ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৩৬
মিথুবুড়ি
‘বাঁকানো কালো বেড়ার ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন সেই ফার্মহাউস টা। যেন সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া কোনো নিঃসঙ্গ স্বপ্ন। চারপাশে শুধু অগণিত সবুজের সমারোহ। বুনো লতাপাতা আর গহীন গাছগাছালির জঙ্গল। বান্দরবানের গভীর অরণ্যে জেগে থাকা এই বাড়িটি এখন মানবশূন্য। একসময়ের কোলাহল এখন নিস্তব্ধতায় মিশে গেছে। ঝিঁঝি পোকা আর বাতাসের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো প্রাণের সাড়া নেই।
‘ফার্মহাউজ টি সম্পূর্ণ সবুজে মোড়া শান্তিপূর্ণ এক আঙিনা। ছোট পাথরের পথ দুপাশে সাজানো বাহারি রঙের ফুলের টবগুলোতে জীবনের ছোঁয়া এনে দিয়েছে। কাঠের বেঞ্চ আর আরামদায়ক বসার জায়গাগুলো যেন গল্প বলার জন্য অপেক্ষায়। বাতাসে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ আর পাখিদের কূজন এই নিভৃত আঙিনাকে প্রকৃতির এক শান্ত আশ্রয় বানিয়ে রেখেছে।
‘ঘন অরণ্যের মাঝখানে হারিয়ে থাকা সেই ফার্মহাউস বহু বছরের পুরনো। হাতে গোনা কয়েকজনই জানে এর অস্তিত্বের কথা। আর জানবেই বা কীভাবে? গভীর নিষিদ্ধ জঙ্গলের গহীনে গুপ্তভাবে তৈরি হয়েছিল এটি। বাতাসে ভেসে আসা প্রাচীন গল্প বলে, আদি যুগে ডাকাতদের আস্তানা ছিল এই বাড়ি। তবে যখন স্থানীয়রা এর খোঁজ পায়, এক অন্ধকার রাতেই আগুন জ্বালিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে দেয় সকল ডাকাতকে। এরপর থেকেই শুরু হয় কথিত ভৌতিক ঘটনাগুলো। অশরীরী আতঙ্কে গ্রামবাসী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
‘তবে সত্যিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভূতের গল্প ছিল এক জাল কাহিনি। একদল ক্ষমতাবান বিত্তশালীর ছলচাতুরী,তারা পরিকল্পিতভাবে এলাকা খালি করিয়ে নিজেদের স্বার্থে জঙ্গল দখল করে নেয়। পরিত্যক্ত ডাকাতদের আস্তানাকে তারা নতুন করে সাজিয়ে গড়ে তোলে একটি সিক্রেট ফার্মহাউস।
‘এখন এই ফার্মহাউস আরেক অন্ধকার ইতিহাসের অংশ। বড় মাফিয়া কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধীদের কুকর্মের স্বর্গ হয়ে উঠেছে এটি। গভীর জঙ্গলের আড়ালে প্রতিবছর ঘটে যায় এমনসব নির্মম কাজ যার হদিস বাইরের পৃথিবী কখনোই জানতে পারে না। নিস্তব্ধ সবুজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ফার্মহাউস এখন পাপ আর প্রহেলিকার এক ভয়ংকর প্রতীক।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘বহু বছর পর সেই ভয়ংকর ফার্মহাউসে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। কাঠের কালো বেড়ার ভেতর বিস্তৃত খোলা জায়গায় এবার দেখা যায় সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ঘোড়া। নিপুণ ভাবে ঘাস খাচ্ছে। এখানে এতকাল প্রাণীর কোনো সাড়া পাওয়া না গেলেও মানুষরূপী অনেক প্রাণীর যাতায়াত দেখা গিয়েছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো বেড়ার ধারে সারি বেঁধে ফুটে থাকা রঙিন ফুলের গাছ। সতেজ পাতা আর কোমল পাপড়িতে ছড়িয়ে আছে। দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এগুলো সম্প্রতি লাগানো হয়েছে।
কিন্তু কার জন্য? অরণ্যের গভীরে সেই নিষিদ্ধ জমিতে কি এখন আবার নতুন কোনো গল্প শুরু হতে চলেছে? নাকি এই সাজসজ্জা আরও কোনো অজানা রহস্যের ইঙ্গিত?
‘ঘন জঙ্গলের ফাঁক গলে ধোঁয়ার মেঘের মতো ছুটে এসে থামল তাকবীরের GTR35 সেই অভিশপ্ত ফার্মহাউসের সামনে। এলিজাবেথকে বাইরে রাখা এখন জীবনের সঙ্গে জুয়া খেলার মতো। তাই এলিজাবেথের নিরাপত্তার জন্য এই ফার্মহাউস একমাসের জন্য মোটা অংকের বিনিময়ে ভাড়া নিতে বাধ্য হয়েছে তাকবীর। এর ভিতর পাসপোর্ট প্রস্তুত হলেই এলিজাবেথকে রাশিয়ায় পাঠিয়ে দিবে। এটাই আপাতত পরিকল্পনা।
‘তাকবীর গাড়ি থেকে নামতেই এক বয়স্ক লোক দৌড়ে এলো। এই লোকটি এখানকার কেয়ারটেকার।এলিজাবেথের দেখভাল করার দায়িত্ব তার ওপর ধার্য করা হয়েছে। তাকবীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চোখ বুলিয়ে নিল চারপাশে। তবে যা দেখল তাতে খানিকটা বিস্মিত হলো। তাকবীর আরে আগে থেকেই এলিজাবেথের নিরাপত্তার ব্যাপারে সংকীর্ণ ছিল। তাই অনেক আগেই এই জায়গার সন্ধান নেয় এবং কিছুদিন আগে এসে একবার দেখেও গিয়েছে। আগে জায়গাটা ছিল শূন্য, পরিত্যক্ত, এক ঘন কালো রহস্যের মতো। কিন্তু এখন? রঙিন ফুলের সারি, সাজানো-গোছানো পরিবেশ।
‘তাকবীর খানিকটা বিস্মিত হলেও সেই ভাবনায় মাথা ঘামাল না। তার মনে এখন শুধু একটা চিন্তায় ব্যস্ত এলিজাবেথকে নিরাপদ রাখা আর দ্রুত এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা।রেয়ান আর তাকবীর ধীরে ধীরে হুইল চেয়ারের থাকা এলিজাবেথকে গাড়ি থেকে নামালো। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মোটা ব্যান্ডেজে মোড়া এলিজাবেথের মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। উজ্জ্বল মুখটি এখন ফ্যাকাসে। সেদিন গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে তার পা। ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকদিন তাকে পুরোপুরি বেড রেস্টে থাকতে হবে।
‘তবে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এতো বড় এক্সিডেন্টেও এলিজাবেথের বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। আঘাত গুরুতর হলেও দ্রুত সেরে উঠবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এলিজাবেথ চারপাশে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। গভীর জঙ্গলের মাঝে এই অচেনা, রহস্যময় জায়গা ওকে মুগ্ধ আর বিভ্রান্ত দুটোই করছে। তাকবীর পাশেই চুপচাপ দাড়িয়ে আছে, চোখে একধরনের দৃঢ় সংকল্প। ভিতরে ভিতরে সে এলোমেলো হলেও কিছুই করার নেই এই মুহুর্তে। সময় এবং পরিস্থিতি দু’টোই তার বিরুদ্ধে।
“এলোকেশী পাখি, কিছুদিন কষ্ট করে এখানে মানিয়ে নাও প্লিজ। খুব শীঘ্রই তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।
‘এলিজাবেথ ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল,”আমি এই জঙ্গলের মাঝে কীভাবে থাকবো, ভালো মানুষ? খুব ভয় করছে আমার।”
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটা মাত্র কয়েক দিনের ব্যাপার। দেখো, ওখানে রামু দা আছেন, উনি তোমার দেখাশোনা করবেন।”
‘পাশে দাঁড়ানো বয়স্ক লোকটার দিকে ইশারা করল তাকবীর। এলিজাবেথ তাকাতেই লোকটা হেসে উঠলে এলিজাবেথের চোখে ভয় আরও বাড়ল। “কিন্তু ওরা যদি আপনার কোনো ক্ষতি করে ফেলে?”
