ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭২
ছায়া
তড়িঘড়ি করে শাহরিয়ারকে শহরের একটি সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইলা আর ইলিয়ানা বাইরে উদ্বেগের সাথে অপেক্ষা করছে, আর আরিয়ান অপারেশন থিয়েটারের সামনে পায়চারি করছে। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এসে জানালেন, শাহরিয়ার এখন আশঙ্কামুক্ত।
হাসপাতালের কেবিনে শাহরিয়ার শুয়ে আছে, পায়ে ব্যান্ডেজ। আরিয়ান তার পাশে এসে বসলে শাহরিয়ার ম্লান হাসল।
আরিয়ানঃ- পাগল ছেলে নিজের জীবনের ঝুঁকি কেন নিতে গেলে?
শাহরিয়ারঃ- আপনার জন্য জীবন দেওয়াও তো সৌভাগ্যের বিষয় স্যার। আপনার জন্য আমি একটা পরিবার পেয়েছি বোন পেয়েছি।
আজ আপনাকে সব বলতে হবে। এই ৮ বছরে আমরা কীভাবে বেঁচে ছিলাম, তা আপনার জানা দরকার।
আরিয়ান শাহরিয়ারের হাতটা শক্ত করে ধরল। শাহরিয়ার বলতে শুরু করল সেই
বিভীষিকাময় ৮ বছরের ইতিহাস।
শাহরিয়ারঃ- স্যার ৮ বছর আগে যখন আপনার মারা যাওয়ার খবর এলো, ইলা তখন অন্তঃসত্ত্বা।এই খবরটা শুনে তার বাবা মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ইলিয়ানাকে পৃথিবীতে আসতে দিবে না। সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলো। শেষে আমি বনুকে আমার কাছে নিয়ে আসি।
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ইলার সেই অসহায় মুখটা।
শাহরিয়ারঃ- আপনার অবর্তমানে আপনার বাবা-মা শোকে ভেঙে পড়েছিলেন। নোহা নেহা পাগলের মত হয়ে গেছিলো।এর মাঝে আপনার বাবা আপনার দুই বোন কে অন্য জায়গায় বিয়ে দেয়।
বিয়ের কথা শুনে আরিয়ানের মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো।
আরিয়ানঃ- বিয়ে মানে নোহার বিয়ে হয়ে গেছে কোথায়?? আর তোমাদের ভালোবাসা??
শাহরিয়ারঃ- আমাদের ভালোবাসার থেকে আপনার দেয়া কথাটা রাখা বেশি দরকার ছিলো স্যার।
শাহরিয়ার থামল তার চোখে জল। সে আবার বলতে শুরু করল,
শাহরিয়ারঃ- স্যার বনু শুধু আপনার স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করেনি, সে আপনার পুরো সন্তানের জন্য সব কিছু ত্যাগ করেছে আপনার সন্তান কে আগলে রেখেছে।
আজ আপনি ফিরে এসেছেন, বনুর ৮ বছরের অপেক্ষা সার্থক হয়েছে।আরিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে ভোরের আলো ফুটছে।সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ইলাফুলকে আর কষ্ট পেতে দিবে না।
আরিয়ান কেবিন থেকে বেরিয়ে ইলার কাছে গেল। ইলা করিডোরের বেঞ্চে বসে ছিল। আরিয়ানকে কাছে আসতে দেখে সে অস্ফুট স্বরে বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া এখন কেমন আছে?
