ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭১
ছায়া
ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে শাহরিয়ারের জিপগুলো এগিয়ে চলেছে পাহাড়ের দুর্গম পথ ধরে। গাড়ির ভেতরে আরিয়ান ইলার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে আছেন।৮ বছরের মিথ্যে জীবন তাকে ক্লান্ত করে দিয়েছে, কিন্তু ইলার শরীরের সেই চেনা ঘ্রাণ তাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিচ্ছে।
হঠাৎ শাহরিয়ারের ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে সজলের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, তবে এবার তাতে প্রচণ্ড উত্তেজনা আর আতঙ্ক।
সজলঃ- শাহরিয়ার একটা খারাপ খবর আছে। আমজাদ চৌধুরী খুন হয়েছেন।মাত্র পাঁচ মিনিট আগে তার বডিতে গুলি লেগেছে। পুরো অপারেশনটা প্রফেশনাল হিটম্যানদের কাজ।
শাহরিয়ারের হাত স্টিয়ারিং হুইলে শক্ত হয়ে বসল।সে আয়না দিয়ে পেছনে বসা আরিয়ানের দিকে একবার তাকাল। আরিয়ান সব শুনতে পেয়েছে।
আরিয়ানঃ- তার মানে ওরা প্রমাণ মুছে দিচ্ছে শাহরিয়ার।আমজাদ চৌধুরী সব জানতেন, তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। পরবর্তী টার্গেট আমরা।
শাহরিয়ার দাঁতে দাঁত চেপে বলল
শাহরিয়ারঃ- আমাদের সেফ হাউসে পৌঁছানো পর্যন্ত ওদের হাত আমাদের ছুঁতে পারবে না ভাইয়া আপনি চিন্তা করবেন না।
ইলা আরিয়ানের হাতটা আরও জোরে চেপে ধরল। তার অন্ধ চোখ দুটো দিয়ে জল পড়ছে। সে ফিসফিস করে বলল
ইলাঃ- আমরা কি কখনোই শান্তিতে থাকতে পারব না? কেন বারবার আমাদের মাঝে মৃত্যু এসে দাঁড়ায়?
আরিয়ান ইলার চুলে একটা চুমু খেয়ে বললেন
আরিয়ানঃ- ভয় পেও না ইলাফুল যে মায়ার জালে আমি আটকা পড়েছিলাম, তার সুতো এখন আমার হাতে এবার জালটা আমি ছিঁড়ব।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে তারা পৌঁছাল সেনাবাহিনীর একটি সুরক্ষিত গোপন আস্তানায়।শাহরিয়ারের কড়া নির্দেশে পুরো এলাকা সশস্ত্র প্রহরীরা ঘিরে রেখেছে।
সকালে আরিয়ানের সামনে দস্তাবেজ আর পুরনো কিছু ফাইলের স্তূপ নিয়ে বসল শাহরিয়ার। সেখানে আরিয়ানের সেই শেষ মিশনের রিপোর্ট আছে। আরিয়ান ফাইলটা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। হঠাৎ তার নজর কাড়ল একটি ছবির ওপর। তার মিশনের সঙ্গী ‘শ্যাডো’র ছবি।
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার স্মৃতির জট যেন আরও আলগা হচ্ছে।
আরিয়ানঃ- শাহরিয়ার এই শ্যাডো… এর আসল নাম কি মেজর জামান?
শাহরিয়ার অবাক হয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- হ্যাঁ মেজর জামান। কিন্তু রিপোর্টে লেখা আছে তিনি সেই বিস্ফোরণে মারা গেছেন এবং তার মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। কেন?
আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বললেন
আরিয়ানঃ- কারণ বিস্ফোরণের ঠিক আগে জামান আমাকে বলেছিল যে সে আর এই সার্ভিসে থাকতে চায় না। সে চেয়েছিল একটা বড় অংকের টাকা নিয়ে সীমান্ত পার হতে। আমি তাকে বাধা দিতে চেয়েছিলাম বলেই সে আমাকে পেছন থেকে আঘাত করেছিল।
শাহরিয়ার যদি জামান বেঁচে থাকে, তবে আমজাদ চৌধুরীকে সে-ই খুন করেছে।
ঠিক তখনই সেফ হাউসের ভেতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল সজল। তার হাতে একটি ট্যাবলেট।
সজলঃ- শাহরিয়ার একটা অদ্ভুত ইমেইল এসেছে আমজাদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত ল্যাপটপ থেকে। ইমেইলটা আমজাদ সাহেব আগেই শিডিউল করে রেখেছিলেন। তিনি হয়তো জানতেন তার মৃত্যু আসন্ন।
সবাই ট্যাবলেটের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকল। ইমেইলে লেখা ছিল
“আরিয়ান যদি তুমি এই ইমেইলটা পড়ো, তার মানে আমি আর বেঁচে নেই। তোমাকে আমি নিজের ছেলের মতো ভালোবেসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে রাখাটা আমার জন্য শুধু আবেগ ছিল না, একটা বাধ্যবাধকতাও ছিল। তোমার ওই শ্যাডো পার্টনার জামান আসলে মারা যায়নি। সে এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় এক ড্রাগ ডিলার। ৮ বছর আগে সেই বিস্ফোরণের পর সে-ই আমাকে টাকা দিয়েছিল তোমার সার্জারী করাতে, যাতে তুমি বেঁচে থাকো কিন্তু তোমার পরিচয় ভুলে যাও। সে তোমাকে দিয়ে ভবিষ্যতে কোনো এক বড় কাজে লাগাতে চেয়েছিল। তোমার মেমোরি ফিরে আসাটাই ছিল ওর জন্য ভয়ের কারণ। সাবধানে থেকো বাবা ও তোমাকে সহজে ছাড়বে না।
পুরো ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। ইলা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার বুকটা ধড়ফড় করছে। যে মানুষটাকে সে ৮ বছর পর ফিরে পেয়েছে, তাকে আবার এক অদৃশ্য শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে?আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন।তার শরীরের সেই পুরনো তেজ ফিরে এসেছে।তিনি শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বললেন
আরিয়ানঃ- শাহরিয়ার আমার ইউনিফর্ম কি আছে?
শাহরিয়ার হাসল ড্রয়ার থেকে আরিয়ানের ইউনিফর্ম বের করে আনল সে।
শাহরিয়ারঃ- আপনার জন্য এটা সবসময় রেডি ছিল স্যার।
আরিয়ান ইউনিফর্মটা হাতে নিয়ে ইলার দিকে তাকালেন। ইলা দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারল আরিয়ানের ভেতরের সেই যোদ্ধাকে।
আরিয়ানঃ- “ইলাফুল তোমার ভয়েজ কিং এবার তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ফিরছে। আজ রাত থেকেই শুরু হবে জামানের শেষ দিন গোনা। সব যুদ্ধ শেষ করে আমরা ফিরবো আপন নিরে।
ইলিয়ানা ঘুম থেকে উঠে ড্রয়িং রুমে এসে দেখল তার পাপা আজ একদম হিরোর মতো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে। সে দৌড়ে এসে আরিয়ান কে জড়িয়ে ধরল।
ইলিয়ানাঃ- পাপা তুমি কি এখন সত্যিকারের যুদ্ধ করতে যাবে?
আরিয়ান ইলিয়ানাকে কোলে তুলে নিলেন।
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ প্রিনসেস এবারের যুদ্ধটা আমাদের এই ছোট্ট পরিবারের শান্তির জন্য।
কিন্তু আরিয়ান জানতেন না, জামান ইতিমধ্যেই তাদের সেফ হাউসের অবস্থান জেনে গেছে। সেফ হাউসের বাইরের জঙ্গলে ঘাপটি মেরে বসে আছে একদল ভাড়াটে খুনি, যাদের একমাত্র লক্ষ্য মেজর আরিয়ানকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
সেফ হাউসের চারদিকের জঙ্গল অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। পাহাড়ের এই নির্জনতায় শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আরিয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ইউনিফর্মের বোতাম গুলো আটকাচ্ছিলেন।
৮ বছর পর এই পোশাক গায়ে জড়িয়ে তার মনে হচ্ছে সে তার আসল প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
আরিয়ান পেছনে তাকিয়ে দেখলেন ইলা দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিস্পলক অন্ধ চোখ দুটো থেকে টলটলে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে ইলার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন।
ইলাঃ- আমার মনটা বারবার কু ডাকছে। কেন জানি মনে হচ্ছে অন্ধকার আমাদের ঘিরে ধরেছে আপনি কি যাবেনই?
