বিয়ে পাগলি পর্ব ৯
নিলুফা নাজমিন নীলা
শাওনদের বাড়ির সবাই এখন হাসপাতালে। ডাক্তারের কেবিনের বাইরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে সবাই। ভেতরে সায়রাকে পরীক্ষা করছেন ডাক্তার।
আজ সকালের ঘটনা হঠাৎ করেই সায়রা ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে। যে মেয়েটা কিনা সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে, হাসি-ঠাট্টায় বাড়ি মাথায় তোলে, সেই মেয়েটাই কয়েকদিন ধরে চুপচাপ হয়ে গেছে। না খাওয়া, না দুষ্টুমি, সারাদিন শুধু বিছানায় শুয়ে থাকে। কিন্তু আজকের ঘটনাটা সবাইকে একেবারে হতবাক করে দিল।
পাগলের মতো ছুটে সবাই সায়রাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। ছয় মাস হলো শাওন আর সায়রার বিয়ে। এই ছয় মাসেই সায়রা তার দুষ্টুমি, মিষ্টি স্বভাব আর নির্দোষ হাসি দিয়ে বাড়ির সবাইকে আপন করে নিয়েছে।
কেবিনের বাইরে বসে রেহানা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছে,
“আমার বউমা টার কি হয়ে গেল আল্লাহ গো? প্রথমে যতই রাগ করতাম দুষ্টামির জন্য, এখন তো আমার মুখেই সায়রার নাম ছাড়া আর কোনো কথা আসে না। আমার বুকটাই ফাঁকা হয়ে যাবে যদি কিছু হয়।”ডাক্তার এবার সবাইকে কেবিনে ডাকলেন। সায়রা শান্তভাবে বসে আছে চেয়ারে। শাওন এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরল, চোখেমুখে শুধু উৎকণ্ঠা।
রেহানা বেগম ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন,
“ডাক্তার, আমার বউমার কী হয়েছে?”
ডাক্তার হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“শান্ত হোন, খুশির সংবাদ আছে।”
রেহানা বেগম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন,
“ফাইজলামি করেন নাকি! আমার বউমা অসুস্থ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে আর আপনি খুশির কথা বলছেন?”
ডাক্তার এবার গম্ভীর অথচ আনন্দের সুরে বললেন,
“আপনাদের বউমা মা হতে চলেছে।”
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য সবাই হা করে তাকিয়ে রইল সায়রার দিকে। সায়রা লাজুকভাবে মাথা নিচু করে মুচকি হাসল।
শাওনের বুঝতে একটু সময় লাগল। কিন্তু যখনই উপলব্ধি করল যে সে বাবা হতে চলেছে, সাথে সাথে খুশিতে চিৎকার করে উঠল,
“কি বললেন ডাক্তার! আমি বাবা হবো!”
বলেই সায়রাকে কোলে তুলে ঘুরাতে লাগল। সায়রা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলে শাওনের কাঁধে, আর সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।
রেহানা বেগম কেঁদে ফেললেন খুশিতে, বললেন,
“আল্লাহ্র রহমত! আমার বউমা আমাকে দাদী বানাবে।”রেহানা বেগম হঠাৎ করেই রেগে গেলেন শাওনের দিকে তাকিয়ে। তিনি তেড়ে গিয়ে বললেন,
“এই নামা! বউমাকে কোনো আক্কেল-গরান নাই তোর?!”
সবাই থমকে গেল রেহানা বেগম এরকম রাগের কথা সাধারণত বলেন না।
শাওনের মুখটা হঠাৎ ছোট হয়ে গেল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কেন মা, কী হলো?”
রেহানা বেগম কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন,
“তুই যে সায়রাকে কোলে নিয়ে পাগলের মতো ঘুরাচ্ছিস, এখন যদি হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়? আমার বউমাটা যদি আবার মাথা ঘুরে লুটিয়ে পড়ে, তখন কী হবে?!”
সবার মুখে এবার “আহা” ভাব ফুটে উঠল। সবাই বুঝতে পারল রেহানা বেগম রাগ করেননি, আসলে চিন্তায় এতটা কঠিন হয়ে উঠেছেন।
শাওন মুচকি হেসে তার মায়ের দিকে তাকাল। আর সায়রা উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল শাশুড়িকে।
রেহানা বেগম স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“আজ আমি মহাখুশি। আমার সোনার বউমা আমাকে দাদু বানাবে! এর চেয়ে বড় খুশি আর কিছু হতে পারে?”
তারপর চোখের জল মুছে আবার হাসলেন,
“শুভ্র! এখনই যা, বাজার থেকে অনেক মিষ্টি আন। পুরো এলাকায় যেন একজন লোকও বাকি না থাকে। সবাইকে খাওয়াতে হবে।”
শুভ্র খুশিতে দৌড় দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর ঘরে যেন আনন্দের স্রোত বইতে শুরু করল সায়রা লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে, শাওন তাকে গোপনে দেখছে, আর রেহানা বেগম চারদিকে খুশির কথা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
সায়রা ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আচার খাচ্ছে। সামনে প্লেটে সাজানো কয়েক রকমের আচার আম, জলপাই,তেতুল, কুল… একেকটা থেকে একটু একটু করে খেয়ে আবার মুখ কুঁচকাচ্ছে।
রান্নাঘরে রেহানা বেগম ব্যস্ত, কিন্তু কাজের ফাঁকে বারবার ছুটে আসছেন সায়রার কাছে।
“কিছু লাগবে নাকি মা? পানি দেবো?”
