মহাপ্রয়াণ পর্ব ৬৩+৬৪
নাফিসা তাবাসসুম খান
রোমানিয়া মূলত চার ঋতু বিশিষ্ট একটি দেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত এবং শীত। আপাতত গ্রীষ্ম ঋতু চলছে। কিন্তু এই কাঠফাটা রোদের মাঝেও হুটহাট ভারী বর্ষণও হচ্ছে। অবশ্য রিকার্ডোর এতে সুবিধাও হচ্ছে। গ্রীষ্মকাল ভ্যাম্পায়ারদের জন্য শোচনীয় নয় মোটেও। সূর্যের তাপে তাদের অনেক সমস্যা হয়। ভ্যাম্পায়াররা হলো নিশি রাতের শীতল আবহাওয়ার প্রাণী। গ্রীষ্ম তাদের শরীরে সয় না। তাই প্রাসাদ থেকে কোনো প্রয়োজন ছাড়া এখন তেমন একটা বের হয় না রিকার্ডো। আর বের হলেও চোখ ব্যতীত সম্পূর্ণ শরীর ভালো করে ঢেকে বের হয় সে।
আজ রাতে প্রাসাদে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে সামিল হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন সনামধন্য ব্যক্তি এবং তাদের স্ত্রী। প্রতিবছরই এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় রাজ ভবনে। কিন্তু রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়ার জন্য এটাই প্রথমবার। ইতিমধ্যে প্রাসাদে সকল অতিথি এসে জমা হয়েছে। সকল অতিথি অপেক্ষা করছে তাদের কাউন্ট এবং কাউন্টেসের।
রিকার্ডোও সেই কখন থেকে কক্ষের বাহিরে দাঁড়িয়ে আনাস্তাসিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু আনাস্তাসিয়ার বের হওয়ার নাম নেই। রিকার্ডো সাদা টিউনিক শার্ট এবং কালো প্যান্টের সাথে রাজকীয় কালো কোট পড়েছে উপরে। চুলগুলো আঁচড়ে পরিপাটি সেজে দাঁড়িয়ে আছে সে। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেতেই সে চোখ তুলে তাকায়। দরজা দিয়ে আনাস্তাসিয়া বের হচ্ছে। হালকা সোনালী রঙের গাউন পড়েছে আজ আনাস্তাসিয়া। লম্বা খোলা চুলে পড়েছে সোনালী টিয়ারা। গলায় এবং কানেও রয়েছে একদম হালকা সোনালী গহনা। রিকার্ডোর মনে হয় আকাশ থেকে ধরণীর বুকে একটি সোনালী পরী নেমে এসেছে হয়তো। যার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে সোনালী আভা। রিকার্ডোর মনের কিনারায় হঠাৎ এক সাগর বেপরোয়া অনুভূতি হানা দেয়। এই মুহুর্তে আনাস্তাসিয়াকে তার কাছে মায়াবতী মনে হচ্ছে। মনের ইচ্ছে বুকে পুষে রিকার্ডো দু কদম এগিয়ে যায় তার দিকে। আনাস্তাসিয়া সামনে এসে দাঁড়াতেই রিকার্ডো তার একহাত নিজের হাতে নিয়ে সেই হাতের উল্টো পিঠে অধর ছোঁয়ায়। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” খুন হয়ে গেলাম। ”
আনাস্তাসিয়ার মনে পড়ে যায় তাদের বিয়ের দিনের ঘটনা। সেদিনও রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে দেখে ঠিক একই কথা বলেছিলো। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আরো বেশ কয়েকবারই রিকার্ডো একই কান্ড করেছে। প্রত্যেক বারই রিকার্ডোর কথা শুনে আনাস্তাসিয়া মনের গহীনে লজ্জাটুকু লুকিয়ে ফেলেছে। আজকেও ঠিক একই কাজ করলো। রিকার্ডো নিজ থেকেই বলে উঠে,
” তৈরি রাণী সাহেবা? ”
” জ্বি আমার কাউন্ট। ”
