Home মাঝরাতের রোদ্দুর মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৩৬

মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৩৬

মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৩৬
নওরিন কবির তিশা

আজকে ফারিনদের হায়ার ম্যাথ টেস্ট। পুরো রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা,সবাই নিজেদের মতো কলমের যুদ্ধ চালাচ্ছে। শুধুমাত্র নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ফারিন। কিছুই লিখছে না নিজের মনে কি জানি ভাবছে, আর লিখবেই বা কি করে? টেস্টের আগের দিন একবার অন্তত প্র্যাকটিস তো করা উচিত কিন্তু ফারিন তো কালকে হায়ার ম্যাথ বই ছুঁয়েও দেখেনি। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই নির্ঝর খেয়াল করছে ফারিন
কিছু না লিখে জালনা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সে সবার উদ্দেশ্যে বেশ জোরেই বললো,,
—”এখানে টেস্ট চলছে যদি কারো টেস্ট দিতে ইচ্ছা করে তাহলে সে ক্লাসে থাকবে না হলে এক্ষুনি আমার ক্লাস থেকে বের হয়ে যেতে পারে”

সবাই নির্ঝরের কথা শুনে ফের লেখা লেখালেখিতে মন দিল। ফারিন নির্ঝরের কথাই শুধু একবার তার দিকে তাকালো তারপর ডোন্ট কেয়ার এমন একটা ভাব নিয়ে আবারো বাইরের দিকে তাকালো। বেশ কিছুক্ষণ পর নির্ঝর দেখল ফারিন এখনো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। এবার মেজাজ গরম হলো তার সে এগিয়ে গিয়ে ফারিন এর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,,
—”স্টান্ড আপ”
ফারিন তার দিকে তাকাল। তার চোখে প্রশ্ন। তা দেখে নির্ঝর ফের বললো,,
—”হ্যাঁ তোমাকেই বলছি স্টান্ড আপ!”
ফারিন দাঁড়িয়ে বলল,,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—”কোনো সমস্যা স্যার?”
নির্ঝর রাগী কণ্ঠে বললো,,
—”আর ইউ জোকিং উইথ মি?”
ফারিন:”ছিঃ ছিঃ স্যার কি বলেন আপনি আমার শিক্ষক আপনার সাথে আমি ইয়ার্কি কেন করব?”
নির্ঝর:”কিছু লিখছো না কেন?”
ফারিন:”কি লিখবো?”
নির্ঝর:”এখানে টেস্ট চলছে মিস ফারিন। তোমার চুপ করে বসে থাকার কারণ কি?”
ফারিন:”স্যার আমি প্রাকটিস করতে পারিনি!”
নির্ঝর:”এখানে কি কোন নাটক চলছে যে তুমি প্রাকটিস করতে পারো নি বলে টেস্ট দিতে পারবেনা এই টেস্টে এলাও না হলে কিন্তু ফাইনালে আমি তোমাকে বসতে দেবো না! নাউ ইউ গিভ মি দ্যা আন্সার প্র্যাকটিস করো নি কেন”
ফারিন চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। তা দেখে নির্ঝর রেগে গিয়ে বলল,,

—”আনসা মি..”
নির্ঝরের এমন চিৎকারে পুরো ক্লাসের সবাই লেখা বন্ধ করে তার আর ফারিনের দিকে তাকালো।ফারিন চোখ মুখ বন্ধ করে দ্রুত বলল,,
—”স্যার আমার শ্বশুরের ঠ্যাং ভেঙে গেছিল!”
নির্ঝর:”হোয়াট?”
ক্লাসের সবাই ফারিনের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পাশ থেকে একটা মেয়ে নেহাকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে বলল,,

—”মাহেরা ফারিন কি বিবাহিত?”
নেহা:”আরে না কি বলছো?”
—”কিন্তু ওই যে বললো?”
নেহা অবাক ফারিন কি সব বলছে! এদিকে ফারিন নিজেও হতভম্ব কি বলল সে! অন্যদিকে নির্ঝর অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফারিন আমতা আমতা করে বলল,,
—”না..মানে..ইয়ে..মানে..স্যার..”
নির্ঝর:”গেট আউট!”
ফারিন বোকা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,,
—”জ্বী স্যার”
নির্ঝর:”আই সে গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস! রাইট নাউ”
ফারিন আর কিছু বলতে পারল না। পুরো ক্লাস তার দিকে তাকিয়ে। কেউ কেউ মুখ চেপে হাসছে। ফারিনের এবার বেশ রাগ হলো। সে রাগে ধুপধাপ ফেলে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর

কলেজ ক্যাম্পাস থেকে কিছুটা দূরের একটা পার্কের বেঞ্চে বসে আছে ফারিন। তার বাঁ পাশে নেহা, ডান পাশে আরা বসে আছে। আর তাদের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ইমন আর রায়ান।লিসা মায়ের অসুস্থতার কারণে টেস্ট দিয়ে চলে গেছে। সবাই নিশ্চুপ হঠাৎই নীরবতা ভেঙে ইমন বললো,,
—”ভাইরে ভাই! ওইটা কি ছিল ফারু? ঠ্যাং ভেঙে গেছে তাও আবার শ্বশুরের! তুই বিয়ে কবে করলি?”
এবার নেহাও যোগ হল,,
—”হ্যাঁ ফারু ফাইজলামির একটা লিমিট থাকে স্যারের সাথে ওইভাবে কেউ কথা বলে?”
ফারিন:”আর কি করতাম এমনিতেই একটা প্যারায় আছি, তারপরে রক্তচোষাটা বারবার কানের কাছে চিল্লাছিল!”
ইমন:”তাই বলে শশুরের ঠ্যাং ভেঙে গেছে?”