“আমার কিছু হবে না। আমার এখনো অনেক কাজ বাকি আছে। তুমি ভয় পেয়ো না৷”
‘এলিজাবেথের কণ্ঠ কাঁপল, “আপনি আমার জন্য এত কিছু করছেন। যদি আমার জন্য আপনার কোনো বিপদ হয়, আমি নিজেকে কখনো মাফ করতে পারবো না। ওরা কারা ভালো মানুষ? কেন বারবার আমাকে মারতে চাইছে?”
‘তাকবীর হাঁটু মুড়ে এলিজাবেথের সামনে বসল। “ওরা যে-ই হোক, তোমাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না।”
‘এক মুহূর্ত থেমে বলল, “একটা কথা দেবে এলোকেশী?”
“কি কথা?”
“যা-ই হোক আমার উপর থেকে কখনো বিশ্বাস হারাবে না? সবসময় এভাবেই বিশ্বাস করবে?”
‘এলিজাবেথের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। “আপনি বিশ্বাসের যে জায়গায় আছেন সেখানে অবিশ্বাসের কোনো স্থান নেই।”
“ওকে, বেস্টু!” তাকবীর হাসল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি চাইলেই বারবার এখানে আসতে পারবো না। ওরা আমাকে সবসময় ফলো করে। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে কল করবে আমাকে, ওকে? আর এখানে তুমি পুরোপুরি সুরক্ষিত।”
‘এলিজাবেথ মাথা নাড়ল। জড়তা মেশানো গলায় বলল,
“ইয়ে… আমার ফোনটা?”
‘তাকবীর হেসে বলল, “তোমার কি সত্যিই ওই ফোনটাই লাগবে? নতুন একটা পাঠিয়ে দিই? আসলে এটা অনেক জায়গায় ফেটে গিয়েছে।”
“নতুন ফোন লাগবে না। এইটাতেই হবে।”
‘এলিজাবেথ মৃদু স্বরে বলল। তাকবীর সাবলীল ভাবে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ভাঙা ফোনটা বের করে এলিজাবেথের হাতে দিল। এলিজাবেথ নিরবে ফোনটা নিয়ে নিলো হাতে। তাকবীরের চোখে প্রতিজ্ঞার দীপ্তি ফুটে উঠল। আশ্বস্ত গলায় বলল,
“ভয় পেয়ো না, এলোকেশী। খুব শীঘ্রই আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।”
‘এলিজাবেথ ভিতরে ভয়ে থাকলেও তাকবীরের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করল। এক চিলতে হাসি দিয়ে মাথা নাড়াল। তাকবীরের ইশারায় রামু দা এলিজাবেথের হুইলচেয়ারের হাতল ধরে ওকে ভিতরে নিয়ে যেতে লাগল। এলিজাবেথ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে তাকবীর হালকা মাথা নাড়িয়ে হাসল। অথচ ভেতরে ভেতরে তাকবীর নিজেও ভঙ্গুর। এলিজাবেথকে ভিতরে নিয়ে যেতেই রেয়ান পাশে এসে দাঁড়াল।
“আপনি তো সবসময় ম্যামের ভালোবাসা চাইতেন। আর এখন নিজেই দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এভাবে সময়গুলো আরও হাতছাড়া হচ্ছে না?”
‘তাকবীর শূন্য জায়গায় দৃষ্টি স্থির রেখে বলল, “যোগাযোগের অভাবে ভালোবাসা হারায় না। বরং তা দূরত্বের দহনে পুড়ে আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।”
‘কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হঠাৎ চোখে আগুনের ঝলক দেখা গেল। চাপা গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “কোম্পানির লোকেরা এখন আমার দুর্বলতা জেনে গেছে। এই মুহূর্তে ও আমার কাছে সেভ না। তাই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে আমায়। সবগুলোর রক্ত দিয়ে আমি গোসল করবো।”
‘রেয়ান একটু থেমে বলল, “একটা কথা বলি বস?”
“হুম।”
“আপনি তো সত্যিকারের অর্থেই ম্যামের বিশ্বাসের যোগ্য না, তেঁতো হলেও এটাই বাস্তবতা। তাই হয়তো সৃষ্টিকর্তা ম্যামের মনে আপনার জন্য ভালোবাসার ফুল ফুটায়নি। কারণ তিনি জানেন এর শেষ পরিণতি কী হতে পারে।”
‘হঠাৎই তাকবীরের চোখের আগুন মুহূর্তেই বর্ষণে নেমে এলো। খাদযুক্ত কণ্ঠে বলল,”সেজন্যই তো এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু দেখো,আমি সবকিছু ছেড়ে দিলেও সবকিছু আমাকে ছাড়ছে না, রেয়ান।”
‘রেয়ান নিচু স্বরে বলল, “পাপ যখন খুব বেশি হয়ে যায় তখন আমরা পাপ ছাড়তে চাইলেও পাপ আমাদের ছাড়ে না। যেমন আমাকেই দেখুন না—এতটাই পাপি হয়ে গেছি যে নিজের ভাইকে মারতেও একবার হাত কাঁপেনি। টাকার লোভে আমি আজ অন্ধ।”
‘তাকবীর হেসে বলল, “তুমি আর আমি একই মাটির তৈরি। তবে জানো আমাদের মধ্যে পার্থক্য কী?”~রেয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই তাকবীর বলল,
“তুমি টাকার পাগল, আর আমি ভালোবাসার কাঙাল।”
‘অতঃপর তাকবীর গভীর দৃষ্টিতে রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,”প্রেমে পড়ার পর বুঝলাম, আমি আসলে কতটা বেহায়া।”
‘রেয়ান নীরবে সম্মতি জানাল। হঠাৎ তাকবীর তড়িঘড়ি করে গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, “জলদি চলো। আমার গোসলের সময় হয়ে গেছে।”
‘ঘন অরণ্যের অন্তহীন সবুজ ভেদ করে দূর আকাশ ছুঁই ছুঁই এক নিঃসঙ্গ টাওয়ার। শীর্ষে দাঁড়িয়ে তিন দৈত্যকায় পুরুষ। পাহাড়ের মতো অবিচল তারা। নিচে তাকবীরের গাড়ি ফার্মহাউস পেরিয়ে মিলিয়ে যেতেই নীল চোখ থেকে দুর্ভিক্ষন নামিয়ে নিল মাঝখানে দাঁড়ানো বলিষ্ঠ এক কায়া। দু’পাশে তার দুই সুরক্ষাকর্মী। রিচার্ডের সুচারু দৃষ্টি প্রথমবারের মতো ভাঙল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি।
“ইউ আর ফা°কিং ওয়েলকাম, রেড। নো ওয়ান ইজ এনাফ ফর ইউ এক্সসেপ্ট মি। নাও ইউ আর কন্ট্রোল্ড বাই মাই প্যারাসাইট, মাই ফা°কিং ডার্ক রেড।”
‘সেই চিরচেনা ভারিক্কি স্বরে শব্দগুলো উচ্চারণ করে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল রিচার্ড। পিছন পিছন নেমে এলো তার অবিচল রক্ষাকবচ, ন্যাসো ও লুকাস।
‘তাকবীর যদি হয় স্থলের নির্ভীক শিকারী, তবে রিচার্ড গভীর জলের নিঃশব্দ হন্তারক। তাকবীর যতই সাবধান হোক না কেন, তার প্রতিটি পদক্ষেপ রিচার্ডের আগে থেকেই জানা হয়ে যায়। বরাবরের মতো এবারও তাকবীরের আগে ফার্মহাউসটি বুক করে রেখেছিল রিচার্ড। এলিজাবেথের আগমন জানান দিতে চারিপাশ ফুলের গাছে ভরে তুলেছিল রিচার্ড। দূরে থাকতে চেয়েও তাকবীরের পা আবারও পড়ল রিচার্ডের জালে। হ্যাঁ এটাই তো রিচার্ড কায়নাত—দ্য ক্রাইম লর্ড এন্ড গ্যাংস্টার বস হিসেবি শিকারী।
‘বরাবরের মতোই ন্যাসো গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে, লুকাস পাশে। রিচার্ড পিছনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসে ইতোমধ্যেই ফার্মহাউসের সব খবরাখবর নিয়ে ফেলেছে। ন্যাসো ড্রাইভ করতে করতে ফ্রন্ট মিরর দিয়ে কিছুক্ষণ রিচার্ডের দিকে চেয়ে রইল। কিছু বলতে চাইছে তবে দ্বিধা কাটছে না।
“ওয়ানা সে সামথিং?”