হাতে হাত রেখে সিঁড়ি বেয়ে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া নিচে নামতেই সকলেই তাদের মাথা নত করে সম্মান প্রদর্শন করতে থাকে। সকলের চোখই ঘুরে ফিরে আটকে আছে তাদের দিকে। আরেক জোড়া চোখেও দূর হতে তাদের দেখছে। তা আর কেউ নয় ম্যাথিউ। হাতে একটি গ্লাস তার। কিছুক্ষণ পর পর সেই গ্লাসে চুমুক বসাচ্ছে সে। এতো মাস ধরে নিজেকে এবং নিজের অনুভূতিকে যথাসম্ভব সামলে আসছে সে। আগেও সামলে চলবে। কিন্তু মাঝে মধ্যে হৃদয়ের যন্ত্রণা তাকে আকুল করে তুলে। যেমন এখন করছে। দ্রুত ম্যাথিউ চোখ ফিরিয়ে নেয় তাদের থেকে। মনে মনে নিজের মনকে শাসায়,
” আনাস্তাসিয়া কখনোই তোর জন্য ছিলো না, আর না কখনো ও তোর হবে৷ সে এখন কাউন্টেস৷ রিকার্ডোর স্ত্রী। ”
নিজেকে শাসিয়ে ম্যাথিউ আবার পিছনে ফিরে তাকায়। বিশাল হলরুমে আজ নাচের আয়োজন করা হয়েছে। সকল কপোত-কপোতী ইতিমধ্যে পিয়ানোর মৃদু মিষ্টি সুরে নাচা শুরু করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডোও আছে। আনাস্তাসিয়াকে নিজের বাহুতে আবদ্ধ করে পিয়ানোর সুরে হালকা শরীর দুলাচ্ছে রিকার্ডো। দৃষ্টি তার আনাস্তাসিয়ার দিকে বিভোর। এই দৃশ্য দেখে ম্যাথিউ হালকা হাসে। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য রমণীর দৃষ্টি তার দিকে। কিন্তু ম্যাথিউ সেদিকে তোয়াক্কা করে না। এখন আর কোনো নারীই তাকে আকর্ষিত করতে পারে না।
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ হলো। ক্লান্ত আনাস্তাসিয়া কক্ষে ফিরে এসে দেখে রিকার্ডো কক্ষে নেই। আনাস্তাসিয়া জানে এই মুহুর্তে রিকার্ডো কোথায় থাকতে পারে। একবার আয়নায় নিজেকে দেখে নেয় সে। গায়ের গয়না গুলো খুলে ফেলে সে৷ এখন ঠিক লাগছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই সে চোখ বুজে একটি লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে চোখ খুলে সেই টেনে নেওয়া শ্বাসটা ছেড়ে দেয়। রিকার্ডোর কাছে যাওয়ার জন্য কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ে। যাওয়ার আগে প্রহরীদের আদেশ দিয়ে দেয় কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করে।
গোছলখানায় পানির মধ্যে নেমে দাঁড়িয়ে আছে রিকার্ডো। পানি তার কোমর সমান। সারাদিনের শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য গোছল করা সেরা মাধ্যম তার কাছে। তাই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এখানে এসে পড়েছে সে। অর্ধ দৃশ্যমান বলিষ্ঠ দেহে বিন্দু বিন্দু পানির কণা জমে আছে।
নিঃশব্দে গোছলখানায় প্রবেশ করে আনাস্তাসিয়া। রিকার্ডো তার দিকে পিঠ করে পানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। রিকার্ডো এখনো লক্ষ্য করে নি আনাস্তাসিয়াকে। আনাস্তাসিয়ার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠে। সে নিজেও চুপচাপ পানিতে নেমে পড়ে।
আচমকা পিছন থেকে কেউ আলতোভাবে জড়িয়ে ধরতেই রিকার্ডো বলে উঠে,
” ঘুমাও নি তুমি এখনো? ”
রিকার্ডোর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
” ঘুম আসছে না। ”
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে ছাড়িয়ে পিছনে ঘুরে তাকায়। আনাস্তাসিয়াকে দেখতেই সে মুগ্ধ চোখে অনিমেষ তাকিয়ে রয়৷ রিকার্ডোর দৃষ্টিতে আনাস্তাসিয়া লজ্জা পেলেও তা লুকিয়ে ফেলে। নিজ থেকেই এক কদম এগিয়ে আসে রিকার্ডোর কাছে। দু’হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। রিকার্ডো ঘোর মেশানো স্বরে প্রশ্ন করে,
” মতলব কি তোমার? ”
” আমি জিতেছিলাম। বলেছিলে যা চাইবো দিবে। ”
