বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭১
রানী আমিনা
সন্ধ্যা নামার পরপরই আকাশে মেঘ জমলো, সুরমা রঙা মেঘ আচ্ছাদন করে নিলো সম্পুর্ন আসমান। এই মেঘাচ্ছন্ন রাত ভালো লাগছিলোনা মীরের। আজ তাই সময়ের পূর্বেই সকল কাজ সমাধা করে, কিছু আগামী দিনের জন্য রেখে ফিরে এলো সে রয়্যাল ফ্লোরে।
বারান্দায় পা রাখতে না রাখতেই শুরু হলো অঝোর ধারায় বৃষ্টি, তারই সাথে দমকা হাওয়া। বারান্দায় মহসিন দাঁড়িয়ে, বৃষ্টির ছাট গায়ে এসে লাগছে তার। মীর কাছাকাছি এসে শুধোলো,
“সম্মানিতা বাঘিনী এখন কি করছেন?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, তিনি আজ দ্রুতই ঘুমিয়ে যাবেন বললেন, আমাদের বলেছেন কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে।”
মীর ভ্রু কুচকালো, হাত উঁচিয়ে ঘড়ি দেখলো। সবে ন’টা বেজেছে। এই মেয়ে রাতের বারোটা বাজলেও কামরায় গুটুর গুটুর করে, পা ফেলার রুমরাম শব্দেই মীর টের পায় তার মধ্যরাতের চোরের মতোন লুকিয়ে চুরিয়ে চলাফেরা৷ আজ বাঘিনীর এমন গুড গার্ল হওয়ার রহস্য কি বুঝলোনা মীর৷
বাইরের ঝড়বৃষ্টির দিকে একবার নজর দিয়ে মীর কামরায় ঢুকলো। পোশাক ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে ফুল ভিউ মিররের সামনে এসে দাঁড়ালো। আয়নার দিকে চেয়ে আনমনে কিছু ভাবতেই মনে খটকা লাগলো তার। দ্রুত পায়ে আনাবিয়ার কামরার দরজায় গিয়ে করাঘাত করে ডাকলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“প্রিন্সেস…..?”
ভেতর থেকে উত্তর এলোনা কোনো। মীর নব ঘুরালো সন্তর্পণে, দরজাটা সামান্য ফাঁকা করে এক চোখ দিয়ে দেখলো কামরার ভেতর। কিন্তু বিছানা দৃষ্টি সীমানায় না আসায় দরজা আরেকটু ঠেলে উঁকি মারলো সে।
যা ভেবেছিলো তাই, বিছানা ফাঁকা!
মেজাজ প্রচন্ড গরম হলো মীরের। সশব্দে দরজা ঠেলে ব্যাস্ত পায়ে কামরায় ঢুকলো সে, ক্ষুব্দ চোখে চারদিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে সোজা ক্লজেটে ঢুকে পড়লো। আনাবিয়াকে ডাকার প্রয়োজন মনে করলোনা একটিবারও।
এরকমটা সে আগেই টের পেয়েছিলো। অন্যান্য দিন গুলোতে রয়্যাল ফ্লোরে পা রাখা মাত্রই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি হয় তার, যা শুধুমাত্র আনাবিয়ার আশেপাশে যাওয়া মাত্রই অনুভব করে সে৷ কিন্তু আজ ব্যাতিক্রম ঘটেছে!
সম্পুর্ন ক্লজেট উলটে পালটে ফেলে, পোশাক আশাক এলোমেলো করে, এদিক ওদিক ছুড়ে যখন কোথাও আনাবিয়াকে খুঁজে পেলোনা তখন ক্ষ্যাপা ষাড়ের মতোন ফোঁসফোঁস করতে শুরু করলো মীর! ক্লজেট থেকে ক্ষিপ্ত পায়ে বেরিয়ে ব্যালকনির উদ্দ্যেশ্যে এগেলো সে। দরজা খোলা পেয়েই বুঝলো আনাবিয়া এই পথেই পালিয়েছে।
প্রসস্ত, সুসজ্জিত ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো সে। সম্মুখে তার নিকষ কালো আঁধারে মোড়া রেড জোন। বৃষ্টি প্রচন্ড, ব্যালকনিতে বৃষ্টির পানির এলোমেলো ছাট এসে ভিজিয়ে দিতে রইলো তাকে। আর সে শ্যোণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রেড জোনের বিরাট বিশাল জঙ্গলের দিকে।
আচমকা বজ্রের ন্যায় কন্ঠে ডাকলো,
“অ্যাবিসোরা!”
