মহাপ্রয়াণ পর্ব ৫+৬
নাফিসা তাবাসসুম খান
নাকের কাছে বিদঘুটে একটি গন্ধে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায় ক্যাথরিন। গন্ধটায় তার মাথা কিছুটা ভারী অনুভব করে সে। একহাতে মাথা ধরে আরেক হাতের উপর ভর করে উঠে বসে সে। মার্থা তার পাশেই বসে ছিলো। সে এগিয়ে ক্যাথরিনকে উঠে বসতে সাহায্য করে। মার্থা ক্যাথরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে থাকে,
” কেন এমন করলে ক্যাথরিন? আমি তোমাকে মানা করেছিলাম। বলেছিলাম দূরে থাকতে এসব থেকে। ”
ক্যাথরিন নিশ্চুপ হয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে। মার্থা আবারও বলতে থাকে,
” ঈশ্বর রক্ষা করেছেন। কারো সাহস নেই আলফার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। যে এই স্পর্ধা করে তার মৃত্য এর থেকেও ভয়ংকর হয়। আলফা দয়া করেছে তোমার উপর। ”
” তুমি কার করুণা নিয়ে বেঁচে আছো মার্থা? ”
সাথে সাথেই মার্থার চেহারার রঙ পাল্টায়। ক্যাথরিন বুঝতে পারে সে সঠিক প্রশ্নই করেছে। আরেকটু দৃঢ় কণ্ঠে সে আবার বলে,
” তুমি খারাপ নও মার্থা এটা আমি ভালোই বুঝেছি। তুমি চাও আমার কোনো ক্ষতি না হোক। সেজন্যই প্রথম দিন থেকে আমাকে বেশ কয়েকবার অনেককিছু নিয়েই সতর্ক করেছো। কিন্তু তুমি কেন এদের দাস হয়ে এই প্রাসাদে আছো? আর তুমি যদি মানুষই হও তাহলে কেন ওরা তোমাকে জীবিত রেখেছে? কেন তোমাকে ছিড়েখুঁড়ে খাদ্যের মতো গ্রহণ করে নি? আমাকে সত্যিটা বলো মার্থা। ”
মার্থা কিছু না বলে অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে দীর্ঘশ্বাস নেয়। কিছুক্ষণ চুপ থাকে। ক্যাথরিন প্রস্তুতি নিচ্ছিল আবার কিছু বলার। কিন্তু মার্থা নিজ থেকেই বলা শুরু করে,
” আমি কোনো মানুষ নই ক্যাথরিন। আমিও একজন নেকড়ে মানবী। ”
এতটুকু শুনে চোখ বড় করে তাকায় ক্যাথরিন। কিছুটা বিস্মিত হয়ে সে প্রশ্ন করে,
” সত্যি? ”
মার্থা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। ক্যাথরিন আবার প্রশ্ন করে,
” তাহলে তুমি ওদের মতো না কেন? ”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” আজ থেকে ২২ বছর পূর্বে, ১৫৯২ সালে আমি ও আমার ভাই রোমানের আর্চি শহরের ছোট্ট একটা গ্রামে বসবাস করতাম। আর্চি শহর সিবিউ শহরের পাশেই অবস্থান করে। আমি ও আমার ভাই অনাথ ছিলাম। ছোট বেলা থেকেই আমরা আমার চাচার বাসায় থাকতাম। সেখানে যে আমাদের খুব একটা কেউ পছন্দ করতো তা নয়। তখন আমার বয়স ১৮ এবং আমার ছোট ভাইয়ের বয়স ১৩ ছিলো। আমাকে ও আমার ছোট ভাইকে আমাদের চাচা কিছু মুদ্রা লাভের আশায় দাস বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমাকে ও আমার ভাইকে আলাদা আলাদা দুজন ক্রেতা ক্রয় করে নেয়। আমি ও আমার ভাই সেখান থেকে আলাদা হয়ে যাই। আমাকে যে বণিক ক্রয় করে তিনি আমার উপর নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতন করতেন। একদিন উনার অত্যাচারের মাত্রা অতি বৃদ্ধি পাওয়ায় আমি নিজের হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে উনার মাথায় আঘাত করে বসি। আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় সেই বণিককে সেখানে ফেলেই আমি সেই বাসা থেকে পালিয়ে যাই। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছিলো।