ফারিন:”আরে তখন কিছু মাথায় আসতেছিল না কি বলবো?”
আরা:”এবার আমাদের তো একচুয়াল কারণটা বল। প্র্যাকটিস করিসনি কেন তুই ফাইনালে এলাও করবে না!”
ফারিন:”এটা কি কলেজের টেস্ট ছিল নাকি?এটাতো উনি ক্লাস টেস্ট নিলেন।এর জন্য যদি আমাকে ফাইনালে না বসতে দেয় তাহলে আমি প্রিন্সিপাল আঙ্কেল কে গিয়ে বলবো।”
রায়ান:”ওরে বাবা এমনিতেই তুই কিছু লিখিস নি তারপরে এত বড় গলা বাজি!”
নেহা সবাইকে থামিয়ে বলল,,

—”থামবি তোরা?আর ফারু তোর কি হয়েছে রে?কালকে রাতে দেখলাম অনেক্ষণ ধরে আংকেল-আন্টির সাথে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কি সব কথাবার্তা বললি‌।তারপর থেকেই এমন অদ্ভুত বিহেব করছিস!”
আরা:”কি হয়েছে রে ফারু খোলসা করে বলতো অ্যানি প্রবলেম?”
ফারিন:”শুধু প্রবলেম?প্রবলেমের বাপ-দাদা, ভাই-বোন সহ চৌদ্দ গুষ্টি এসে হাজির হয়েছে!”
ইমন:”মানে?”
ফারিন:”মানে..আমার বিয়ে ঠিক করেছে আমার বাবা-মা!”
—”মানে কি?”
সবাই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো।ইমন বলল,,

—”কবে,কখন,কার সাথে?কই আমায় তো কিছু বললি না।”
নেহা:”তোরে দেখতিছে আমি ওর রুমমেট তাই কিছু বলেনি।যাই হোক কার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তোর কোনো কাজিন?”
ফারিন:”আরে নাহ!আমার এরকম কোনো কাজিন নেই থাকলে তো কবেই লেখাপড়া ছেড়ে তার গলায় ঝুলে পড়তাম!কিন্তু আমি তো আর সিনেমা বা উপন্যাসের নায়িকা নই যে নায়কের মতো কাজিন থাকবে!”
নেহা:”তাহলে হুট করে আংকেল-আন্টি কার সাথে ঠিক করল?”
ফারিন:”আরে ঠিক বিয়ে ঠিক করেনি বাট বাবা বলেছেন যে ঐ ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে!নাহলে..তোরা তো আমার বাবাকে ভালো করেই চিনিস!”

নেহা:”আচ্ছা বুঝলাম তোর কোন কাজিন নেই কিন্তু হঠাৎ করে তোর বাবা কোন ছেলে ধরে আনলো তোর জন্য?”
ফারিন:”এ কোনো সাধারণ ছেলে নয় লা! কি হলো আমার বাবার পছন্দের ছেলে, ছেলে মোর বাবার পিচ্চি কালের বেস্ট ফ্রেন্ডের ছেলে তার উপর আবার বিসিএস ক্যাডার!”
ইমন হেসে বলল,,
—”সিরিয়াসলি ফারু এই সময় তোর মজার মুড আছে!”
ফারিন:”মুড থাকবে না মানে! আম অলয়েজ কুল ব্রো!”
ইমন:”তা একটু আগে অমন ঢং করতে ছিলি কেন এমন ভাব দেখাচ্ছিলি যেন বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এই টেনশনেই তুই ম্যাথ করতে পারিস নি আর টেস্ট দিতে পারিস নি!”
ফারিন:”টেনশন তো একটু হচ্ছেই চিনি না জানি না কার না কার সাথে বিয়ে ঠিক করেছে! আর সবচেয়ে বড় কথা আমার এখন বিয়ে করার একদম মুড নেই!”

নেহা:”বিয়ে করার জন্য আবার মুডের প্রয়োজন হয়?”
ফারিন:”অফকোর্স বেবি! মুড না থাকলে দেখা গেল আমি সাজুগুজু করলেও ছবি ভালো উঠলো না! আমি তো বিয়ে করবো মূলত ছবি তোলার জন্য বুঝিস না!”
ইমন:”আসলেও ফারু তোর বরের কপাল খারাপ আছে!”
ফারিন:” সেসব বাদ দে এখন বল কি করে গেলে বিয়েটা ভেঙেও যাবে আর আমার দোষও হবে না?”
ইমন:”তোর নিজের মাথায়ই তো সারাক্ষণ উদ্ভট চিন্তাভাবনারা ঘোরাঘুরি করে এখন আবার আমাদের হেল্প নিচ্ছিস কেন?”
ফারিন:”কালকে রাত্রে অনেক ভেবেছি এটা একটাও যুক্তিযত মনে হচ্ছে না!”
নেহা:”কি কি ভাবলি?”
ফারিন:”এই ধরনের সামনে খুরিয়ে হাটা টেয়ারা হয়ে যাওয়া অথবা তুতলিয়ে কথা বলা!”
সবাই একযোগে হেসে উঠলো। রায়ান নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল,,

—”বুদ্ধিগুলো ভালো কিন্তু এগুলো পুরাতন হয়ে গেছে!”
ইমন:”ঠিক ঠিক!”
ফারিন:”তাহলে তোরাই কিছু বুদ্ধি দে না!”
তারা কথা বলতে বলতে হঠাৎই ফারিন এর ফোন বেজে উঠলো। সরি স্কিনে তাকিয়ে দেখলো তার মা কল দিচ্ছে। প্রথমে রিসিভ না করলেও বারবার ফোন আসার কারণে শেষমেষ সে রিসিভ করল।
ফারিন:”হ্যালো আম্মু”
ফাহমিদা আনম:”কোথায় তুই?”
ফারিন:”আম্মু এই তো কলেজে!”
ফাহমিদা আনম:”তোকে না কালকে রাতে বললাম আজকে কলেজে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বাসায় আয় বিকালে আঙ্কেল আন্টিরা আসবে।”
ফারিন:”কিন্তু আম্মু..”