মুহুর্তেই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে মীরের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো একটি ধোঁয়ার ন্যায় অবয়ব। মীর শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“এই মুহুর্তে সে কোথায় আছে?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী এই মুহুর্তে জঙ্গলের প্রায় মধ্যবর্তী স্থানের একটি পরিত্যক্ত ট্রি হাউজে অবস্থান করছেন। স্পষ্টতই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।”
মীর দ্বিতীয় কথা বললোনা। জোর কদমে কামরায় ফিরে গায়ে একটা পুরু চাদর জড়িয়ে গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। বড় বড় পায়ে রয়্যাল ফ্লোর ছেড়ে যেতে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“অসভ্যটাকে পেলে আজ মাথায় তুলে একটা আঁছাড় দেবো আমি!”
আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মুহুর্মুহু, তারই সাথে উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে বৃষ্টির তোপ। মুষলধারে বৃষ্টিতে একাকার হয়ে গেছে জঙ্গলের সব ঝোপঝাড়। প্রচন্ড ঝড়ো বাতাসে রেড জোনের গাছগুলো একটার ওপর আরেকটা আছড়ে পড়ছে, যেন এখুনি ভেঙে পড়বে গায়ের ওপর।
সেই অন্ধকারের বুক চিরে, জঙ্গলের ইনভিজিবল রোড দিয়ে প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলেছে মীরের গাড়িটি৷ বৃষ্টির বড় বড় ফোটা এসে ধুমধাম শব্দে আছড়ে পড়ছে উইন্ডশিল্ডে। হেডলাইটের তীব্র আলোয় বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটাকে মনে হচ্ছে একেকটি কাঁচের তলোয়ার। গাড়ির ভেতরে স্টিয়ারিং ধরে থাকা মীরের চোখ জোড়া অস্থির, চতুর্দিকে উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে হন্যে হয়ে খুঁজছে অ্যাবিসোরার বলা ট্রি হাউজ।
বিরক্তিতে ক্রমশ কপাল কুচকে এলো মীরের। মেয়েটি পালালো কিন্তু একটা ভালো দিনে পালাতে পারলোনা, এই অলুক্ষুণে দিনেই তার পালানোর পুলক জাগলো! মনে মনে আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে কিছুক্ষণ ভয়ানক বকাবকি করে গাড়ি হাকালো সে জঙ্গলের আরও গভীরে৷
বনের গভীরে, কোমর ভাঙা রেড উড ট্রির জীর্ণ ট্রি-হাউজের ভেতরে হাটু মুড়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলো আনাবিয়া। চেয়ে দেখছিলো বাইরের বৃষ্টি। হঠাৎ বাতাসের দানবীয় গর্জনের মাঝেই সে শুনতে পেল এক ধাতব গোঙানি, ইঞ্জিনের গ্রুম গ্রুম শব্দ, এগিয়ে আসছে এদিকেই।
চমকালো সে, তৎক্ষনাৎ উঠে উঁকি দিলো বাইরে। মীরের কালো রঙা গাড়িটি চিনতে এক মুহুর্ত দেরি হলোনা তার।
আতঙ্কিত হয়ে তড়িঘড়ি দরজা দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়লো সে, তারপর উর্ধশ্বাসে ছুটলো উলটো দিকে। হেড লাইটের তীব্র আলোকে মীর স্পষ্ট দেখলো জংলী ঘাসের ওপর দিয়ে ছুটে পালাতে চাওয়া আনাবিয়ার শুভ্র, উজ্জ্বল শরীর।
মীর গাড়ির গতি বাড়ালো তৎক্ষনাৎ, ঝড়ো বেগে আনাবিয়ার পিছু নিতে নিতে জানালার গ্লাস নামিয়ে বজ্রকঠিন গলায় গর্জে বলে উঠলো,
“ওইখানেই দাঁড়াও, আর এক পাও এগোবে না! তোমাকে ধরতে পারলে আজ তোমার মাথা ফাটাবো আমি!”
আনাবিয়া মীরের এমন গর্জনে আরও জোরে ছুটতে শুরু করলো, ভয়ে আতঙ্কে পেছন ফিরে দেখলোনা পর্যন্ত!
জঙ্গলের অদৃশ্য রাস্তা দিয়ে গাড়িটা তখন পশুর মতো গর্জন তুলে ছুটছে, মীরের দুহাত স্টিয়ারিং হুইলে শক্ত করে ধরা। দুঃশ্চিন্তা আর ক্রোধে কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম! তার চোখের সামনে আনাবিয়ার ঝলমলে ছায়া, পালিয়ে যাছে জঙ্গল চিরে!
