বাদশাহ নামা পর্ব ৩১+৩২
আমিনা
প্রাশান্ত মহা সাগরের বুক চিরে, উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে সামনে এগিয়ে চলেছে একটি সুপার ইয়ট। ইয়ট টির তৃতীয় ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে আসওয়াদ, চোখ জোড়া তার সমুদ্রের সাদা ফেনা তোলা নীল ঢেউ এর দিকে, ঘাড় বাবরি ঝাকড়া, কিঞ্চিৎ কোকড়া চুল গুলো বাতাসে উড়ছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সালিম। সে তাকিয়ে আছে তার থেকে লম্বায় চওড়ায়, জ্ঞানে, বুদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতা টির দিকে। কিছুক্ষণ আসওয়াদের দিকে তাকিয়ে থেকে সালিম প্রশ্ন করলো,
— ওখানে পৌঁছানোর পর আমাদের সেখানে কতদিন থাকতে হবে আসওয়াদ?
— আ’ম নট শিও’ বা’ সিক্সটি ইয়া’স, অ্যাপ্রকসিমে’লি, ভাইজান।
সালিমের দিকে এক পলক তাকিয়ে কথা টা বলে আবার সমুদ্রের নীল রাশীর দিকে মনোযোগ দিলো আসওয়াদ।
— আম্মাজান আমার জন্য নিজে বেছে বেছে জনা দশেক দাসী পাঠিয়েছেন৷ কিছু কিশোরী, আর কিছু বাচ্চা! যদিও আমার উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ছোয়া নিষেধ! কিন্তু আর তো মাত্র দুইটা বছরই। তারপর আমি চল্লিশে পা দেবো। ততদিনে মেয়ে গুলো আর একটু বড় হয়ে যাবে। আর বাচ্চা গুলোকে আরও দশ বছর পর কাজে লাগানো যাবে৷ কিন্তু তোমার কি হবে আসওয়াদ? তুমিও তো আর দশ টা বছর পর চল্লিশে পড়বে। কিন্তু তখন আর দাসী পাবে না!
কথা গুলো বলে দাঁত কেলিয়ে হাসলো সালিম। আসওয়াদ কিঞ্চিৎ শব্দ করে হেসে সমুদ্রের দিক থেকে ফিরে সালিমের দিকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
— চাচি জান একটা বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন৷ নইলে তোমার ফ্রি টাইম টুকু তুমি আমার মাথাটা খারাপ করতে কাজে লাগাতে। এখন যেমন করার চেষ্টা করছো। ভালো লাগছে এটা ভেবে যে আমার পেছনে না লেগে অন্তত কিছু একটা নিয়ে তুমি ব্যাস্ত থাকবে! খুবই ভালো, টাটকা কিছু নিয়ে! পারলে একসাথে তিন চার জন কে সাথে নিও, সময় টা আরও ভালো কাটবে৷
শেষের কথাগুলো নিচু স্বরে ঠোঁট টিপে হেসে বলল আসওয়াদ। সালিম আসওয়াদের দিকে মাথা টা সামান্য ঝুকিয়ে বলল,
— শুনলাম আমার চাচিজানও নাকি তোমার জন্য দাসীর অফার করেছিলেন, কিন্তু তুমি রিজেক্ট করেছো! তোমার যন্ত্রপাতি সব ঠিক ঠাক আছে তো? নাকি কাজ করে না?
নাক মুখ কুচকে খিকখিক করে হাসলো সালিম। আসওয়াদ নিজেও এবার সালিমের মতো করে সালিমের দিকে একটু ঝুকে মৃদু হেসে বলে উঠলো,
— আমার ম্যানলিনেস এর ওপর প্রশ্ন তুলোনা ভাইজান, নইলে কিন্তু তোমার দাসী একটাও আস্ত থাকবে না! তখন তোমার দিন গুলো খুব পানসে যাবে, যা আমি চাইনা।
আসওয়াদের কথা শেষ হতেই আসওয়াদ আর সালিম দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাপা সুরে হেসে উঠলো।
সাত দিনের মাথায় মাঝ রাতের পর আসওয়াদ দের ইয়ট টা এসে থামলো সেন্ট্রাল আমেরিকার এল সালভাদর রিজিওনের ‘লা লিবার্তা’ পোর্টে৷ ইয়টের ক্রু মেম্বার আর সালিমের বাচ্চা দাসী গুলোকে ইয়টে রেখে বাকি দাসী গুলোকে নিয়ে ইয়ট থেকে বেরিয়ে পড়লো সালিম আর আসওয়াদ৷ ইয়টে প্রায় পনেরো বছরের মতো খাদ্য মজুদ আছে। ক্রু মেম্বার আর অন্যরা বেশ ভালোভাবেই পনেরো ষোল টা বছর এখানে আরাম আয়েসে কাটিয়ে দিতে পারবে৷
ইয়ট থেকে বেরিয়ে ইয়টের বহির্ভাগ টা এক বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে আড়াল করে দিলো আসওয়াদ, বাইরে থেকে দেখলে সেটাকে একটা পুরোনো আমলের জাহাজ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। সব কিছু ঠিক ঠাক করে, সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমেরিকাকে খুটে খুটে দেখার উদ্দ্যেশ্যে বেরিয়া পড়লো ওরা।
বহির্বিশ্ব এখনো প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক খানি পিছিয়ে আছে। এখানে এখনো টেলিভিশনই আবিষ্কার হয়নি। এল সালভাদর থেকে প্রথমেই ওরা চলে গেলো সোজা ওয়াশিংটন ডিসি তে। তারপর সেখানেই থাকার মতো একটা জায়গা নিয়ে আসওয়াদ আর সালিম ঢুকলো সেখানের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে। প্রায় বছর দুয়েক ওখানেই থেকে লাইব্রেরি টাকে তামা তামা করে প্রচুর পড়াশোনা করলো আসওয়াদ আর সালিম। আর সেই সাথে ঘুরলো পুরো আমেরিকা মহাদেশ টা।
এরপর ওরা চলে গেলো ইউকে তে। সেখানে গিয়ে আসওয়াদ, সালিম দুজনেই অ্যাডমিশন নিলো অক্সফোর্ডে। আসওয়াদ নিলো বায়োকেমিস্ট্রি, আর সালিম নিলো ফিজিক্স। প্রচুর পড়াশোনার ফাকে ফাকে ঘুরে বেড়ালো পুরো ইউরোপ কান্ট্রি টা। আর তার কিছু বছর পরই গ্রাজুয়েট হয়ে অক্সফোর্ড থেকে বের হয়ে এলো দুজনে।
এরপর আসওয়াদের শখ হলো ও মানব শরীর নিয়ে পড়াশোনা করবে। শখ পূরণ করতে ইংল্যান্ডেরই অন্য একটা কলেজে গিয়ে ভর্তি হলো ও অ্যানাটমি তে, আর সেই সময় টা সালিম নাচানাচি করে কাটালো।
কিছু বছর পর অ্যানাটমি তে গ্রাজুয়েশন নিয়ে বের হয়ে ইউরোপ ছেড়ে ওরা আবার ফিরে এলো আমেরিকাতে; এল সালভাদরে, তাদের ইয়টের নিকট। সেখানে ইয়টের ক্রু মেম্বার দের কে আগামী পনেরো বছরের জন্য রেশন দিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়লো আবারও।
এরপর সিটিতে ফিরে দুজন মিলে সময় নিয়ে ফ্রেঞ্চ আর স্প্যানিশ ভাষা শেখা শুরু করলো। আর সেই সাথে দাদাজানের কথা মতো শিখলো ব্রাজিলিয়ান জু জিৎসু। ক্রাভ মাগা আসওয়াদের আগে থেকেই শেখা ছিলো, সেই কিশোর বয়সে দাদাজান নিজ দায়িত্বে তাকে মাস্টার রেখে ক্রাভ মাগা শিখিয়ে ছিলেন৷ তাই এইটা শিখতে তার বেগ বেশি পেতে হলো না। কিন্তু সালিমের এর আগে কোনো মার্শাল আর্ট শেখা না থাকার কারণে বেচারা কে খুব কষ্ট করতে হলো।
এদিকে নিজের শারীরিক শক্তি যথা সম্ভব কম ব্যাবহার করার চেষ্টা করেও মার্শাল আর্ট একাডেমিটির সব গুলো বাঘা বাঘা স্টুডেন্ট কে কুপোকাত করে ফেললো আসওয়াদ। শেষ পর্যন্ত এমন হলো যে কেউ ওর সাথে অনুশীলন করতেও চাইতো না। সেখানের শিক্ষক গুলোও আসওয়াদ কে এড়িয়ে এড়িয়ে চলতো। তাই বাধ্য হয়ে সালিম কেই আসওয়াদের সাথে অনুশীলন করতে হতো, আর সালিমের বারো টা বাজতো!
