Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৪

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৪

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৪
ছায়া

হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে সবাই বাড়িতে ফিরেছে। চারদিকে এখন উৎসবের আমেজ। শাহরিয়ার আর নোহার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও আরিয়ান আর ইলা যেন নিজেদের জন্য একটুও সময় পাচ্ছে না। সারাক্ষণ আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীর ভিড়।
বিকেলের নরম আলোয় ইলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর বাইরের জগতটা তার কাছে একদম নতুন মনে হচ্ছে। গাছের সবুজ পাতা, আকাশের নীল , বাগান সবকিছুই সে প্রাণভরে দেখছে। হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত হাত তাকে জড়িয়ে ধরল। ইলা চমকে উঠলেও পরক্ষণেই সেই পরিচিত ঘ্রাণে শান্ত হয়ে গেল।আরিয়ান ইলার কানে ফিসফিস করে বলল

আরিয়ানঃ- কী দেখছ এত মন দিয়ে ইলাফুল? নিজের স্বামী পাশে থাকতে বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকাটা কি অন্যায় নয়?
ইলা ঘুরে আরিয়ানের বুকে মুখ লুকাল। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
ইলাঃ- আপনি না বড্ড বেশি দুষ্টু হয়ে গেছেন ভয়েজ কিং আট বছর আগের সেই গম্ভীর মানুষটা কোথায় গেল? যে কথায় কথায় রেগে যেত কারো সাথে কথা বলতো না।
আরিয়ান ইলার চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচু করল। তার চোখে দুষ্টুমির হাসি।
আরিয়ানঃ- গম্ভীর মানুষটা তো তোমাকে বিয়ে করার পরেই মরে গেছে।এখন যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে শুধু তোমার ভালোবাসার কাঙাল। আচ্ছা ইলাফুল একটা কথা বলো তো, ব্যান্ডেজ খোলার পর আমাকে দেখে তোমার প্রথম কী মনে হয়েছিল? আমি কি এখনো আগের মতোই হ্যান্ডসাম আছি?নাকি বুড়ো হয়ে গেছি?
ইলা একটু দুষ্টুমি করার সুযোগ ছাড়ল না। সে ভ্রু কুঁচকে ভাবার ভান করল।

ইলাঃ- উম্ম… সত্যি বলব? আমার না একটু মন খারাপ হয়েছে।ভেবেছিলাম আট বছর পর আপনি হয়তো একটু বুড়ো হয়ে যাবেন, মাথায় দু-চারটে পাকা চুল থাকবে। কিন্তু আপনি তো দেখি আগের চেয়েও বেশি ‘হ্যান্ডসাম’ হয়ে গেছেন। এখন তো আমার ভয় লাগছে, আপনাকে আবার কেউ ছিনিয়ে না নেয়।
আরিয়ান হা হা করে হেসে উঠল। ইলার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
আরিয়ানঃ- ছিনিয়ে নেওয়ার সাধ্য কার? যার পাহারাদার স্বয়ং ইলাফুল, তার দিকে তো অন্য কেউ চোখ তুলে তাকানোর সাহসও করবে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় সজোরে ধাক্কা পড়ল।
ইলিয়ানাঃ- “মাম্মাম পাপা” তোমরা ভেতরে কী করছ? আমি কি আসতে পারি?
আরিয়ান আর ইলা তড়িঘড়ি করে একে অপরের থেকে সরে দাঁড়াল। আরিয়ান বিড়বিড় করে বলল,
আরিয়ানঃ- এই মেয়েটা একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে অসময়ে ডিস্টার্ব করায় ওস্তাদ।
ইলিয়ানা ঘরে ঢুকে দেখল তার বাবা জানালার বাইরে খুব মন দিয়ে আকাশ দেখছে আর মা আলমারি গোছানোর ভান করছে।ইলিয়ানা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আরিয়ান কে বলল
ইলিয়ানাঃ- পাপা, আকাশ কি ঘরের ভেতর দিয়ে ভালো দেখা যায়? চলো না বাইরে চলো। শাহরিয়ার মামু আর নোহা ফুপি ঝগড়া করছে।
আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- সেকী বিয়ের আগেই ঝগড়া? চল তো দেখি কী হলো।

ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখা গেল এক তুলকালাম কাণ্ড। শাহরিয়ার একটা পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে বসে আছে আর নোহা মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে।
নোহাঃ- আমি বলেছি এই কালারের পাঞ্জাবি তোমাকে পরতে দেব না মানে দেব না তোমাকে এতে একদম কালো ভূতের মতো লাগবে।
শাহরিয়ার অসহায় মুখে বলল,
শাহরিয়ারঃ- আরে নোহা এটা ইলা বনুর পছন্দের কালার তাই এনেছি এখন আমি ওর পছন্দ কীভাবে ফেলব?
নোহাঃ- ইলা ভাবির পছন্দের কালার তাতে কী? বিয়ে কি ভাবির সাথে হচ্ছে নাকি আমার সাথে? আমি যা বলব সেটাই ফাইনাল।
আরিয়ান গিয়ে শাহরিয়ারের কাঁধে হাত রাখল।
আরিয়ানঃ- শাহরিয়ার শোনো হে হবু বর। বিয়ের আগেই যদি এই হাল হয়, তবে বিয়ের পর কিন্তু তোমাকে গামছা পরে ঘুরতে হবে। বোনের কথা শোনো ওর পছন্দটাই মেনে নাও।
শাহরিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
শাহরিয়ারঃ- স্যার আপনিও শেষে ঐ দলেই ভিড়লেন? ঠিক আছে আমি ওই লাল পাঞ্জাবিটাই পরব।
নোহার রাগ জল হয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। শাহরিয়ারের মতো শান্ত ছেলে এমন উত্তর দেবে কেউ ভাবেনি। পুরো বাড়িটা এখন হাসিতে গমগম করছে।

রাতের ডিনারের পর আরিয়ান চুপিচুপি ইলার হাত ধরে ছাদে নিয়ে গেল।চারিদিকে জোনাকি জ্বলছে।আরিয়ান পকেট থেকে একটা ছোট্ট মখমলের বক্স বের করল।ভেতরে একটা হীরের আংটি চিকচিক করছে।
আরিয়ানঃ- “ইলাফুল” আট বছর আগে আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল কোনো বিদায় না বলে। আজ আবার নতুন করে শুরু করতে চাই। এই আংটিটা তোমার জন্য নয় আমাদের নতুন করে ফিরে পাওয়া জীবনের জন্য।
ইলা আবেগে আপ্লুত হয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো।আরিয়ান আংটি পড়িয়ে ইলাকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকাল।
আরিয়ানঃ- জানো ইলাফুল এই আট বছর আমি যখন ঘুমাতাম তখন শুধু তোমার ওই মায়াবী ডাকটা আমার কানে বাজত।আর যখন চোখ খুলতাম তখন দেখতাম তুমি নেই। আজ যখন তোমাকে আবার ফিরে পেয়েছি তখন মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
ইলা আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল,

ইলাঃ- ভয়েজ কিং আপনার মায়াজালে তো আমি ১০ বছর আগেই আটকা পড়েছি। এখন শুধু সারাজীবন এই জালের ভেতর বন্দী থাকতে চাই।
হঠাৎ নিচ থেকে মেহেরাব খানের গলা শোনা গেল,
মেহেরাবঃ- আরিয়ান কোথায় তুই? তোর আম্মু তোকে খুঁজছে।
আরিয়ান কপালে হাত দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- শান্তি নেই রে ,শান্তি নাই ইলাফুল, এই পরিবারে আমাদের একটু রোমান্স করারও শান্তি নেই।চলো নিচে যাই নতুবা আব্বু আবার সিআইডি পাঠিয়ে দেবে।
ইলা খিলখিল করে হেসে উঠল তাদের জীবনের বসন্ত যেন আজ সত্যি ডানা মেলেছে ইলা হেসে আরিয়ানাকে বলল
ইলাঃ- আপনি শুনে আসুন আমি এখানে আছি।
আরিয়ান ইলার হাতে একটা চুমু দিয়ে নিচে চলে গেলো।ইলা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর এই প্রথম সে একা রাতের আকাশ দেখছে। তার চোখের তারায় চাঁদের প্রতিচ্ছবি চিকচিক করছে।