হেডলাইটের আলো বনের ঘন অন্ধকারে নাচছে পাগলের মতোন। এই ঝড়ের রাতে এভাবে ছোটাছুটি করলে যে আনাবিয়ার কোনো দুর্ঘটনা ঘটা নিশ্চিত সেটা ভেবেই মীরের ক্রোধ বেড়ে চলেছে উত্তরোত্তর, তার মন চাইছে মেয়েটিকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারতে!
আনাবিয়া দৌড়াচ্ছে উদ্ভ্রান্তের মতোন! বৃষ্টির ঝাপটায় তার চোখ খোলা রাখা দায়, ভেজা চুল মুখে এসে ঝাপটা মারছে বারংবার। ছুটতে ছুটতে আচমকা মাটির সাথে মিশে থাকা ঝোপঝাড়ের এক গুচ্ছ বুনো লতার শক্ত জালে পা আটকে গেল তার, মুহুর্তেই টাল সামলাতে না পেরে সশব্দে আছড়ে পড়লো সে!
হাতের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো আনাবিয়া, পা ছাড়াতে সজোরে হ্যাচকা টান দিতেই মুক্তি পেলো ঠিকই কিন্তু গোড়ালিতে প্রচন্ড এক মোচড় লাগলো তার, যন্ত্রণায় গুমরে উঠলো সে তৎক্ষনাৎ! যন্ত্রণা সামলাতে না পেরে আবার বসে পড়লো মাটিতে!
ঠিক সেই মুহূর্তেই মীরের গাড়িটি বাঁক ঘুরে ধেয়ে এল আনাবিয়ার দিকে! হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোয় তার দৃষ্টিগোচর হলো আনাবিয়ার ব্যাথাতুর মুখে যন্ত্রণার নিদারুণ ছাপ!
কিন্তু গাড়িটি যে আনাবিয়া হতে আর মাত্র কয়েক ফুট দূরে। ব্রেক কষা মাত্রই এই ভয়ানক গতিতে গাড়িটি সোজাসুজি তার ওপর দিয়ে চলে যাবে।
হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেল মীরের, আনাবিয়াকে গাড়ির চাকার তলায় পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে তৎক্ষনাৎ প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষল সে, আর তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে স্টিয়ারিং হুইলটি ঘুরিয়ে দিল ডান দিকে!
গাড়িটি আনাবিয়ার ঠিক গা ঘেঁষে, ইঞ্চি খানেক দুরত্ব রেখে ছিটকে গিয়ে বিকট শব্দে সজোরে ধাক্কা খেল এক বিশাল রেইনট্রির গুঁড়িতে।
আনাবিয়া আতঙ্কে চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছিলো, কাঁপতে কাঁপতে চোখ খুলতেই দেখল গাড়িটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে লেগে আছে গাছের সাথে। বুক কেঁপে উঠলো আনাবিয়ার, দুঃশ্চিন্তায় মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হলো তার! উঠে গিয়ে দেখতে চাইলো মীরের কোথাও আঘাত লেগেছে কিনা! কিন্তু এই ঝুম বৃষ্টির তোপে পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে অক্ষম হলো সে।
তখুনি গাড়ির দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। কপালে লেগে থাকা রক্ত আর বৃষ্টির জল হাতের উলটো পিঠে মুছে মীর বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে। চোখে মুখে তার ভয়ানক ক্রোধ!
দাঁতে দাঁত পিষে, দ্রুত পায়ে লতায় জড়িয়ে থাকা আনাবিয়ার কাছে এগিয়ে গেল সে। আনাবিয়া মীরের ক্রোধিত চেহারায় আতঙ্কিত হয়ে বসা অবস্থাতেই হাতে হেটে পিছিয়ে গেলো খানিকটা। মীর ভারী পায়ে এসে কোনো ভূমিকা ছাড়াই তার দুই হাত শক্ত করে ধরে হ্যাঁচকা টানে খাড়া করে দাঁড় করিয়ে দিল মাটির ওপর! পরক্ষণেই বৃষ্টির গর্জনকে ছাপিয়ে গর্জে বলে উঠলো,
“এক থাপ্পড়ে তোমার দাঁত ফেলে দেবো আমি, বেয়াদব মেয়ে! এই ঝড় বৃষ্টির রাতে জঙ্গলে পালিয়েছো কোন সাহসে? আর একটু হলেই তো তোমার ওপর দিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে দিতাম! তোমার জন্য আমার গাড়িটার কি হাল হয়েছে দেখেছো? সমস্যা কি তোমার? সবসময় মানুষকে এত যন্ত্রণা দাও কেন তুমি?”
