মায়াবতী পর্ব ৮

মায়াবতী পর্ব ৮
ইসরাত জাহান ইকরা

রাতের অন্ধকার কেটে সকাল হতেই, উঠান ঝাঁট দেওয়ার শব্দ, রাস্তাঘাটে সাইকেলের হর্ন, পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙলো মেঘার, ভ্রু কুঁচকে ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ৭.৩০ বাজে। মেঘা ধরফরিয়ে উঠে বসে দেখতে পেলো মাটি হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে, মেঘা বিছানা থেকে নেমে ফ্রেস হয়ে এসে মাটি কে ডেকে নিচে চলে গেল।
মাটি ঘুমঘুম চোখে বিছানায় উঠে বসতেই পর মূহুর্তেই মনে পড়লো আজকে তো মাহিদরা চলে যাবে। তারপর মাটি ফট করে উঠে বিছানা গুছিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।

মেঘা নিচে গিয়ে দেখতে পেলো বাড়ির সবাই উঠে পড়েছে, উঠানে চেয়ার পেতে বসে কি জেনো আলোচনা করছে। মেঘা কৌতুহলি চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রাহিমা বেগমের কাছে গিয়ে বলতে লাগলো চাচী আজ কি রান্না করবো।
রাহিমা বেগম ভ্রু কুঁচকে একপলক মেঘার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,_ আজকে তোর রান্না করতে হবে না বরং,এখন অনুর রুম টা গুছিয়ে দিয়ে এসে ফ্রিজ থেকে মাংসের পোটলা বের করে ভিজিয়ে রাখ। আর থালা বাসন গুলো পুকুর পাড় থেকে মেজে নিয়ে আয়। তারপর মশলা বেটে দিস, যা যা দেড়ি করিস।
অনুর আসার কথা শুনে মেঘা কিছুটা চমকে উঠলো, তার চাইতে বেশি ভয়‌ই লাগছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মেঘা আচ্ছা বলে উপরে চলে গেল, উপরে যাওয়ার সময় মেহমিদ এর সামনে পড়লো। মেহমিদ ভ্রু কুঁচকে মেঘার দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘা মেহমিদ এর দিকে থেকে চোখ সরিয়ে পাশ কেটে উপরে চলে গেল। মেহমিদ কিছু না বলে নিচে চলে এলো। মেহমিদ নিচে এসে আনোয়ার হোসেনের পাশে চেয়ার টেনে বসলো। তখনি ওদের কথোপকথন শুনতে পেলো। আনোয়ার হোসেন বললেন _ কাল কি হয়েছে না হয়েছে সেগুলোর জন্য তোমরা বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছো। আমি কাল রাতে বাজারে ছিলাম এর মধ্যেই এসব ঝামেলা হয়ে যাবে ভাবিনি। আমি এসব কিছু জানি না তোমরা কোথাও যাচ্ছো না ব্যাস।

শায়লা বেগম বলে উঠলেন _ আরে না না,ঐসব কথাবার্তায় রাগ করে যাচ্ছি না, মেহমিদ এর বাবার একটা ইমপোর্টেন্ট মিটিং আছে,সেই জন্য যাওয়া হচ্ছে। আর এখন একেবারে চলে যাচ্ছি আর আসবো না এমনটা তো না, বরং এখানে আমাদের আরো দায়িত্ব রয়েছে শাহিনের মেয়ে দুটোর ভবিষ্যত আর ভরনপুষন তো আমাদের ই দেখতে হবে না। আর শাহিনের মেয়ে বলছি কেন, মেয়ে দুটো আমার, আমি এখান থেকে নিয়ে যেতাম যদি ওদের পরিক্ষা না থাকতো।

আনোয়ার হোসেন বললেন _ তোমরা কি ভুলে গেছো আর চারদিন পর মেঘার বাবা মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী, তাই ভাবছিলাম তুমরা যেহেতু এসেছো এবার বড় করেই একটা দোয়া মাহফিলের আয়োজন করি ‌। কিন্তু তোমরা চলে গেলে আমার দ্বারা সবটা সামলে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়তো না।