এর মধ্যেই হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত বাহু তাকে জড়িয়ে ধরল।আরিয়ানের চিবুক ইলার কাঁধে এসে থামল।সেই চিরচেনা পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ আর আরিয়ানের গলার স্বর ইলা চোখ বুজে সেই স্পর্শ অনুভব করল।আরিয়ান খুব নিচু স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- কী দেখছ এত মন দিয়ে ইলাফুল? চাঁদের সাথে কি কোনো গোপন কথা হচ্ছে?
ইলা একটু হাসল,তারপর আরিয়ানের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বলল
ইলাঃ- চাঁদকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম কতগুলো বছর আমি শুধু এই মায়াবী জোৎস্নার কথা কল্পনা করেছি। কিন্তু আজ যখন আপনাকে পাশে নিয়ে এই চাঁদ দেখছি, মনে হচ্ছে চাঁদের চেয়েও সুন্দর কিছু আমার খুব কাছে আছে।
আরিয়ান ইলাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। চাঁদের আলোয় ইলার ফর্সা মুখটা যেন আরও মায়াবী লাগছে।আরিয়ান ইলার কপালে অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে থাকা কয়েকটা চুল কানের পেছনে গুজে দিল। তার গভীর মায়াবী চোখ জোড়া ইলার চোখের ওপর স্থির।

আরিয়ানঃ- তুমি জানো ইলাফুল ওই অভিশপ্ত আটটা বছর আমার প্রতিটি রাত কাটত তোমার গলার আওয়াজ শুনে? মাঝে মাঝে মনে হতো, আমি বোধহয় আর কোনোদিন মায়াবী চোখ দুটোর খুজে পাবো না। আজ যখন তুমি আমাকে দেখছ আমার মনে হচ্ছে আমি নতুন করে জন্ম নিয়েছি।
ইলা আরিয়ানের শার্টের কলারটা হাত দিয়ে একটু ঠিক করে দিল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল।
ইলাঃ- “ভয়েজ কিং” আপনার সেই কণ্ঠ যেটা শুনে আমি আপনার প্রেমে পড়েছিলাম, সেই কণ্ঠটা আজও আমার কানে মায়াজাল বুনে যায়। আমি কি সত্যিই আপনাকে ফিরে পেয়েছি?
আরিয়ান আর কোনো কথা বলল না। সে আলতো করে ইলার চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচু করল। ইলার চোখের পাতায় প্রশান্তির ছায়া। আরিয়ান ধীর পায়ে আরও কাছে এগিয়ে এল। ইলা অনুভব করল আরিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস তার গালে আছড়ে পড়ছে। আরিয়ান ঝুঁকে পড়ে ইলার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।
আরিয়ানঃ- এই আট বছরের প্রতিটি মুহূর্তের ঋণ আমি শোধ করতে চাই ইলাফুল। প্রতিটি রাত প্রতিটি হাহাকার…আমি তোমাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে চাই।

ইলা লজ্জায় আরিয়ানের বুকে মুখ লুকাল। আরিয়ান তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। চারপাশের জগতটা যেন থমকে গেছে। শুধু দুটি হৃদস্পন্দন একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে।হঠাৎ ইলা মুখ তুলে দুষ্টুমি করে বলল
ইলাঃ- আচ্ছা ভয়েজ কিং আপনি যে এত রোমান্টিক কথা বলছেন, কেউ যদি এখন ছাদে চলে আসে?
আরিয়ান একটা নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
আরিয়ানঃ- আরে এই বাড়িতে রোমান্স করা মানেই তো যমদূতের ভয় রোমান্স করা। নিজের বউ এর সাথে প্রেম করতে হচ্ছে লুকিয়ে। নিচতলায় মেহেরাব খান সিআইডির মতো ঘুরছেন, ওদিকে আবার ইলিয়ানা যেকোনো সময় হানা দিতে পারে। এক কাজ করি চলো আমরা আজই আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যাই।
ইলা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে রাতের নির্জনতা যেন ধন্য হলো। আরিয়ান মুগ্ধ হয়ে ইলার হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবল এই হাসির জন্যই তো সে যমদূতের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে।আরিয়ান ইলার হাতটাতে নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে বলল

