Home মহাপ্রয়াণ মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩৯+৪০

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩৯+৪০

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩৯+৪০
নাফিসা তাবাসসুম খান

ক্যাথরিন বিচলিত চোখে বারবার চারিদিকে তাকাচ্ছে। গত আধঘন্টা ধরে সে পায়চারি করে চলেছে। আরোণ এক গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ক্যাথরিনকে পরখ করে চলেছে চুপচাপ। শেষমেশ আর না পেরে প্রশ্ন করে বসে,
” তুমি এতো বিচলিত হচ্ছো কেন? ”
ক্যাথরিন চিন্তিত সুরে জবাব দেয়,
” আধঘন্টা হয়ে গিয়েছে আমরা অপেক্ষা করছি। অ্যানা এখনো আসে নি। ওর কোনো বিপদ হয়নি তো? ”
” এসে পড়বে তুমি চিন্তা করো না। ”

মুখে এই কথা বললেও ভিতরে ভিতরে এখন আরোণেরও চিন্তা হচ্ছে৷ আরোণ চাচ্ছিলো আনাস্তাসিয়ার সুরক্ষিত কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিতে বা নিজেদের সাথে বাসকোভ প্রাসাদে নিয়ে যেতে। কিন্তু আনাস্তাসিয়া এখানে থাকতে চাওয়ায় সে আগ বাড়িয়ে কিছু বলে নি। কিন্তু আনাস্তাসিয়ার নিরাপদ থাকাও তার দায়িত্বের মাঝে পারে। ক্যাথরিনের আপনজনের প্রতিও আরোণের কিছু দায়িত্ববোধ আছে।
আরোণের ভাবনার মাঝেই সেখানে আনাস্তাসিয়া এসে উপস্থিত হয়। দৌড়ে এসে ক্যাথরিনকে জড়িয়ে ধরে সে। ক্যাথরিন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করে,
” কোথায় ছিলি তুই এতক্ষণ? আমার কতো চিন্তা হচ্ছিলো ধারণা আছে তোর? ”
আনাস্তাসিয়া সারারাত ওই কুটিরে রিকার্ডোর সাথে বসে ছিলো। ঝড়ের প্রকোপ কমে আসতেই শেষ রাতের দিকে রিকার্ডো তাকে বাসার সামনে পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়। বাসায় ফিরতেই ঘুম তাকে জেকে ধরে। তাই সকালে উঠতে দেরি হয়ে যায় তার। মুখে সে জবাব দেয়,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” জুন এবং জেনিও সাথে আসার জন্য জেদ করছিলো। ওদের বুঝিয়ে রেখে আসতেই সময় লেগেছে। ”
এটুকু বলেই আনাস্তাসিয়া পাশে দাঁড়ানো আরোণের দিকে তাকায়। আরোণ তাকে দেখে বলে,
” কি অবস্থা আনাস্তাসিয়া? ”
আনাস্তাসিয়া মাথা নেড়ে বলে,
” এইতো খারাপ না। ”

আরোণের সাথে কথা বলতে এক প্রকার অস্বস্তিবোধ করছে আনাস্তাসিয়া। আরোণের এক পরিচয় যেমন হচ্ছে সে ক্যাথরিনের প্রেমিক তাছাড়াও তার আরেক পরিচয় হচ্ছে সে একজন নেকড়ে। তাও নেকড়েদের আলফা। আর আনাস্তাসিয়ার মনে যার জন্য অনুভূতি সে একজন ভ্যাম্পায়ার। আর ভ্যাম্পায়ারদের জাত শত্রু হচ্ছে নেকড়েরা। উফফ! আর ভাবতে পারছেনা আনাস্তাসিয়া। তার মাথায় চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। সে কখনো ভাবে নি তার আর ক্যাথরিনের সাদামাটা সাজানো জীবন এতোটা এলোমেলো হয়ে যাবে কখনো। তাও কিনা ভ্যাম্পায়ার এবং নেকড়ের জন্য। কিন্তু জীবন বড়ই অদ্ভুত। জীবনে ঝড় কখনো বলে কয়ে আসে না। হুট করে এসে সব কিছু ওলট-পালট করে তান্ডব করে দিয়ে যায়।
ক্যাথরিন আরোণের দিকে তাকিয়ে বলে,

” আমি অ্যানার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই। আমাদের কিছুক্ষণের জন্য একা ছেড়ে দাও৷ ”
আরোণ মাথা নেড়ে বলে,
” আমি এদিকটায়ই আছি। কিছু প্রয়োজন হলে ডাক দিও। ”
এটুকু বলেই আরোণের প্রস্থান করে। তারপর ক্যাথরিন আনাস্তাসিয়ার দিকে ফিরে তাকায়। আনাস্তাসিয়া জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। সে ভেবে পাচ্ছে না কোথা হতে শুরু করবে সে। ক্যাথরিন বোনের বিচলিত মুখখানা দেখে প্রশ্ন করে,

” কি হয়েছে? কালকেও মনে হয়েছে তুই আমাকে কিছু একটা বলতে চাস। যা বলার স্পষ্ট বলে দে আমাকে। ওই বাসায় কি কেউ তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করে? ”
আনাস্তাসিয়া চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর ধীরস্বরে ক্যাথরিনকে বলে,
” আমরা আরেকটু দূরে গিয়ে কথা বলি? ”
ক্যাথরিন চারিদিকে চোখ বুলায়। বুঝতে পারে আনাস্তাসিয়া আরোণ কিছু শুনে ফেলার ভয় পাচ্ছে। তাই বলে,
” চল হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। ”
আনাস্তাসিয়া আর ক্যাথরিন হাঁটা শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা দূর আসতেই আনাস্তাসিয়া নিজ থেকে বলে উঠে,
” তুই আরোণকে বিশ্বাস করিস? ”
ক্যাথরিন চটপট উত্তর দেয়,

” চোখ বন্ধ করে। ”
” কিন্তু সে একজন নেকড়ে। ”
” আরোণ একজন নেকড়ে এর থেকেও বড় সত্য হচ্ছে ও আমাকে ভালোবাসে অ্যানা। ”
” তারমানে তুই বিশ্বাস করিস এই ভালোবাসা কোনো ভুল নয়? ”
ক্যাথরিন আড়চোখে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
” ভালোবাসা কখনোই ভুল হয় না অ্যানা। ”
আনাস্তাসিয়া এবার দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে উঠে,
” আমি একজনকে ভালোবাসি। ”
ক্যাথরিন চাপা স্বরে চিৎকার করে বলে উঠে,
” কি! ”
ক্যাথরিনকে আরো চমকে দিয়ে আনাস্তাসিয়া আবার বলে উঠে,

” আমি যাকে ভালোবাসি সে একজন ভ্যাম্পায়ার। ”
ক্যাথরিন এবার জোরে চিৎকার দেওয়ার জন্য মুখ খুলতেই আনাস্তাসিয়া হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে মিনতি করে বলে উঠে,
” চিৎকার করিস না দয়া করে। আরোণ শুনতে পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ”
ক্যাথরিন কণ্ঠ একদম খাদে নামিয়ে বলে,
” ভ্যাম্পায়ার? তুই ভালোবাসিস? কিভাবে কি হলো আমাকে এক্ষুণি খুলে বল। ”
আনাস্তাসিয়া আংশিক ঘটনা খুলে বলে ক্যাথরিনকে। রিকার্ডোর তাকে মারার আদেশ দেওয়া সহ তার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করা এবং জ্যাকসনের তাকে মারার চেষ্টা করার বিষয়গুলো সে লুকায় ক্যাথরিনের থেকে। সব শুনে ক্যাথরিন বিস্ময়ে মুখে হাত দিয়ে বলে,
” এতো কিছু হয়ে গিয়েছে আর তুই আমাকে কিছু জানাস নি! ”
” আরোণ সামনে ছিলো কালকে। তখন আমি কিভাবে বলতাম তোকে? ”
” আমার মনে হয় তোর সুরক্ষার জন্যই কাউন্ট রিকার্ডো তোকে সকলের আড়ালে জোসেফের সাথে তার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। ”