অন্ধকারে অপরিচিত জায়গায় রাস্তা হারিয়ে ফেলি আমি। আর্চি ও সিবিউ শহরের সীমানাপ্রান্তের জঙ্গল হয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা শব্দ শুনতে পাই। শুকনো পাতা মোড়ানোর শব্দ। থেমে আমি আশেপাশে তাকিয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে থাকি। আমি মনে করি শহরের কেউ কি আমার পিছু নিয়েছে হয়তো। কিন্তু হঠাৎ একটি নেকড়ের ডাক শুনতে পেয়ে আমার ভুল ধারণা বদলে যায়। আমি ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালানোর আগেই আমার সামনে একটি নেকড়ে এসে দাঁড়ায়। ভয়ংকর গর্জন তুলে সে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে আমার পায়ে কামড় বসায়। ব্যাথায় আমি চিৎকার করে উঠি। তখনই সেখানে আরেকটা নেকড়ে আসে। সে জলদি এসে সেই নেকড়েকে সেখান থেকে সড়িয়ে মানবরূপে ফিরে আসে। আমি দেখতে পাই আমার সামনে আমার ভাই বসে আছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরে তখন দেখি এক অপরিচিত কামরায় আম। আমার ভাই আমার পাশে বসে আছে। আমি তাকে প্রশ্ন করি আমি কোথায়, তার কি হয়েছে, সে এরকম নেকড়ে রূপে কেন ছিলো। আমার প্রতুত্তরে সে আমাকে বলে এটা নেকড়ে পালদের রাজ্য। সে এখন একজন ওমেগা নেকড়ে। আর সেই নেকড়ে দ্বারা কামড়ের ফলে আমিও নেকড়েতে পরিণত হই। ”
এসব শুনে বিস্ময়ে ক্যাথরিনের মুখ হা হয়ে যায়। সে বুঝতে পারছে না কি বলা উচিত তার। মার্থা নিজ থেকেই বলে,
” আমি ওদের একজন হয়েও ওদের মতো নই ক্যাথরিন। আমি আজ পর্যন্ত কোনো মানব দেহকে খাদ্য হিসেবে গ্রহন করি নি। কাউকে হত্যা করি নি। সেটার প্রমাণ হচ্ছে আমার চোখ। কোনো ওমেগা জাতের নেকড়ে যদি কোনো মানুষকে হত্যা করে তবে তার চোখের মণির রঙ পরিবর্তন হয়ে উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ ধারণ করে। যতদিন কোনো ওমেগা নেকড়ে কোনো মানুষকে হত্যা না করবে ততদিন তার চোখের মণির রঙ সাধারণই থাকবে। ”
” তোমাদের আলফা? তার চোখের মণির রঙ রক্তিম লাল কেন? ”
” কারণ তিনি আলফা। তিনি আমাদের সবার থেকে আলাদা। উনি কত মানুষ হত্যা করেছেন তার জীবনে তার কোনো হিসেব নেই৷ এবং শক্তির দিক দিয়েও তিনি আমাদের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী। ”
মার্থা আবার বলে,
” তুমি জানতে চেয়েছিলে না যে কেন আমি এইখানে দাসত্ব করি? এটা আমার শাস্তি। আমি আর দশটা সাধারণ নেকড়ের মতো তাদের নিয়ম পালন করছি না দেখেই আমি এখানে দাস হয়ে আছি। আমিও তোমার মতো সাধারণ মানুষের আহার গ্রহণ করি। ”
এসব কিছু শুনে ক্যাথরিন থম হয়ে বসে থাকে। তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে আরোণের সেই যুবকটির বক্ষ ছেদ করে বের করে আনা হৃদপিণ্ডের দৃশ্যটি। মুহূর্তেই সে জ্বলে উঠে। মার্থার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
” সেই অসভ্য আলফা কোথায় তোমাদের? ”
” ক্যাথরিন! তোমাকে বারবার মানা করি আমি। এভাবে বলো না। আলফা শুনতে পেলে এর শাস্তি গুনতে হবে। ”
” আমি তোমাকে শেষ বারের মতো প্রশ্ন করছি মার্থা। তুমি আমাকে না বললে আমি নিজেই খুঁজে নিবো। ”
ক্যাথরিন দৃঢ় কণ্ঠে বলে। মার্থা কিছুটা ভরকে যায় ক্যাথরিনের এমন কথায়। সে জানে যদি সে না বলে ক্যাথরিন তখন নিজেই খুঁজে নিবে। সেটায় আরো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাই সে বলে দেয়,
” তোমার কামরা থেকে বের হয়ে বামপাশের দিকে তৃতীয় কামরা আলফার। ”
সাথে সাথে ক্যাথরিন বিছানা থেকে নামে। দ্রুত পায়ে বারান্দায় গিয়ে সেখান থেকে একটি মশাল এনে মোমবাতি দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে নেয়। মার্থা ভয় পেয়ে ক্যাথরিনকে প্রশ্ন করে,
” তুমি কি করতে চাচ্ছো ক্যাথরিন? কোনো ধরনের পাগলামি করো না। ”