রিকার্ডো হঠাৎ ঘোরের মধ্যে চলে যায়। ভুলে যায় নিজের সাথে করা নিজের প্রতিজ্ঞা। তার মনে উঁকি দিচ্ছে কিছুটা বেপরোয়া এবং বেহায়া অনুভূতি। সেই অনুভূতিতে মশগুল হয়ে সে আনাস্তাসিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে। সম্মোহনী স্বরে প্রশ্ন করে,
” কি চাই আমার নাসিয়ার? ”
” তোমাকে। ”
রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে এই ছোট শব্দটুকু উচ্চারণ করে আনাস্তাসিয়া। আরো কিছু বলতে নিবে কিন্তু তার আগেই রিকার্ডো তার ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে চুপ করিয়ে দেয়। আনাস্তাসিয়া আর কথা বলতে পারে না। চুপ করে রয় তাই। পানি এবং বাতাসে মিশে আছে ফুলের সুবাস। পানির উপর ভাসমান বিভিন্ন ফুল। আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকেই রিকার্ডো পানির উপর থেকে একটি একটি করে ফুল তুলে নিয়ে আনাস্তাসিয়ার চুলের ভাজে আটকে দিতে থাকে। আনাস্তাসিয়া চোখ বুজে রয়। চোখ নিশপিশ করছে তার। অধর জোড়া মৃদু কাপছে। বেশ আবেদনময়ী লাগছে তাকে। পিটপিট করে আনাস্তাসিয়া চোখ খুলে তাকায়। রিকার্ডো তার দিকেই গভীর নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। সেই দৃষ্টি আনাস্তাসিয়ার সর্বাঙ্গে কম্পন ধরায়৷ আনাস্তাসিয়াকে তাকিয়ে থাকার আর সুযোগ না দিয়ে রিকার্ডো তার সাথে ওষ্ঠদ্বয় মিলিয়ে দেয় গভীরভাবে। রিকার্ডোর অশান্ত শ্বাস-প্রশ্বাস স্পষ্ট টের পায় আনাস্তাসিয়া। রিকার্ডো রুদ্ধশ্বাস নিয়ে হঠাৎ বলে উঠে,
” ভালোবাসি নাসিয়া। ”
এটুকু বলেই আবার আনাস্তাসিয়ার ঘাড়ে মুখ ডোবায়৷ রিকার্ডোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে আজ। আনাস্তাসিয়ার সর্বাঙ্গ জুড়ে বয়ে বেড়ানো লাজ ভাঙতে ব্যকুল হয়ে পড়ে। ব্যকুল প্রেমিককে আরো মাতাল করে দিতে এক দমকা হাওয়া এসে হানা দেয় সমগ্র কক্ষ জুড়ে। অবাধ্য হয়ে উড়তে থাকে সকল পর্দা। নিভে যায় কক্ষে মিটিমিটি করে জ্বলমান সকল মোমবাতি। কেবল রয়ে যায় সোনালী চাঁদের অস্পষ্ট কিরণ।
মেঘেদের আড়ালে চাঁদ লুকিয়েছে। চারিদিকে অন্ধকার। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের মাথা চাপড়াচ্ছে রিকার্ডো। কালো মেঘে ছেয়ে আছে তার হৃদয়। মনে মনে শুধাচ্ছে কেবল যে এতো বড় ভুল সে কিভাবে করলো। রাগে থরথর করে শরীর কাপছে তার। কক্ষের ভেতর থেকে আনাস্তাসিয়ার গোঙানোর আওয়াজ ভেসে আসে। রিকার্ডো ধীর-স্থিরতা সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করে। বিধ্বস্ত অর্ধজ্ঞান অবস্থায় বিছানার সাথে লেপ্টে আছে আনাস্তাসিয়া। থেকে থেকে ব্যাথায় গুঙিয়ে কাঁদছে সে। রিকার্ডো আরেকটু কাছে এসে আনাস্তাসিয়ার পিছনে এসে বসে। চাদরের বাহিরে কেবল আনাস্তাসিয়ার ঘাড়, হাত, এবং পিঠ দৃশ্যমান। সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই রিকার্ডোর বুক দুমড়ে মুচড়ে উঠে। নিজেকে মনে মনে বলে উঠে,
” পশু একটা তুই। ”