আনাবিয়ার কান্না পেলো! সে যে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে তা চোখে বাঁধলো না মীরের? তার গাড়িটা এতই মূল্যবান হয়ে উঠলো এখন? আচমকা ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। কান্নাজড়ানো গলায় ক্ষোভ মিশিয়ে বলে উঠলো,
“আমি যে পায়ে ব্যাথা পেয়েছি সে খেয়াল নেই আপনার! গাড়িটি বুঝি খুব প্রিয় হয়ে গেছে এখন? সামান্য একটু ঘষা কি লেগেছে তাতেই আপনি আমার সাথে জানোয়ারের মতো করছেন!”
‘সামান্য ঘঁষা’ শব্দটা শুনে মীর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো গাড়ির দিকে। রেইনট্রিটা গাড়ির সম্মুখের অংশ দুমড়েমুচড়ে ভেদ করে প্রায় ভেতরে চলে এসেছে। আরেকটু হলেই মীরের নাকের ডগায় এসে লাগতো!
“একে তোমার সামান্য ঘঁষা মনে হচ্ছে?”
দাঁতে দাঁত চেপে বলল মীর। আনাবিয়া হিঁচকি তুলে নাক টেনে বলল,
“তা নয় তো কি? ওইটুকু সারানো তো আপনার এক তুড়ির ব্যাপার!”
“তাহলে তোমাকেও অমন একটা ঘঁষা দেই? পরে এক তুড়ি দিয়ে ঠিক করে দিবো।”
আনাবিয়া ভয় পেলো যেন, মীরের হাত থেকে ছাড়া পেতে চাইলো তৎক্ষনাৎ। কিন্তু মীর থামার পাত্র নয়। রাগে তার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়! এই রাতে শুধুমাত্র এই মেয়েটির জন্য তাকে সমস্ত বিশ্রাম বিসর্জন দিয়ে ঝড় বৃষ্টি মাথায় তুলে ছুটতে হয়েছে জঙ্গলে, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে গাড়িটাও নষ্ট হয়েছে!
আনাবিয়ার নিরবতা তাকে আরও ক্ষেপিয়ে তুললো যেন! ক্ষুব্ধ হয়ে আনাবিয়ার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
“কেন পালিয়েছো তুমি? কোন কারণে? কি ভেবে, কোন বুদ্ধিতে এসব করো তুমি? কি মজা পাও এভাবে মানুষকে ভোগান্তি দিয়ে? তোমার এই উদ্ভট পাগলামির কারণে আমার কত ক্ষতি হয় জানো তুমি? আমার এখন কামরায় বসে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, আর আমি এখানে এক পাগলের পিছে ছুটছি! গাড়িটার কী দশা হয়েছে দেখেছো? আর আমার কপালটা ফেটে যে রক্ত বেরোচ্ছে! কেন করো এসব?”
আনাবিয়ার কন্ঠরোধ হয়ে এলো, ঠোঁট ফুলে উঠলো তৎক্ষনাৎ! ও কি এতই খারাপ? এতই বিরক্ত করে ও মীরকে? এতই অসুবিধা হয় ওর জন্য মীরের! গলা বেয়ে উঠে আসতে থাকা দলা পাকানো কান্নাকে কোনোভাবে গিলে ফেলে সে প্রায় অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে বলে উঠলো,
“আমি বলেছিলাম আপনাকে আমার পেছনে আসতে? কেন এসেছেন? আপনার গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট ঘটেছে সেটা কি আমার দোষ? আমি তো বলিনি আপনাকে আমার পিছু নিতে? তবে এসেছেন কেন?”
মীর আনাবিয়ার নিরর্থক প্রশ্নগুলোকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে সন্ধানী চোখে এদিক ওদিক দেখতে রইলো। প্রচন্ড বিরক্তিতে ছেয়ে গেলো তার চেহারা। খুব যে মেজাজ গরম হয়েছে সেটা চেহারা দেখেই টের পেলো আনাবিয়া।
অভিমান হলো ভিষণ, বুকের ভেতর পুড়তে শুরু করলো। মীর তবে তাকে উপেক্ষা করা শুরু করেছে? তার প্রশ্নের কোনো গুরুত্ব নেই এখন আর? সে বুঝি খুব বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন?
চোখ ভর্তি হতে শুরু করলো আনাবিয়ার, ইচ্ছা করলো এখনি ছুটে পালিয়ে যেতে এই স্থান থেকে। টলমলে চোখ জোড়া অপমানে, অভিমানে অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো সে।
“হাটতে পারবে?”