‘রিচার্ডের গম্ভীর স্বরে ভরকে গেল ন্যাসো। অথচ রিচার্ডের দৃষ্টি তখনও ল্যাপটপে নিবদ্ধ। ন্যাসো আর পিছপা হলো না। সরাসরি বলে উঠল,
“বলছিলাম, ম্যাম এই ভয়ংকর জঙ্গলে একা থাকবে কিভাবে? সবেমাত্র একটা ট্রমা থেকে বের হলো। একা থাকলে তো আরও ভেঙে পড়বে।”
‘রিচার্ডের ভাবলেশহীন জবাব, “ভেঙে পড়ার কিছু নেই। প্রত্যেকের একা বাঁচতে শেখা উচিত। তাহলেই কারোর ভাঙার ক্ষমতা থাকবে না।”
‘পাশ থেকে লুকাস বলল,”এটা কি আদৌ সম্ভব?”
‘রিচার্ডের ঠাণ্ডা কণ্ঠে কাঠকাঠ উত্তর এলো,”কেন না? আমার জীবনের চৌদ্দটা বছর আমি একা কাটিয়েছি-বদ্ধ ঘরে, হিংস্র জন্তু আর অস্ত্রের মাঝে। বালিশের জায়গায় মাথার নিচে ছিল বন্য প্রাণীদের মৃত লাশ। আর প্রতিটি নিশ্বাসে শ্বাসরোধ করা মৃত্যুর গন্ধ। রক্তের গন্ধে মেতে উঠতে উঠতে, এখন আর আমার নাকে কোনো মিষ্টি সুবাস পৌঁছায় না। খিদের তাড়নায় কাঁচা মাংস চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়েছি। জানতাম যে কোনো মুহূর্তে আমার শরীরের উপর ছড়ানো হতে পারে সেই রক্তের ধারা। আমিও তো সেই রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলাম,যার দয়া বা সহানুভূতির কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
‘স্তব্ধ হয়ে গেল লুকাস ও ন্যাসো। কিছু মুহূর্ত ধরে গাড়ির ভেতর পিনপতন নীরবতা বজায় রইল। অবশেষে লুকাস হালকা গলায় প্রশ্ন করল,
“বস,এতোটাই ভয়ংকর ছিল আপনার অতীত?”
‘রিচার্ডের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন এল না।একদম পাহাড়ের মতো নিঃশব্দ। ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
“এটাই ছিল আমার জীবনের বাস্তবতা।”
‘ন্যাসো আর লুকাসের কাছে রিচার্ডের অতীত ছিল এক গোলকধাঁধা, এক রহস্যময় অতীত যা জানার খুব কৌতুহল ছিল তাদের। তবে আজ আর সাহস হয়নি সেই ভয়ানক অতীতের খোঁজ নিতে। ন্যাসো নিচু গলায় বলল,
“বস, আপনি কাঁদেননি কখনো?”
‘রিচার্ডের মুখাবয়বে কোনো চিত্তবিনোদন বা অনুভূতির চিহ্ন নেই। শুধু শান্ত কণ্ঠে বলল, “না, আমি কাঁদিনি, আর কাঁদবো না কখনো। কারণ কাঁদলে আমার ভিতরের এই যন্ত্রণা গুলো বেরিয়ে আসবে। এগুলোর খুব প্রয়োজন। এই যন্ত্রণাগুলো আমার ভিতর ছিঁড়ে ছিঁড়ে আমাকে নরখাদকে পরিণত করছে।”
“সৃষ্টিকর্তার প্রতি কোনো অভিযোগ আছে?”
“হ্যাঁ, অনেক আছে। বললে শেষ করা যাবে না। আমরা তার গোলাম, আর গোলামদের নাফরমানী প্রতি পদে পদে। তাই আমি মুখ খুলতে চাই না। যদি মুখ থেকে অরচিত কিছু বেরিয়ে যায়… শুধু এটুকু বলতে পারি, হয়তো আমার জীবনটা আর চারপাঁচটা জীবনের মতো স্বাভাবিক হতে পারতো।”
‘রিচার্ডের আজ এক ভিন্ন রূপে প্রকাশিত। এই প্রথমবার নিজের সম্পর্কে বলতে শুরু করেছে। আগুনের মতো কথায় বর্জন ঘটাল সমস্ত অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা, চোখে জ্বলছে এক অদম্য ক্রোধের অগ্নি। হাতে ল্যাপটপটা শক্ত করে চেপে ধরে কঠিন গলায় বলতে থাকল,
“আমি অন্ধ ঘরের বন্ধ দোয়ার। পুড়তে পুড়তে সব কিছু ছাই হয়ে গিয়েছে আমার ভিতর। আমার স্পর্শে যে আসবে সে ভস্ম হয়ে যাবে, আর কিছুই থাকবে না। আট বছর সুখী ছিলাম। তারপর তেইশ বছর ধরে আমি হাসি না। আমার বক্ষে এক একটা ক্ষত ছাড়া কোনো প্রাপ্তি নেই। আমি শুধু এক নিরব চিৎকার যা কেউ শুনে না।”
‘রিচার্ডের কথায় লুকাস আর ন্যাসোর অভ্যন্তর ভিজে গেল। তাদের নিরবতায় হতচেতন হয়ে ফিরে তাকাল রিচার্ড। যখনই বুঝতে পারল তার কঠিন অবয়বে কিছুটা বিধ্বস্ততার ছাপ ফুটে উঠছে, তখনই দ্রুত কথার সুর পাল্টে ফেলল।
“সম্পূর্ণ জঙ্গল ঘেরাও করে ফেলা হোক। আমার অনুমতি ছাড়া যেন এক পিপড়াও ঢুকতে না পারে। প্রতিটা কোণে কোণে আমি গার্ড চাই, তবে তাদের দৃষ্টি যেন এই বাড়ির ওপর না আসে। কেটে ভাসিয়ে দিব সবগুলোকে যদি আসে।”
‘রিচার্ডের মুখে কড়া নির্দেশ। তার চোখে দৃষ্টির আগুন চিরকালীন শাসকের মত। সামনের দুজনের গরম নিশ্বাস পড়ল। একটা মানুষ কতটা কঠোর আর রহস্যময় হলে মুহূর্তেই নিজের রূপ পাল্টে ফেলতে পারে। রিচার্ড যেন তাদের কাছে এক শীতল আগুন, যার ভেতর অদৃশ্য ঝড় বয়ে যায়।
“এলিজাবেথ ম্যাম আজ থেকে এখানে একা থাকবে। এখন কি আপনার জন্যও ছোটখাটো একটা কুঁড়ে ঘর বানিয়ে দিবো নাকি জঙ্গলে?”