প্রচুর ভাষা চর্চা করে, মার্শাল আর্ট শিখে, সব জায়গায় অনেক অনেক বার করে ঘোরাঘুরি করে ওরা এবার চলে এলো রাশিয়া তে। সেখানে এসে দুজনে মিলে সময় নিয়ে রাশিয়ান এবং জার্মানি ভাষা শিখলো। আর সেই সাথে মেম্বারশিপ নিলো রাশিয়ার স্টেট লাইব্রেরি তে৷ জানা অজানা বই গুলো রাত দিন এক করে পড়তে শুরু করল আসওয়াদ। সালিমের দ্বারা ওসব হতে চায় না। ও আরাম প্রিয় মানুষ! আসওয়াদের সাথে লাইব্রেরি তে আসে ঠিকই কিন্তু বেশির ভাগ সময় টা সে বই সামনে নিয়ে ঘুমায়! তাতে আসওয়াদের সুবিধাই হয়! কারণ সালিম যতক্ষন জেগে থাকবে ততক্ষণ আসওয়াদের সাথে ফাজলামি করে গোমড়ামুখো আসওয়াদ কে হাসাতেই থাকবে, হাসাতেই থাকবে!
বেশ কয়েক বছর রাশিয়াতে থেকে, প্রচুর ঘোরাঘুরি আর পড়াশোনা করে দুজনে আবার ফিরে এলো আমেরিকা তে। এরপর আমেরিকাতে আরও একটা বছর কাটিয়ে ওরা ফিরলো এল সালভাদরের পোর্টে, ওদের ইয়টের নিকট।
এরপর আমেরিকা কে বিদায় জানিয়ে, নিজেদের ইয়ট টা নিয়ে, পানামা ক্যানাল হয়ে সোজা চলে গেলো ইস্ট এশিয়াতে। এরপর সেখানে গিয়ে চায়নার নর্দান পোর্ট ওব দালিয়েনে ইয়ট টা রেখে, ইয়টের ক্রু মেম্বার দের কে আরও পনেরো বছরের রেশন দিয়ে, ওরা আবারও বের হলো ভ্রমণে৷
চায়নাতে এসে আসওয়াদ গিয়ে ভর্তি হলো সাংহাই এর জিয়াউ তোং ইউনিভার্সিটি তে, ম্যাথম্যাটিকসে। সালিম কে সেখানে পড়তে বললে সালিম বলল তাকে দিয়ে আর পড়াশোনা হবে না। সে আপাতত প্রকৃতিবিদ হতে চায়। আসওয়াদ ও আর তাকে জোর করলো না৷ সে নেচে বেড়ালেই বরং ভালো থাকবে! পড়ার কথা বললেই সালিমের মুখ কালো হয়ে যায়! তার চাইতে হাসি খুশি থাকুক, প্রকৃতি দেখুক, এইটাই ভালো!
পড়াশোনার পাশাপাশি সালিমের সাথে রোজ প্রকৃতি দেখা আর বিভিন্ন প্রানী নিয়ে গবেষণা করতে করতে দিন পার হতে লাগলো আসওয়াদের। সেই সাথে ও অ্যাডমিট হলো সেখানের কুংফু একাডেমি তে। ম্যাথ আর কুংফুর পাশাপাশি সেখানের লাইব্রেরি গুলোতে ঢূ মারা ছিলো ওর অন্যতম কাজ৷ সময় পেলেই দুজনে মিলে চলে যেতো লাইব্রেরি তে।
সারাক্ষণ একসাথে থাকতে থাকতে ওদের দুজনের ভেতর কার সিনিয়র জুনিয়র ফারাক টা একসময় নাই হয়ে গেলো! বন্ধুর মতো সম্পর্ক হিয়ে গেলো দুজনের পুরোপুরি। কিন্তু সালিম হয়ে গেলো দুষ্টু! মাঝে মাঝেই দুষ্টু সালিম দুষ্টু দুষ্টু ম্যাগাজিন এনে আসওয়াদের পড়ার সময় ওর সামনে এনে ধরতো আর বলত কাছে তো দাসী পাবি না, ফিল নে! আর আসওয়াদ যেত চটে! সালিম ওকে আরও বেশি চটাতো! দুজনে মিলে এসব নিয়ে যখন তখন কুস্তিতে মেতে উঠতো, আর আসওয়াদ সুযোগ বুঝে নিজের শেখা বিভিন্ন মার্শাল আর্ট প্রয়োগ করতো সালিমের ওপর, আর সালিম আসওয়াদের কেলানি খেয়ে চিৎপটাং হয়ে থাকতো!
