বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬০
রানী আমিনা
ফটোগ্রাফটা দেখা মাত্রই জায়ানের আত্মা উড়ে গেলো। রক্তশূণ্য চেহারা নিয়ে সে হতবাক চোখে তাকালো মীরের দিকে। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি একটা রেয়ার ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছেন, যার জন্য আপনি অনেক কিছুই ভুলে গেছেন এবং যাচ্ছেন। শেহজাদীকেও আপনি ভুলে গেছেন, তাই আমি তাকে মনে করিয়ে দিয়ে আপনাকে পীড়া দিতে চাইনি। ক্ষমা করবেন!”
লিও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অত্যাশ্চর্য চোখে জায়ানের দিকে চেয়ে ছিলো। জায়ানের এমন একের পর এক সুন্দর সুন্দর মিথ্যা কথা শুনে লিও যেন আকাশ থেকে পড়ছে বার বার। জায়ানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সে মীরের দিকে রাখলো, তার প্রতিক্রিয়া কি হয় জানার জন্য।
মীরকে কিছুটা দ্বিধান্বিত দেখালো, ভ্রু কুচকে সে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে আমার?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি সেটাও ভুলে গেছেন। ক্ষমা করবেন, আমি নিজেও ভুলে গেছি আপনার অসুখের নাম। রয়্যাল মেডিক্যালের হেকিম ভালো বলতে পারবেন।”
নত মুখে আনুগত্যের সাথে বলল জায়ান। মীর আনমনা হয়ে ভাবতে লেগে গেলো তৎক্ষনাৎ। আসলেই সে আজকাল অনেক কিছুই মনে করতে পারেনা। জোর করে মনে করতে গেলে মস্তিষ্কে পীড়া দেয়। তবে কি সে সত্যিই কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছে?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
জায়ান আড়চোখে একবার দেখলো মীরের চেহারাখানা। অলক্ষে একবার তাকালো লিওর দিকে। লিও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে জায়ানেরই দিকে। জাভেদ বাপের এমন দুঃসাহসিক কাজে হতভম্ব হয়ে অস্থির হয়ে একবার লিও আরেকবার জায়ানের দিকে দেখছে। বিড়বিড়িয়ে সে লিওকে বলল,
“ধরা পড়লে আমার বাপ এবার এমন মারা খাবে, কন্ট্রোলার তো দূর কি বাত, জীবনে আর হিজ ম্যাজেস্টির ছায়ার পাশেও ঘেঁষতে পারবেনা৷”
“যা হচ্ছে হইতে দেন চাচা, নইলে সবাই ফাঁসবো। আপনিও ফাঁসবেন। হিজ ম্যাজেস্টি জানতে পারলে কাউকে আর আস্ত রাখবেন না৷”
ফিসফিসিয়ে বলল লিও।
মীর আনমনা থেকে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো। ভারী পায়ে হেটে সে গিয়ে বসলো চেয়ারের ওপর। চুপচাপ কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে সে জায়ানকে ডাকলো। জায়ান গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যেতেই বলল,
“আমি জানিনা কি হয়েছে, বা কেন সে আমার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু যা-ই করুক, সে সালিমের মেয়ে, এবং আমিও হয়তো তাকে যথেষ্ট স্নেহ করতাম। সে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তাকে আমি তোমার জিম্মায় রাখছি জায়ান। সুস্থ হওয়ার পরেই তাকে আমার প্রাসাদে পাঠিয়ে দিবে। দেমিয়ান শেহজাদীদের এভাবে বাইরের পরিবেশে থাকা মানায় না, আর মানালেও আমি সেটা হতে দিবো না৷”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ক্ষমা করবেন, তবে শেহজাদী হয়তো যেতে চাইবেন না।”
“কেন?”
