Home বাদশাহ নামা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩+৪

বাদশাহ নামা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩+৪

বাদশাহ নামা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩+৪
রানী আমিনা

“নোমান, নোমান!”
নিজের কামরা থেকে মিহি সুরে নোমান কে ডাকতে ডাকতে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে এলো আনাবিয়া৷
নোমান মীরের কামরার সামনেই দন্ডায়মান ছিলো, শেহজাদীকে দেখা মাত্রই মাথা নত করে আনুগত্য জানিয়ে ও বলে উঠলো,
“আদেশ করুন শেহজাদী!”
“আমি মীরির কাছে যাবো। আমার মীরি কোথায় গেছে তুমি জানো?”
মুখ খানা উচু করে, নিজের হীরকখন্ডের ন্যায় উজ্জ্বল চোখ জোড়ায় আকাশসম মায়া জড়িয়ে নোমানের দিকে তাকিয়ে শুধালো আনাবিয়া।

“হিজ ম্যাজেস্টি রেড জোনের জঙ্গলে গিয়েছেন শেহজাদী। হয়তো খুব দ্রুতই ফিরে আসবেন, আপনি আর অল্প একটু অপেক্ষা করুন শেহজাদী!”
মাথা নত রেখেই উত্তর করলো নোমান। ভুলেও শেহজাদীর দিকে চোখ তুলে তাকালো না। ক্যাস্ট্রেটেড হওয়া সত্বেও শেহজাদীর দিকে সরাসরি তাকানো তাদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
“আমাকে নিয়ে চলো মীরির কাছে, আমার ভালো লাগছে না!”
মুখ নামিয়ে মন খারাপ করে বলল আনাবিয়া৷
শেহজাদীর এমন আবদারে তটস্থ হলো নোমান। ঠোঁট জোড়ায় ইতস্তত হাসি মিশিয়ে ঢোক গিলে ও বলল,
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টির আদেশ ছাড়া আমি আপনাকে সেখানে কিভাবে নিয়ে যাই বলুন? এখন তো সন্ধ্যা নেমে গেছে, আর উনি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাস্ত আছেন। তাছাড়া রেড জোনে যাওয়ার অনুমতি আমাদের কারো নেই শেহজাদী!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নোমানের থেকে এই পরোক্ষ না’ টা শোনা মাত্রই মেজাজ বিগিড়ে গেলো আনাবিয়ার। বিষণ্ণতায় মাখা মুখ খানা মুহুর্তেই শক্ত কঠিন হয়ে গেলো। ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠে তীক্ষ্ণ হয়ে গেলো চোখের দৃষ্টি।
ওকে না’ বলবে এত সাহস নোমানের কবে থেকে হয়েছে!
দাঁতে দাঁত পিষে ও চিবিয়ে চিবিয়ে, হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“আমি এখন যাবো মানে এখনি যাবো! আর তুমিই আমাকে নিয়ে যাবে এখনি, এই মুহুর্তে!”
শেহজাদীর জেদ সম্পর্কে নোমান ভালোভাবেই জ্ঞাত। তিনি যখন যা চাইবেন তাকে তখনই সেটা দিতে হবে নইলে প্রাসাদ মাথায় তুলে ফেলবেন।

কিন্তু এখন শেহজাদী যেটা চাইছেন সেটা তো ওর সাধ্যের বাইরে!
হিজ ম্যাজেস্টির অনুমতি ছাড়া ও কিভাবে শেহজাদী কে নিয়ে রেড জোনের ভেতরে যাবে! তাছাড়া ও একজন সাধারণ কর্মচারী, রেড জোনে যাওয়া মাত্রই রেড জোনের গাঢ় ভারী বাতাস ওকে চেপে ধরবে।
কিন্তু এটা এখন কে বোঝাবে শেহজাদী কে!
নোমান আর একবার ঢোক গিলে আনাবিয়া কে বোঝানোর উদ্দ্যেশ্যে ধীর গলায় ডেকে উঠলো,
“শেহজাদী. . .”

“আর একটাবারের জন্যও যদি তুমি না’ বলেছো তবে তোমাকে আমি এখনি এখান থেকে নিচে ফেলে দেবো নোমান! নিয়ে চলো আমাকে এক্ষুনি!”
এক প্রকার গর্জে উঠে বলল আনাবিয়া। নোমান ভড়কালো। শেহজাদী কে নিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই, যেকোনো সময়ে তিনি যাকিছু করে ফেলতে পারেন। তাছাড়া নোমান শক্তিতেও পেরে উঠবে না শেহজাদীর সাথে।
আর যদি ভুলবসত নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে কোনোভাবে শেহজাদীকে স্পর্শ করে ফেলে তবে হিজ ম্যাজেস্টি ওর ধড় থেকে মাথা টা আলাদা করে ফেলবে!
দুদিকেই বিপদ, এমনিও মরবে ওমনিও মরবে। তার থেকে অল্প একটু আদেশ অমান্য করে বেঁচে যাওয়াই ভালো।

জঙ্গলের ভেতরে হাত আর চোখ বেধে হাটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে প্রায় পনেরো বিশ জনের মতো মানুষকে, নারী পুরুষ উভয়ই বিদ্যমান সেখানে।
চারপাশ টা অত্যান্ত নিশ্চুপ, শুধু ক্ষণে ক্ষণে চোখ বাধা মানুষ গুলো নিজেদের আশেপাশে অনুভব করছে চতুষ্পদী শিকারী জন্তুদের বিচরণ!

শুকনো পাতার ওপর হিংস্র পশু গুলোর সতর্ক পদক্ষেপের মৃদু আওয়াজ কানের পর্দায় এসে বাড়ি খাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে৷
মানুষগুলো এখনো জানেনা ঠিক কোথায় তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছে।
অপরাধের সাজা স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড জারি হওয়ার পর বেশ কিছুদিন তাদেরকে প্রিজনে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই তাদেরকে কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই চোখ বেধে নিয়ে চলে আসা হয়েছে এখানে৷
আর এই জায়গাটা যে সাধারণ কোনো জায়গা নয় সেটাও খুব ভালোভাবেই অনুমান করতে পারছে তারা৷
আশপাশের বাতাসটা অত্যান্ত ভারী, পানির মতো; যেন পরতে পরতে বয়ে চলেছে তাদের চারপাশ দিয়ে।
ভারী বাতাস গুলো ধাক্কা দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে ওদের, চেপে ধরছে যেন আষ্টেপৃষ্টে!
হাটুর কাছে কিসমস্ত কিলবিল করে বেড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন মাটির ভেতর থেকে কোনো অদ্ভুত কিছু উঠে এসে নিজেদের ছোট্ট ছোট্ট কর্ষিকা দিয়ে ওদেরকে টেনে নিয়ে গলাধঃকরণ করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে জোরে জোরে দম নিচ্ছে ওরা সকলে, এখানের বাতাস টা যেন ওদের ফুসফুস পর্যন্ত পৌছচ্ছে না ঠিকভাবে, শ্বাসনালীতে আটকে থাকছে।

এমন সময় চোখের ওপর থেকে কাপড় সরে গেলো ওদের সকলের। এতক্ষণ ধরে চোখ বাধা থাকায় প্রথমে দেখতে একটু অসুবিধা হলেও পরক্ষণেই আশপাশ টা ওদের চোখ সওয়া হয়ে গেলো৷
রাত নেমে গেছে ধরণীতে, উঁচু উঁচু গাছগাছালির ফাঁক ফোকড় দিয়ে চাঁদের আবছা আলো এসে পড়ছে জঙ্গলের মাটিতে।
কিন্তু ওরা ঠিক কোথায়? আশেপাশে কেউ নেই কেন? এই ঘন, অদ্ভুত জঙ্গলের ভেতর ওদেরকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে?
আশেপাশে তাকিয়ে নিজেদের অবস্থান টা দেখে নিলো একবার সকলে।
কারো কারো মুখ চেনা, কেউ কেউ অচেনা৷ এদের সবার সাথেই কোনো না কোনো ভাবে প্রিজনের ভেতর সবার দেখা হয়েছে। সবাই-ই মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামী; কিন্তু ওদেরকে এখানে কেন নিয়ে আসা হয়েছে! এই অদ্ভুতুড়ে জঙ্গলের ভেতর!

ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে অন্ধকারের ভেতর এই ভয়ঙ্করদর্শন জঙ্গলটাকে পরখ করে ভয়ে শিহরণ বয়ে যেতে লাগলো ওদের শরীরে৷ গলা শুকিয়ে এলো।
এমন সময় সেখানে উপস্থিত সকলকে সচকিত করে দিয়ে কিছু একটা তড়িৎ গতিতে ছুটে চলে গেলো ওদের পেছন দিয়ে; ছায়ার মতো, যেন কোনো অশরীরী!
আঁতকে উঠলো ওরা সকলে, চাপা ভীতিপূর্ণ শব্দ বেরিয়ে এলো কারো কারো মুখ থেকে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো ওদের। নিঃশব্দে ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে রইলো ওরা সতর্ক চোখে!
ওদের সকলের হাত বাধা, এখন যদি কোনো হিংস্র পশু ওদেরকে আক্রমণ করে তবে কি করবে ওরা! কিভাবে ঠেকাবে?

এমন সময়ে খচ খচ শব্দ তুলে ছিড়ে গেলো ওদের সবার হাতের বাধন। যেন কেউ প্রচন্ড দ্রুত গতিতে ধারালো কোনো খঞ্জর দিয়ে ছিড়ে দিয়ে গেলো ওদের বাধন গুলো। কিন্তু ঠিক কে খুলে দিলো সেটা ওরা টের পেলো না, হাওয়ার গতিতে কোনো অদৃশ্য সত্তা যেন খুলে দিয়ে গেলো ওদের হাতের বাধন।
বাধন গুলো খুলে যেতেই হাসিমুখে উঠে দাড়ালো ওরা, ওদেরকে কি তবে ছেড়ে দেওয়া হবে! ওদের কি মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে না? আবার কি ওরা নিজেদের পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজনের নিকট ফিরে যেতে পারবে?
চোখে মুখে আশার আলো দেখা গেলো ওদের সকলের, মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ক্ষীণ আশায় বুক বাধলো ওরা।

কিন্তু ওদের হাসিমুখ স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ! অদূরেই হি হি করে হিংস্র ভাবে হেসে উঠলো কিছু একটা।
চকিতে ওরা তাকালো সেদিকে। তাকাতেই আত্মা কেঁপে উঠলো ওদের!
জ্বলজ্বলে চোখে সেদিক থেকে এগিয়ে আসছে একদল চারপায়ী জন্ত! চাঁদের ক্ষীন আলোয় চকচক করে উঠছে ওদের ধারালো মাংসাশী দাঁত গুলো। হি হি হাসি বের হয়ে আসছে জন্তু গুলোর মুখ থেকে। সেগুলো আরও একটু কাছাকাছি এগোতেই স্পষ্ট হলো ওদের চেহারা!
হায়েনা!

ভয়ে চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেলো আসামী গুলো।
ধীর পায়ে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, নিজেদের শাণিত দাঁত গুলো বের করে মানুষের মতো করে হিংস্র হাসি হেসে এগিয়ে আসছে হায়েনা গুলো! তাদের দানবাকার এবং ঝকঝকে দাঁতের তীক্ষ্ণতা দেখে মানুষ গুলোর হৃদপিণ্ড বেরিয়ে আসার জোগাড় হলো! হায়েনা গুলোর মুখনিঃসৃত হিংস্র হাসি যেন কাঁপিয়ে তুললো ওদের অন্তরাত্মা কে!
আর ঠিক সেই মুহুর্তেই মানুষ গুলোর ডান দিক থেকে চাপা হিংস্র গর্জন তুলে বেরিয়ে এলো একদল হিংস্র ব্লাক প্যানথার৷

আতঙ্কে মরুভূমির ন্যায় শুকিয়ে যাওয়া গলাগুলোকে ভেজানোর চেষ্টায় ঢোক গেলার চেষ্টা করলো ওরা। কিন্তু আফসোস, মুখ টাও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, গলাটা ভেজানোর জন্য সামান্য লালাও সেখানে আর অবশিষ্ট নেই!
নিজেদের দুপাশে দুই হিংস্র প্রাণীর উপস্থিতিতে এবার ধীর পায়ে পিছু হটতে শুরু করলো ওরা।
কোনোভাবেই ছুটে পালানোর চেষ্টা করা যাবে না! ছুটে পালাতে গেলেই জন্তু গুলো আক্রমণ করে বসবে ওদের!
কিন্তু পেছনে হটতে হটতে হঠাৎ করেই ধাক্কা খেয়ে বেধে গেলো ওরা কোনোকিছুর সাথে! কারা যেন দাঁড়িয়ে আছে ওদের পেছনে, সারিবদ্ধভাবে; ঠিক মানুষের আকৃতির ন্যায়।
তাদের ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে ওদের মাথার ওপর।

অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে আওয়াজ ভেসে আসছে সে মনুষ্য আকৃতির জীব গুলোর গলা থেকে, শরীর থেকে অদ্ভুত তীব্র মাংস পঁচা গন্ধ আসছে। কিন্তু পেছন ফিরে সেই মনুষ্য আকৃতির জীব গুলোর চেহারা দেখার মতো সাহস ওরা কেউ করে উঠতে পারলো না!

আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দ্রুতগতিতে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করলো ওরা, ঘামতে শুরু করলো ত্রাসের তাড়নায়। ঠিক সেই মুহুর্তেই ওদের সামনে থাকা বিশাল রেডউড গাছ গুলোর একটার মাথার দিকে ঝড়ের গতিতে উড়ে এসে পড়লো ভারী কিছু একটা, সম্পুর্ন গাছটার উপরের অংশ দুলে উঠলো তার ভারে।
নিচের আসামি গুলো হতচকিত হয়ে, আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকালো নিজেদের উপরের দিকে। রেডউড গাছের শক্তপোক্ত ডালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কেউ, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা শক্তিশালী বাতাসে থেকে থেকে উড়ছে দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটির গায়ে থাকা ঢোলাঢালা পোশাকটি।

রহস্যময় এই ব্যাক্তিটির উপস্থিতির সাথে সাথেই নিচে দাঁড়ানো আসামী গুলোর চারপাশে ঘুরে বেড়ানো জন্তুগুলোর এতক্ষণের হিংস্র, চাপা গর্জন গুলো নিরব হয়ে গেলো। আনুগত্যে যেন নুইয়ে গেলো তারা।
চরম কৌতুহল নিয়ে আসামী গুলো তাকিয়ে রইলো ওপরের দিকে, ওই ব্যাক্তিটা কে সেটা বোঝার জন্য।
তখনি চোখ মেলে তাকালো সেই দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটি। আর মুহুর্তেই দৃষ্টি গোচর হলো তার উজ্জ্বল স্বর্ণালি দ্যুতি ছড়ানো শিকারী চোখ জোড়া। মুখে ফুটে উঠলো দুর্লভ হাসি; তীক্ষ্ণ, ঝকঝকা দাঁত গুলো ঝলকালো সে হাসিতে। ঘাড়টা সামান্য কাত করে সে একবার দেখলো নিচে থাকা আসামী গুলোর ভয়ার্ত চেহারাগুলো।
আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তারা তাকিয়ে আছে গাছের ডালের ওপর দন্ডায়মান, অন্ধকারের সাথে মিশে যাওয়া কুচকুচে কালো রঙা ব্যাক্তিটির দিকে। যার জ্বলন্ত দৃষ্টি, আর হিংস্র হাসি জানান দিচ্ছে তার নিষ্ঠুর উন্মত্ততার!
ঠিক সেই মুহুর্তেই আশপাশের থমকানো পরিবেশটাকে সচকিত করে দিয়ে রেডউড গাছটির শক্তপোক্ত ডাল টিতে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তিটা নিচের আসামী দের উদ্দ্যেশ্যে মৃদুস্বরে শুধু বলে উঠলো,

— রান!
দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটার উচ্চারিত ওই একটি শব্দেই যেন সমস্ত জঙ্গল জুড়ে আলোড়ন বয়ে গেলো৷ জেগে উঠলো যেন সমস্ত রেড জোন। আশপাশ থেকে হুড়মুড়িয়ে হিংস্র পশুর পালেরা ঝড়ের গতিতে ছুটে আসতে শুরু করলো আসামী গুলোর দিকে।
গত কয়েক মাস ধরে তো এমন একটা ভুরিভোজের অপেক্ষাতেই তারা ছিলো; তাজা তাজা মাংস, যেখান থেকে ফিনকি ফিয়ে বের হবে গরম রক্ত!
মুখ ডুবিয়ে টাটকা শরীরগুলো থেকে মাংস ছিড়ে খাবে ওরা, সমস্ত মুখ জুড়ে লেগে থাকবে রক্তের দাগ, তাজা জিনিসের স্বাদটাই তো আলাদা!
আসামী গুলো ভড়কালো প্রচন্ড। নিজেদের দিকে আশপাশ থেকে সমস্ত হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের ছুটে আসতে দেখে ত্রাস লেগে গেলো ওদের।