আনাস্তাসিয়া মাথা নত করে শুধু নাড়ায়। সে চায়নি ক্যাথরিন রিকার্ডোকে ঘৃণা করুক তাই কিছু বিষয় সে বাদ দিয়ে নিজের মতো করে বলেছে। আনাস্তাসিয়া নিজে সাক্ষী রিকার্ডো তাকে কতবার বাঁচিয়েছে। কিন্তু পুরো ঘটনা ক্যাথরিনকে বললে ক্যাথরিন রিকার্ডোকে ঘৃণা করতো। হয়তো আরোণকেও জানিয়ে দিতো। এতো কিছু আর ভাবতে পারছে না আনাস্তাসিয়া। তার মাথা ভোতা হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। ক্যাথরিন বলে উঠে,
” তোকে এখানে ফেলে আমি ফিরে যেতে পারবো না অ্যানা। তুইও আমার সাথে চল। আরোণের সাথে আমরা নিরাপদ থাকবো। ”
আনাস্তাসিয়া নাকোচ করে দিয়ে বলে,

” আমি তোর চিন্তা বুঝতে পারছি। এতোদিন পর তোকে পেয়ে আমারও তোকে ছেড়ে থাকতে মন চাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের জীবন পাল্টেছে। আমরা এখন আর কাভালা দ্বীপে প্রজাপতির ন্যায় উড়ে বেড়ানো ক্যাথরিন এবং আনাস্তাসিয়া নই৷ আমরা নিজেদের সব হারিয়ে ভালোবাসার কারণে রোমানিয়ায় নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখা ক্যাথ এবং নাসিয়া। যারা ভালোবেসেছি একজন নেকড়ে মানব এবং একজন ভ্যাম্পায়ারকে। আমাদের জীবন আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নেই। এই ভালোবাসা হলো সর্বনাশা। যার প্রতি কদমেই রয়েছে গভীর ফাঁদ। ভুলক্রমে কোন হোঁচট খেলেই এই ফাঁদে পড়ে মৃত্যু নিশ্চিত। আমাদের জীবনের রাস্তা আর এক নেই। জীবন নতুন মোড় নিয়েছে। যেই মোড়ে হয়তো আরোণ এবং রিকার্ডোর জন্য কখনো আমাদের একে অপরের বিপরীতেও যেতে হতে পারে। কিন্তু আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে তা যেন কখনো না হয়। এই নেকড়ে ভ্যাম্পায়ারদের শত্রুতার ইতি টানতে হবে আমাদের মিলে। ”

ক্যাথরিন মন দিয়ে এতক্ষণ আনাস্তাসিয়ার কথা শুনছিলো। এক চাপে তার ছোট বোন কতগুলো কঠিন বাস্তব কথা বলে ফেললো ভাবতেই সে অবাক হচ্ছে। এটাই কি সেই সতেরো বছরের উড়নচণ্ডী আনাস্তাসিয়া যার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা ছিল পাহাড় এবং সমুদ্র? সামান্য জ্বর এলে পুরো ঘর মাথায় তুলে ফেলা মেয়ে কি না আজ ভালোবাসার জন্য মৃত্যুর পণ করতেও পিছুপা হটছে না? ক্যাথরিন মনে মনে ভাবে এটাই তো ভালোবাসা। আরোণকে ভালোবেসে সে আজ অরণ্যের গহীনে এক প্রাসাদে নেকড়ে পালের মাঝে থাকতেও রাজি। ক্যাথরিন আনাস্তাসিয়ার গালে হাত রেখে বলে,
” ভালোবাসা কখনো ভুল হয় না অ্যানা। কিন্তু ভালোবাসার মানুষ ভুল হতে পারে। আমি আশা করছি তোর ভালোবাসার মানুষটা কখনো ভুল না হোক। আমার একটাই প্রার্থনা সেও যেন তোকে ততটাই ভালোবাসে যতটা তুই তাকে বাসিস। ”

চারিদিকে বারবার চোখ বুলিয়ে তাকাচ্ছে বেঞ্জামিন। তার সামনে থাকা এই গুহা এবং অপরিচিত এই দুজম মানুষকে তার মোটেও ভালো ঠেকছে না। কিন্তু ড্রাগোসের কারণে বাধ্য হয়ে সে এসেছে।
ড্রাগোস দু’হাত পিঠের পিছনে ভাজ করে দাঁড়িয়ে থেকে জ্যাকসনের উদ্দেশ্যে বলে,
” কি বলতে চাও তুমি তাড়াতাড়ি বলো। ”
জ্যাকসন হাসে। বিচ্ছিরি সেই হাসির ধরণ। বলে উঠে,
” এতো উত্তেজিত হচ্ছেন কেন প্রিন্স? চিন্তা করবেন না। আপনাকে বিনা কারণে আমার সাথে আসতে বলি নি আমি। বরং আপনার জন্য অনেক বড় এক তথ্য আছে আমাদের কাছে। ”
ড্রাগোস বলে উঠে,

” সেজন্যই আমি তোমার সাথে এসেছি। কি এমন বিশেষ তথ্য যা জানা আমার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ? ”
ড্যানিয়েল পাশ থেকে বলে উঠে,
” তার আগে আপনি বলেন, আপনি কি এই সাম্রাজ্যের অতিত সম্পর্কে অবগত? ”
ড্রাগোস ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” কোন অতিত? ”
” আলবার্টদের অতিত? ”
ড্রাগোস এবং বেঞ্জামিন দুজনই এবার বেশ অবাক হয়। তারা বুঝতে পারছে না এই আগুন্তকঃ হঠাৎ করে তাদের আলবার্টদের সম্পর্কে প্রশ্ন কেন করছে? ড্রাগোস গলা খাকড়ি দিয়ে বলে উঠে,
” জানবো না কেন? অবশ্যই জানি। ”
জ্যাকসনের হাসি এবার আরো বৃদ্ধি হয়। সে ড্যানিয়েলের দিকে তাকাতেই ড্যানিয়েলও হাসে সামান্য। তারপর সে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,

” আমি যদি বলি যে আলবার্টদের একজন উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন তাহলে আপনি কি করবেন প্রিন্স ড্রাগোস? ”
শেষের সম্বোধনটুকু কিছুটা রসিকতার সুরে করে জ্যাকসন। ড্রাগোস এবং বেঞ্জামিনের মাথায় যেন বেশ বড়সড় এক বজ্রপাত হলো। হওয়ারই কথা। এমন হুট করে কেউ এধরণের কথা বললে সেটা এতো সহজে হজম হওয়ার কথা না। ড্রাগোস রাগান্বিত সুরে বলে উঠে,
” তোমাদের এতো বড় সাহস যে তুমি আমার সাথে ঠাট্টা করছো? এক্ষুণি তোমার গর্দান কেটে বাজারে ঝুলিয়ে দিবো। ”
ড্যানিয়েল পাশ থেকে বলে,

” যেটাকে আপনি ঠাট্টা বলছেন সেটা বাস্তবতা। আপনার সিংহাসন হুমকির মুখে আছে। কারণ একজন আলবার্ট এখনো জীবিত আছে। যদিও সে নিজের আসল পরিচয় সম্পর্কে অবগত নয় তবে যদি সে কখনো জেনে যায় তবে এই রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসার স্বপ্ন আপনার স্বপ্নই রয়ে যাবে। ”
বেঞ্জামিন আনমনে বলে উঠে,
” সেই আলবার্টের বর্ণনা? ”
ড্যানিয়েলের মুখ বিরসতায় ভরে উঠে। তবুও সে বলে,
” তীক্ষ্ণ তার দৃষ্টি, অগ্নিতাপ থেকেও ভয়ংকর তার রাগ, গোলকধাঁধার মতো জটিল তার মস্তিষ্ক, সৌন্দর্য তার চোখ ধাধানো, শত্রুদের কাছে সে এক আতংকের নাম। ”
ড্রাগোস একটা ঢোক গিলে। হঠাৎ করেই তার গলা যেন খুব শুকিয়ে আসছে। তবুও সে রয়ে সয়ে প্রশ্ন করে,
” তার নাম? ”
” রিকার্ডো। রিকার্ডো আলবার্ট। ”