“তিনি দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করেছেন এবং এখন থেকে তিনি এভাবেই একজন সাধারণ নাগরিক হয়ে থাকতে চান।”
মীর শীতল চোখে চেয়ে রইলো জায়ানের দিকে কিছুক্ষণ, তারপরেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তাকে বলে দিও এটা অসম্ভব। সুস্থ হওয়া মাত্রই যেভাবেই পারো তাকে আমার প্রাসাদে পাঠিয়ে দিবে, সে সেখানেই থাকবে। আমার আদেশ অমান্য করলে সেটা তার বা তোমার, কারো জন্যই ভালো হবে না জায়ান। এটা তাকে ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিও। সে প্রাসাদে পৌছলেই আমি তার থেকে জেনে নিবো সে কেন আমার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”
তারপর ভারী পায়ে করিডোর বয়ে এগোতে এগোতে লিওকে বলল,
“আমি শিরো মিদোরিতে ফিরবো লিও।”
লিও আদেশ পাওয়া মাত্রই জায়ানের দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে দ্রুত পায়ে এগোলো মীরের পেছনে। আর জায়ান জাভেদ মিলে বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলো হাসপাতালেই।”
“আমি আর এক চামচও খাবোনা, উহুম!”
দুদিকে মাথা নাড়িয়ে গাল ফুলিয়ে বলল আনাবিয়া। কপাল জুড়ে সাদা ব্যান্ডেজ, মাথা ভার হয়ে আছে তার! ইলহান চামচে স্যুপ তুলে ওর ঠোঁটের কাছে নিয়ে বলল,
“এইতো আর এতটুকুই, আর খেতে বলবোনা। শুধু এই এক চামচ, এটাই লাস্ট!”
“মিথ্যা কথা! লাস্ট লাস্ট বলে বলে তিন চামচ খাইয়ে দিয়েছেন, এখনো লাস্ট লাস্ট বলছেন! আমি আর খাবোই না এই বিশ্রি স্যুপ!”
ফ্যালকন পাশ থেকে অনুনয়ের সুরে বলল,
“খেয়ে নিন আম্মা, এটা শরীরের জন্য অনেক উপকারী, আপনার ক্ষত দ্রুত সারবে৷”
“উহুম!”
বলে আরেকদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো আনাবিয়া। ইলহান আর ফ্যালকন দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো বাহার, সে আমতাআমতা করে বলল,
“শেহজাদী, আমি কিছু করে দেই?”
“তুমি করলে সেটা মুখেই দেওয়া যাবে না, চুপ থাকো।”
কিঞ্চিৎ ধমকের স্বরে বলল ইলহান। বাহার চুপসে গেলো সাথে সাথেই। আনাবিয়া তৎক্ষনাৎ চোখ পাকিয়ে তাকালো ইলহানের দিকে, শাসনের সুরে বলল,
“এটা কি ধরনের বিহেভিয়ার?”
ইলহান এ প্রশ্নের কোনো উত্তর করলোনা, উলটো স্যুপ ভর্তি চামচ আনাবিয়ার ঠোঁটের কাছে নিয়ে বলল,
“আর এক চামচ খেলেই শেষ, আর খেতে বলবোনা, প্রমিজ!”
আনাবিয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে গলাধঃকরণ করলো সেটুকু।
জায়ান আর তার তিন ছেলে এসে পৌছোলো তখনি। ভোরেই ইলহানের কাছে খবর পাঠিয়ে সে জাভেদকে নিয়ে বাড়িতে গেছিলো। সারা রাত ঘুম না হওয়ায় শরীর খারাপ লাগছিলো তার। কুশল বিনিময় শেষে জায়ান ইলহান ব্যাতিত সকলকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে একটা চেয়ার পেতে বসলো আনাবিয়ার পাশে।
আনাবিয়া ওকে এভাবে গুছিয়ে বসতে দেখে শুধোলো,
“কিছু বলবেন চাচাজান?”
“জ্বি শেহজাদী। আসলে….. আসলে একটা সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
“কি সর্বনাশ?”
“গতকাল যে গাড়িটি আপনাকে ধাক্কা দিয়েছিলো……”
“তার কি হয়েছে?”
“গাড়িটি আসলে হিজ ম্যাজেস্টির ছিলো। লিও ড্রাইভ করছিলো, হিজ ম্যাজেস্টিও গাড়িতেই ছিলেন!”