প্রশ্ন করলো মীর। আনাবিয়া অন্যদিকে চেয়েই রইলো, উত্তর করলো না কোনো। মীর ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলো,
“ওদিকে একটা ওক গাছ দেখা যাচ্ছে, ওর নিচে শুকনো থাকতে পারে আশা করা যায়। উপরে একটা রেইনট্রির ছায়া আছে, বৃষ্টির পানি পৌছবে না খুব সম্ভবত। আপাতত সেখানে গা বাঁচানোর মতো একটা ব্যাবস্থা করতে হবে।”
বৃষ্টির জোর বাড়ছে। আনাবিয়ার ঠান্ডা লাগছে প্রচন্ড, ঠোঁট জোড়া নীলচে হয়ে আছে। মীরের দেখানো পথে একবার তাকিয়ে কাঁধ থেকে হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে একা একাই হেঁটে এগোলো, কিন্তু পায়ের ব্যথায় মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছিল আবারও।
মীরের দৃষ্টি ওর দিকেই নিবদ্ধ ছিলো। আনাবিয়া পড়ে যাওয়ার আগেই বিদ্যুৎ বেগে ছুটে গিয়ে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল আনাবিয়াকে। আনাবিয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে হাতপা ছুড়তে ছুড়তে অস্ফুট অভিমানি স্বরে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে, আমি একাই যেতে পারবো! কাউকে লাগবে না আমার!”
কিন্তু মীর পাত্তা দিলোনা তার কথায়। নিজের সাথে ঠেসে ধরে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
“এইটুকুনি দেহ, তার কোষে কোষে শুধু তেজ!”
পরক্ষণেই জোর গলায় বলল,
“আর কখনো যদি এমন স্পর্ধা দেখিয়েছো তবে তোমাকে মাথায় তুলে একটা আছাড় দিবো আমি, মাইন্ড ইট! একটা দিন শান্তিতে থাকতে দাওনি, নট অ্যা সিঙ্গেল ডে! রোজ একটার ওপর একটা ঝামেলা লাগাতেই আছো, লাগাতেই আছো! শান্তি ভালো লাগেনা তোমার, না!”
আনাবিয়া মুখে টুশব্দটি করলোনা, কিন্তু চোখ জোড়া বাধা মানলো না কোনো, অঝোর ধারায় ঝরে চলল তারা! সাথে বাড়লো বৃষ্টির বেগ!
মীর দ্রুত পা চালিয়ে পৌছুলো ওক গাছটার কাছে। ঘন ডালপালার কারণে সেখানে সরাসরি বৃষ্টির তেজ অনেক কম। ওপরে আরেকটি রেইনট্রির ছায়া থাকায় কয়েক ফোটা বৃষ্টির পানি ব্যাতিত আর কিছুই ভেদ করেনি গাছের পুরু পাতার বাহার।
মীর দ্রুত হাতে পাশের রেইনট্রির দেহ থেকে টেনে টেনে বাকল ছাড়িয়ে ওক গাছের দুটি সমান্তরাল ডাল একত্রে পেঁচিয়ে, ওপরে বড় বড় প্রায় শুকনো পাতা দিয়ে একটা মাচার মতোন তৈরি করে ফেললো। দুবার হাত চেপে মাচার শক্তিমত্তা পরীক্ষা করে তার ওপর বসিয়ে দিলো আনাবিয়াকে। শুধোলো,
“ব্যাগে শুকনো কাপড় আছে?”
আনাবিয়া অন্যদিকে ফিরে মাথা নাড়ালো উপর নিচে। তাকালো না মীরের দিকে। মীর নিজের গায়ের ভেজা চাদরটা খুলে ফেলে বলল,
“পোশাক বদলে নাও, আমি ওদিকে যাচ্ছি। ফিরে আসবো এখুনি। এখান থেকে কোথাও যাওয়ার চিন্তাও যদি করেছো তবে তোমাকে দ্বিতীয় বার পাওয়া মাত্রই আমি দুই খন্ড করে দিবো, মাইন্ড ইট!”
মীর বৃষ্টির মধ্যেই আবার তার দুমড়ে যাওয়া গাড়ির দিকে এগোলো। সে চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই ঠোঁট ভেঙে সজোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আনাবিয়া! তার কান্নার শব্দ চাপা পড়ে গেলো বর্ষণের তুমুল শব্দের নিচে।
গাড়ির নিকট গিয়ে ঘুরে ফিরে মীর দেখলো তার সাধের গাড়ির বর্তমান অবস্থা। ইঞ্জিন পুরোটাই হয়তো বদলাতে হবে। সামনে গিয়ে গাড়িটি দু হাতে সজোরে ঠেলে সে সরিয়ে নিলো রেইনট্রির গা থেকে। ভেঙেচুরে যাওয়া বনেটটি উঁচু করে দেখলো। ধোঁয়া বেরোচ্ছে কুন্ডলী পাকিয়ে। ভেতর টা ভেঙে চুরে একশেষ!