চায়না তে বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে, গ্রাজুয়েশন শেষ করে ওরা দুজনে চলে এলো জাপানে। একাডেমিক পড়াশোনা আসওয়াদের এখানেই শেষ। যত গুলো সাবজেক্ট পড়ার শখ ছিলো সব গুলই পড়া হয়েছে। আর না! এখন শুধু ঘোরাঘুরি।
জাপানে এসে জাপানি ভাষা শিখলো ওরা দুজন মিলে। প্রচন্ড রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জাপান বিমোহিত করলো ওদের। কিন্তু শিরো মিদোরির ওপরে কোনো কিছুই নয়! জাপানে কিছু বছর কাটিয়ে প্রচুর ঘোরাঘুরি করে, এরপর এলো কোরিয়া তে। সেখানে তায়কোয়ানডোর ক্লাসে ভর্তি হলো দুজন। সালিম কিছু দিন ক্লাস করে হাল ছেড়ে দিলো। এতসব কষ্ট করা ওর দ্বারা আর হচ্ছে না। কিন্তু আসওয়াদ হাল ছাড়লো না৷ বেশ কিছু বছর সেখানে কাটিয়ে তায়কোয়ানডো টা ভালোভাবে রপ্ত করে, কোরিয়া থেকে বিদায় নিয়ে ওরা চায়না ফিরে গিয়ে ইয়টে থাকা ক্রু মেম্বার দের জন্য আরও দশ বছরের রেশন দিয়ে এবার রওনা দিলো দক্ষিণ এশিয়ার উদ্দ্যেশ্যে। সেখানে গিয়ে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ ঘুরে, সব গুলো দেশের ভাষা শিখে, প্রচুর ঘোরাঘুরি করে, সেখানের সংস্কৃতি গুলো রপ্ত করে এবার শেষ বারের মতো ফিরলো চায়না তে। তারপর রওনা দিলো নিজেদের ইয়ট টা যেখানে রাখা আছে সেখানে।
রাতের প্রায় একটা। অনেক ক্ষণ ধরে গাড়িতে এক ভাবে বসে থেকে থেকে কোমর লেগে গেছিলো সালিমের। তাই ড্রাইভার কে বলে গাড়ি টা থামালো ও। এরপর বাইরে বের হয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করতে থাকলো। ওর দেখাদেখি আসওয়াদ ও নেমে এলো৷ ততক্ষণে সালিম গাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই চলে গেছে। হঠাৎ করেই সেই দূর থেকেই চিৎকার করে আসওয়াদ কে ডাক দিলো সালিম। আসওয়াদ তখন দুই হাত আকাশে তুলে আড়মোড়া ভাঙছিলো। সালিমের চিৎকারে সেদিকে এগিয়ে গেলো ও। তারপর সালিমের কাছে গিয়ে পৌছালে সালিম ওকে বলল,
— কিছু শুনতে পাচ্ছিস তুই?
আসওয়াদ কিছুক্ষণ কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো, হ্যাঁ, থেকে থেকে একটা বাচ্চার তীক্ষ্ণ কান্নার চাপা আওয়াজ ভেসে আসছে কোথা থেকে যেন! ভ্রু জোড়া কুচকে গেলো আসওয়াদ সালিম দুজনেরই। তড়িঘড়ি করে দুজনে খুজতে লেগে গেলো এই ফাকা রাস্তার মধ্যে বাচ্চা কোথায় কাঁদছে! কিছুক্ষণ শব্দ কে অনুসরণ করে হাটার পর আসওয়াদের হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার পাশে থাকা একটা বড়সড় ডাস্ট বিনে। আসওয়াদ উচ্চস্বরে ডাক দিলো সালিম কে। তারপর এগিয়ে গিয়ে ডাস্ট বিনের মুখ টা আলগা করলো।
সেই মুহুর্তে সালিম ও এসে পৌছালো সেখানে৷ আসওয়াদের দৃষ্টি অনুসরণ করে ডাস্টিবিনের মধ্যে তাকালো সে নিজেও৷ কালো রঙা পলিথিনে মোড়ানো একটা ফুটুফুটে নবজাতক। বাচ্চা টা এখন আর কাদছে না। চোখ বুজে শুয়ে আছে। গায়ে রক্ত মাখানো, নাভির সাথে এখনো লম্বা নাড়ি লেগে আছে। হয়তো কয়েক ঘন্টা আগেই কেউ ফেলে রেখে গেছে এখানে৷ ক্লান্তিতে গলা দিয়ে আর কান্না বের হচ্ছে না তার।
সালিম তড়িঘড়ি করে বাচ্চা টাকে উঠিয়ে নিলো হাতে৷ বাচ্চাটার শরীরে কিছু কিছু জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে৷ সালিম মুখ থেকে আফসোস সূচক শব্দ করলো। তারপর বলল,
— এটা কেমন অমানুষিক কাজ! একটা জলজ্যান্ত বাচ্চাকে এইখানে এইভাবে রেখে চলে গেলো! এদের কি কোনো মনুষ্যত্ব বোধ নেই!
আসওয়াদ বাচ্চাটির চোখ বোজা মুখের দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তি করলো,
— নো নেগেটিভিটি, অনলি পজিটিভিটি!
তারপর সালিম কে উদ্দ্যেশ্য করে বলল,
— এগুলো সব অবৈধ সম্পর্কের ফসল। মজা নেওয়া শেষে নিষ্পাপ বাচ্চা গুলোকে এইভাবেই এরা ডাস্ট বিনে ফেলে রাখে। এদের প্রোটেকশন ইউজ করতে কিসে সমস্যা হয় জানিনা! জাহান্নামে যাবে সবগুলো!
সালিম আর আসওয়াদ সেই গাড়িতে করেই অসুস্থ বাচ্চা টিকে নিয়ে পাশের একটি হাসপাতালে গেলো। আর এরপর বাচ্চাটির চিকিৎসার ব্যাবস্থা করে, রাত টা হাসপাতালে কাটিয়ে পরদিন সিকালে বাচ্চা টাকে সহ পোর্টে রওনা দিলো। এরপর নিজেদের ইয়টে করে আবার প্রশান্ত মহাসাগরের বুক বয়ে রওনা দিলো পঞ্চদ্বীপের উদ্দ্যেশ্যে।
দেমিয়ান প্রাসাদে বাদশাহ হুজায়ফা আদনানের কামরার পাশে থাকা বিশাল কামরাটির বিরাট ব্যালকনির লতাপাতার নকশা করা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে আসওয়াদ৷ বাষ্পাবিভূত চোখ জোড়া ওর শূন্যে।
ওরা প্রাসাদে ফিরেছে আজ দশ দিনের মতো। এসেই যে খবর টা সবার আগে আসওয়াদের কানে এসেছে সেটা হলো এলানরের মৃত্যু। আজ থেকে পয়ত্রিশ বছর আগেই এই ধরণীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। তার ভ্রমণের মাঝেই যে মায়ের মৃত্যু হবে এটা জেনেই সে ভ্রমণে গিয়েছিলো৷ পঞ্চদ্বীপে ফেরার সময় মানসিক ভাবে মা কে আর কখনো দেখতে না পাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই ও ফিরেছিলো। কিন্তু প্রাসাদে পা রাখার পরই এক অসাড়তা পেয়ে বসেছে ওকে৷ মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে, মা নেই, মা নেই!
মায়ের কামরা টার দিকে যেতেও সাহস হচ্ছে না। পুরোনো স্মৃতি গুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠে ওর রাতের ঘুম হারাম করে দিবে হয়তো! সেখানে হয়তো এখন নতুন কেউ নিজের আস্তানা গেড়ে নিয়েছে। তার মা তো ছিলো সামান্য এক দাসী। তার অনুপস্থিতিতে কারো হয়তো কিছু যাবে আসবে না! কিন্তু তার তো ওই মা টাই ছিলো সব!
আসওয়াদের ভাবনার মাঝেই সালিম এসে উপস্থিত হলো সেখানে। আসওয়াদ কে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে এসে পাশে দাড়ালো। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
— জঙ্গল থেকে ঘুরে আসি চল, তোর ভালো লাগবে৷
— কোনো কিছু করতে মন সায় দিচ্ছে না ভাইজান!