ফাহমিদা আনম:”কিন্তু কি ফারু? আগামী ২ ঘন্টার ভিতরে তোকে আমি বাসায় দেখতে চাই। তোর আব্বু তো তোকে কিছু বলবে না আমার সাথে রাগারাগি করছে ভালো করে জানিস তোর আব্বু কি পরিমাণ তিরিক্ষি মেজাজের!”
ফারিন:”আচ্ছা তুমি রাখো আমি আসছি।”
আরা:”দোস্ত যাই হোক ছেলে কিন্তু নির্ঝর স্যারের মতো হ্যান্ডসাম হওয়া চাই!”
ফারিন রেগে গিয়ে বলল,,
—”চুলায় যাক তোদের নির্ঝর স্যার। আমি মরতেছি আমার জ্বালায়!”
তারপর নেহার দিকে ফিরে বলল,,
—”তুই কি আসবি নাকি থাকবি? আমি কিন্তু বাসা থেকে ডাইরেক্ট ডুমুরিয়া যাব।”
নেহার সাথে সাথে ইমন আর রায়ানও বললো,,
—”হ্যাঁ আসছি!”

রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে শিশির পা বাড়ালো আনায়াদের ধূসর দুই তলা বিল্ডিং এর দিকে। কলিংবেল বাঁজাতেই বের হয়ে আসলেন আনায়ার আম্মু। আগে হলে ইনায়া আসতো কিন্তু রিসেন্ট বিয়ে হওয়ার কারণে সে এখন শ্বশুর বাড়ি আছে। আনায়ার আম্মু শিশিরকে দেখে স্নিগ্ধ হেসে জড়িয়ে ধরলেন। শিশির মুচকি হেসে বলল,,
—”কেমন আছেন আন্টি?”
—”আলহামদুলিল্লাহ ভালো কিন্তু এই তোর আসার সময় হলো?”
শিশির:”না আসলে আমরা তিন দিন হচ্ছে সুইজারল্যান্ড থেকে এসেছি তার উপর আবার বাসায় লোকজন ছিলো এজন্য আসতে পারিনি।”
তাকে ভিতরে এনে বসতে দিতে দিতে বললেন,,
—”তুই একটু বস আমি শরবত বানিয়ে নিয়ে আসি। তুই আসবি জানলে আমি তোর ফেভরিট নুডুলস বানাতাম।”
শিশির:”না না আন্টি কিছু লাগবে না আপনি ব্যস্ত হবেন না! শুধু বলুন আনায়া কোথায় ও আজকে ভার্সিটি যাইনি?”
আনায়ার কিছু না শুধু যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালেন। শিশিরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,,
—”আজকে নাকি ভার্সিটির ক্লাস নেই? ওতো সকাল থেকে দরজা খোলে নি কালকে রাতে বলেছিল যে আজকে ক্লাস নেই যাবেনা ভার্সিটি”
শিশির কিছুটা অবাক হয়ে বলল,,

—”কি আন্টি ও বাইরে আসেনি?আমার ফোনটা তো ধরছেনা আন্টি ও রুমে আছে না?”
আনায়ার আম্মু:”হ্যাঁ ও তো রুমেই সকাল থেকে বের হয়নি!”
—”আচ্ছা আন্টি”
শিশির কথাটি বলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। আনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দুই তিনবার নক করলো কিন্তু ভিতরে থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। এবার শিশির বেশ চিন্তিত গলায় বলল,,
—”আয়ু বেবি দরজাটা খোল!”
বেশ কিছুক্ষণ বাদে আনায়া দরজা খুলল। তার চোখ গুলো ফুলে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো, ওড়নাটা কোনরকম বুকের উপর দেওয়া। কেমন অগোছালো লাগছে তাকে কিন্তু সে তো এরকম অগোছালো থাকে না। শিশির বেশ উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

—”কি হয়েছে জান তোর? ফোন ধরছিলি না কেন? আর কালকে রিদিত ভাইয়ের সাথে কি কথাবার্তা হলো? কি এমন কথা বলছিলি তোরা তারপর থেকে রিদিত ভাইকেও ফোনে পাচ্ছি না তোকেও না?”
আনায়া রিদিতের নাম শুনে বেশ রেগে গিয়ে বলল,,
—”একদম আমার সামনে ওই লোকের নাম নিবি না! কি মনে করে কেউ নিয়ে নিজেকে কোন সিনেমার হিরো? আমি কি আমাকে বলেছিলাম ওর পিছনে ঘুরঘুর করতে কেন করছিলেন আমার পেছনে ঘুরঘুর? আর এখন কেনঝ ছেড়ে চলে গেছে হ্যাঁ?কেন কালকে আমাকে অত কঠিন কঠিন কথা শোনালো?”
আনায়ার চোখ ফেটে গড়িয়ে পরলো নোনা জল। তাকে এমন অস্থির কন্ঠে কথা বলতে শুনে শিশির তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে বলল,,

—”কি হয়েছে জান এরকম করছিস কেন মিস করছিস রিদিত ভাইকে? ফোন দিবো?”
আনায়া ফুঁপিয়ে উঠে বলল,,
—”না একদম ফোন দিবি না ওনাকে, উনি যতক্ষণ নিজে থেকে ফোন দিবে ওনার কাছে একদম ফোন দিবি না!”
শিশির এবার তাকে বুক থেকে তুলে মুচকি হেসে বলল,,
—”দেখছিস ওনার একদিনের ইগনোর করা তোর সহ্য হচ্ছে না আর তুই কিভাবে দিনের পর দিন ওনাকে ইগনোর করেছিস? তুই ভালোবেসে ফেলেছিস ওনাকে আয়ু। you are in love!”
আনায়া:”ওসব লাভ-টাভ কিছু না? শুধু ওনার ইগনোর করাটা আমি মেনে নিতে পারছি না উনি কেন কালকে এভাবে আমার সাথে ওভাবে কথা বলল?”

