Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৩
ছায়া

ইমতিয়াজকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে নোহাকে নিয়ে যখন আরিয়ান বাড়িতে ফিরল, তখন বাড়ির পরিবেশ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। নোহার শরীর জুড়ে নীল হয়ে যাওয়া মারধরের দাগগুলো যেন মেহেরাব খানের কলিজায় তীরের মতো বিঁধছে। নিজের ঘরে ফিরে নোহা যখন ক্লান্তিতে আরিয়ানের কাঁধে মাথা রাখল, তখন মেহেরাব খান আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।তিনি নোহার সামনে এসে ওর হাত দুটো নিজের দুহাতে চেপে ধরলেন। বয়স্ক মানুষটার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে।মেহেরাব খান ফুঁপিয়ে কেঁদে দিলো
মেহেরাবঃ- মারে… আমাকে মাফ করে দিস। আমি নিজ হাতে তোর জীবনটা বিষিয়ে দিলাম।তোর মা আর আমি ভেবেছিলাম তোকে রাজপ্রাসাদে পাঠাতে পারলেই হয়তো তুই সুখে থাকবি। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি রাজপ্রাসাদের আড়ালে একটা কসাইখানা ছিল। তোর ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে দিলেই হয়তো আজ তুই এমন নিস্প্রভ হয়ে থাকতি না। এখন তোর কী হবে মা? এই সমাজ কি তোকে সহজভাবে মেনে নেবে? সারাজীবন কীভাবে একা থাকবি তুই?

বাবার এই হাহাকার শুনে নোহা শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমের এক কোণ থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে এল শাহরিয়ার। তার চোখে এখনো নোহার জন্য সেই চিরচেনা মায়া আর অস্থিরতা।শাহরিয়ার মেহেরাব খানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
শাহরিয়ারঃ- আঙ্কেল, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, তবে আমি আপনার এই পাখিকে আমার করে নিতে চাই। জানি, আমার কোনো বিশাল রাজপ্রাসাদ নেই, নেই কোনো অগাধ সম্পত্তি। কিন্তু কথা দিচ্ছি আঙ্কেল, আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনার মেয়েকে আমি কোনোদিন কোনো কষ্টে পড়তে দেব না।
শাহরিয়ারের কথা শুনে পুরো ঘরে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এল। শাহরিয়ার ধীর পায়ে নোহার সামনে গিয়ে বসল। নিজের চোট পাওয়া পা উপেক্ষা করে সে হাঁটু গেড়ে বসল নোহার সামনে। নোহার সেই ফ্যাকাসে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শাহরিয়ার অশ্রুসজল চোখে তাকাল।

শাহরিয়ারঃ- নোহা গত ৭ বছর আমি প্রতিটা দিন তোমাকে ছাড়া মরে মরে বেঁচেছি। ভেবেছিলাম তুমি সুখে আছো তাই নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু আজ যখন তোমাকে এই অবস্থায় দেখলাম, আমার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেছে। তুমি কি আমায় আরেকটা সুযোগ দিবে? এই ক্ষতবিক্ষত নোহাকে আমি আমার বুকের পাঁজরে আগলে রাখতে চাই।এই অধম শাহরিয়ারকে কি তোমার জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করবে?
নোহা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে মানুষটাকে সে এত ভালোবেসেও পায়নি তাকে।যে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল, আজ সে-ই তার সবটুকু অন্ধকার মুছে দিতে চাইছে। নোহা কী করবে ভেবে না পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে আরিয়ানের দিকে তাকাল।আরিয়ান এগিয়ে এসে নোহার মাথায় হাত রাখল তার চোখেও আজ সার্থকতা।

আরিয়ানঃ- নোহা পাখি অনেক হয়েছে আমার জন্য, এই পরিবারের সম্মানের জন্য তোরা অনেক স্যাক্রিফাইস করেছিস। আর না তুই শাহরিয়ারের ভালোবাসা দেখিসনি, কিন্তু আমি দেখেছি।ও শুধু আমার বউ আর সন্তানকে আগলে রাখেনি, ও নিজের বুকের ভেতর তোর স্মৃতিকেও আগলে রেখেছে। এখন তোদের এক হওয়ার পালা। শাহরিয়ারের চেয়ে ভালো আর কেউ তোকে আগলে রাখতে পারবে না।
নোহার চোখের বাঁধ ভাঙা জল এবার শাহরিয়ারের হাতের ওপর গিয়ে পড়ল।সে অস্ফুট স্বরে শুধু বলল,
“ভাইয়া…”
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ রে পাগলী এটাই তোর আসল ঠিকানা।
শাহরিয়ারের সেই আকুল করা প্রস্তাব আর আরিয়ানের আশ্বাসে নোহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে শাহরিয়ারের হাতটা শক্ত করে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। এই কান্না কোনো দুঃখের নয়, এ যেন দীর্ঘ ৭ বছরের জমানো সব অপমান আর যন্ত্রণার মুক্তি।নোহা কান্নাভেজা গলায় বলল
নোহাঃ- আমায় ফিরিয়ে দেবে না তো কাবির? আমি তো এখন সেই আগের চঞ্চল নোহা নেই। আমার শরীরে মনে সব জায়গায় শুধু ক্ষতের দাগ।তুমি আমায় গ্রহণ করতে পারবে তো?