মোশারফ হোসেন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে উঠলো _ আসলেই তো, আমার তো মনে‌ই ছিল না। কিন্তু এখন আমার যাওয়া ও জরুরি। তবে এর একটা সমাধান আছে, আমি আর শায়লা আজকে ঢাকায় ব্যাক করবো, এখানে মেহমিদ আর মাহিদ থাকবে। থেকে তোর সাথে সবটা এরা ম্যানেজ করবে আর আমরা শাহিনের মৃত্যুবার্ষিকীর আগের দিন চলে আসবো।

প্রস্তাব টা আনোয়ার হোসেনের ও মন্দ লাগেনি, বিনিময়ে খুশিতে মোশারফ হোসেন কে জরিয়ে ধরে বললো ঠিক আছে ভাইজান। তবে আমি উঠি, এখন আমার বাজারে যেতে হবে, এই বলে আনোয়ার হোসেন চেয়ার থেকে উঠে বলে উঠলো _ ক‌ই গো অনুর মা বাজের ব্যাগ টা দাও।

এতোক্ষণ সবটাই শুনছিলো রাহিমা বেগম, মেহমিদ মাহিদের থাকার কথা শুনে ভিশন খুশি হলো। কেননা রাহিমা বেগম মনস্থির করে রেখেছেন অনুর সাথে মেহমিদ এর বিয়ে দিবেন।
চা খেয়ে শায়লা বেগম আর মোশারফ হোসেন চলে গেলেন নিজেদের ঘরে। এদিকে চেয়ারে বসে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মেহমিদ মিটিমিটি হাসছে, কালকে রাতে মোশারফ হোসেন কে মেহমিদ ই বলেছিলো জেনো তাকে যেভাবেই হোক এ বাসায় রেখে যেতে। মেঘা কে রেখে চলে গেলে কি পরিমান কষ্ট সহ্য করতে হবে মেঘার এটা ভেবে মেহমিদ থেকে যেতে চাইছিল।

এদিকে মাটি উপরে থেকে সবকিছুই শুনছিলো, মাহিদরা যাচ্ছে না ভেবে খুশিতে নাচতে নাচতে মাহিদের রুমের দিকে যাচ্ছিল, তখনি একটা রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাটি লক্ষ্য করলো মেঘা অনুর রুম গোছাচ্ছে।
মাটি পিলিপিলি পায়ে অনুর রুমে প্রবেশ করে বলে উঠলো _ বাহ একদম চকচকা ফকফকা করে গুছিয়েছিস তো, আজ থেকে এখানে থাকবো নাকি আমরা।
মেঘা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো _ খবরদার মাটি এখানের কিছুই এলোমেলো করবি না,ন‌ইলে অনু আপা এসে তুলকালাম কান্ড করে ফেলবে।

মাটি ভেংচি কেটে বলে উঠলো _ এই ব্যাপার ডাইনি টা আসছে তাহলে, ছোটবেলায় তো কম মারেনি, এবার মারতে আসলে চুল গুলো ছিঁড়ে দিব।
মেঘা রেগে বলে উঠলো _ বের হো তো মাটি আমাকে জ্বালাস না। ঠিকমতো কাজ করতে দে, অনেক কাজ পড়ে আছে এমনিতেই আজকে জেঠুরা চলে যাচ্ছে।
মাটি বিছানায় ধপ করে বসে উপরের দিকে তাকিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে বলে উঠলো _ যাচ্ছে না, মেহমিদ ভাই আর মাহিদ্দা থেকে যাচ্ছে।

পরক্ষনেই মেঘার হাত টা আপনা আপনি থেমে গেল, খুশিতে চোখ টলমল করে উঠলো। মেহমিদ থাকবে শুনে মেঘার বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। কিন্তু মাটির সামনে সেই অফুরন্ত খুশিটা প্রকাশ করলো না। মাটি মেঘার মুখের পানে তাকিয়ে বলে উঠলো _ কি খুশি খুশি লাগছে। আমারো এমন লাগতেছিলো তো তাই বুঝতে পারলাম। বলেই মেঘা কে চোখ মারলো।
মেঘা ফিক করে হেসে দিয়ে বলে উঠলো _ এবার ঘর থেকে বের না হলে সত্যি সত্যি মাইর খাবি মাটি, এই বলে বেত হাতে নিতেই মাটি দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
মাটি চলে যেতেই মেঘা আনমনে হাসতে লাগলো। মেঘা রুম গুছিয়ে দরজা আটকিয়ে নিচে চলে গেল।