শিশির:”এটাই তো ভালোবাসা বলে রে পাগলি! ওনার সামান্য কিছু কথায় তুই এত কষ্ট পাচ্ছি একবার ভাব অন্য কেউ তোকে এরকম করে বললে তুই কষ্ট পেতিস অন্য কোনো ছেলে যদি বলতো নিশ্চয়ই না?”
আনায়া মনে মনে ভাবলেও সত্যিই তো অন্য কেউ যদি তাকে বলতো ইনফ্যাক্ট অন্য কোন ছেলে বললেও তো তার এত কষ্ট লাগত না কিন্তু রিদিত? তাহলে কি সে ভিন্ন? আসলেও কি সে দ্বিতীয়বার কারো প্রেমে পড়েছে?না না কোনদিনই না। সে নিজেই নিজেকে শান্ত করে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,,
—”তা তুই এত কিছু কোথা থেকে জানলি তুই কি কারো প্রেমে পড়েছিস নাকি?”

শিশির কিছুটা চুপসে গেল। আসলেও কি নাহিয়ানের প্রতি তার যে অনুভূতি সেটা কি ভালোবাসা নাকি শুধুই ভালোলাগা? ভালোবাসা একটা দীর্ঘস্থায়ী জিনিস আর ভালো লাগাটা ক্ষণিকের। তাহলে শিশিরেরটা কি দীর্ঘস্থায়ী নাকি ক্ষণিকের। ব্যাপারটা একবার ঝালাই করে নিলে মন্দ হয় না, সে নাহিয়ানের থেকে কিছুদিন দূরে থাকবে তাহলেই বুঝবে এটা ভালোলাগা না ভালোবাসা! কিন্তু নাহিয়ান যে মানুষ সে নাতো নিজেকে শিশিরের থেকে দূরে রাখবে আর নাতো শিশিরকে তার থেকে দূরে যেতে দেবে। শিশিরকে এমন ভাবনার গহীনে তলিয়ে যেতে দেখে আনায়া সামান্য ধাক্কা দিয়ে বলল,,

—”কিরে বল কিছু..”
হঠাৎই আনায়া লক্ষ্য করল শিশিরের গলার কাছে গোল করে লাল হয়ে যাওয়া একটা দাগ। মনে হচ্ছে সেখানে কিছু বেশ জোরে কামড় দিয়েছে। আনায়া চিন্তিত সাথে অবাক কণ্ঠে শুধালো,,
—”বেবি তোর গলায় কি হয়েছে রে?”
শিশির কিছুটা ভড়কে গেল। মনে পড়ে গেল কালকে রাতের কথা যখন নাহিয়ান তার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়েছিল তারপর…. সে লজ্জায় লাল হয়ে গেল অন্যদিকে আনায়া বেশ উদ্বিগ্ন সে বলল,,
—”মনে তো হচ্ছে বিষাক্ত কিছুতে কামড়িয়েছে তুই বস আমি মলমটা নিয়ে আসি!”
শিশির তার হাত টেনে ধরে বলল,,

—”লাগবে না তুই বস!”
আনায়া:”লাগবে না মানে এখান থেকে ইনফ্রাকশন হয়ে যেতে পারে!”
কথাটা বলেই আনায়া একটা মলম এনে সযত্নে শিশিরের গলায় লাগিয়ে দিতে যেতে বলল,,
—”তা বললি নাতো কিসে কামড়িয়েছে?”
শিশির আমতা আমতা করে বলল,,
—”মনে হয় কোনো বিষাক্ত পোকায় কিন্তু আমি টের পাইনি জানিস!”
আনায়া দুষ্টু হেসে বলল,,
—”আমার তো মনে হচ্ছে কোন প্রাপ্তবয়স্ক হ্যান্ডসাম ড্যাসিং পোকায় কামড়িয়েছে!”
শিশির অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,,

—”মানে?”
আনায়া হেসে বলল,,
—”আর নাটক করতে হবে না পিও। আমি সবটা জানি এখন বল তোরা বাড়ির সবাই কে কবে বলছিস? আর আমাদের বিয়ের দাওয়াত কবে খাওয়াচ্ছিস?”
শিশির:”দোস্ত দেখ তুই যা ভাবছিস একদম এরকম না উনি আমাকে জোর করে..”
আনায়া:”আমি সবটা জানি শুধু অপেক্ষা করছিলাম তোর মুখ থেকে শোনার জন্য কিন্তু তুই তো বললি না তাই আমি বললাম..”
শিশির:”আমি তোকে বলতামই কিন্তু..”

আনায়া:”থাক আর কিন্তু কিন্তু করতে হবে না এখন বল বাড়ি কবে জানাচ্ছিস?”
শিশির:”আমি কেন জানাবো আমি কি ওনাকে জোর করে বিয়ে করছে নাকি উনি আমাকে জোর করে বিয়ে করছে উনাকেই জানাতে হবে!”
আনায়া হেসে উঠলো। দুই বান্ধবীর কথোপকথন, আর গল্প গুজবে কেটে গেল বেশ কিছু সময়।

দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। শিশির চলে যাওয়ার জন্য বাসার বাইরে আসতে দেখতে পায় রাস্তার সাইডেই বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল চাপছে নাহিয়ান। আনায়া নাহিয়ান কে দেখে মুচকি হেসে বলে,,
—”তোমার হ্যান্ডসাম পোকা চলে এসেছে যাও তাহলে এখন তো আর আমার প্রয়োজন নেই!”
শিশির কিছুটা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে,,
—”আয়ু”
আনায়া মুচকি হেসে তাকে বিদায় জানিয়ে ভিতরে চলে যায়। সে চলে যেতেই শিশির নাহিয়ানের দিকে এগিয়ে এসে বলে,,
—”আপনি এখানে? আর এই গরমের ভেতরে হেলমেট মাথায় দিয়ে রেখেছেন কেন?”
নাহিয়ান দুষ্টু হেসে বলল,,

—”কি আর করব বলুন আমার একটা জেলাস বউ আছে সে আবার যদি কোনো কোন মেয়ে আমায় দেখে তাহলে তার কলিজা ভুনা করে খেতে চায় তাই আর কি করার নিজেই মুখ ঢেকে ঘুরে বেড়াচ্ছি না হলে যদি আমার বউটা যদি আবার খুনটুন করে বসে তাহলে তো সে জেলে চলে যাবে আর বউ ছাড়া থাকা তো আমার পক্ষে সম্ভব না এজন্য!”
শিশির বুঝতে পারল নাহিয়ান কথাগুলো কেন বলছে সে কিছুটা রেগে গিয়ে বলল,,
—”আপনি কি নিজেকে শাহরুখ খান মনে করেন যে মেয়েরা আপনাকে দেখেই ক্রাশ খাবে?”
নাহিয়ান:”কি জানি কিন্তু আমার বউয়ের চোখে আমি আবার অনেক সুন্দর তো এই জন্য!”
শিশির:”তাহলে আপনার বউয়ের চোখে সমস্যা! ডাক্তার দেখান!”
নাহিয়ান বাইকে বসতে বসতে বলল,,

