Home মন রাঙানোর পালা মন রাঙানোর পালা পর্ব ২৪

মন রাঙানোর পালা পর্ব ২৪

মন রাঙানোর পালা পর্ব ২৪
ইয়াসমিন খন্দকার

অভিক সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট নিয়ে আনিসার রুমে চলে আসে। কিন্তু আনিসার রুমে প্রবেশ করতেই হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ পুরো রুমের অবস্থা বিধ্বস্ত এবং রুমের কোথাও আনিসা নেই। অভিক হঠাৎ করেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। আনিসার নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু কোন সাড়া আসল না। অভিক এবার হন্তদন্ত হয়ে পুরো বাড়িতে আনিসাকে খুঁজল। কিন্তু কোথাও তার কোন খোঁজ পেল না। ততক্ষণে সুনীতিও এই ব্যাপারে জেনে যায়। সুনীতি এসে অভিককে বলে,”চলো তো, আমরা আনিসা আপুর রুমটা আরেকবার ভালো করে খুঁজে দেখি। এমনো তো হতে পারে ওখান থেকে ওনাকে খোঁজার কোন ক্লু পেয়ে গেলাম।”

“হ্যাঁ, চলো।”
দুজনেই আনিসার রুমে গিয়ে খুঁজতে থাকে। সুনীতির হঠাৎ কি মনে হলো সে আনিসার খাটের নিচে তাকালো। সাথে সাথেই চেচিয়ে উঠে বলল,”আনিসা আপুউউউ!”
সুনীতির চিৎকারে অভিক ছুটে এসে দেখল আনিসা খাটের নিচে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। সে দ্রুত আনিসাকে খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করে বিছানায় শুইয়ে দিল। অতঃপর তার মুখে পানির ছিটা দিল। কিছু সময়ের মধ্যেই আনিসা জ্ঞান ফিরে পেল। অভিককে নিজের সামনে দেখেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সুনীতি এ দৃশ্য দেখে কষ্ট পেল খানিক৷ অভিক আনিসাকে জিজ্ঞেস করল,”তুই ঠিক আছিস তো?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আমি একদম ঠিক নেই অভি। আমার অতীত যে আমাকে ঠিক থাকতে দিচ্ছে না। একজন ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে, একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসে আমার পুরো জীবনটা একদম নষ্ট হয়ে গেল।”
অভিক একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,”তোর অতীতের ঘটনা কি এখন আমার সাথে শেয়ার করতে পারবি?”
“হ্যাঁ, পারব।”
” শুরু কর।”

আনিসা গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করে,”তখন ছিল আমাদের ইন্টার ফাস্ট ইয়ারের ফাইনাল এক্সাম। আমাদের বাড়ির গলির বাইরে তুই আমায় পৌঁছে দিয়ে চলে যেতি৷ আর গলির ভেতরে প্রতিদিন ফুল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত শিহাব। সে ছিল একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স থার্ড ইয়ারের পদার্থবিদ্যার স্টুডেন্ট ছিল। প্রথম প্রথম আমি তাকে পাত্তা দেইনি৷ কিন্তু একসময় তার প্রতি আমার মনে অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করে। আর এটাই ছিল আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল।”

বলেই কিছুক্ষণ থামে। অভিক আনিসার কাঁধে ভরসার হাত রেখে বলে,”তুই বলতে থাক।”
আনিসা আবার বলা শুরু করে,”শিহাবের প্রতি আমার দূর্বলতা ও নিজেও অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাই তো একদিন সাহস করে আমার পথ আটকে ধরে আমায় জোরপূর্বক একটি পার্কে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গিয়ে আমাকে এটা স্বীকার করতে বাধ্য করায় যে আমি ওকে পছন্দ করি। এরপর থেকে আমাদের একত্রে সময় কাটানো শুরু হয়। এজন্য আমি তোকে আর আরাফাতকে কম সময় দিচ্ছিলাম। শিহাবের সাথে ঘোরাফেরা করতে করতে আমি ওর প্রতি আরো দূর্বল হয়ে পড়ি। ও আমাকে সবসময় আমার পছন্দের গিফট দিত, আমার ভীষণ যত্ন নিত। আমার সামান্য কষ্টও ওকে বিচলিত করে দিত। এসব বিষয় আমাকে ওর প্রেমে গভীরভাবে পড়তে বাধ্য করেছিল আর শিহাব এটা বুঝতে পেরে আমার সুযোগ নেয়।”

“কি করেছিল শিহাব?”
অভিকের প্রশ্নে আনিসা চোখ বন্ধ করে নিয়ে বলে,”একদিন শিহাব আমায় প্রস্তাব দেয়…প্রস্তাব দেয় যেন আমরা রুমডেট করি..”
বলেই হু হু করে কাঁদতে শুরু করে আনিসা। অভিক নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলে,”এরপর কি হয়েছিল? তুই কি ওর প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলি?”
আনিসা দুপাশে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে,”না..না অভি..আমি একদম ওর প্রস্তাবে রাজি হইনি প্রথমে। বরঞ্চ ওকে তীব্র অপমান করে চলে এসেছিলাম। এরপর কিছুদিন ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখি। যারপর একদিন ও নিজে থেকে আমার সামনে আসে। আমার পায়ে পর্যন্ত পড়ে যাতে আমি সব ভুলে ওকে ক্ষমা করে দেই। আমি শিহাবকে ভালোবাসতাম তাই না করতে পারিনি৷ আবারো আমি আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক করে নেই। কিন্তু ও আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখেনি অভি।”

