মায়াবতী পর্ব ৯

মায়াবতী পর্ব ৯
ইসরাত জাহান ইকরা

মেঘা গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে অনুর দিকে তাকিয়ে আছে। আর চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মেঘা কান্নাভেজা কন্ঠে বলে উঠলো _ অনু আপু আমি কি করেছি, তুমি আমাকে মারছো কেন।
অনু রেগে দাঁত কিটমিট করে বলে উঠলো _ কি করেছিস জানিস না, এখন সাধু সাজছিস। এতো দিন বাসায় ছিলাম না সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে উড়তে শুরু করছিস তাই না। এই বলে অনু যেই মেঘার চুল ধরতে যাবে তখনি মেঘা অনুর হাত ধরে, ঝাড়ি দিয়ে বলে উঠলো _ আমার অপরাধ টা কি বলবে তো, শুধু শুধু কেন মারছো।

অনু মেঘার এহেন কান্ডে ভিশন রেগে গেল। মেঘা কে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেঘার গলা চেপে ধরলো আর বলতে লাগলো _ এতো বড় সাহস তোর আমার মুখের উপর কথা বলিস, আমার গায়ে হাত দিস তোকে আজ আমি মেরেই শান্ত হবো। কি তোর অপরাধ শুনবি না, তবে শুন তুই আমার কলিজায় হাত দিয়েছিস,। এইই মেহমিদের সাথে কি তোর। যদি কখনো মেহমিদের আশেপাশে দেখছি তো, তোকে তো মারবোই সাথে তোর ছোট বোন মাটি ওকে ও স্কুল থেকে ছেলেপেলেদের হাতে তুলে দিয়ে বলবো মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। বুঝেছিস
এদিকে মেঘার ধম বন্ধ হয়ে আসছে, গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করছে। চোখ দুটো উল্টে যাচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তখনি দরজায় মাটি এসে কড়া নাড়লো,_ আপু তোকে চাচী ডাকছে, বলেছে, তাড়াতাড়ি গিয়ে মশলা বেটে দিতে। ও আপু তুই দরজা লাগিয়ে কি করছিস।
মাটির ডাকে অনু নিজের রাগ কন্ট্রোল করলো। মেঘা কে ছেড়ে দিয়ে বলে উঠলো _ আমার কথাটা মাথায় গেঁথে রাখিস, এই বলে দরজা খুলে গটগট করে চলে গেল।

অনু কে নিজেদের ঘর থেকে বের হয়ে যেতে দেখে,মাটি ভিশন অবাক হলো, মাটি অনুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলতে লাগলো _ এই ডাইনি টা আমাদের ঘরে এসেছিলো কেন রে, এই বলে মাটি বিছানার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো মেঘা শুয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। মাটি দৌড়ে গিয়ে _ জগ থেকে পানি নিয়ে মেঘা কে বিছানা থেকে উঠিয়ে পানি এগিয়ে দিল। মেঘা পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে বালিশে মাথা এলিয়ে দিল।
মাটি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো _ আপু তুই এমন করিস কেন, ওই ডাইনি টা তোকে মেরেছে তাই না। ওকে তো আজকে মেরেই ফেলবো, এই বলে মাটি উঠে যেতে নিলে মেঘা মাটির হাত ধরে টেনে বিছানায় বসিয়ে রাখলো। মেঘা মাটি কে বলতে লাগলো _ এদের সাথে আমরা পেড়ে উঠবো না মাটি, দিনশেষে আমাদের এখানেই থাকতে হবে।

মাটি _ তাই বলে ওদের সব অন্যায় মাথা পেতে নিতে হবে, এর প্রতিবাদ না করলে ওরা আরো মাথায় চেপে বসবে। আর তুমি ওদের এতো ভয় পাচ্ছো কেন, জেঠুরা তো আছেই বিশেষ করে মেহমিদ ভাই কে জানালেই তো ওদের এতো সাহস বাড়বে না।