জঙ্গলের দিকে চোখ রেখে বলল আসওয়াদ। কন্ঠ রোধ হয়ে আসতে শুরু করেছে ওর! সালিম কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল,
— তাহলে দাদাজানের সাথে গল্প করবো, চল!
আসওয়াদ সালিমের কথা টা উপেক্ষা করে পালটা প্রশ্ন করলো,
— বাচ্চা মেয়েটা কেমন আছে এখন?
— ভালো আছে। ক্ষত গুলো প্রায় সেরে উঠেছে৷ ওর জন্য আমি একজন দুধ মা রেখেছি। সেই ওকে দুধ খাওয়াচ্ছে এখন৷ শরীর স্বাস্থ্য এখন একটু ভালোর দিকে গেছে তার। মেয়েটা কে দেখলেই কি যে মায়া মায়ে লাগে বলে বোঝাতে পারবো না তোকে!
— নাম রেখেছো?
— হ্যাঁ, ইনায়া। ওকে মুসলিম হিসেবেই বড় করবো।
আসওয়াদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। বাচ্চা টা ভালো আছে শুনে ভালো লাগছে এখন একটু। সালিম আবার বলল,
— হিসাব মতে আর পনেরো বিশ বছরের ভেতরেই একজন শেহজাদী আসতে চলেছেন। তার আগে পিছেও হতে পারে! হয়তো সে হবে আমাদের বোন, আর নয়তো আমাদের যে কারো সন্তান; তোমার, আমার নয়তো ইলহামের। ভাবতেই ভালো লাগছে! একজন শেহজাদী আসবে! কত আদরেরই না হবে সে সবার! মেয়ে বাচ্চা মানেই একটা অন্যরকম কিছু!
উচ্ছসিত হয়ে উঠলো সালিম। আসওয়াদ ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— মেয়েটা আল্লাহ তা’য়ালা তোমাকে দিন।
— আমিন, সুম্মা আমিন!
বলে উচ্চস্বরে হাসলো সালিম, আসওয়াদও তাল মেলালো ওর হাসিতে। এমন সময় ওদের পেছন থেকে ভেসে এলো একটি গম্ভীর কন্ঠস্বর,
— আসওয়াদ!
সালিম চমকে তাকালো পেছনে। আসওয়াদ না চমকালেও অবাক হলো। কারণ ওই গাম্ভীর্য পূর্ণ কন্ঠস্বর টির মালিক তার বাবা! জীবনে প্রথম বারের মতো তার বাবা তার কাছে এসে তার নাম ধরে ডেকেছে। এতে আসওয়াদের খুশি হওয়ার কথা থাকলেও কেন যেন ও খুশি হতে পারলো না। সালিমের উপস্থিতিতে যে বিষাদ ওর মন থেকে চলে গেছিলো বাবাকে দেখে সেটা আবার দ্বিগুণ হয়ে ভর করলো ওর শরীরে৷ মৃদু হাসি মাখা মুখ টা থেকে হাসি মিলিয়ে গেলো মুহুর্তেই।
সালিম তার চাচাজান কে দেখে সালাম বিনিময় করে পিতা পুত্র কে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলো। আর আরহাম এগিয়ে এসে দাড়ালেন ব্যালকনির রেলিঙের ধার ঘেঁষে তার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা আসওয়াদের দিকে৷ এই প্রথম নিজের সন্তান কে ভালো করে দেখলেন তিনি!
আসওয়াদ কি করবে ভেবে পেলো না। বাবাকে আজ দেখে তার কেন জানি প্রচন্ড রাগ হচ্ছে! এই লোকটি তার জন্মের পর তার মুখ দেখার পর থেকে আর একটি বারের জন্যও তার কাছে আসেননি, তাকে জন্ম দেওয়ার অপরাধে তার মায়ের কাছেও আর আসেননি! মা বেচে থাকাকালীন যতবারই আসওয়াদ মায়ের কাছে গিয়েছে ততবারই মায়ের চোখে দেখেছে প্রিয় মানুষ টাকে না পাওয়ার হাহাকার, ঠিক তার মতো!
কিছুক্ষণ বাবার দিকে নির্বিকার চোখে তাকিয়ে ব্যালকনির মাঝ বরাবর থাকা নকশাদার সোফায় বাবাকে সসম্মানে বসতে বলল আসওয়াদ৷ আরহাম সেখানে গিয়ে বসলে আসওয়াদ নিজেও বসলো বাবার বিপরীতে। তারপর বাবার দিকে প্রশ্ন ছুড়লো,
— জ্বি বলুন, কেন এসেছেন আপনি এখানে?
আরহাম কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছেলেকে দেখলেন। লম্বা চওড়া, বলিষ্ট পুরুষালি দেহের একজন পূর্ণবয়স্ক যুবক। ধারালো, শক্ত চোয়াল দ্বয় তার ইস্পাত-দৃঢ় ব্যাক্তিত্বের জানান দিচ্ছে প্রকট ভাবে। উজ্জ্বল শাণিত চোখ জোড়া তার দৃঢ়চেতা মানসিকতার চিহ্ন হয়ে যে কোনো মানুষের সম্পুর্ন মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। মাথার ঝাকড়া, কিঞ্চিৎ কোকড়া চুল গুলো ঘাড় বাবরি। মুখে খোচাখোচা দাড়ির আভাস। নিঃসন্দেহে একজন সুন্দরী রমনীর হৃদয় এক মুহুর্তে হরণ করতে এই চেহারাটা, এই অ্যাপিয়ারেন্স টা যথেষ্ট।
আরহাম মুখ খুললেন, ধীর গলায় বললেন,
— আমি জানি তুমি তোমার মা কে অনেক ভালোবাসতে। সময়ের কাছে হেরে গিয়ে সে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন। এলানরের মৃত্যুতে তুমি মানসিক ভাবে অনেক আঘাত পেয়েছো, জানি! এটা নিয়ে আর মন খারাপ করো না। নিজেকে কাজে ব্যাস্ত রাখো, তাহলে আর মা কে মনে পড়বে না।
— জ্বি।
ব্যাস এতটুকুই। এতুটুকু বলেই আসওয়াদ চুপ করে রইলো। তার সামনে বসা ব্যাক্তিটি তার জন্মদাতা পিতা। কিন্তু এই মুহুর্তে এই লোকটিকে তার একদমই পছন্দ হচ্ছে না! বিরক্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে বুক। নিজের অজান্তেই ভ্রু জোড়া কুচকে উঠলো আসওয়াদের৷ আরহাম সেটা খেয়াল করে মৃদু হেসে বললেন,
— আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না। পছন্দ না করারই কথা! বাবা হিসেবে আমার যে দায়িত্ব ছিলো তোমার প্রতি তা আমি পালন করিনি, বা করতে ব্যর্থ হয়েছি!