আরিয়ান ইলার কপালে মাথা ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল মায়ার জালে আটকা পড়ে আমি ৮ বছর ঘুমিয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন সত্য আমার সামনে। জামান শুধু আমার শত্রু নয়, সে দেশের শত্রু। ওকে না থামালে আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবী কোনোদিন শান্ত হবে না। তুমি আমার ওপর বিশ্বাস হারিও না।
ঠিক তখনই বাইরে একটা শুকনো পাতা মাড়ানোর শব্দ হলো। আরিয়ানের কান খাড়া হয়ে উঠল। তিনি দ্রুত ইলাকে ঘরের এক কোণে সরিয়ে নিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালেন। শাহরিয়ারের প্রশিক্ষিত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও সজাগ হয়ে গেছে। সে তার সাব-মেশিনগানটা হাতে তুলে নিয়ে ইশারায় আরিয়ানকে সতর্ক করল।
শাহরিয়ারঃ- স্যার গেটের বাইরের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো অফ হয়ে গেছে। ওরা এসে গেছে।
আরিয়ান চোখের পলকে খাটের তলা থেকে নিজের সার্ভিস রিভলবারটা বের করে নিলেন। ইলা ভয়ে কাঁপছিল, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করল। তার কানে আসছে অনেকগুলো বুটের শব্দ।
হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে জানালার কাঁচ চুরমার করে একটি গ্রেনেড ভেতরে এসে পড়ল।আরিয়ান চিৎকার করে উঠলেন,
আরিয়ানঃ- শাহরিয়ার শুয়ে পড়
বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলো ড্রয়িং রুমের এক পাশে। ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। সেই ধোঁয়ার মাঝেই শুরু হলো বৃষ্টির মতো গুলির শব্দ। বাইরে থেকে জামানের ভাড়াটে খুনিরা আক্রমণ শুরু করেছে।
শাহরিয়ার নিপুণ নিশানায় পাল্টা গুলি ছুড়তে শুরু করল।আরিয়ান ইলা আর ইলিয়ানাকে নিয়ে বেডরুমের ভেতর একটি সিক্রেট বাঙ্কারের দিকে এগোচ্ছিলেন।ইলিয়ানা ভয়ে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
ইলিয়ানাঃ- পাপা ওরা কারা? ওরা কেন শব্দ করছে?
আরিয়ান ইলিয়ানাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন
আরিয়ানঃ- ভয় নেই প্রিনসেস পাপা আছে তো তোমরা এই সুড়ঙ্গ দিয়ে পেছনের গেটে চলে যাও। তোমার সজল আংকেল সেখানে জিপ নিয়ে অপেক্ষা করছে।
ইলা আরিয়ানের হাত ছাড়তে চাইছিল না।
ইলাঃ- আপনি আসবে না?
আরিয়ান হাসলেন যে হাসিতে বিদায়ের সুর নেই,আছে বিজয়ের সংকল্প।
আরিয়ানঃ- আমি জামানের সাথে সব হিসেব চুকিয়ে আসছি। তুমি যাও ইলাফুল আমার আমার কিছু হবে না।
ইলা ইলিয়ানাকে নিয়ে চলে গেলো এই গুলির ধব্দে ইলিয়ানা ভয়ে পাচ্ছে। এদিকে
শাহরিয়ার আর আরিয়ান দুজনে মিলে খুনিদের ব্যস্ত করে রাখলেন যাতে ইলা আর ইলিয়ানা নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারে। ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের বারান্দায় একজনের দীর্ঘ ছায়া দেখা গেল। হাতে একটি একে-৪৭। লোকটার মুখের অর্ধেকটা পোড়া বিস্ফোরণের ক্ষত।আরিয়ান গলার স্বর শুনেই চিনে ফেললেন
আরিয়ানঃ- জামান পরিচয় লুকিয়ে আর লাভ নেই সামনে আয়
জামান অট্টহাসি দিয়ে ঘরের ভেতর পা রাখল। তার চোখেমুখে পৈশাচিক আনন্দ।
জামানঃ- ওয়াও মেজর আরিয়ান ইউনিফর্মে তোমাকে এখনও সেই আগের মতোই দাম্ভিক লাগছে।কিন্তু এই দাম্ভিকতা আর কতক্ষণ? তুমি জানো না, তোমার এই সেফ হাউস এখন একটা ডেথ ট্র্যাপ।
আরিয়ান শান্তভাবে নিজের পিস্তল তাক করে বললেন
আরিয়ানঃ- ৮ বছর আগে তুই আমাকে মারতে চেয়েছিলি, কিন্তু ভাগ্য আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে জামান। আমজাদ চৌধুরী তো শুধু তোর ঘুঁটি ছিল। তাকে মারলি কেন?