এদিকে সিএনজি থেকে টপস্ পেন্ট পড়া, একটি মেয়ে নামলো। সেটা ঘরের জানালা দিয়ে আয়েশা দেখতে পেলো। তারপর আয়েশা ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে আসতে আসতে বলতে লাগলো _ আম্মা, আম্মা গো অনু আপু চলে আসছে।
আয়েশা বেগম রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে ছুটে এলেন, অনু লাগেজ হাতে গেট পেরিয়ে উঠানে আসতেই মেহমিদ কে দেখতে পেলো।

মেহমিদ ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকাতেই ওমনি ফট করে অনু এসে মেহমিদ কে জরিয়ে ধরলো।
মেহমিদ ফোন টা কোন রকম পকেটে রেখে অনু কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলো।
অনু বলে উঠলো _ কেমন আছিস মেহমিদ।
মেহমিদ অনুর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে উঠলো _ ভালো ছিলাম এখন নেই। আর নাম ধরে তোকে না বারন করেছি ডাকার জন্য ভাই ডাকবি আমি তোর থেকে বড়।

অনু বলে উঠলো _ হুহ তোরে ক‌ইছে, তিন মাসের বড় হবি এটা কেউ ধরে। একসাথে হেসে খেলে বড় হ‌ইছি। ভার্সিটি তে ভর্তি হ‌ইছি বিধায় ফুফির বাড়ি থাকতে হ‌ইছে ন‌ইলে এতো দিন তোর সাথেই থাকতাম।
মেহমিদ বলে উঠলো _ হ‌ইছে তোর আর আমার সাথে থাকা লাগবে না, যা ঘরে যা।
তখনি রাহিমা বেগম বলে উঠলেন _ কিরে অনু কেমন আছিস, আয় মা ঘরে আয়। আর এসব কি পড়ছিস যা চেঞ্জ করে আয় তোর সাথে অনেক কথা আছে ঘরে আয়।

এই বলে অনুর লাগেজ রাহিমা বেগমের হাতে নিয়ে উপরে যেতে লাগলো।
এতোক্ষণ যাবত উপরে থেকে সবটাই দেখছিলো মেঘা, অনুর মেহমিদ কে জরিয়ে ধরতে দেখে রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে গেল মেঘার। অজান্তেই চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, তখনি উপরে রাহিমা বেগম আর অনু কে আসতে দেখে চোখ মুছে নিলো মেঘা।

অনুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো _ কেমন আছো অনু আপু।
অনু কপাল কুঁচকে বলে উঠলো _ হুম, ভালো আছি। এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস কাজ নেই।
মেঘা _ কাজ করেই তো এলাম, তোমার রুমটা পরিষ্কার করে এলাম,আর বাকি কাজগুলো করতে যাচ্ছি।
অনু চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো _ কি বললি আমার কাছে কাজের হিসাব দিচ্ছিস, একটা থাপ্পর মেরে ( এই বলে এগিয়ে যেতে নিলে রাহিমা বেগম অনু কে থামায়)
রাহিমা বেগম _ কি করছিস অনু,তোর জেঠুরা একটু পর বেরিয়ে যাবে, পরে শাসন করিস এখন ঘরে আয়। এই মেঘা যা থালা বাসন মেজে আয়। ( ধমকে)

মেঘা মলিন মুখে নিচে চলে। নিচে গিয়ে রান্নাঘর থেকে থালা বাসন নিয়ে পুকুরপাড়ে চলে গেল। কোমরে ওড়োনা গুজে বসে থালা বাসন মাজতে মাজতে মেঘা ডুকরে কেঁদে উঠলো _ আর বলতে লাগলো মা গো, তুমি কেন আমাদের রেখে চলে গেলে, আমাদের দুই বোন কে ও সাথে করে নিয়ে যেতে পারলে না, এতো অবহেলা লাঞ্চনা যে আর সহ্য করতে পারলো না। পরক্ষনেই মেঘার চোখের সামনে মেহমিদ কে অনুর জরিয়ে ধরা ভেসে উঠলো। এবার নিজের উপর নিজেরই বিরক্তিবোধ লাগছে মেঘা। মেঘা রেগে আনমনেই একটু জোরেই বলে উঠলো _ মেহমিদ ভাই কে যার ইচ্ছে সে জরিয়ে ধরুক,তাতে আমার কি,, আমার এমন লাগছে কেন।

