বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৪
রানী আমিনা
হসপিটালের বেডে মীরের যখন ঘুম ভাঙল ততক্ষণে ভোরের আলো বেশ জোরদার হয়েছে। ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত খানা দিয়ে চোখ কচলাতে গিয়ে স্মরণ হল গতরাতের কথা৷ আনাবিয়াকে মনে পড়তেই ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখল সে, তখনি চোখে পড়ল অদূরে চেয়ারে বসে থাকা ইলহানকে। মীরকে তার দিকে শ্যোণ দৃষ্টিতে তাকাতে দেখেই সে সোৎসাহে বলে উঠল,
“গুড মর্নিং, ব্রাদা’।”
মীর আচমকা ক্রুদ্ধ হলো, ক্ষুব্ধ স্বরে সে ডেকে উঠল,
“শিনজো, শিনজো”
মীরের ঝাঝাল কন্ঠ শোনা মাত্রই করিডর থেকে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকল আনাবিয়া, শঙ্কিত গলায় বলে উঠল,
“কি হয়েছে? চিৎকার করছ কেন? ব্যাথা বেড়েছে?”
আনাবিয়া এগিয়ে এলো মীরের আঘাতপ্রাপ্ত স্থান গুলো পর্যবেক্ষণের জন্য, কিন্তু মীর ইলহানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এ এখানে কি করছে? কে ডেকেছে ওকে?”
“আরে বাবা আস্তে, এটা হসপিটাল! আর চাচাজি এসেছেন তো কি হয়েছে? তোমার অসুস্থতার খবর শুনে দেখতে এসেছেন। তুমি এমন করছ কেন তার সাথে? ভালো ব্যাবহার করতে পারনা একটু?”
মীর দ্বিগুণ রেগে কিছু বলতে নিবে, তখনি বাইরে থেকে ছোট ছোট পায়ে হেটে ভেতরে এলো লুসি। মীর ওকে দেখে থেমে গিয়ে আনাবিয়ার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে শুধলো,
“ও কে?”
“চাচাজির ইন্টেনডেড।”
মিষ্টি হেসে বলল আনাবিয়া, ইলহান গলা খাকারি দিল তৎক্ষনাৎ। লুসি কিছু বুঝতে না পেরে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল এই তিন নিশ্চুপ মানব মানবীর দিকে। মীর লুসিকে একবার দেখে ইলহানের দিকে ফিরে রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“এই টুকু বাচ্চা মেয়েকে তুই বিয়ে করবি? পেডো নাকি তুই?”
“ইশ্, বলছে দেখ কে? নিজে আমার দুধের মেয়ে বিয়ে করে বসে আছে, মেয়েটার মুখের দিকে তাকান যায়না! আর আমাকে বলে পেডো!”
আনাবিয়া হকচকিয়ে গেল, গাল লাল হয়ে গেলো তার। দ্রুত লুসির হাত ধরে বাইরের দিকে টেনে নিয়ে যেতে বলল,
“চলো লুসি, এরা সবাই খারাপ।”
আনাবিয়া যেতেই ইলহান ফিরিস্তি দেওয়ার সুরে বলল,
“লুসি উপযুক্ত বয়সে পৌঁছলে তখন বিয়ে করব, এখন করছি নাকি আমি? দিনে দিনে ব্রেইনলেস হয়ে যাচ্ছিস, আগে তো এমন ছিলি না!”
মীর কিয়ৎক্ষণ ওর দিকে শীতল চোখে চেয়ে থেকে নাকের পাটা ফুলিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“বের হ। দরজাটা ওদিকে। তোর মুখ দেখতে আমার ইচ্ছে করছে না।”
“তাহলেই চিন্তা কর তোর মুখ দেখতে লোকের কত কষ্ট হয়!”
“তুই এখানে এসেছিস কেন?”
“আমার মেয়ে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করছে আর আমি আসব না? হাজার হলেও আমার মেয়ের জামাই হাত ভেঙে পড়ে আছে!”
বলে খিক খিক করে হাসল ইলহান। মীর ওর সস্তা কৌতুকে বিরক্ত হল। ডাকল আবার,
“শিনজো!”