শাহরিয়ার নোহার চোখের জল মুছে দিয়ে মৃদু হাসল সেই হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত নির্ভরতা।
শাহরিয়ারঃ- ওই ক্ষতগুলো তোমার একার নয় নোহা,ওগুলো আমার অপূর্ণতার চিহ্ন।আজ থেকে আমরা দুজনে মিলে সেই ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলব।আমি তোমাকে চাই নোহা ঠিক যেমনটা আগে চেয়েছিলাম।
পুরো ঘরে খুশির লহরী বয়ে গেল নাফিযা বেগম চোখের কোণ মুছলেন।ইলা হাতরে হাতরে এগিয়ে এসে শাহরিয়ার আর নোহার হাত একসাথে মিলিয়ে দিল।
ইলাঃ- ভাইয়া অনেক হয়েছে আর কোনো বিচ্ছেদ নয়।এবার তোমরা এক হও।তবে আমার একটা আবদার আছে।কথা হচ্ছে আমি আমার চোখের অপারেশন করাব। আমি সুস্থ হয়ে নিজের এই নতুন চোখে আমার ভাইয়ের বিয়ে নিজের হাতে দেব।
ইলার কথায় আরিয়ান মুগ্ধ হয়ে তাকাল।ইলাফুলের এই আত্মবিশ্বাস তাকে আরও বেশি শক্তি দিচ্ছে। আরিয়ান ইলার কাঁধে হাত রেখে বলল,
আরিয়ানঃ- অবশ্যই ইলাফুল তুমি সুস্থ হবে, আর আমরা সবাই মিলে ধুমধাম করে শাহরিয়ার আর নোহার বিয়ে দেব।

আরিয়ান বাড়ির সবাইকে বলে দিয়েছে নেহাকে যেনো কোনো কিছু না জানানো হয় সে নিজে নেহাকে সারপ্রাইজ দিবে।কথা মত পরদিন সকালেই আরিয়ান নেহার বাড়িতে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লো।
নেহা জানে না তার আদরের বড় ভাই বেঁচে আছে।শাহরিয়ার আর ইলা বাড়িতেই থাকল নোহার দেখভালের জন্য। আরিয়ান একা রওনা হলো নেহার শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে।
নেহার স্বামী জাওয়াদ একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নেহা সেখানে বেশ সুখে আছে,কিন্তু বড় বোন নোহার কষ্টের কথা ভেবে সে সবসময় বিষণ্ণ থাকে। আরিয়ান যখন ওদের কলিং বেল চাপল, নেহা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল।
নেহা দরজাও খুলে দিল সামনে এক লম্বা, সুদর্শন, ক্লিন শেভ করা যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কিছুটা থমকে গেল। এক পলক তাকিয়ে চোখ নিচে করে নিলো আরিয়ানের চোখে তখন সানগ্লাস, মুখে এক চিলতে হাসি।নেহা অপরিচিত ভেবে বলল
নেহাঃ- জি কাকে খুঁজছেন? জাওয়াদ তো বাসায় নেই।
আরিয়ান কিছু বলল না সে ধীরে ধীরে সানগ্লাসটা খুলল। নেহার দিকে তাকিয়ে একটা পরিচিত ডাক দিল।
আরিয়ানঃ- নেহা পাখি তোর ভাইয়াকে ভেতরে আস্তে বলবি না?
ডাকটা শুনেই নেহা স্থির হয়ে গেল শরীরের ভেতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল তার।এই কণ্ঠস্বর এই ডাকার ভঙ্গি এ তো স্বপ্নেও সে প্রতিদিন শোনে! নেহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল তার মস্তিষ্ককে এই সত্যটা গ্রহণ করতে।নেহা কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল
নেহাঃ- ভাইয়া….না আমি ভুল শুনছি।আমার ভাইয়া তো নেই আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি ভাইয়ার কথা ভাবতে ভাবতে?