পেছন থেকে মেহমিদ বলে উঠলো _ কেমন লাগছে?
মেঘা আঁতকে পেছনে তাকিয়ে দেখলো মেহমিদ দাঁড়িয়ে আছে, এক হাত প্যান্টের পকেটে রেখে আরেক হাতে পেয়ারা খাচ্ছে। পরক্ষনেই মেঘা চোখ সরিয়ে সামনে ফিরে জিহ্বায় কামড় বসালো। সাথে সাথে ভিশন লজ্জা ও পেলো। মেঘা কোন কথার জবাব না দিয়ে তাড়াতাড়ি করে থালা বাসন ধুয়ে এখান থেকে কেটে পড়তে লাগলো। পিছন ফিরতেই দেখতে পেলো মেহমিদ মেঘার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।

মেহমিদ ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো _ কি কেমন লাগছিল বললে না তো। মাথা ব্যাথা করছে ঔষধ লাগবে।
মেঘা নিচের দিকে তাকিয়ে একটা ঢুক গিলে, যেই মেহমিদের পাশ কাটিয়ে দৌড় দিতে যাবে ওমনি পা পিছলে গেল। সাথে সাথে মেহমিদ এক পা এগিয়ে মেঘার কোমর জড়িয়ে ধরল, কিন্তু তখনি মেহমিদের পা সাবানে পিছলে দুজনেই জরিয়ে ধরে পুকুরের পানিতে পড়ে গেল।
আকস্মিক ঘটনায় দুজনেই ভরকে গেল। পুকুরের পানিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তাকিয়ে আছে।
তখনি মাটি বলে উঠলো _ একি তোমরা পানিতে কি করছো।
সাথে সাথে মেঘা আর মেহমিদ উপরে উঠে আসলো। মেঘা থালাবাটি হাতে নিয়ে বলে উঠলো _ ওই সাবানে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম।

মাহিদ _ তাই বলে দুজনে একসাথে।
মেঘা চোখ উপরে তুলতেই দেখতে পেলো _ মাটি,মাহিদ অনু আয়েশা দাঁড়ানো।
মেঘা অনুর রাগান্বিত ফেস থেকে একটু ভয় পেয় গেল। মাটি আর কিছু না বলে সেখান থেকে দৌড়ে চলে গেল।
মেহমিদ চুল ঠিক করে মাহিদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো _ হ‌ইছে আর গোয়েন্দার মতো জেরা করতে হবে না, যে যার কাজে যা।

অনু রাগে গজগজ করতে করতে বাসার ভিতরে চলে গেল।
মেঘা ভেজা শরীরে গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরে থালা বাসন রাখতেই, রাহিমা বেগমের প্রশ্নের মুখে পড়লো।
রাহিমা বেগম _ ভিজলি কি করে,।
মেঘা _ ওই পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। চাচী আমি জামা পাল্টে আসি, তারপর মসলা বেটে দেই?
রাহিমা বেগম _ খালি কাজ ফাকি দেওয়ার ধান্দা,যা তাড়াতাড়ি আয়।
মেঘা অনুমতি পেয়ে ঘরে চলে গেল। তখনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অনু রান্নাঘরে আসলো। এসে রাহিমা বেগমের উদ্দেশ্য বলে উঠলো _ মা মেঘা কোথায়?

রাহিমা বেগম _ ঘরে গিয়েছে,ওনি নাকি পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, তাই কাপড় পাল্টাতে গেছে। আর তুই ওকে খুঁজছিস কেন।
অনু _ পানিতে পড়ে গিয়েছে না ছাই, মেহমিদ এর সাথে পানিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ছিল তুমি জানো। ওর কতো বড় শাহস, আজকে ওকে আমি মেরেই ফেলবো। এই বলে অনু উপর চলে গেল।

মায়াবতী পর্ব ৭

এদিকে মেঘা ওয়াশ রুম থেকে জামা চেঞ্জ করে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই কেউ হাত ধরে টেন নিয়ে এসে গালে স্বজোরে এক থাপ্পর মেরে বসলো। মেঘা ছলছল চোখে অনুর দিকে তাকালো।

মায়াবতী পর্ব ৯