কথা বলার এই পর্যায়ে উঠে দাড়ালেন আরহাম, তাকে সম্মান জানিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে আসওয়াদ ও উঠে দাড়ালো। আরহাম তখন আবার বললেন,
— তবে এইটা ভেবো না যে আমি তোমাকে পুরোপুরি অবহেলা করেছি! তুমি কবে কোথায় কি করেছো না করেছো সবই আমার জানা! হয়তো সরাসরি আমি তোমার খেয়াল রাখতে পারিনি। কিন্তু তোমার আড়ালে আমি ঠিকই রেখেছি। এতে অনেক উপকার হয়েছে তোমার! তুমি যে শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছো তাতে তোমাকে প্রচুর শক্ত থাকতে হতো, যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হতে হতো, যা তুমি হয়ে গেছো! এখন আমার আর কোনো চিন্তা নেই।
শেষোক্ত কথা টা বলে আসওয়াদের দিকে এক টুকরো মৃদু হাসি নিক্ষেপ করে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন আরহাম। আর আসওয়াদ বাবার যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবার চোখ রাখলো শিরো মিদোরির জঙ্গলের ওপর।
উপযুক্ত বয়স হওয়া সত্বেও আসওয়াদ প্রাসাদের দাসী দের কে নিজের সেবায় নিযুক্ত করার প্রস্তাব টা প্রত্যাখ্যান করেছিলো। তাই এখন হুজায়ফা আদনান খুজে খুজে সবচেয়ে সুন্দরী, অল্পবয়স্কা দাসী গুলোকে নিজের নাতির সেবায় নিযুক্ত করলেন। কিন্তু এখানেই বাধলো বিপত্তি……
নিজের মায়ের মৃত্যু শোক, বাবার ওপর হওয়া রাগ আর জীবনের সমস্ত না পাওয়া গুলো ক্রমে ক্রমে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো আসওয়াদের। ভেতরে ভেতরে ফুসতে থাকা আসওয়াদের সমস্ত দিন টা কাটতো প্রাসাদের রাজ পরিবারের সদস্য দের জন্য তৈরি কৃত জ্যিমে, সেখানের ফাইটিং এরিয়াতে পাঞ্চিং ব্যাগে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করে করে; আর রাত টা কাটতো ওর জন্য নির্ধারিত সুন্দরী দাসী গুলোর সাথে, যাদের কে ও শুধু মাত্র নিজের রাগ মেটানোর জন্য নৃশংস ভাবে খুন করে ফেলতো নিজের বিছানায়, ঘনিষ্ঠরত অবস্থাতেই!
এভাবে চলতে চলতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো আসওয়াদ৷ মায়ের দেওয়া সাবধানবানী ভুলে নিজের ভেতরের পশু টাকে আরও বন্য করে তুলতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক রূপে থাকা বন্ধ করে দিলো ও। যে রূপ নিয়ে ও জন্মেছিলো সেটাকেই নিজের আসল সত্তা হিসেবে মেনে নিলো। ক্রমে ক্রমে নৃশংসতা বাড়তে বাড়তে চরম পর্যায়ে চলে গেলো ওর। কিন্তু এ খবর টা আসওয়াদের খাস কামরা আর হুজায়ফা আদনানের কান পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকলো তার বাইরে গেলো না৷
হুজায়ফা আদনান নাতির এমন কর্মকাণ্ডে প্রথমে খুবই চিন্তিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ভাবলেন এই কাজ করে যদি তার নাতি মানসিক ভাবে শান্তি পায়, তো পেতে থাকুক। আর তাই ব্যাপার টা কে সম্পুর্ন গোপন রেখে নাতির করা অপকর্ম টা কে সযত্নে ঢাকা দিলেন তিনি। সমস্ত লাশ গুলোকে নিজ দায়িত্বে একের পর এক গুম করে ফেললেন, কাকপক্ষী ও কখনো টের পেলো না!
কিন্তু এই খবর টা কোনো এক অতি গোপনীয় মাধ্যম দিয়ে পৌছে গেলো আরহামের নিকট। আর নিজের সন্তানের এহেন কর্মকাণ্ড, আর তাতে নিজের পিতার এমন পরক্ষ সায় তে যারপরনাই অবাক হলেন তিনি। সেই সাথে তার প্রচন্ড রাগ হলো হুজায়ফা আদনানের ওপর।
সেই মুহুর্তেই তিনি চলে গেলেন হুজায়ফা আদনানের খাস কামরায়, তার ছেলেকে এইভাবে অন্ধকারের ভেতর ডুবিয়ে দেওয়ার জবাব চাইতে। কিন্তু হুজায়ফা আদনান তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ শুনে আরহাম কে শান্ত কন্ঠে জবাব দিলেন,
— কি করেছো তুমি তোমার ছেলের জন্য? তার বয়স আর কিছু দিন পরই একশত তে পড়তে চলেছে। এই এত গুলো বছরে তার পেছনে তোমার অবদান কি? কি দায়িত্ব পালন করেছো তুমি তোমার সন্তানের প্রতি? অথচ তার দাদাজান হয়ে আমি তার পিতার থেকে তার প্রতি অনেক অনেক বেশি দায়িত্ব পালন করেছি। তার এই অবস্থার জন্য কে দায়ী? তুমি দায়ী, তোমার অপরিনামদর্শী কর্মকাণ্ড দায়ী৷ শুধুমাত্র জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না। পিতা হতে গেলে সন্তানের প্রতি পিতার দায়িত্ব কর্তব্য যথাযথ ভাবে পালন করতে জানতে হয়। আমি যেটা ভালো মনে করেছি সেটাই করেছি। তুমি যদি এখন তোমার সন্তান কে সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চাও তবে চেষ্টা করে দেখতে পারো। আমার কোনো বাধা নেই।
হুজায়ফা আদনানের কথা শুনে আরহামের আর কিছু বলার রইলো না। তিনি ফিরে আসলেন নিজের কামরায়। আর তার বেশ কিছু দিন পর তিনি সময় নিয়ে একদিন গেলেন আসওয়াদের কামরায়। কিন্তু আসওয়াদ দিনের বেশির ভাগ সময় টা জ্যিমে কাটায় সেটা তার জানা ছিলো না। আসওয়াদ কে কামরায় না পেয়ে তার দ্বাররক্ষকের নিকট জানতে পারলেন আসওয়াদের বর্তমান অবস্থানের কথা। আর এরপর সোজা চলে গেলেন প্রাসাদের জ্যিমে। কিন্তু জীমে ঢুকেই বুকের ভেতর টা অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠলো তার।
আসওয়াদ জ্যিমে থাকাকালীন অন্য কারো জ্যিম এরিয়ায় প্রবেশ সম্পুর্ন নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বাররক্ষকের নিকট আসওয়াদের এমন নিষেধাজ্ঞা শুনে কিঞ্চিৎ অবাকই হয়েছিলেন আরহাম৷ কিন্তু এখন এই মুহুর্তে এসে আসওয়াদ কে দেখে আরহাম বুঝলেন নিষেধাজ্ঞার কারণ!