আরিয়ানঃ- ভালো আছে ইলাফুল ও আমাকে সব বলেছে। এই ৮ বছর তুমি যে লড়াইটা করেছ, তার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
ইলা আরিয়ানের বুকে মাথা রাখল। ইলিয়ানা তখন চেয়ারে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সকাল বেলা শাহরিয়ারের শারীরিক অবস্থা এখন বেশ স্থিতিশীল। ডাক্তার তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন, তবে শাহরিয়ারের জেদ সেও আত্রাই যাবে। নিজের চোখে আরিয়ানের পরিবারের পুনর্মিলন দেখতে চায় সে।
আরিয়ান প্রথমে রাজি হতে চায়নি, কিন্তু শাহরিয়ারের আকুতি আর ইলার মৌন সম্মতি দেখে সে না করতে পারল না। একটি বড় মাইক্রোবাস ভাড়া করা হলো। আরিয়ান ড্রাইভার এর পাশের সিটে পেছনে ইলা, শাহরিয়ার আর তার কোলে মাথা রেখে আধোঘুমে থাকা ইলিয়ানা।
গাড়ি যত আত্রাইয়ের মাটির কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে,আরিয়ানের হৃদস্পন্দন তত বাড়ছে। দীর্ঘ ৮ বছর পর সে নিজের ভিটায় ফিরছে আবেগ নিয়ে ফিরছে।
গাড়ি যখন বাড়ির সামনে এসে থামল, চারপাশ নিঝুম। ইলা গাড়ি থেকে নেমে ইলিয়ানার হাত ধরল। আরিয়ান আর শাহরিয়ার নামল ধীর পায়ে।বাড়ির সদর দরজা খোলা ছিল। আরিয়ানের মা নাফিযা বেগম বাগানে বসে ছিলেন। আরিয়ান তার মাকে দেখে একটু চমকে উঠলো বার্ধক্য আর শোকের ছাপ তার সারা শরীরে স্পষ্ট।
হঠাৎ কারো ছায়া পড়তে দেখে তিনি চোখ তুললেন। ইলার সাথে শাহরিয়ারকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন।
নাফিযাঃ- ইলা মা তুই এসেছিস তোর অভিমান ভেগেছে এত বছর পড়ে।
ইলা কিছু বলতে পারল না,তার গলা বুজে এল। সে শুধু একপাশে সরে দাঁড়াল। নাফিযা বেগমের নজর এবার ইলার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী যুবকটির ওপর পড়ল।
আরিয়ান চশমাটা খুলে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছল।নাফিযা বেগম স্থির হয়ে বসে রইলেন। হাতের চায়ের কাপটা পড়ে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
নাফিযাঃ- আমি কি ভুল দেখছি? ওটা কি আমার শাওন?
ভেতর থেকে আরিয়ানের বাবা মেহেরাব খান বেরিয়ে এলেন।দরজায় দাঁড়িয়ে চশমাটা ঠিক করে নিয়ে ভালো করে তাকিয়েই
মেহেরাবঃ- “আ…আরিয়ান? বাবা? তুই বেঁচে আছিস?”
আরিয়ান টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। কান্নায় ভেঙে পড়ল সেই শক্ত মানুষটা।
আরিয়ানঃ- আব্বু আমি ফিরে এসেছি।
নাফিযা বেগম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি চিৎকার করে আরিয়ানকে জাপটে ধরলেন। মা-ছেলের সেই আর্তনাদ আর মিলনের দৃশ্যে আকাশের বাতাসও যেন ভারি হয়ে উঠল। শাহরিয়ার আর ইলার চোখের কোণে তখন নোনা জল।মেহেরাব খান ইলার দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,
মেহেরাবঃ- বউমা তুমি ফিরে এসেছো আমার ছেলেকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছো।
ইলিয়ানা তখনো ফ্যালফ্যাল করে দেখছিল। আরিয়ান তার হাত ধরে টেনে আনল।
আরিয়ানঃ- আব্বু আম্মু দেখো, এটা তোমাদের নাতনি। ইলা একাই ওকে বড় করেছে এই ৮ বছর।
নাফিযা বেগম ইলিয়ানাকে জড়িয়ে ধরলেন। শাহরিয়ার এক কোণে দাঁড়িয়ে ম্লান হাসছিল। তার জীবনের সবটুকু ত্যাগ আজ স্বার্থকতা পেল। নোহা আর নেহার কথা মনে হতেই আরিয়ানের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল, কিন্তু আজ শুধু খুশির জোয়ারে ভাসতে চাইল সবাই।
আরিয়ানের ফিরে আসায় মেহেরাব খান আর নাফিযা বেগমের চোখে আজ আনন্দের বান ডেকেছে। ইলিয়ানাকে বুকে টেনে নিয়ে নাফিযা বেগম যেন হারানো দিনগুলো ফিরে পাচ্ছেন। কিন্তু এই উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেও আরিয়ানের মনের এক কোণে বিষাদ জমে আছে। শাহরিয়ারের বলা কথাগুলো তীরের মতো বিঁধছে তার বুকে। নোহা আর নেহা তার কলিজার দুই বোন এখন কোথায়? কিভাবে আছে সে জানে না।
বাড়ির ড্রয়িংরুমে সবাই বসলে আরিয়ান ধীরস্থিরভাবে বাবার পাশে বসল। শাহরিয়ার একপাশে সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে। আরিয়ান মেহেরাব খানের হাতটা শক্ত করে ধরে প্রশ্ন করল।
আরিয়ানঃ- আব্বু নোহা আর নেহা কোথায়? ওদের দেখছি না কেন? শাহরিয়ার বলল ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা কেমন আছে?