—”হবে হয়তো! তা ম্যাম আপনি কি বসবেন নাকি রোদের ভিতর দাঁড়িয়ে ঝগড়া করবেন?”
শিশির:”তারমানে আপনি কি আমাকে ঝগড়ুটে বলতে চাচ্ছেন?”
নাহিয়ান:”না না ম্যাম কি যে বলেন আপনি কেন ঝগড়াটে হতে যাবেন আপনি তো আসমানের পরী!”
শিশির:”ফ্ল্যাট করছেন?”
নাহিয়ান:”তা একপ্রকার”
শিশির:”আপনার না ঘরে বউ আছে?”
নাহিয়ান:”আপনারও তো হাজবেন্ড আছে!”
শিশির কিছুটা দুষ্টুমি করে বলল,,
—”আমি কি একবারও বলেছি আমার হাজবেন্ড আছে?আমি সিঙ্গেল!”
নাহিয়ান:”তাই নাকি?”
শিশির:”হুম”

নাহিয়ান:”কিন্তু আমার কেন জানি মনে হল আপনি ম্যারিড!”
শিশির:”কেন আপনি আমার সাথে ম্যারিডের কোন সাইন দেখলেন যে মনে হলো আমি ম্যারিড?”
নাহিয়ান:”ও আচ্ছা তাহলে বাসায় চলুন আজকে থেকে আপনার কাছে অতি দ্রুত যাতে ম্যারিডের সবচেয়ে বড় সাইন চলে আসে সেই ব্যবস্থা করব!”
শিশির:”কি ব্যবস্থা?”
নাহিয়ান:”নোশি কে আনার ব্যবস্থা!”
শিশির বেশ অবাক হয়ে বলল,,
শিশির:”নোশি কে?”
নাহিয়ান কোনরকম ভনিতা না দেখিয়ে স্পষ্টভাবে বলল,,
—”আপনার আর আমার ভবিষ্যৎ প্রিন্সেস!”
শিশির এবার বেশ লজ্জা পেলে। এই লোকটাও না লাগামহীন একেবারে কখন যে কি বলে বসে। সে আর কিছু না বলে বাইকের পিছনে উঠে বসলো। নাহিয়ান মুচকি হেসে বাইক স্টার্ট দিল।

বাইক চলছে ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক দিয়ে। হঠাৎই শিশির বলল,,
—”আপনি কি করে জানলেন আমি আনায়াদের বাসায়?”
নাহিয়ান:”আমি ফার্স্টে আপনাদের ভার্সিটিতে গেছিলাম সেখান থেকে জানতে পারি আপনি ক্লাস মিস করে বান্ধবীর বাসায় এসে গল্প করছেন!”
শিশির:”একদমই ক্লাস মিস করিনি বাকি যেগুলো ইম্পোর্টেন্ট না মানে আই থিংক আর কি যে ইম্পর্টেন্ট নয় আমার জন্য। বাই দ্যা ওয়ে আপনাকে কে বলল আমি আনায়াদের বাসায়?আশা!”
নাহিয়ান:”ওরে বাবা না! একদমই না, ওই মেয়ে তো আমার ত্রিসীমানাও আসেনি। সজন না কে একটা আছে না ও বলল!”
শিশির:”ও আচ্ছা!”
কিন্তু পরক্ষণেই কি একটা ভেবে চোখ সরু করে বলল,,

—”কেন আশা আপনার কাছে আসেনি বলে কি আপনার কষ্ট হচ্ছিল”
নাহিয়ান এক হাত দিয়ে বাইক হ্যান্ডেল করতে করতে অন্য হাত শিশিরের হাতের উপর রেখে বলল,,
—”আপনার কি মনে হয়?”
নাহিয়ানের এমন হঠাৎ স্পর্শে শিশির খানিকটা কেঁপে উঠল তারপর দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিতে বলল,,
—”ক-ক-কিছু না”
নাহিয়ান শিশিরকে এমন লজ্জা পেতে দেখে মুচকি হাসলো। সে হাত ছাড়লো না বরং আরো শক্ত করে ধরল।
বাইক চলছে…. কিন্তু শিশিরের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে আরও কিছু প্রশ্ন। সেটা শোনার জন্য নাহিয়ানকে দাঁত দিয়ে ভাবছে কিন্তু কি বলে ডাকবে প্রত্যেকবারই কি শুনুন,এই যে,ওই যে, এভাবে সম্বোধন করা ঠিক? আগে তো তাও নাহিন ভাই বলে ডাকত কিন্তু এখন কি বলবে? যাইহোক সে বুকে কিছু সাহসের সঞ্চয় করে আস্তে করে ডাকলো,,

—”নাহিন ভাই!”
সাথে সাথে নাহিয়ান বাইকে ব্রেক বসলো শিশির এসে পরল নাহিয়ানের পিঠের ওপর। সে ভড়কে গিয়ে প্রশ্ন করল,,
—”কি হলো?”
নাহিয়ান:”আমি তোর কোন দিকের ভাই লাগি হ্যাঁ? তুই আমাকে ভাই বলছিস তাহলে নোশি কি আমাকে মামা বলে ডাকবে?”
এই লোকটাকে বোঝা যায় না কখন যে হুট করে রেগে যায়! শিশির তো শুধু নাহিন ভাই ই বলেছে তাতেই এত রাগ! সে আমতা আমতা করে বলল,,
—”তাছাড়া আর কি বলব প্রত্যেকবার কি এই যে,ওই যে বলতে ভালো লাগে?”
নাহিয়ান:”কে বলেছে যে ওই যে বলতে আমাকে নোশির পাপা বলে ডাকবি!”
শিশির কিছুটা লজ্জা পেলও পরক্ষণে মাথা নিচু করে আস্তে বলল,,

—”আচ্ছা!”
নাহিয়ান:”কি আচ্ছা!”
শিশির:”এখন থেকে নোশির পাপা বলে ডাকবো!”
নাহিয়ান:”এক্ষুনি একবার ডাক!”
শিশির অবাক হলো এখনই! নাহিয়ান আবার বলল
—”কি হলো?”
শিশির:”পারবোনা!”
নাহিয়ান:”কেন?”
শিশির:”আমার লজ্জা করে!”