আনাবিয়া পানি খেতে নিয়েছিলো। জায়ানের কথা শোনা মাত্রই হিচকি লাগলো তার। মুহুর্তেই কেশে টেশে একাকার করে বিছানা পত্র ভিজিয়ে ফেললো সে। ইলহান তড়িঘড়ি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত করলো।
স্বাভাবিক হতেই আনাবিয়া আতঙ্কিত চেহারা নিয়ে তাকিয়ে জায়ানকে জিজ্ঞেস করলো,
“আমাকে দেখে ফেলেছে? চিনে ফেলেছে?”
“ব্যাপার শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বাঁচা যেতো শেহজাদী!”
“মানে? কি বলতে চাইছেন? কি হয়েছে?”
আশঙ্কিত স্বরে শুধোলো আনাবিয়া। জায়ান গতকালের সমস্ত ঘটনা একে একে বর্ণনা করে শোনালো তাকে।জায়ানের এত স্পর্ধা দেখে আনাবিয়া আর ইলহানের চোখ জোড়া ক্রমে ক্রমে বড় বড় হয়ে যেতে রইলো। জায়ানের কথা শেষ হতেই আনাবিয়া বলল,
“মীর যদি কখনো জানতে পারে আপনি তাকে এভাবে ঘোল খাইয়েছেন তবে আপনার কল্লাটাই আগে কাটা যাবে৷”
“এই জন্যই আপনার কাছে এসেছি শেহজাদী, আপনিই কেবল আমাকে রক্ষা করতে পারেন! হিজ ম্যাজেস্টি আদেশ করেছেন আপনাকে যেন আমি প্রাসাদে ফিরিয়ে দিয়ে আসি। আপনি একজন দেমিয়ান শেহজাদী, এবং সারাজীবন তাই-ই থাকবেন, এর বাইরে আপনার কোনো পরিচয় নেই।”
“আপনি তাকে বলেননি আমি দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করেছি?”
“বলেছি শেহজাদী, তিনি বলেছেন এটা অসম্ভব! এবং বলেছেন আপনাকে যদি আমি প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে না পারি তবে আপনি আমি দুজনেই বিপদে পড়বো!”
“আমি কোথাও যাচ্ছিনা৷”
নির্বিকার গলায় বলল আনাবিয়া। জায়ান সাদির মুখ শুকিয়ে গেলো, অনুনয়ের সুরে বলল,
“শেহজাদী, দয়া করুন! আপনি প্রাসাদে না ফিরলে হিজ ম্যাজেস্টি আমাকেই শেষ করে ফেলবেন! আমার কথা শুনুন শেহজাদী!”
“আমি কি আপনাকে মিথ্যা বলতে বলেছি?”
“মিথ্যা না বললে সবার পূর্বে আমিই ফেঁসে যেতাম শেহজাদী। বাধ্য হয়ে বলেছি, আপনাকে বাঁচাতে বলেছি!”
“আমি কোনো ভাবেই শিরো মিদোরিতে ফিরবোনা চাচাজান, প্রয়োজনে আপনার সাথেও আর কোনো যোগাযোগ রাখবোনা। আপনি তাকে বলে দিবেন আমি প্রাসাদে ফিরতে চাইনা বলে পালিয়ে গেছি। দোষ যা হবার আমারই হবে, আপনি সেইফ থাকবেন।”
জায়ান অসহায় চোখে তাকালো ইলহানের দিকে, বলল,
“শেহজাদা! শেহজাদীকে একটু বুঝান!”
ইলহান মুখে হাত দিয়ে বসে বসে দুজনের কথা শুনছিলো। জায়ানের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে মনে মনে সে বেশ পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিলো। জায়ানের কথার উত্তরে সে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“ইয়াম্পসিবল!
আমার মেয়ের যা মন চাইবে সে তাই করবে, এখানে আমি কথা বলার কেউনা। আমার দায়িত্ব শুধু তার সেইফটি নিশ্চিত করা, জায়ান সাদি। এই ব্যাপারে আমি আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারবোনা, দুঃখিত।”
জায়ান বুঝলো ফাঁটা বাঁশের চিপায় তার মূল্যবান জিনিস আঁটকে গেছে। নিজের সর্বনাশের কথা চিন্তা করে জায়ান ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠতে লাগলো। আনাবিয়া ওকে কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে বলে উঠলো,
“আমাকে আর এই এরিয়াতে খুঁজে পাবেন না চাচাজান, আমি আজকেই এইখান থেকে পালাবো। ঘোষণা দিয়ে পালাচ্ছি যেন আপনি আমার জন্য চিন্তা না করেন৷ মীর আমাকে খুঁজতে এলে বলে দিবেন আমি কাউকে না বলে পালিয়ে গেছি।”
“শেহজাদী, কিন্তু….”