প্রচন্ড ভয়ে, আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পারলো ছুটে পালাতে শুরু করলো। আর তাদের পেছন পেছন হিংস্র হাসি হেসে, হল্লা করতে করতে ছুটে গেলো একএক টা জন্তুর পাল! শিকারকে যদি একটু দৌড়ঝাপ করে না-ই ধরা হয় তবে তো শিকারের মজাটাই নষ্ট! তাতে যে আর কোনো বিনোদন থাকে না।
কিন্তু বেশি দূর ছুটে পালাতে পারলোনা আসামী গুলো, তার আগেই হিংস্র পশুগুলো ঝাকে ঝাকে ঝাপিয়ে পড়লো তাদের ওপর। নিজেদের ধারালো নখর যুক্ত থাবা আর তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে একের পর এক নৃশংস হামলা চালাতে শুরু করলো আসামী গুলোর ওপর। প্রচন্ড যন্ত্রণায় গগনবিদারী আর্তনাদ করে উঠলো তারা।

রেডউড গাছের চুড়াটিকে অবলম্বন করে, গাছের উঁচু ডালটিতে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটার মুখে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি। মর্মভেদী চিৎকার গুলো তার কানে ঠেকলো সুমধুর সুরের ঝংকারের ন্যায়।
তার গাঢ়, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঝলমল করে উঠলো হিংস্র আনন্দে। নিচ থেকে আসক প্রতিটি ব্যথাতুর চিৎকার তার কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে তার ঠোঁটের কোণে খেলে যেতে লাগলো এক চিলতে অদ্ভুত হাসি।
চোখ বন্ধ করে, গভীরভাবে শ্বাস নিলো সে, যেন সেই চিৎকারের প্রতিধ্বনি পরিপূর্ণ করে তুলছে তার ভেতরটাকে।
তার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়ে উঠতে লাগলো ধীরে ধীরে, প্রতিটি যন্ত্রণা পূর্ণ আর্তনাদ যেন জাগিয়ে তুলতে শুরু করলো তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো হিংস্র পশুকে, যে প্রতিমুহূর্তে হয়ে উঠতে লাগলো আরও তৃষ্ণার্ত, আরও ক্ষুধার্ত।

চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো এক নিষ্ঠুর আনন্দের ছায়া, যা নিচের আসামী গুলোর কষ্টের প্রতিটি ফোঁটা শুষে নিতে লাগলো অবিরত তৃষ্ণায়।
জন্তু গুলো দাঁত দিয়ে ছিড়ে নিতে লাগলো তাদের শরীরের মাংস, থাবা দিয়ে খুবলে নিতে লাগলো তাদের চোয়াল আর চোখ। তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠতে শুরু করলো রেড জোনের নির্দিষ্ট জায়গাটা।
কিন্তু হঠাৎই রেডউড গাছের ডালে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তিটার মনোযোগ আকর্ষণ করলো ভিন্ন কিছু একটা। নিচে চলা চিৎকার চেচামেচি, হট্টগোলের শব্দের ভেতর দিয়ে সে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো কিছু, আর তখনি তার কানে এলো একটি ছোট্ট মেয়ের মিহি কন্ঠস্বর৷ খিলখিল শব্দ তুলে হেসে সে গল্প করে চলেছে কারো সাথে অবিরাম।
আর সেটা কানে যাওয়া মাত্রই ব্যাক্তিটি নিজের গুরুগম্ভীর, বজ্রকন্ঠে আদেশের সুরে বলে উঠলো,

“সাইলেন্স”
তার মুখনিঃসৃত শব্দটা নিচে তোলপাড় করে বেড়ানো পশুদের কানে যাওয়া মাত্রই স্থীর হয়ে গেলো সকেল। যে আসামী গুলো তখনও বেচে ছিলো, বাঁচার জন্য যাদের মুখ থেকে আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিলো তখনও, তাদের সবগুলোর কণ্ঠনালী মুহুর্তেই নিজেদের ধারালো দাঁত বসিয়ে এক টানে ছিড়ে ফেলে চিরকালের জন্য স্থীর করে দিলো ওরা৷ সমস্ত রেডজোন জুড়ে নেমে এলো পিনপতন নিরবতা।
পরক্ষণেই রেডউড গাছের সুউচ্চ ডালটি থেকে লাফিয়ে নেমে সেই ছোট্ট মেয়েটির কন্ঠস্বর অনুসরণ করে স্বর্ণোজ্জল চোখের অধিকারী দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটি রাজকীয় পায়ে হেটে চলে গেলো সেদিকে।

“নোমান, নোমান! দেখো কত্ত কত্ত জোনাকি, এরা কত্ত সুন্দর!”
উচ্ছসিত কন্ঠে নিজের লম্বা চুলের মোটাসোটা স্বাস্থ্যবান দুইটা বেনী দুলিয়ে ছুটে ছুটে নাচতে নাচতে সামনে এগোচ্ছে আনাবিয়া৷ ওর সামনে হাজার হাজার জোনাকি, তাদের মিটিমিটি হলুদাভ সবুজ আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চারপাশটা।

খিলখিল শব্দে হেসে জোনাকি গুলো ধরার বৃথা চেষ্টা করে বেড়াচ্ছে আনাবিয়া।
নোমান বার বার ওকে শান্ত হয়ে থাকতে বলছে, হুট করে যদি ছুটে কোনোদিকে চলে যায় তবে নোমানের মাথাটা কোন ঘেউলে মজা করে খাবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই৷
নোমান তার সামনে ছুটে চলা আনাবিয়ার দিকে খেয়াল রাখছে, আবার চারপাশে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে বারবার। কখন কোন দিক থেকে কি চলে আসে আল্লাহ মালুম!
ভাগ্যিস শেহজাদী সাথে আছে, নইলে এতক্ষণে কার পেটে ও হজম হতো কে জানে!
মীরের ব্যাক্তিগত দেহরক্ষী আর স্পেশাল গার্ড গুলো কিছুটা সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো। শেহজাদীর কন্ঠস্বর শোনা মাত্রই এদিকে এগিয়ে এলো হামদান সহ আরও দুজন গার্ড। হামদান কে দেখা মাত্রই নোমান ছুটে এলো ওর দিকে।

“হামদান ভাই আমার, আমারে বাঁচা ভাই!”
অসহায় কন্ঠে কথা গুলো বলে হামদানের গায়ের কাছে এসে দাড়ালো নোমান, ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো আবার চারপাশটা৷ তাদের থেকে একটি নির্দিষ্ট দুরত্বে, আশপাশটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে শয়ে শয়ে হিংস্র শিকারী জন্তু জানোয়ার। অন্ধকারের ভেতর জ্বলজ্বল করছে তাদের চোখ আর দাঁত৷ সেগুলো দেখে ভয়ে আঁতকে উঠে চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়ে হামদান কে জড়িয়ে ধরলো নোমান।
কিন্তু হামদান ওকে নিজের থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
“সর গায়ের ওপর থেকে! ইয়ে টা কেটে ফেলে তো এখন পুরোপুরি মেয়ে হয়ে গেছিস দেখি! এইটুকু জঙ্গলে এসেই ভয়ে এরে ওরে জড়িয়ে ধরছিস!”

হামদানের কথায় আহত হলো নোমান। ভ্রু উঁচিয়ে মন খারাপ করে বলল,
“তুই আমাকে এইভাবে বলতে পারলি হামদান! দুজনে তো একসাথেই এখানে এসে জুটেছিলাম। তুই একটু স্বাস্থবান ছিলি বলে তোকে ওরা ফাইটিং ক্যাটাগরিতে নিয়ে গেলো। আর আমি একটু কোমর দুলিয়ে হেটেছিলাম কিনা! তাতেই আমার সব শেষ হয়ে গেলো! কিন্তু তুই এভাবে পর হয়ে গেলি ভাই আমার!”
হামদান ওর দিকে একবার বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“চুপথাক তোহ, বকিস না।”

নোমান মুখ বেকিয়ে হামদানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনে ছুটে বেড়ানো আনাবিয়ার দিকে নজর রাখলো।
আনাবিয়ার ওসব দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, ও নাচতে নাচতে এদিক ওদিক ছুটে বেড়িয়ে চলেছে। ওর ছোয়া পেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে চারপাশের গাছপালা গুলো। ফুল গুলো ফুটে উঠে উজ্জলতা ছড়াচ্ছে চারদিকে।
নিজের এই অদ্ভুত ক্ষমতা আবিষ্কার করার পরমুহূর্তেই আনাবিয়া খিলখিল করে হেসে উচ্ছসিত হয়ে এবার ছুয়ে দিতে লাগলো সমস্ত ফুলগুলোকে।
এদিক থেকে ওদিক ছুটে ছুটে, নিজের মুক্তোঝরানো হাসিতে রেড জোন টাকে সচকিত করে তুলে ফেললো ও৷
দূর থেকে মাথা নত রেখেও আড়চোখে ওর দিকে নজর রাখলো হামদান। ভুল করে আবার হিজ ম্যাজেস্টির ওদিকে না চলে যায়!