নাহিয়ান:”ওরে আমার লজ্জাবতি লতা পাতা যখন নিজের বরকে ভাই বলো তখন তোমার লজ্জা কোথায় যায়? এক্ষুনি একবার না বললে আমি এখান থেকে বাইকই সরাবো না!”
শিশির ভালো করে তাকিয়ে দেখল আশেপাশে অনেক গাড়ি। আর এটা পার্কিং এরিয়াও না।এক্ষুনি ট্রাফিক পুলিশে সবার সামনে হ্যারাস করবে তাদের। সে দ্রুত নাহিয়ান কে বলল,,
—”এখান থেকে চলুন প্লিজ!”
কিন্তু নাহিয়ানও নাছোড়বান্দা। সে একগুঁয়েমির স্বরে বলল,,
—”আগে আমি যা বললাম সেটা করতে হবে!”
শিশির আর উপায়ন্তু না পেয়ে চোখ বন্ধ করে দ্রুত বলল,,
—”নোশির পাপা!”
নাহিয়ান:”এভাবে নয় একটু রোমান্টিক ভাবে বলো,,
‘নোশির বাবা চলো’!”
শিশিরের এবার বেশ রাগ হচ্ছে। রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে কিসব ? কিন্তু কি আর করার নাহিয়ানও নাছোড়বান্দা তাই শিশির নিজেকে শান্ত রেখে বলল,,

—”নোশির পাপা চলুন”
নাহিয়ান:”চলুন না চলো!”
শিশির নাক মুখ শিটকে বলল,,
—”নোশির পাপা চলো”
নাহিয়ান:”আহা ডার্লিং, পুরো হৃদপিণ্ডে গিয়ে লাগলো!”
শিশির মনে মনে বলল,,
—”কিডনি লিভার কলিজা যকৃত অগ্ন্যাশয় সবকিছুতে লাগবে সবকিছুতে লাগবে শুধু একবার বাড়িতে চলো!”

পশ্চিম আকাশে সূর্য প্রায় অস্তমিত। গোধূলি লগ্নের আলোয় লাল হয়ে এসেছে চারিপাশ। গাড়ি এসে থামল একটি দুই তলা ভবনের সামনে। সামনের সিটে ড্রাইভার এর সাথে বসে আছেন ইমরান চৌধুরী, আজ খুবই উৎফুল্ল তিনি কতদিন পর নিজের পুরাতন বন্ধুর বাসায় এসেছেন তাকে দেওয়া ছোটবেলার কথা রাখতে। অন্যদিকে গাড়ির ব্যাক সিটে বসে আছেন হাসনা চৌধুরী নিঝুম আর নির্ঝর।হাসনা চৌধুরীর মুখটা মলিন তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলের জীবনে ফারিনের মত কেউ আসুক। কিন্তু..পাশেই নিঝুম বসা চারিপাশে সৌন্দর্য উপভোগ করছে সে, ডান সাইডে নির্ঝর মোবাইলে কি একটা কাজ করছে। গাড়ি থামায় ইমরান চৌধুরী সবার উদ্দেশ্যে বললেন,,

—”চলে এসেছি নামো সবাই!”
তার কণ্ঠে যেন আবেগ ঝরে পড়ছে। নির্ঝর ফোন থেকে মুখ তুলে চোখে মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাইরে তাকালো। এখানে আসার কোন রকম ইচ্ছা ছিল না তার। মেয়ে কি কোন পন্য না কি যে দেখতে আসতে হবে। বাবা মার পছন্দ নাই তো তার পছন্দ‌। কিন্তু তাকে এখানে নাকি মানে সে বুঝতে পারল না। সে তো আসতেই চাইনি, বাবার আদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। গাড়ি থেকে নামতেই নির্ঝরের দেখা হল ইমদাদের সাথে। ইমদাদ নির্ঝর কে দেখে জড়িয়ে ধরে বলল,,
—”কি ব্যাপার দোস্ত তুই এখানে?”
নির্ঝর:”আরে কতদিন পর দেখা কি অবস্থা তোর?”
ইমদাদ:”আর অবস্থা তুই তো বিসিএসে টিকে গেলি আমার তো.. সেসব বাদ দে তুই এখানে কি করছিস?”
তখন পিছন থেকে ইমরান চৌধুরী বলল,,

—”নির্ঝর দ্রুত এসো!”
নির্ঝর:”তোমরা যেটা লাগো বাবা আসছি!”
ইমরান চৌধুরী বললেন,,
—”দ্রুত এসো। না জানি মেয়েটা কতক্ষণ ধরে ওয়েট করে বসে আছে”
কথাটা বলেই তিনি হাসনা চৌধুরী নিঝুম আর ড্রাইভারকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন। তাদেরকে দেখে ইমদাদ বলল,,
—”বাই এনি চান্স তুই কি মেয়ে দেখতে এসেছিস?”
নির্ঝর:”হুম”
ইমদাদ:”পুতুলকে?”
নির্ঝর:”আমি অত নামটাম জানি নাকি বাবা বাবা বলেছে তাই এসেছি”
ইমদাদ:”তুই সেই খাইসটা,খাইসটাই থেকে গেলি! যাই হোক যদি পুতুলকে দেখতে আসিস তাহলে তো এলাকায় শোকবার্তা ছেপে যাবে!”
নির্ঝর:”মানে?”
ইমদাদ:”পুতুল যে এই এলাকার কতগুলো ছেলের ক্রাশ তারই মনে হয় হিসাব নেই। কিন্তু ডোন্ট ওয়ারী ওই মেয়ে কাউকে পাত্তা দেয় না! বরং যে লেভেলের টাইট তাই আল্লাহ, যাইহোক তুই যা। দেরি হয়ে যাচ্ছে আবার”
এদিকে…

