বিকেলের প্রণয় পর্ব ৫০
Arshi Ayat
মিলাত আর অনুরুপের বিয়েটা আনুষ্ঠানিক ভাবে আজ আবার হলো।কনে বিদায়ের সময় মিলাতের বাবা-মা ভীষণ কাঁদলেন।মিলাতের বাবা হারুন সাহেব মিলাতের হাত অনুরুপের হাতের মাঝে দিয়ে বলল,’বাবা,তোমরা যখন নিজেরা বিয়ে করেছিলে তখন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।তোমাকে ভালো,মন্দ অনেক কথা বলেছিলাম।মনে কিছু রেখো না।আমার মেয়েটাকে সুখে রেখো।ওর জীবনটা আমি ভালো করতে পারি নি কিন্তু তুমি ওকে কাঁদতে দিও না।ও কাঁদলে আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না।’
অনুরূপ শ্বশুরমশাইকে শ্রদ্ধার সাথে জড়িয়ে ধরে বলল,’বাবা,আপনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন।আমি কথা দিচ্ছি আপনার মেয়েকে কাঁদতে দেব না।যদি ও কখনো আমার জন্য কাঁদে তাহলে আপনি আমাকে যে শাস্তি দেন আমি মাথা পেতে নেবো।’
হারুন সাহেব ভারমুক্ত হলেন যেন!আদরের কন্যাটি একটি ভালো পরিবারে গেছে এটাই যেন তার শান্তি।
রীতি-নীতি,বন্ধুদের দুষ্টুকথা শুনে অনুরুপ রাত বারোটায় ঘরে ঢুকতে পারলো।এদিকে মিলাত ঘোমটা ফেলে হাত,পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিলো।অনুরুপ আসার শব্দ শুনে দরজার দিকে চেয়ে বলল,’এতক্ষণে আসার সময় হলো?তো বন্ধুরা কি বুদ্ধি দিলো শুনি একটু।’
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘সাধারণত বাসর রাতে বিড়াল মা’রার বুদ্ধিই দেয় কিন্তু বিড়াল তো আমি আগেই মেরে ফেলেছি তাই আজ শুধু বলেছে তোমার আর বাবুর খেয়াল রাখতে।’
‘আচ্ছা বলেন তো ছেলে হবে না মেয়ে?’
‘আমার মনে হচ্ছে মেয়ে।’
‘আমারও।’
‘বাহ,তাই নাকি!তাহলে চলো মেয়ের নাম ভাবি।’
‘আর যদি ছেলে হয়?’
‘ছেলে হলে পরে ভেবে নেবো।আগে মেয়ের নামই ভাবি।’
কথাবার্তা আর খুনসুটিতেই শুরু হলো ওদের নতুন জীবনের প্রথম রজনী।
আজ রেভানের জন্মদিন।চৈতির মনে আছে সেটা।এই দিনটা ও কি করে ভুলবে!ভীষণ যত্ন করে কেক বানালো ও।একদম পারফেক্ট হয়েছে।ও আগে থেকেই ভালো কেক বানাতে পারে,মাঝেমধ্যে বানায় কিন্তু সেটা শুধু নিজের জন্যই কিন্তু আজ প্রথমবার অন্যকারো জন্য বানাচ্ছে।নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য।
একটা টকটকে লাল গোলাপের তোড়া আর কেকটা পার্সেল পাঠালো রেভানের কাছে।খুব ইচ্ছে করে ওর রেভানের সাথে একসাথে দাঁড়িয়ে কেক কাটতে।চৈতি স্বপ্ন দেখে কোনো এক জন্মদিনে ও রক্তলাল রঙের শাড়ি পরে,সুন্দর করে সেজে যেমনটা রেভান ভালোবাসে তেমন করেই ওর সাথে জন্মদিনের কেক কাটবে।