আনাবিয়া দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিল, মীর ইশারায় কাছে ডাকল ওকে। লুসিকে নিয়ে ভেতরে এলে ইশারায় ওকে বিছানায় বসতে বলল। আনাবিয়া বেডে উঠে বসলে জিজ্ঞেস করল,
“সকালে খেয়েছো কিছু?”
“না, ক্ষিদে নেই, পেট কেমন ভরা ভরা লাগছে।”
“গতকাল যত আবোলতাবোল খেয়েছ সেগুলো এখন তোমাকে পীড়া দিবে শিনজো। ডক্টরকে বলে হজমের ওষুধ খেয়ে নাও, নইলে এবার পেট ব্যাথা শুরু হবে।”
মীরের কথা শেষ হতে না হতেই আনাবিয়ার মুখখানা প্রায় চুপসে গেলো। ইলহান ব্যাস্ত হয়ে পড়ল লুসির সাথে মীরকে পরিচয় করিয়ে দিতে। লুসি বিস্মিত চোখে একবার ইলহান আর একবার মীরের দিকে চাইতে রইল। ইলহান বেশ মজা পেলো তা দেখে। মীর বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলনা আনাবিয়ার ভয়ে।
আচমকা তার মনোযোগ গেলো আনাবিয়ার শুকনো চেহারার প্রতি। উদাস চোখে সে চেয়ে আছে বিছানার সফেদ চাদরের দিকে, পলক পড়ছেনা চোখের। মীর হাত রাখলো ওর মাংসল ঊরুর ওপর, আনাবিয়া চমকে তাকালে জিজ্ঞেস করল,
“কি ব্যাপার? মন খারাপ কেন আমার শিনজোর?”
আনাবিয়া কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে অসহায় মুখ করে মৃদুস্বরে বলে উঠল,
“বুকজ্বালা করছে!”
মীর চিন্তিত মুখে উঠে বসলো, জিজ্ঞেস করলো,
“টয়লেটে যাবে?”
“উহুম….. খাবার…. খাবার মনে হচ্ছে বুকে উঠে আসছে!”
কথা শেষ করতে না করতেই আচমকা সশব্দে মীরের গা ভাসিয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে দিলো আনাবিয়া। ইলহান লুসিকে নিয়ে ছিটকে সরে গেল বিছানার নিকট থেকে, ঘৃণায় মুখ কুচকে নিল তৎক্ষনাৎ, ব্যাস্তস্বরে বলল,
“আমি ডাক্তারকে খবর দিয়ে আসি৷”
বেরিয়ে গেলো সে দ্রুতপায়ে।
দ্বিতীয় বার বমির বেগ আসতেই আনাবিয়া টলমল পায়ে নেমে যেতে চাইল বিছানা থেকে, মীর আটকাল তাকে তৎক্ষনাৎ। বিছানার পাশে রাখা টাবটা দ্রুত হাতে উঠিয়ে নিয়ে বলল,
“এখানে করো, উঠতে হবে না।”
আনাবিয়া সশব্দে বমি করতে রইল, মীর ওর এলোমেলো চুলগুলোকে মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“বলেছিলাম রয়ে সয়ে খেয়ো। শুনোনিত আমার কথা! এখন কষ্টটা কে পাচ্ছে?”