ক্যাথরিন আরোণের সাথে বুখারেস্ট ফিরে এসেছে। ক্রিয়াস এখনো ফিরে নি। আরোণ ক্রিয়াসকে সেখানে ক্যাথরিনের অগোচরে রেখে এসেছে আনাস্তাসিয়ার দিকে খেয়াল রাখার জন্য। পাশাপাশি ভাসলুই গ্রামের সাথের জঙ্গলের দিকটাও তার খোঁজা বাকি। আনাস্তাসিয়ার সাথে দেখা করে ফেরার পর থেকেই ক্যাথরিন আনমনে কোনো ভাবনায় ডুবে আছে। আরোণ ভেবে নিয়েছে হয়তো বোনের চিন্তাই করছে সে। তাই সে আর এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করে নি। নিজের কক্ষে বসে সে ভাবছে জ্যাকসনের কোনো হদিস কেন পাওয়া যাচ্ছে না। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে একদম। তার এসব ভাবনার মাঝেই কক্ষের দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। দরজা যদিও ভেতর থেকে লাগানো না কেবল চাপিয়ে রাখা। তবুও আরোণ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে ক্যাথরিন তার সামনে দাঁড়ানো। অবশ্য এই বাসায় সে আর ক্যাথরিন ছাড়া আর কেউ নেই তাই অন্য কারো আসার প্রশ্নই জাগে না। আরোণ দরজা খুলেই বলে উঠে,

” আমার কক্ষে প্রবেশের জন্য তোমার কখনো অনুমতির প্রয়োজন নেই ক্যাথ। তোমার যখন মর্জি তুমি আসতে পারো। ”
ক্যাথরিন সেই কথার কোনো পাল্টা জবাব না দিয়ে উল্টো আবদারের সুরে বলে উঠে,
” আমি বাহিরে যেতে চাই তোমার সঙ্গে। ”
আরোণ সাবলীল গলায় হেসে প্রশ্ন করে,
” কোথায়? ”
” যেখানে তুমি নিয়ে যাবে। ”
আরোণ আর কথা বাড়ায় না। ক্যাথরিনের হাত ধরে সেই অবস্থাতেই বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় কেবল চাঁদের আলো রয়েছে। একটা মানুষও নেই। ক্যাথরিন দেখে আরোণ এগিয়ে গিয়ে ভ্যালেন্টাইনের বাধন খুলছে। তাই সে প্রশ্ন করে,

” তুমি ঘোড়া নিবে না? ”
আরোণ হেসে বলে,
” এক ঘোড়ায় যেতে কোনো সমস্যা হবে তোমার? ”
ক্যাথরিন মাথা নেড়ে না জানায়। বাধন খুলে আরোণ নিজে প্রথমে ভ্যালেন্টাইনের উপরে চড়ে বসে। তারপর একহাত বাড়িয়ে দেয় ক্যাথরিনের দিকে। ক্যাথরিন হেসে সেই হাত ধরে আরোণের সামনে উঠে বসে। আরোণ দুইহাতে লাগাম ধরে ক্যাথরিনের কাধের পাশে মুখ নিয়ে শীতল স্বরে বলে উঠে,
” শুভ যাত্রা। ”
ক্যাথরিন সামান্য শিউরে উঠে। পরপরই সে পরম আবেশে নিজের পিঠ আরোণের বুকের উপর ছেড়ে দিয়ে বলে,
” শুভ যাত্রা। ”

মাথার উপর পূর্ণ চাঁদ। চাঁদের আলো যেন জলপ্রপাতের সৌন্দর্য কয়েকশো গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। সরু লেকের মাঝে চাঁদের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। লেকের পাশেই রয়েছে সবুজ পাতার ভীড়ে লাল এবং গোলাপি রঙের ক্যামেলিয়া ফুলের বাহার। বরফে ঘেরা পাহাড়ের একপাশে আবার গা ঘেঁষে উঠেছে জেসমিন ফুল গাছ। পাশাপাশি সমতল ভূমিতেও বরফ ভেদ করে মাথা বের করে রয়েছে অসংখ্য সাদা স্নো ড্রপ এবং বেগুনি ক্রোকাস ফুল।
প্রথমবার যখন এখানে এসেছিল ক্যাথরিন তখন দিনের বেলা ছিলো। তার মনে হয়েছিলো সেই দৃশ্যটা তার দেখা সবথেকে সুন্দর একটা দৃশ্য। কিন্তু ক্যাথরিনের এখন মনে হচ্ছে সে ভুল ছিলো। রাতের বেলায় এই জায়গার দৃশ্য আরো বেশি মনোমুগ্ধকর। ক্যাথরিনের জানা নেই আরোণ তাকে এতো জলদি কিভাবে এখানে নিয়ে আসলো কিন্তু সে অনেক খুশি যে আরোণ তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ক্যাথরিন পিছু ফিরে খুশিতে আত্মহারা হয়ে আরোণকে জড়িয়ে ধরে। আরোণ মনে মনে প্রেয়সীর খুশি দেখে খুশি হয়। কেবল ক্যাথরিনের এই হাসিটুকু দেখার জন্য ও ক্যাথরিনকে এখানে নিয়ে এসেছে।

ক্যাথরিন আরোণকে ছেড়ে দিয়ে সামনের দিকে এগুতে নিলেই পিছনে নিজের হাতে টান অনুভব করে। পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে আরোণ তার একহাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাথরিন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় আরোণের দিকে। আরোণ হঠাৎই ক্যাথরিনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। মাথা তুলে ক্যাথরিনের চোখে চোখ রেখে সে শীতল স্বরে বলে উঠে,
” চন্দ্র, পাহাড়, জলপ্রপাত, ক্যামেলিয়া, জেসমিন, বরফকুচি এবং ভ্যালেন্টাইনকে সাক্ষী রেখে আমি আজ বলছি আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি ক্যাথ। যতটুকু ভালোবাসলে নিজেকে কারো অধীনে সমর্পণ করে দেওয়া যায় নিঃসংকোচে ঠিক ততটুকু ভালোবাসি আমি তোমাকে। ”

ক্যাথরিনের শরীর জুড়ে এক শীতল অনুভূতি বয়ে যায়। এক হিংস্র নেকড়ে যে কিনা তারই সামনে একদিন কারো হৃৎপিণ্ড টেনে হিঁচড়ে ভক্ষণ করেছিলো আজ কিনা সেই তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতির এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিচ্ছে? আদৌ কেউ বিশ্বাস করবে এটা? কেউ করুক অথবা না করুক ক্যাথরিন করবে। কারণ এইসব কিছুর জলজ্যান্ত সাক্ষী সে।
ক্যাথরিনকে আরো বড় ধাক্কা দিয়ে আরোণ আবার বলে উঠে,

” এই প্রণয়কে সবথেকে পবিত্র সম্পর্কের নাম দিয়ে বাকি জীবনের জন্য আমার হবে তুমি ক্যামেলিয়া? ”
ক্যাথরিন কিছু বলতে পারে না। সে বাকহারা এবং কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রয়। অতি খুশিতে হয় মানুষ আত্মহারা হয়ে ফেটে পড়ে অথবা বাকহারা হয়ে পড়ে। ক্যাথরিনের সাথেও তা হচ্ছে। আরোণ এইমাত্র তাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিলো? ক্যাথরিনের মনে হচ্ছে সে কোনো স্বপ্নের জগতে বাস করছে। ঘুম ভাঙলেই এই স্বপ্ন ফুরিয়ে যাবে। সে একহাত বাড়িয়ে আরোণের গালে হাত রাখে। না এটা স্বপ্ন নয়। যা হচ্ছে সব বাস্তব। ক্যাথরিন মাথা নাড়ায়। খুশি তার চোখ দিয়ে দু ফোটা অশ্রু রূপে বেরিয়ে আসে। অস্ফুটে সে বলে উঠে,
” হ্যাঁ আরোণ। ”