প্রশ্নটা শুনেই মেহেরাব খানের উজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখের জল মুছলেন। পাশে থাকা নাফিযা বেগমও শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
মেহেরাবঃ- রেহেম করেছেন আল্লাহ যে তোকে ফিরে পেয়েছি বাবা। কিন্তু তোর দুই বোনের ভাগ্য দুই রকম লিখেছিলেন তিনি। নেহা খুব সুখে আছে বাবা। ওর স্বামী জাওয়াদ খুব ভালো মানুষ, ওকে মাথায় করে রাখে। একটা ছেলেও হয়েছে ওদের। কিন্তু নোহা…
আরিয়ানঃ- নোহা কী আব্বু? ও ভালো নেই?
মেহেরাব খানঃ- না রে বাবা নোহার ওপর দিয়ে যে কী ঝড় বয়ে গেছে তা তোকে বলে বোঝাতে পারব না। তোর মৃত্যুর পর নোহা বলেছিলো ও এক আর্মি ছেলেকে ভালোবাসে কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম তোর মত যদি কিছু হয়। তাই আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।ঐ ছেলের সাথে না বিয়ে দিয়ে নোহার বিয়ে দিলাম চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলের সাথে। ভেবেছিলাম রাজপ্রাসাদে থাকবে মেয়েটা, সুখে থাকবে। কিন্তু ওই পিশাচটা ওকে মানুষ বলে গণ্য করে না।
আরিয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এল। মেহেরাব খান আবার বলতে শুরু করলেন,
মেহেরাবঃ- ওর জামাই ওকে অমানুষিক টর্চার করে। আমি অনেকবার গিয়েছি ওকে ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু নোহা ফেরেনি। ও আমাদের ওপর অভিমান করে এই বাড়িতে পা রাখেনি।
আরিয়ান আর সহ্য করতে পারল না। সে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। শাহরিয়ার মাথা নিচু করে চোখের জল ফেলছে। যে নোহাকে সে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসত, আজ সে অন্য কারো হাতে নির্যাতিত হচ্ছে।
এদিকে,
শহরের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নোহা। আগের সেই চঞ্চল নোহা এখন নিস্তেজ ফ্যাকাসে। চোখের নিচে কালচে দাগ। হাতে একটা পুরনো পোড়া দাগ স্পষ্ট।
পেছন থেকে তার স্বামী ইমতিয়াজ মদ্যপ অবস্থায় টলতে টলতে ঘরে ঢুকল।
ইমতিয়াজঃ- কী রে?এখনো দাঁড়িয়ে আছিস? খাবার টেবিলে সাজিয়েছিস? নাকি আবার চড়-থাপ্পড় খেতে ইচ্ছে করছে?আর এভাবে কি তোর ঐ নাগরের কথা ভাবছিস।
নোহা কোনো উত্তর দিল না।কারণ এই কথা তার রোজ শুনতে হয়। সে শুধু শূন্য দৃষ্টিতে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, ‘ভাইয়া থাকলে আজ আমাকে এই দিন দেখতে হতো না।’
অন্যদিকে,
নেহার ঘর তখন আলোয় ঝলমল করছে। সে তার ছোট ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছে। যদিও সে সুখে আছে, কিন্তু বড় বোনের এই কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। নেহা ফোন হাতে নিয়ে নোহার নাম্বারে ডায়াল করল, কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে দেওয়া হলো।বার বার ফোন দিচ্ছে কেউ ধরছে না।
নেহা টেনশনে মেহেরাব খান কে ফোন দিয়ে সব খুলে বলল সব শুনে আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।তার চোখে এখন আগ্নেয়গিরির লাভা। সে ইলার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আমার নোহা পাখিটা একা লড়াই করছে। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে বসে থাকতে পারব না। শাহরিয়ার তুমি কি যেতে পারবে আমার সাথে?