আনাবিয়া হাঁফাতে শুরু করল, গাল বেয়ে কষ পড়তে রইল তার, চোখ ভরে গেলো লোনা পানিতে। মীর টাবটা নীচে রেখে দিয়ে একহাতে ধরে নামাল ওকে, বলল,
“হাত মুখ ধুয়ে নিবে চলো, গোসল দিতে পারলে বেস্ট হবে। গুরুজনদের কথা না শুনলে কি হয় দেখেছো? এখন থেকে টু দ্যা পয়েন্টে আমাকে মেনে চলবে।”
নিজের সাথে ধরে আনাবিয়াকে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে চলল সে। মীরের গা থেকে বমির উটকো গন্ধে আবারও গা গুলিয়ে এলো আনাবিয়ার, অথচ মীর কত অবলীলায় তার এই উৎকট গন্ধ গায়ে নিয়ে ঘুরছে! দুর্বল চোখে মীরের দিকে একবার চেয়ে দেখলো সে, নির্বিকার তার মুখভঙ্গি।
তখনি কয়েকজন নার্স হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো কামরাতে, আনুগত্য জানিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় তারা এগিয়ে এলো আনাবিয়াকে ধরে নিতে। কিন্তু কদম বাড়াতেই থেমে গেলো মীরের হাতের নিঃশব্দ ইশারায়।
স্যাটিনের পর্দার ফাঁকা দিয়ে দুপুরের তীব্র রোদের এক ফালি এসে পড়ছে বিছানার ওপর, আনাবিয়া ভেজা চুলে ঘুমিয়ে আছে মীরের বক্ষপরে। এক বমিতেই শরীরের সারা শক্তি যেন গায়েব হয়ে গেছে তার, ঠান্ডা পানিতে গোসল দিতেই ঘুম এসে ঝাপিয়ে পড়েছে চোখে।
রোদটা ঘুরে এসে পড়ল আনাবিয়ার মুখের ওপর। ওর এই চোখজুড়ানো, শান্ত ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইলনা মীর, হাত বাড়িয়ে সন্তর্পণে টেনে দিল পর্দা। ইলহান বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেছে একটু আগেই। সাথের বাচ্চা মেয়েটি আনাবিয়ার কাছে থাকার বায়না করলেও ইলহান এটা সেটা বুঝিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে তাকে।
হাতের ব্যান্ডেজটির দিকে দেখল মীর, ডাক্তার এক সপ্তাহ রাখতে বলেছেন। কিন্তু এখনি এটাকে বিরক্ত লাগছে তার, আনাবিয়াকে ঠিকমতো জড়িয়ে ধরতে পারছেনা এই আপদটার কারণে। এক সপ্তাহ সে কিভাবে এই হাতে তার শিনজোকে অনুভব না করে থাকবে ভেবে পেলনা। তাকাল আনাবিয়ার মুখপরে, মৃদুলয়ে শ্বাস ছাড়ছে সে ছন্দে ছন্দে। টেরাকোটা রঙা ঠোঁট জোড়া ফুলে আছে অভিমানী ছোট্ট শিশুর মতন।
হাত বাড়িয়ে একবার ছুঁয়ে দিল কোমল অধরজোড়া। আনাবিয়া ঠোঁট কুচকে নিল সাথে সাথেই, চোখ কুচকে নড়েচড়ে উঠে অন্যদিকে ঘাড় ফিরিয়ে ঘুমোতে নিল আবার। মীর বলে উঠল,
“আর কত ঘুমোবে আমার প্রাণ? দিনে এত ঘুমোলে রাতে ঘুম আসবেনা তোমার। উঠে বসো শিনজো। পেট খালি তোমার, খেয়ে নাও কিছু। ”
আনাবিয়া শ্বাস ছেড়ে ঘুম জড়ানো স্বরে বলে উঠল,
“প্রাসাদে চলো, আমার একদম ভাল লাগছেনা এখানে।”
আচমকা করাঘাত পড়লো কেবিনের দরজায়, বাহির হতে ভেসো এলো কারো কন্ঠস্বর,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইছি।”
মীর আনাবিয়ার ঘুমে কাতর মুখখানা দুহাতে তুলে বলে উঠল,
“তোমার বড় ছেলে এসেছে দেখো, উঠো।”
কোকোর উপস্থিতির কথা জানা মাত্রই আচমকা দীপ্তি হারাল আনাবিয়ার শুভ্র চেহারা। মীরের বুক থেকে নেমে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে এগোতে সে বলে উঠল,
“আমি এখন কারো সাথে দেখা করতে চাইনা৷”
সে ওয়াশরুমে ঢুকতেই মীর কোকোকে ভেতরে আসতে বলল, কোকো দরজা ঠেলে ভেতরে এসে আনুগত্য জানিয়ে চিন্তিত স্বরে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়েই আমি চলে এসেছি। আপনার শরীর এখন কেমন? হাতের ফ্র্যাকচারটা কি খুব গুরুতর?”
মীর উত্তর দিলনা, কিয়ৎক্ষণ শান্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে তর্জনীর ইশারায় কাছে ডাকল। কোকো একটা ঢোক গিলে মীরের নাগালে আসতেই আচমকা এক হাতে ক্ষিপ্র বেগে কোকোর গলা চেপে ধরল সে!
মীরের এমন হঠাৎ আক্রমণে খেই হারিয়ে ফেলল কোকো, ভয়ে বিস্ময়ে মীরের দিকে কোনোরকমে চোখ তুলে তাকাতেই মীর চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“শিনজো তোর সাথে কথা বলতে চায়না কেন? কি করেছিস তুই?”