এটুকু বলেই হামলে পড়ে সে আরোণের বুকে। আচমকা ক্যাথরিনের এমন কাণ্ডে তাল সামলাতে না পেরে বরফের উপরই পড়ে যায় আরোণ। তবুও দু’হাতে তার বুকের উপর পড়ে থাকা ক্যাথরিনকে সামলে নেয় স্বযত্নে। সময় নিয়ে নিজেও চোখ বুজে রয়। আরোণের মনে হচ্ছে তার জীবনের সকল অপূর্ণতা ধীরে ধীরে পূর্ণতা হয়ে ধরা দিবে তার কাছে। ক্যাথরিন আরোণের বুক থেকে মুখ তুলে তাকায় তার দিকে। খুশিতে অশ্রুসিক্ত সেই নয়ন জোড়া দেখে আচমকা ক্যাথরিনকে সহ ঘুরে তার উপর এসে পড়ে আরোণ। ক্যাথরিনের গাল লাজে লাল হয়ে পড়েছে। এতো ঠান্ডার মাঝেও নিজের গালকে তপ্ত অনুভব করছে সে। আরোণ ঘোর মেশানো সুরে বলে,

” তোমার তথাকথিত অসভ্য প্রেমিক কি অসভ্য প্রেমিকের ন্যায় তোমার লাজের পরিমান বাড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি পেতে পারে? ”
ক্যাথরিন মৃদু হেসে চোখ বুজে নেয়। আরোণ ক্যাথরিনের রুদ্ধ আঁখি জোড়াকে সম্মতির লক্ষণ মনে করে নেয়। সাথে সাথেই সে ক্যাথরিনের ওষ্ঠদ্বয় খুবই সন্তপর্ণে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যালেন্টাইন এবং আকাশের চাঁদ সাক্ষী হয় এক প্রণয় যুগলের একান্ত মুহুর্তের।

রান্নাঘর থেকে চেচিয়ে আনাস্তাসিয়াকে ডাকছে জোয়ান্দ্রা। আনাস্তাসিয়া হুড়মুড়িয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করতেই জোয়ান্দ্রা বলে,
” অ্যানা জোসেফ যাওয়ার পরপরই যে বাচ্চা দুটি পিছু পিছু বেরিয়ে গেলো এখনো ফিরে নি। আমার হাতে রান্না নাহয় আমিই যেতাম। একটু গিয়ে দেখোনা বাঁদড় দুটো আবার কোথায় গেল। যেখানেই পাবে কান ধরে দুটোকে বাসায় নিয়ে আসবে। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
” তুমি চিন্তা করো না আমি ওদের নিয়ে আসছি। আর সামনে পেলেই সবার আগে আচ্ছামত ওদের কান দুটো মলে দিবো। ”

এটা বলেই আনাস্তাসিয়া দৌড়ে বেরিয়ে পড়ে। সে ভাবে বাচ্চারা হয়তো জোসেফের পিছু নিয়ে জঙ্গলের দিকে গিয়েছে হয়তো। তাই সে নিজেও সেদিকে ছুট লাগায়। কিন্তু জঙ্গলের অনেকটুকু এসেও যখন সে কাউকে পায়না তখন ফিরে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হতেই সে পিছন হতে কারো কণ্ঠ শুনতে পায়।
” আনাস্তাসিয়া? ”
আনাস্তাসিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। শ্যামবর্ণের পুরুষকে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ভয়ে সে জমে যায়। কাপা কাপা স্বরে বলে উঠে,
” ম্যাথিউ? ”

ম্যাথিউ ভুত দেখার মতো চমকে তাকিয়ে আছে। তার বিশ্বাস হচ্ছেনা আনাস্তাসিয়া তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জীবিত। ম্যাথিউ তড়িৎ গতিতে আনাস্তাসিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। উদ্ভ্রান্তের মতো প্রশ্ন শুরু করে,
” তুমি বেঁচে আছো? জীবিত ছিলে তুমি? কিভাবে? ”
আনাস্তাসিয়া কোনো উত্তর দিতে পারে না। ভয়ে তার গলা কাঠ হয়ে আসে। ম্যাথিউ উত্তরের আশায় না থেকে আপনমনে এটা সেটা প্রশ্ন করতে থাকে। হঠাৎ ম্যাথিউ চুপ হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মেলে সে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,

” দাঁড়াও। তুমি জীবিত ছিলে তাহলে ফিরে আসো নি কেন দূর্গে? ”
আনাস্তাসিয়ার কাছে এই প্রশ্নেরও জবাব নেই। সে কি জবাব দিবে যে রিকার্ডো তার দূর্গে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছে? ম্যাথিউ এবার রেগে জোরে বলে উঠে,
” জবাব দিচ্ছো না কেন? মুখে কুলুপ এঁটে কেন রয়েছো? তোমার কোনো ধারণা আছে শুধুমাত্র তুমি মৃত ভেবে আমার কি অবস্থা হয়েছিলো? আমার জীবন থমকে গিয়েছিলো বেয়াদব মেয়ে। ”
এটুকু বলে আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে পিছনের দিকে ধাক্কা মারে ম্যাথিউ। ম্যাথিউ ভুল করে জোরে ধাক্কা দেওয়ায় আনাস্তাসিয়া পিছনে এক গাছের সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যায়। গাছের নিচে কিছু ডালপালা পড়ে ছিলো। আনাস্তাসিয়ার বাম হাতে সেই ডালের কিছু সূক্ষ্ম অংশ ঢুকে হাত কেটে যায়। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে হাত বেয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। আনাস্তাসিয়া ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে। কিন্তু সামনের দিকে তাকাতেই তার গলার স্বর বন্ধ হয়ে যায়। ম্যাথিউ কেমন হিংস্র দৃষ্টিতে তার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ এবং মুখ দেখতে ভয়ংকর লাগছে তার। ভীত আনাস্তাসিয়া আরো ভয় পেয়ে যায় যখন সে দেখে ম্যাথিউর চোয়ালের দু’দিকে দুটি সূচালো দাঁত বেরিয়ে এসেছে। আনাস্তাসিয়া কাপা স্বরে বলতে থাকে,

” ম্যাথিউ। না। দূরে থাকো আমার থেকে। ”
ম্যাথিউ চাইলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। রক্ত দেখে তার ভেতরের হিংস্র স্বত্তা জাগ্রত হয়েছে। তার মস্তিষ্কে কেবল রক্ততৃষ্ণা ঘুরপাক খাচ্ছে। আনাস্তাসিয়া ভয়ে নিজের হাত পিঠের পিছনে লুকিয়ে ফেলতে নেয় তড়িঘড়ি করে। কিন্তু এতে আরো বিপত্তি বাধে। আরো দুটি সূক্ষ্ম ডালের সাথে লেগে তার হাত আরো কেটে রক্ত বের হওয়া শুরু করে। এবার ভয়ে আনাস্তাসিয়া নিশব্দে কাদতে শুরু করে। আচমকা ম্যাথিউ ঝড়ের গতিতে তার দিকে এগিয়ে আসতে নিলে আনাস্তাসিয়া ভয়ে মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে চিৎকার করে উঠে। কিন্তু সাথে সাথেই জোরে কোনো একটা শব্দ পেয়ে সে মাথা ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকায়। রিকার্ডো তার সামনে। আর ম্যাথিউ তাদের থেকে অনেকখানি দূরে মাটির উপর পড়ে আছে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ ম্যাথিউ উঠে দাঁড়িয়ে ফসফস করতে থাকে হিংস্র স্বরে। আনাস্তাসিয়া ভয়ে নিজের ডান হাত বাড়িয়ে রিকার্ডোর একহাত শক্ত করে ধরে রয়। রিকার্ডো আড়চোখে একবার আনাস্তাসিয়া ও তার বাম হাত থেকে বেয়ে পড়া রক্তের দিকে চায়। সাথে সাথে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে সামনে ম্যাথিউর দিকে তাকায় সে। তারপর চোয়াল শক্ত করে সে বলে উঠে,