আরিয়ানঃ- ভালোবাসি ইলাফুল আগের চেয়েও অনেক বেশি।
ইলা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তিতে বলল
ইলাঃ- আমিও আপনাকে ভালোবাসি ভয়েজ কিং। সারাজীবন এভাবেই আপনার মায়াজালে বন্দী থাকতে চাই।
আরিয়ানের মায়াবী চাহনি আর তার ঠোঁটের স্পর্শে ইলা যেন এক অজানা নেশায় ডুবে যাচ্ছিল।আরিয়ানের বাহুডোর ইলার শরীরের শিহরণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আরিয়ান যখন আরও কাছে এগিয়ে আসতে চাইল, ইলা হালকা হাতে আরিয়ানের বুকে বাধা দিয়ে লজ্জা মেশানো গলায় বলল
ইলাঃ- ভয়েজ কিং কী করছেন? কেউ চলে আসবে তো এখানে এভাবে কেউ রোমান্স করে?
আরিয়ান ইলার কোমরে হাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিলো। ইলার তপ্ত নিঃশ্বাস এখন আরিয়ানের গলার নিচে আছড়ে পড়ছে। আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল
আরিয়ানঃ- নিচে তো আব্বুর সিআইডি গিরি আর রুমে ইলিয়ানার হানা।তাহলে এখন কি আমার বউয়ের সাথে প্রেম করার জন্য আমাকে পরকালেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে?
ইলা কিছুটা লজ্জা আর অবাক হয়ে বলল

ইলাঃ- তাই বলে এখানে এভাবে খোলা আকাশের নিচে??
আরিয়ান মাথা চুলকে বলল
আরিয়ানঃ- ইলাফুল এখানে না হলে কোথায়? বলো?
ইলা শুধু ডাগর চোখে তাকিয়ে রইল আরিয়ানের দিকে। আরিয়ানের আর সহ্য হলো না এই মায়াবী চাহনী।আরিয়ান ইলার হাত ধরে একরকম টেনেই ছাদের কোণায় থাকা ছোট চিলেকোঠার রুমটার দিকে নিয়ে গেল। ইলা অবাক হয়ে বলল
ইলাঃ- আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ওটা তো পুরনো ঘর ধুলোবালি ভর্তি হবে ঐখানে মনে হয় ভূত প্রেত বাসা বেধেছে।

আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।সে রুমের দরজাটা খুলে ইলাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল ইলা ঘরের ভেতর পা রাখতেই থমকে গেল।এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সে কোনো স্বপ্ন দেখছে।
সারা ঘরটা লাল গোলাপ আর সাদা রজনীগন্ধা ফুলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। মেঝের চারকোণে বড় বড় মোমবাতি জ্বলছে, যার মৃদু আলোয় পুরো ঘরটায় এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এমনকি পুরনো সেই খাটটাকেও নতুন চাদর আর ফুলের মালায় সাজানো হয়েছে। দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর ইলার জন্য এর চেয়ে বড় কোনো সারপ্রাইজ হতে পারত না।ইলা বিস্ময়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো
ইলাঃ- এগুলো… এগুলো কখন করলেন আপনি?
আরিয়ান পেছন থেকে ইলার কাঁধে হাত রাখল।
আরিয়ানঃ- যখন তুমি বিকেলে সবার সাথে গল্প করছিলে, তখন শাহরিয়ার আর আদিবকে নিয়ে আমি এই ব্যবস্থা করেছি।এই আট বছর আমরা যে দূরত্বে ছিলাম, আজ এই ফুলের ঘ্রাণ আর মোমের আলোয় সেই দূরত্বটুকু মুছে ফেলতে চাই ইলাফুল।
আরিয়ান ইলাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। ইলার হৃদস্পন্দন তখন ট্রেনের গতির মতো দ্রুত চলছে। আরিয়ান ধীরে ধীরে ইলার গলার পেছনে থাকা জামার ফিতাটা আলতো করে টেনে দিল। ইলা শিউরে উঠে আরিয়ানের শার্ট আঁকড়ে ধরল।