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি! আম্…. আমি ক্-কিছু করিনি! জ্-জানিনা কি হ্-হয়েছে! বিশ্… বিশ্বাস করুন!”
মীরের হাতে থেকে নিজের গলা ছাড়ানর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল কোকো। মীর কিছুক্ষণ শকুনি চোখে চেয়ে থেকে অবশেষে ছেড়ে দিল ওকে। কোকো ছাড়া পেয়ে হাঁফাতে রইল রেসের ঘোড়ার মত। মীর রুক্ষ গলায় বলে উঠল,
“ও ওয়াশরুমে গেছে, বের হলেই ক্ষমা চাইবি। ও যদি তোকে ক্ষমা না করে তবে তোর অবস্থা আমি খারাপ করে দিবো।”
আনাবিয়া বেরিয়ে এলো কিছু পরেই। মীরের ধারালো দৃষ্টির তোপে তৎক্ষনাৎ কোকো যথাসম্ভব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করল নিজেকে। কিন্তু আনাবিয়ার দৃষ্টি এড়ালোনা ওর অস্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস। এগিয়ে এসে কোকোর দিকে কিয়ৎক্ষণ ভ্রু কুচকে চেয়ে থেকে মীরের দিকে ফিরে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি করেছ তুমি ওর সাথে?”
“কে? আমি? আমি কি করবো? কিসব প্রশ্ন করো!”
নিরীহ কণ্ঠে বলল মীর। আনাবিয়া ওর দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে থেকে কোকোর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“ও কিছু করেছে তোর সাথে? সত্যি কথা বল!”
কোকো তড়িৎ বেগে মাথা নাড়াল দুদিকে। মীর তা দেখে নাখোশ হয়ে বলে উঠল,
“আমি যে বললাম কিছু করিনি সেটা তোমার বিশ্বাস হলনা? ওর কাছে নতুন করে জিজ্ঞেস করতে হল?”
“তোমার খুনো চেহারাকেও আমি বিশ্বাস করতে পারি, কিন্তু এমন নিষ্পাপ চেহারা নয়।”
“অহ্৷”
অতিরিক্ত ভালোমানুষি দেখাতে গেলে ধরা পড়ে যাবে ভয়ে মীর চুপ করে গেল। আনাবিয়া কোকোর কাছাকাছি গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে রইলো কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে কিনা। চোখ জোড়া লালচে হয়ে আছে তার, ঢোক গিলছে ধীরে।
কোকো গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“আমি ঠিক আছি আম্মা, আমার কিছুই হয়নি।”
কোকোর কন্ঠস্বর ফ্যাসফ্যাসে শোনালো। মীর অন্যদিকে চেয়ে ছিলো, কোকোর মুখে আনাবিয়াকে আম্মা সম্বোধন শুনতেই ক্রুদ্ধ চোখে তাকালো সে। সেদিনে মীরের দেওয়া হুমকি স্মরণ হতেই কোকো মাথা নিচু করে নিলো তৎক্ষনাৎ।
আনাবিয়ার নীরিক্ষণী নজর তখন গেলো ওর গলার দিকে। পেশিবহুল গলাতে লম্বাটে, শক্ত আঙুলের লালচে দাগ স্পষ্ট। আনাবিয়া দাঁতে দাঁত চেপে মীরের দিকে ফিরলো, মীর গলা খাকারি দিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। কোকোকে দেয়ালের ধার ঘেঁষে থাকা সোফাতে বসিয়ে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে আনাবিয়া উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,
“ঢোক গিলতে অসুবিধা হচ্ছে কিনা দেখ, শ্বাস প্রশ্বাসে বেশি প্রবলেম হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।”
“চিন্তা করবেন না আম্…. শেহজাদী, আমি ঠিক আছি। তেমন কিছু হয়নি।”
মৃদু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল কোকো। আনাবিয়া খেয়াল করল কোকোর অন্যরকম সম্বোধন, কিন্তু বললনা কিছুই। প্রসঙ্গ পালটে শুধোল,
“হাতে কি এখনো যন্ত্রণা হয়?”
