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মীর, সশব্দে গাড়ির দরজা বন্ধ করে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? কে মরেছে?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহ্….. ম্-মানে… একটা মেয়ে। মারা যায়নি, বেঁচে আছে এখনো, কিন্তু কি অবস্থায় আছে বুঝতে পারছিনা৷”
আতঙ্কিত স্বরে বলল লিও।
মীর বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসতেই বুকের ভেতর আবারও সেই একই অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার, ঠিক যেমনটা হয়েছিলো রামাদি সামার সেনাঘাটিতে!
ব্যাপারটিকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে এসে আনাবিয়ার পাশে বসলো সে। সফেদ চুল দেখতেই ভ্রু কুচকে এলো তার। হাত দিয়ে মুখের ওপর থেকে সে সরিয়ে দিলো চুল, চাঁদের আলো এসে পড়লো আনাবিয়ার মুখের ওপর৷ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মীর তার দিকে! পরমুহূর্তেই দৃষ্টি কঠিন হয়ে এলো তার। সেই মেয়েটি, সফেদ চুলের মেয়েটি!
এই অলৌকিক, মোহনীয় সুন্দর মুখশ্রীর আড়ালের বিশ্বাসঘাতকতা সে ভুলেনি, আর না কখনো ভুলবে। কে সে? কি সম্পর্ক তার মীরের সাথে? এত সাহস কিভাবে তার? তার এত স্পর্ধা যে সে নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান এর হাত থেকে তারই শত্রুকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়!
এই অপরাধ সে কোনোদিন ক্ষমা করবে না৷ কিন্তু তার সাথে মেয়েটির ঠিক কি সম্পর্ক সেটা তাকে জানতেই হবে।
মীর আনাবিয়াকে ওভাবে রেখেই উঠে আসতে চাইলো, তখুনি দূর হতে কর্ণগোচর হলো রাত বারোটার ঘন্টা ধ্বনি। মুহুর্তেই বিকট শব্দে আতশবাজির বিরাট মেলায় আলোকিত হয়ে উঠলো আকাশ৷ সেই রঙিন আলোর মনোহর ঝলকনানিতে মীরের চোখে পড়লো আনাবিয়ার কানের পাশ দিয়ে ধীর গতিতে বয়ে চলা রক্তিম তরলের স্রোতে।
নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠলো মীর, হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠলো তার ধড়াস করে! তড়িঘড়ি হাতে আনাবিয়ার মাথাটা উঁচু করে ধরলো সামনে। মনোযোগী দৃষ্টি দিতেই দেখলো কপালের ওপর চুলের সংযোগ স্থলে একটি বিরাট ক্ষত। তা থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে রক্ত।
লিও অপরাধবোধে মুহ্যমান হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলো চুপচাপ, আনাবিয়াকে এই অবস্থায় দেখে তার চোখ ফেটে অশ্রু বের হওয়ার উপক্রম। হাত দিয়ে কোনো রকমে নিজের মুখ চেপে কান্না আঁটকানোর তীব্র চেষ্টা করতে রইলো সে।
মীর ব্যতিব্যস্ত হয়ে আনাবিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে লিওর উদ্দ্যেশ্যে ক্ষিপ্র স্বরে বলে উঠলো,
“লিও, এখুনি একে হসপিটালে নিতে হবে৷”
লিও কান্না আঁটকে ছুটে গেলো ড্রাইভিং সিটে। মীর আনাবিয়াকে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসেই কপালের ক্ষতের ওপর হাত চেপে ধরলো রক্ত বন্ধের প্রচেষ্টায়।
লিও ঝড়ের গতিতে চালিয়ে নিলো গাড়ি৷
বড় ছেলে জাভেদের সাথে জায়ান সাদি যখন কিমালেবের জেসিওন হাসপাতালে এলো তখন রাতের প্রায় দুটো। কাঁচা ঘুম থেকে উঠে পড়ায় চোখের নিচে ফোলা তার। জাভেদ পিউর জেন্টেলম্যান সেজে বাবার পিছে পিছে এলো সেখানে৷
এত রাতেও হাসপাতাল সম্পুর্ন জাগ্রত। স্বয়ং বাদশাহ এসে হাজির হওয়ায় জাগ্রত হাসপাতালের কেউ টু শব্দটি করছেনা। রোবটের মতোন চুপচাপ থেকে নিজেদের কাজ করে চলেছে। যেন কদমও ফেলছে মেপে মেপে! ডাক্তার নার্সরা নিঃশব্দে ছোটাছুটি করছে, সবার ভেতরেই ভীষণ রকম উদ্বেগ।
জায়ান রিসেপশনিস্ট এর থেকে জেনে নিয়ে সোজা উঠে গেলো হাসপাতালের চতুর্থ তলায়৷ সেখানে যেতেই চোখে পড়লো মীরকে, চোখে মুখে উৎকন্ঠা সাথে বিরক্তি নিয়ে ধীর পায়ে পায়চারি করে চলেছে সে করিডোর জুড়ে। লিও কেবিনের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ।
জায়ান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো মীরের সামনে। আনুগত্য জানিয়ে আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি এত রাতে হসপিটালে জরুরি তলব করলেন, কার কি হয়েছে? অবস্থা কি খুব গুরুতর?”