আরিয়ান আর পারল না সে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।নেহা চিৎকার দিয়ে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
নেহাঃ- ভাইয়া তুমি সত্যি ফিরে এসেছো?তুমি মরোনি ভাইয়া? কেন আমাদের এভাবে একা ফেলে গেলে? জানো আম্মা-আব্বু কত কেঁদেছে? নোহা আপু শেষ হয়ে গেছে ভাইয়া ইলা ভাবিও আমাদের ছেরে চলে গেছে আমার সুখী সংসার নষ্ট হয়ে গেছে ভাইয়া।
আরিয়ান নেহাকে শান্ত করার চেষ্টা করল,তার নিজের চোখও তখন জলে টলমল।
আরিয়ানঃ- শান্ত হ বোন আমি সব জানি সব ঠিক করে দিবো আমি আগের মত নোহাকে আমি ফিরিয়ে এনেছি।আর কোনো কান্না নয় নেহা এবার শুধু হাসির দিন।
নেহা যেন ঘোরের মধ্যে আছে সে বারবার আরিয়ানের মুখটা ছুঁয়ে দেখছে, এটা সত্যি তো? জাওয়াদ ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গেল। যখন সে জানল এই সেই কিংবদন্তি আরিয়ান, যাকে নিয়ে নেহা সবসময় গল্প করত, সে শ্রদ্ধায় মাথা নত করল।
নেহার ড্রয়িংরুমে বসে জাওয়াদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে আরিয়ান স্থির করল তারা আজই আত্রাই ফিরবে। নেহা যেন হাতে আকাশ পেয়েছে। সে চটজলদি তার ছোট ছেলেকে তৈরি করে নিল।জাওয়াদও তার অফিসের ছুটি ম্যানেজ করে নিলো এই অভাবনীয় পুনর্মিলনে শরিক হতে।
আত্রাইয়ের বাড়িতে যখন নেহা তার ছোট পরিবার নিয়ে এসে নামল, বাড়ির চিত্র তখন পাল্টে গেছে। নোহা এখন অনেক শান্ত, শাহরিয়ারের সেবা আর ভালোবাসায় তার চোখের নিচের কালচে দাগগুলো যেন ফিকে হতে শুরু করেছে। নেহা বড় বোনকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল, কিন্তু সেই কান্নায় এখন আর হাহাকার নেই, আছে স্বস্তি।
কয়েকদিন পর,

আরিয়ান ইলার চোখের অপারেশনের সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করল।শহরের সেরা চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে দিন ঠিক করা হলো।আরিয়ান গোপন রাখল না কিছু, সে তার পুরনো সব আপনজনদের ফোন করল। সাবিহা বেগম, রাশেদ তালুকদার, হালিমা ,পরি, আদিব সবাইকে আসতে বলল। আরিয়ানের বেঁচে থাকার খবর শুনে তারা যতটা অবাক হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল ইলার চোখের আলো ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা শুনে।
অপারেশন থিয়েটারের বাইরে,
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন মুখে তার তৃপ্তির হাসি।
ডাক্তারঃ- অপারেশন সাকসেসফুল তবে ব্যান্ডেজ খোলার পর কয়েক মিনিট সময় লাগবে ওর চোখ মানিয়ে নিতে।
পরদিন সকালে কেবিনে সবাই উপস্থিত। ইলার দুচোখে সাদা ব্যান্ডেজ।আরিয়ান ইলার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে নোহা, নেহা, শাহরিয়ার, জাওয়াদ এবং আরিয়ানের বাবা-মা। সাবিহা বেগম আর রাশেদ তালুকদারও ভিড় করে আছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়।
নার্স এসে ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজ খুলতে শুরু করলেন। আরিয়ানের হৃদস্পন্দন যেন নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে।ব্যান্ডেজ পুরোপুরি খুলে যাওয়ার পর ইলা কয়েকবার চোখের পাতা পিটপিট করল।ঝাপসা আলোয় সে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
আরিয়ান খুব নিচু স্বরে বলল