“কোনো কিন্তু নয়, আমি যা বলেছি তাই। এই যদি না হয় তবে আমি নিজ দায়িত্বে গিয়ে মীরকে বলে দিবো আপনি কি কি মিথ্যা কথা বলেছেন তাকে। এখন আপনি ভাবুন কি করবেন।”
জায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো, ক্ষণিক পর বলল,
“ঠিক আছে, আপনি পালিয়ে যান৷”
রাতের কিমালেব মুড়ে আছে ঘন কুয়াশায়। মূল শহর থেকে বেশ দূরের এক উঁচু, নির্জন পাহাড়ি রাস্তার মধ্যিখানের এক তীক্ষ্ণ বাঁকের ঠিক পরেই একটি সদ্য তৈরি এক তলা রেস্টুরেন্ট। আলো ঝলমলে ভবনটি দেখামাত্রই মন বলবে পাহাড়ের বুকে কেউ জাদুবলে এক ঝকমকে রত্ন খোদাই করে বসিয়ে দিয়েছে!
বিশাল বিশাল জানালাগুলো মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত, সেগুলো ভেদ করে হলদে-কমলা রঙা উষ্ণ আলো ঠিকরে পড়ছে বাইরের কালো জগতে, বাইরের অন্ধকারকে যেন ঠেলে রাখছে দূরে!
প্রবেশপথের দু’পাশে পরম যত্নের সাথে ছাঁটা গাছের টব গুলোতে বসানো উজ্জ্বল রঙ বেরঙের ফুল, আঁধারের ভেতরেও ঝলমল করছে তা। সেগুন কাঠের দরজার পিতলের নবটি চকচক করছে।
ভেতর থেকে শব্দ ভেসে আসছে টুকটাক। ক্ষণিক পরেই খুলে গেলো দরজা। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ফারিশ আর জাভেদ। দুজনে বেরিয়ে এসে শীতল বাতাসে বুক ভরে দম নিলো। জাভেদ চাপা স্বরে বলল,
“চল ভাই, চুরি করে চলে যাই। যা করার এরা কজন করুক।”
“একদম না, আগামীকালই ওপেনিং। এখন আমরা চলে গেলে ওরা গুছিয়ে উঠতে পারবেনা, আর শেহজাদী রাগ করবেন।”
“এহ্, এসেছেন শেহজাদীর দিওয়ানা!
যতই নকশা করো উনি তোমার কপালে কোনোদিন জুটবেন না। এতদিন হিজ ম্যাজেস্টি ছিলেন, এখন শেহজাদা ইলহান। তার মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে চোখ গেলে দেবেন উনি, তাকিয়ে দেখিও খানিক ক্ষণ!”
“ভয় দেখাইস না ভাই। এখন পরিস্থিতি অনেক খানিই আয়ত্তে এসেছে, হিজ ম্যাজেস্টি শেহজাদীকে ভুলে গেছেন। আর শেহজাদী রাজি থাকলে শেহজাদা ইলহানের কোনো ক্ষমতা থাকবেনা তাকে আঁটকানোর৷”
“শেহজাদী তার প্রাণ থাকতে রাজি হবেন না, লিখে রাখ৷”
জাভেদের কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ফারিশ। আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল,
“জানি, কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? নিজের সুখের জন্য এতটুকু কষ্ট তো করাই যায়!”
“তুই হলি ভিলেন দেবদাস। নিজের সুখের জন্য পরের বউকে কেড়ে নিয়ে আসবি।”
“চুপ থাক। তোর খবর বল, তোর জন্য না মেয়ে দেখছে?”
“হ। বাপকে বললাম করবোনা বিয়ে, বাপ বললো করাই লাগবে, একা একা আর থাকা যাবেনা।”
“কেমন দেখলি?”