মেঘা _ এই একদম না, এসব কাউকে জানাতে হবে না, জানালে পরিবারে আরো সমস্যা হবে, তাহলে জেঠুরা রাগ করে এখান থেকে চলে যাবে, পড়াশোনার জন্য আমাদের এখানেই থাকতে হবে ওদের সাথেই। আর আমি একা হলে না হয় ওদের অত্যাচারে মুখ বুঝে থাকতাম না, আমার সাথে তোর জীবন জরিয়ে আছে।
মাটি রেগে বলে উঠলো _ হ‌ইছে শুনছি তোর নীতিকথা। আমি গেলাম আমার কাজে……এই বলে মাটি চলে গেল।
মেঘা বিছানা ছেড়ে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো গলায় পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে। ওড়োনা মাথায় পেঁচিয়ে মেঘা নিচে চলে যায়, জেনো কেউ তা না দেখতে পারে।
নিচে যেতেই মেঘা দেখতে পেলো মেহমিদ ফোনে কার সাথে যেনো কথা বলছে, আড়চোখে একবার মেঘা কে পরখ করে গেট পেরিয়ে বাইরে চলে গেল।

মেঘা রান্নাঘরে গিয়ে শিল পাটা নামিয়ে মশলা বাটতে আরম্ভ করলো। আর ভাবতে লাগলো এভাবে চলতে থাকলে মেঘার ইয়ার চেঞ্জ পরিক্ষা ভালো হবে। এখন থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে ধ্যান কাটলো হাতে ব্যাথা পেয়ে। মেঘা উফ বলে পিরি টেনে নিচে বসে হাতের আঙ্গুলে পানি ঢালতে লাগলো। তখনি রাহিমা বেগম বললেন _ মন কোথায় থাকে? মেহমিদ এর কাছে,,, অনুর কাছে থেকে সবটাই শুনলাম, তোর ব্যাবস্থা হয়ে গেছে, মেহমিদ রা আর চারদিন পর ই চলে যাবে সেই সুযোগে তোকে বিয়ে দিয়ে দিব, তারপর আর পর পুরুষের সাথে ঢলাঢলি করতে হবে না।

এসব কথা শুনে মেঘার বেশ বিরক্ত লাগলো, কোনরকম রান্নাঘর থেকে কাজ শেষ করে বেরিয়ে পড়লো।
তখনি পিছন থেকে মাটি বলে উঠলো _ আপু তোকে মেহমিদ ভাই ডাকছে। বললো তার রুমে যেতে।
মেঘা ভ্রু কুঁচকে মাটির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো _ কিছু বলেছিস?
মাটি বললো _ আমি কি বলবো, তুই যদি মার খেতে ভালোবাসিস তবে এখানে আমার কি বলার থাকে।
মেঘা এক পলক মাটির দিকে তাকিয়ে উপরে চলে গেল _ মেহমিদ এর রুমের দিকে।

মেঘা মেহমিদের রুমের দরজায় নক করে বলে উঠলো _ মেহমিদ ভাই ডেকেছেন?
মেহমিদ উত্তরে বললো _ হুম ভেতরে এসো।
মেঘা কোনরকম ওড়োনা ঠিক করে ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলো মেহমিদ বিছানায় বসে ফোন টিপছে।
মেঘা ভেতরে প্রবেশ করে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলো।
মেহমিদ ফোন টা বিছানার পাশে রেখে মেঘা কে স্ক্যান করে দেখতে লাগলো। এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেহমিদ মেঘা কে দেখছে বলে আমতা আমতা করে মেঘা বলে উঠলো _ কিছু বলবেন মেহমিদ ভাই? না মানে আমার কিছু কাজ আছে, ।

মেহমিদ ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো _ কবে থেকে হুজুরীনি সাজা হচ্ছে মেঘ?
মেঘা চমকে তাকিয়ে বলে উঠলো _ মানে?
মেহমিদ বিছানা থেকে নেমে হাত দুটো ভাঁজ করে বলে উঠলো _ এই যে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে ইয়া লম্বা ঘোমটা দিয়ে,কাজ করা, সারা বাড়ি ঘুরা ঘুরি তাই একটু কনফিউজড।
মেঘা তুতলিয়ে বলতে লাগলো _ এই এমনিতেই, আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই।
মেহমিদ বলে উঠলো _ ওড়োনা টা সরাও মেঘ।
সাথে সাথে মেঘা হকচকিয়ে মেহমিদ এর পানে তাকালো। মেঘা কপাল কুঁচকে বলে উঠলো _ এসব কি বলছেন মেহমিদ ভাই।