ফাইটিং এরিয়ার একটা বিশালাকার পাঞ্চিং ব্যাগে প্রচন্ড শব্দ তুলে বিদ্যুৎ গতিতে একের পর দানবীয় আঘাত করে চলেছে আসওয়াদ। প্রতি টা পাঞ্চের সাথে আসওয়াদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে ক্রোধ মিশ্রিত চাপা হিংস্র গর্জন। কুচকুচে কালোবর্ণের, পেশিবহুল বিশালার শরীর টা শারীরিক কসরতের কারণে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে আছে। পুরু, চকচকা চামড়ার ওপর বয়ে চলা ঘামের সুক্ষ্ম স্রোত গুলোর ওপর আলোকরশ্মি পড়ে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে।
পাঞ্চিং ব্যাগ টা এমন বিশাল হওয়ার কারণ টের পেলেন আরহাম। আসওয়াদ যে শক্তি তে প্রতিটা ফিস্ট ব্লো দিচ্ছে তাতে কোনো সাধারণ পাঞ্চিং ব্যাগ ব্যবহার করলে আসওয়াদের করা দুইটা আঘাতেই তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো!
জ্যিমের দরজাটা কিঞ্চিৎ ফাকা করে এতক্ষণ আসওয়াদ কে পর্যবেক্ষণ করছিলেন আরহাম। এবার দরজাটা পুরোপুরি খুলে ভেতরে ঢুকলেন তিনি। কিন্তু তার ভেতরে ঢোকার শব্দ পেয়েই ঝড়ের গতিতে পাঞ্চিং ব্যাগ টা এক হাতে থামিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে জ্যিমের দরজার দিকে তাকালো আসওয়াদ। আর তার সে চাহনি দেখা মাত্রই আরহামের বুকের ভেতর টা ধক করে উঠলো!
আকাশ সমান বিরক্তিতে কুচকে যাওয়া ভ্রু জোড়ার নিচে জ্বলজ্বল করছে হিংস্র এক জোড়া অগ্নিগোলকের ন্যায় চোখ। শক্ত চোয়াল দ্বয়ের আড়ালে যে রাগে দাঁতে দাঁত পিষে আছে সেটা বাইরে থেকেই স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে আছে। আরহাম থমকালেন। শব্দ করে শুকনো ঢোক গিললেন একটা। একবার ভাবলেন ফিরে যাবেন কিনা! কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন আজ নিজের ঔরসজাত সন্তানের এমন মূর্তি কে ভয় পেয়ে সন্তানের সামনে থেকে ফিরে গেলে দ্বিতীয় বার আর কখনো তিনি তার সন্তানের সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস পাবেন না। তাই তার যা করার আজকেই করতে হবে, নইলে আর কখনোই আসওয়াদ কে তার এই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। আসওয়াদের শিকারী চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে থেকেই বুক ভরে দম নিয়ে সামনে আগালেন তিনি।
সেদিন আসওয়াদ কে সময় নিয়ে অনেক অনেক ক্ষণ ধরে বোঝালেন আরহাম। নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলেন, পিতা হিসেবে নিজের অপারগতার কথা স্বীকার করে অনুতপ্ত হলেন। আসওয়াদ ধৈর্য ধরে শুনলো তার বাবার কথা। আর সব শেষে কথা দিলো যে সে নিজেকে শুধরানোর চেষ্টা করবে। আর করলোও তাই।
নিজেকে ধীরে ধীরে হিংস্রতা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করলো আসওয়াদ, নিজের ভেতরের পশুটাকে আয়ত্তে নিয়ে এলো সময় নিয়ে। নিজের স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসার চেষ্টা করতে থাকলো প্রাণপণে। আরহাম নিজেও ছেলের সাথে সময় কাটানো শুরু করলেন। রোজ দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় তিনি ব্যয় করতে শুরু করলেন আসওয়াদের সাথে। ধীরে ধীরে তাদের পিতা পুত্রের ভেতরকার দুরত্ব টা কমতে শুরু করলো। নিজেদের সুখ দুঃখ কে আস্তে আস্তে ভাগাভাগি করে নিতে শুরু করলো তারা। হুজায়ফা আদনান নিজের ছেলে আর নাতির এমন পরিবর্তনে খুশি হলেন অনেক। আসওয়াদের খারাপের ভেতর দিয়ে কিছু একটা ভালো তো হয়েছে! এটাই অনেক।
কিন্তু এদের বাবা ছেলের সখ্যতায় সবাই খুশি হলেও খুশি হতে পারলো না কেবল ইলহাম। এতদিন ধরে স্বতন্ত্র ভাবে বাবার ভালোবাসা পেয়ে আসা ইলহাম হঠাৎ করেই তার বাবার ভালোবাসার ভাগাভাগি মেনে নিতে পারলো না। এখনো পর্যন্ত তার ভাই আসওয়াদের সাথে তার কখনো সরাসরি কথা হয়নি। জীবনে চলার পথে দেখা হয়েছে বহুবার। কিন্তু কেউ কারো দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। ইলহাম তাকায়নি আশঙ্কায়, কারণ সে জানে যে সে সব কিছু পাওয়া সত্বেও আসওয়াদের ন্যায় যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। আর আসওয়াদ তাকায়নি আত্মবিশ্বাসে, কারণ সে জানে সে কিছুই না পাওয়া সত্বেও নিজেকে যোগ্য করে তুলতে কোনো দিক থেকে কম রাখেনি।
বাবার হঠাৎ এমন সন্তান প্রীতি তে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলো ইলহাম। এতদিন তার একটা ভরসা ছিলো যে আসওয়াদ তাকে কোনো দিক থেকে হারাতে না পারলেও তার বাবাকে কখনো তার থেকে নিতে পারবে না। কিন্তু এখন ইলহামের সে ধারণাও বিফলে যেতে চলেছে। আসওয়াদ শেষ পর্যন্ত তার বাবার মনোযোগ ও পেয়ে গেলো! এসব কথা ভাবলেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠতো ইলহামের হাত জোড়া।
ধীরে ধীরে একসময় ঠিক হয়ে এলো সব কিছু। যদিও আসওয়াদের বন্য স্বভাব টা পুরোপুরি ঠিক হলো না! এখনো মাঝে মাঝেই সে ভুল বসত হোক বা ইচ্ছা করে, তার কাছে আসা দাসী গুলোকে নৃশংস ভাবে হতা করে। কিন্তু সে খবর গুলো আর তার খাস কামরার বাইরে যায় না। তার খুবই কাছের কিছু সেবক রাই তার এই কুকর্ম কে অতি সাবধানতার সহিত সঙ্গোপনে বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে আসে৷
কিন্তু আসওয়াদ তার হিংস্রতাকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেয় না। যেটুকু করলে তার ভেতরের পশু তৃপ্ত হবে, কিন্তু লোভি হয়ে উঠবে না ততটুকুতেই সে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে।
আরহামের সাথে এখন আসওয়াদের সম্পর্কের অনেক উন্নতি হয়েছে। আর সালিমের সাথে তো তার গলায় গলায় ভাব। যদিও সালিমের বাবা আজলান আসওয়াদের সাথে তার সন্তানের এমন মাখামাখি পছন্দ করেন না একদমই। আরহামের কোনো অস্তিত্ব কেই তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু যতদিন হুজায়ফা আদনান বেচে আছেন ততদিন তার এ অপছন্দের কথা তার ভেতরেই রাখতে হবে। বাইরে প্রকাশ করলেই সিংহাসন হাতছাড়া!