‘রিচার্ডের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। হিংস্রতার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল লুকাসের উপর।
“তুমি এইমাত্র কি বললে? সাহস তো কম না তোমার!”
‘ভরকে গেল লুকাস। ন্যাসো হতভম্ব। লুকাস আমতা আমতা করে বলল,
“আপনিই তো বললেন ম্যাম বলতে!”
‘রিচার্ড গর্জে উঠল আবারও,”ম্যামের আগে কি বলেছিস?”
‘লুকাস শুষ্ক গলায় বলল, “এলিজাবেথ ম্যাম।”
“ইউ বাস্টার্ড! এলিজাবেথ কি তোর শালার বউ নাকি? আজ থেকে কোনো ম্যাম না, খালাম্মা ডাকবি! ডিরেক্টর খালাম্মা ডাকবি ওই আল্লাহর বান্দীকে। এসব ম্যাম ট্যামেও ঝামেলা লেগে যায় অনেকসময়।”
‘লুকাস থতমত খেয়ে গেল। ন্যাসো ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল। রিচার্ডের রাগে আগুন ফুঁসছে। লুকাস তাও মিইয়ে গিয়ে নিভু স্বরে বলল,
“বসের বৌ খালাম্মা হয় কিভাবে?”
‘রিচার্ডের তাৎক্ষণিক জবাব,”বানালেই হয়। এই শালি আমি বাদে দুনিয়ার সবার বোন আর খালাম্মা।”
‘এবার ন্যাসো মুখ খুলল। ঠোঁট কামড়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, “বস এই একটা মেয়েকে আপনার আর কি কি নামে ডাকা বাকি আছে?”
‘বেহায়া লুকাস রিচার্ড কিছু বলার আগেই ছটফটিয়ে উঠে বলল,”শালি, বান্দি, খালাম্মা, ধান্ধাবাজ, রেড—আর কি কি বাকি আছে বস?”
‘রিচার্ড নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে সিটে গা এলিয়ে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “আর একটা আছে। চোর! আমার ঘুম চোর!শালি ঘুম চোর।”
‘লুকাস হেসে বিটলামির স্বরে বলল, “আরেকটা কিন্তু আছে বস।”
‘রিচার্ডের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে গেল। উঠে সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “কি?”
‘লুকাস দাঁত কেলিয়ে হাসল,”আমাদের মিনিস্টার সুমন্ধীর
বোন!”
‘বলেই ফিক করে হেসে উঠল । ন্যাসোও হাসিতে তাল দিল। রিচার্ড বাঁকা হেসে আবার সিটে গা এলিয়ে দিল। এই উচ্ছৃঙ্খলতার মাঝেও নিজের ধৈর্যকে আঁকড়ে ধরে রাখছে সে।
“একমাত্র আমার বসকেই দেখালাম, যে নিজের বউকে অন্যের বউ বলে চালিয়ে দিয়েছে এতদিন। শুধুমাত্র বউয়ের সেফটির জন্য।”
‘লুকাসের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ন্যাসো লুকাসের পেটে গুঁতা মারল। চাপা স্বরে বলল, “তোমার এই বেশি চলা জবানের জন্যই একদিন তুমি মরবে বসের হাতে।”
‘লুকাস ব্যথায় নাকমুখ কুঁচকে পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “আমার কি দোষ? আমি কথা পেটের ভিতর রাখতে পারি না। পেটে ছুটোছুটি করে। একটা মানুষ কতটা চাপা আর রহস্যময় হতে চব্বিশ ঘণ্টা তার সঙ্গে থেকেও আমরা তার কোনো পদক্ষেপ সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পারি না?”
“হ্যাঁ, রিচার্ড কায়নাত রহস্যে ঘেরা এক বন্ধ ঘর। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে না বলা এখতিয়ার, যত্ন। এতোদিন আমার কাছে রাখাটা বিপদজনক বলে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। দূরে রাখতেও নিজের ছায়াতলে রেখে এসেছি। এখন সেই জায়গায়ও বিপদ। তাই তো ছলনায় সেখান থেকেও সরিয়ে দিলাম। এবার শুধু কাছে আসার সময়।”
‘লুকাস নিভু স্বরে ফিসফিসিয়ে বললেও রিচার্ডের কানে পৌঁছে যায়। রিচার্ডের ভারি স্বরে চমকে যায় দু’জনেই। লুকাস জিভ কেটে ঘাপটি মেরে বসে রইল। ন্যাসো ভারি গলায় শুধালো, “মানে?”
‘রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
“এখান থেকেই রচিত হবে রিদ আর এলির হৃদয়স্পর্শী প্রেমের অমর অধ্যায়।”
“আর অপেক্ষা কেন? আপনার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে নিজের স্ত্রীকে কাছে এনে রাখার।”
“ভুলে যেও না ন্যাসো, কাদের কিন্তু এখনো ধরা পড়েনি। ওকে নিয়ে আমি এক বিন্দু পরিমাণ রিস্ক নিতে চাইনা।”
“আপনার কি মনে হয়, ম্যাম এতো সহজে আপনার কাছে আসবে? আমি যা করেছেন সেটা পাপ। আর এসব কিছু কোনো মেয়েই সহজে মেনে নিতে পারবে না।”
‘ন্যাসোর কথায় রিচার্ডের ভিতর কোনো অনুশোচনার স্রোত গড়ে উঠার বদলে মস্তিষ্কে পৈশাচিক হিংস্রতা নাড়া দিয়ে উঠল আর চোখে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। উইন্ডোতে থাবা মেরে চিৎকার করে বলল,
“কোনো ভুল করিনি আমি। যা করেছি ইচ্ছেকৃতভাবে করেছি। ঘৃণা থেকে করেছি। আমার ভিতর কোনো অনুশোচনা নেই। এতে এর পরিণতি যা হবে, হবে। আমি এমনিতেই পাপের সাগরে ডুবে আছি। মৃত্যুকে ভয় পাই না রিচার্ড কায়নাত।”
“কিন্তু বস?”
“এই বিষয়ে আর একটা কথাও হবে না।”
‘রিচার্ডের ধমক খেয়ে ন্যাসো চুপ হয়ে গেল। রিচার্ডের কপালের শিরাগুলি টগবগিয়ে উঠেছে। রাতের গভীরতর নিরবতায় গর্জনিত কণ্ঠে বলল রিচার্ড,
“ঐ ট্রাক ড্রাইভার এবং শুয়োরের বাচ্চাগুলো পাওয়া গেছে?”