মীর কোনো উত্তর দিলোনা, ঘুরে অন্যদিকে পায়চারীতে ব্যাস্ত হয়ে গেলো। জায়ান দমে গেলো তাতে। লিওর দিকে তাকিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো কি হয়েছে৷ লিও হতাশ ভঙ্গিতে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো অবস্থা একদমই হাতের নাগালে নেই৷ তারপর ইশারায় জায়ানকে রোগিণীর অবস্থা দেখতে ডাকলো কাছে৷
জায়ান মীরের দিকে আরেকবার তাকিয়ে দরজার কাছে গিয়ে কাঁচের এপাশ হতে ভেতরে উঁকি দিতেই আঁতকে উঠলো, আতঙ্কিত হয়ে লিওর দিকে তাকাতেই লিও উপর নিচে মাথা নাড়িয়ে নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিলো বর্তমান অবস্থার ভয়াবহতার কথা।
“তুমি নিশ্চয় তাকে চেনো? জায়ান সাদি।”
মীরের গুরুগম্ভীর স্বরে কেঁপে উঠলো জায়ান৷ দ্রুত লিওর পাশ থেকে সরে মীরের দিকে ফিরে নত মুখে দাঁড়িয়ে সে উপর নিচে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
মীর গর্জে বলে উঠলো,
“মুখে বলো!”
“পজিটিভ ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমি তাকে চিনি৷”
“এতদিন তবে তাকে তুমি আমার থেকে প্রোটেক্ট করে গেছো? একজন বিশ্বাস ঘাতককে তুমি আমার থেকে আড়াল করে গেছো? জবাব দাও জায়ান সাদি!”
মীরের গর্জনে কেঁপে উঠলো হাসপাতালের নির্জন ফ্লোরটি। জায়ান সাদি চুপ করে রইলো, মাটির দিকে দৃষ্টি তার, চোখ তোলার মতো সাহস এই মুহুর্তে জোগাড় করতে পারলোনা।
“কে সে? পরিচয় বলো তার। কি হয় সে তোমার? কিভাবে চেনো তুমি তাকে?”
জায়ান শুকনো ঢোক গিললো একটা, কম্পিত শ্বাস ছেড়ে ভীতসন্ত্রস্ত স্বরে উত্তর করলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, তিনি….. তিনি শেহজাদা সালিম আরাবী দেমিয়ানের মেয়ে, শেহজাদী আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান।”
মীরের কুঞ্চিত ভ্রুজোড়া সোজা হয়ে এলো তৎক্ষণাৎ। মুখের ক্রোধিত ভঙ্গিমা উবে গিয়ে সেখানে এসে ভর করলো বিস্ময়!
সালিমের মেয়ে! সালিমের মেয়ে কবে হয়েছিলো? সে যদি সালিমের মেয়েই হবে তবে এতদিন সে কোথায় ছিলো? মীরই বা কোথায় ছিলো? সালিমের মেয়ের ব্যাপারে সে কেন জানেনা?
“তার মায়ের নাম কি?”
জিজ্ঞেস করলো মীর। জায়ান কাঁপা গলায় উত্তর দিলো,
“ই-ইনায়া, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর অবাক হলো আরও৷ সে ইনায়ার মেয়েই যদি হবে তবে মীর কেন জানেনা? ইনায়ার মৃত্যু হয়েছিলো প্রাসাদেরই রয়্যাল মেডিকেলে, তবে এই বাচ্চা তখন কোথায় ছিলো?
মীর এগিয়ে এলো জায়ানের দিকে, গমগমে স্বরে বলল,
“ডিটেইলস বলো৷”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদীকে জন্ম দিতে গিয়ে ইনায়া মারা যায়। কিন্তু তখন প্রাসাদের রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল থাকায় তাকে আমি আমার কাছে নিয়ে আসি। তিনি আমার কাছে থেকেই বড় হয়েছেন।
আপনাকে কখনো জানানো হয়নি, কারণ তার পরিচয় আমি সম্পুর্ন গোপন রাখতে চেয়েছিলাম। যেন কারো খারাপ দৃষ্টি তার ওপর না পড়ে, কেউ তার কোনো ক্ষতি না করে বসে!
আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি, কিন্তু দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি! আমার ভুল হয়েছে, আমার আপনার থেকে সত্য গোপন করা উচিত হয়নি।”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮
কম্পিত, অনুতপ্ত গলায় কথাগুলো বলে জায়ান মাথা নিচু করে রইলো। মিথ্যা বলতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে এলো তার, তবুও নিজেকে শক্ত করে রইলো সে।
মীর কিয়ৎক্ষণ জায়ানের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিজের ট্রাউজারের পকেট থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ফটোগ্রাফটি বের করে জায়ানের সামনে ধরে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আমি যখন তার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানিইনা, তবে তার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক?”