জামানঃ- অকেজো জিনিস আমি রাখি না আরিয়ান। আর আমজাদ সাহেব ইমোশনাল হয়ে পড়ছিলেন। তিনি তোমাকে সত্যিই ছেলে বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার দরকার ছিল তোমার সেই পুরনো মিশনের ফাইলগুলো, যা তুমি তোমার মেমোরিতে তালা মেরে রেখেছ। এখন সেই চাবি আমি তোমার মগজ থেকে বের করে নেব। যেহেতু মেমোরি ফিরে এসেছে তাই ফাইল গুলো কোথায় আছে আমাকে বলে দাও।
আরিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। তিনি ট্রিগার চাপলেন। শুরু হলো দুই দুর্ধর্ষ অফিসারের জীবন-মরণ লড়াই। ঘরের আসবাবপত্র চুরমার হয়ে যাচ্ছে গুলির আঘাতে।
অন্যদিকে, ইলা আর ইলিয়ানাকে নিয়ে সজল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জিপের দিকে দৌড়াচ্ছিল। হঠাত ইলা দাঁড়িয়ে গেল।
সজলঃ- ভাবি দাঁড়াচ্ছেন কেন? দ্রুত আসুন
ইলা চিৎকার করে উঠল
ইলাঃ- না সজল ভাইয়া আরিয়ান আর ভাইয়া একা লড়ছে আমি অনুভব করতে পারছি ওদের সামনে বড় বিপদ, জামান একা আসেনি।
ঠিক সেই সময় সেফ হাউসের দিক থেকে আরও একটা বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেল। পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশে উঠে গেল। ইলা স্তব্ধ হয়ে সেই আগুনের তাপ্ত অনুভব করতে লাগল। তার বুক চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে এল
ইলাঃ- আরিয়াআআআআন
আগুনের উত্তাপ বাতাসের সাথে মিশে ইলার গায় এসে লাগছে। সে হাতড়ে হাতড়ে সামনের দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু সজল তাকে শক্ত করে ধরে রাখল।
ইলাঃ- ভাইয়া আমাকে ছাড়ুন আরিয়ান ভাইয়া ভেতরে একা লড়ছে। ওই আগুনের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি ভাইয়া ওরা হয়তো আমাকে ডাকছে।
সজল ধরা গলায় বলল
সজলঃ- ভাবি ওখানে যাওয়া এখন আত্মহত্যার শামিল হওয়া একই। শাহরিয়ার আর আরিয়ান ভাই দুজনেই ভেতরে আটকা পড়েছে আপনি শান্ত হন।
কিন্তু শান্ত হওয়ার মতো অবস্থায় কেউ নেই। ঠিক তখনই সেই জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে কাশির শব্দ শোনা গেল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেদ করে দুইটা অবয়ব টলতে টলতে বেরিয়ে আসছে। একজনের কাঁধে অন্যজন ভর দিয়ে আছে।
ইলা তীক্ষ্ণ কানে সেই পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল “আরিয়ান”
হ্যাঁ আরিয়ানই তার ইউনিফর্মের একপাশ পুড়ে গেছে, কপাল বেয়ে রক্ত পড়ছে। সে শাহরিয়ারকে ধরে টেনে বের করে আনছে। শাহরিয়ারের পায়ে গুলি লেগেছে, সে প্রায় অচেতন। আরিয়ান তাদের নিরাপদ দূরত্বে এনে শাহরিয়ারকে সজলের হাতে সঁপে দিলেন।
ইলা পাগলের মতো আরিয়ানকে হাতড়ে বেড়াতে লাগল। আরিয়ান ইলার কাঁপুনি ভরা হাত দুটো নিজের রক্তাক্ত হাতে চেপে ধরলেন।
আরিয়ানঃ- আমি ঠিক আছি ইলাফুল তোমার ভয়েজ কিং এত সহজে হার মানার পাত্র নয়।
ইলা আরিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু আরিয়ানের চোখ তখনো সেফ হাউসের পেছনের অন্ধকারের দিকে। জামান পালিয়ে গেছে বিস্ফোরণের অন্ধকার এর মধ্যে দিয়ে। আরিয়ান সজলকে উদ্দেশ্য করে বলল
আরিয়ানঃ- সজল শাহরিয়ারকে গাড়িতে তোলো।ওকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। আর জামান… ও বেশিদূর যেতে পারেনি। ওর পায়ে আমি গুলি করেছি।
শাহরিয়ার ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল,তবুও সে আরিয়ানের হাত ধরে বলল