মার্থা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে জ্বলন্ত আগুন। মশালে নয় বরং ক্যাথরিনের চোখে। মনে হচ্ছে সবাইকে ভস্ম করে দিবে। মার্থা এগিয়ে ক্যাথরিনের কাছেও যেতে পারছে না আগুনের জন্য। নেকড়েরা আগুনকে খুব ভয় পায়। আগুন থেকে যত সম্ভব দূরে থাকে তারা। আগুন তাদের জন্য এতোই ভয়ংকর যে তাদের মারার অন্যতম বড় অস্ত্র হচ্ছে আগুন। ক্যাথরিন মশাল হাতে কামরার দরজা খুলে। সাথে সাথে সামনে দেখে মানব রূপি নেকড়ে রক্ষক দরজার পাশে দাঁড়ানো। ক্যাথরিনের হাতে আগুনের মশালটি দেখে ভয়ে পথ ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। ক্যাথরিন বুঝতে পারে নেকড়েদের দূর্বলতা আছে আগুনে। মনে মনে পৈচাশিক হাসি হাসে এই ভেবে যে এই একই ভয় এখন সে আরোণের চোখেও দেখতে পাবে। সে ছুটে যায় আরোণের কামরার সামনে। এখন আর দরজায় তালা দেওয়া নেই। সে দরজার মাঝ বরাবর সজোরে লাত্থি মারতেই দরজা সম্পূর্ণ খুলে যায়। কামরার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা আরোণ ঘুরে পিছনে ফিরে ক্যাথরিনের দিকে তাকায়। ক্যাথরিনের হাতে থাকা আগুনের মাশলের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে কিছুটা পিছিয়ে যায় সে। ক্যাথরিন বলে,
” কি হয়েছে? ভয় পাচ্ছিস কেন? আয়। আমার কাছে আয় সাহস থাকলে। ”
ভয়জড়িত কণ্ঠে আরোণ বলে,
” ক্যাথ। এমন করো না। ফেলে দাও ওটা হাত থেকে। দূরে রাখো আমার থেকে। ”
বলতে বলতে পিছিয়ে যেতে থাকে আরোণ। ক্যাথরিন সামনে এক পা দু পা করে এগোতে এগোতে বলে,
” পিছিয়ে যাচ্ছিস কেন? খুব ভয় হচ্ছে এখন? না জানি কত কত মানুষের প্রাণ নিয়েছিস। তাদের চোখে এই মৃত্যু ভয়ই তো তোর খুব প্রিয় তাই না? আজকে তোর চোখে সেই একই ভয় দেখে আমি হাসবো তোর উপর। ”
আরোণ ভয়ে পিছিয়ে যেতে যেতে বারান্দায় এসে পৌঁছায়। ক্যাথরিন তার কাছে বারান্দায় আসতেই মুহূর্তেই আরোণের চেহারার রঙ বদলায়। চোখমুখ থেকে ভয়ের ভাব সড়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে রক্তিম চোখ আরো তীক্ষ্ণ করে ক্যাথরিনের দিকে তাকায়। হঠাৎ এমন পরিবর্তনে কিছুটা ভরকে যায় ক্যাথরিন। ঠিক সেই মুহূর্তে আরোণ ঝড়ের বেগে চোখের আড়াল হয়ে ক্যাথরিনের পিছনে এসে একহাতে ক্যাথরিনের গলা চেপে ধরে এবং অপর হাতে ক্যাথরিন যে হাতে মশাল ধরে ছিলো সে হাত শক্ত করে ধরে মশালটা ক্যাথরিনের মুখের সামনে এনে ধরে। নির্ভীক কণ্ঠে বলে,
” ক্যাথ! তোমার সাহস দেখে আমি মুগ্ধ। খুব দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছো। আরোণকে আগুনের ভয় দেখাতে এসেছো? উফফ বোকা ক্যাথ। ”
ক্যাথরিন কিছুটা বোকা দৃষ্টিতে বুঝার চেষ্টা করে আরোণ আগুন দেখেও কোনো ভয় পাচ্ছে না কেন? তার যতদূর মনে পড়ছে বাকি সব নেকড়ে আগুন দেখে ভয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলো। ক্যাথরিনের ভাবনার মাঝেই আরোণ আবার বলে,
” নিশ্চয়ই ভাবছো আমি তোমাকে দেখে ভয়ে তোমার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার বদলে কিভাবে তোমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছি? কিন্তু তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো যে আমি নেকড়ে পালের আলফা হই। এই সামান্য আগুন এবং তুমি কখনোই আমাকে শেষ করতে পারবে না ক্যাথ। বরং আমি চাইলে এই মুহুর্তে এই আগুন দিয়েই তোমার সুন্দর মুখ পুড়িয়ে দিতে পারি। ”
এটা বলে আরোণ মশালটা ক্যাথরিনের মুখের আরো কাছে এনে ধরে। আগুনের তাপ স্পষ্ট ক্যাথরিনের মুখে এবং চোখে এসে পড়াতে ক্যাথরিন একহাত মুখের সামনে এনে ধরে। আরোণ ক্যাথরিনের গলা থেকে হাত নামিয়ে সেই হাত দিয়ে ক্যাথরিনের মুখ আড়াল করার জন্য সামনে রাখা হাতটা ধরে পিছনে এনে মুড়িয়ে ধরে। কানের কাছে পুনরায় ফিসফিস করে বলে,