“কি করেছিল ও?”
“সেদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর, থার্টি ফাস্ট নাইট উপলক্ষ্যে ও আমায় বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতে চায়। তুই তো জানিস, আমার বাবা একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন,,তাই আমায় যেতে দিতে রাজি হন নি। তখন আমি আমাদের কলেজের কয়েকটা মেয়েকে নিয়ে যাই বাবার কাছে এবং মিথ্যা বলি যে, আমরা মেয়েরা মিলে আমাদেরই এক বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে থার্টি ফাস্ট নাইট সেলিব্রেট করব। এটা শুনে বাবা রাজি হয়ে যায়।”

অভিকের মনে পড়ে যায় এটাই সেইদিন ছিল যেদিন সে নদীর পারে সুইসাইড করতে গিয়ে শিহাব ও আনিসাকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছিল।
“এই মিথ্যাটা বলে আমি শিহাবকে নিয়ে ঘুরতে বের হই। সারাটা সন্ধ্যা, রাত আমরা গোটা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াই। শিহাব আমাকে ওর বাইকে করে বুড়িগঙ্গার তীরে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে আমরা একসাথে ডিনার করি এবং আমরা আবেগের বশে কিছুটা ঘনিষ্ঠ..”

বলতে গিয়ে আনিসার গলা কেপে ওঠে। আনিসা নিজেকে শক্ত করে নিয়ে পুনরায় বলে,”কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না সেদিন রাতে আমার জন্য আরো কত ভয়ানক কিছু অপেক্ষা করছিল। সেদিন রাতে শিহাব আমার খাবারে নেশাদ্রব্য মিশিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে আমি নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। শয়তানটা এটারই সুযোগ নেয়..ওর মনে যে এতটা জঘন্য পরিকল্পনা ছিল আমি বুঝিনি..আমার ঐ অবস্থার সুযোগ নিয়ে ও আমার সাথে…”
বলতে গিয়ে আনিসা আবারো থেমে যায়। অভিক, সুনীতি দুজনই চোখ বন্ধ করে নেয়।

“কিন্তু ও শুধু একাই এসব করে ক্ষান্ত হয়নি। সেদিন ওর আরো ৪-৫ জন বন্ধু পালাক্রমে আমায়…আই ওয়াজ গ্যাং রেপড..”
এটুকু বলে গলা ছেড়ে দেয় আনিসা। সুনীতি এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। আনিসা আবারো বলা শুরু করে,”ওদের ভয়াবহতা আরো বেশি ছিল। ওরা এরপর আমাকে ঐ অবস্থায় সিলেটে নিয়ে আসে। এখানে নিয়ে এসে টানা এক সপ্তাহ প্রতিদিন পালাক্রমে আমায়…প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত আমার কাছে নরকযন্ত্রণার মতো ছিল৷ ঐসব পশুদের একটুও মায়া হয়নি আমার উপর। আমাকে অন্ধকার ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল। সেই সময় আমি প্রতি মুহুর্তে আল্লাহর কাছে নিজের মৃত্যু কামনা কর‍তাম। কিন্তু আমার মৃত্যু মেলেনি। বদলে মিলেছে অসম্মান আর কষ্ট।”
একটু থেমে সে আবারো বলে,

“আমার বাবা কোনক্রমে জেনে গিয়েছিল যে আমি সিলেটে আসি। তাই সেও আমায় খুঁজতে সিলেটে আসে। আমার আপন বলতে আমার বাবাই তো শুধু ছিল, মাকে তো জন্মের পরই হারিয়েছিলাম। বাবা, যেহেতু একজন পুলিশ অফিসার ছিল তাই খুব সহজেই আমার সন্ধান পেয়ে আমি অব্দি পৌঁছে যায়। কিন্তু তার পরিণতি ভালো ছিল না। শিহাব এবং ওর বন্ধুরা আমার চোখের সামনেই আমার বাবাকে নৃশংস ভাবে খুন করে। আমাকে বাঁচাতে এসে আমার বাবাকে মরতে হয়।”
সুনীতি বলে ওঠে,”কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আপনার বাবা তো একজন পুলিশ অফিসার ছিল। তাকে মারা তো এতটা সহজ ছিল না।”

“আমিও প্রথমে তেমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। শিহাবের বাবা সিলেটের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। শুধু তাই নয়, তিনি সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এখানকার স্থানীয় প্রশাসন তার কেনা গোলাম। আমার বাবা এখানকার যেসব পুলিশ অফিসারের উপর ভরসা করে আমায় উদ্ধার করতে এসেছিলেন তাদের কেউই বাবাকে সাহায্য করেনি। বরং বাবার মৃত্যুর পর তারা সবাই পালাক্রমে আমাকে…”
আর বলতে পারে না আনিসা তার গলা শুকিয়ে আসছে।

অভিক আনিসার কাছে এসে তার কাধে হাত রেখে বলে,”তাহলে এতগুলো বছর তুই কোথায় ছিলি?”
“ঐ শিহাব এতগুলো দিন আমাকে বন্দি করে রেখেছিল। ও আমাকে কষ্ট দিয়ে মজা পেত..তাই এতগুলো দিন আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে। আসলে তো ও একটা সাইকো।”
“তাহলে তুই সেদিন ওখানে কিভাবে পৌঁছালি?”

মন রাঙানোর পালা পর্ব ২৩

“আমি খবর পেয়েছিলাম সীমান্ত এলাকায় আর্মিদের সাথে শিহাবের লোকদের ঝামেলা হবে। এজন্য আমি ওত পেতে ছিলাম। ওখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়ায় আমাকে যেখানে বন্দি রাখা হয়েছিল সেখানে দায়িত্বরত অনেককেও সীমান্তে পাঠানো হয়। যার ফলে আমার হাতে সুবর্ণ সুযোগ আছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমি ওখান থেকে কয়েকজনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে আসি। আর তারপর কি হলো তোরা তো জানিসই।”

মন রাঙানোর পালা পর্ব ২৫