আনাবিয়া ছুটে যেদিকেই গেলো সেদিকের হিংস্র পশু গুলো আনুগত্যের সাথে মাথা নুইয়ে সরে যেতে লাগলো দুপাশে। নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রাখলো ওরা শেহজাদীর থেকে।
কিন্তু ওদের ওই উজ্জ্বল হিংস্র দৃষ্টি দেখে ভয় পেলো না আনাবিয়া, আদুরে ভঙ্গিতে আরও এগিয়ে যেতে নিলো ওদের দিকে। কিন্তু ওরা কেউ ধরা দিলো না। শেহজাদীকে ছুয়ে ফেললে যে খুব খুব অসুবিধা!
কিন্তু ওরা সরে যাওয়ায় আনাবিয়ার মেজাজ গরম হলো। ওদেরকে একটু ছুয়ে দেবে তা না, শালা গুলো সব পেছন দিকে চলে যাচ্ছে।
আনাবিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর সামনে থাকা নেকড়ের পালের দিকে তাকালো। তারপর এক হাত কোমরে গুজে দাঁড়িয়ে অন্য হাত টা উঁচিয়ে দলের সবার সামনে দাঁড়ানো আলফা কে হাতের ইশারায় নিজের দিকে ডেকে আদেশের সুরে বলে উঠলো,
“অ্যাই, তুমি এদিকে আসো।”
আলফা নেকড়ে টা শেহজাদীর আদেশ পাওয়া মাত্রই মাথা নুইয়ে এগিয়ে গেলো। নেকড়ে টা কাছে এগিয়ে আসলে আনাবিয়া আলফা নেকড়েটার গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ে ওর পিঠে ওঠার জন্য কসরত করতে করতে বলে উঠলো,

“আমাকে তোমার পিঠে নাও।”
নেকড়ে টা আলতো ভাবে নিজের পিঠ খানা নুইয়ে দিলো যেন শেহজাদী সহজে উঠতে পারে ওর পিঠে। আনাবিয়া কিছুক্ষণ চেষ্টার পর উঠে বসলো আলফার পিঠের ওপর। তারপর উচ্ছসিত কন্ঠে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
“ইয়েএএএএ, চলোওওওও!”
বলেই নেকড়েটার ঘাড়ের কাছের ফুলে থাকা নরম লোমশ অংশটা নিজের ছোট্ট ছোট্ট দুহাতের মুঠির ভেতর নিয়ে নিলো শক্ত করে।
আর আনাবিয়া ভালো ভাবে ধরে বসতেই হামদানের দিকে এক পলক তাকিয়ে ছুটতে শুরু করলো আলফা৷ আলফা ছুটতেই ওর পিঠের ওপর বসা আনাবিয়া চিৎকার করে উঠলো আনন্দে!
আলফাটা বেশি দূরে গেলো না৷ হিজ ম্যাজেস্টি রেগে যাবে না এমন একটা ছোট্ট এরিয়া ঘুরিয়ে নিয়ে আনাবিয়াকে হামদান নোমান দের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে এলো আবার৷
নোমান ওকে দেখে আনুগত্যের সাথে বলে উঠলো,

“শেহাজদী নামুন এইবার! এতরাতে ছোটাছুটি করলে পরে আপনার শরীর খারাপ করবে৷”
এমনিতেই রাতের বেলা হিজ ম্যাজেস্টির আদেশ ছাড়াই শেহজাদীকে নিয়ে সে এই মৃত্যুপুরীতে উপস্থিত হয়েছে। এখন এসে যদি তিনি এসে দেখেন তার অতি আদরে বাদর হওয়া শেহজাদী নেকড়ের পিঠের ওপর উঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে তবে শেহজাদীকে তো কিছুই বলবে না, বিপদে পড়বে ও আর এই অসহায় নেকড়ে টা৷
কিন্তু আনাবিয়া আলফার পিঠ থেকে নামতে নারাজ। সে আরও কয়েক চক্কর দিবে বলে জেদ ধরে বসে রইলো। হামদান, নোমান কারো অনুরোধেই কোনো কাজ হলো না, সে চড়বে তো চড়বেই।
আনাবিয়ার জেদের কাছে হেরে গিয়ে অগত্যা আলফাটাও আবার আনাবিয়াকে পিঠে নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড ছুটতে উদ্যত হলো।
ঠিক সেই মুহুর্তেই সেখানে আগমন ঘটলো মীরের৷

মীর এসেই আলফার দিকে দৃষ্টি দিলো। আলফা নেকড়েটা আনাবিয়াকে পিঠে নিয়ে ছুটে যেতে গিয়েও মীরকে দেখে দ্রুত গতিতে ব্রেক কষলো সেখানেই।
হঠাৎ করে আলফা থেমে যাওয়ায় আনাবিয়া ঝুঁকে পড়লো সামনের দিকে কিছুটা। মীর দ্রুত ওর বা হাতের কব্জির উপরের অংশ দিয়ে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে আগলে নিলো আনাবিয়াকে।
আনাবিয়া বাধা পেয়ে মুখ তুলে তাকালো মীরের দিকে, তারপর মায়াভরা চোখ জোড়া বড়বড় করে আবদারের সুরে বলল,
“আর একটু ঘুরি আমি?”
মীর মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার ওই চাহনির দিকে। এইভাবে তাকিয়ে এমন করে আবদার করলে ওর শিনুর আবদার ফেলবে কার সাধ্য!
মীর স্মিত হেসে ওর চুলের বেণির একটাকে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,

“ওর পিঠ থেকে নামো, তোমাকে আমি জঙ্গলে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো।”
আনাবিয়া খুশি হলো প্রচন্ড। চোখ জোড়া ঝিলিক দিয়ে উঠলো ওর খুশিতে। এই প্রথম বার ও রাতের বেলা জঙ্গলের এতটা গভীরে এসেছে, রাতের রেড জোন যে এত সুন্দর হতে পারে তা ওর জানা ছিলো না। আর এখন মীর ওকে নিয়ে ঘুরবে জঙ্গলে এটা তো স্বপ্নের মতো ঠেকবে ওর কাছে।
আনাবিয়ে উচ্ছসিত হয়ে নামতে গেলো আলফার পিঠ থেকে। আলফা তড়িঘড়ি করে নুইয়ে গিয়ে নামতে সাহায্য করলো ওকে।

এই ফাকে মীর নোমানের দিকে তাকিয়ে চোখ গরম দিলো। হিজ ম্যাজেস্টি কে নিজের দিকে এইভাবে তাকাতে দেখে নোমান ভড়কে গিয়ে অসহায় চোখে ইশারা দিয়ে বোঝালো যে তার কোনো দোষ নেই, শেহজাদী জেদাজেদি করছিলো বলেই সে শেহজাদীকে নিয়ে এসেছে এখানে। নইলে নিজে থেকে রেড জোনে আসার মতো সাহস তো ওর এই জীবনে হবেনা অন্তত।
মীর এক পলক তার শাস্তি দেওয়ার স্থানের দিকে তাকিয়ে হামদানকে চাপা গলায় আদেশ দিলো,
“ইয়্যু গায়্যিজ ক্যারি অন।”

মীরের আদেশ পেতেই হামদান সহ অন্য গার্ড গুলো সম্মতি জানিয়ে এগোলো সেদিকে।
নোমান বেচারা একা একা অসহায়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হওয়ার মতো অবস্থা। এখন এখানে ও একাএকা কি করবে? প্রাসাদে কিভাবে ফিরবে !
মীর নোমানের এই শোচনীয় অবস্থা খেয়াল করে পাশে থাকা আলফা টাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে উঠলো,
“ফ্রস্টি, ওকে প্রাসাদে পৌছে দিয়ে এসো।”
ফ্রস্টি মীরের আদেশে মাথা নুইয়ে সম্মতি জানালো। তারপর তাকালো নোমানের দিকে।
নোমানের এদিকে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। শেষ মেশ কিনা হিজ ম্যাজেস্টি ওকে একটা নেকড়ের হাতে তুলে দিলো! ওই ফ্রস্টি নামক রাক্ষসটার তাকানো দেখেই তো কলজে টা মোচড় দিয়ে উঠছে! এ যদি মাঝরাস্তায় ওকে অবলা পেয়ে ওর ওপর আক্রমণ করে তখন কি হবে!
মীর আনাবিয়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজের কনিষ্ঠ আঙুল এগিয়ে দিলো,