এক মাথা ঘোমটা দিয়ে হাতে একটা ট্রেতে কিছু ফল আর শরবত নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করেছে ফারিন। ইচ্ছা তো করছে এক্ষুনি ট্রেটা ফ্লোরে আচার মেরে ভেঙে ফেলতে।। কিন্তু কি আর করার সামনেই তার বাবা-মা বসে আছে। এখনই হঠাৎ একটা অপরিচিত পুরুষালীর কন্ঠ,,
—”মা ঘোমটাকে একটু সরাও তো!”
ফারিনের ইচ্ছা করছে ট্রেটা দিয়ে লোকটার মাথায় এক বাড়ি দিয়ে বলতে,,
—”বেডা ছবি দেখে আসিস নি। এখন আবার ঘোমটা তুলে দেখাতে হবে, একটু পরে বলবি একটু হেটে দেখাও তারপরে চুলটা মেলে দেখো কেন রে ভাই আমি কি বাজারের পণ্য?”
কথাগুলো বলার কাছে এসে আটকে গেল তার। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এই লোকটা তার বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড কিছুই বলতে পারবে না সে আলতো হাতে ঘোমটা টা সরালো সে। তখনই ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল নির্ঝর। চোখাচোখে হতেই দুজনে বেশ অবাক হলো।

নির্ঝর:”তুমি?”
ফারিন:”আপনি?”
নির্ঝর:”পাত্রী কি তুমি?”
ফারিন:”পাত্র কি আপনি?”
এবার দুইজনই একসাথে বলল,,
—”ওহ শিট এই বিয়ে ক্যানসেল!”
ফারিনের কন্ঠে তার দিকে চমকে তাকালেন হাসনা চৌধুরী। অন্যদিকে মেয়ের এমন ব্যবহারে মোস্তফা কামাল সাহেব ফাহমিদা আনমের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।ফাহমিদা আনমে মুখে অনিচ্ছুক হাঁসির রেখা টেনে ‌মেয়েকে সবার থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গেলেন।
ফারিন:”উফ আম্মু হাত ছাড়ো লাগছে তো”
ফাহমিদা আনম:”লাগুক! লাগার জন্যেই তো ধরেছি”
ফারিন:”আম্মু!”

ফাহমিদা আনম:”তুই কি রে ফারু? সারাজীবন তোর আর তোর বাবার মুড দেখতে দেখতেই তো আমার জীবন কেটে গেল।আর কত?”
ফারিন:”আমি কি করলাম?”
ফাহমিদা আনম:”ওইখানে এভাবে সিনক্রিয়েট করলি কেন? ওরা কি মনে করবে বল তো যে তোর মা তোকে ভালো শিক্ষা দেয় নি ভালো লাগবে তখন?”
ফারিন:”যা ইচ্ছা মনে করুক মা আর এখানে তো শুধু আমি বলিনি নির্ঝর ‌স্যারও বলছে”
ফাহমিদা আনম:”নির্ঝর স্যার মানে তুই কি নির্ঝরকে আগে থেকে চিনিস?”
ফারিন:”চিনবো না কেন ওই তো সেই হিটলার!”
ফাহমিদা আনম অবাক হয়ে বললেন,,

—”মানে তোদের নির্ঝর স্যার?”
ফারিন:”জ্বী! আর আম্মু আমি তো তোমার সাথে সব কথা শেয়ার করে ফেল তুমি তো জানো ওই হিটলারের বাচ্চা কি লেভেলের হিটলার ওকে বিয়ে করা সম্ভব!”
ফাহমিদা আনম:”সেটা তো ঠিক কিন্তু ওটাই যে ইমরান ভাইয়ের ছেলে সেটা তো জানতাম না ইমরান ভাইয়ের ছেলে তো ভালো বিসিএস ক্যাডার আর তোর বাবাকে তো চিনিস এখানে আমার কিছু করার নেই মা।!”
ফারিন:”তোমার কিছু করার না থাকলেও আমার আছে আমি ওকে বিয়ে করব না!”
ফাহমিদা আনম:”তুই কি চাচ্ছিস তোর বাবা আর আমার সম্পর্ক ভেঙে যাক!”
ফারিন:”এখানে বাবার তোমার সম্পর্কের কথা কোথা থেকে আসছে মা?”

ফাহমিদা আনম:”আপনি খুব ভালো করেই জানিস ইমরান ভাই আর তোর বাবার কত ভালো বন্ধুত্ব এখন যদি তোর কারনে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় তাহলে তোর বাবা আমার সাথে সম্পর্ক ভেঙে দিতেও দুইবার ভাববে না!”
ফাহমিদা আমার কোন কথা না বলে এখান থেকে চলে যায়। ফারিন নিষ্পলক চেয়ে থাকে সেদিকে এখন সে কি করবে? তখনই পাশ থেকে কেউ একজন বলে,,
—”কিরে ফারু কেমন লাগছে? এবার তো মনে হচ্ছে রক্তচোষাটাকে তোর বিয়ে করতে হবে! যাইহোক আমার কিন্তু নির্ঝর ভাইয়াকে ভীষণ ভালো লেগেছে!”