আনাস্তাসিয়ার শরীরে বিভিন্ন জায়গায় কাঁটা দাগ দৃশ্যমান। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার পাশে শুয়ে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। পিঠের একটি কাঁটা জায়গায় সময় নিয়ে চুমু খায়। আনাস্তাসিয়ার এই সামান্য ছোঁয়াও সহ্য হচ্ছে না আপাতত। ব্যাথা যেন আরো কয়েক গুন বেড়ে যাচ্ছে তার। রিকার্ডো তবুও সড়ে না। ওভাবেই শুয়ে রয় আনাস্তাসিয়াকে বুকে জড়িয়ে। দোষীর মতো ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় সে তার দিকে। কখনো আনাস্তাসিয়াকে কষ্ট না দেওয়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রিকার্ডো নিজেকে মনে মনে দোষী সাব্যস্ত করে আনাস্তাসিয়ার এই কষ্টের জন্য। কিন্তু বর্তমানের তুলনায় ভবিষ্যৎ তাকে বেশি ভাবাচ্ছে। কারণ সেই ভবিষ্যতে সে সুখের কোনো ছায়া দেখতে পায় না। সেই ভবিষ্যৎ ঘন অন্ধকারের অতলে ডুবে আছে।
শেষবারের মতো আবার রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার ঘাড়ে গভীর একটা চুমু খেয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” আমাকে ক্ষমা করো নাসিয়া। তোমার কষ্টের কারণ হতে চাইনি কখনো আমি। কিন্তু বিশ্বাস রাখো আমার জন্য সম্পূর্ণ পৃথিবী একদিকে এবং তুমি আরেকদিকে। তুমি আমার জীবনের চরম সত্য। এই সত্য কোনোদিন মিথ্যে হতে দিবো না আমি। তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। ”
রিকার্ডোর কোনো কথা আনাস্তাসিয়া শুনলো কিনা বুঝা গেল না। কিন্তু এবার সে আর ব্যাথায় কাঁদলো না। উল্টো আরেকটু পিছে এসে রিকার্ডোর বুকে পিঠ এলিয়ে দিয়ে গুটিসুটি মেরে লেপ্টে রইলো।
লোল্যান্ডা এসেছে বাসকোভ প্রাসাদে ক্যামেলিয়াকে দেখতে। ক্যাথরিন মারা যাওয়ার পর এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবারই এসেছে সে এখানে। ক্যাথরিন তার খুব কাছের এবং একমাত্র বন্ধু ছিলো। যার প্রণয়ের পরিপূর্ণতা পেতে দেখে সে খুব খুশি ছিলো। মনে মনে আশার আলো ফুটেছিলো তার। ভেবেছিলো হয়তো একদিন সেও ক্রিয়াসকে পাবে। কিন্তু ক্যাথরিনের পরিণতি দেখে তার মনোবল দূর্বল হয়ে গিয়েছে। আজ শেষবারের মতো সে এই প্রাসাদে এসেছে। উদ্দেশ্য ক্রিয়াসের সাথে কথা বলা।
ক্রিয়াস এবং আরোণ প্রাসাদের বাহিরে গিয়েছে। লোল্যান্ডা ক্যামেলিয়াকে কোলে নিয়ে এতক্ষণ প্রধান দরজার সামনে হলরুম জুড়ে পায়চারি করছিলো। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেতেই সে ফিরে তাকায় দরজার দিকে। আরোণ এবং ক্রিয়াস একসাথে প্রবেশ করেছে কেবল প্রাসাদে। আরোণকে দেখতেই ক্যামেলিয়ার চেহারায় আদর ভাব ফুটে উঠে। ঠোঁট উল্টে সে বেশ আদুরে স্বরে ডাকে,
” বাব্বাহ। ”
আরোণ এগিয়ে এসে ক্যামেলিয়াকে কোলে তুলে নেয়। মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে সে শুধায়,
” জ্বি জান। ”
ক্যামেলিয়া সাথে সাথে আরোণের বুকে মাথা এলিয়ে দেয়। আরোণ আর কোনো কথা না বলে উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। ক্রিয়াসও পিছু পিছু আসতে নেয়। কিন্তু আরোণ থেমে ক্রিয়াসকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” লোল্যান্ডা হয়তো তোমার সাথে কোনো কথা বলবে। তোমার এখন আসার প্রয়োজন নেই। ”
আলফার কথা শুনে ক্রিয়াস আর এগোয়নি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আরোণ উপরে চলে যাওয়ার পর ক্রিয়াস লোল্যান্ডার দিকে ফিরে তাকায়। লোল্যান্ডা এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। ক্রিয়াসকে তাকাতে দেখে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ক্রিয়াস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,