আরিয়ানঃ- ইলাফুল… দেখতে পাচ্ছ?
ইলা ধীরে ধীরে চোখ মেলল।প্রথমে সবকিছু অস্পষ্ট মনে হলেও মুহূর্তের মধ্যেই তার সামনে ভেসে উঠল এক দেবতুল্য পুরুষ। দীর্ঘ ৮ বছরের কল্পনার সেই মানুষটা এখন রক্ত-মাংসের শরীরে তার সামনে।আরিয়ানের পরনে সাদা শার্ট, স্লিভগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। ক্লিন শেভ করা মুখমণ্ডল, ধারালো নাক আর সেই গভীর মায়াবী চোখ জোড়া যা ৮ বছর আগে ইলার স্মৃতিতে আটকে ছিল।আরিয়ানের চেহারায় এখন এক পরিণত আভিজাত এক বীরের তেজ।
ইলাঃ- ভয়েজ কিং আমি… আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি
ইলার কণ্ঠস্বরটা কাঁপছিল আরিয়ানের চোখে জল টলমল করে উঠল।সে হাসিমুখে ইলার গাল ছুঁয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ ইলাফুল আমি তোমার সামনেই আছি।
ইলা আবেগে আপ্লুত হয়ে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরতে চাইল,ঠিক তখনই আরিয়ান মুচকি হেসে একটু সরে দাঁড়াল।ইলা এবার পুরো ঘরটার দিকে তাকাল। সে দেখল তার বাবা-মা হালিমা ,আদিব,পরি, মেহেরাব খান, নাফিযা বেগম এবং তার দুই প্রিয় ননদিনী নোহা ও নেহা। সবার চোখে আজ খুশির বন্যা। আর সেই সাথে ছোট ইলিয়ানা যাকে সেই ছোট দেখেছে ইলা।
ইলা সবাইকে দেখে চিৎকার করে উঠল
ইলাঃ- আমি সবাইকে দেখতে পাচ্ছি আম্মা, আব্বু, নোহা… তোমরা সবাই এখানে হালিমা ,পরি
সাবিহা বেগম এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
সাবিহাঃ- মারে আজ থেকে তোর সব অন্ধকার শেষ। আমার মা সব দেখতে পাচ্ছে।
রাশেদ তালুকদার আরিয়ানের পিঠে হাত রেখে বললেন,
রাশেদঃ- বাবা আরিয়ান তুমি আমাদের মেয়েটাকে শুধু আলো দাওনি আবার একটা নতুন জীবন দিলা।
পুরো কেবিনটা যেন একখণ্ড স্বর্গে পরিণত হলো। ইলা তার দৃষ্টি ফিরিয়ে আবার আরিয়ানের ওপর রাখল। সে ভাবল যে চোখের আলো দিয়ে সে প্রথমবার তার ভালোবাসার মানুষকে দেখল, সেই চোখ দিয়ে সে এবার তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ সাজাবে।

শাহরিয়ার আর নোহা একপাশে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকাল।ইলা সুস্থ হয়েছে শাহরিয়ার এর খুশি দেখে কে।
ইলা এখন পুরোপুরি সুস্থ। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার পর তার পৃথিবীটা আজ নতুন রঙে সেজেছে। আরিয়ান ইলার পাশে বসে ওর হাতটা আলতো করে ধরে আছে। ঘরের এক কোণে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন সাবিহা বেগম আর রাশেদ তালুকদার। তাঁদের মনে পড়ছে আট বছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা, যখন তাঁরা ইলার ওপর অমানুষিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
রাশেদ তালুকদার ধীর পায়ে ইলার বেডের কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন
রাশেদঃ- “মা… ইলা মা আজ তোর এই সুন্দর চোখের দিকে তাকানোর যোগ্যতাও আমি হারিয়ে ফেলেছি। আট বছর আগে আমরা যা করতে চেয়েছিলাম, তার জন্য যদি তুই আমাদের কোনোদিন ক্ষমা না করিস, তবে আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না। আমি একজন বাবা হিসেবে ব্যর্থ হয়েছিলাম মা।
সাবিহা বেগম ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি ইলার পায়ের কাছে বসে পড়লেন।

সাবিহঃ- মারে আমাদের ভুল হয়ে গিয়েছিল। লোকলজ্জার ভয়ে আমরা তোর কোল খালি করতে চেয়েছিলাম। আরিয়ান বাবা, তুমি আমাদের ক্ষমা করে দাও। আমরা তোমাদের অনেক বড় শত্রু হতে চেয়েছিলাম।
আরিয়ান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে জানে ক্ষমা করা মহৎ কাজ, কিন্তু ইলার ওপর দিয়ে যা বয়ে গেছে তা ভোলার মতো নয়। ইলা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনগুলো, যখন নিজের বাবা-মা তাকে একা ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, যখন শাহরিয়ার ভাই তাকে নিজের পরিচয় দিয়ে আগলে রেখেছিলেন।
ইলা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে সাবিহা বেগমকে টেনে তুললেন। ইলার চোখে তখন এক অদ্ভুত কাঠিন্য আর মায়ার মিশ্রণ।
ইলাঃ- আম্মা আব্বু… তোমরা আমার জন্মদাতা।তোমাদের ওপর রাগ করে থাকা মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। আমি তোমাদের ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।
রাশেদ তালুকদার চোখ মুছে বললেন