হতাশায়, ক্রোধে প্রায় উন্মাদ হয়ে বনেটের ওপর সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে সে ফিরে এল আবার ওক গাছটার নিচে। ওকে ফিরতে দেখে আনাবিয়া উৎসুক চোখে একবার তাকালেও পরক্ষণেই আবার নামিয়ে নিলো দৃষ্টি। পোশাক বদলে নিয়েছে সে, ব্যাকপ্যাক টা অনাদরে পড়ে আছে এক পাশে। নাকের ডগা লাল হয়ে আছে তার। ঝলমলে চোখ জোড়াতেও কিঞ্চিৎ লালের আভাস।
ওর অভিমানি, বেদনাবিদ্ধ চেহারা দৃষ্টিগোচর হলো মীরের। মাচার ওপর উঠে এসে বলল,
“গাড়িটা ডেড। বৃষ্টির চাপ কমা পর্যন্ত আমাদের এখানেই থাকতে হবে। এত বৃষ্টির ভেতর বের হলে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে আরও।”
“আমার জন্য আপনার এখানে বসে বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, প্রাসাদে ফিরে যান। আর… আমি পালিয়ে যাচ্ছিনা, চিন্তা নেই। বৃষ্টি কমলে প্রাসাদে ফিরে আসবো।”
শান্ত গলায় বলল আনাবিয়া। মীর ওর দিকে শকুনি চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,
“মাঝে মাঝে মন চায় তোমাকে গলা টিপে মেরে ফেলি! আর একটাও বাজে কথা বললে তোমাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলবো, মাইন্ড ইট!”
“বাজে কথা কোনটা বললাম? আমার জন্য আপনার অনেক অসুবিধা হচ্ছে তো আপনি কেন আছেন এখানে? ফিরে গেলেই তো পারেন! কথায় কথায় মেরে ফেলার হুমকি না দিয়ে একদিন মেরে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যায়! আবার মাইন্ড ইট মাইন্ড ইট করছেন!”
হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় ঝাঝিয়ে বলে উঠলো আনাবিয়া। দমিয়ে রাখতে চাওয়া কান্নার দমকে তখনো তার কন্ঠরোধ হয়ে আসার উপক্রম! কথা গুলো বলেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো আনাবিয়া। ঠোঁট দুটো ঠাণ্ডায়, ক্ষোভে, অভিমানে কাঁপতে রইলো তার।
মীর কিয়ৎক্ষণ আনাবিয়ার রুষ্ট মুখপানে চেয়ে অতঃপর সরে সরে একটু কাছে গিয়ে বসল। মোলায়েম গলায় বলল,
“চুল মুছো ভালো ভাবে, পানি পড়ছে। এভাবে থাকলে ঠান্ডা লাগবে।”
“তাতে আপনার সমস্যা কোথায়? আমার ঠান্ডা লাগলে আপনার কি? আপনার গাড়ির ঠান্ডা লাগছে কিনা দেখে আসুন, পারলে চুমু খেয়ে আসুন কয়েকটা!”
ক্রুদ্ধ গলায় বলতে বলতে আনাবিয়া এবার কেঁদে ফেললো সত্যি সত্যি! মীর ঠোঁট টিপে হাসি সংবরণ করলো। ভেজা প্যান্টের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে আনাবিয়ার শুভ্র মুখে লেগে থাকা পানির মুক্তোর ন্যায় ফোটা গুলো মুছে দিতে দিতে চাপা হেসে বলল,
“হিংসা হচ্ছে বুঝি?”
আনাবিয়া এক ঝটকায় মীরের হাত সরিয়ে দিয়ে সরে বসলো কিছুটা। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ডান হাতের উলটো পিঠে মুছলো চোখ। মীর ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা, হাত বাড়িয়ে আনাবিয়ার ব্যাকপ্যাক টা নিয়ে ভেতরে হাতড়ে দেখতে রইলো চুল মোছার জন্য শুকনো কাপড় পাওয়া যায় কি।
হাতে পোশাকের মতো কিছু বাঁধতেই বের করলো মীর, কিন্তু বের করতেই চোখ কপালে উঠলো তার। এটা তো তার শার্ট!
“তোমার ব্যাগে আমার শার্ট কেন? আমার শার্ট নিয়ে কি করো তুমি?”
আনাবিয়া চমকে তাকালো পেছনে। মীরের হাতে শার্ট দেখে বুকের ভেতর দুড়ুম দুড়ুম শুরু হলো তার। এর কি ব্যাখ্যা দিবে সে মীরের কাছে? দ্রুত বেগে শার্টটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সে তেজি গলায় বলল,
“পার্মিশন ছাড়া ব্যাগে হাত দিয়েছেন কেন? কারো ব্যাক্তিগত জিনিসে হার দেওয়ার আগে অনুমতি নিতে হয় জানেন না আপনি?”