” এতটুকুই সহ্য করতে পারছো না? এখনও তো তোমাকে কষ্টের সাথে সাক্ষাৎই করাই নি আমি। ”
ক্যাথরিনের চোখ ছাপিয়ে নামে জলের ধারা। তবুও সে একটি বারও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করে না। এইযে এতো যন্ত্রণা হচ্ছে তবুও কিছু অনুভব করছে না সে। তার অনুভূতি নামক মায়াজাল হয়তো ভোতা হয়ে গিয়েছে। কিছুটা বিরক্ত হয় এতে আরোণ। নিশ্চিত এই মেয়ের আগুনের তাপে যন্ত্রণা হচ্ছে যা তার চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠছে। তবুও মুখ দিয়ে একটি রা শব্দও করছে না। অথচ আরোণ চাইছে ক্যাথরিন নিজ থেকে তাকে বলুক যে তার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই মেয়ে মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে আছে। আরোণ আগুনের মশালটা দূরে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং ধাক্কা দিয়ে ক্যাথরিনকে ঘুরিয়ে কামরার ভেতর ফেলে দেয়। কক্ষের বাহিরে অপেক্ষমাণ মার্থাকে উচ্চস্বরে ডাকে। মার্থা ক্যাথরিনের পিছু পিছু এসে কক্ষের বাহিরে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলো। ডাক পড়তেই সে মাথা নত করে ধীরগতিতে প্রবেশ করে ভিতরে।
” এই মেয়েকে নিয়ে যাও এখান থেকে। আর কখনো যদি আমার অনুমতি ব্যাতিত আমার কক্ষে প্রবেশ করে তাহলে এর শাস্তি তুমি এবং তোমার ভাই পাবে। ”
আরোণের কথা শেষ হওয়া মাত্রই মার্থা মাথা নত করে এগিয়ে এসে ক্যাথরিনকে উঠতে সাহায্য করে তাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকা। দরজার দারপ্রান্তে গিয়ে ক্যাথরিন একবার ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে আরোণের দিকে তাকায়। আরোণ ক্যাথরিনের দিকেই তাকিয়ে ছিলো এতক্ষণ। ক্যাথরিনের চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে।
গতরাতের তুষার ঝড়ের ফলে বেশ অনেকগুলো গাছ ভেঙ্গে পড়েছে গ্রামে। গ্রামের পুরুষেরা সেগুলো কেঁটে টুকরো করে সব ঘরে ঘরেই কাঠ বিতরণ করছেন। ঠান্ডার মরসুমে সব ঘরেই সন্ধ্যার পর ঘর উষ্ণ রাখার জন্য কাঠের প্রয়োজন। আনাস্তাসিয়া সকাল থেকেই বরফ পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত। অপরদিকে লিয়াম কিছুক্ষণ পরপরই বরফ ছুঁড়ে মারছে আনাস্তাসিয়ার দিকে। আনাস্তাসিয়া রাগ হয়ে বারবার লিয়ামকে ধমকাচ্ছে। তবে বেশি একটা লাভ হচ্ছেনা। লিয়াম নিজের মতোই খেলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই লিয়াম আবার ক্যাথরিনকে বরফ ছুঁড়ে দৌড়ে পালানোর সময় বরফে পিছলে পড়ে যায়। এবার আনাস্তাসিয়া কাজ ফেলে দৌড়ে এসে লিয়ামের উপর উঠে বসে তার দুহাত নিজের মুঠোর মাঝে ধরে বলে,
” বেশি বিরক্ত করছিস তুই সকাল থেকে। এখন আমিও তোর উপর থেকে উঠবো না যতক্ষণ না তুই ক্ষমা চাইবি। ”
” গ্র্যানি! অ্যানা আমাকে মারছে। ”
” এই গ্র্যানিকে ডাকছিস কেন? চুপচাপ ক্ষমা চা। নাহয় এই ঠাণ্ডা বরফের উপর শুয়ে থাক। ”
লিয়াম জ্বিভ বের করে ব্যঙ্গ করে হাসতে থাকে। আনাস্তাসিয়াও হেসে লিয়ামের পেটে কাতুকুতু দিতে দিতে বলে,
” আমি তোর খেলা ছুটাচ্ছি বরফ নিয়ে। বাঁদর কোথাকার। ”
এই বলে আনাস্তাসিয়া লিয়ামের উপর থেকে সরে বরফ ছুঁড়ে মারতে থাকে। লিয়ামও আনাস্তাসিয়াকে লক্ষ্য করে বরফ ছুঁড়ে খেলতে থাকে। অফিলিয়া বসার ঘরের জানালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখে কিছুটা স্বস্তি পায়। অবশেষে আনাস্তাসিয়ার মুখে হাসি দেখতে পেয়ে তিনি অনেকটাই চিন্তা মুক্ত হয়।