রাশেদঃ- বল মা তুই যা বলবি আমরা তাই করব।
ইলা মৃদু হাসল সে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল, যে একপাশে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। ইলা শাহরিয়ারের হাতটা ধরে রাশেদ তালুকদার এর কাছে নিয়ে এলো।
ইলাঃ- আমি কোনো সম্পত্তি চাই না আব্বু। আমার শর্ত হলো তোমাদের শাহরিয়ার ভাইকে আইনত দত্তক নিতে হবে। আজ থেকে শাহরিয়ার ভাই শুধু আমার পালক ভাই নয়, ও তালুকদার বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে পরিচয় পাবে।এই আট বছর সে আমাকে বাবা, মা এবং ভাই সবকিছুর আদর দিয়ে আগলে রেখেছে। নিজের জীবন বাজি রেখে ও আমার ইলিয়ানাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে। ওর ঋণ আমি কোনো জন্মে শোধ করতে পারব না। তোমরা যদি ওকে নিজের ছেলে হিসেবে মেনে নাও, তবেই আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিবো।
ইলার কথা শুনে পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। শাহরিয়ার যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে তো কোনোদিন প্রতিদানের আশায় কিছু করেনি।

শাহরিয়ারঃ- বনু এসব কী বলছিস তুই? আমি তোকে ভালোবেসে করেছি, কোনো পরিচয়ের লোভে নয়।
ইলা শাহরিয়ারের মুখ চেপে ধরল।
ইলাঃ- “চুপ করো ভাইয়া তুমি সারাজীবন দিয়েছ, এবার আমাদের নেওয়ার পালা। আব্বু, কী ভাবছ?
রাশেদ তালুকদার এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। তিনি এগিয়ে গিয়ে শাহরিয়ারকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাশেদঃ- ইলা ঠিক বলেছে বাবা এই আট বছর ও যে দায়িত্ব পালন করেছো তা কোনো আপন ছেলেও করত কি না সন্দেহ নিজের বোনের জন্য, আজ থেকে তুমিই এই তালুকদার বাড়ির বড় ছেলে তুমি আমাদের সন্তান।
সাবিহা বেগমও শাহরিয়ারের মাথায় হাত রাখলেন।শাহরিয়ারের চোখের জল বাঁধ মানল না।যে ছেলেটি সারাজীবন অনাথের মতো জীবন যাপন করেছে আজ সে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবার খুঁজে পেল। আরিয়ান দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে তৃপ্তির হাসি হাসল। সে জানত ইলাফুলের মনটা অনেক বড়।আরিয়ান এগিয়ে এসে শাহরিয়ারের কাঁধে হাত রাখল।
আরিয়ানঃ- তাহলে ঠিক হলো শাহরিয়ার এখন থেকে সরকারিভাবে তালুকদার বাড়ির ছেলে। আর তার মানে হলো,আমার নোহা পাখির বিয়েটা হবে তালুকদার বাড়ির বড় ছেলের সাথে এবার আর কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না।

হাসিতে ভরে উঠল পুরো ঘর। নাফিযা বেগম আর মেহেরাব খানও যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। ইলা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। আরিয়ান চোখের ইশারায় তাকে অভিবাদন জানাল।
সবাই যখন আনন্দে আত্মহারা, ইলা তখন মনে মনে ভাবল
ইলাঃ- ভয়েজ কিং আমি হয়তো এতদিন চোখে অন্ধকার দেখেছিলাম, কিন্তু আপনার ফিরে আসা আর এই মানুষগুলোর ভালোবাসা আজ আমার জীবনকে পূর্ণ করে দিল।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। নার্স ইলিয়ানাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। ছোট ইলিয়ানা তার মাকে সুস্থ দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭২

ইলিয়ানাঃ- মাম্মাম এখন তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?
ইলা ইলিয়ানাকে কোলে তুলে নিয়ে ওর কপালে চুমু খেল।
ইলাঃ- হ্যাঁ মামনি আমি তোমাকে দেখছি, তোমার বাবাকে দেখছি, আর আমাদের পুরো পরিবারকে দেখছি।
এই দিনটি শুধু একটি মানুষের দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার দিন ছিল না,এটি ছিল একটি ভাঙা পরিবারের আবার জোড়া লাগার দিন। ক্ষমা,ত্যাগ আর ভালোবাসার জয় হলো আজ।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৪