‘লুকাস চিরায়ত গম্ভীর গলায় বলল, “ট্রাক ড্রাইভার ইতিমধ্যে স্বর্গে চলে গেছে। আর এক্সিডেন্টের পিছনে যারা ছিল, তাদের এখনও পাওয়া যায়নি। সম্ভবত মিনিস্টার তুলে নিয়ে গেছে।”
“পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। তেমনি তার মরার পাখনা গজিয়েছে।”
‘রিচার্ডের শেষের কথাগুলো বুঝল না ন্যাসো লুকাস কেউ। তারা এখনও তেমন ভাবে পরিচিত না বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার সাথে। বিপরীতে কোনো প্রশ্নও করল না। নিরবে গাড়ি চলতে থাকল আঁকাবাকা পথ ধরে।
“আচ্ছা একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কখন একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যায়? যখন সে নিজেকে থেকে লুকিয়ে থাকে, নাকি তাকে লুকিয়ে রাখা হয়।”
‘রিচার্ড খুবই ভাবুক ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল। লুকাস এতো প্যাচানো কথা বুঝতে পারছে না। ন্যাসো চতুর স্বভাবের। সে-ই গুরুগম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“যে হারিয়ে যেতে চাই, তাকে কখনো খুঁজে পাওয়া যায় না।”
“এলিসা ম্যাম বেঁচে আছেন আর বাংলাদেশেই আছে।”
“এলিসা কে?”
‘রিচার্ড চাপা হুশিয়ারী স্বরে বলল,”রেসপেক্ট ন্যাসো। শ্বাশুড়ি হয়।”
‘ন্যাসো মুচকি হাসল,”আপনি এটা কিভাবে জানলেন?”
“আমি অনেক কিছুই জানি, তবুও অনেক কিছু জানি না। এখনও আসল সত্যের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। হয়তো এজন্য একটু পিছুটান। যদি আমার এক পা এগোনোও তার ক্ষতি করে, তবে আমি দায়ী। একবার সত্যের মুখোমুখি হই, তখন আসল খেলা শুরু হবে। এখন খেলাটা সোয়াট টিম-ই খেলুক।”
‘বলেই রিচার্ড বক্র হাসি দিল। ঠোঁটের কোণে রহস্যের ছায়া জমে উঠেছে। ন্যাসো একটুও বিচলিত হলো না। তার রিচার্ডের উপর অটুট বিশ্বাস রয়েছে। রিচার্ড কায়নাত একবার কোনো কিছুতে হাত দিলে, তা হাসিল করেই ছাড়ে। ন্যাসো ইউ-টার্ন নিতে নিতে মজা করে বলল,
“এটা কি ম্যামকে খুশি করার জন্য? ইজ দিস বৌকে শ্বাশুড়ি গিফট করে ক্ষমা চাওয়ার নিনজা টেকনিক?”
“ফাক অফ। অফিসে চলো, ফাস্ট।”
‘অফিসে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে রিচার্ডের ঠান্ডা মেজাজ তিরিক্ষি মেজাজে পরিণত হলো। তার ডেস্কের উপরে অজস্র চিঠি এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। যা কিছুদিন ধরেই আসছিল। রিচার্ড প্রতি বারই সেগুলো অবহেলা করে গিয়েছে। খুলেও দেখেনি কোনদিন। এগুলো লাড়ার কাজ। তবে আজ প্রতিদিনের মতো চিঠিগুলো ওয়েস্ট বিনে ফেলে না দিয়ে রিচার্ড কিছু চিঠি খুলে পড়ল। সবগুলোতেই ছিল প্রেমের জোয়ার, কাছে আসার উষ্ণ বার্তা।
‘রিচার্ড হাতে কলম নিল। তারপর একটি চিঠি হাতে নিল তাকাল যেখানে লেখা ছিল “প্রিয়র চেয়েও প্রিয়, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।” সেই চিঠির উল্টো পিঠে রিচার্ড নিজে লিখল,
“নষ্টর চেয়েও নষ্ট! এভাবে অন্যের স্বামীকে চিঠি দিতে বলি হায়, লজ্জা লাগে না? আরেকবার যদি একটা চিঠি আসে তো তোর বাঁশবাগানের ঝাড়ে আগুন জ্বালিয়ে দিবো শালি সস্তা।”
‘অতঃপর আরেকটা চিঠি যেখানে লেখা ছিল “একবার সুযোগ দিয়ে তো দেখো বেইবি”, তাতে রিচার্ড লিখল,
“আমার মেডামের একটা হুমম,আর এই জান কুরবান। পথঘাটের নর্দমায় তাকানোর মতো হাসবেন্ড ছিল না আমার ওয়াইফের ডেসটিনিতে।”
‘লেখা শেষ করে রিচার্ড দারোয়ানকে ডেকে চিঠিগুলো তার হাতে দিল। চোখে ক্ষুব্ধ অগ্নি আর মনের ভেতর বিরক্তি নিয়ে হনহনিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল রিচার্ড
‘আলোছায়া অনাথ আশ্রমটি মানবতার ফেরিদম্পতির হাতে গড়া আশ্রয়। এখানে শত শত অবহেলিত শিশু মমতার ছায়ায় বড় হয়ে উঠছে। তাকবীরের গাড়ি এসে থামল আশ্রমের সামনে। গাড়ি থেকে নামতেই কালো পোশাক পরা বিদেশি গার্ডরা সামনে এসে দাঁড়াল তাকবীরের সামনে। তাকবীর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি কার্ড বের করে তাদের দিল। স্ক্যানারে সাথে মিলিয়ে নিয়ে তারা নিশ্চিত হলো। এই কার্ড ছাড়া এখানে প্রবেশ অসম্ভব। মেশিনে সংযোগ মিলে যেতেই গেট খুলে গেল।
‘তাকবীরের গাড়িটা আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করল। তাকবীর গাড়ি থেকে নামতেই এক ঝাঁক উচ্ছ্বসিত শিশু মৌমাছির মতো তাকে ঘিরে ধরল। তাকবীর হাসিমুখে সকলের সাথে কথা বলল। তাদের হাতে চকলেট তুলে দিল। এরপর আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করল। ভিতরের একটি গোপন রাস্তা সোজা নিয়ে গেল নিচের সিঁড়ির দিকে। সিঁড়িতে যেতে হলেও আবারও কার্ড পাঞ্চ করতে হয়। তাকবীর কার্ড পাঞ্চ করতেই দরজা খুলে গেল।
‘তাকবীর সিঁড়ি বেয়ে নেমে পৌঁছাল “ঠিকানা” নামক বেজমেন্টে। আশ্রমের নিচে এই ঘরের বিশেষ অস্তিত্ব রয়েছে। বেজমেন্ট’টা এটি দুই ভাগে বিভক্ত। যেখানে এক অংশে মানবতার চর্চা আর অন্য অংশে নীরবতার পর্দায় মোড়ানো অজানা কার্যকলাপ।