” আমার কক্ষে চলো। ”
ক্রিয়াস চুপচাপ বসে লোল্যান্ডাকে দেখছে। নীরবতা ভেঙে সে নিজেই বলে উঠে,
” কি বলতে চাও বলে ফেলো। ”
লোল্যান্ডা এই কথার অপেক্ষাই ছিলো। সে কোনো ভনিতা না করে সাথে সাথে বলে উঠে,
” তুমি কি কখনো আমাকে ভালোবাসো নি? ”
” না। ”
ক্রিয়াসের মুখ থেকে সরাসরি না শুনে লোল্যান্ডার মুখ কালো হয়ে আসে। তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করে,
” তাহলে আমার জন্য এতকিছু করলে কেন? ”
” মায়া থেকে কেবল। ”
লোল্যান্ডার চোখে পানি জমে যায়। শব্দরা গলায় এসে দলা পাকিয়ে যায়। মুখ ফুটে সে আর কিছু বলতে পারে না। মাথা নত করে রয়। এই অবস্থা দেখে ক্রিয়াস উঠে দাঁড়ায়। লোল্যান্ডার সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
” নেকড়েদের জীবনে ভালোবাসা কেবল একবারই আসে লোল্যান্ডা। সেই একবারই তার জীবনের প্রথম এবং শেষ হয়। এই কথাটি যেমন সত্য তেমন একজন নেকড়ে এবং মানুষের ভালোবাসা অসম্ভব এটাও সত্য। কারণ এই নিয়ম প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায়। এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করলে তার ফল কখনোই ভালো হয় না। ”
লোল্যান্ডা এখনো কিছু বলছে না। চুপচাপ মাথা নত করে রয়। ক্রিয়াস নিজেই আবার বলে,
” আমার কথা বাদ দিলাম। তুমি নিশ্চয়ই আলফা এবং ক্যাথরিনকে দেখেছো? তাদের পরিণতি নিজ চোখেই দেখলে। একজন নেকড়ের জীবনে ভালোবাসা হলো অভিশাপ লোল্যান্ডা। আর এসব কিছু বুঝার পরও তোমার অযথা কোনো আশা নিয়ে অপেক্ষা করা উচিত হবে না। কারণ এই গন্তব্যের শেষে কেবল মৃত্যু ছাড়া আর কিছু পাবে না।”
লোল্যান্ডা এবার চোখ তুলে তাকায়। সাথে সাথে তার ডান গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ক্রিয়াস তা দেখেও না দেখার ভান করে। লোল্যান্ডা এবার এগিয়ে এসে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করে বসে। ক্রিয়াস কিছু বুঝে উঠার আগেই সে আবার ক্রিয়াসকে ছেড়ে এক কদম পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। হতভম্ব ক্রিয়াসকে বাকরুদ্ধ রেখে লোল্যান্ডা বলে উঠে,
” এটাই শেষবার ছিলো। আর কখনো আমার ছায়া তোমার পথ মাড়াবে না। ”
কথাটুকু শেষ করে লোল্যান্ডা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। ক্রিয়াস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,
” চলে যাও এখান থেকে। আর কখনো ফিরে এসো না। কারণ যেটাকে তুমি মায়াজাল ভাবছো তা শুধুমাত্র মৃত্যুজাল। ”
নতুন দিনের শুরু। আনাস্তাসিয়ার যখন ঘুম ভাঙে তখন প্রায় দুপুর। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই সে সম্পূর্ণ শরীরে ব্যাথা অনুভব করে। সাথে সাথে তার মস্তিষ্ক সচল হয়। ভীত দৃষ্টিতে আনাস্তাসিয়া কক্ষের চারিদিকে একবার তাকায়। উহু। রিকার্ডো কোথাও নেই। কোনো মতে বিছানা ছেড়ে নেমে আনাস্তাসিয়া আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সম্পূর্ণ শরীরে দৃশ্যমান কাঁটা দাগগুলো দেখে আনাস্তাসিয়া ভয়ে আঁতকে উঠে। নিজের জন্য নয় রিকার্ডোর জন্য ভয় করছে তার। রিকার্ডো নিশ্চয়ই এসব দেখে গিয়েছে? তার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিলো? রেগেছে খুব? নাকি নিজেকে দোষারোপ করছে?
