Home ভূমধ্যসাগরের তীরে ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব ৩৩

ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব ৩৩

ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব ৩৩
লেখিকা দিশা মনি

মিষ্টি ভীষণ অস্থির হয়ে গেছিল রাফসানের বিপদের কথা ভেবে। আমিনা ও ফাতিমা বিবি মিলে তাকে সামলানোর বৃথা চেষ্টা করতে থাকে। এরইমধ্যে পুরো এলাকার চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। একুশ শতাব্দীর মধ্যে মার্সেই শহরে তো বটেই ফ্রান্সে এমনকি ইউরোপেও এটা সবথেকে বড় ট্রাজেডি ছিল৷ অনেকেই নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে। ধারণা করা হচ্ছিল, এই বিস্ফোরণের ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে পারে।

এসব কথা কানে আসতেই যেন মিষ্টি সব আশা ছেড়ে দিতে থাকে। তার বারবার রাফসানের বলা শেষ কথাগুলো মনে পড়তে থাকে। মিষ্টি ছটফট করতে থাকে। মিষ্টির এই অবস্থা দেখে আমিনা দ্রুতই তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে চায়। কিন্তু মিষ্টি জেদ করছিল সে ভূমধ্যসাগরের তীরে যাবে। এজন্য সে সব বাধা অতিক্রম করে ছুট লাগায়৷
ছুটতে ছুটতে মার্সেই বন্দরের কাছাকাছি যেতেই মিষ্টি যেন এক নারকীয় দৃশ্যের সাক্ষী হয়। চারিদিকে বিস্ফোরণের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। মানুষের আহাজারির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কত মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে। এলাকাটা পুরো পুলিশ বাহিনী সহ উদ্ধারকর্মীরা ঘিরে রেখেছে। মিষ্টিকে ছুটে আসতে দেখেই একজন পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এই যায়গাটায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। আপনি ফিরে যান।”
মিষ্টি করুণ কন্ঠে বলে,
“দয়া করে আমায় যেতে দিন। আমার স্বামী..ও এই বিস্ফোরণের ফলে হারিয়ে গেছে। ওর সাথে যখন আমি কথা বলছিলাম তখনই আমি এই বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই৷ তারপর থেকে ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না৷ ও এই বন্দরের কাছেই ছিল।”

“দেখুন, আমি আপনার পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছি। কিন্তু এখানে আপনার স্বামী-সহ আর হাজার হাজার মানুষ হারিয়ে গেছে, অনেকে আহত হয়েছে অনেকেই বা..সকলের স্বজনই আপনার মতোই ব্যবহার করছে। আমি এটাও জানি, বিপদে পড়লে মানুষের মাথা কাজ করে না। কিন্তু আপনারা আমাদেরকে আমাদের কাজটা সঠিকভাবে করতে দিন। এই স্থানে এখন সাধারণ মানুষের প্রবেশ করা যাবে না। এখানে আরো কোন বিস্ফোরক দ্রব্য থাকতে পারে। তাই জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্যই এই ব্যবস্থা নেয়া। তাছাড়া, এত এত ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে আপনি কাউকে খুঁজেও পাবেন না। তাই আমি অনুরোধ করছি, আপনি একটু ধৈর্য ধরুন। ধৈর্য ধরে দেখুন। হয়তো আপনার স্বামীকে খুঁজে পাওয়া যাবে। আপনি আপনার নাম আপনার স্বামীর নাম আর তার কোন ছবি থাকলে থানায় গিয়ে ডায়েরি করে রাখুন। সেখান থেকেই আমরা আপনার স্বামীর কোন খোঁজ পেলে আপনাকে জানাবো।”

মিষ্টি অসহায় কন্ঠে বলে,
“আপনারা বুঝতে পারছেন না কেন? আমার স্বামীর সাথে আমার ভীষণ জরুরি কথা আছে। আমি..আমি মা হতে চলেছি। এই সুখবরটা এখনো অব্দি ওকে জানাতে পারি নি৷ দয়া করে আমায় যেতে দিন। এই সুখবরটা ওকে দিতে হবে।”
এমন সময় আমিনা সেখানে ছুটে আসে। আমিনা এসেই মিষ্টিকে ধরে বলে,
“আপু..তুমি নিজেকে সামলাও। ওনাদেরকে ওনাদের কাজটা করতে দাও। ওনারা তো বলছেন, যে মিস্টার রাফসানের ছবি, নাম সব লিখিয়ে রাখতে। তুমি তাই করো। এখন এরকম পাগলামি করে কোন লাভ নেই।”
এরইমধ্যে হঠাৎ করে মিষ্টির মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। সে সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে৷ আমিনা মিষ্টির এই অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলে এবং তাকে সামলানোর চেষ্টা করে।

১ সপ্তাহ পর,
মিষ্টি এখন মার্সেইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি। সেদিনের ঘটনার পর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। এখন অবশ্য সে অনেকটাই সুস্থ।
আমিনা মিষ্টির কাছে এসে বসে। মিষ্টি আমিনাকে জিজ্ঞেস করে,
“রাফসানের কোন খোঁজ পাওয়া গেছে?”
আমিনা একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নাড়ায়। মিষ্টির চোখ দিয়ে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে নিজের পেটে হাত রেখে বলে,
“তাহলে কি আমি রাফসানকে আমাদের সন্তানের ব্যাপারে জানাতে পারব না? ও কি আর আমার কাছে ফিরবে না? আমার সন্তান কি তার বাবার ভালোবাসা পাবে না?”
আমিনা বলে,