বরফ নিয়ে খেলা শেষে আনাস্তাসিয়া কক্ষে ফিরে আসে নিজের। কক্ষের এককোণে রাখা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে তার চুলের বিভিন্ন জায়গায় বরফ আঁটকে আছে। হাতের সাহায্যে এক এক করে বরফের ছোট ছোট কণা গুলো সে সড়াতে থাকে। তার মনে পড়ে যায় সে রাতের ঘটনা।
রিকার্ডো নামক সেই আগুন্তকঃ নিজের নাম বলে কিছুক্ষণ আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। এক হাত ঘোড়ার লাগাম থেকে সড়িয়ে সেই হাত নিয়ে আনাস্তাসিয়ার চুল জুড়ে বিচরণ করতে থাকে। আনাস্তাসিয়ার চুলের ভাজে ভাজে আঁটকে থাকা বরফ কণা গুলো সরিয়ে দিতে থাকে। আনাস্তাসিয়ার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। হঠাৎ ঘোড়া শব্দ করে থেমে যেতেই তার হুশ হয়। সামনে তাকাতেই দেখতে পায় জঙ্গল পাড় করে সে গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছে। রিকার্ডো বলে,
” এখান থেকে একাই যেতে পারবে আশা করছি। ”
” হু। তুমি? তুমি যাবে না? ”
” আমার পথ আলাদা। ”
এই বলেই ঘোড়ার লাগাম আনাস্তাসিয়ার হাতে ধরিয়ে রিকার্ডো নিচে নেমে পড়ে। আনাস্তাসিয়া কিছু বলার পূর্বেই রিকার্ডো বলে,
” ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ”
আনাস্তাসিয়া আর কিছু না বলে সামনে ফিরে ঘোড়া নিয়ে যেতেই নিবে সেই মূহুর্তে রিকার্ডো পিছন থেকে প্রশ্ন করে,
” তোমার নাম? ”
আনাস্তাসিয়া পিছনে ফিরে হালকা হেসে বলে,
” আনাস্তাসিয়া। ”
সবুজ নেত্রের সেই যুবকটি হালকা হাসলো বৈকি। এমনটাই ধারণা করে নিলো আনাস্তাসিয়া সেই চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে।
যতবার দুচোখের পাতা এক করছে ততবারই আনাস্তাসিয়ার মনে হচ্ছে কামরায় সে ছাড়াও অন্য কারো উপস্থিতি আছে। গ্র্যানি ও লিয়াম ঘুমিয়েছে বেশ অনেকক্ষণ আগেই। তাহলে কে আসতে পারে? এসব ভাবতে ভাবতেই দু চোখ মেলে তাকায় আনাস্তাসিয়া। না। কেউ নেই। আবার চোখ বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে আনাস্তাসিয়া। এবার কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুমে তলিয়ে যায় সে। ঘুমানোর সাথে সাথেই অন্ধকারাচ্ছন্ন কামরায় একটি ছায়ার বিচরণ দেখা যায়। ছায়াটি এগিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার পাশে বসে। কিছুটা ঝুঁকে আসে আনাস্তাসিয়ার ঘাড়ের কাছে। উষ্ণ অধর ছোঁয়ায় সেখানে। পরক্ষণেই অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,
” নাসিয়া। ”
শীত মরসুমের কারণে চারিদিকে কুয়াশাজড়ানো আভা ছড়িয়ে আছে। আকাশে সূর্যের দেখা পাওয়া বেশ দুষ্কর। অবশ্য আগামী একমাস পর্যন্ত এই শীত স্থায়ী থাকবে। তারপরই দেখা মিলবে বসন্তের। বসন্ত এলেই মেসিডোনিয়া শহরের রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। পাহাড়ের বুক ঘেসে থাকা বরফ খসে সেখানে সবুজের বিচরণ চলে। কাস্টোরিয়া গ্রামের বাজার আরো জমজমাট হয়ে উঠে। কাভালা শহরের তুলনায় এখানে জনসংখ্যা বেশি। রূপের দিক দিয়ে কাভালা শহর থাসোস দ্বীপের কারণে আরো বেশি সুন্দর দেখায়। তবে মেসিডোনিয়ার সৌন্দর্যও ভিন্নরকম সুন্দর। শীতকালে সাদা বরফে ঘেরা এই শহর ভয়ংকর সুন্দর রূপ ধারণ করে।
লেকের পাশেই এক বিশাল মাল্টা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছায়া। তার দৃষ্টি সামনে থাকা আনাস্তাসিয়ার দিকে যে আপাতত চুপচাপ লেকের পারে বসে আছে একটি পাথরের উপর। গভীর ধ্যানে কিছু একটা ভাবছে সে। বিকেল বেলা হওয়া সত্ত্বেও চারিদিকে একটা গুমোট অন্ধকার ভাব। চুপচাপ বসে থাকা আনাস্তাসিয়ার ধ্যান ভাঙ্গে হঠাৎ দূর হতে কারো অস্তিত্ব অনুভব করে। পিছনে ফিরে মাল্টা গাছটার দিকে তাকায় সে। কেউ নেই। অথচ তার স্পষ্ট মনে হচ্ছিলো কেউ একজন দূর হতে তাকে দেখছে। উঠে দাঁড়ায় আনাস্তাসিয়া। এগিয়ে যায় সে মাল্টা গাছের কাছে। কাউকে না দেখে সে ফিরে যাওয়ার জন্য পিছনে ফিরতেই আতংকে চিৎকার করে উঠে। বরফে পা পিছলে পড়ে যেতে নেয়। পড়ে যাওয়ার সময় এক মুহূর্তের জন্য আনাস্তাসিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভূমি থেকে কেবল এক হাত ব্যবধান তখনই একটি বরফের ন্যায় ঠান্ডা হাত নিজের ঘাড়ের নিচে অনুভব করে আনাস্তাসিয়া। ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকায় সে।