মেহেরাবঃ- ও কিভাবে যাবে এই অবস্থায় আর তুই তো আসলি কাল যাস আজ যেতে হবে না।
শাহরিয়ারের চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল সে শুধু বলল,
শাহরিয়ারঃ- আংকেল আমি ঠিক আছি,
আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে শাহরিয়ার আবার বলল
শাহরিয়ারঃ- আমি তৈরি স্যার।
মেহেরাব খান শাহরিয়ার কথা শুনে নিজেও বলল
মেহেরাবঃ- তাহলে আজ আমরা সবাই যাবো।
আরিয়ানের রক্ত টগবগ করে ফুটছে যে বোনকে সে ফুলের মতো আগলে রাখত, সেই বোনের এই দশা সে কল্পনাও করতে পারছে না। কারো বারণ শুনল না কেউ। শাহরিয়ারের পায়ে চোট থাকলেও তার ভেতরের ক্রোধ তাকে অমানুষিক শক্তি দিচ্ছে। মেহেরাব খান, নাফিযা বেগম, ইলা এবং শাহরিয়ারকে নিয়ে আরিয়ান তক্ষুনি নোহার শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
শহরের সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ভেতরে তখন নারকীয় তাণ্ডব চলছে।মদ্যপ ইমতিয়াজ নোহার চুলের মুঠি ধরে দেয়ালে মাথা ঠুকছে।
ইমতিয়াজঃ- হারামজাদি তোর বোন ফোন দিচ্ছে কেন রে? কী বলছিস ওকে? আমার নামে বিচার দিচ্ছিস? তোর বাপের বাড়ি যাওয়ার সাধ মিটিয়ে দেব আজ!
নোহা চিৎকার করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ইমতিয়াজ হাত উঁচিয়ে সপাটে একটা থাপ্পড় মারল নোহাকে। থাপ্পড়ের চোটে নোহা ছিটকে গিয়ে পড়ল সদর দরজার সামনে, ঠিক এক জোড়া শক্ত পক্ত পায়ের কাছে।
নোহা যন্ত্রণায় চোখ বুজে গোঙাচ্ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, এক জোড়া পরিচিত শীতল কিন্তু আশ্রয়ের স্পর্শ তাকে টেনে তুলছে। নোহা চোখ মেলে তাকাল। সামনে ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, যার কাঁধে এখনো সেই চেনা আভিজাত্য। নোহা বিশ্বাস করতে পারল না। তার মনে হলো সে মারা গেছে আর জান্নাতে তার ভাইয়ার দেখা পেয়েছে।
নোহা কোনো কথা না বলে, কোনো প্রশ্ন না করে আর্তচিৎকার দিয়ে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরল। এ যেন এক ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরা।
নোহাঃ- ভাইয়া তুমি এসেছো ভাইয়া? আমাকে নিয়ে যাও ভাইয়া এরা আমাকে মেরে ফেলবে।
ইমতিয়াজ তখনো নেশার ঘোরে টলছে। সামনে অপরিচিত এক যুবককে দেখে সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল।
ইমতিয়াজঃ- ওরে আমার সতী সাধ্বী স্ত্রী ঘরের দরজা খোলা পেয়ে এখন সবার সামনে নাগরকে জড়িয়ে ধরছিস?এটা আবার তোর কোন নাগর রে নোহা?এই তুই কে রে? ছাড় ওকে এটা আমার বাড়ি, আমার বউ তোর সাহস তো কম না, পরের বউকে এভাবে ধরিস?