এতসব ভাবনার মাঝেই আনাস্তাসিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে যেতে নিলেই দেখে টেবিলের উপর একটা ট্রে রাখা। আনাস্তাসিয়া এগিয়ে সেই টেবিলের কাছে গিয়ে দেখে ট্রের উপর একটা বাটি। সেটাতে ভেষজ ঔষধ জাতীয় কিছু রয়েছে। তার সাথে একটি ছোট চিরকুট রয়েছে। আনাস্তাসিয়া চিরকুটটা তুলে হাতে নিয়ে পড়া শুরু করে।
” শরীরে লাগিয়ে নিও। আর আজ তোমার কক্ষের বাহিরে আসার প্রয়োজন নেই। তোমার যা যা কাজ ছিলো তা আমি সামলে নিবো। ”
আনাস্তাসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অন্তত এতটুকু নিশ্চিত হতে পারলো যে রিকার্ডো তার উপর রেগে নেই। কারণ রেগে থাকলে নিশ্চয়ই তার জন্য চিরকুট রেখে যেত না? কিন্তু আনাস্তাসিয়ার তো আজ বাহিরে কিছু কাজ ছিলো। তারমানে রিকার্ডো কি প্রাসাদের বাহিরে গিয়েছে? আনাস্তাসিয়া একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাহিরে তাকায়। আকাশে আজ সূর্যের তপ্ততা বেশ। রিকার্ডো এই তপ্ততা থেকে বাঁচতে ঠিকঠাক শরীর ঢেকে গিয়েছে কিনা তা নিয়ে বেশ চিন্তা হয় আনাস্তাসিয়ার।
একটি পুরনো অদ্ভুৎ বাড়ির বাহিরে এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আছে জোসেফ। রাত হওয়ায় এই জায়গাটা তার বেশ ভুতুড়ে লাগছে। কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে বারবার। আবার এই বাড়ির আশেপাশে এক মাইলের মধ্যে অন্য কোনো বাড়ি নেই। থাকবে কিভাবে? এই বাড়ি যে জঙ্গলের ভেতর। কিন্তু এই মুহুর্তে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া জোসেফের কাছে অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই। কারণ কাউন্ট নিজে তাকে সাথে করে এখানে নিয়ে এসেছে। আজ থেকে কয়েকমাস আগেই রিকার্ডো নিজেই জোসেফকে রাজ প্রাসাদে একজন সেনার চাকরি দেয়। কিন্তু এই কয়েকমাসে প্রাসাদের বাহিরে রিকার্ডো তাকে কোথাও সাথে করে নিয়ে যায়নি৷ তবে আজই কেন নিয়ে এলো? এসব আকাশ কুসুম প্রশ্ন ভাবতে ভাবতে জোসেফ হঠাৎ বলে উঠে,
” ঈশ্বর। কাউন্ট কি নিজের এসব বিপদজনক কাজের সঙ্গী বানানোর জন্য আমি ছাড়া আর কাউকে চোখে দেখে না। উনি ভ্যাম্পায়ার। উনার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু আমি সাধারণ এক মানুষ। আমাকে যদি এখন কোনো ভূত এসে ঘাড় মটকে দেয় তবে আমার কি হবে? আমাকে কে বাঁচাবে? ”
এসব বলতে বলতেই জোসেফ আবার বাড়ির দরজার দিকে তাকায়। এতক্ষণ হলো এখনো রিকার্ডোর বেরোনোর নাম গন্ধ নেই। কি কারণে রিকার্ডো এখানে এসেছে তাও জানা নেই জোসেফের। তাকে কেবল বলা হয়েছে এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে সে তাই করছে।
মৃদু সংখ্যক মোম কক্ষের অন্ধকার ঘোচাতে পারে নি মোটেও। রিকার্ডো চুপচাপ চারিদিকে একবার নজর বুলিয়ে আবার সামনে বসে থাকা বৃদ্ধের দিকে তাকায়। সে টেবিলে থাকা ডায়েরিটা গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছে৷ এই ডায়েরিটা ওরিয়ন যাওয়ার আগে রিকার্ডোকে দিয়ে গিয়েছে। এবং এ-ও বলে গিয়েছে যে এই ডায়েরির প্রয়োজন পড়তে পারে তার কোনোদিন।