শাহরিয়ারঃ- স্যার ও বর্ডারের দিকে যাচ্ছে। ওখানে ওর লোক আছে। ওকে এখনই ধরতে হবে।
আরিয়ান নিজের রিভলবারটা চেক করে নিলেন।তার চোখে এখন আগুনের চেয়েও বেশি তেজ। তিনি ইলার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললেন।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল শেষবারের মতো আমাকে যেতে দাও।আজ যদি আমি ওকে না ধরি, তবে ও সারা জীবন আমাদের ছায়ার মতো তাড়া করবে।আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি সূর্য ওঠার আগে ফিরে আসব।
ইলা এবার বাধা দিল না সে জানে, এই লড়াইটা আরিয়ানের সম্মানের, তার অস্তিত্বের। ইলা শুধু বলল
ইলাঃ- আমি আপনার জন্য এখানেই অপেক্ষা করব। আপনার পায়ের শব্দ না শোনা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ব না।
আরিয়ান ইলার কপালে চুমু দিয়ে পাহাড়ের নিচের ঘন জঙ্গলের দিকে দৌড়াতে শুরু করলেন। রক্তের দাগ অনুসরণ করে তিনি জামানের পিছু নিয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ দৌড়ানোর পর একটা ঝর্ণার কাছে এসে আরিয়ান থামলেন।ঝর্ণার শব্দের আড়ালে কারো হাঁপানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।আরিয়ান শান্ত গলায় বললেন
আরিয়ানঃ- জামান তোর খেলা শেষ। অস্ত্র ফেলে বেরিয়ে আয়। পালানোর আর কোনো পথ নেই।
ঝোপের আড়াল থেকে জামান বেরিয়ে এল। তার পা দিয়ে প্রচুর রক্ত ঝরছে। তার হাতে থাকা একে-৪৭ এর বুলেট শেষ। সে একটা ছুরি বের করে উন্মাদ হাসি হাসল।
জামানঃ- ৮ বছর আগে তোকে মারতে পারিনি আরিয়ান, ওটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। কিন্তু আজ তোকে সাথে নিয়েই আমি মরব।
জামান চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আরিয়ানের ওপর। দুই শক্তিশালী যোদ্ধার মাঝে শুরু হলো মল্লযুদ্ধ। পাথর,কাদা আর পানির মাঝে তারা একে অপরকে আঘাত করতে লাগল। জামানের ছুরির আঘাতে আরিয়ানের বাহু কেটে গেল, কিন্তু আরিয়ান তার সেই বিশেষ ‘আর্মি মুভ’ দিয়ে জামানকে আছাড় দিলেন পাথরের ওপর।আরিয়ান জামানের বুকের ওপর চেপে বসে তার কলার ধরলেন।
আরিয়ানঃ- কেন করলি এমন? আমরা ট্রেনিং নিয়েছি, একসাথে দেশ রক্ষার শপথ নিয়েছি। টাকার জন্য তুই সব বিক্রি করে দিলি?
জামান রক্তাক্ত মুখে হাসল
জামানঃ- শপথ দিয়ে পেট ভরে না আরিয়ান। তোর মতো আদর্শবাদী হয়ে আমার লাভ নেই। তবে জেনে রাখ, আমি ধরা দিলেও তোর শান্তি নেই। আমার বস তোকে খুঁজে বের করবেই।
আরিয়ান গম্ভীর গলায় বললেন
আরিয়ানঃ- তোর বসের সাথে পরে দেখা হবে। এখন তোর হিসেব চুকানোর পালা।
আরিয়ান জামানকে টেনে হিঁচড়ে পাহাড়ের ওপরের দিকে নিয়ে এলেন, যেখানে শাহরিয়ারের ব্যাকআপ টিম ইতিমধ্য পৌঁছে গেছে।জামানকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে জিপে তোলা হলো।
জামকে আর্মির হাতে তূলে দিলে আরিয়ান তার ইলাফুল এর কাছে ছূটলো ভোরের প্রথম আলো যখন পাহাড়ের চূড়ায় দেখা দিল, আরিয়ান ফিরে এলেন ইলার কাছে। ইলা তখনো সেই পাথরের ওপর বসে ছিল। আরিয়ানের বুটের শব্দ পেতেই সে দাঁড়িয়ে গেল।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭০
ইলাঃ- “আরিয়ান?”
আরিয়ান ইলাকে জড়িয়ে ধরলেন। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোয় আরিয়ানের রক্তাক্ত ইউনিফর্ম যেন এক নতুন জয়ের গল্প বলছিল।
আরিয়ানঃ- যুদ্ধ শেষ ইলাফুল এবার বাড়ি ফেরার পালা।