ইমতিয়াজ টলতে টলতে নোহার হাত ধরে টেনে আনতে গেল। আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে এক ঝটকায় নোহাকে নিজের আড়ালে নিয়ে ইমতিয়াজের কলার ধরল। তারপর সারা শরীরের শক্তি দিয়ে ইমতিয়াজের গালে বসিয়ে দিল এক প্রচণ্ড চড় “ঠাস্”
ইমতিয়াজ সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে সোফার ওপর পড়ল। আরিয়ান বাঘের মতো গর্জে উঠল।
আরিয়ানঃ- কুত্তার বাচ্চা ওর নাগর না, আমি ওর ভাই হইরে জানোয়ারের বাচ্চা, তোর সাহস কী করে হয় আমার বোনের গায়ে হাত তোলার?তুই জানিস আমি কে,আমি ওর মায়ের পেটের ভাই হই। এতদিন তো কেউ ছিল না বলে খুব সিংহ সেজেছিলি, আজ তোর যম এসেছে।
ইমতিয়াজ কিছু বলার আগেই শাহরিয়ার আর সহ্য করতে পারল না। সে ক্রাচ ছাড়াই হেঁচকানো টানে ইমতিয়াজকে মেঝেতে ফেলল। নিজের পায়ের ব্যথা ভুলে শাহরিয়ার আজ দানব হয়ে উঠেছে।শাহরিয়ার ইমতিয়াজের বুকে লাথি মেরে
শাহরিয়ারঃ- এই হাত দিয়ে নোহাকে মেরেছিস না? এই হাত আমি আজ গুঁড়ো করে দেব নির্যাতন করার জায়গা পাস না? এই শুয়োরের বাচ্চা, তোর মতো জানোয়ারদের জন্য জেলের ভাতই ঠিক আছে।
শাহরিয়ার আর আরিয়ান মিলে ইমতিয়াজকে উত্তম-মধ্যম দিতে শুরু করল। মেহেরাব খান আর নাফিযা বেগম নোহাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছেন। ইলা পাশে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে এই ভয়াবহ দৃশ্য অনুভব করে।
আরিয়ান ইমতিয়াজের শার্টের কলার ধরে হিড়হিড় করে টেনে ব্যালকনির কাছে নিয়ে গেল।
আরিয়ানঃ- তোর মতো কুলাঙ্গারকে মারলে আমার হাত নোংরা হবে। তুই আইনি মার খাবি আর আমার হাতে খাবি কলিজা ফাটা মার।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭১
নোহা তখনো আরিয়ানের শার্টের হাতা শক্ত করে ধরে আছে। তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না ভাইয়া সত্যি ফিরে এসেছে। আরিয়ান ইমতিয়াজকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার ব্যবস্থা করে নোহার দিকে তাকাল। ওর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে আরিয়ানের বুক ফেটে যাচ্ছিল।আরিয়ান নোহার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- নোহা পাখি চল এই নরকে তুই আর এক মুহূর্ত থাকবি না। আজ থেকে তোর এই ভাই তোকে আগলে রাখবে। কার সাধ্য আছে তোর দিকে চোখ তুলে তাকায়?
নোহাকে নিয়ে আরিয়ান যখন ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন নোহার মনে হলো ৭ বছরের দীর্ঘ অমাবস্যা শেষে আজ তার আকাশে সত্যি চাঁদ উঠেছে।