আনাবিয়ার কথাতে নিজের যন্ত্রে আবদ্ধ ডানহাতখানার দিকে তাকাল কোকো। বলল,
“না শেহজাদী, মাঝে মাঝে একটু চিনচিনে ব্যাথা টের পাই, এছাড়া কিছু নয়।”
“দুপুরে খাওয়া হয়েছে?”
“না শেহজাদী, চিন্তা করবেন না, বাইরে খেয়ে নিবো।”
“বাইরে কি খাবি?”
“মাছ।”
আনাবিয়া হাসল মৃদু, মাছভক্ত কোকোর শৈশবের পেটুক স্বভাবের স্মৃতি মনে পড়ল তার। ক্ষণিক নিরবে কাটল কামরার ভেতর। আনাবিয়া মেঝের দিকে চেয়ে বসে রইল চুপচাপ। কোকো নিজেও তাকিয়ে রইল মেঝেতে, আচমকা প্রচন্ড মন খারাপ হলো তার। মীর দুজনকে একবার পরখ করে নিয়ে গমগমে স্বরে বলে উঠল,
“প্রাসাদে ফিরতে চাইলে তৈরি হয়ে নাও শিনজো।”
বলা মাত্রই উঠে দাঁড়াল আনাবিয়া, পোশাক নিয়ে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। সে চোখের আড়াল হলে মীর বলল,
“আমার অনুমতি ব্যাতিত তোকে যেন দ্বিতীয়বার শিনজোকে আম্মা ডাকতে না শুনতে পাই।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“গতকালের ইনসিডেন্টের ব্যাপারটা কতদূর এগিয়েছে?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার আদেশমত হুইলের মালিকের ব্যাবসা আজীবনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে এবং মেলার আয়োজককে উদাসীনতার জন্য দু’কোটি জরিমানা করা হয়েছে। তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে জরিমানা পরিশোধের, নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর জরিমানা পরিশোধ না করলে তার যাবতীয় সম্পত্তি সাম্রাজ্যের অধিনে নিয়ে নেওয়া হবে৷”
“গ্যুড। এখন তুমি যেতে পারো, আমরা বের হব।”
পারিষদদের সাথে বিস্তর আলোচনা শেষে মীর যখন রয়্যাল ফ্লোরে ফিরল তখন মধ্যরাত। গত এক সপ্তাহ প্রচন্ড চাপ যাচ্ছে তার। ফিলোমেলা আর মহসিন তার রাতের খাবার হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দাতেই। ওদেরকে পেরিয়ে যাবার সময় মীর জিজ্ঞেস করল,
“বাঘিনী ঘুমিয়েছে?”
“না, ইয়োর ম্যাজেস্টি। শেহজাদী প্রাসাদের ছাদে আছেন।”
বলল মহসিন। মীরের কপালে ভাজ পড়ল, ফিলোমেলার দিকে ফিরে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এত রাতে সে ছাদে কি করছে? আর তার সাথে তুমি নেই কেন?”
ফিলোমেলা ভয় পেলো। এমন কিছুর সম্মুখীনই যে সে হবে আগেই বুঝেছিলো। নত মুখে অপরাধী গলায় উত্তর দিলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী বললেন তাঁর ঘুম আসছেনা৷ আমি সাথে যেতে চাইলে তিনি যেতে দেননি, আমাদেরকে রয়্যাল ফ্লোর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছেন।”
“কেন? কি করেছো তোমরা?”
“ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি। আমরা তাঁর রাগ হওয়ার মতো কিছুই করিনি, বিশ্বাস করুন! শেহজাদী যখন যা চেয়েছেন যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে করেছি। কিন্তু….. কিন্তু শেহজাদী আজকাল অকারণে প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছেন। মহসিন চাচাকে তো দেখতেই পারছেন না। দুপুরে খাবার সময়ে চিংড়ির মালাই কারির স্বাদ মনমতো না হওয়ায় ট্রে সুদ্ধ উলটে ফেলে দিয়েছেন। রাতে তো তাকে খাবারই খাওয়াতে পারিনি কেউ!”