” এক পা-ও সামনের দিকে আসবি না ম্যাথিউ। আর এই মেয়েকে ছোঁয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। ”
ম্যাথিউ তবুও ফসফস করে সামনের দিকে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসে। রিকার্ডো একহাতে তাকে ধাক্কা মেরে আবার দূরে নিয়ে ফেলে চিল্লিয়ে বলে উঠে,
” তোর এতো বড় স্পর্ধা? তুই ভুলে যাচ্ছিস তোর সামনে কে দাঁড়ানো? নিজের জীবন প্রিয় হলে এই মুহুর্তে এখান থেকে চলে যাবি তুই। নাহলে আমি ভুলে যাবো যে তুই আমার মায়ের পেটের ভাই হস। ”

আচমকা ধাক্কা খেয়ে ম্যাথিউর খেয়াল হয় এইমাত্র সে কি করতে যাচ্ছিলো। সাথে সাথে সে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকায়। আনাস্তাসিয়ার ভীত চোখ দেখতেই ম্যাথিউর মাঝে অপরাধবোধ জাগ্রত হয়। সে উঠে দাঁড়ায়। আনাস্তাসিয়া ভয়ে রিকার্ডোর পিছনে মুখ লুকায়। ম্যাথিউ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ায় না। সাথে সাথে প্রস্থান করে সে সেখান থেকে। অপরাধবোধ তাকে জেকে ধরেছে। একটু আগে সে আনাস্তাসিয়াকে আঘাত দিয়েছে। আবার তার উপর আক্রমণ করতেও যাচ্ছিলো। ম্যাথিউ তীব্র গতিতে দৌড়ে জঙ্গলের অন্য প্রান্তে এসে পৌঁছায়। ক্রোধে এবং অপরাধবোধে সে জোরে চিৎকার করে উঠে। তারপর ফসফস করতে করতে চারিদিক তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে নেয়। দূরেই একটা হরিণ শাবক তার চোখে পড়ে। এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সে ওই হরিণ শাবকের উপর আক্রমণ করে তার রক্তপান করা শুরু করে। পরপরই সে আক্রোশে নিজেকে বলতে থাকে,

” এইমাত্র তুই তোর জীবনের সবথেকে বড় ভুল করতে যাচ্ছিলি ম্যাথিউ। তুই তাকে আঘাত করতে যাচ্ছিলি যার প্রতি তোর অনুভূতি জন্মেছে। আনাস্তাসিয়ার আমার সাথে নিজেকে নিরাপদ অনুভব করা উচিত ছিলো। কিন্তু ও আমাকে ভয় পাবে এখন থেকে। আমার কোনো অধিকার নেই ওর সামনে যাওয়ার। ও হয়তো ঘৃণা করবে এখন থেকে আমাকে। ঘৃণা করাই উচিত। আমি এটাই প্রাপ্য। ”
শেষের কথাটুকু বেশ জোরে বলে উঠে ম্যাথিউ। সাথে সাথে মাথার উপর দিয়ে একঝাঁক পাখি উড়ে যায়। শান্ত অরণ্যের গহীনে মুহুর্তেই বয়ে যায় অশান্ত পাখির ঝাঁকের ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ।

” আহ! ”
বলে চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় আনাস্তাসিয়া। রিকার্ডো তাকায় সেই ভয়ার্ত মুখশ্রীর পানে। তারপর আবার নিচে তাকিয়ে আনাস্তাসিয়ার হাত থেকে টেনে ডালের অংশ বের করতে থাকে। ডালের ছোট ছোট টুকরো টেনে বের করার সাথে সাথেই ফিনকি দিয়ে আরো রক্ত বের হতে থাকে। রিকার্ডো অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এমন না তার রক্তের প্রতি আসক্তি নেই। আছে তবে সে যথাসম্ভব চেষ্টা করছে নিজেকে সংযত রাখার। আনাস্তাসিয়ার রক্তের ঘ্রাণকে উপেক্ষা করা বেশ কঠিন একটা কাজ। কিন্তু রিকার্ডো আগেও বহুবার এই কঠিন কাজটা সফলভাবে করেছে। আজও একইভাবে নিজেকে সংবরণ করে চলেছে।

আনাস্তাসিয়া পিটপিট করে রিকার্ডোর দিকে তাকায়। মনে মনে সে বুঝতে পারে রক্ত দেখলে ভ্যাম্পায়াররা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। ওরিয়নের সেই ডায়েরিতেও এই একই কথা পড়েছিল সে। তবুও রিকার্ডোর নিজেকে সংবরণ করা দেখে আনাস্তাসিয়া মুগ্ধ হয়। রিকার্ডো চোখের পলকেই নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল দিয়ে আনাস্তাসিয়ার হাতের চারিদিকে রক্ত পরিষ্কার করা শুরু করে। তবুও রক্ত পড়া না থামলে রিকার্ডো আদেশের সুরে বলে উঠে,
” এখান থেকে এক তিল পরিমাণও নড়বে না। আমি এক্ষুণি আসছি। ”

আনাস্তাসিয়া কিছু না বলে কেবল মাথা নাড়ায়। কিছুক্ষণের মাঝেই রিকার্ডো ফেরত আসে। হাতে তার দু তিন রকমের পাতা। নিচে পড়ে থাকা দুটি পাথর দিয়ে সেই পাতাগুলো পিষে নেয় সে। তারপর হাতের কাটা জায়গা গুলোয় লাগিয়ে দিতে থাকে। এতে করে রক্ত পড়া বন্ধ হয় কিছুটা। পরপরই রিকার্ডো নিজের গলা থেকে একটা কালো কাপড় হাতে নিয়ে সেটা দিয়ে আনাস্তাসিয়ার হাত অর্ধেকটা বেধে দেয়। এতক্ষণ আনাস্তাসিয়া চুপ করে ছিলো। এবার নিচের দিকে তাকিয়ে থেকেই মুখ ফুটে বলে উঠে,
” আমার কার থেকে রক্ষা করছো? নিজের থেকে নাকি বাকি সবার থেকে? ”
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়া দিকে তাকায়। আনাস্তাসিয়াও রিকার্ডোর চোখে চোখ রাখে। পরপরই রিকার্ডো পাল্টা প্রশ্ন করে,

” জেনে বুঝে বিপদে পড়তে আসো কেন? ”
” আমি বিপদে পড়তে আসি না, বিপদ নিজেই আমার পিছু ছাড়ে না। কিন্তু…”
” কিন্তু কি? ”
” কিন্তু আমি জানি বিপদ যা-ই হোক না কেন রক্ষক হিসেবে তোমাকে আমি নিজের সামনে পাবো সর্বদা। ”
রিকার্ডো তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন করে,
” এতো বেশি বিশ্বাস আমার প্রতি? ”
” নিজের প্রতি। ”
রিকার্ডোর মুখ গম্ভীর হয়ে আসে। সে কাঠকাঠ গলায় প্রশ্ন করে,
” ধরে নিলাম তোমাকে আমি সবার থেকে বাঁচিয়ে বেরাচ্ছি। কিন্তু আমার থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে? ”
আনাস্তাসিয়া রহস্যময়ী সুরে বলে উঠে,