মেহমিদ রেগে বলে উঠলো _যা বলছি তাই করো, এক্ষুনি ফাস্ট।
মেঘা বুঝতে পারলো মেহমিদ এর সাথে তর্ক করে পারবে না, তাই দরজার দিকে তাকিয়ে দৌড় দিতে যাবে ওমনি মেহমিদ মেঘার হাত টেনে ধরে দরজা বন্ধ করে ফেললো।
মেহমিদ এক টানে মেঘার ওড়োনা খুলে ফেললো। মেঘা তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল, সাথে সাথে লম্বা চুল গুলো খোপা খুলে পিঠে ছড়িয়ে পড়লো।

মেঘা রেগে বলে উঠলো _ আপনি কি চান মেহমিদ ভাই এমন করছেন কেন।
মেহমিদ মেঘা হাত টেনে বিছানা থেকে উঠিয়ে গাল দুটো ধরে গলার দিকে তাকালো। মেহমিদ গলার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো গলায় পাঁচ আঙুলের দাগ।
মেহমিদ ভ্রু উঁচু করে বলে উঠলো _ আপনাকে কি ঘুমের ঘোরে বোবায় ধরেছিল মিস মেঘা।
মেঘা কোনরকম মেহমিদ এর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রেগে বলে উঠলো _ সবটাই তো জানেন তবে এমন করছেন কেন বলুন তো, এই আপনার জন্য, আপনার জন্য‌ই আমার সাথে আজ এমন হয়েছে। দয়া করে আপনি আমার থেকে দূরে থাকুন।

মেহমিদ শান্ত হয়ে চেয়ার টেনে বসে জগ থেকে পানি খেয়ে বলে উঠলো _ তারপর?
মেঘা রেগে জোর গলায় বলে উঠলো _ তারপর আর কি?
মেহমিদ বলে উঠলো _ বাহ বাহ আমার সাথে জোর গলায়, তারপর? ছোটবেলায় ও আমার জন্য মার খেয়েছিলেন মিস মেঘা?
মেঘা মেহমিদের কথায় চুপ হয়ে গেল।

তারপর মেহমিদ বলে উঠলো _ আসলে আপনি এখনো প্রাচীন যুগে পড়ে আছেন মিস মেঘা, কেননা প্রাচীন যুগের মানুষেরা ছিল দাস প্রথায়, একজন মালিক থাকতো আর দাসদের উপর চরম নির্যাতন চালাতো,তাই দাসদের কুকুর বা গাধার সাথে তুলনা করা হতো, আপনাকে কোনটার সাথে তুলনা করা যায় বলুন তো।
এবার মেঘা বুকটা ফেটে কান্না আসতে লাগলো, মেঘা অসহায় দৃষ্টিতে মেহমিদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো _ আপনি তো মেয়ে হয়ে জন্ম নেন নাই মেহমিদ ভাই? তাই আপনি কি বুঝবেন, যাদের মাথায় উপর বাবা নামক গাছটি নেই, মা নামক রক্ষক টি নেই, তাদের জীবন টা দাস প্রথার ন্যায় চলতে থাকে।

মেহমিদ বলে উঠলো _ হ‌ইছে, সারাজীবন মানুষ কে নিজের দুর্বলতা দেখিয়ে বেরাবা আর মানুষ তোমার দুর্বলতায় আঘাত করবে না ভাবলে কি করে। যাই হোক, এবার থেকে আর দুর্বলতা নয় নিজেকে একটি শক্তিশালী মানুষ হিসেবে তৈরি করো।
আর কালকে থেকে তোমার টাইপিং ক্লাস শুরু। সকালে ঘুম থেকে উঠে পুকুর পাড়ে চলে এসো। এবার যাও,।
মেঘা মেহমিদের কথা শুনে চোখ মুছে নিজের ঘরে চলে গেল।

মায়াবতী পর্ব ৮

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই সবাই খাওয়া দাওয়া করে নিল, শায়লা বেগম আর মোশারফ হোসেন রোওনা দিল ঢাকার উদ্দেশ্যে।
পরদিন থেকে এক নতুন সকাল তৈরি করবে মেঘা। কাউকে আর ভয় পাবে না এবার থেকে সে। এই ভেবে মেঘা মাটির দিকে তাকালো।

মায়াবতী পর্ব ১০