আরিয়ানঃ- ভয় পাচ্ছ ইলাফুল?
ইলা চোখ বুজে কাপা কাপা ঠোঁটে বলল
ইলাঃ- না… শুধু বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি সত্যি আমার পাশে আছেন।
আরিয়ান ইলার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। মোমের আলোয় ইলার ফর্সা ঘাড় আর কাঁধটা যেন জ্বলজ্বল করছে। আরিয়ান খুব ধীরে ইলার ঘাড়ের ওপর নিজের তপ্ত ঠোঁট ছোঁয়াল।ইলা এক অস্ফুট আর্তনাদ করে আরিয়ানের বুকে মুখ লুকাল।আরিয়ানের হাত দুটো ইলার পিঠের উন্মুক্ত অংশে মায়াজাল বুনতে শুরু করল।
মোমবাতির শিখাগুলো কাঁপছে,ঠিক যেমন আরিয়ানের স্পর্শে ইলার শরীর কাঁপছে।আরিয়ান ইলার ঠোঁটের খুব কাছে গিয়ে থামল।দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।আরিয়ান আর সময় নিল না, সে গভীর আবেগে ইলার ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিল।দীর্ঘ আট বছরের হাহাকার না পাওয়ার বেদনা আর গভীর তৃষ্ণা যেন সেই একটি চুম্বনেই বিলীন হয়ে গেল।
ইলা অনুভব করল আরিয়ানের হাতের চাপ তার শরীরে বাড়ছে।আরিয়ান ইলাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল।ঘরের মোমবাতিগুলো ধীরে ধীরে নিভে আসছিল, কিন্তু তাদের মনের ভেতরে জ্বলতে থাকা ভালোবাসার আগুন তখন প্রলয় হয়ে ঝরছিল। সারারাত সেই চিলেকোঠার ঘরে গোলাপের সুবাস আর দুটি প্রাণের মিলনের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
দীর্ঘ অমাবস্যার পর ইলা আর আরিয়ানের জীবনে আজ এক পূর্ণিমার রাত এল,যে রাত আর কোনোদিন শেষ হবে না।

পরের দিন সকাল থেকেই বাড়িতে সাজ সাজ রব। নোহা আর শাহরিয়ারের বিয়ে বলে কথা মেহেরাব খান ঘোষণা করে দিয়েছেন “আমার বড় ছেলের ঘরের ফেরার আনন্দ আর মেয়ের বিয়ে সব মিলিয়ে কোনো খামতি রাখা যাবে না” তাই ঠিক হলো আজ সবাই মিলে শহরের বড় শপিং মলে যাবে কেনাকাটা করতে।
দুটো মাইক্রোবাস একটাতে বড়রা, আর অন্যটাতে আরিয়ান, ইলা, নোহা, শাহরিয়ার, নেহা, জাওয়াদ, পরি,আদিব,আর হালিমা সাথে তো খুদে সদস্য ইলিয়ানা আর নওয়াস আছেই।
গাড়িতে উঠেই নোহার মুখ ভার শাহরিয়ারের পাশে না বসে সে ইলার গা ঘেঁষে বসল।আরিয়ান ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে আয়নায় নোহাকে দেখে বলল,
আরিয়ানঃ- কী রে নোহা পাখি? হবু বরের ওপর আবার কিসের রাগ?
নোহাঃ- ভাইয়া তোমার এই হবু শ্যালক তো মানুষ না,একটা আস্ত রোবট কাল রাতে আমি ওকে মেসেজ দিয়েছি যে আমার ল্যাভেন্ডার কালারের লেহেঙ্গা চাই, আর উনি রিপ্লাই দিয়েছেন
‘ওটা বিয়েতে ভালো লাগবে না তার চেয়ে লাল পরলে ভালো লাগবে?’ ভাবো একবার তুমিও লাল আমিও লাল।
শাহরিয়ার নিরুপায় হয়ে হাসল।

শাহরিয়ারঃ আরে ভাইয়া আমি তো জাস্ট সাজেস্ট করেছি। আমি কি জানতাম লেহেঙ্গার কালার নিয়ে থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হয়ে যাবে?
এভাবে হাসাহাসি করতে করতে সবাই শপিং মলে পৌঁছাল। মলে ঢুকেই ইলিয়ানা বায়না ধরল সে আগে খেলনা কিনবে। আরিয়ান মেয়েকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আজ আমাদের প্রিন্সেস এর যা ইচ্ছে সব নিবে।
ইলা আর নেহা ব্যস্ত হয়ে পড়ল শাড়ি দেখতে। ইলা একটা গাঢ় নীল রঙের জামদানি হাতে নিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল কেমন লাগছে। আরিয়ান দূর থেকে আঙুল দেখিয়ে ‘চমৎকার’ ইশারা করল।
এদিকে নোহা আর শাহরিয়ারের খুনসুটি থামছেই না। শাহরিয়ার একটা পান্না সবুজ শাড়ি বের করে নোহার গায়ের পাশে ধরল।
শাহরিয়ারঃ- এই যে মহারানী এই কালারটা কিন্তু আপনার ওই ল্যাভেন্ডারের চেয়েও বেশি ফুটবে।
নোহা চোখ পাকিয়ে তাকাল,কিন্তু আয়নায় নিজেকে দেখে মনে মনে ভাবল শাহরিয়ারের চয়েসটা কিন্তু মন্দ নয়। তবুও মুখে বলল,