” আত্মরক্ষা ভালো জানা আছে আমার এবং নিজ থেকে ধরা দেওয়াও। ”
রিকার্ডো চেয়ে রয় আনাস্তাসিয়ার দিকে। একটু আগে ভীতসন্ত্রস্ত থাকা মেয়ের মুখে এখন নির্ভীক ভাব ফুটে উঠেছে। রিকার্ডো ভয় পায়। আনাস্তাসিয়া ভুল করছে। আনাস্তাসিয়ার উচিত রিকার্ডোকে ভয় পাওয়া। তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা। কিন্তু আনাস্তাসিয়া জেনে বুঝে আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে। এই অনুভূতির মায়াজাল খুবই ভয়ংকর। যারা একবার এই ফাদে ঝাঁপ দেয় তারা পুরো জীবন এই তপ্ত অনুভূতি বুকে নিয়ে দহন হয়।

আজ বেশ অনেকদিন হয়েছে ড্যানিয়েলের কোনো ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছেনা। যদিও কোভেনরা এ নিয়ে সামান্য চিন্তিত বটে। কিন্তু ম্যাথিউর মাঝে এ নিয়ে কোনো ভাবান্তর নেই। তার এই দূর্গের কারো থাকা না থাকা দিয়ে কিছু আসে যায়না। সে কেবল একজনের চিন্তায়ই বিভর থাকে। তা হলো আনাস্তাসিয়া। সপ্তাহে এক দু বার সে লুকিয়ে আড়াল হতে গিয়ে জোসেফের বাসার সামনে থেকে আনাস্তাসিয়াকে দেখে আসে। আনাস্তাসিয়া জোসেফের বাসায় কিভাবে পৌঁছালো তা সম্পর্কে জোসেফকে প্রশ্ন করতেই জোসেফ জবাবে জানায় যে সে আনাস্তাসিয়াকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো সেই রাতে। তার কাছে মনে হয়েছিলো আনাস্তাসিয়ার দূর্গে না ফেরাতেই মঙ্গল। ম্যাথিউ আর এই বিষয়ে জোসেফকে কিছু বলতে যায়নি। যা হয় ভালোর জন্যই হয়। হয়তো আনাস্তাসিয়ার এই দূর্গ থেকে দূরে থাকাতেই মঙ্গল।

কিন্তু এই কয়েকদিনে ম্যাথিউ আরেকটা জিনিসও উপলব্ধি করেছে। হয়তো রিকার্ডোও আনাস্তাসিয়াকে পছন্দ করে ফেলেছে। নাহয় সেদিন কেন সে আনাস্তাসিয়াকে রক্ষা করতো ম্যাথিউর থেকে? যদিও সেই ঘটনার পর তাদের দুই ভাইয়ের মাঝে কোনো কথা হয়নি বললেই চলে। কিন্তু ম্যাথিউ রিকার্ডোর অনুভূতির বিষয়টা উপলব্ধি করতেই আপনমনে হেসেছিলো। নিজের ভাগ্যের প্রতি উপহাসের হাসি ছিলো সেটা। রিকার্ডোর প্রতি ম্যাথিউর মনে সবসময় ঘৃণা ছিলো একটা কারণে। সে মনে করে ক্যামিলো রিকার্ডোকে একমাত্র ভালোবাসে। নাহয় কোন মা অন্য কারো সন্তানকে বাঁচানোর জন্য নিজের সন্তানের জীবন ধ্বংস করে? ম্যাথিউ সবসময় মনে করতো রিকার্ডো তার থেকে তার মাকে কেড়ে নিয়েছে। আজ এতো বছর পর এসে যখন ম্যাথিউ প্রথমবারের মতো কাউকে ভালোবাসলো তখন রিকার্ডোর মনেও সেই মেয়েকেই ধরলো। এটার দোষ কি সে রিকার্ডোকে দিবে? ম্যাথিউর মনে হয় এইসব কিছুর জন্য দোষী তার ভাগ্য। তার ভাগ্য কখনো তার ভাগের খুশিটুকু সহ্য করতে পারে না। কপালে ভাগ্যের সীমারেখা ফসকে সেই খুশিটুকু সবসময় ম্যাথিউর থেকে দূরে পড়ে যায়।

আনাস্তাসিয়ার সাথে দেখা করতে এসেছে ক্যাথরিন। এতদিন পর বোনকে দেখে আনাস্তাসিয়া খুশিতে আটখানা হয়ে যায়। ক্যাথরিন আত্মহারা হয়ে বলে,
” আমার তোকে একটা সুসংবাদ জানানোর আছে। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
” কি সুসংবাদ? ”
” আমি আর আরোণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা বিয়ে করবো। ”
বোনের বিয়ে নিয়ে সবসময়ই আনাস্তাসিয়ার অনেক স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু এই মুহুর্তে সে বুঝে উঠতে পারছে না তার কি খুশি হওয়া উচিত নাকি না? আনাস্তাসিয়া ক্যাথরিনের হাত ধরে গম্ভীর সুরে প্রশ্ন করে,
” তুই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিত তো? তুই যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছিস সে কিন্তু কোনো সাধারণ মানব না বরং একজন নেকড়ে মানব। পুরোটা জীবন একজন নেকড়ে মানবের সাথে জীবনসঙ্গী হিসেবে থাকাটা খুব বড় একটা সিদ্ধান্ত। ”

ক্যাথরিন আনাস্তাসিয়াকে আশ্বস্ত করে বলে,
” আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত অ্যানা। ”
আনাস্তাসিয়া বোনকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানায়। ক্যাথরিন সাথে সাথে বলে উঠে,
” আমি তোকে আমার সাথে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার সাথে থাকতে রাজি হস নি কিছু বলিনি। কিন্তু অন্তত আমার বিয়েতে তো উপস্থিত থাকতেই পারবি তাই না? ”
ক্যাথরিনের মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে আনাস্তাসিয়ার মানা করার সাহস হয় না। তারও তার বোনের বিয়েতে উপস্থিত থাকার ইচ্ছে আছে। আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” কিন্তু জোয়ান্দ্রা, জোসেফ ওদের কি বলে যাবো আমি? ”
ক্যাথরিন বলে,
” আমি ওদের সাথে দেখা করতে চাই এবং নিজে কথা বলতে চাই। ”
আনাস্তাসিয়া বুঝে উঠতে পারে না কি করা উচিত। সে শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।

বসার ঘরে পাশাপাশি বসে আছে আনাস্তাসিয়া এবং ক্যাথরিন। বাসায় জোসেফ উপস্থিত নেই। শুধু জোয়ান্দ্রা এবং বাচ্চারা আছে। ক্যাথরিন নিজেকে আনাস্তাসিয়ার বোন হিসেবে পরিচয় দিতেই জোয়ান্দ্রা বেশ অবাক হয়। কারণ সে আনাস্তাসিয়ার মুখে শুনেছিলো যে আনাস্তাসিয়ার পরিবারের কেউই জীবিত নেই। জোয়ান্দ্রা আনাস্তাসিয়ার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই ক্যাথরিন চোখ উঠে,

” আমি বুঝতে পারছি আপনি কি ভাবছেন। কিন্তু আমার বেঁচে থাকাটা সম্পূর্ণ এক অলৌকিক ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। আমি বেঁচে শেষ পর্যন্ত রোমানিয়ায় এসে পৌঁছাই। এখানে এক যুবকের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেলি। কিছুদিন আগেই হুট করে আমার আনাস্তাসিয়ার সাথে দেখা হয়। আনাস্তাসিয়াকে জীবিত পেয়ে আমি অসম্ভব খুশি হই। ওকে আমার সাথে যাওয়ার জন্যও অনুরোধ করি। কিন্তু ও আর রাজি হয়নি। ও আপনাদের সাথেই থাকতে চেয়েছে। কিন্তু এখন কাল বাদে পরশু আমার বিয়ে। এখন অন্তত কিছু দিনের জন্য ওকে আমার সাথে নিয়ে যেতে চাই আমি। অবশ্যই যদি আপনার অনুমতি পাই। ”
জোয়ান্দ্রা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়। তার সামনে থাকা ক্যাথরিনকে দেখে মনে হচ্ছে না সে মিথ্যে বলছে। জোয়ান্দ্রা আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকায়। আনাস্তাসিয়া চোখে আকুতি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বেশ ভেবেচিন্তে বলে,