মীর হাত উঁচু করে শার্টটা আনাবিয়ার নাগালের বাইরে নিয়ে কৌতুকপূর্ণ গলায় বলল,
“তোমার ব্যাগে আমার শার্ট কেন বলো আগে, বললেই ফেরত দিয়ে দিবো। প্রয়োজন হলে আমার আরও দুটো শার্ট তোমাকে দান করে দিবো।”
“শুনুন, আমার পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা! আমি এখন একদমই মজা করার মুডে নেই। ওইটা আমার শার্ট। ফেরত দিন এখনই!”
“এটা স্পষ্টই আমার শার্ট, তোমার শার্ট কি করে হয়?”
“আমার শার্ট, আপনি দিয়েছিলেন আমাকে! ফেরত দিন এক্ষুনি!”
মীরের হাত থেকে শার্টটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল আনাবিয়া। মীর তৎক্ষনাৎ হাত গলিয়ে গায়ে চড়িয়ে ফেললো শার্টটা। বলল,
“আমার শার্টে হাত দিবে না! তোমার এত পোশাক থাকতে আমার শার্ট চুরি করেছো কেন?”
“একদম চুরি করিনি আমি, মিথ্যা অপবাদ দিবেন না!”
নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল আনাবিয়া। মীর আচমকা ওর কোমর ধরে টেনে বসালো নিজের কোলের ভেতর। ব্যাকপ্যাক হাতড়ে আনাবিয়ার একটি টিশার্ট পেতেই সেটা দিয়ে রগড়ে রগড়ে মুছতে শুরু করলো আনাবিয়ার সফেদ চুল। আনাবিয়া কিছুক্ষণ ছটফট করে অতঃপর হাল ছেড়ে দিয়ে বসে রইলো চুপচাপ।
মাথা মোছা হলে আনাবিয়াকে ঘুরিয়ে নিজের বুকে পিঠ ঠেকিয়ে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিলো। আনাবিয়া হাত-পা ছুড়ে উঠে যেতে চাইলে ওকে মাথায় তুলে আছাড় মারার হুমকি দিয়ে বসিয়ে দিলো আবার, তারপর মচকে যাওয়া পায়ের গোড়ালি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ। তেমন আশঙ্কাজনক নয়, সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ফুলে উঠেছে কিঞ্চিৎ। মীর ওর পায়ের গোড়ালির ফুলে ওঠা স্থানে বৃদ্ধাঙ্গুলির জোরালো মালিশ প্রয়োগ করতে করতে আচমকা জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি তো কারো স্পর্শ পছন্দ করোনা! আমার স্পর্শে অস্বস্তি হচ্ছে না তোমার?”
“হলে বলতাম অবশ্যই।”
“তুমি কি তবে আমার এমন স্পর্শে অভ্যস্ত?”
মীরের প্রশ্নে তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলোনা আনাবিয়া। চুপ করে রইলো। সে খুব বুঝছে মীর তাকে এখন কথার জালে ফাঁসাবে, সত্যিটা মুখ থেকে বের করে নিয়ে আসতে চাইবে। কোনো উত্তর দিলেই ফেঁসে যাবে সে। একটা শুকনো ঢোক গিলে চুপ করে বসে রইলো সে।
মীর ওর পায়ে মালিশের জোর বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলল,
“চুপ করে থাকবে না, আমি যা জিজ্ঞেস করবো সব সত্যি বলবে।”
“সত্যি বললে আমি কি পাবো?”
“তোমাকে আর প্রাসাদে ফিরতে জোর করবোনা৷”
“বাকি জীবনের জন্য?”
“উহুম, ভোর হওয়া পর্যন্ত।”
আনাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা। গা গরম হতে শুরু করেছে তার, জ্বর আসবে খুব শিগগিরী। নাক দিয়ে পানির মতোন তরল গড়িয়ে পড়ছে। মাথার তালু দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে যেন! সাথে সাথেই একবার হাঁচি দিলো আনাবিয়া৷
মীর হাতের রুমালটি দিয়ে তৎক্ষনাৎ মুছে দিলো ওর নাক। গায়ের শার্টটি খুলে আনাবিয়ার গায়ের ওপর চড়িয়ে দিয়ে বলল,
“প্রাসাদে ফিরতে হবে, তোমার গা গরম।”
“আমি কোথাও যাবোনা, এখানেই থাকবো।”
“জেদ কোরোনা, শিনজো!”
আনাবিয়া চমকালো, তড়িতে মীরের বুক থেকে মাথা তুলে তাকালো সে মীরের দিকে। বিস্মিত, হতভম্ব চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি….কি বললে তুমি আমাকে!”