“সুন্দর আছে, কিন্তু আমার পছন্দ হচ্ছে না।”
“ক্যান রে ভাই, গ্যে নাকি তুই?”
“বাজে কথা বলবেনা ফারিশ ভাই, বেশি কথা বললে কিন্তু তোমার প্রেয়সীর সাথে প্রেমের আলাপ করতে চাইবো৷ তুমি নিশ্চয়ই জানো তোমার প্রেয়সী আমাদের কাজিন মহলের সকলের হার্টথ্রব?”
ফারিশ ধ্বংসাত্মক চোখে তাকালো জাভেদের দিকে৷ জাভেদ সেটা টের পেয়ে বলল,
“আরে ভাই, হাইপার হচ্ছেন কেন? মজা করছিলাম তো!
ফারিশ সাহেবের মতো আমাদের অত সাহস আছে নাকি? হিজ ম্যাজেস্টির হাতে গলা টেপা খাওয়ার পরও যার সাহস কমেনা তার সাথে আমাদের তুলনা তো হাতি আর পিপড়ের মতো!”
এমন সময়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো জেসার, বলল,
“ভাইজান, আমরা একা একা আর কত করবো? আপনারা দুজন আসুন, কাজ শেষ হলে তখন যতখুশি গল্প করবেন।”
ফারিশ জাভেদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভেতরে ঢুকলো আবারও৷
রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন উপলক্ষে আনাবিয়া কিমালেবের দরিদ্র কৃষক আর শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে আহারের ব্যাবস্থা করেছে। ফারিশ, ফ্যালকন, জাভেদরা আন্তরিকতার সাথে সকলকে প্যাকেট ভর্তি খাবার দিয়ে চলেছে। অভাবী মানুষ গুলো পেট পুরে, তৃপ্তি নিয়ে খেতে পেরে আজ বেশ খুশি। আনাবিয়ার জন্য মন ভরে দুয়া দিয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পথে তাদের পরিবারের জন্যও প্যাকেট ভর্তি খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে আনাবিয়া।
ইলহান আনাবিয়ার রেস্টুরেন্ট খোলা নিয়ে প্রথমে অনেক আপত্তি করেছিলো। তার একদমই ইচ্ছে ছিলোনা আনাবিয়া বাইরের কাজে যুক্ত হোক। আনাবিয়া মানুষের জন্য রান্না করে বেড়াবে এটা ভাবলেই তার মেজাজ গরম হয়ে উঠছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনাবিয়া বুঝিয়ে সুঝিয়ে, ইলহানের পছন্দমতো নিয়ম নীতি নির্ধারন করে অবশেষে ইলহানকে রাজি করিয়েছে।
ইলহান শর্ত দিয়েছে আনাবিয়া সকলের জন্য রান্না করবেনা, প্রত্যেকদিন রান্না করবেনা, কখনো শখ হলে রান্না করবে, শুধুমাত্র রাতে রেস্টুরেন্ট ওপেন করবে এবং দিনে পনেরো থেকে বিশ জনের বেশি কাস্টমার অ্যালাও করবে না। সর্বোচ্চ সীমা বিশ জন, তার ওপারে কোনোভাবেই নয়!
রান্নার জন্য কুরো আহমার থেকে দুজন নামী দামী শেফকে ধরে আনতে চাইছিলো কিন্তু আনাবিয়া রাজি হয়নি। সে লোকালয় থেকেই ভালো রান্না জানা দুজন মধ্যবয়সী নারী আর একজন পুরুষকে রেখেছে। আজকের রান্না তারাই করেছে, আনাবিয়া বসে বসে দেখিয়ে দিয়েছে শুধুই!
ইলহান নিজ দায়িত্বে রেস্টুরেন্টের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস গুলো একটি ডিজিটাল সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে বাইরে। সেখানে নাকি আবার কাস্টমারও কাউন্ট হবে!