” আনাস্তাসিয়া যেতে চাইলে আমার কোনো সমস্যা নেই। ”
আনাস্তাসিয়া যেন এই অনুমতির অপেক্ষায়ই ছিলো। খুশিতে সে জোয়ান্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে। জোয়ান্দ্রাও আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে তার কানে কানে বলে,
” খুব সাবধানে থাকবে এবং নিজের খেয়াল রাখবে। আর জলদি গিয়ে জলদি ফিরে আসবে। আমরা তোমার অপেক্ষায় থাকবো। ”
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” অবশ্যই ফিরে আসবো আমি। ”

বুখারেস্ট প্রাসাদের একটি অত্যন্ত গোপন কক্ষে সবার অগোচরে প্রবেশ করে ড্রাগোস। কক্ষে প্রবেশ করতেই তার দেখা হয় জ্যাকসন এবং ড্যানিয়েলের সাথে। যারা আপাতত এই প্রাসাদে লুকিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। অবশ্য এটা ড্রাগোসেরই বুদ্ধি ছিলো। ড্রাগোসকে দেখেই জ্যাকসন বলে উঠে,
” সুস্বাগত প্রিন্স ড্রাগোস। ”
ড্রাগোস বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলে,
” আমার প্রাসাদে আমাকেই স্বাগত জানাচ্ছো তুমি? ”
ড্যানিয়েল বলে উঠে,
” আপনার প্রাসাদ নয় প্রিন্স। সিংহাসনে এখনো আপনি বসেন নি। ”
ড্রাগোস চোয়াল শক্ত করে বলে,
” খুব শীঘ্রই বসবো। এর জন্য যা প্রয়োজন হয় করবো। কিন্তু ওই রিকার্ডোকে কখনোই নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে দিবো না আমি। ”

ড্যানিয়েল এবং জ্যাকসনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। এটাই চাচ্ছিলো তারা। ড্রাগোসের এই সিংহাসনের প্রতি লোভই তাদের কাজে লাগাতে হবে। আগুনে আরেকটু ঘি ঢালার জন্য জ্যাকসন বলে উঠে,
” নিজের পিতাকেও হত্যা করতে পারবেন সিংহাসনের জন্য? ”
এই প্রশ্ন শুনে কিছুটা চমকায় ড্রাগোস। পরপরই সে বলে উঠে,
” পারবো। ”
ড্যানিয়েল বলে উঠে,
” মনে রাখবেন আপনার প্রতিপক্ষ কোনো সাধারণ মানুষ নয়। একজন ভ্যাম্পায়ার সে। তাকে হারাতে হলে আপনার শক্তিশালী হতে হবে অনেক। আর আপনার সাথে একজন ভ্যাম্পায়ার এবং নেকড়ে আছে। তাই চিন্তার কোনো বিষয় নেই। ”
ড্রাগোস হেসে মাথা নাড়ায়। আর মনে মনে ভাবে একবার রিকার্ডোকে মেরে নিজের সিংহাসন সুরক্ষিত করে ফেললে এই ভ্যাম্পায়ার এবং নেকড়েদের সে নির্বংশ করে ছাড়বে। অপরদিকে জ্যাকসন এবং ড্যানিয়েলও মনে মনে চিন্তা করে একবার ড্রাগোসকে বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারলেই তারা এর থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলবে।

রাতে বাসায় ফিরে খেতে বসেই জোসেফ জোয়ান্দ্রাকে প্রশ্ন করে,
” আনাস্তাসিয়া, জুন এবং জেনি ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে? ”
জোয়ান্দ্রা খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলে,
” জেনি এবং জুন ঘুমিয়ে আছে। ”
জোসেফ মজা করে বলে,
” আর ওই জংলী বিড়াল? সে কি করছে? ”
” ও বাসায় নেই। ”
জোয়ান্দ্রার কথায় খাওয়া থামিয়ে ভ্রু কুচকে তাকায় জোসেফ। এখন প্রায় মাঝরাত। এই সময়ে মেয়েটা বাসায় নেই মানে কি? কোথায় গিয়েছে? জোসেফ চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করে,
” বাসায় নেই মানে? ”
” ওর বোনের সাথে গিয়েছে ও। ”
” বোন? ”

” হ্যাঁ। ওর বড় বোন ক্যাথরিন। সে জীবিত আছে। রোমানিয়াতেই ছিলো। আনাস্তাসিয়ার সাথে দেখা হয়েছিলো কিছুদিন আগে। আজ ওকে নিয়ে যেতে এসেছিলো নিজের বিয়ে উপলক্ষে। ”
জোসেফ যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সে উদ্বীগ্ন স্বরে বলে উঠে,
” কিসের বোন? কিসের বিয়ে? আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি আনাস্তাসিয়াকে কেন যেতে দিলে অপরিচিত কারো সাথে? ”
” অপরিচিত কেউ নয় জোসেফ ওর আপন বোন ছিলো। আর আনাস্তাসিয়া নিজ থেকে যেতে চাইছিলো। আমি কি করে ওকে আটকাতাম? ”
জোসেফের গলা দিয়ে আর খাবার নামে না। সে চিন্তিত সুরে বলে উঠে,
” কাউন্ট যদি জানে আনাস্তাসিয়া এখানে নেই তাহলে আমি তাকে কি জবাব দিবো? ”
জোয়ান্দ্রা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” আনাস্তাসিয়ার এখানে থাকা না থাকা দিয়ে তোমার কাউন্টের কি আসে যায়? ”
জোসেফ বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,
” আসে যায়। আনাস্তাসিয়ার বেঁচে থাকার উপর কাউন্টের ভালো থাকা নির্ভর করে৷ ”

লোল্যান্ডা এবং আনাস্তাসিয়া ক্যাথরিনের কক্ষে বসে আছে। সকলেই বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সকল নেকড়েদের মুখেই হাসি ফুটে আছে। আজ এক শতাব্দী পর বাসকোভ প্রাসাদ নতুন রূপে সেজে উঠেছে। তাও কিনা তাদের আলফার বিয়ের জন্য। প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখছে না কেউ। আনাস্তাসিয়ার মনে হচ্ছে সে যেন কোনো রাজ মহলে চলে এসেছে। কিন্তু এখানে আসার পর আনাস্তাসিয়া কিছুটা নিশ্চিত হতে পেরেছে। কারণ এখানে এসে তার মোটেও মনে হচ্ছে না সে কোনো নেকড়ে পালের আস্তানায় এসেছে। সকলের ব্যবহারই বেশ অমায়িক। ক্যাথরিনকে যেন সকলে মাথায় তুলে রাখছে। আর সবথেকে ভালো লাগছে আনাস্তাসিয়ার যে জিনিসটা সেটা হলো আরোণের ক্যাথরিনের প্রতি ভালোবাসা। আরোণ যেন ক্যাথরিনকে চোখে হারাচ্ছে।

অনেক রাত পর্যন্ত আনাস্তাসিয়া এবং লোল্যান্ডা ক্যাথরিনের কক্ষে বসে গল্প করে। একটা পর্যায়ে লোল্যান্ডা এবং ক্যাথরিনের ঘুম পেয়ে গেলে যে যার কক্ষে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ে। লোল্যান্ডা নিজের কক্ষে ফিরে গেলেও আনাস্তাসিয়ার ঘুম পাচ্ছিলো না বিধায় সে প্রাসাদের সামনের আঙিনায় বেরিয়ে হাঁটতে থাকে। নিজের কক্ষের বারান্দা হতে আরোণ দেখে আনাস্তাসিয়াকে নিচে একা হাঁটতে। কিছু একটা ভেবে আরোণও নিচে নেমে আসে। আঙিনায় বের হতেই আনাস্তাসিয়ার সাথে দেখা হয়ে যায় তার। আরোণ বলে উঠে,
” আশা করি তুমি বিরক্ত হচ্ছো না। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে মাথা নেড়ে বলে,
” না আসুন সমস্যা নেই। ”