“আরেকটু নুন লাগবে?”
মনে হয় পারলে তিনি সারাদিনই সায়রার পাশে বসে থাকতেন।
শুধু রেহানা বেগম নন একবার শাওনের বাবা এসে বলছেন, “কি খাবে বউমা?”
একবার সুভা এসে বলছে, “ভাবি, টক লাগতেছে?”
আরেকবার শুভ্র দৌড়ে আসে, “আমি এনে দিই, তুমি ওঠো না।”
আর শাওন তো আছেই দিনে শত বার কল দেয়,
“কি করছো? কেমন লাগছে? কিছু লাগবে?”
সায়রা এত যত্নে একেবারে অবাক হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই দরজা দিয়ে ভেতরে আসছে কেউ সায়রা টের পেল। মুখ তুলে তাকাতেই দেখে ঝিনুক।সাথে সাথেই সায়রার মুখে ঝলমলে হাসি ফুটে উঠল।
সে উঠতে চাইল আনন্দে, কিন্তু ঝিনুক হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দিল,
“না না, বসে থাক। তুই উঠলেই তো লাফ দিবি।”
এ কথায় দুজনেই হেসে উঠল। তারপর ঝিনুক এগিয়ে এসে সায়রাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।সায়রা আর ঝিনুক গল্পে মশগুল। এরই মাঝে রেহানা বেগম এসে দুইজনের সামনে চা আর নাস্তা রেখে গেলেন। ঝিনুক কাপ হাতে নিয়ে হঠাৎ বলল,
“শুভ্র কোথায়?”
সায়রা সাথে সাথেই ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“হু হু… সবই জানি।”
ঝিনুক মুখ নিচু করে হেসে ফেলল।সায়রা আবার বলল,
“তুই যে শুভ্রর সাথে প্রেম করছিস কই, বলিসনি তো!”
ঝিনুক একটু অপরাধী স্বরে বলল,
“আজকেই বলতাম…”
সায়রা হালকা রাগী কণ্ঠে বলল,
“তুই না বললে কি হবে!আমার দেবর তোকে প্রপোজ করার আগেই আমাকে সব বলেছে। আমার কথামতোই তোকে প্রপোজ করেছে।”
ঠিক তখনই দরজা দিয়ে শুভ্র ঢুকল। ঝিনুককে দেখে শুভ্র মুচকি হেসে থেমে গেল। দুজন দুজনের চোখে চোখ রাখল।
সায়রা একবার শুভ্রকে দেখে আবার ঝিনুককে দেখে, তারপর গলা কাঁকরাতে বলল,
“ভেবেছিলাম আমিই শুধু বিয়ে-পাগলি! এখন দেখি আমার ছোঁয়ায় আশেপাশের মানুষজনও বিয়ে-পাগলি হয়ে যাচ্ছে।”
ঝিনুক মুখ ফুলিয়ে বলল,
“একদমই না! আমি তোর মতো বিয়ে-পাগলি না বুঝলি? আমার বিয়েই ভালো লাগে না।”
শুভ্র সাথে সাথে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“মানে? তুমি আমাকে বিয়ে করবে না? আমার সাথে শুধু টাইম পাস করছ?”
ঝিনুক তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলল,
“এমা! না না… এমন বলিনি।”
তখনই আবার রেহানা বেগম চলে এলেন সেখানে। সবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
“কি নিয়ে এত কথা হচ্ছে?”
সায়রা এবার খুশি মুখে হেসে বলল,
“শাশুমা, আপনার ছোট ছেলেকে বিয়ে কবে করাবেন?”
সাথে সাথেই শুভ্র আর ঝিনুক হা করে তাকিয়ে রইল সায়রার দিকে। দু’জনের মুখেই ভয় এখন সায়রা কি করে বসে!
রেহানা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“কেন করাবো না? মেয়ে দেখে যদি পছন্দ হয়, একেবারেই করিয়ে দেব।”
সায়রা আর দেরি না করে বলল,
“মেয়ে তো দেখা হয়ে গেছে, শাশুমা।”
ঝিনুক তখন প্রাণপণে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করছে “না, দয়া করে কিছু বলিস না!” কিন্তু সায়রা তাতে কান দিল না। রেহানা বেগমও কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছেন সায়রার দিকে।
সায়রা এবার গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“আপনার সামনেই তো আছে শাশুমা। আপনার ছোট ছেলে আর শান্তশিষ্ট ভদ্রমেয়ে ঝিনুক তারা প্রেম করে।”
কথাটা শোনা মাত্রই শুভ্র হঠাৎ উঠে দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে গেল।
রেহানা বেগম ধীর পায়ে গিয়ে ঝিনুকের সামনে দাঁড়ালেন।
“দাঁড়াও।”
ঝিনুক ভয়ে কেঁপে উঠল। কাঁপা কাঁপা পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। রেহানা বেগম আবার বলল,
“এসব কবে থেকে শুরু হলো?”
ঝিনুক কাঁপা গলায় বলল,
“ক…কয়েকদিন হলো।” তার গলা যেন শুকিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎই রেহানা বেগম মুচকি হেসে বললেন,
বিয়ে পাগলি পর্ব ৮
“তুমি খুব মিষ্টি মেয়ে। যাক, আমার ছোট ছেলেটারও এবার মাথায় একটু বুদ্ধি হয়েছে মনে হয়। তোমার বাবার নাম্বারটা দিয়ে যেও কেমন।”
ঝিনুকের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সায়রা পাশে বসে হো হো করে হাসি থামাতে পারছিল না।