লম্বা হুডযুক্ত ক্লকের আড়ালে থাকা এক যুবক তাকে একহাতে ধরে রেখেছে। ঘাড়ের নিচ হতে হাতটা সড়িয়ে নিলেই আনাস্তাসিয়া আর ভূমির মাঝে থাকা এক হাত সমান ব্যবধান ঘুচে যাবে। যুবকের মুখোশ দ্বারা ঢাকা চেহারার দিকে তাকাতেই আনাস্তাসিয়ার টনক নড়ে উঠে। এই চোখজোড়া সে চিনে৷ সে তার জীবনে এই সবুজ নেত্রের মানুষ হিসেবে একজনকেই দেখেছে। সেই চন্দ্রগ্রহনের রাতে এই চোখের মালিকের সাথেই তার পরিচয় হয়েছিল। জড় পদার্থের মতো জমে যায় আনাস্তাসিয়া। সেই সবুজ নেত্র পল্লবের দিকে তাকিয়ে সম্মোহনী স্বরে বলে,
” রিক। ”
রিকার্ডো হাতের সাহায্যে ধীরে ধীরে আনাস্তাসিয়া কে সোজা করে দাঁড় করায়। আনাস্তাসিয়ার মোহিত দৃষ্টি রিকার্ডোর চোখের উপর স্থির। মৃদু বাতাস বইছে। রিকার্ডো কিছুটা গলা খাকড়ি দিতেই হুশ ফিরে আনাস্তাসিয়ার। সে কি বলেছে বুঝতে পেরেই খানিকটা লজ্জা পায়৷ নজর ঝুঁকে পড়ে।
” তুমি কি সবসময় একা বনে ঘুরে বেড়াও? ”
রিকার্ডোর প্রশ্ন শুনে তার দিকে তাকায় আনাস্তাসিয়া। প্রতুত্তরে বলে,
” হু? না। ”
এটা বলেই আনাস্তাসিয়া আবার ফেরত প্রশ্ন করে,
” তুমি মেসিডোনিয়ান? ”
” না। ”
” তাহলে মেসিডোনিয়ায় কি করছো তুমি? তাও আবার কাস্টোরিয়া গ্রামে! ”
রিকার্ডো হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাশে এক গাছের কাছে গিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,
” তুমি মেসিডোনিয়ান? ”
” উহু। ”
” তাহলে তুমি মেসিডোনিয়ায় কি করছো? তাও আবার কাস্টোরিয়া গ্রামে? ”
নিজের বোকার মতো করা প্রশ্নে লজ্জিত হয় আনাস্তাসিয়া। এগিয়ে গিয়ে পূর্ব স্থান গ্রহন করে বসে সে। হাতে একটি গাছের সরু ডাল। তা দিয়ে বরফ খুড়তে খুড়তে বলে,
” আমি আমার গ্র্যানির সাথে থাকি এখন। তিনি মেসিডোনিয়ান। ”
” আমিও কিছু কাজেই এসেছি এখানে। ”
কি কাজে এসেছে সেটা প্রশ্ন করবে ভেবেও আর কিছু প্রশ্ন করে না আনাস্তাসিয়া। পাছে আবার তাকে গায়ে পড়া স্বভাবের ভেবে বসে যদি। আড়চোখে একটু পর পর রিকার্ডোর দিকে তাকাচ্ছে আনাস্তাসিয়া। বলার জন্য আর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না সে। রিকার্ডো নিজ থেকেই বলে,
” আমার দিকে চাইলে সরাসরিই তাকাতে পারো। এতো লুকিয়ে আড়চোখে তাকানোর মতো কিছু নেই। ”
রিকার্ডোর কথা শুনে আপনাআপনি আনাস্তাসিয়ার মুখ হা হয়ে যায়। রিকার্ডোতো তার দিকে তাকিয়েও ছিলো না। তাহলে সে কিভাবে দেখলো? অবশ্য আনাস্তাসিয়া যেভাবে বারবার তাকাচ্ছিলো এতে বোঝারই কথা। আনাস্তাসিয়ার ইচ্ছে করছে এক ছুটে এখান থেকে পালিয়ে যেতে। সে উঠে এসে রিকার্ডোর সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
” আমি মোটেও তোমাকে দেখছিলাম না। ”
এই বলেই পাশ কেটে চলে যেতে নেয় আনাস্তাসিয়া। রিকার্ডো একহাতে আনাস্তাসিয়ার বাহু ধরে টেনে তাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। আকাশী রঙা গাউন ও তার ওপর ছাই রঙের লম্বা ক্লক পড়া আনাস্তাসিয়াকে আপাদমস্তক পরখ করে নেয় সে। ক্লকের হুডটা তুলে আনাস্তাসিয়ার মাথায় তুলে দিতে দিতে বলে,