নোহাঃ- হুম, চলবে তবে জুতো কিন্তু আমি আমার পছন্দমতো কিনব, আপনি টু শব্দ করতে পারবেন না।
কেনাকাটার মাঝখানে আরিয়ান চুপিচুপি ইলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।ইলা তখন নেহার জন্য গয়না দেখছিল।
আরিয়ানঃ- “ইলাফুল” ওদের তো কেনাকাটা চলছেই। চলো আমরা আমাদের জন্য কিছু দেখি?
ইলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
ইলাঃ- আমাদের তো সব কেনা শেষ আর কী কিনবেন?
আরিয়ান ইলার হাত ধরে একটা ঘড়ির শোরুমে নিয়ে গেল। সেখানে এক জোড়া কাপল ওয়াচ পছন্দ করল সে। ইলার হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিয়ে আরিয়ান বলল,
আরিয়ানঃ- তোমার দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর আমাদের প্রতিটা সেকেন্ড আমি হিসেব করে কাটাতে চাই। এই ঘড়িটা তোমাকে মনে করিয়ে দেবে, এখন থেকে তোমার সব সময় শুধু আমার।
ইলার চোখে জল চলে এল আরিয়ান তাড়াতাড়ি টিস্যু দিয়ে মুছে দিয়ে বলল,

আরিয়ানঃ- উঁহু আজ শুধু কেনাকাটা আর খাওয়া-দাওয়া। কোনো ইমোশনাল ড্রামা নয়।
শপিং শেষে সবাই ফুড কোর্টে গিয়ে বসল। শাহরিয়ার সবার জন্য কফি আর স্ন্যাকস নিয়ে এল। জাওয়াদ আর নেহা তাদের ছোট ছেলেকে নিয়ে খুনসুটি করছিল। এমন সময় ইলিয়ানা এসে আরিয়ানের কানে কানে বলল,
ইলিয়ানাঃ- পাপা, শাহরিয়ার মামু না নোহা ফুপিকে একটা শপিং ব্যাগ দিয়েছে ট্রায়াল রুমের আড়ালে আমি দেখেছি।
আরিয়ান আর জাওয়াদ একসাথে হো হো করে হেসে উঠল। শাহরিয়ার আর নোহা লজ্জায় মাথা নিচু করে কফিতে চুমুক দিল। মেহেরাব খান আর রাশেদ তালুকদার দূর থেকে এই হাসিখুশি মুখগুলো দেখে পরম তৃপ্তি পেলেন। দীর্ঘ আট বছরের বিষাদ যেন এই একটা শপিং ট্রিপেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
শপিং শেষ করে বের হয়ে মেহেরাব খান দেখে আরিয়ানের সাদা কার দারিয়ে। সেটা দেখে কিছুটা অবাক হয়ে যায়। আরিয়ান বুঝতে পেরে বলে ওটা ও আসতে বলেছে ইলাকে নিয়ে একটু বের হবে একা তাই।মেহেরাব খান আর কিছু বলল না। সবাই সবার মত যে যার জায়গায় উঠলে ইলা উঠতে যাবে তখন আরিয়ান টেনে নিজের গাড়িতে বসিয়ে নিলো।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭৩

সবাইকে বলে দিলো তোমরা ঐ গাড়িতে যাও আমি আর ইলাফুল এটায় যাবো। সবাই এক সাথে অকে স্যার বলে চিল্লায় উঠলো।
আরিয়ান ইলার কাঁধে হাত রেখে ড্রাইভ করছিল। ইলা জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবল, জীবন সত্যিই অদ্ভুত। যে মানুষগুলো একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে চলে গিয়েছিল, আজ তারা এক ছাদের নিচে, এক গাড়িতে ভাগ করে নিচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ।

ভয়েজের মায়াজাল শেষ পর্ব