“তুমি এভাবে আশাহত হয়ো না, মিষ্টি আপু। দেখবে, কোন না কোন উপায় নিশ্চয়ই বের হবে।”
মিষ্টি নিজের চোখের জল মুছে বলে,
“আর কি উপায় বের হবে? এতদিন হয়ে গেল অথচ ওনার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। উনি কোথায়, কি অবস্থায় আছেন কিছুই আমি জানি না। এভাবে কি জীবন চলতে পারে? উনি কি আর আমার কাছে ফিরবেন না?”
“অবশ্যই ফিরবে। তুমি আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।”
এমন সময় একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি মিষ্টির কেবিনে প্রবেশ করেন। তার মুখ মাস্ক দিয়ে ঢাকা থাকায় তাকে চেনা যাচ্ছিল না। মিষ্টি তাকে দেখেই বলে ওঠে,

“কে আপনি?”
লোকটি মুখ থেকে মাস্ক সরায়। আর তাতেই মিষ্টি অবাক হয়ে বলে,
“ড্যাড, তুমি?”
মোর্শেদ চৌধুরী অশ্রুসিক্ত চোখে নিজের মেয়েকে দেখছেন। আজ দীর্ঘ কয়েক মাস পর, তিনি নিজের মেয়েকে দেখতে পেলেন। মিষ্টি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বাবাকে জড়িয়ে ধরল৷ অতঃপর কান্না করতে করতে বলল,
“এসব কি হয়ে গেল ড্যাড? এসব তো হবার কথা ছিল না। মিস্টার রাফসান আমায় ছেড়ে কোথায় চলে গেলেন? কেন এভাবে হারিয়ে গেলেন আমার জীবন থেকে?”

মোর্শেদ চৌধুরী বললেন,
“সবই নিয়তির খেলা রে মা! কি করবো বলো?”
মিষ্টি বলে,
“রাফসানকে আমার কাছে ফিরতেই হবে।”
মোর্শেদ চৌধুরী মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“আমি তোমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। আসলে এই মিশনটা এতই গুরুত্বপূর্ণ আর ঝুকিপূর্ণ যে..জানি না, রাফসান কোথায় আছে আর কি অবস্থায় আছে। এই মারাত্মক বিস্ফোরণের পর আদৌ কি সে বেচে..”
“ড্যাড..এমন কথা বলো না প্লিজ।”

“আমি এমন কিছু বলতে চাই না। কিন্তু তুমি ভেবে দেখো,এখনো অব্দি রাফসানের টিমে যারা ছিল এমন ৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে ভীষণ বাজে অবস্থায়। আরো কত অজ্ঞাত লাশ বিভিন্ন মর্গে পড়ে আছে যাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। হয়তোবা রাফসানও তাদের মাঝেই।”
“চুপ করো ড্যাড, রাফসানের কিছু হয় নি। ও এভাবে আমায় ছেড়ে যেতে পারে না।”
“এমন পাগলামি করো না মিষ্টি। আমি আজ তোমায় আবার বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। আমি শুনেছি, তুমি মা হতে চলেছ। এই পরিস্থিতিতে আমি কিছুতেই তোমায় এখানে রাখত পারব না। রাফসানকে তো আমি রক্ষা করতে পারি নি। কিন্তু তোমার বা তোমার সন্তানের কোন ক্ষতি আমি হতে দেবো না। তোমায় আর এক মুহুর্তও এখানে থাকতে হবে না।”

মিষ্টি বলে,
“না, আমি এখান থেকে কোথাও যাব না। যতক্ষণ না রাফসানের খোঁজ পাওয়া যায় ততক্ষণ আমি মার্সেই শহরের বাইরে এক পাও রাখব না।”
“ছেলেমানুষী করো না, মিষ্টি। তোমার মা তোমার জন্য ভীষণ চিন্তায় আছেন। তুমি এখানে এসেছ থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। আমি তার অবস্থা আর চোখে দেখতে পারছি না। তুমি ফিরে চলো।”
মিষ্টি বলে,
“আমার যা বলার আমি বলে দিয়েছি। আমি এখান থেকে ততক্ষণ যাব না যতক্ষণ না রাফসানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি রাফসানের মাকে কথা দিয়েছিলাম, ওকে নিয়েই এখান থেকে ফিরব। সেই কথা আমি রাখবোই।”
“তুমি তাহলে আমার সাথে ফিরবে না?”

“নাহ।”
মোর্শেদ চৌধুরী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন,
“বেশ, যা ভালো মনে করো। তোমার জেদের কাছে আমি হার মানলাম। আমি এখানে তাহলে তোমার থাকার জন্য একটা নিরাপদ ব্যবস্থা করছি। আর আমার চেনাজানা বিশেষ কিছু গোয়েন্দাকে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি রাফসানকে খোঁজার জন্য। তুমি সাবধানে থেকো।”
মিষ্টি মাথা নাড়িয়ে বলে,

ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব ৩২

“মমকে বলে দিও, আমি ভালো আছি।”
মোর্শেদ চৌধুরী চোখের জল ফেলে বিদায় নেন।

ভূমধ্যসাগরের তীরে পর্ব ৩৪