” আর কখনো যেন তোমাকে এখানে সেখানে একা ঘুরতে না দেখি। ফিরে যাও। ”
” তুমি মুখোশের আড়ালে থাকো কেন সবসময়? ”
” চেহারা দেখিয়ে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন মনে করি না। ”
এই বলে রিকার্ডো চলে যেতে নিলেই আনাস্তাসিয়া ক্লকের ভেতর হতে একটি তলোয়ার বের করে রিকার্ডোর কাধে রেখে বলে,
” রহস্য আমার পছন্দ নয়। ”
রিকার্ডোর চোখে কিছুটা হাসির আভা ফুটে উঠে। সে মুহূর্তেই মাথা নিচু করে ঘুরিয়ে আনাস্তাসিয়ার পিছনে এসে তার হাতের দ্বারা সেই তলোয়ার তার গলায় ধরে ভরাট কণ্ঠে বলে,
” তলোয়ারও চালানো জানো দেখছি। তবে আরো প্রশিক্ষণ দরকার তোমার। ”
রিকার্ডোর শক্তির সাথে পেরে উঠছে না আনাস্তাসিয়া। তবুও দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
” আমার যথেষ্ট প্রশিক্ষণ আছে। ”
এটা বলেই তলোয়ারসহ ঘুরে পাশ ফিরে যায় সে। তলোয়ারের ধারে রিকার্ডোর ক্লক কেটে গা থেকে খুলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কালো ম্যাডিভাল টিউনিক শার্ট এবং ছাই রঙের ব্রীচেস প্যান্টের সাথে গলায় কালো রঙের একটি কাপড় দ্বারা অর্ধেক মুখ ঢেকে রেখেছে সে। আনাস্তাসিয়া এগিয়ে যাবে তার আগেই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে গাছের সাথে পিঠ করে দুহাত চেপে ধরে বলে,
” দুঃসাহসিক বটে তুমি। ”
এই বলে আনাস্তাসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বুঝার চেষ্টা করে রিকার্ডো। হাতের বাধন কিছুটা হালকা হয়ে আসে অন্যমনস্ক হওয়ার ফলে। আনাস্তাসিয়া সুযোগ বুঝে রিকার্ডোর গলার কালো কাপড়টা একটানে খুলে ফেলে । রিকার্ডোর সম্পূর্ণ মুখ দৃশ্যমান হয়। এক মুহূর্তের জন্য আনাস্তাসিয়া দম নিতে ভুলে গেল। তার মনে হলো তার সামনে কোনো মানুষ নয় স্বয়ং কোনো গ্রীক দেবতা দাঁড়িয়ে আছে। হতেই পারে। এমন ঐশ্বরিক সুন্দর কোনো পুরুষকে এর আগে কখনো দেখেনি আনাস্তাসিয়া। সে কোনো কবি হলে নিশ্চিত এখন এই যুবকের সৌন্দর্য নিয়ে মহাকাব্য রচনা করে ফেলতো। এই গোধূলি লগ্ন যেন রিকার্ডোর সৌন্দর্যকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। অপলক চেয়ে থেকে রিকার্ডোকে দেখতে থাকে আনাস্তাসিয়া। গৌরবর্ণের দীর্ঘদেহী, সুদর্শন যুবক আনাস্তাসিয়াকে স্তম্ভিত করে। বাদামী রঙের চুল ও সবুজ চোখের মণি বেশ মানানসই লাগছে তার উপর। রক্তিম লাল অধর জোড়া দেখে মনে হচ্ছে হালকা ছুয়ে দিলেই ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসবে। এই যুবক কি রূপকথার সেই রাণীর মতো তাজা রক্ত দিয়ে স্নান করে নাকি সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য? প্রশ্ন জাগে আনাস্তাসিয়ার মনে।
রিকার্ডো কিছুটা তার দিকে ঝুকে আসতেই চোখ বুজে নেয় আনাস্তাসিয়া।
” দৃষ্টি ও মন দুটিই তোমার আয়ত্তের বাহিরে চলে যাবে এভাবে সরাসরি তাকিয়ে থাকলে। ”
চোখ মেলে তাকায় আনাস্তাসিয়া। হুশ হয় তার। চোখ গরম করে তাকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,
” তোমার দিকে মোটেও তাকিয়ে ছিলাম না আমি। ”
এই বলে এক দৌড়ে সেখান থেকে পালায় সে। রিকার্ডো পিছন থেকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে থাকে এক কিশোরীর তার থেকে দৌড়ে পালানোর দৃশ্য। কিশোরীর হাতে রিকার্ডোর মুখ আবৃত করার সেই কালো কাপড়টা বরফ ঘেঁষেই যেন তার সাথে পালিয়ে যাচ্ছে। নিচে পড়ে থাকা তলোয়ারের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দেয় রিকার্ডো।
অন্ধকারচ্ছন্ন কক্ষে বিশাল আসনে বসে আছে আরোণ। তার সামনে এক হাটুতে ভর দিয়ে মাথা নত করে বসে আছে ক্রিয়াস।