কেটে গেছে প্রায় অনেক গুলো বছর। পঞ্চদ্বীপ বরাবরের মতোই বহাল তবিয়তে চলছে। কিন্তু হুজায়ফা আদনানের শরীর টা ভালো নেই। বয়সের ভারে তিনি কাহিল হয়ে পড়েছেন৷ বয়স এখন চলছে ছশো নিরানব্বই। সাধারণ দেমিয়ান দের থেকে তুলনামূলক একটু বেশি দিনই পৃথিবীর বুকে টিকে আছেন তিনি। হাতে সময় আর বাকি নেই বেশি। এখন সময় ক্ষমতা হস্তান্তরের৷
দেমিয়ান ঐতিহ্য অনুযায়ী বাদশাহ নির্ধারণ করা হয় লাইফ ট্রির ইশারায়। অর্ধেক জীবিত আর অর্ধেক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ লাইফ ট্রি দেমিয়ান বংশের প্রতিটি সদস্যের ওপর পূঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে নজর রাখে। তাদের কর্মকাণ্ড, চালচলন, আচার আচরণ সবকিছুকে নিজের ভেতর অ্যানালাইসিস করে সে নির্ধারণ করে পরবর্তী বাদশাহ হওয়ার যোগ্যতা কে বেশি রাখে। আর লাইফ ট্রি দ্বারা নির্ধারিত শেহজাদা কেই সর্বদা বাদশাহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এবারও তার ব্যাতিক্রম হবে না!
ঐতিহ্য কে অনুসরণ করে হুজায়ফা আদনান একরাতে মহাসমারোহে তার পরিবারের সকল সদস্য দের কে জড়ো করে লাইফ ট্রির নিকট নিয়ে এলেন। পরবর্তী বাদশাহ নির্ধারণ হলে তাকে দেখেই শান্তিতে মৃত্যু বরণ করতে পারবেন তিনি।
রেড জোনের ভেতরে এসে লাইফ ট্রির চারপাশ ঘিরে দাঁড়ালো দেমিয়ান বংশের শেহজাদা রা। আরহামের দুপাশে দাঁড়ানো আসওয়াদ এবং ইলহাম। এতগুলো দিনেও কেউ কারো সাথে কথা বলেনি। আজকের এই স্পেশাল দিন টিতেও না৷ আসওয়াদের পাশে দাঁড়ানো সালিম। আর সালিমের পাশেই তার বাবা আজলান। তাদের সবার সামনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ হুইলচেয়ারে বসা হুজায়ফা আদনান। তার ধবধবে সাদা দাড়ির ফাকে এক ফালি হাসি। অজানা এক আনন্দে চোখ জোড়া তার ঝিলিক দিয়ে উঠছে। দেমিয়ান সদস্য দের কে নিরাপত্তা দিতে নির্দিষ্ট দুরত্ব নিয়ে তাদের কে ঘিরে দাঁড়ানো প্রায় শ খানেক সৌলজার্স।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পরই ধীরে ধীরে উজ্জলতা বাড়লো লাইফ ট্রির। একটি সাধারণ গাছের ন্যায় সর্বদা দৃশ্যমান হয়ে থাকা লাইফ ট্রিকে এতদিন জঙ্গলে যাওয়া আসার পথে আসওয়াদ বহু বার দেখলেও তার এই বিশেষ রূপ আজ প্রথম বার দেখছে ও৷ এই গাছ টির বিশেষত্ব দাদাজানের লাইব্রেরি তে থাকা বইতে পড়লেও কখনো সেটা চোখে দেখা সম্ভব হয়নি। তাই আজ এমন দৃশ্য দেখে অন্তর মন পুলকিত হয়ে উঠলো আসওয়াদের৷
লাইফ ট্রির উজ্জলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ডালপালা গুলোর মুভমেন্ট হতে শুরু করলো। সুক্ষ্ম সোনা রঙা নকশা খেলে যেতে লাগলো লাইফ ট্রির সমস্ত শরীর জুড়ে। লাইফ ট্রি পুরোপুরি সচল হওয়ার পর দেমিয়ান দের দিকে তার উজ্জ্বল ডাল পালার কয়েকটি এগিয়ে এলো। দেমিয়ান দের সকল সদস্য গুলোকে নিজের ডাল গুলো দিয়ে ছুয়ে দিলো লাইফ ট্রি টা। কিন্তু আসওয়াদের কাছে গিয়ে থমকে গেলো তার ডাল গুলো।
এই বান্দা টা প্রায় প্রায় তার পাশ দিয়ে ঘুরে জঙ্গলে ঢুকে যায়। জঙ্গল টার প্রতি তার প্রচন্ড মায়া। লাইফ ট্রি নিজের সরু ডাল গুলো দিয়ে আসওয়াদের ঘাড় বাবরি ঝাকড়া চুল গুলোকে আদর দিয়ে এলোমেলো করে দিলো। নিজের প্রতি লাইফ ট্রির এমন অন্যরকম আচরণ দেখে আসওয়াদ খুশি হওয়ার সাথে সাথে অবাক হলো কিছুটা, কিন্তু প্রকাশ করলো না। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো ওর।
সবাইকে ছুয়ে দেওয়া শেষে লাইফ ট্রি নিজের ডালপালা গুলোকে একিয়ে বেকিয়ে হুজায়ফা আদনানের উদ্দেশ্যে শূন্যে ফুটিয়ে তুললো কিছু লেখা। যার সারমর্ম এই যে, আজ তাদের এইখানে সমবেত হওয়ার কারণ কি?
হুজায়ফা আদনান উত্তর দিলেন যে তিনি চান লাইফ ট্রি পঞ্চদ্বীপের পরবর্তী বাদশাহ নির্বাচন করুক। কারণ তার জীবনীশক্তি ফুরিয়ে এসেছে। কখন না জানি পরম শক্তিশালী সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে পরপারে পাড়ি জমাতে হয়!