“আমার আঙুল ধরে হাটো শিনু।”
আনাবিয়া মীরের কনিষ্ঠ আঙুল টা নিজের ছোট্ট মুঠির ভেতরে নিয়েই নাচতে নাচতে এগোলো সামনের দিকে। আজ আর ওর আনন্দ ধরছে না!
মীর আনাবিয়াকে নিয়ে সে স্থান ত্যাগ করতেই ফ্রস্টি এগিয়ে গিয়ে নোমানকে ইশারা করলো নিজের পেছন পেছন আসার, কিন্তু নোমান এদিকে কাঁপতে শুরু করলো ভয়ে। ও জীবনেও একা একা এই নেকড়ের সাথে কোথাও যাবেনা, মাঝ রাস্তায় যদি ওর ঘাড় মটকে দেয় তখন কি হবে!
নোমান কে এক জায়গায় স্থীর হয়ে কাঁপাকাঁপি করতে দেখে ফ্রস্টি ভাবনা চিন্তা করলো কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ করেই নিজের হিউম্যান ফর্মে এলো যেন নোমানের একটু সাহস হয়।
কিন্তু ওকে হুট করেই নেকড়ে থেকে এক দীর্ঘকায় পেশিবহুল পুরুষে পরিণত হয়ে যেতে দেখেই নোমানের কলিজার পানি শুকিয়ে গেলো, ভয়ে আতঙ্কে একটা চিৎকার দিয়ে সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো ও।

হতাশ হয়ে কপাল চাপড়ালো ফ্রস্টি, শালার আগেই ভালো ছিলো! ভালো করতে গিয়ে এখন খারাপ হয়ে গেলো আরও। হিজ ম্যাজেস্টি ওর ওপর কোথাকার কোন মুরগীর দায়িত্ব যে দিয়ে গেলো!
ফ্রস্টির আশে পাশে থাকা ওর প্যাকের অন্যান্য নেকড়ে গুলো নোমানকে নিয়ে নিজেদের ভেতর চাপা সুরে হাসাহাসি শুরু করলো। ফ্রস্টি ওদের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে এবার অগত্যা কাধে তুলে নিলো জ্ঞান হারিয়ে ফেলা নোমানকে। তারপর ভারী ভারী পা ফেলে এগোলো প্রাসাদের দিকে৷

“ঘোড়ায় চড়বে শিনু?”
মীরের কনিষ্ঠ আঙুল ধরে বেণী দুলিয়ে নাচতে নাচতে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে আগানো আনাবিয়াকে মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো মীর।
“ঘোড়া! কোথায় ঘোড়া?”
উচ্ছসিত হয়ে কৌতুহলী দৃষ্টিতে মীরের দিকে মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে শুধালো আনাবিয়া।
মীর এক পলক আকাশের বুকে থালার মতো লেগে থাকা উজ্জ্বল চাঁদ টার দিকে তাকিয়ে আবার আনাবিয়ার ছোট্ট উৎসুক মুখ খানার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,
“আজ পূর্ণিমা, আজ সমুদ্রের পাড়ে অনেক অনেক ডানা ওয়ালা ঘোড়ার দেখা পাওয়া যাবে। ওদেরকে শুধুমাত্র পূর্ণিমার রাতেই দেখতে পাওয়া যায়, এছাড়া অন্যসময়ে ওরা বাইরে আসে না। তুমি চড়বে?”
আনাবিয়া হাসি মুখে প্রবল উৎসাহে ওপর নিচে মাথা নাড়িয়ে চড়বো!’ বলে আবার নাচতে নাচতে এগোতে লাগলো সামনে।

মীর ওর নাচুনি দেখে মিষ্টি করে হাসলো। চোখ জোড়া জুড়িয়ে গেলো ওর এই ছোট্ট চাঁদটার স্নিগ্ধতায়।
“আচ্ছা, ওইখানে কালো ঘোড়া পাওয়া যাবে? আমি কালো ঘোড়ায় চড়বো!”
নিজের মনে জঙ্গলের চারপাশ টা উৎসুক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে আনমনে বলে উঠলো আনাবিয়া।
“তোমার কি কালো রঙ খুব পছন্দ শিনু?”
আনাবিয়ার হাত টা ছেড়ে দিয়ে ওর নেচে নেচে এগোনোর দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে হাটতে হাটতে প্রশ্ন করলো মীর।
” হ্যাঁ, অন্নেক পছন্দ।”
“কেন?”
“তোমার গায়ের রঙ কালো যে, তাই! তোমাকে আমার অন্নেক পছন্দ, তাই কালো রঙ আমার অন্নেক পছন্দ। তুমি কত্ত সুন্দর! অন্নেক সুন্দর!”
টেনে টেনে সুর করে বলতে বলতে নিজের চারপাশের লতায়পাতায় জড়ানো গাছগুলোকে ছুয়ে দিয়ে, তাদের ফুল গুলোকে উজ্জ্বল করে দিতে দিতে এগোতে লাগলো আনাবিয়া।

“তুমি কি জানো, আমার গায়ের এই অদ্ভুত রঙের কারণে আমাকে একসময় কতটা কষ্ট পেতে হয়েছে, আমার আপনজনেরা আমাকে দূরে সরে দিয়েছে তাদের থেকে? ”
গলা খাদে নামিয়ে বলল মীর। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওর ছোটবেলার সমস্ত দুর্বিষহ স্মৃতি গুলো! সারা পৃথিবীকে একপাশে রেখে নিজের দাদাজানের ছায়াতলে বড় হওয়ার সেই দিনগুলো এসে থমকে দাঁড়ালো ওর মানস্পটে।
মীরের কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই চলা থামিয়ে মীরের দিকে ঘুরে দাড়ালো আনাবিয়া। ভ্রুজোড়া কুচকে নিয়ে চোখ জোড়াতে হিংস্রতা ফুটিয়ে ও তেজি গলায় বলে উঠলো,

“কে কষ্ট দিয়েছে তোমাকে? এত সাহস কার হয়েছে যে আমার মীরিকে কষ্ট দিবে! তাকে আমার সামনে নিয়ে আসো, তাকে আমি সাগরের পানিতে ফেলে দেবো। শার্ক এসে কামড়ে কামড়ে ছিড়ে খেয়ে ফেলবে ওকে!”
আনাবিয়ার এমন তেজি রূপ দেখে শব্দ করে স্নিগ্ধ হাসলো মীর। আনাবিয়ার দিকে এগিয়ে এসে ওর সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়লো, তারপর আনাবিয়ার শুভ্র চুলের বেণির একটা আলতো করে ধরে হাতে জড়িয়ে নিতে নিতে বলল,

“তাঁরা কেউ আর বেচে নেই শিনু, আকাশের বুকে চলে গেছেন। ”
“কেন? ওখানে ওরা কেন গেছে?”
“সবাই একটা সময়ে আকাশে চলে যায়। আমি, তুমি, আমরা সবাই একদিননা একদিন সেখানে চলে যাবো।”
“ঠিক আছে, আমি যখন আকাশে যাবো তখন ওদেরকে খুব মেরে দেবো। তোমাকে কষ্ট দেয়া ওদের বার করে দেবো।”
ভ্রুকুটি করে নিজের হাত জোড়া দিয়ে মারমুখী ভঙ্গি করে বলল আনাবিয়া। মীর হেসে উঠলো ওর অ্যাকশন দেখে।
এই অবুঝ মেয়েটা ওকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, কোনো শর্ত কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই ভালবাসে, সেখানে সামান্যতম খাদ নেই!

খরস্রোতা নদীর প্রবাহের ন্যায় বাধাহীনভাবে বয়ে চলে ওর ভালোবাসা, উন্মত্ত স্রোতের সাথে উলটে পালটে ভাসিয়ে নিয়ে চলে মীরকে, পূর্ণতায় পরিপূর্ণ করে দিয়ে যায় ওকে। পৃথিবীর কোথাও কোনো কিছু দিয়েই সে ভালোবাসা পরিমাপ করা যাবে না কখনোই!
চোখের কোণে বাষ্প জমলো মীরের, ঝিলিক দিয়ে উঠলো দৃষ্টিকোণে জমা হওয়া লোনা পানিরকণা।
সন্তর্পণে চোখের কোণ জোড়া মুছে নিতে গেলো মীর, কিন্তু আনাবিয়ার চোখ এড়ালো না সেটা।
নিজের মুখের তেজি ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেলো আনাবিয়ার। সেখানে এসে জড়ো হলো একরাশ বেদনা। ওর মীরি কি কাদছে?
মীরের দিকে এগিয়ে এসে ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে মীরের মুখের দিকে বড় বড় চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ও উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