মীর আনাবিয়ার মুখের সামনে আসা চুলগুলোকে কানের পাশে গুজে দিয়ে বলল,
“আজ আবার আমাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করলে, কেন করলে?”
আনাবিয়া উত্তর দিলোনা কোনো, উদ্ভ্রান্তের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মীরের দিকে। মীর পকেট থেকে একটি চিরকুট বের করে রাখলো আনাবিয়ার সামনে, বলল,
“তুমি জানো? আমার যদি কোনো প্রেয়সী থাকতো তবে আমি তাকে ‘শিনজো’ নামে ডাকতাম! আমি জানি আমি তাকে এ নামেই ডাকতাম, তাকে সম্বোধন করতাম ‘আমার প্রাণ’, ‘আমার আত্মা’ বলে!
কিন্তু আমার কখনো কোনো প্রেয়সী হবে না, আমি কাউকে কখনো আমার বিছানা ব্যাতিত কোথাও স্থান দিবোনা জন্য এ নামটা আমার হৃদয়ের গহীনেই চাপা রেখে ছিলাম!
তবে তোমাকে আমি কেন ‘শিনজো’ বলে ডাকি? কেন তোমাকে আমি আমার প্রাণ জ্ঞান করি? কে তুমি আমার? কিভাবে তুমি আমার শিনজো হয়েছো?”
আনাবিয়ার মুখপানে নিজের স্বর্ণাভ চোখের স্নিগ্ধ, মুগ্ধ দৃষ্টি ফেলে, মোলায়েম কন্ঠে করে গেলো সে একের পর এক প্রশ্ন! আনাবিয়া বিস্ময় ,আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে রইলো মীরের মুখপানে। আকস্মিক ঘটনায় খেই হারিয়ে ফেললো সে, মীর এতসব কিভাবে জানলো? এ নাম সে কোন স্থান থেকে উদ্ধার করলো? মীরের কোন কথার কি উত্তর দিবে সে? কিভাবে উত্তর দিবে?
আনাবিয়ার নিরবতায় যেন মরিয়া হয়ে উঠলো মীর, আনাবিয়ার দিকে ঝুঁকে, তার চোখের কাছে চোখ নিয়ে এসে অস্থির, ব্যাগ্র স্বরে বলল,
“‘স্যিক দ্যা স্যোল!’ হয়্যার ইজ মা’ স্যোল? তুমিই আমার স্যোল, তাইনা বলো! কি ছিলাম আমি তোমার, শিনজো? আর তুমিই বা আমার কি ছিলে? কি কি লুকিয়েছো আমার থেকে বলোতো! কি কি অজানা আছে আমার? কি হও তুমি আমার? কেন তোমার জন্য আমি এত উতলা হই? কেন এত অস্থির হই বলোতো! কেন তোমার বিপদ আঁচ করলে আমার সব ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করে? সব জানো তুমি! বলো আমাকে, আমি জানতে চাই সব, সমস্তই!”
আনাবিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো মীরের সিকে। ক্ষণিকের জন্য চোখের পলক পড়লো না তার। আতঙ্ক, বিস্ময়, শঙ্কা সমস্ত মিলিয়ে পাংশু বর্ণ ধারণ করলো তার চেহারা! মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো যেন! আঁধার ঘনিয়ে আসা দৃষ্টিতে মীরের দিকে চেয়ে জড়ানো গলায় অস্ফুটে স্বরে কোনো রকমে আওড়ালো,
“আম্-আমি প্-প্রাসাদে ফিরবো, আমার শরীর ভালো লাগছে না! আমাকে প্রাসাদে নিয়ে চলুন!”
মীর এগিয়ে এলো আরও, আনাবিয়ার মুখখানা নিজের দুহাতের ভেতর ভরে উঁচু করে নিজের মুখের একদম কাছে নিয়ে এসে শুধোলো,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭০
“তোমার সাথে কি আমার শরীরের পাশাপাশি কোনো মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক ছিলো শিনজো? আমি কি তোমার প্রেমিক ছিলাম? একটিবার বলো প্লিজ, একটিবার সত্যি কথাটি বলো আমাকে!”
মীরের জোরালো শ্বাস এসে বাড়ি খেতে রইলো আনাবিয়ার মুখপরে। মীরকে এত কাছে দেখে আনাবিয়ার শ্বাস ঘন হয়ে উঠলো আচমকা। অতিরিক্ত আতঙ্কে, বিস্ময়ে, উত্তেজনায়, তৎক্ষনাৎ জ্ঞানলুপ্ত হলো সে!

Next part taratari deben please onek late kore denn