‘মাটির নিচে তৈরি এই বিশাল বেজমেন্ট উপরের কাঠামোর থেকেও বড় এবং নিখুঁত সুরক্ষায় ঘেরা। নিচের অংশও আবার দু-ভাগে বিভক্ত। তাকবীর মার্চ ২৪ লেখা অংশের দিকে এগোল। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই গা শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য সামনে এলো। দেয়ালে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ, ছড়িয়ে থাকা ভাঙা আসবাব আর অদ্ভুত কিছু সরঞ্জাম। জায়গাটা যেন কোনো উন্মাদ সাইকোপ্যাথের কল্পনার প্রদর্শনী।
‘ভিতরে পা রাখতেই তাকবীরের জুতো তাজা রক্তে ভেজা ফ্লোরে পড়ল। প্রতিটি ধাপে নাকে ভেসে এলো পচা মাংসের উৎকট গন্ধ। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে অজানা আতঙ্কে। তাকবীরের চোখে-মুখে কোনো ভয় নেই-বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা। এই কক্ষে মাংস কাটার এমন কোনো অস্ত্র নেই, যেটা নেই। এখনো ধারালো ছুরি গুলোতে রক্তের শুকনো দাগ লেগে আছে। অবাক করে দিয়ে এই কক্ষে প্রবেশ করতেই তাকবীরের চোখের মনির রং বদলে যায়। চেহারায় ফুটে উঠে এক নৃশংস হিংস্রতার প্রতীক।
‘চেয়ারে সেই ছেলেটাকে বেঁধে রাখা। সেদিন যারা পাহাড়ে তাকবীরের এক্সিডেন্ট ঘটিয়েছিল। ওদের মধ্যে বাকি ছেলেগুলোর নিথর দেহ রক্তাক্ত মেঝেতে পড়ে আছে। সকলের শরীর সাদা হয়ে গিয়েছে। বুঝা যাচ্ছে শরীরে রক্তের কোনো অস্তিত্ব নেই। চেয়ারে বেঁধে থাকা ছেলেটাও ইতিমধ্যে শরীর ছেড়ে দিয়েছে। মাথা ফেলে দিয়েছে। আর তার চারপাশে ঘেরাও করা কয়েকজন। তাদের হাতে বড় বড় ইনজেকশন। যেগুলো দিয়ে তারা ছেলেটার শরীর থেকে টেনে টেনে সব রক্ত বের করে নিচ্ছে। যেভাবে বাকিদের থেকে নিয়েছিল। রক্তগুলো একটা বালতিতে জমা করা হচ্ছে।
‘তাকবীর পরণের পাঞ্জাবিটা একটানে খুলে ফেলল। উত্তেজনায় শিরা টান টান হয়ে আছে । ধৈর্যের সব বাঁধ ভেঙে গেলে লোহার টেবিল থেকে ধারালো ছুরিটা তুলে নিল। এক নিঃশ্বাসে ছেলেটার গলায় চালিয়ে দিল ছুরির তীক্ষ্ণ ধার। মুহূর্তেই মন্ডু শরীর থেকে আলাদা হয়ে নিচে পড়ে থাকা নিথর দেহগুলোর উপর গড়িয়ে পড়ল। ফিনকি দিয়ে ছুটে আসা রক্ত ছিটকে পড়ল তাকবীরের কৃষ্ণগহ্বরে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি তাকবীর । রক্তে ভরা বালতিটা শক্ত হাতে তুলে নিল। এক প্রবল প্রচেষ্টায় উষ্ণ টাটকা রক্ত শরীরের উপর ঢেলে দিয়ে সেরে নিল আজকের গোসল। সঙ্গে সঙ্গে তৃপ্তির শীতল হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে।
‘আশ্রম থেকে কিছু দূরে নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে আছে কালো জিপটা। এরিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গার্ডদের চলাফেরা খেয়াল করে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে নিল নিজের পরিকল্পনা। এখানকার গার্ড বদল হয় প্রতি ঘণ্টায়। সেই ফাঁকটাই কাজে লাগাতে প্রস্তুত হয় এরিক। পিছনের গেটের কাছ থেকে গার্ড সরে যেতেই নিঃশব্দে এক লাফে দেয়াল টপকে ওপারে নেমে গেল এরিক। দ্রুততার সঙ্গে গা ঢাকতে হলো কারণ নতুন গার্ডের আগমনের সময় হয়ে এসেছে। চতুরতার সঙ্গে আশ্রমের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল এরিক।
‘আগের দিন ছোট্ট বাচ্চাটার শরীরে ভিক্টর যে খেলনা গাড়িটা লাগিয়ে দিয়েছিল সেটাই ছিল হিডেন ক্যামেরা। বাচ্চাটি আশ্রমের ভেতরে প্রবেশ করতেই বাইরে থেকে রিমোট কন্ট্রোলে গাড়িটা পরিচালনা করতে থাকে এরিক। কাল রাতজুড়ে এরিক সজাগ থেকেছে। আশ্রমের প্রতিটি কোণায় কোণায় চোখ রেখেছে। তবে কোনো সন্দেহজনক কিছুই ধরা পড়েনি, বরং এরিকের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। এরিক হাল ছাড়েনি। শেষ রাতের ফুটেজে হঠাৎ ধরা পড়ে তাকবীরের বডিগার্ড রেয়ান আর কয়েকজন গার্ড মিলে কয়েকজনকে টেনেহিঁচড়ে একটি গোপন রাস্তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খেলনা গাড়িটাও সেই পথে নিতে চাইলে সিঁড়ির কাছে পৌঁছাতেই এলার্ম বেজে ওঠে বার বার। স্পষ্ট বোঝা যায় সেখানেও কঠোর সিকিউরিটি সিস্টেম আছে।
‘এরপর আর অপেক্ষা করা চলে না। নিজের চাকরি আর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে সশরীরে ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নিল এরিক। এরিক ধীরে ধীরে সেই গোপন রাস্তাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো তাকবীরের ঠোঁট-কামড়ানো টিটকারি—
“অফিসার সম্ভবত ভুল করে এখানে এসে পড়েছেন তাই না?”
‘এক মুহূর্তের চমক কাটিয়ে এরিক ধীর অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে পিছন ঘুরল। তাকবীরের চুল ভেজা, গায়ে সদ্য পরা নতুন পাঞ্জাবি। এরিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকবীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরখ করে নিল। ঠোঁটে একটুকরো বিদ্রূপ মিশিয়ে বলল,
“আজকাল মিনিস্টারদের আশ্রমেও গোসল করা হচ্ছে নাকি?”
‘তাকবীর ঠোঁট কামড়ে হাসল। “গোসলের চেয়ে আশ্রমে শান্তিই মুখ্য, অফিসার।”
‘এরিকের চোখ সঙ্কীর্ণ হলো। “তাহলে কি মিনিস্টাররা এখন শান্তি খুঁজতে বেজমেন্টে যায়?”
“বেজমেন্ট? এখানে তো এমন কিছু নেই।”
“নাটক করছেন? কাল রাতে যাদের টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন, তারা কারা?”