“তুমি কাঁদছো কেন মীরি?”
” কই, কাঁদছি না তো!”
বলতে বলতে হাসার চেষ্টা করলো মীর। কিন্তু আনাবিয়ার এই সরল, সুন্দর প্রশ্নে মীরের হাসিমুখটাকে ছাপিয়েই ওর চোখ বেয়ে এবার ঝরঝর করে ঝরে পড়লো কয়েকফোটা লোনা পানি।
শশব্যস্ত হয়ে উঠলো আনাবিয়া! ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক টা ছেয়ে গেলো চিন্তায়; কি হয়েছে ওর মীরির?
দ্রুত পায়ে মীরের কাছে আরও এগিয়ে এসে ওর ছোট্ট ছোট্ট হাত জোড়া দিয়ে আগলে ধরলো মীরের মুখ খানা। তারপর মীরের চোখের পানি গুলো ত্রস্ত ভঙ্গিতে মুছে দিতে দিতে কান্নাভেজা গলায় ব্যাকুল কন্ঠে বলে উঠলো,
“কি হয়েছে তোমার? আবার কেউ কষ্ট দিয়েছে তোমাকে? আমি কি কিছু করেছি? বলো আমাকে, আমি আর সেটা করবোনা প্রমিস! বলো কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার মীরি?”
মীর ঝাপসা চোখে আনাবিয়ার ভ্রু তোলা চিন্তিত, অস্থির মুখখানার দিকে তাকিয়ে ডান হাতখানা রাখলো নিজের বুকের বা পাশে, আনাবিয়া কে বোঝালো সেখানে কষ্ট হচ্ছে ওর।
আনাবিয়া অস্থিরমনে ওর ছোট্ট ছোট্ট হাত জোড়া মীরের মুখ থেকে সরিয়ে এনে পেতে রাখলো মীরের বুকের ওপর, তারপর স্বান্তনার সুরে বলল,

“ঠিক হয়ে যাবে তুমি আর কান্না কোরোনা, তুমি কান্না করলে আমারও কান্না আসে!”
বলতে বলতে নিজেও ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেললো আনাবিয়া।
জঙ্গলজুড়ে শুরু হলো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, কুচো বৃষ্টির ফোটা গুলো এসে আলতো করে ছুয়ে দিতে লাগলো ওদের দুজনকে।
কান্নার মাঝেও মীরের মুখে ফুটে উঠলো এক অনন্য সুখানুভূতির হাসি, আনাবিয়াকে নিজের দৃঢ় হাতজোড়া বাড়িয়ে আগলে নিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে শব্দ করে একটা অশ্রুসিক্ত চুমু খেলো ওর মাথার ওপর। তারপর মুখে বলল,
“আর কোনো কষ্ট নেই আমার শিনু, তুমি ছুয়ে দিয়েছো যে! সব কষ্ট চলে গেছে আমার, একদম নেই হয়ে গেছে!”

আকাশে আজ অসংখ্য তারা ছিটানো। তার ভেতরেই একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় সগর্বে দীপ্তি ছড়াচ্ছে কাসার থালার ন্যায় বিশাল চাঁদখানা। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।
সমুদ্রের ঢেউগুলোও যেন সেই আলোয় মোড়া। ঢেউয়ের প্রতিটা ওঠানামায় তৈরি হচ্ছে সাদা ফেনা, আর সেগুলো বালুকাবেলায় এসে মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

পাড়ের ওপর থাকা বালুরাশির ওপর উপচে পড়ছে পূর্ণিমা চাঁদের উজ্জ্বল ঝকঝকা আলো; যেন এক সোনালি ক্যানভাস, যেখানে চাঁদের আলোর কোমল স্পর্শে প্রতিটা দৃশ্য আলতো করে আঁকা।
পাশেই নারকেল গাছগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে, তাদের দুর্বোধ্য ছায়া গুলো বালির ওপর ছড়িয়ে পড়ে তৈরি করে ফেলছে এক নিখুঁত ছবি। মৃদুমন্দ হাওয়ায় গাছের চেরা চেরা পাতাগুলো নড়ছে, যেন তারা এই রাতের মনোমুগ্ধকর সুরে মৃদু তালে নেচে চলেছে অবিরাম।
দূরে কোথাও ঝিঁঝি পোকারা ডেকে চলেছে তারস্বরে, তাদের ঝাঝালো কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে বাতাসের সাথে। থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে রাতের পাখিদের সুমিষ্ট সঙ্গীত।
প্রকৃতি যেন এই মনোরম রাতটিকে উপহার দিয়েছে একটি মিষ্টি মধুর সুর, যার মূর্ছনায় ধীরে ধীরে ঘুমের দেশে তলিয়ে যাচ্ছে সমস্ত প্রাণীকুল।

সমুদ্র পাড়ের এই মায়াবী রাত যেন থমকে দিয়েছে সময়কে; সবকিছুই নিস্তব্ধ, একইসাথে আশ্চর্যরকম জীবন্ত।
তারই মাঝে চাঁদের আলোর ঝলমলে উজ্জ্বলতার নিচে সমুদ্রের ঝিকিমিকি বালুকা রাশির ওপর দিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে এক ঝাক সাদা, কালো আর বাদামি রঙা ঘোড়া।
প্রচন্ডরকম উজ্জ্বলতায় ঘেরা ঘোড়াগুলো মসৃণ দেহের ওপর চাঁদের নরম আলো পতিত হয়ে, প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করে উঠছে।

পিঠের ওপর থাকা বিশাল বিশাল পাখা গুলোয় সমুদ্রের ভেতর থেকে ছুটে আসা শীতল ঝড়ো হাওয়ায় ঢেউ খেলে চলেছে। বাতাস কেটে ওরা এগিয়ে নিয়ে চলেছে ওদের ডানা জোড়া।
ছুটছে ওরা, ছুটে চলেছে বাঁধনহারা স্বাধীনতায়, যেন মাটিতে তাদের কোনো ভার নেই।
দৌড়ের প্রতিটা পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ওদের দৃঢ় পেশিগুলো। কালো, লম্বা রেশমসম কেশরগুলো বাতাসে বুনোভাবে উড়ে তৈরি করে চলেছে কোনো ছবির বুনট।
স্বপ্নের মতো জীবন্ত হয়ে উঠেছে সমুদ্রের পাড়টা। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে চুপিসারে সজীব করে তুলেছে এ রাতটিকে।

মীর আনাবিয়ার ডান হাতটা নিজের বাহাতের মুঠির ভেতর ধরে নিয়ে হাটছে সমুদ্রের পাড়ের উদ্দ্যেশ্যে। দীর্ঘকায় মীরের হাতখানা ধরে রাখতে গিয়ে আনাবিয়াকে খুব বেগ পেতে হচ্ছে।
নিজের হাতটায় বার বার টান পড়ছে ওর। মাঝে মাঝেই পায়ের গোড়ালি উচু করে নিজের হাত টাকে টান খাওয়া থেকে বাচাচ্ছে ও। মীর সেটা লক্ষ্য করে হাসছে চুপিসারে, কিন্তু কিছু বলছে না।
কিছু মুহুর্ত পরেই আনমনা আনাবিয়ার চোখ গেলো চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সমুদ্রের পাড়ের সেই অতিপ্রাকৃত স্থানটিতে। আর সেখানের ওই বিশাল উচ্চতার হৃষ্টপুষ্ট ঘোড়া গুলোকে দেখা মাত্রই আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে চিৎকার করে উঠলো ও। তারপর মীরের হাতের মুঠি থেকে এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে ও ছুটলো সেদিকে। পেছন থেকে মীরের উৎকন্ঠিত কন্ঠের সাবধান বানী ভেসে এলো
“আস্তে ছুটো শিনু, পড়ে গেলে ব্যাথা পাবে কিন্তু!”
কিন্তু মীরের সাবধান বানী ওর কর্ণগোচর হলো না। অতিশয় আনন্দে কলকলিয়ে হেসে, উৎফুল্ল চিত্তে ও ছুটে গেলো ঘোড়া গুলোর দিকে।

হঠাৎ কোনো মানব শিশুর মিহি কন্ঠস্বর কানে আসতেই এতক্ষণ মনের আনন্দে ছোটাছুটি করতে থাকা ঘোড়াগুলো হকচকিয়ে গিয়ে চমকে তাকালো শব্দের উৎসের দিকে। এত রাতে রেড জোনের ওই সমুদ্র পাড়ে কোনো সাধারণ মানুষের আগমন একেবারেই অসম্ভব, তবে কে এলো এখানে! কার কন্ঠস্বর শুনে থমকালো ওরা!
সন্ধানী দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকাতেই ওদের চোখে পড়লো দু হাত মেলে ওদের দিকে ছুটে আসতে থাকা চাঁদের টুকরোর ন্যায় শুভ্র, উজ্জ্বল এক মেয়ে।
হীরকখন্ডের ন্যায় ঝলমল করছে তার চোখ জোড়া, যেন সেখানে লুকিয়ে আছে এক অতলস্পর্শী সমুদ্রের ন্যায় গোপনীয়তা।

পরণের গাড় সবুজের ওপর সাদার মিশ্রণের ঢিলাঢালা রোবটা তার ছোটার গতিতে হাওয়ায় ভেসে চলেছে। চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ঝিকিমিকি করছে তার ঘন, সফেদ রঙা চুলগুলো। রাতের বাতাসে ভেসে চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার খিলখিলে হাসি।
আনাবিয়ার এই হঠাৎ উপস্থিতিতে মুহুর্তের ভেতরেই সেখানের স্নিগ্ধ পরিবেশ টা হয়ে উঠলো আরও স্নিগ্ধ, আরও মনোরম!

চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করতে থাকা ঘোড়া গুলো ওদের ডানা উঁচিয়ে, মাথা নুইয়ে, ধীর পায়ে এগিয়ে এলো আনাবিয়ার দিকে।
এ যে তাদের শেহজাদী! শিরো মিদোরি আর দেমিয়ান বংশের বহুল আকাঙ্খিত মানবী। পরক্ষণেই তাদের নজর গেলো লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে আসা শেহজাদীর পেছনে ধীর, গুরুগম্ভীর পদক্ষেপ তুলে হেটে আসা, পঞ্চদ্বীপের একচ্ছত্র অধিপতি বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান!
সাথে সাথেই সেই পঙ্খিরাজ ঘোড়াগুলোর দলপতি উচ্চস্বরে হ্রেষাধ্বনি তুলে সাবধান করলো অন্যদের। আর দলপতির আহ্বানধ্বনি কানে যাওয়া মাত্রই সমস্ত ঘোড়া গুলো ছুটে এসে দাঁড়িয়ে গেলো সারিবদ্ধভাবে। তারপর তাদের দিকে হেটে আসা মীরের উদ্দ্যেশ্যে প্রবল আনুগত্যে মাথা নোয়ালো সামান্য।
মীরের সেসব দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, ওর সতর্ক দৃষ্টির পুরোটাই আনাবিয়াতে নিবদ্ধ। মেয়েটা প্রাণবন্ত, অস্থির!
বেণী দুলিয়ে, লাফালাফি করতে করতে সে ছুটে চলে গেলো ঘোড়াগুলোর একেবারে সামনে দাঁড়ানো কুচকুচে কালো রঙা ঘোড়াটার দিকে গিয়ে লাফিয়ে গলা জড়িয়ে ধরতে গেলো তারা, কিন্তু দীর্ঘকায় ঘোড়াটার গলা পর্যন্তও লাফিয়ে ঠাঁই পেলো না আনাবিয়া।

দলপতিটা তৎক্ষনাৎ নিচু হয়ে আনাবিয়াকে তার গলা জড়িয়ে ধরতে সাহায্য করলো। আনাবিয়া দলপতিটার গলা জড়িয়ে ধরেই লাফাতে লাফাতে, আনন্দে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,
“দেখো এ কত্ত সুন্দর! এই ঘোড়া টা আমার, এটাতে আমি চড়বো!”
মীর ওর দিকে এগোতে এগোতে সাবধানী কন্ঠে বলল,
“ঠিক আছে চড়বে, কিন্তু আগে লাফালাফি বন্ধ করো! যেভাবে স্প্রিঙের মতো লাফাচ্ছো, তাতে পা একটু এদিক ওদিক হলেই মচকাবে। আসো, তোমাকে ওর পিঠে উঠিয়ে দিই।”
শেষোক্ত কথাটা আনাবিয়ার বাহুতলে হাতে দিয়ে ওকে উঁচু করে ধরে কালো রঙা ঘোড়াটার পিঠের ওপর উঠিয়ে দিতে দিতে বলল মীর৷

আনাবিয়া ঘোড়াটার পিঠে ওঠা মাত্রই উচ্ছসিত হয়ে উঠলো। চোখ জোড়া ওর ঝিলিক দিয়ে উঠে প্রকাশ করলো ওর অত্যাধিক আনন্দের অনুভূতি! পিঠের ওপর উঠেও আনাবিয়ার পা জোড়া শান্ত হলো না, ঘোড়াটার শরীরের দুপাশে রাখা পা দুইটা দ্রুত গতিতে তালে তালে নাচাতে লাগলো ও। ছোট্ট ছোট্ট হাত জোড়া দিয়ে মুঠি করে ধরলো ঘোড়াটার ঘাড়ের কাছের কেশর গুচ্ছ। লম্বা লম্বা কেশরের স্পর্শে সুড়সুড়ি লাগলো ওর। খিলখিলখিল করে হেসে উঠলো ও আবারও৷

মীর আনাবিয়ার উচ্ছসিত মুখখানার দিকে তাকালো, ওর মনে পড়ে গেলো নিজের শৈশবের কিছু ঝাপসা স্মৃতি। প্রথমবার যখন দাদাজানের সাথে কোনো এক পূর্ণিমার রাত্রে সে এইখানে এসেছিলো সেদিন সেও আনাবিয়ার মতোই প্রচন্ড রকম দুরন্তপনা করেছিলো! ঘোড়ার পিঠে চড়ার জন্য ওর আর তর সইছিলো না!
আজ ছোট্ট আনাবিয়ার ভেতর সে নিজের শৈশবের প্রতিচ্ছবিই দেখছে। এই মিষ্টি মেয়েটা হুবহু ওর মতো কিভাবে হলো! ওর মতো রাগ, ওর মতো জেদ, ওর মতো উচ্ছাস, ওর মতো আচরণ, ওর মতো কথাবার্তা! সবকিছুই ওর মতো!
নিবিড়, হৃদয়গ্রাহী দৃষ্টিতে মীর তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ আনাবিয়ার ওই চঞ্চল মুখোশ্রির দিকে। এরপর নিজেও উঠলো ঘোড়াটার পিঠের ওপর৷ তারপর আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে প্রাণবন্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

“শিনু, আজ তোমাকে শিখিয়ে দেবো ঘোড়া কিভাবে চড়তে হয়।”
আনাবিয়া ঘোড়াটার ঘাড়ের নিকট ফুলে ফেপে থাকা কেশর গুলোকে নিজের ছোট্ট হাত জোড়ার ভেতরে নিয়ে দলাই মলাই করতে করতে শুধালো,
“আচ্ছা, এর নাম কি?”
“ওর এখনো কোনো নাম নেই শিনু, তবে তুমি চাইলে ওকে একটা সুন্দর নাম দিতে পারো।”
আনাবিয়ার ফোলা চোয়ালদ্বয় টেনে অনুরাগ পূর্ণ কন্ঠে উত্তর করলো মীর।
আনাবিয়া মুখে হাত ঠেকিয়ে ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ কুচকে ভাবুক দৃষ্টিতে অদূরে তাকিয়ে চিন্তা করলো কিছুক্ষণ। তারপর পেছনে বসা মীরের দিকে ঘাড় টা কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে কৌতুহলী গলায় শুধালো,

“আচ্ছা, এ ছেলে না মেয়ে?”
“ছেলে।”
“তুমি কিভাবে জানলে এ ছেলে? ও কি তোমাকে বলেছে?”
“না বলেনি, এমনিতেই বোঝা যায়।”
“কিন্তু ওরা তো কথা বলেনা, ওদের মুখে তো ছেলেদের মতো দাড়িও নেই, সবাই তো দেখতেও একই রকম, তাহলে কিভাবে বোঝা যায়?”
মীর অপ্রস্তুত হয়ে কাশলো। এই মেয়েকে এখন ও কিভাবে বোঝাবে ঘোড়ার জেন্ডার কিভাবে বুঝতে হয়! কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা খাকারি দিয়ে ও বলে উঠলো,
“আছে, সিস্টেম। তুমি বুঝবে না, ছোটরা এসব বোঝে না। তুমি এখন ভালোভাবে ভেবে ওকে একটা সুন্দর নাম দাও তো দেখি।”

মীরের কথায় আনাবিয়ার মাথা থেকে ঘোড়ার জেন্ডারের বিষয়টা আউট হয়ে গেলো। নাম কি দেওয়া যায় সেটা নিয়ে আবারও ভাবতে বসলো ও৷
আমাবিয়াকে আবার ভাবতে দেখে মীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো, এখন যদি জেদ ধরে বসে থাকতো যে ঘোড়ার জেন্ডার চিনিয়ে না দিলে আজ আর প্রাসাদে ফিরবে না তাহলে ওর কি অবস্থা হতো সেটা ভেবেই মীরের কান চুলকাচ্ছে।
মীরের কথা মতো কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করেই আনাবিয়া উচ্ছসিত কন্ঠে বলে উঠলো,