আরোণও আনাস্তাসিয়ার সাথে হাঁটা শুরু করে। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে আরোণ নিজ থেকে বলে উঠে,
” এই প্রাসাদে উপস্থিত সকলকেই আমি নিজের পরিবার মানি। আর একদিন পরে তুমিও আমার পরিবারের অংশ হয়ে যাবে অ্যানা। ক্যাথরিনের বোন হিসেবে বলছি না তবে তোমাকে আমি ছোট বোন হিসেবেই মনে করি। আর ভাই হিসেবে নিশ্চয়ই আমি কখনো তোমার খারাপ চাইবো না এটা বিশ্বাস করো? ”
আনাস্তাসিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আরোণের দিকে। সে বুঝে উঠতে পারে না আরোণ কি বলতে চাইছে। তাই চুপচাপ তাকিয়ে রয় আরোণের দিকে। আরোণ কোনো ভনিতা না করে স্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,
” গতবার যখন আমি ক্যাথরিনকে তোমার সাথে দেখা করানোর জন্য নিয়ে যাই তখন ফিরে আসার সময় আমি ক্রিয়াসকে সেখানে থেকে যেতে বলি। তোমার উপর নজর রাখার জন্য। যেন তোমার কিছু প্রয়োজন হলে সে সেখানে উপস্থিত থাকে। ”

এটুকু শুনে আনাস্তাসিয়ার গলা শুকিয়ে যায়। পা আপনা আপনি থমকে যায়। আরোণ বলে উঠে,
” তুমি রিকার্ডোকে চিনো? ”
আনাস্তাসিয়া মনে মনে যা ভাবছিলো তাই হয়। তারমানে ক্রিয়াস তাকে রিকার্ডো এবং ম্যাথিউর সাথে সেদিন দেখে ফেলেছিলো। কারণ তারপর তো আর তাদের দেখা হয় নি। আনাস্তাসিয়া স্বীকার করে,
” হ্যাঁ। ”
আরোণ প্রশ্ন করে,
” কোথায় সাক্ষাৎ হয়েছিলো তোমাদের প্রথম? ”
” মেসিডোনিয়ায়৷ ”
আরোণ এবার শেষ প্রশ্নটা করে,
” তুমি ওর প্রতি দূর্বল? ”
আনাস্তাসিয়া এই প্রশ্নের আর উত্তর দিতে পারে না। মাথা নত করে চুপ করে রয়। আরোণ জবাব বুঝে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

” তুমি জানো সে কোনো সাধারণ মানুষ নয় বরং ভ্যাম্পায়ার? ”
” হুম। ”
” তবুও? ”
আনাস্তাসিয়া এবার মাথা তুলে তাকায় আরোণের দিকে। তারপর বলে উঠে,
” আপনি যেহেতু আমাকে ছোট বোন মনে করছেন সেহেতু আপনার কাছে একটা আবদার করতে পারি আমি? ”
আরোণ মাথা নেড়ে বলে,

” অবশ্যই বলো। ”
” আমি জানি নেকড়ে এবং ভ্যাম্পায়াররা জাত শত্রু হয়। শত বছর ধরে এই শত্রুতা চলে আসছে। ঠিক সাপ এবং বেজির মতো। কিন্তু আমার জন্য আপনি কি পারবেন আপনাদের এই শত্রুতার রেশ ভুলে যেতে? কখনো রিকার্ডোর কোনো ক্ষতি না করতে? ”
আরোণ কিছু বলতে পারে না। আনাস্তাসিয়া তার কাছে বেশ কঠিন একটা জিনিস চেয়ে বসেছে। ক্যাথরিন এবং আনাস্তাসিয়ার জন্য আরোণ নিজের শত্রুতা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারবে। কিন্তু রিকার্ডো? সে কি কখনো পারবে এই কাজ করতে? আনাস্তাসিয়া আবার বলা শুরু করে,

” আপনিও তো ক্যাথরিনকে ভালোবাসেন। আপনার তো জানা কথা যে অনুভূতির উপর আমাদের কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। যাকে একবার আমরা নিজেদের মনে জায়গা দিয়ে বসি তার প্রতি অবাধ্য অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের হাতে নেই। আর সেই মানুষটার উপর কোনো বিপদ কি আমরা কখনো মেনে নিতে পারবো? আমি কেবল চাই রিকার্ডো ভালো থাকুক। আমার হোক অথবা না হোক তার ভালো থাকাটাই আমার কাম্য কেবল। ”
আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে আরোণের নিজের কথা মনে পড়ে যায়। একটা সময় সেও মনে মনে চাইতো ক্যাথরিন তার হোক অথবা না হোক অন্তত ভালো থাকুক। ভাগ্য তার প্রতি সদয় হওয়ায় আজ সেই ক্যাথরিন তার স্ত্রী হতে চলেছে। আরোণ এসব ভেবে মৃদু হেসে আনাস্তাসিয়ার মাথায় হাত রাখে। সাথে সাথেই আনাস্তাসিয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠে। সে বড় করে হেসে বলে,
” ধন্যবাদ ভাই। ”

জোসেফের বাসার দিকে দূর হতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিকার্ডো। প্রতিদিন রাতেই দেখা যায় আনাস্তাসিয়া বের হয়ে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে। কিন্তু কালকে রাত থেকে এই পর্যন্ত একবারও তার দেখা পায়নি রিকার্ডো। কপালে তার সূক্ষ্ম ভাজ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পরেই জোসেফ ফিটনের সামনে উঠে বসে জঙ্গলের ভেতর দিকে যাত্রা শুরু করে। রিকার্ডো চুপচাপ জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে যায়৷
জোসেফ আপনমনে ঘোড়ার পিঠে চাবুক চালিয়ে জঙ্গলের ভেতর হয়ে যাচ্ছে। আচমকা পথের মাঝে রিকার্ডোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তড়িঘড়ি করে ফিটন থামায় সে। রিকার্ডোকে দেখে তার কলিজার পানি শুকিয়ে এসেছে। তবুও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ধীরে ধীরে ফিটন থেকে নেমে এগিয়ে যায় সে। রিকার্ডো কোনো ভনিতা না করে প্রশ্ন করে,

” আনাস্তাসিয়া কোথায়? ”
জোসেফ বুঝে যায় যে আনাস্তাসিয়া যে বাসায় নেই তা কাউন্ট বুঝে গিয়েছে। এখন মিথ্যা বলে আরো বিপদ বাড়াতে চায় না সে। তাই মাথা নত করে ধীরে সে বলে উঠে,
” বাসায় নেই কাউন্ট। ”
রিকার্ডো সাথে সাথে জোসেফের গলা চেপে ধরে। তাকে সমতল ভূমি হতে কিছুটা উপরে তুলে ক্রোধান্বিত সুরে প্রশ্ন করে,
” কোথায় আনাস্তাসিয়া? ”
জোসেফের শ্বাস আটকে আসার উপক্রম। কোনমতে সে ছটফট করতে করতে বলে উঠে,
” সিবিউতে গিয়েছে। ”

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩৭+৩৮

সাথে সাথে রিকার্ডো জোসেফকে দূরে ছুড়ে মেরে সেখান থেকে তড়িৎ গতিতে প্রস্থান করে। জোসেফ নিচে বসে কাশতে কাশতে গলা চেপে ধরে নিজের। অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,
” ও ওর বোনের সাথে গিয়েছে। ”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে যায়। রিকার্ডো তার আগেই সেখান থেকে প্রস্থান করে।

মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪১+৪২