“আশ্রমের গার্ড। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
‘তাকবীর, এরিক একসাথেই পিছন ঘুরল। তাকবীরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে তাজুয়ার দেওয়ান। তার পাশে কয়েকজন গার্ড। তাজুয়ার দেওয়ান এসে তাকবীরের পাশে দাঁড়াল। এরিকের দিকে চেয়ে আন্তরিক হেসে বলল,”ঐ-যে ওরা।”
‘এরিক পাশের গার্ডগুলোর দিকে তাকাল। এরা স্পষ্টতই কাল রাতের লোক নয়। এরিকের চিবুক শক্ত হয়ে উঠল। তাজুয়ার দেওয়ান ফোন বের করে ব্যস্ত হাতে নম্বর চাপতে চাপতে বলল, “অনুমতি ছাড়া একজন মিনিস্টারের প্রপার্টিতে প্রবেশ কি আপনাদের আইন অনুযায়ী অপরাধ নয়? আমি নিশ্চিত নই আপনার অফিসারের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছি।”
‘তাজুয়ারের ইঙ্গিত বুঝে এরিকের মুষ্টিবদ্ধ হাত কাঁপতে থাকল ক্রোধে। তবু নিজের ধৈর্য সংযত রেখে এগিয়ে গেল তাকবীরের সামনে। ঠোঁটের কোণে মিচকে হাসি ঝুলিয়ে থাকা তাকবীরের চোখে চোখ রেখে বলল,
“ইউ লুক লাইক এ সাইকোপ্যাথ মিনিস্টার।”
‘তাকবীর ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর কণ্ঠে বলল, “ইয়েস, আই’ম। খুনি, সাইকোপ্যাথ, স্মাগলার আরও অনেক কিছু। তবে কি জানেন, স্কুলে ইংলিশ স্যার একদিন বলেছিল, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড় ধরা। তেমনি আমিও মানবতার ফেরিওয়ালা, যতদিন না পড়ি ধরা।”
‘এরিক তাকবীরের চোখে চোখ রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ধরা এবার পড়বেনই। আর সেটা আমার হাতেই হবে। খুব শিগগির।”
‘তাজুয়ার হেসে বলল, “হ্যাঁ অফিসার, আমি মিনিস্টার তাকবীর দেওয়ানের বাবা তাজুয়ার দেওয়ান বলছিলাম…”
‘এরিক রক্তগরম চোখে তার দিকে একবার তাকিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। তাজুয়ার ফিচলে হাসি দিয়ে ফোন নামিয়ে গার্ডদের উদ্দেশে গলা উঁচিয়ে বলল, “এই কেউ অফিসার সাহেবকে বাঁধা দেবে না!”
‘এরিক চলে যেতেই তাকবীর বাবার দিকে ফিরল। গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,”আব্বা আমি কি আপনার নিজের ছেলে?”
‘তাজুয়ার দেওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল। কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল, “এসব কি বলছ বীর?”
‘তাকবীরের কণ্ঠে ক্ষোভ আর হতাশার ছায়া, “মানুষ তো তার সন্তানকে ভালো মানুষ বানাতে চায়। আপনি কেন নিজের হাতে আমাকে একটা অমানুষ বানালেন?”
‘তাজুয়ার গম্ভীর স্বরে বলল, “আবারও বলছি বীর একটা সাধারণ মেয়ের চক্করে পড়ে অকৃতজ্ঞের মতো কথা বলো না। ভুলে যেও না তোমার মা-বোনের কথা। প্রতিশোধের আগুনে তুমি নিজেই এই পথ বেছেছিলে।”
‘এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি তাজুয়ার। গমগমে পায়ের শব্দ ফেলে চলে গেল। তাকবীর ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। নিজ মনে বলল,
“এক দেখাতেই প্রেমে পড়েছিলাম। এখন সেই এক দেখা-ই আমার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
‘ছটফট করছে এলিজাবেথ। চোখে ঘুম নেই, মনের শান্তিও উধাও। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও কোনো স্বস্তি মেলে না। কিছুক্ষণ আগেই তাকবীরের সাথে কথা হয়েছে। অথচ সে কথাগুলো যেন আরও অস্থিরতা এনে দিয়েছে ওর মনে। রামু দা এসে রাতের খাবার আর ওষুধ খাইয়ে দিয়ে গেছে সেই কখন। কিন্তু এলিজাবেথের বুকের ভিতরে জমে থাকা অজানা আগুন কোনোভাবেই নিভছে না। তাকবীরের আচরণ এখন মাঝে মাঝেই ওর কাছে অদ্ভুত লাগে। সেদিন “ঠিকানা” নামের সেই ঘরের প্রসঙ্গে তাকবীরের কথার পর আর কোনো প্রশ্ন করা হয়নি বটে। কিন্তু মনের গভীরে জমে থাকা কৌতূহল আজও এলিজাবেথকে শান্তি দেয় না।
‘একে তো নতুন জায়গা,ঘন জঙ্গলের নিস্তব্ধতা। সব মিলিয়ে ঘুম এলিজাবেথের চোখ এড়িয়ে চলছে। প্রতি মুহূর্তে মনের কোণে জমছে চিন্তার মেঘ পরিবার পরিজনের জন্য বুকের ভেতর একরাশ কষ্টের ঢেউ খেলছে। তবে সে তো একলা তার দুঃখ দেখার কেউ নেই। ফোনটা হাতে নিয়ে একটু বারবার নামিয়ে রাখলেও এবার আর নিজেকে থামাতে পারল না। মায়াজাল নামক হোয়াইটঅ্যাপ একাউন্টে ঢুকে দেখল শেষ কথোপকথনের তারিখ দু’দিন আগে। তারপর নীরবতা। ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভে কি-বোর্ডে আঙুল চালালো এলিজাবেথ।
“অসভ্য টুকি।”
‘ওপাশ থেকে এত দ্রুত রিপ্লাই আসবে কল্পনাও করেনি এলিজাবেথ। যেন অপর প্রান্তের মানুষটিও অপেক্ষা করছিল তার একটুখানি শব্দের জন্য।
“এই মেয়ে ঘুমাচ্ছো না কেন? ভালো মেয়েরা রাত জাগে না।”
‘এলিজাবেথ ভেংচি কেটে টাইপ করল, “আমি তো ভালো না।”
“কে বলল?”
“আমি নিজেই।”
“কে তোকে খারাপ বলেছে? আমাকে বল। তার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব।”
‘তুইতোকারি শুনে একটু চমকে উঠল এলিজাবেথ। তবে বিষণ্ন মনে এসব এখন বিশেষ গুরুত্ব পেল না। ঠান্ডা ভঙ্গিতে লিখল, “তাহলে আগে আমার জিভই টেনে ছিঁড়তে হবে। কারণ আমি নিজে নিজেকে সবথেকে বেশি ঘৃণা করি।”
“কারণ?”
“আছে কিছু কারণ। থাকুক না অজানা। জগৎ তো আজ না কাল বলবেই। তাই আগে নিজে ই বলে নিচ্ছি, পরে যদি সুযোগ না পায়।”
“বেশি বুঝা মেয়েদের নারীগত না জন্মগত স্বভাব?”
‘এলিজাবেথ ঠোঁট টিপে হাসল। কিন্তু হঠাৎ কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে বুকের ভিতর ধপ করে উঠল। ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে কম্বলের নিচে গুটিয়ে গিয়ে লিখল, “আমার না খুব ভয় করছে।”
‘ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ এল,“আমি বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। শুধু শুনে রাখো মেয়ে, ভয় পেতে নেই। ভয় পেলে ভয় আরও চেপে ধরে।”
‘এলিজাবেথ টুক করে জবাব দিল, “এখন করলে কি কবর আমি?”
“আমি আসবো?”
‘চোখ বড় বড় হয়ে গেল এলিজাবেথের। দ্রুত লিখল,“মানে কী বলছেন এসব? আপনি জানেন আমি কোথায় আছি?”
“খুঁজে বের করে নেব। শুধু বলো আসব কিনা? যত সমুদ্র,নদী পার করতে লাগে করব।”
“না না ভাই, থাক। কোনো দরকার নেই।”
“তোমার দরকার না থাকলেও একদিন আসব। নিজের প্রয়োজনে।”
“আপনার প্রয়োজন মানে?”
“আমি দেখতে চাই সেই সাহসী মেয়েটাকে, যে রাতদুপুরে আমার ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।”
‘এলিজাবেথ অবাক হয়ে ঢং করে লিখল, “আজব তো! আরে ভাই আমি কি চোর নাকি,যে আপনার ঘুম কেড়ে নেব?”