ফারিন রাগেদৃষ্টিতে পাশে তাকিয়ে দেখতে পায় টেবিলের উপর বসে আপেল খাচ্ছে আর পা দোলাচ্ছে তার ভাই ফারদিন। বয়সে তার থেকে দুই বছরের ছোট। মুখে দুষ্টু হাসি,এমনিতে ফারিনের আর ফারদিনের সারাদিন রাত ঝগড়া বাধে। ফারিন যখন বাড়ি আসে তখন বোঝা যায় যে দুই ভাই বোন এক জায়গায় হয়েছে। আর এখন এই মুহূর্তে এমনিতেই তার মাথা গরম তারপর ফারদিনের উল্টাপাল্টা কথা। ফারিন নিচু থেকে নিজের জুতা হাতে নিয়ে বলল,,

—”দেখছে সেটা কি এখন যদি এটা না খেতে চাস তাহলে সর না হলে কিন্তু সত্যি সত্যি বাড়ি মারবো!”
ফারদিন দ্রুত টেবিল থেকে নেমে বাইরে গিয়ে দরজায় উঁকি মেরে বলল,,
—”বেস্ট অফ লাক আপুমনি!”
ফারিন:”ফারদিনের বাচ্চা সরলি!”
ফারদিন দুষ্টু হেসে দৌড় দিল ।
এদিকে…..
ইমরান চৌধুরী:”এই তাহলে তোমার সেই ফারিন!”
হাসনা চৌধুরী:”হ্যাঁ”
মোস্তফা কামাল সাহেব কিছু না বুঝে বলল,,
—”এই তহলে ফারিন মানে?”
ইমরান চৌধুরী তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,,
—”আরে কি হয়েছে শুনি নির্ঝর আর পুতুল মানে ফারিন একদিন ওদের কলেজের একটা ফানশনে গান করছিল। সেখানেই ছিল তোর হাসনা ভাবি। আর সেই দিন থেকেই আমার কানের কাছে খালি ফারিন ফারিন করে!”
মোস্তফা কামাল:”ও আচ্ছা”
দুজনেই হাসলো। পাশ থেকে নির্ঝর ইমরান চৌধুরীকে ডেকে বলল,,

—”আমি বিয়ে করতে পারব না বাবা!”
ইমরান চৌধুরী চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,,
—”বিয়ে করতে পারবে না মানে কি? অসভ্যতামি হচ্ছে! বালটা তো তোমাদের বিয়েটা আমি আজকেই দিয়ে দিতাম কিন্তু অনুষ্ঠান করতে হবে তো। একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা।!”
নির্ঝর হাসনা চৌধুরীকে কিছু বলার আগেই হাসনা চৌধুরী বলল,,
—”নির্ঝর এতদিন তোর সব কথা আমি মেনে এসেছি তোর বাবার আড়ালে আমি তোকে অনেক সাপোর্ট করেছি কিন্তু আজকে একদম না ফারিন মেয়েটাকে আমার নিজেরও পছন্দ। তাই তুই যদি সবার সামনে কান মোলা না খেতে চাস চুপচাপ যা বলছি মেনে নে।

নির্ঝর চুপ করে থ মেরে বসে থাকলো। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে এখন কিছু বলতে গেলে তার নিজেরই মান সম্মান কাটা যাবে আর ফারিনের সামনে তো কখনোই নিজের মান সম্মান খাওয়ানো যাবে না। তাই সে চুপচাপ বসে থাকলো। মোস্তফা কামাল ইমরান চৌধুরীর মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে বলল,,
—”তাহলে কি বলিস বন্ধু? বিয়ের দিন তারিখ কবে রাখব নির্ঝরকে কিন্তু আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে! এখন তোদের যদি ফারিনকে পছন্দ হয়!”
ইমরান চৌধুরী দ্রুত মিষ্টি চিঁবিয়ে বললেন,,
—”আর পছন্দ অপছন্দের কি আছে তোর মেয়ে মানে তো আমারও মেয়ে! আর তাছাড়া রইল বাকি হাসনার কথা ও তো পুতুল শুনে আর আসতে চাচ্ছিল না পরে যখন জানতে পেরেছে পুতুলই তার ফারিন তখন থেকে দেখছিস না কি খুশি।”

ইমরান চৌধুরী আর মোস্তফা কামাল সাহেব হাসনা চৌধুরীর দিকে তাকালেন। তিনি ফাহমিদা আনমের সাথে গল্প করছেন। যেন দুজন বহুদিনের চেনা।
মোস্তফা কামাল:”তাহলে কি? বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করি!”
ইমরান চৌধুরী হাসনা চৌধুরী দিকে তাকিয়ে ডেকে বললেন,,
—”হাসনা এদিকে আসো ভাবি আপনিও আসেন!”

হাসিনা চৌধুরী ও ফাহমিদা আনাম এগিয়ে আসলেন। ইমরান চৌধুরী নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—”নির্ঝর তাহলে তুমি বাইরে থেকে ঘুরে আসো। এখন আমরা এখানে কথাবার্তা বলব।”
পাশ থেকে মোস্তফা কামাল সাহেব বললেন,,
—”ও এখন সন্ধ্যায় বাইরে কোথায় যাবে? তার চেয়ে বাবা তুমি ফারিন এর সাথে একটু একান্তে কথা বলে এসো দুজনেরই একটু চেনা চেনা বাড়বে।”
নির্ঝর মনে মনে বলল,,
—”এমনিতেই যা চিনে তাতে আর কিছু লাগবেনা!”
কিন্তু মোস্তফা কামাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—”না আঙ্কেল থাকুক!”

মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৩৫

নির্ঝর বেরিয়ে গেল। ফাহমিদা আনম হাসনা চৌধুরী ইমরান চৌধুরী আর মোস্তফা কামাল মিলে বিয়ের তারিখ ঠিক করলেন সামনের সপ্তাহের শুক্রবারে। মোস্তফা কামাল বললেন,,
—”এত দ্রুত!”
ইমরান চৌধুরী:”পারলে তো তোর মেয়েকে আজকেই নিয়ে যায় কিন্তু ফরমালিটি বলে তো কিছু আছে নাকি? এমনিতো তুই তো সেই পিচ্চিকাল থেকে তোর মেয়েকে আমার ছেলের জন্য দিয়েই রেখেছিস!”
মোস্তফা কামাল:”তা ঠিক!”
সবাই একযোগে হেসে উঠলো। আর এটাই ঠিক করা হলো যে সামনের সপ্তাহেই ফারিন আর তার হিটলারের বিয়ে!

মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৩৭