শহরের বাইরে একদম নির্জন একটা জায়গায় দোতলা কাঠের রেস্ট হাউজটা একদম গোপনীয়।এটার কথা রেলমন্ত্রী মতিউর সাহেব ছাড়া কেউ জানে না।বলা যায় এটা একটা গোপন আস্তানা।আগে মাঝেমধ্যে কোনো ঝামেলা হলেই তিনি এখানে চলে আসতেন কিছুদিনের জন্য।আজও এখানেই বসে আছে।সামনেই টি-টেবিলের ওপর বিদেশি ব্রান্ডের মদ রাখা।তিনি সোফায় হেলান দিয়ে গভীর ভাবে ভাবছেন কিছু একটা।হঠাৎই ফোন এলো তার প্রিয়বন্ধু,একইসাথে শালা।স্ত্রী’র ছোটোভাই।বেশকিছুদিন ধরে তাকে অন্যমনস্ক দেখে আর কেউ কিছু না বুঝলেও ওই মানুষটা বুঝেছে।তাই বারবার জিজ্ঞেস করছিলো কিন্তু তিনি বলেন নি।অবশেষে আজ মনে হচ্ছে ওকে বলা উচিত।হয়তো ও কোনো সাহায্য করতে পারবে।
সেইজন্যই এই আস্তানার ঠিকানা পাঠিয়ে আসতে বলেছে এখানে।
ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই আলমগীর রহমান পৌঁছে গেলেন রেলমন্ত্রীর আস্তানায়।ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চারপাশটা চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে বন্ধুকে বললেন,’কি বন্ধ!এটার কথা তো আগে বলো নি।’
‘কি আর বলব বন্ধ!এটায় তেমন একটা আসাই হয় না।’
‘তো হঠাৎ এখানে আসার কারণটা কি বলো তো?’
‘বলবো বলেই ডেকেছি।সোফায় বসো।কফি খাবে।’
‘হ্যাঁ খাওয়া যায়।’
মতিউর সাহেব কাজের লোক’কে বললেন দু’টো কফি দিতে।কিছুক্ষণ পরই কাজের লোক কফি দিয়ে গেলে মতিউর সাহেব তাকে বললেন,’আজ তুমি চলে যাও।আজ আর কাজ নেই।’
কাজের লোক চলে যেতেই তিনি বন্ধুকে একেরপর এক ঘটনা খুলে বলতে লাগলেন।চৈতির সাথে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে ব্ল্যাকমেইল পর্যন্ত সবকিছু।আলমগীর সাহেব সব ঘটনা আদ্যোপান্ত শুনে বললেন,’ভালোই তো ফেঁসেছ বন্ধু।’
‘তা আর বলতে!এখন পরামর্শ দাও কি করা যায়?’
‘ওকে সরিয়ে ফেলো।’
‘বললেই হলো না।ও সবকিছুর সিস্টেম করে রেখেছে।ও যদি মরেও যায় ওই ভিডিওগুলো পাবলিক হয়ে যাবে।’
‘আচ্ছা দাঁড়াও ভাবতে দাও।’
‘প্লিজ দ্রুত ভাবো।এই টেনশন নিয়ে আর বাঁচা যাচ্ছে না।’
‘হু,,,আর তুমি বাসায় যেও।নুহা তোমাকে ফোনে না পেয়ে আমাকে ফোন করেছে।মেয়ের তো অন্তত একটু খোঁজ রাখবে নাকি!’
‘হ্যাঁ,যাব আজই।’
রোগী দেখা শেষ করে অনুরুধ রাত আট’টায় চেম্বার ছাড়বে তার আগেই এসিস্ট্যান্ট এসে বলল,’ভিআইপি কল আছে একটা।’
অনুরুপ আসতে বলল।একটু পরই আলমগীর রহমান এলেন।অনুরুপ তাকে দেখে উঠে গিয়ে হাত মেলালো।আলমগীর রহমান চেয়ারে বসতে বসতে বললেন,’অনেকদিন দেখা হয় না ডাক্তার কেমন আছো?’
‘আলহামদুলিল্লাহ,আমি তো ভালো আছি আঙ্কেল।আপনি কেমন আছেন?’
‘ভালো,তবে ইদানীং ঘুম হচ্ছে না।’
‘অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে ঘুম হয় না।ইদানীং বেশি দুশ্চিন্তা করছেন মনে হচ্ছে!’
‘হ্যাঁ,চাপের মধ্যে রয়েছি।’
‘কি রকম?’