‘ওপাশ থেকে হাসির উত্তর এলো, “না আপ্পি, আপনি চোর না। আপনি ডাকাত।”
‘চোয়াল ফাঁক হয়ে গেল এলিজাবেথের। ক্রোধের স্টিকার পাঠিয়ে সাথে দিল,”আপ্পি?”
‘একইভাবে ওপাশ থেকেও আসলো, “ভাই?”
‘এলিজাবেথ কী লিখবে বুঝে উঠতে পারছিল না। কথাগুলো তার কাছে একটু অস্বস্তিকর ঠেকলেও একধরনের কৌতূহলও জাগাচ্ছিল। এরই মধ্যে ওপাশ থেকে আবার মেসেজ এলো,”আচ্ছা, মেয়েরা কী চায়?”
‘এলিজাবেথ কিছুক্ষণ ভেবে টাইপ করল, “বাউন গার্ল’রা তো টাকা-পয়সা, দামি গাড়ি-বাড়ি এসব চায়।”
“আর তুমি?”
“একজন শুদ্ধ পুরুষ।”
“তাহলে আমাদের মতো খারাপ পুরুষের কী হবে?”
“আগুন লাগুক আপনাদের মতো খারাপ পুরুষের মুখে। আচ্ছা, ছেলেরা কেমন মেয়ে চায়?”
“আজব! আমি সবারটা জানব কী করে?”
‘বিরক্ত হয়ে এলিজাবেথ লিখল, “উফফ! ঠিক আছে, নিজেরটাই বলুন।”
“আমার মন ভালো একটা মন চাই। কিন্তু আমার চাঁদ শুধু ওটা চাই। এই যেমন এখন ওর ক্র্যাবিন্স হচ্ছে একটু কিছু মিছু……”
‘এলিজাবেথ ভ্রু কুঁচকে লিখল,”চাঁদ মানে? ওটা মানুষের শরীরে থাকে নাকি?”
“মানুষের না, শুধু পুরুষ মানুষের।”
“মানে! কোথায়?”
“অতলে! মেয়ে মানুষদের চাঁদের সৌন্দর্য থাকে তাদের হাসিতে। আর পুরুষের চাঁদের আলোর কার্যকারিতা থাকে তাদের ব্যক্তিগত সেই বিশেষ চাঁদে।”
‘এলিজাবেথ থমকে গেল। ওর পেটের ভিতর ছুটে গেল এক ঝাঁক প্রজাপতি। মায়াজাল থেকে আবারও মেসেজ এলো,
“তোমার স্বামীকে মিস করছ?”
‘এলিজাবেথ তপ্ত শ্বাস ফেলে বিষণ্ন মনে টাইপ করল,”একদমই না।”
“তাহলে আমাকে কর।”
“ওমা কেন?”
“কারণ এই শীতে আমি তোমাকে উষ্ণতা দিচ্ছি।”
‘বুঝল না এলিজাবেথ, “কীভাবে?”
“কেন ফিল করতে পারছো না? মে আই হ্যাভ টু এক্সপ্লেইন?”
‘অস্বস্তি লাগা সত্ত্বেও এলিজাবেথ দাঁতে দাঁত চেপে লিখল,
“আপনি কি ছোট থেকেই এমন নষ্ট, নাকি বড় হয়ে হয়েছেন?”
“ছোট থাকতে ভালোই ছিলাম। এমনকি বড় হয়েও। তবে হঠাৎ এক মেয়ে এলো আমার একলা জীবনে । এক দেখাতেই আমার ধারালো ইস্পাতে কম্পন ধরাতে পেরেছিল সে। তারপর থেকেই আমি নষ্ট। সব দোষ আমার বৌয়ের বুঝলে।”
‘এলিজাবেথ বিরক্ত হয়ে লিখল, “আপনার সব কথায় ডাবল মিনিং থাকে।”
“এতেই এমনটা মনে হলো? শুনো মেয়ে, আমি খুলে দিলে মুখ, হয়ে যাবে তোমার অন্য মুড। ছটফট করবে এই নিশি ভোর।”
‘এলিজাবেথের গালে লাল লাভার মতো জ্বলে উঠল। তড়িঘড়ি করে বালিশের নিচে ফোন রেখে গালে ঠাণ্ডা পানি দিতে লাগল। ওপাশ থেকে কোনো রিপ্লাই না পেয়ে রিচার্ড উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে হাঁটতে ট্যারেসের সামনে গিয়ে থামল। সামনের কাচ গলিয়ে ওপাশে অন্ধকারে আচ্ছন্ন আকাশে দেখা যাচ্ছে আলোকিত একলা চাঁদ। আজ নতুন ম্যানশনে উঠেছে রিচার্ড, তবে ন্যাসো ওরা এখনও বাগানবাড়িতেই। রাণীর জন্য তৈরি ম্যানশনে রাণীর ই প্রথম পা রাখা উচিত। এই ভাবনাতেই এখনও ওদের এখানে আনেনি রিচার্ড।
‘চাঁদের আলোতে রিচার্ডের পিছনে দেয়াল এবং বেডসাইডের দেয়ালে ঝুলানো ছবি গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অজস্র ফ্রেমে বাঁধানো এলিজাবেথের মুহূর্তগুলো। বিশেষভাবে চোখে পড়ে দেয়ালের বড় একটা ছবি,, লাল চুল,গড়নে কলাপাতার রঙের জামা, চোখেমুখে ভয় মিশে থাকলেও ভীষণ মায়াময়। বৃষ্টিতে ভেজা সেই এলিজাবেথ প্রথম সাক্ষাতে এ রূপে রিচার্ডের গাড়ির ড্যাশবোর্ড ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। সেই ছবি যত্নে এখানে টাঙিয়ে রেখেছে রিচার্ড।
‘তবে এখানে শুধু সেই দিনের ছবিই নয়।ক্যালিফোর্নিয়া, টুইন পিক পাহাড়, ইতালি, তাকবীরের বাড়ি, সিলেট প্রতিটি জায়গার স্মৃতিগুলোও ছবিতে বন্দি হয়ে ঝুলছে এই হৃদয়হীন মানুষটির কক্ষে।
‘তবুও, অনুভূতি প্রকাশে রিচার্ড আজও ব্যর্থ। তার ভেতর জমে থাকা অগণিত অপ্রকাশিত ভালোবাসার ভার যেন কেবল দেয়ালের ফ্রেমগুলোই বহন করছে। শক্ত মনের গহীনে জমে থাকা দানা দানা সুপ্ত অনুভূতি রিচার্ডকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করতে শুরু করেছে। পৈশাচিক বিধ্বংসী মস্তিষ্ক যতটা সেগুলোকে দমাতে চাইছে, অনুভূতির দাবানল ঠিক ততটাই পুঁতে দিচ্ছে তাকে। তামাকু কখনো মন শান্ত করে না, বরং সেই অশান্তির ঝড় আরও প্রবল করে তোলে।
ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৩৫
‘সে ঝড়ও যেন ফিরে আসে সেই তাণ্ডবেরই কাছে যেখানে রিচার্ডের আত্মা অস্থির। রিচার্ড হাতে তুলে নিল এক বোতল ওয়াইন। হঠাৎই অদম্য ক্রোধে ছুঁড়ে মারল কাচের গ্লাসে। ঝনঝনে শব্দে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল কাচের টুকরোগুলো।কাচের ঝনঝনানি থেকেও জোরে চেঁচিয়ে উঠল রিচার্ড,
“পাপ-পুণ্যের হয় না সংসার ! তবে খোদা কেন করলে মোরে পাপী?”