“পেয়েছি! ওর নাম এখন থেকে কালাচাঁন!”
মীর শব্দ করে নির্মল হাসলো। তারপর বলল,
“ঠিক আছে, কালাচাঁন। এবার চলো।”
তারপর কালাচাঁনের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“শিনুর কালাচাঁন, তোমাকে এত সুন্দর একটা নাম দেওয়ার জন্য আমার শিনুকে একটা বেস্ট রাইড উপহার দেওয়া তোমার জরুরি কর্তব্যের ভেতরে পড়ে।”
মীরের কথাগুলো কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই কালাচাঁন মুখ থেকে অদ্ভুত হ্রেষাধ্বনি তুলে মাথা নেড়ে সায় দিলো। আর তার পরমুহূর্তেই নিজের খুরে ভর দিয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে গেলো সমুদ্রের দিকে।
আনাবিয়া খুশিতে, উত্তেজনায় চিৎকার দিয়ে উঠলো। ওর উচ্ছ্বসিত চেহারা দেখে মীর খুশি হলো প্রচন্ড। এই বাচ্চা মেয়েটিকে হাসতে দেখার মতো শান্তির হয়তো আর কিছুই নেই এই সমগ্র পৃথিবীতে।
কালাচাঁনের দ্রুতগতিতে ছুটে চলা পা জোড়া সমুদ্রতীর পার হয়ে গিয়ে পড়লো সমুদ্রের নীলচে পানির ওপর, কিন্তু ডুবলো না ওর পা।

অদ্ভুত ভাবে সেখানে যেন তৈরি হয়ে গেলো কোনো মজবুত স্থান, যা বয়ে নিয়ে চলল কালাচাঁন আর ওর পিঠে বসা আনাবিয়া আর মীর কে৷
কালাচাঁনের পা জোড়া সমুদ্রের পানিতে পড়া মাত্রই আনাবিয়ার চোখ জোড়া বড়বড় হয়ে গেলো। কালাচাঁন পানির ওপর দিয়ে হেটে চলেছে! বিস্মিত নয়নে পেছনে বসা মীরের দিকে তাকিয়ে ও অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠলো,
“মীরি, তুমি দেখছো! কালাচাঁন পানির ওপর দিয়ে দৌড়ায়!”
আনাবিয়ার বিস্মিত চেহারাটা দেখে মীরের ঠোঁট জোড়ায় ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি, চোখে মুখে ওর উপচে পড়লো আনন্দ। ওর শিনুর এই বিস্মিত, হতভম্ব চেহারাটা দেখার জন্যই তো আজ তাকে এখানে নিয়ে আসা!
মীর আনাবিয়ার শুভ্র বেণি জোড়ার একটি নিজের হাতের মুঠিতে পুরে নিয়ে সেটা ধরে সামান্য টান দিয়ে আনাবিয়ার মাথাটা নিজের বুকের ওপর ঠেকিয়ে ওর চুলের ওপর দিয়ে মাথায় একটা কোমল চুমু খেয়ে স্নিগ্ধ গলায় বলে উঠলো,

“আমি দেখেছি, আজ তুমি দেখো!”
আনাবিয়া উচ্ছসিত হয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। আনাবিয়ার উচ্ছসিত হাসিতে কালাচাঁন এবার কমিয়ে দিলো ওর ছোটার গতি, এরপর সমুদ্রের নীল পানির ওপর দিয়ে মসৃণ গতিতে হেঁটে অনুভব করতে লাগলো তার পিঠের ওপর বসা এই দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটির নির্মল প্রেমের আনন্দকে।
আনাবিয়ার দৃষ্টি মুগ্ধ, স্তব্ধ! নিজের হীরকখন্ডের ন্যায় উজ্জ্বল চোখ জোড়া বিস্ফোরিত করে ও দেখছে এই সমুদ্রের অপার সৌন্দর্য। আকাশটা ছেয়ে আছে মিটিমিটি তারায়। বাতাস বইছে মৃদুমন্দ গতিতে!
মীরের এবার হঠাৎ করেই একটা অন্যরকম কাজ করে বসলো। আনাবিয়ার বেনী জোড়া দুহাতে নিয়ে খুলে বাতাসে উন্মুক্ত করে দিলো ওর দীঘল শুভ্র কেশগুচ্ছ। সমুদ্রের বাতাসের মৃদু স্পর্শে উড়তে লাগলো আনাবিয়ার সফেদ চুল। মীরের চোখে মুখে এলোমেলো ভাবে মৃদুস্পর্শ দিতে শুরু করলো ওরা!

মীরের অদ্ভুত কাজকর্ম এবার বেড়েই চলল! আনাবিয়ার ছোট্ট কোমরে হাত রাখে, ওকে টেনে নিয়ে এলো ও নিজের একেবারেই কাছে। তারপর আনাবিয়ার ছোট্ট দেহের সমস্ত ভার নিয়ে নিলো নিজের বুকের ওপর৷ আনাবিয়া মীরের বুকে পিঠ ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে। দৃষ্টি ওর বিস্ময়াভিভূত! পূর্ণিমার রাতে যে শিরো মিদোরি রূপের বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে যায় সেটা ওর জানা ছিলো না!
মীরের প্রকৃতির এই পাগল করা সৌন্দর্যের প্রতি কোনো খেয়াল নেই। ওর মোহাচ্ছন্ন চোখ জোড়া বিস্মিত নয়নে আকাশপানে চেয়ে থাকা আনাবিয়ার দিকে নিবদ্ধ।

মুগ্ধ চাহনিতে ও তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার ওই ছোট্ট মুখখানার দিকে৷ হৃৎপিণ্ডের রক্ত প্রবাহ বেড়ে গেলো ওর ধীর গতিতে। কালাচাঁনের মৃদু দুলুনি যেন সঙ্গ দিতে শুরু করলো ওর হৃদয়ের ধুকপুকানিকে।
আনাবিয়া হাসে, নির্মল হাসি। ওর মুগ্ধ চোখের তারায় একটি বিশাল উজ্জ্বল চাঁদের ছায়া।
মীর ওর মুখের দিকে স্নিগ্ধ, মোলায়েম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আনমনে আওড়ালো,
“পূর্ণিমার রাতের এই মনোহরী চাঁদ সমস্ত জাহানের মাঝে তার আলো ছড়িয়ে দেয়! তুমি আমার এই চাঁদের থেকেও লাবণ্যময়ী শিনু, যার আলোয় শুধু আমারই মন আলোকিত হয়ে থাকে, যার অপরূপ মুখোশ্রির ঝলসানো দীপ্তি শুধু আমার হৃদয়েই ঝরে পড়ে ঝুম বৃষ্টির মতো!

চাঁদটা কতো দূরে!
কিন্তু তুমি—তুমি তো আমার কাছে, খুব কাছে, আমার হৃদয়ের পরতে পরতে।
তুমি যে আমার এই নিকষ কালো অন্ধকার জীবনের চিরন্তন পূর্ণিমা শিনু!”
কালাচাঁন এবার একটু দ্রুত চলতে শুরু করলো। আনাবিয়া মীরের বুকে ঠেকিয়ে রাখা মাথাটা উঁচু করে তাকালো মীরের মুখপানে। মীরের সাথে চোখাচোখি হলো ওর। মীর ওর শুভ্র ললাটে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে শুধালো,

“কেমন লাগছে শিনু তোমার?”
“অন্নেক ভালো লাগছে, অনেক অনেএএএক! তুমি সাথে থাকলে আমার সব ভালো লাগে!”
ঝকঝকে দাঁত জোড়া মেলে হেসে বলল আনাবিয়া। তারপর মীরের দিকে থেকে চোখ সরিয়ে আবার তাকালো সমুদ্রের নীল ঢেউয়ের দিকে।
ওর উত্তর শুনে মীর প্রেমময় হাসি দিলো। তারপর নিজের মাথাটা আনাবিয়ার মাথার ওপর রেখে আদুরে কন্ঠে বলল,

বাদশাহ নামা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১+২

“প্রাণ আমার! আমার শিনজো!”
আনাবিয়া মীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে রাখলো। এই জায়গাটার মতো নিরাপদ জায়গা পৃথিবীর আর কোথাও নেই! এই বুকে যতক্ষণ ও মাথা ঠেকিয়ে রাখবে ততক্ষণ নশ্বর কারো ক্ষমতা হবে না ওর কিছু করার।
সন্তুষ্ট চিত্তে হাসলো আনাবিয়া। আনমনেই এক অনির্বচনীয় সুখ অনুভব করলো ও। কিন্তু ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক ওর এই অনুভূতিকে কোনো নাম দিতে পারলো না।
আর এই মুগ্ধ, বিমোহিত প্রেমিক আর তার ছোট্ট, অবুঝ প্রেমিকাকে নিয়ে কালাচাঁন ছুটতে লাগলো ওর নিজস্ব গতিতে।

বাদশাহ নামা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫+৬