‘আমার না কিন্তু আমার বোন জামাইয়ের।’
অনুরুপ মনে মনে হাসলো।সে জানতো এরকম কিছুই হবে আর এটারই অপেক্ষা করছিলো ও।তবুও মুখে যথাসম্ভব কৌতুহল ফুটিয়ে বলল,’শেয়ার করা যাবে আঙ্কেল?’
‘কনফিডেনসিয়াল ব্যাপার তবে তোমার ওপর আমার আস্থা আছে।তাই তোমাকে বলছি।’
অত্যন্ত চিন্তিত স্বরে পুরো ঘটনা বললেন তিনি।সব শুনে অনুরুপ বলল,’আঙ্কেল আপনি কি আমাকে মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করাতে পারবেন?আপনাদের সমস্যা মনে হচ্ছে আমি সলভ করতে পারব।’
‘আচ্ছা,বাবা।আমি তার সাথে কথা বলে তোমাকে জানাচ্ছি কাল।’
‘জ্বি,আঙ্কেল।’
‘তাহলে উঠি।’
‘না,আঙ্কেল বসুন।চা দিতে বলি।’
‘না,না চা খেয়েই এসেছি।ব্যস্ত হইও না।’
এই বলে আলমগীর সাহেব চলে গেলেন চেম্বার ছেড়ে।
বাসায় ফেরার পথে চালতার আচার,এক প্যাকেট বিরিয়ানি,ফুচকা,টকদই এসব নিয়ে ফিরলো অনুরুপ।মিলাত তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বই পড়ছিলো।অনুরুপকে দেখে বলল,’আমার না বাখরখানি খেতে ইচ্ছে করছে।পুরান ঢাকারটা।’
‘আচ্ছা দাঁড়াও একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।’
‘আচ্ছা।’
দশমিনিটের মধ্যেই অনুরুপ বউকে নিয়ে রওনা হলো পুরান ঢাকার উদ্দেশ্যে।
রেভান রাতে বাসায় ফেরার পর দেখলো নুহা মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।অনেক্ক্ষণ মস্তিষ্কে আতিপাতি করে খুঁজেও রাগ করার মত কোনো ঘটনা মনে পড়লো না।রেভান মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,’নারী জাতি বড়ই অদ্ভুত।’
অতঃপর মান ভাঙানোর জন্য কাছে গিয়ে বলল,’রাগ কেনো?’
‘আপনার কোন এক্স গার্লফ্রেন্ড আপনাকে কেক পাঠিয়েছে জন্মদিনের।’
‘আমার এক্সের বিয়ে হয়ে গেছে।আর তুমি যার কথা বলছো তার সাথে আমার প্রেম ছিলো না।সে আমাকে পছন্দ করতো না তো কেক কেনো পাঠাবে।’
‘তাহলে অন্য কেউ পাঠিয়েছে।অন্য কোনো প্রেমিকা।’
‘দেখি কেকটা।’
‘ইশ!কেক দেখার কত শখ।ফেলে দিয়েছি আমি।’
‘আচ্ছা ভালো করেছো।তুমি কেক আনাও নি আমার জন্য।’
‘ইশ,বুড়া দামড়া এখনও কেক কাটা লাগবে।’
রেভান মন খারাপ করে ফ্রেশ হতে চলে গেলো এই কথা শুনে।
ফ্রেশ হয়ে বের হতেই দেখলো পুরো ঘর অন্ধকার আর ঘরের এককোণে মোম জ্বলছে কেকের ওপর।রেভান একটু এগোতেই নুহা ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললে,’শুভ জন্মদিন।’
কেনো যেনো রেভানের ভীষণ ভালো লাগলো এটুকুতেই।কেক কাটার পর রেভান বলল,’গিফট?’
নুহা সুন্দর করে একটা শপিং ব্যাগ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,’এটা পরে আসুন।’
বিকেলের প্রণয় পর্ব ৪৯
‘শার্ট?’
‘খুলেই দেখুন।’
রেভান শপিং ব্যাগটা নিয়ে চলে গেলো ওয়াশরুমে।এদিকে নুহা মুখ চেপে হেসেই যাচ্ছে কারণ এটার ভেতরে Calvin Klein এর সেই আডারওয়্যারটা যেটা ও তুরস্কের এয়ারলাইন্স থেকে কিনেছে।