এতক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে থেকে কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়ে রিকার্ডো। নড়েচড়ে বসে প্রশ্ন করে,
” কিছু বুঝতে পারলেন জোতিষ্যী ফিলিক্স? ”
জোতিষ্যী ফিলিক্স চোখ তুলে তাকায় রিকার্ডোর দিকে। ভাঙা গলায় বলে উঠে,
” আপনার এই সাম্রাজ্য এবং সিংহাসন ফিরে পাওয়া আপনার জন্ম থেকেই নির্ধারিত ছিলো কাউন্ট। কেউ এটা হওয়া থেকে আটকাতে পারতো না। ”
রিকার্ডো অধৈর্য গলায় প্রশ্ন করে,
” অতীত নয় আমি বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। ”
জোতিষ্যী এবার চোখ বুজে ফেলে। হাতে থাকা কালি দ্বারা একটি সাদা কাগজে কিছু একটা আঁকে। রিকার্ডো বেশ বিরক্ত হয়। তবুও চুপ করে বসে রয়। আঁকা শেষ হতেই জোতিষ্যী চোখ মেলে সেই কাগজটার দিকে তাকায়। এবার সেই কাগজটি হাতে নিয়ে তিনি উঠে জানালার দিকে এগিয়ে যায়। হাতের কাগজের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বাহিরে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় কোনো কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না৷ জোতিষ্যী দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কিছুক্ষণ পর আকাশের একদিক থেকে মেঘ সড়ে গিয়ে কিছুটা পরিষ্কার হয়ে উঠে। সেখানে স্পষ্ট একটি তারা দেখা যাচ্ছে এখন। জোতিষ্যী ফিলিক্স সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বলে উঠে,
” মিলে যাচ্ছে৷ সব মিলে যাচ্ছে৷ ”
রিকার্ডো পিছন থেকে প্রশ্ন করে,
” কি মিলে যাচ্ছে? ”
জোতিষ্যী এবার ঘাড় ঘুরিয়ে রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে বলে,
” রাজ জোতিষ্যী ভারতানের আঁকা নক্ষত্রের সাথে আমার নক্ষত্র এবং আকাশে তারার নক্ষত্রের হিসেব খুব মিলে যাচ্ছে৷ ”
রিকার্ডো জোতিষ্যীর কথার অর্থ কিছু বুঝে না৷ সে সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,
” এই মিলে যাওয়ার অর্থ কি? ”
” যেই অভিশাপের শুরু আপনার জন্ম দিয়ে শুরু সেই অভিশাপ খুব দ্রুত কেটে যাবে৷ এবং সেই অভিশাপের ইতি কেবল আপনার হাতেই ঘটবে। যা হতে চলেছে তা হওয়া থেকে কেউ থামাতে পারবে না৷ নক্ষত্রের দ্বারা সে নিজের আগমন বাত্রার জানান দিয়েছে। এই সাম্রাজ্য কেবল আলবার্টদের দ্বারাই শাসিত হবে এখন থেকে। ”
জোতিষ্যীর বলা প্রথম কথার অর্থ ধরতে না পারলেও শেষ কথার অর্থ বেশ বুঝতে পারে রিকার্ডো। এবং বুঝতে পেরে রিকার্ডো প্রশ্ন করে,
” তার আগমন কারো অন্তের কারণ হবে না তো? ”
” যার শুরু আছে তার অন্তও আছে। কিন্তু অন্ত দিয়েই নতুন যাত্রার সূচনা হয়। ”
রিকার্ডো বিরক্ত হয়। জোতিষ্যী ফিলিক্সের উত্তর তার মনপুত হয় না৷ সে টেবিলের উপর থেকে ডায়েরিটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। পিছন থেকে জোতিষ্যী বলে উঠে,
মহাপ্রয়াণ পর্ব ৬১+৬২
” যা হওয়ার তা পরিবর্তন করার চেষ্টা করলে তা আরো দ্রুত ঘটবে। তাই যা যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দেওয়াই উত্তম। ”
রিকার্ডো আর এক মুহূর্ত সেখানে অপেক্ষা করে না। জোতিষ্যী রিকার্ডোর প্রস্থানের পানে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড়য়ে কিছু বলে উঠে।