” আলফা আমরা মেসিডোনিয়ায় সব জায়গায় খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাই নি৷ ”
” হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে? পালিয়ে যাবে কোথায়? আরোণ রদ্রিগেজের চোখ ফাঁকি দেওয়া এতোই সহজ? আকাশ পাতাল যেখানে খুশি গিয়ে পালিয়ে বেড়াক। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কতোটা ভয়ংকর হয় তা আমি ওকে বুঝিয়ে ছাড়বো। ”
পিছনেই মার্থা কক্ষে প্রবেশ করে মাথা নত করে কুশল জানায়। আরোণ প্রশ্ন করে,
” খেয়েছে সে? ”
” জ্বি না আলফা। আমি খুব চেষ্টা করেছি কিন্তু কিছু মুখে তুলছে না। সন্ধ্যার পর থেকেই জ্বরটা বেড়েই চলেছে। ”
কিছুটা ক্ষিপ্ত কণ্ঠে আরোণ বলে,
” তুমি আছো কিসের জন্য? একটা সাধারণ মেয়ের এতোটুকু খেয়াল রাখতে পারছো না? এখনো জ্বর কমাতে পারো নি। এই মেয়ের যদি কিছু হয় তুমি সহ তোমার ভাইকে দিয়ে আমি সসম্পূর্ণ পালের ভোজের আয়োজন করবো। ”
ক্রিয়াস এবং মার্থা দুজনেই কিছুটা অবাক হয়ে তাকায়। আরোণ তাদের অবাক দৃষ্টি দেখে চোখ কুচকে তাকায়। সাথে সাথে রুক্ষ কণ্ঠে আবার বলে উঠে,
” আমি এজন্যই বলছি কারণ আমি চাইনা এই সামান্য জ্বরে এই মেয়ে মারা যাক। ”
এই বলেই সেখান থেকে প্রস্থান করে আরোণ। সোজা চলে আসে ক্যাথরিনের কামরায়। অন্ধকার কামরায় এক দুটি মোমের আলোয় অন্ধকার তেমন একটা ঘুচছে না। তবুও সেই আলোয় ক্যাথরিনকে আবছা দেখতে পাচ্ছে আরোণ। নিস্তেজ শরীরটা বিছানায় গুটিয়ে আছে। চেহারায়ও খানিকটা পরিবর্তন লক্ষনীয়। প্রথমদিনের সাথে আজকের চেহারায় অসাদৃশ্য লক্ষ্য করে ক্যাথরিনের পাশে এগিয়ে বসে আরোণ। পরশুদিনের সেই আগুনের তাপে এখনো চেহারা লাল হয়ে আছে ক্যাথরিনের। আরোণ কিছুক্ষন ভনিতা করে ধীরে নিজের হাত দিয়ে ক্যাথরিনের কপাল ছুঁয়ে দেখে। সঙ্গে সঙ্গেই তার শীতল বরফের ন্যায় হাতে অগ্নিতাপ অনুভব করে। আরোণের ভ্রু জোড়ার মাঝে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ে। সে ভেবেছিলো এই মেয়ে হয়তো খুব সাহসী। কিন্তু সামান্য হৃদচ্ছেদের মতো দৃশ্য দেখেই এই মেয়ে এতোটা ভেঙে পড়বে তা আরোণ ধারণা করে নি। জাগ্রত অবস্থায় তো খুব বড় বড় কথা বলে বেড়ায় এখন কি অসহায়ের মতো পড়ে আছে ভেবে অবজ্ঞার হাসি হাসে সে।
জ্বরের ঘোরে হালকা বিড়বিড় করছে ক্যাথরিন। স্পষ্ট কিছু শোনা যাচ্ছে না। আরোণ সামান্য ঝুঁকে শোনার জন্য।
” আমি তোমাকে খুন করবো আরোণ। ”
কথাটা আরোণের কানে তীক্ষ্ণভাবে বেজে উঠে। সে দৃষ্টি স্থির করে তাকায় ক্যাথরিনের দিকে। ক্যাথরিন সামান্য নড়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। তার ফলে তার কিছু চুল ঘাড়ের কাছ থেকে সড়ে যায়। আরোণ অবাক হয়ে তাকায় ক্যাথরিনের ঘাড়ের দিকে। সে একহাতে ক্যাথরিনের মাথা কিছুটা উঁচু করে ধরে আরেক হাত দিয়ে তার চুলগুলো সব ঘাড়ের পিছনে সরিয়ে দেয়। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ক্যাথরিনের ঘাড়ে সূঁচালো দুটি দাঁতের কামরের ছাপ। এটা দেখে আবার ক্যাথরিনের চেহারার দিকে তাকায় আরোণ। ক্যাথরিনের বিবর্ণ, ফ্যাকাসে চেহারা দেখে আঁচ করতে পারে সে কিছু একটা। ভরাট কণ্ঠে সে ডাকে,
মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩+৪
” ক্যাথ। ”
ক্যাথরিন সামান্য চোখ খুলে তাকায়। সে ঘোলাটে চোখে আরোণকে দেখতে পায়। আরোণের একহাত নিজের ঘাড়ের পিছনে ও অন্য হাত নিজের গলায় অনুভব করে সে। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে,
” মারতে এসেছো? ”
আরোণের উত্তর না শুনেই চোখ বুজে ফেলে সে। আরোণ বিড়বিড় করে বলে,
” আমি ছাড়াও তোমাকে মারার জন্য অন্য শত্রু আছে। ”