লাইফ ট্রি তার ডালপালা গুলোতে রিনরিনে শব্দ তুলে নিজের নিকট ফিরিয়ে নিয়ে নিরাব হয়ে রইলো। তার শরীর বয়ে খেলে যেতে শুরু করলো নানা রঙের আলোচ্ছটা। হুজায়ফা আদনান বুঝলেন লাইফ ট্রি নিজের ভেতর কার সমস্ত ডেটা গুলো অ্যানালাইসিস করছে৷ ধৈর্য ধরে বসে রইলেন তিনি।
আরহাম আজলান দুজনেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলো লাইফ ট্রির সিদ্ধান্তের। আজকের পর তাদের দুজনের কেউ একজন হবে বাদশাহ, আর বাদশাহ চাইলে অন্যজন হবে তার সহযোগী। আর যদি না চায় তবে সে বাদশাহর মন রক্ষা করে চলতে পারলে প্রাসাদে থাকতে পারবে, আর যদি সেটাও করতে ব্যর্থ হয় তবে তার স্থান হবে ডার্ক প্যালেসে। আজকের পরই সবার ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যাবে।
বেশ কিছুক্ষণ পর লাইফ ট্রি আবার সচল হলো। তারপর নিজের ডাল পালা গুলোতে আগের মতোই রিনরিনে শব্দ তুলে এগিয়ে দিলো হুজায়ফা আদনানের পেছনে দাঁড়ানো শেহজাদা দের দিকে আর এরপরই সেখানে উপস্থিত সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজের ডাল গুলো দিয়ে আসওয়াদের হাত জোড়া সাপের মতো একে বেকে জড়িয়ে ধরলো লাইফ ট্রি। তারপর আসওয়াদ কে নিজের ডাল গুলোর সাহায্যে নিজের কাছাকাছি টেনে নিয়ে এসে বাকি সবার দিকে ফিরিয়ে ধরলো। আর এরপর নিজের ডাল পালা গুলো দিয়ে আসওয়াদের মাথার ওপর মুকুট সদৃশ তৈরি করে দেখিয়ে দিলো যে এ-ই হবে পঞ্চদ্বীপের পরবর্তী বাদশাহ।
আসওয়াদ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো হুজায়ফা আদনানের দিকে। তার আগের প্রজন্ম কে রেখে লাইফ ট্রির তাকে চ্যুজ করার কারণ টা বোধগম্য হলো না ওর কিছুতেই। হুজায়ফা আদনান নিজেও অবাক হলেন। এমন টা এর আগে কখনো লাইফ ট্রি করেছে কিনা সন্দেহ! আর তাছাড়া আসওয়াদ এখন নিতান্তই ছোট! এটা ঠিক যে এখানে উপস্থিত অন্য সবার থেকে তার বুদ্ধিমত্তা, যোগ্যতা, পারদর্শীতা, ক্ষমতা কোনো অংশেই কম না। কিন্তু বয়সের পরিপক্বতার ও তো প্রয়োজন আছে।
কিন্তু হুজায়ফা আদনান আর দ্বিতীয় কোনো চিন্তা মাথায় আনলেন না। লাইফ ট্রি যখন অ্যানালাইসিস করে আসওয়াদ কেই উপযুক্ত মনে করেছে তখন আসওয়াদই উপযুক্ত, অন্য কেউ নয়। হুজায়ফা আদনান গর্বিত হলেন, তার নিজের হাতে গড়া নাতি যে অন্য সবার থেকে উপযুক্ত হয়ে উঠেছে এটা ভেবেই তিনি খুশি হলেন প্রচন্ড।
আরহাম ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া জানাবেন বুঝতে পারলেন না। তিনি তার বাবার বড় সন্তান, নিজেকে যথাসম্ভব যোগ্য হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার দুই ছেলে, দুইটাই তার কাছে হীরক খন্ডের ন্যায়। সে হিসাবে লাইফ ট্রির তাকে বাদশাহ হিসেবে অধিষ্ঠিত করা উচিত ছিলো, কিন্তু তাকে না করে করা হলো তার ছেলে কে! কিছু সময়ের জন্য বুকে চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলেও সেটা পরক্ষণেই মিলিয়ে গেলো আরহামের। বাদশাহ তো হচ্ছে তারই ছেলেই, তার তো খুশি হওয়ার কথা! কিন্তু তা না করে তিনি হিংসা করছেন! নিজেকে মনে মনে ধিক্কার জানালেন আরহাম।
সালিম খুশি হলো সবচাইতে বেশি। চোখে মুখে আনন্দ উপচে পড়তে লাগলো ওর৷ এত গুলো বছর ধরে এই বন্ধু রূপি ভাইটির সাথে থেকে থেকে সে এতটুকু বুঝেছে যে সে সত্যিকার অর্থেই বাদশাহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতা রাখে। সে নিজে এতদিন আসওয়াদের সাথে সাথে থেকে, আসওয়াদ যা যা করেছে সবকিছু করেও আসওয়াদের সমপরিমাণ যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি! আর যারা ওর সাথে কখনো ছিলোই না তারা কি করবে!
কিন্তু আজলান আর ইলহাম রীতিমতো ক্রুদ্ধ হলো। লাইফ ট্রির এহেন সিদ্ধান্ত তারা দুজন একেবারেই মেনে নিতে পারলো না৷ এটা তাদের কাছে ঠেকলো সাক্ষাৎ অবিচারের ন্যায়৷ এই দুই ব্যাক্তি নিজেদের ভেতর কোনো মত বিনিময় না করেও মানসিক দিক থেকে হয়ে উঠলো একই পথের পথিক৷
আর সবার এসব ভাবনার মাঝেই লাইফ ট্রির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ানো আসওয়াদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে চমকে দিয়ে তার পিঠের ভেতরে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে ধারালো খঞ্জরের ন্যায় প্রবেশ করলো লাইফ ট্রির বিশেষ ছয়টি সরু, সুক্ষ্ম ডাল। আর সেগুলো প্রবেশ করতেই তীব্র যন্ত্রনায় আকাশ বাতাস কাপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো আসওয়াদ। আসওয়াদের এমন অবস্থায় আরহাম আঁতকে উঠে ছুটে ওর কাছে যেতে নিলে হুজায়ফা আদনান তাকে বাধা দিয়ে বললেন,
— কাছে যেও না৷ লাইফ ট্রি ওর কোনো ক্ষতি করছে না। ওকে ওর অধিকার বুঝিয়ে দিচ্ছে৷
বাবার কথা শুনে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এলেন আরহাম। কিন্তু আসওয়াদের গগনবিদারী চিৎকার এসে তার বুকের ভেতর টা দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যেতে লাগলো যেন।
বেশ কিছুক্ষণ পর লাইফ ট্রি ছেড়ে দিলো আসওয়াদ কে। লাইফ ট্রি ছেড়ে দিতেই হাটু গেড়ে মাটিতে ধাম করে বসে পড়লো আসওয়াদ৷ নিঃশ্বাস পড়ছে ওর প্রচন্ড জোরে। শরীরের থাকা পোশক গুলোর অধিকাংশই পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে। সমস্ত শরীর জুড়ে তার জন্মের সময়কার ডোরাকাটা সোনালি রঙা নকশা গুলো ফুটে উঠেছে। কালো রঙা পুরু চামড়ার ওপর সেগুলোকে অসম্ভব রকম সুন্দর দেখাচ্ছে। শরীরের শিরা উপশিরা গুলো অস্বাভাবিক ভাবে ফুটে উঠেছে সমস্ত দেহে। শিকারী চোখ জোড়া আগের থেকেও বেশি উজ্জলতা ছড়াচ্ছে।শরীর থেকে ধোঁয়া উড়ছে ওর।
বাদশাহ নামা পর্ব ৩০
আরহাম ছুটে গেলেন আসওয়াদের কাছে, তারপর ওর ভারী শরীর টা কে টেনে মাটি থেকে ওঠাতে চাইলেন। কিন্তু বাধা দিলো আসওয়াদ৷ তারপর কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দুর্বল পায়ে নিজে নিজেই উঠে দাড়ালো ও। এরপর লাইফ ট্রির চারপাশ দিয়ে ধীর পায়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে, এক বিশাল দায়িত্ব নিজের কাধে চাপিয়ে, সবাই কে পেছনে ফেলে রেখে এক প্রকার খুড়িয়ে খুড়িয়ে একা একাই প্রাসাদে ফিরে গেলো আসওয়াদ। আর ওর পেছন পেছন এগোলো হুজায়ফা আদনান সহ অন্যরা।
নিজের দায়িত্ব গুলো অন্য কারো ওপর অর্পণ করে দিয়ে প্রচন্ড হালকা হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে প্রাসাদের দিকে এগোলেন হুজায়ফা আদনান।