আনাবিয়া হতাশ চোখে দেখে গেছে শুধু! সারাজীবন তাকে এভাবেই এই হতচ্ছাড়া গুলোর মাতব্বরি সহ্য করতে হবে ভেবে আর কিছু বলেনি।
সকলে চলে গেলে রেস্টুরেন্ট নির্জন হয়ে গেলো আবারও। ভেতরে ফারিশ, ফ্যালকনেরা এখনও উল্লাস করে খাওয়া দাওয়া করে চলেছে, সারাদিনের খাটুনির পর এখন খেতে পেরে তাদের এনার্জি হর্স পাওয়ারে ফিরে এসেছে যেন। বাইরে থেকেও তাদের চিৎকার চেচামেচি, মারামারি, ফাটাফাটির আওয়াজ পাচ্ছে আনাবিয়া।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ইলহান নিজেও যোগ দিয়েছে আজ তাদের সাথে। ওই লোকটা দিনে দিনে বয়সে ছোট হচ্ছে যেন! হাটুর বয়সী ছেলেদের সাথে সারাদিন মারাধরা, ছোটাছুটি করে চলেছে আজকাল।
আনাবিয়া হতাশার শ্বাস ফেলে রেস্টুরেন্টের ভেতরে যেতে নিলো। তখনি চোখে পড়লো দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে একটি বছর তিনের ছোট্ট মেয়ে। এই শীতেও তার গায়ে শুধুমাত্র একটা ছেড়া, ময়লা পোশাক। আনাবিয়া তাকাতেই গাছের গুড়ির পিছে লুকিয়ে পড়লো সে৷
আনাবিয়া হাসলো, এগিয়ে গেলো সেখানে। মেয়েটি তখনো চুপটি করে দাঁড়িয়ে সেখানে। উঁকি মেরে দেখতে চাইলো আনাবিয়া চলে গেছে কিনা। কিন্তু উঁকি মারতেই আনাবিয়ার সুন্দর মুখখানা দৃষ্টিগোচর হলো তার।
ছুটে পালাতে চাইলো সে, কিন্তু আনাবিয়া ধরে ফেললো তাকে। কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপার বাবু? এই সন্ধ্যা বেলা তুমি এখানে কেন? তোমার বাবা মা কই?”
বাচ্চাটি চুপসে গেছে দেখে আনাবিয়া অভয় দিয়ে বলল,
“ভয় পেয়োনা, আমি একদম বকা দিবোনা। বলো! কার সাথে এসেছিলে তুমি?”
“এ্-এতা…!”
“একা এসেছো? এত দূর! বাসা কোথায় তোমার? বাবা মা বকা দিবে যে এইবার! এখন কি করবে?”
মেয়েটি চুপ করে আছে দেখে আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“খেতে পেয়েছো তুমি?”
মেয়েটি ছলছল চোখে দুদিকে মাথা নাড়ালো। আনাবিয়ার মায়া হলো ভীষণ, বলল,
“খাওয়ার সময়ও এখানে লুকিয়ে ছিলে?”
মেয়েটি মাথা নাড়ালো ওপর নিচে, তারপর কেঁদে ফেললো হঠাৎই। আনাবিয়া ওকে কাছে টেনে নিলো, বলল,
“কাঁদেনা বাবু, অনেক মজার খাবার আছে, সব খাবে তুমি। চলো দেখি এখন!”
আনাবিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বাচ্চাটির হাত ধরে টানতে গেলে আর্তনাদ করে উঠলো সে। আনাবিয়া চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? ব্যাথা পেয়েছো? কোথায় ব্যাথা পেয়েছো দেখি?”
মেয়েটির বাহুসন্ধির কাপড় সরিয়ে দেখলো আনাবিয়া, সেখানটা অস্বাভাবিক ভাবে লাল হয়ে ফুলে আছে। আনাবিয়া সেখানে হাত দিতেই মেয়েটি ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো আবারও। আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে এখানে?”
“নুতুন মা পেলে দিয়েথিলো দে, তালপল তেকে বেতা!”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৯
বলতে বলতে গলা কেঁপে গেলো তার, চোখে এসে আবারও ভর করলো লোনা পানি৷ আনাবিয়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর কোলে তুলে নিলো তাকে হঠাৎই।
মেয়েটিকে বুকে আগলে নিয়ে রেস্টুরেন্টের দিকে এগোতে এগোতে ভাবলো, যদি সে কখনো কারো সৎ মা হয় তবে সেও কি এমন নিষ্ঠুর হয়ে উঠবে…..?