অসহায় স্বরে বলল ফিলোমেলা। মহসিনের দিকে তাকালো মীর, বৃদ্ধ মহসিন যে আনাবিয়ার এমন আচরণে বড়ই মর্মাহত সেটা তার ছলছল চোখেই টের পেলো৷ আনাবিয়াকে ফেরাতে কামরায় না ঢুকে পুনরায় সে এগোলো ছাদের উদ্দেশ্যে।
ছাদের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হওয়া রেড উড গাছের সুউচ্চ মগডাল গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে আনাবিয়া, চোখে মুখে তার বিরক্তি স্পষ্ট। মীরের উপস্থিতি টের পেয়েও নড়লনা, ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। মীর ভারী পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়াল আনাবিয়ার গা ঘেঁষে। আনাবিয়া বিরক্তির স্বরে বলে উঠল,
“সরে দাঁড়াও, তোমার গা থেকে শালিকের গন্ধ আসছে।”
“শালিকের গন্ধও নিয়ে ফেলেছ?”
কৌতুকের স্বরে বলল মীর। আনাবিয়া ভ্রুকুটি করে তাকাল একবার ওর দিকে। মীর জিজ্ঞেস করল,
“রাতে খাওনি কেন?”
“ভালো লাগছে না।”
“ঘুরতে যাবে?”
“না।”
আনাবিয়ার সোজাসাপটা উত্তরে মীর হাসলো মৃদু, কিসে তার প্রাণের এত রাগ হয়েছে জানতে হলে এখন তদন্ত কমিটি বসাতে হবে। গলা খাকারি দিয়ে সে মৃদুস্বরে বলে উঠলো,
“কিমালেবে যেতে হবে আগামীকাল আমাকে, কয়েকমাসের জন্য। চলো আমার সাথে, পাহাড় ঘুরে আসবে, ভালো লাগবে।”
“কোথাও যাবনা আমি।”
“কেন?”
“জানিনা কেন। তুমিও যাবেনা।”
কাঠকাঠ গলায় বলল আনাবিয়া। মীর আরেকটু কাছে সরে এসে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি না হয় যাবেনা, কিন্তু আমি কেন যাবনা?”
“আমি বলেছি তাই।”
“কাজ আছে যে আমার!”
“কাজ পরে করবে, এখন তুমি সারাক্ষণ আমার সাথে থাকবে। তুমি তখনই যাবে যখন আমার মন চাইবে, সেটাও আমাকে সাথে নিয়ে।”
“কেন?”
“অত কেন কেন করো কেন? জানিনা আমি কেন।”
ঝাঝিয়ে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর কিভাবে এই অজানা, অকারণ ক্রোধের দাবানল নেভাবে বুঝতে পারলোনা। দুহাতে আনাবিয়াকে ধরে ছাদ হতে বেরিয়ে যাওয়ার পথ ধরে এগোতে এগোতে বলে উঠলো,
“চলো, গোসল দিবে।”
“এই মাঝরাতে আমি গোসল কেন দিবো? আজব!”
“গরম মাথা ঠান্ডা করতে।”
আনাবিয়াকে এক প্রকার ঠেলে নিয়ে এলো সে রয়্যাল ফ্লোরে। বিস্তর বাকবিতণ্ডা, বিদ্রোহ, আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আনাবিয়াকে ঠান্ডা পানিতে গোসল দিতে সক্ষম হলো মীর। গোসলের পর আশ্চর্যজনকভাবেই নিয়ন্ত্রণে এলো তার মেজাজ। ঘুমোতে যাবার সময়ে মীরের গলা জড়িয়ে ধরে সে আদুরে আবদারে বলল,
“তুমি কাল কিমালেবে যাবেনা, বলে দিচ্ছি কিন্তু। আমি যখন চাইবো তখন যাবে। আমাকে ছাড়া গেলে তোমাকে আমি খুন করে ফেলবো।”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৩
“যেতেই হবে, ইনেভিটেবল।”
“কিচ্ছু জানিনা আমি, তুমি এখানে আমার কাছেই থাকবে।”
দ্বিতীয় দফার বাকবিতণ্ডার পর মীর নিরুপায় হয়ে সম্মত হলো তাতে। আনাবিয়া আস্বস্ত হওয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল মীরের বক্ষপরে।
কাকডাকা ভোরে আনাবিয়াকে বুক হতে নামিয়ে নিঃশব্দে তৈরি হয়ে শিয়রে একটা ছোট্ট চিরকুট রেখে মীর বেরিয়ে পড়লো কিমালেবের উদ্দ্যেশ্যে।
